ডাকাতি মামলার আসামির পুনর্বহাল: যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড–এ দ্বৈত নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ডাকাতি মামলায় গ্রেফতার, একটানা এক মাস সতের দিন জেল হাজত, এরপর জামিনে মুক্তি—আর তারপরই বিনা বাধায় আবার চাকরিতে যোগদান! সরকারি মালিকানাধীন জ্বালানি খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড–এর বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপোতে ঘটেছে এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা, যা এখন প্রতিষ্ঠানজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম এইচআর) মোঃ মাসুদুল ইসলাম এবং বাঘাবাড়ী ডিপো ইনচার্জ আবুল ফজল মোঃ সাদেকিন। তাদের প্রত্যক্ষ মদদে ডাকাতি মামলার আসামি অফিস সহকারী (হাজিরাভিত্তিক) হোসাইন মোঃ ইসহাক মিল্টন কোনো নিয়মনীতি অনুসরণ ছাড়াই ফের চাকরিতে যোগ দিয়েছেন—এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

গ্রেফতার, জেল, তারপরও ‘চিকিৎসাধীন’ গল্প ! তথ্য অনুযায়ী, বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপোর অফিস সহকারী হোসাইন মোঃ ইসহাক মিল্টন গত ৬ জানুয়ারি ২০২৬ একটি ডাকাতি মামলায় গ্রেফতার হন। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থানার একটি মামলায় আদালতের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানা পুলিশ তাকে আটক করে। প্রায় এক মাস সতের দিন জেল হাজতে থাকার পর তিনি ২২ ফেব্রুয়ারি জামিনে মুক্তি পান।
তবে বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে রহস্যের ঘনঘটা। ইসহাক মিল্টনের দাবি—তিনি ডাকাতি নয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলায় কারাবন্দি ছিলেন এবং এ সময় অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিলেন।

কিন্তু অফিস কর্তৃপক্ষের একাংশ বলছে ভিন্ন কথা। বাঘাবাড়ী ডিপোর ডেপুটি ম্যানেজার আবুল ফজল মোঃ সাদেকিন দাবি করেন, “ইসহাক মিল্টন জেলে ছিলেন—এটা আমি এই প্রথম শুনলাম। আমার জানা মতে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।” অথচ দেড় মাসের বেশি অনুপস্থিতির পর তার পুনরায় যোগদানের বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে—একজন কর্মী যদি সত্যিই জেলে থাকেন, তবে সেটি কীভাবে ‘হাসপাতালে চিকিৎসাধীন’ হিসেবে চালানো হলো? আর যদি চিকিৎসাধীনই হন, তাহলে সেই চিকিৎসার কাগজপত্র কোথায় ?

‘বিশ্বস্ত ক্যাশিয়ার’, বদলির সঙ্গী !
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ইসহাক মিল্টন দীর্ঘদিন ধরে ডিপো ইনচার্জ আবুল ফজল মোঃ সাদেকিনের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত। তাকে অনেকেই ডিপো ইনচার্জের ‘ক্যাশিয়ার’ বলেও উল্লেখ করেন। অভিযোগ রয়েছে, আবুল ফজল যেখানে বদলি হন, সেখানেই সঙ্গে নিয়ে যান ইসহাক মিল্টনকে। পার্বতীপুর ডিপোতে একসঙ্গে কর্মরত থাকার পর বাঘাবাড়ীতে বদলির সময়ও তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। এবারও সেই প্রভাব খাটিয়ে জেল ফেরত কর্মীকে পুনর্বহাল করা হয়েছে—এমনটাই অভিযোগ।

জিএম এইচআর–এর নীরবতা কি ‘সম্মতির সীল ’? বাঘাবাড়ী ডিপো ইনচার্জের সঙ্গে মানবসম্পদ বিভাগের জিএম এইচআর মোঃ মাসুদুল ইসলামের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও অবৈধ লেনদেনের অভিযোগও ঘুরছে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে-বাইরে। সেই সম্পর্কের জোরেই নাকি কোনো প্রশাসনিক তদন্ত ছাড়াই ইসহাক মিল্টনের পুনঃযোগদান নিশ্চিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জিএম এইচআর মাসুদুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার এই নীরবতা কি দায় এড়ানোর কৌশল, নাকি ঘটনার অন্তরালে থাকা প্রভাবশালী চক্রের প্রতি নীরব সমর্থন—সে প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।

