বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন বিআইডব্লিউটিপি-১ প্রকল্পের পরিচালক আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জন, ড্রেজিং প্রকল্পে অনিয়ম, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সদ্য বদলি হওয়া বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ স্থাপনা ও ঘাট সিন্ডিকেটে পৃষ্ঠপোষকতা এবং সরকারি কার্যালয়ে প্রকাশ্যে ধূমপানের অভিযোগ সামনে এসেছে।
একাধিক নথি, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, স্থানীয় সূত্র এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে এসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে
প্রতিবেদক। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোর বিষয়ে স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই এখনও সম্ভব হয়নি।
২০১২ থেকে ২০২৪–অঢেল সম্পদের বিস্তার : অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আইয়ুব আলী নিজের, স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের নামে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা, ফতুল্লা, কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, পূর্বাচল, কালীগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, শালিখা, ভৈরব ও যশোরের বাঘারপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে প্লট, ফ্ল্যাট, বাড়ি, কৃষিজমি, মাছের ঘের, গরু ও মুরগির খামার, বায়োগ্যাস প্লান্ট এবং ধানি জমির তথ্য পাওয়া গেছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, তিনি ছেলে নাভিদ ফারহান ঐশিক, স্ত্রী ফারজানা নাহিদ লিজা, মেয়ে পূর্ণতা ফারজানা এবং ভাই-বোনদের নামেও বিপুল সম্পদ কিনেছেন।
রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট : অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্ত্রী ফারজানা নাহিদের নামে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এম ব্লকে ৩ কাঠার একটি প্লট রয়েছে, যেখানে সাততলা ভবনের নির্মাণকাজ চলছে।
এছাড়া বারিধারা ডিওএইচএসে দুটি ২,২০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, পশ্চিম ধানমণ্ডি, জিগাতলা, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পূর্বাচল, আফতাবনগর, আশুলিয়া এবং রাজধানীর আরও বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লটের তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, সাভার-আশুলিয়ায় গরুর খামার, যশোরে গরুর খামার, আশুগঞ্জে মুরগির খামার, মাছের ঘের এবং মাগুরার বিভিন্ন মৌজায় বিপুল কৃষিজমির মালিকানার তথ্য।
আশুগঞ্জে ১০ কোটি টাকার খামার প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন : ব্রাহ্মাণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার চরচারতলা ইউনিয়নে প্রায় ৫০ শতাংশ জমিতে একটি বড় মুরগির খামার, বায়োগ্যাস প্লান্ট ও বহুতল ভবন নির্মাণের তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১০ কোটি টাকা।
একই এলাকায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২১০ কোটি টাকার কার্গো টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পেরও প্রকল্প পরিচালক আইয়ুব আলী।
স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে, প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি কাজের সূত্রেই চেয়ারম্যান ফাইজুর রহমানের সঙ্গে আইয়ুব আলীর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
তবে চেয়ারম্যান ফাইজুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি মূল ঠিকাদার নন; কেবল নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করেছেন। মুরগির খামার নিজের অর্থ ও জমি বিক্রির টাকায় নির্মাণ করছেন বলেও দাবি করেন।
বিদেশেও সম্পদের অভিযোগ : অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, ২০২১ সালে লন্ডনে এবং ২০২৩ সালে নিউইয়র্কে বাড়ি কেনেন আইয়ুব আলী। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় ছেলেদের নামে সম্পদ এবং ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগও রয়েছে।
তবে বিদেশে সম্পদ সংক্রান্ত এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই এখনও সম্ভব হয়নি।
ড্রেজিং প্রকল্পে শত শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ : ড্রেজিং প্রকল্পে প্রতি ঘনমিটার মাটি অপসারণের ব্যয় বাস্তবের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখিয়ে সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ১৪০ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিংয়ের বিপরীতে দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এর একটি বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, নির্ধারিত আরপিএমের চেয়ে কম গতিতে ড্রেজার চালিয়ে জ্বালানি তেল সাশ্রয়ের নামে তেল চুরি এবং কম পরিমাণ পলি অপসারণ করেও কাগজে-কলমে বেশি কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়।
এছাড়া নদী থেকে উত্তোলিত বালু বিক্রি এবং একই স্থানে পুনরায় পলি জমার সুযোগ রেখে বারবার ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগও রয়েছে। নিম্নমানের ড্রেজার আমদানি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও ঘুষের অভিযোগ : আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে নিম্নমানের ১১টি ড্রেজার আমদানির বিল অনুমোদন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং ড্রেজার ও সহায়ক জলযান মেরামতে দীর্ঘদিন ধরে একটি সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, গত ১৫ বছরে ড্রেজিং বিভাগের প্রায় সব বড় প্রকল্পেই তিনি প্রভাব বিস্তার করেছেন।
ঠিকাদারদের হামলার ঘটনাও আলোচনায় : নারায়ণগঞ্জের একটি প্রকল্পে কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে অর্থ গ্রহণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ কয়েকজন ঠিকাদারের হামলার শিকার হন আইয়ুব আলী। ওই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরেও বিতর্ক : সদ্য বদলি হওয়া বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক অভিযোগ। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, তিনি দায়িত্ব পালনকালে সরকারি অফিসকেই ব্যক্তিগত আড্ডাখানায় পরিণত করেন এবং অবৈধ স্থাপনা ও ঘাট সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে অর্থ আদায়ে ভূমিকা রাখেন।
সম্প্রতি খুলনায় সরকারি সম্পত্তি নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিক তার দপ্তরে গেলে তাকে অফিসকক্ষে প্রকাশ্যে ধূমপান করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে।
ভিডিওচিত্রে দেখা যায় বলে অভিযোগ, সেবাগ্রহীতাদের উপস্থিতিতেই তিনি ধূমপান করছেন এবং একই সঙ্গে সরকারি ফাইলে স্বাক্ষর করছেন।
একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, অফিস চলাকালে ধূমপান তার নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল এবং এতে সেবাগ্রহীতারা চরম ভোগান্তিতে পড়তেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আমি টেনশনে থাকি, তাই এভাবে ধূমপান করি।”
তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, শিক্ষার্থী লাঞ্ছনা, অবৈধ স্থাপনা সিন্ডিকেটে সম্পৃক্ততা এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নিয়েও অনুসন্ধান চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে যা বললেন আইয়ুব আলী : অভিযোগের বিষয়ে জানতে ফোন করা হলে আইয়ুব আলী প্রথমে প্রতিবেদকের বিস্তারিত পরিচয় জানতে চান। পরে তিনি জানান, মিটিংয়ে রয়েছেন এবং পরে কথা বলবেন। সন্ধ্যায় পুনরায় যোগাযোগ করে তার ও পরিবারের নামে বিপুল সম্পদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান এবং তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পরামর্শ দেন। একপর্যায়ে তিনি ফোন কেটে দেন।
মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া : নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমি ওর দায় নিতে পারব না।” অন্যদিকে, যুগ্ম পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
বিআইডব্লিউটিএ’র বর্তমান চেয়ারম্যানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
অনুসন্ধান অব্যাহত : আইয়ুব আলী ও মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা সম্পদ, প্রকল্প বাস্তবায়ন, টেন্ডার ব্যবস্থাপনা, ড্রেজিং কার্যক্রম, সরকারি অর্থ অপচয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও স্বাধীন যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে, বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং কার্যক্রম, প্রকল্প ব্যয়, সম্পদ অর্জন এবং প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।