নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ভুয়া পিএইচডি সনদ ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার ছুটি ও প্রেষণ ভোগের অভিযোগে বিভাগীয় মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। নথিপত্র অনুযায়ী, বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি নিজেই দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এরপরও গুরুদণ্ড নয়, মাত্র এক বছরের জন্য একটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের মতো লঘুদণ্ডেই পার পেয়ে যান তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতাসীন মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে এই প্রকৌশলীর ক্যারিয়ারে একের পর এক অস্বাভাবিক উত্থানের দরজা খুলেছে। একসময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সঙ্গে ‘ফুপু-ভাতিজা’ সম্পর্কের পরিচয় দিয়ে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই পরিচয়ের জায়গায় এসেছে জামায়াত-ঘনিষ্ঠতার দাবি। আবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে বিএনপি-ঘনিষ্ঠতার পরিচয় দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, কিন্তু খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক বদলায়নি-শুধু বদলেছে পরিচয়ের ভাষা।
বর্তমানে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্বে)। এই পদ স্থায়ী করার প্রচেষ্টার পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে পদোন্নতির তালিকার শীর্ষে ওঠার অভিযোগও উঠেছে।
তাকে ঘিরে বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার পুনর্মূল্যায়নের নামে কমিশন বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, নথি জালিয়াতি এবং জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে।
জাল কাগজপত্রে অস্ট্রেলিয়া, তদন্তে প্রমাণিত অসদাচরণ ;
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংরক্ষিত নথিতে থাকা বিভাগীয় মামলার আদেশে দেখা যায়, খালেকুজ্জামান চৌধুরী অস্ট্রেলিয়ায় প্রেষণ ভোগের জন্য একটি ভুয়া অফার লেটারসহ শিক্ষাসংক্রান্ত কাগজপত্র তৈরি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করেছিলেন-এমন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
নথি অনুযায়ী, বিষয়টি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার আওতায় ‘মিসকন্ডাক্ট’ বা অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অভিযুক্ত কর্মকর্তা লিখিত জবাবে দোষ স্বীকার করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
এরপর ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার স্বাক্ষরিত আদেশে তার একটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়।
অর্থাৎ, সরকারি নথির ভাষ্য অনুযায়ী, জাল কাগজপত্র ব্যবহারের অভিযোগে বিভাগীয় শাস্তি হয়েছিল।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এ ধরনের গুরুতর অসদাচরণের পর তার বিরুদ্ধে কেন কঠোরতর ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? এবং শাস্তির অল্প সময়ের মধ্যেই কীভাবে তার ক্যারিয়ারে অস্বাভাবিক গতির পদোন্নতি শুরু হলো?
তিন বছরের মাথায় দুই দফা পদোন্নতি : সরকারি চাকরির সার্ভিস রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৬ সালে বিভাগীয় শাস্তি পাওয়ার পর ২০১৯ সালের ২২ জুলাই নিয়মিত পদোন্নতি পেয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হন খালেকুজ্জামান চৌধুরী। এর কয়েক মাসের মধ্যেই, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, তিনি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জাল কাগজপত্র ব্যবহারের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত এবং যিনি নিজেই দোষ স্বীকার করেছেন, তার ক্ষেত্রে এত দ্রুত ক্যারিয়ার অগ্রগতির পেছনে কী ধরনের প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছিল? সংশ্লিষ্ট নথিতে এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না থাকলেও রাজনৈতিক সুপারিশের অভিযোগটি নতুন করে সামনে এসেছে।
‘ফুপু-ভাতিজা’ সম্পর্কের রাজনীতি : অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রভাবশালী নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কের পরিচয় দিয়ে খালেকুজ্জামান রাজনৈতিক প্রভাববলয়ে অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
তবে সাজেদা চৌধুরীর ছেলে সাজেদ আকবর এ ধরনের সম্পর্কের বিষয়ে সরাসরি জ্ঞান থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তার ভাষায়, একই নির্বাচনি এলাকার হওয়ায় অনেকেই তার মায়ের কাছে আসতেন এবং কেউ কেউ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি করতেন।
এই বক্তব্যের ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আরও সামনে আসে- খালেকুজ্জামানের সঙ্গে সাজেদা চৌধুরীর কথিত আত্মীয়তা আদৌ প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা কি কখনো তদন্ত করা হয়েছিল?
