তেজগাঁও সাব রেজিস্ট্রি অফিসে দালালরাজ্য: প্রভাবশালী চক্রের কাছে জিম্মি সাধারণ মানুষ

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ রাজধানী ঢাকার তেজগাঁও সাব রেজিস্ট্রি অফিস এখন সাধারণ মানুষের জন্য আতঙ্কের জায়গায় পরিণত হয়েছে। এখানে সেবা নিতে এলে দালাল চক্রের মুখোমুখি না হয়ে কোনো কাজ করানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পুরো অফিসটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো দলিল নড়ে না, কোনো ফাইল এগোয় না। ফলে প্রকৃত সেবা প্রত্যাশীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, যাদের কোনো সরকারি পদ বা দায়িত্ব নেই, তারাও সাব রেজিস্ট্রারের এজলাসে প্রকাশ্যে বসে দলিল সম্পাদনের কাজে যুক্ত থাকে। সাব রেজিস্ট্রারের পাশেই দাঁড়িয়ে তারা দলিল প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে এবং নিজেদের প্রভাব দেখায়। এইভাবেই বছরের পর বছর ধরে তারা কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই চক্রের অন্যতম আলোচিত সদস্য হলেন আকিব এবং তার ভাই আওলাদ হোসেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কারও বৈধ নিয়োগপত্র বা দায়িত্ব না থাকলেও তারা অফিসের ভেতরে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সাধারণ মানুষকে নানা কৌশলে আস্থায় নিয়ে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দেয় তারা। এরপর কাজের বিনিময়ে ইচ্ছেমতো টাকা আদায় করে নেয়। কেউ রাজি না হলে ফাইল আটকে রাখার ভয় দেখানো হয়।

অভিযোগ আছে, তেজগাঁওয়ের সাব রেজিস্ট্রার আবদুল কাদেরের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতাতেই এই দালাল চক্রটি এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সাব রেজিস্ট্রার যতক্ষণ এজলাসে থাকেন, ততক্ষণ এই চক্রের সদস্যরা চারপাশ ঘিরে বসে থাকে। আগত সেবাগ্রহণকারীদের নজরে পড়তেই তারা কাছে টেনে নেয় এবং দ্রুত কাজের প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায় করে।

এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সিল ও স্বাক্ষর জাল করে দলিল তৈরি, বালাম বইয়ে কাটাছেঁড়া, গুরুত্বপূর্ণ পাতা ছিঁড়ে ফেলা এবং সরকারি নথি নষ্ট করার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের মাধ্যমে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে এবং সরকারি সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে জানা গেছে। তেজগাঁও ও মোহাম্মপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসকে তারা কার্যত নিজেদের অবৈধ বাণিজ্য কেন্দ্র বানিয়ে ফেলেছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, সরকার পরিবর্তন হলেও এই চক্র সব সময় নিজেদের অবস্থান ঠিক রেখে চলে। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, তাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে নিজেদের অপকর্ম ঢাকার চেষ্টা করে। অবৈধ আয়ের একটি বড় অংশ স্থানীয় কিছু পাঁতি নেতার পেছনে ব্যয় করে তারা নিজেদের প্রভাব ধরে রাখে। এসব নেতাদের মাধ্যমেই সাব রেজিস্ট্রারের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই সুযোগে সাব রেজিস্ট্রার আবদুল কাদের রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় দালাল চক্রটি অফিসটিকে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তির মতো ব্যবহার করছে। ফলে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দলিল, বালাম বই ও নথিপত্র নষ্ট হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে হারিয়েও যাচ্ছে।

