বিশেষ প্রতিবেদকঃ বরিশাল আঞ্চলিক বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও যানবাহন নিবন্ধনকে কেন্দ্র করে অনিয়ম এবং ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে মোটরযান পরিদর্শক সৌরভ কুমার সাহার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, পরীক্ষায় অকৃতকার্য প্রার্থীদেরও টাকার বিনিময়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন তিনি। এ কাজে তাঁর সঙ্গে কার্যালয়ের আশপাশে সক্রিয় একটি দালাল চক্র জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে সরকারি নিয়ম মেনে লাইসেন্স পাওয়ার পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে লাইসেন্স সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
বিআরটিএর প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, প্রথমে লার্নার বা শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে হয়। এরপর নির্ধারিত দিনে লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই একজন আবেদনকারী চূড়ান্ত ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য হন। কিন্তু বরিশাল বিআরটিএতে এই নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। পরীক্ষায় ফেল করলেও নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলে ফলাফল পরিবর্তন করে পাস করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে গাড়ি চালানোর প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকা ব্যক্তিরাও লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
এ বিষয়ে একটি লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্সের নথিও সামনে এসেছে। লার্নার নম্বর ১১-১৮৫৯৮২০১-এর আবেদনকারী আকাশ খান, পিতা মনির খান। নথি অনুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বরিশাল বিআরটিএ কার্যালয়ে তাঁর পরীক্ষার দিন নির্ধারিত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের আবেদনকারীদের পরীক্ষার ফলাফল প্রভাবিত করতে একটি চক্র কাজ করে। পরীক্ষায় কে উত্তীর্ণ হয়েছেন আর কে অকৃতকার্য হয়েছেন, তা যথাযথভাবে যাচাই না করেই অর্থের বিনিময়ে ফলাফল পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে সৌরভ সাহার বিরুদ্ধে। এমনকি পরীক্ষার বোর্ডে ম্যাজিস্ট্রেট বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ফলাফল ও পরীক্ষার খাতায় কারসাজি করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এই পুরো কার্যক্রম পরিচালনায় সৌরভ সাহার ঘনিষ্ঠ একটি চক্র সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে। চক্রটির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত গাড়িচালক রিয়াজ খান ছাড়াও আলাউদ্দীন, জাকির, আসাদুল ও হৃদয়ের নাম উঠে এসেছে। এদের পাশাপাশি আরও ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল লাইসেন্সপ্রত্যাশীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরীক্ষায় ফেল করা কিংবা নিয়ম অনুযায়ী লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারা ব্যক্তিদের সঙ্গে তারা টাকার বিনিময়ে লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার চুক্তি করে। পরে সেই অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি পরীক্ষার বোর্ডকে কেন্দ্র করে এই চক্রের মাধ্যমে কয়েক লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হয়। একেকটি বোর্ড থেকে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে মোটরযান পরিদর্শক সৌরভ সাহার বিরুদ্ধে। ফলে সরকারি পরীক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে অদক্ষ চালকরা অর্থের বিনিময়ে লাইসেন্স পেলে সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্স নয়, যানবাহন নিবন্ধনেও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে সৌরভ সাহার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ট্রাক ও মোটরসাইকেলের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় বিভিন্নভাবে অর্থ আদায় করা হয়। একটি সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন করিয়ে দিতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিয়মকানুন উপেক্ষা করে শত শত থ্রি-হুইলার ও সিএনজি নিবন্ধনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অনিয়মের কারণে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি পরিবহন খাতে অবৈধ যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সৌরভ সাহার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অবশ্য এবারই প্রথম নয়। এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা দায়েরের তথ্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ ও মামলার পরও তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে প্রভাব বিস্তার করে তিনি নিজের অনিয়মের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে চাকরিতে যোগদানের পর সৌরভ সাহার সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ১১ বছরের চাকরিজীবনে তিনি নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তাঁর পরিবারের নামে একাধিক বাস, বিলাসবহুল ব্যক্তিগত গাড়ি এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকার তথ্যও সামনে আনা হয়েছে। এর মধ্যে ‘হাওলাদার পরিবহন’-এর বাসের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। চাকরির আয় ও এসব সম্পদের প্রকৃত উৎসের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
সব মিলিয়ে বরিশাল বিআরটিএ কার্যালয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও যানবাহন নিবন্ধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পরীক্ষায় ফেল করেও অর্থের বিনিময়ে লাইসেন্স পাওয়ার অভিযোগ জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। সচেতন নাগরিকদের দাবি, সৌরভ কুমার সাহার বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ, ফলাফল পরিবর্তন, দালাল সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ, পরিবারের নামে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবহন সম্পদের উৎস যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।