আওয়ামী লীগ থেকে জামায়াত, এরপর নতুন রাজনৈতিক পরিচয়? ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খালেকুজ্জামান চৌধুরীর রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরন বদলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এবার তিনি জামায়াত-ঘনিষ্ঠ পরিচয় সামনে আনেন। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কের কথা বলা হয়।
খালেকুজ্জামানের বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা গ্রামে। একই উপজেলার ফুলসুতি গ্রামে ডা. তাহেরের শ্বশুরবাড়ি। পারিবারিক সূত্রের সম্পর্কের কারণে তাহেরের স্ত্রী ডা. হাবিবা আক্তার চৌধুরীকে তিনি ‘ফুপু’ বলে ডাকেন—এমন দাবিও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এই সম্পর্ক এবং তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলামের প্রভাবেই ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর তিনি পাঁচজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব পান। এ অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু একজন কর্মকর্তার পদোন্নতির প্রশ্ন নয়; বরং সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা ও বিধিবিধান কতটা রাজনৈতিক সুপারিশের কাছে পরাজিত হয়েছে—সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
জ্যেষ্ঠতায় তিন নম্বর, তালিকায় এক নম্বর! গণপূর্ত অধিদপ্তরের দাপ্তরিক জ্যেষ্ঠতার তালিকা অনুযায়ী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীদের মধ্যে মো. আবুল খায়ের ও উৎফল কুমার দে খালেকুজ্জামানের আগে রয়েছেন। জ্যেষ্ঠতার বিচারে খালেকুজ্জামানের অবস্থান তৃতীয়। কিন্তু প্রধান প্রকৌশলী পদ স্থায়ী করার প্রক্রিয়ায় তাকে তালিকার শীর্ষে রাখার অভিযোগ উঠেছে।
গত ৬ জুলাই প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগের জন্য সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) বিবেচনার উদ্দেশ্যে পাঁচজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নাম জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে প্রশাসনিক জ্যেষ্ঠতার স্বাভাবিক ক্রম অনুসরণ করা হয়নি।
এখানেই শেষ নয়। অভিযোগ রয়েছে, খালেকুজ্জামানের পথ পরিষ্কার করতে তার চেয়ে জ্যেষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তাকে দুর্বল করার জন্য তাদের নাম জুলাই-পরবর্তী একটি মামলার আসামির তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।

“মামলার বোঝা চাপিয়ে সিনিয়রদের সরানোর চেষ্টা? : অভিযোগ অনুযায়ী, রামপুরা থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় জ্যেষ্ঠ কয়েকজন প্রকৌশলীসহ মোট ৪৭ জনের নাম যুক্ত করা হয়। সেই মামলার নথি এসএসবিতে উপস্থাপন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়েছে-এমন অভিযোগ রয়েছে।
যদি এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে এটি হবে ভয়াবহ প্রশাসনিক অনিয়মের নজির। কারণ একটি ফৌজদারি মামলায় কারও নাম থাকা আর আদালতে তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। ফলে শুধু মামলার আসামি হওয়ার তথ্য ব্যবহার করে পদোন্নতিতে কাউকে বাদ দেওয়া এবং অন্য কাউকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকলে তার পেছনের উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে তদন্ত করা জরুরি।
বদলি বাণিজ্যের অভিযোগে অস্বস্তিতে গণপূর্ত : প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য।
অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার কাছ থেকে ১০ লাখ থেকে শুরু করে এক কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ আদালত বা কোনো তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে বিষয়টি বর্তমানে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
তারপরও অভিযোগের গুরুত্ব বাড়িয়েছে মার্চের গণবদলির ঘটনা।
চলতি বছরের ৩ মার্চ এক দিনে অর্ধশতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলির আদেশ দেওয়া হয়।
অভিযোগ ওঠে, এত বড় পরিসরের রদবদলের বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি। পরে ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে অধিকাংশ বদলি বাতিল করা হয়।
প্রশ্ন হলো—কেন এত বড় বদলি আদেশ দেওয়া হয়েছিল, কারা এর সুবিধাভোগী ছিলেন এবং বাতিলের আগে বা পরে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে শুধু নথি, ব্যাংক লেনদেন ও স্বাধীন তদন্ত।
বরখাস্ত প্রকৌশলীকে ‘ব্যাকডেটে’ পুনর্বাসনের অভিযোগ :
আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বরখাস্ত প্রকৌশলী মো. সাইফুজ্জামানকে ঘিরে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ৩ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির দায়ে সাইফুজ্জামানকে বরখাস্ত করে। আদেশে তাকে লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু গণপূর্ত অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি আদেশে দেখা যায়, ২ ফেব্রুয়ারি তাকে ঢাকার রিজার্ভে বদলি দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ, ৩ ফেব্রুয়ারি বরখাস্ত হওয়া একজন কর্মকর্তাকে ২ ফেব্রুয়ারি বদলি দেখানো হলো কেন?