সিবিএ নেতাদের বরখাস্ত, কিন্তু ‘বিশ্বস্ত’ কর্মীর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেন ? আরও বিস্ময়কর হলো, দীর্ঘদিন ধরে জেল হাজতে থাকা যমুনা ওয়েলের সিবিএ নেতা আবুল হোসেন ও মুহাম্মদ এয়াকুব এবং অনুপস্থিত আরেক সিবিএ নেতা জয়নাল আবেদীন টুটুলকে সম্প্রতি সাময়িক বরখাস্ত করেছে কর্তৃপক্ষ।

তাহলে প্রশ্ন একটাই—একই প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড কেন? সিবিএ নেতাদের ক্ষেত্রে কঠোরতা, আর ডিপো ইনচার্জের ঘনিষ্ঠ কর্মীর ক্ষেত্রে রহস্যজনক নমনীয়তা কেন ? নিয়মের শাসন, নাকি ব্যক্তির প্রভাব ? রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রতিষ্ঠানে এমন অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন তোলে না, বরং পুরো ব্যবস্থাপনাকেই সন্দেহের মুখে দাঁড় করায়। একজন কর্মী জেল হাজতে ছিলেন কি না—এ তথ্য জানতেই যদি কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিভ্রান্তি থাকে, তবে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ? ডাকাতি মামলার আসামি হোক বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার অভিযুক্ত—যে কোনো ফৌজদারি মামলায় গ্রেফতার হওয়া কর্মীর বিষয়ে স্পষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া থাকার কথা। সেখানে কীভাবে নিয়ম ভেঙে ‘বিশেষ ব্যবস্থায়’ পুনঃযোগদান সম্ভব হলো?

এখন দেখার বিষয়—যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের শীর্ষ কর্তৃপক্ষ কি এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করবে, নাকি প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যাবে?
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দ্বৈত নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এই বিস্ফোরক অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

  • Related Posts

    মাদারীপুর এলজিইডিতে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পিডি বাবুল আখতারকে ঘিরে শতকোটি টাকার প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ মাদারীপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র ও কার্যাদেশ নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন এলজিইডির সাবেক মাদারীপুর জেলা নির্বাহী…

    ভিজিটিং কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি ঘিরে প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিস্ট্রার মো. জাহিদ হাসানের বদলিকে কেন্দ্র করে তাঁর দায়িত্ব পালনকালের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় তাঁর বদলি হওয়ার খবরের পাশাপাশি ভিজিটিং কার্ড…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    মাদারীপুর এলজিইডিতে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পিডি বাবুল আখতারকে ঘিরে শতকোটি টাকার প্রশ্ন

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 12 views
    মাদারীপুর এলজিইডিতে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পিডি বাবুল আখতারকে ঘিরে শতকোটি টাকার প্রশ্ন

    ভিজিটিং কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি ঘিরে প্রশ্ন

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 9 views
    ভিজিটিং কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি ঘিরে প্রশ্ন

    বিআরটিএ উত্তরা মেট্রো-৩: ঘুষ দাবির অভিযোগে প্রশ্নের মুখে সেবা কার্যক্রম, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

    বিআরটিএ উত্তরা মেট্রো-৩: ঘুষ দাবির অভিযোগে প্রশ্নের মুখে সেবা কার্যক্রম, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

    চাকরির আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মেলে না, সাবেক সাবরেজিস্ট্রার নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 14 views
    চাকরির আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মেলে না, সাবেক সাবরেজিস্ট্রার নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

    লোহাগড়ায় জমি নিয়ে বিরোধ, ছোট ভাইকে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ বড় ভাই ও ভাবীর বিরুদ্ধে!

    লোহাগড়ায় জমি নিয়ে বিরোধ, ছোট ভাইকে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ বড় ভাই ও ভাবীর বিরুদ্ধে!

    বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের জন্য ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছিল: রিজভী

    বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের জন্য ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছিল: রিজভী