অভিযোগের তালিকায় আরও রয়েছে আওলাদ হোসেনের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি। একাধিক সূত্র জানায়, তাকে এক সময় পাঁচ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং কয়েক মাস জেলও খেটেছেন। তার বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা রয়েছে। সহকর্মীদের ভাষ্যমতে, আওলাদ হোসেন এমন কোনো কাজ নেই যা করতে সে পিছপা হয়। অনেক সময় তার কথা না মানলে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও আওলাদ হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। তেজগাঁও শিল্প এলাকায় তার পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে। হাতিরঝিল, বাড্ডা ও টঙ্গীতে রয়েছে জমি ও বাড়ি। সুনামগঞ্জে তিন একর জায়গাজুড়ে মাছের ঘের আছে বলেও জানা গেছে। এসব সম্পদের একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ থাকলেও তিনি সবই পৈতৃক সম্পত্তি বলে দাবি করে আসছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওলাদ হোসেন নিজেকে কারও তোয়াক্কা না করা একজন হিসেবে পরিচিত করে তুলেছেন। আইজিআর, জেলা রেজিস্ট্রার—কাউকেই তিনি গুরুত্ব দেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাব রেজিস্ট্রার ছাড়া অন্য কারও কিছু করার ক্ষমতা নেই। এই আত্মবিশ্বাস থেকেই তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে এজলাস কক্ষ দখল করে রাখাও এই চক্রের আরেকটি বড় অভিযোগ। সাধারণ সেবাগ্রহণকারীরা সেখানে দাঁড়ানোরও সুযোগ পান না। টেবিল-চেয়ার বসিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীরা জায়গা দখল করে রাখে। কে কতটা প্রভাবশালী, তার ওপর নির্ভর করে কে এজলাস কক্ষে বসতে পারবে। বিষয়টি জেলা রেজিস্ট্রারের নজরে আনা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সাব রেজিস্ট্রার আবদুল কাদেরের উদাসীনতায় পুরো চক্রটি এখন আরও লাগামহীন হয়ে উঠেছে।

  • Related Posts

    ক্ষমতার পালাবদলে পরিচয় বদলের অভিযোগ, আলোচনায় প্রাণিসম্পদ পরিচালক শাহজামান খান

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ দেশের প্রশাসনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কর্মকর্তা নিজেদের অবস্থান বদল করছেন—এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কৃত্রিম প্রজনন দপ্তরের পরিচালক মো. শাহজামান খানকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো…

    ২২ বছর গৃহবন্দি, নির্যাতনের অভিযোগ কুমু বেগমের; ন্যায়বিচার চেয়ে সংবাদ সম্মেলনে কান্না

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ দীর্ঘ ২২ বছর ধরে গৃহকর্মী হিসেবে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার এবং পরবর্তীতে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ তুলে প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    জামায়াতপন্থী আইন কর্মকর্তাদের পদত্যাগকে ‘পলিটিক্যাল স্টান্টবাজি’ বলছে বিএনপি

    • By Reporter
    • জুন ২৪, ২০২৬
    • 10 views
    জামায়াতপন্থী আইন কর্মকর্তাদের পদত্যাগকে ‘পলিটিক্যাল স্টান্টবাজি’ বলছে বিএনপি

    জিতলে জাপান, ড্র-তে নেদারল্যান্ডস আর হারলে জার্মানি—কী করবে ব্রাজিল

    • By Reporter
    • জুন ২৪, ২০২৬
    • 9 views
    জিতলে জাপান, ড্র-তে নেদারল্যান্ডস আর হারলে জার্মানি—কী করবে ব্রাজিল

    ৬ মাসের মধ্যে শেষ হবে কাঁচপুর টার্মিনালের কাজ, যানজটমুক্ত হবে ঢাকা

    • By Reporter
    • জুন ২৪, ২০২৬
    • 9 views
    ৬ মাসের মধ্যে শেষ হবে কাঁচপুর টার্মিনালের কাজ, যানজটমুক্ত হবে ঢাকা

    মাদকমুক্ত প্রজন্ম গঠনে শিক্ষার ওপর জোর ডেপুটি স্পিকারের

    • By Reporter
    • জুন ২৪, ২০২৬
    • 10 views
    মাদকমুক্ত প্রজন্ম গঠনে শিক্ষার ওপর জোর ডেপুটি স্পিকারের

    যে কারণে মানচিত্র থেকে সরে গেল জাপান, কী বলছে গবেষণা

    • By Reporter
    • জুন ২৪, ২০২৬
    • 9 views
    যে কারণে মানচিত্র থেকে সরে গেল জাপান, কী বলছে গবেষণা

    যুক্তরাজ্যে এক হাজারেরও বেশি স্কুল বন্ধ

    • By Reporter
    • জুন ২৪, ২০২৬
    • 10 views
    যুক্তরাজ্যে এক হাজারেরও বেশি স্কুল বন্ধ