আরও প্রশ্ন—এই আদেশ যদি সত্যিই ২ ফেব্রুয়ারি জারি হয়ে থাকে, তাহলে তা ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হলো কেন? অভিযোগকারীরা এটিকে নথি জালিয়াতি বা ব্যাকডেটিংয়ের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে মূল নথি, ডাক রেজিস্টার, ডিজিটাল ফাইলের টাইমস্ট্যাম্প, অনুমোদনকারী কর্মকর্তাদের নোট এবং আদেশ জারির রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
টেন্ডারেও ‘কমিশন’ বিতর্ক : বদলি বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরে বড় প্রকল্পের দরপত্র পুনর্মূল্যায়নের নামে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে।
ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১, বিভাগ-৩ এবং শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ-২-এর অধীনে বড় অঙ্কের পাঁচটি দরপত্র পুনর্মূল্যায়নের জন্য ফেরত পাঠানোর ঘটনা সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, নতুন পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ২০২৫-এর ত্রুটির কথা বলা হলেও প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল কমিশন না পাওয়ায় দরপত্র আটকে রাখা।
এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো-টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, প্রধান প্রকৌশলীর নোট, পুনর্মূল্যায়নের লিখিত কারণ, দরপত্রদাতাদের দর এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত—সবকিছু পাশাপাশি পরীক্ষা করা।
কারণ কোনো টেন্ডার পুনর্মূল্যায়ন করা নিজে অপরাধ নয়। কিন্তু পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত যদি বিধিসম্মত কারণ ছাড়া নেওয়া হয়ে থাকে এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে তা ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি গুরুতর প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মে পরিণত হতে পারে।
দুদকে অভিযোগ, চাওয়া হয়েছে সম্পদের হিসাবও :
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বদলি-পদায়নে আর্থিক লেনদেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বরখাস্ত প্রকৌশলীকে ব্যাকডেটে বদলির মাধ্যমে পুনর্বাসনের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগে সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ, আর্থিক লেনদেন যাচাই এবং সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, দেশে-বিদেশে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সম্পদ অর্জনের বিষয়ও তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই তদন্ত বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়া প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ : খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে বিতর্কের মধ্যে একজন সাংবাদিককে হুমকির অভিযোগও সামনে এসেছে।
২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে দৈনিক সকালের স্টাফ রিপোর্টার মো. এমরান হোসেন মতিঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডিতে তিনি অভিযোগ করেন, সংবাদ সংগ্রহের জন্য প্রধান প্রকৌশলীর মোবাইল নম্বরে ফোন করলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং সাংবাদিকতা পেশা নিয়ে হেয়প্রতিপন্ন করার মতো কথা বলা হয়। মতিঝিল থানার নথিতে জিডিটি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তথ্য রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই অভিযোগেরও তদন্ত প্রয়োজন। কারণ একজন সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে একজন সাংবাদিকের বিরোধ থাকতেই পারে; কিন্তু অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে সেটি মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক।
ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক-একই গল্পের পুনরাবৃত্তি ? খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে অভিযোগগুলোর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো তার রাজনৈতিক পরিচয়ের ধারাবাহিক পরিবর্তনের দাবি।
