গণপূর্তে বিধি লঙ্ঘনের মহোৎসব: আদালতের আদেশ উপেক্ষা, দ্বৈত বেতন ও অবৈধ পদোন্নতিতে জাহাঙ্গীর আলমের উত্থান

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাবেক ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে একের পর এক ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য সামনে আসছে। অবৈধ নিয়োগ, বিধিবহির্ভূত পদোন্নতি, আদালতের আদেশ প্রকাশ্যে অমান্য এবং একই সময়ে দুই সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন উত্তোলনের মতো গুরুতর অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন মোঃ জাহাঙ্গীর আলম। সংশ্লিষ্ট নথি ও অভ্যন্তরীণ সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বছরের পর বছর ধরে একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতির নেটওয়ার্ক প্রশাসনের ভেতরেই সক্রিয় রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আদালতের স্পষ্ট স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের একটি গোষ্ঠীকে সরাসরি উচ্চতর পদে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী এ ধরনের সরাসরি নিয়োগ ‘ব্লক পোস্ট’ হিসেবে বিবেচিত, যেখানে পরবর্তী পদোন্নতির সুযোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু নিয়মের তোয়াক্কা না করে ষষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব কর্মকর্তাকে পরবর্তীতে পঞ্চম গ্রেডে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা সম্পূর্ণভাবে বিধিবহির্ভূত বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে মোঃ জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তিনি একই সময়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়মিত বেতন গ্রহণ করেছেন এবং একই সময় গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদেও এককালীন বেতন উত্তোলন করেছেন। বেতন উত্তোলনের সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী একই সময়ে দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন গ্রহণ গুরুতর অপরাধ হলেও জাহাঙ্গীর আলম আজও নির্বিঘ্নে চাকরিতে বহাল রয়েছেন।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, সাবেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা বদরুল আলম খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন ধরে দরপত্র বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বদরুল আলম খানের ডানহাত হিসেবে পরিচিত থাকায় বিভাগের ভেতরে তার প্রভাব ছিল প্রশ্নাতীত। অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে বিভাগের বহু কর্মকর্তা তার ভয়ে নীরব থাকতে বাধ্য হন।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, এ অবৈধ নিয়োগ ও পদোন্নতির পেছনে সক্রিয় ভূমিকা ছিল সাবেক পূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূইয়া এবং রফিকুল ইসলামের। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও এসব নিয়োগে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ছিল। একই সঙ্গে দাবি করা হচ্ছে, অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব প্রকৌশলী শুধু রাজনৈতিক ক্যাডার হিসেবেই পরিচিত নন, বরং জুলাই আন্দোলনের বিপরীতে ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। কয়েকজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় অর্থদাতা হিসেবে নাম থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।

এদিকে আদালতের নির্দেশে ১৭ জন বিসিএস কর্মকর্তার পদ সংরক্ষণের আদেশ থাকলেও গণপূর্ত অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তা আজও কার্যকর করেনি। বরং অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিসিএস কর্মকর্তাদের ওপরে জ্যেষ্ঠতা দিয়ে গ্রেডেশন তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর ভুক্তভোগী বিসিএস কর্মকর্তারা গ্রেডেশন পুনর্নির্ধারণের আবেদন জানালেও তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোঃ শামীম আখতার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আদালতের আদেশের প্রকাশ্য অবমাননা এবং স্বৈরাচারী দোসরদের অবৈধ সুবিধা টিকিয়ে রাখার কৌশল।

প্রশাসনের ভেতরেও এই অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জনপ্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই ধরনের পদোন্নতি কোনোভাবেই বিধিসম্মত হতে পারে না এবং এর পেছনে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ছাড়া এমন ঘটনা সম্ভব নয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলেন, আদালতের স্থগিতাদেশের মধ্যে যোগদান এবং একই সময়ে দুই দপ্তর থেকে বেতন উত্তোলন সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ আত্মসাতের শামিল। তার মতে, দুর্নীতি দমন কমিশনের উচিত জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে অবৈধভাবে উত্তোলিত অর্থ উদ্ধার করা এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়—আদালতের আদেশ, সরকারি চাকরি বিধি এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা উপেক্ষা করে কীভাবে বছরের পর বছর ধরে এমন ভয়াবহ অনিয়ম চলতে পারে? কোন ‘অদৃশ্য শক্তি’র ছত্রছায়ায় আজও বহাল রয়েছে এই দুর্নীতির নেটওয়ার্ক? জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।

  • Related Posts

    দীর্ঘদিন পর বিটিআরসির ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন, উঠল অনিয়মের অভিযোগ

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)-এর আটজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই তারা চাকরিতে যোগ…

    ডিএই প্রশাসন শাখায় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ: সিন্ডিকেট, বদলি বাণিজ্য ও অনিয়মের জালে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকা খামারবাড়িস্থ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রশাসন শাখার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক এ এ মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুদকের চার্জশিটভুক্ত পলাতক আসামিদের আশ্রয় প্রদান, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী কর্মকর্তাদের…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    শততম ম্যাচে রেকর্ডের ঝড় তুললেন এমবাপ্পে

    • By Reporter
    • জুন ২৩, ২০২৬
    • 9 views
    শততম ম্যাচে রেকর্ডের ঝড় তুললেন এমবাপ্পে

    যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা বন্ধে ডিএসসিসি, বিডি ক্লিন ও রেড ক্রিসেন্টের যৌথ উদ্যোগ

    • By Reporter
    • জুন ২৩, ২০২৬
    • 9 views
    যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা বন্ধে ডিএসসিসি, বিডি ক্লিন ও রেড ক্রিসেন্টের যৌথ উদ্যোগ

    রাতে ১৭ অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির আভাস

    • By Reporter
    • জুন ২৩, ২০২৬
    • 8 views
    রাতে ১৭ অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির আভাস

    ১৫ বছরের মধ্যে মিসরের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে ইসরায়েল: ইহুদি নেতার সতর্কবার্তা

    • By Reporter
    • জুন ২৩, ২০২৬
    • 9 views
    ১৫ বছরের মধ্যে মিসরের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে ইসরায়েল: ইহুদি নেতার সতর্কবার্তা

    খামেনির দাফন ও শেষ বিদায়: তেহরানে তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা

    • By Reporter
    • জুন ২৩, ২০২৬
    • 9 views
    খামেনির দাফন ও শেষ বিদায়: তেহরানে তিন দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা

    বিপৎসীমার কাছাকাছি তিস্তার পানি, খুলে দেওয়া হয়েছে সব জলকপাট

    • By Reporter
    • জুন ২৩, ২০২৬
    • 9 views
    বিপৎসীমার কাছাকাছি তিস্তার পানি, খুলে দেওয়া হয়েছে সব জলকপাট