বিশেষ প্রতিবেদকঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আতিকুল ইসলামকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে এসেছে। বরিশালে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে অনিয়ম, ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ এবং বিপুল অর্থের অবৈধ লেনদেনে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে ঢাকায় এলজিইডি সদর দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্পের দায়িত্বে থাকলেও আগের অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত হয়নি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বরিশালে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আতিকুল ইসলাম স্থানীয়ভাবে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেছিলেন। ওই বলয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়নকাজ ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে কাজের মান, বাস্তব অগ্রগতি কিংবা প্রকৃত ব্যয়ের বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই না করেই বিল-ভাউচার প্রস্তুত ও পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপব্যবহার ও আত্মসাতের সুযোগ হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আতিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বরিশালে দায়িত্ব পালনের সময় তৎকালীন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হাসনাত আবদুল্লাহসহ ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এ রাজনৈতিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি প্রশাসনিকভাবে সুবিধা পেয়েছেন এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের পরও প্রভাবশালী পদে টিকে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বরিশালে দায়িত্ব পালনের সময় আতিকুল ইসলাম ঠিকাদারদের একটি নির্দিষ্ট অংশকে সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে নিজের প্রভাববলয় তৈরি করেন। কাজ পাওয়া, বিল ছাড় করানো এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তার ঘনিষ্ঠদের প্রভাব ছিল বলে কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য, এর ফলে সাধারণ ঠিকাদারদের একটি অংশ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে আতিকুল ইসলাম এলজিইডির সদর দপ্তরের RIVER (Resilient Infrastructure for Adaptation and Vulnerability Reduction) প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গুরুত্বপূর্ণ এই পদে তার নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের দাবি, অতীতে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি না করেই তাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সদর দপ্তরের ওয়ার্কশপ ভবনের লেভেল-৩-এ তার কার্যালয়ে বিভিন্ন ঠিকাদার ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়মিত যাতায়াত নিয়েও কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
আতিকুল ইসলামকে ঘিরে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো ব্যক্তিগত সম্পর্ক সংক্রান্ত। তার বন্ধু ও নরসিংদীর নির্বাহী প্রকৌশলী ফুলকাম বাদশার স্ত্রীর সঙ্গে অনৈতিক বা পরকীয়ার সম্পর্কে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ফুলকাম বাদশার স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন এবং সেই সূত্রে আতিকুল ইসলামেরও দেশটিতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল। সেখানে ফুলকাম বাদশার পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত সম্পর্কের এই অভিযোগের পক্ষে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, বরিশালে দায়িত্ব পালনকালে আতিকুল ইসলাম একাধিকবার থাইল্যান্ডে যাতায়াত করেছেন। তার এসব সফরের উদ্দেশ্য, ব্যয়ের উৎস এবং সেখানে কার সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল—এসব বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত হোটেলেও বিভিন্ন নারীর সঙ্গে তাকে সময় কাটাতে দেখা গেছে।
আতিকুল ইসলামের পারিবারিক সম্পদ নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, তার স্ত্রী ও সন্তান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং তাদের নামে-বেনামে সেখানে বিপুল সম্পদ রয়েছে। একই সঙ্গে দেশে ও বিদেশে আতিকুল ইসলামের সম্পদের পরিমাণ তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। তবে এসব সম্পদের বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এলজিইডির কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, আতিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা দরকার। বিশেষ করে বরিশালে দায়িত্ব পালনের সময় তার সম্পদ বৃদ্ধি, ঠিকাদারদের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক, প্রকল্পের বিল-ভাউচার, বিদেশ ভ্রমণের অর্থের উৎস এবং বর্তমানে তিনি যে প্রকল্পের দায়িত্বে রয়েছেন সেখানে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযোগকারীদের দাবি, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে শুধু প্রশাসনিক পদায়ন পরিবর্তন না করে তার সম্পদের উৎস এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনও যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নেওয়া এবং প্রমাণ যাচাইয়ের দাবি রয়েছে।
সব মিলিয়ে, এলজিইডির গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ আতিকুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হলে তিনি দীর্ঘদিনের অনিয়মের অভিযোগ থেকে মুক্ত কি না, নাকি এসব অভিযোগের পেছনে বাস্তব কোনো ঘটনা রয়েছে—তা স্পষ্ট হতে পারে।