আওয়ামী লীগ আমলে সাজেদা চৌধুরীর সঙ্গে আত্মীয়তার পরিচয়, পরবর্তী সময়ে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক, এরপর নতুন রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দাবি—সব মিলিয়ে অভিযোগকারীরা যে চিত্র তুলে ধরছেন তা হলো, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে তিনি নিজেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
এই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের জন্য রাজনৈতিক পরিচয়ের দাবি নয়, প্রয়োজন নথিভিত্তিক অনুসন্ধান-কার সুপারিশে কোন পদোন্নতি, কোন নথির ভিত্তিতে কোন পদায়ন, কোন সময়ে কোন সিদ্ধান্ত, কার অনুমোদনে কোন টেন্ডার পুনর্মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে আর্থিক লেনদেনের কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল কি না।
বিশেষজ্ঞের প্রশ্ন: দুর্নীতির অভিযোগ থাকা কর্মকর্তাই কেন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে?
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, জালিয়াতি বা দুর্নীতির অভিযোগে প্রমাণিত কোনো কর্মকর্তাকে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসানোর আগে তার অতীত রেকর্ড গভীরভাবে যাচাই করা উচিত।
তার মতে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কর্মকর্তাদের পদপদবি বাগিয়ে নেওয়ার সংস্কৃতি প্রকৃত যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তাদের পিছিয়ে দেয় এবং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সক্ষমতা দুর্বল করে।
এই বক্তব্যের সঙ্গে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর অতীত ও বর্তমান ক্যারিয়ার নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে—একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতীতে বিভাগীয় শাস্তি থাকলে পরবর্তী পদোন্নতির সময় সেটি কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তরও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।
জবাব মেলেনি প্রধান প্রকৌশলীর : খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে ১০ আগস্ট তার দপ্তরে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার ব্যাখ্যা, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং সংশ্লিষ্ট নথির ভিত্তিতে অবস্থান তুলে ধরা জরুরি।
এখন সামনে তিনটি বড় প্রশ্ন : খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার। তবে সরকারি নথি, বিভাগীয় মামলার আদেশ, পদোন্নতির রেকর্ড, বদলি আদেশ এবং দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগ মিলিয়ে অন্তত তিনটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—
প্রথমত, জাল কাগজপত্র ও অসদাচরণের অভিযোগে বিভাগীয় শাস্তি পাওয়া একজন কর্মকর্তা কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই দ্রুত পদোন্নতির ধারায় উঠে এলেন?
দ্বিতীয়ত, জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে থাকা একজন কর্মকর্তা কী প্রক্রিয়ায় প্রধান প্রকৌশলীর পদে অগ্রাধিকার পেলেন?
তৃতীয়ত, বদলি, পদায়ন ও টেন্ডার নিয়ে যে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, তার পেছনে কোনো অর্থনৈতিক লেনদেনের প্রমাণ আছে কি না? এই তিন প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়-নথি, আর্থিক হিসাব, ডিজিটাল রেকর্ড এবং স্বাধীন তদন্তেই মিলবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তর দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। সেখানে প্রধান প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়ে যদি জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, রাজনৈতিক প্রভাব, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার অনিয়ম কিংবা নথি জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বিতর্ক নয়; এটি পুরো প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।
অভিযোগগুলোর সত্যতা কিংবা অসত্যতা—দুটিই দ্রুত নির্ধারণ করা জরুরি। কারণ অভিযোগ যদি মিথ্যা হয়, তাহলে একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধ হওয়া উচিত। আর অভিযোগ সত্য হলে, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে পরিচয় বদলে পদ-পদবি বাগিয়ে নেওয়ার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া সুশাসনের দাবি অর্থহীন হয়ে পড়বে।








