আইজিপির নাম ভাঙিয়ে কোটি টাকার প্রতারণা—শফিউল্লাহ আল মুনিরের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক প্রভাবশালী মুখ—শফিউল্লাহ আল মুনির। নিজেকে কখনো ক্রীড়া সংগঠক, কখনো ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিলেও তার বিরুদ্ধে জমা হওয়া অভিযোগ, মামলা, তদন্ত প্রতিবেদন ও আদালতের আদেশ বিশ্লেষণ করলে উঠে আসে এক ভয়ংকর চিত্র—প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারের এক সুপরিকল্পিত নেটওয়ার্ক।

আইজিপির নাম ভাঙিয়ে প্রভাব বিস্তার! অভিযোগ রয়েছে, শফিউল্লাহ আল মুনির দেশের বর্তমান পুলিশের আইজিপির নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। নিজেকে “আইজিপির ঘনিষ্ঠ লোক” পরিচয় দিয়ে নানা সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন তিনি। অথচ একাধিক অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়েছে—তার সঙ্গে আইজিপির কোনো সম্পর্কই নেই। তবুও এই ভুয়া প্রভাবের দাপটে দীর্ঘদিন ধরে তিনি চালিয়ে গেছেন প্রতারণার বাণিজ্য।

অপরাধের পুরনো ছায়া: র‍্যাবের হাতে গ্রেফতার : ২০০৮ সালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় র‍্যাবের অভিযানে আটক হন শফিউল্লাহ। সে সময় তার পরিচালিত স্টুডিও থেকে পর্নোগ্রাফি সংশ্লিষ্ট সামগ্রী, ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনায় তার সঙ্গে সহযোগী ও কথিত মডেলদেরও আটক করা হয়—যা তার অতীত কর্মকাণ্ডের অন্ধকার দিককে সামনে আনে।

দুদকের নজরে ‘অস্বাভাবিক সম্পদের পাহাড়’ : দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—মাত্র ৪৯ লাখ টাকার বৈধ আয়ের বিপরীতে তার নামে পাওয়া গেছে ১১ কোটির বেশি সম্পদ, যার বিশাল অংশের কোনো বৈধ উৎস নেই। এই প্রেক্ষিতে আদালত তার বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যাতে তদন্ত প্রভাবিত না হয়।

মামলার পর মামলা—কিন্তু রহস্যজনক অব্যাহতি ! তার বিরুদ্ধে একাধিক থানায় প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দায়ের হলেও কিছু ক্ষেত্রে তদন্ত শেষে “তথ্যগত ভুল” দেখিয়ে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে অন্যদিকে বেশ কয়েকটি মামলায় চার্জশিট দাখিল হয়েছে, যা তার বিরুদ্ধে অভিযোগের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

প্রতারণার বহুমুখী কৌশল :
অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ এবং বিস্ময়কর— ব্যবসায়িক অংশীদার বানানোর প্রলোভনে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া, বিদেশে পাঠানো, চাকরি দেওয়া, লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আদায় এবং ব্যাংক ঋণ ও সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা, এলপিজি ডিলারশিপ থেকে শুরু করে ট্রাভেল ব্যবসা—সবখানেই একই কৌশল, কেবল ব্যক্তি নয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ভুয়া প্রকল্পের ফাঁদে কোটি টাকা লোপাট : খাগড়াছড়িতে ইপিজেড, কেবল কার, খুলনায় চিংড়ি ও ইথানল প্রকল্প, নদীতে সাব-জেটি—এমন সব আকর্ষণীয় প্রকল্পের নামে বিনিয়োগ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। বাস্তবে এসব প্রকল্পের অগ্রগতি প্রশ্নবিদ্ধ, কিন্তু অর্থ গেছে কোথায়—সেই উত্তর মিলছে না।

বিলাসী জীবন ও অন্যের টাকায় বিদেশ ভ্রমণ : অভিযোগ রয়েছে, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ দিয়ে সৌদি আরব, দুবাই, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল ভ্রমণ করেছেন তিনি। অফিস ভাড়া, স্টাফ বেতন, সামাজিক অনুষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই অন্যের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

ভয়ভীতি, অস্ত্রধারী প্রভাব ও হুমকি : শুধু প্রতারণাই নয়—অভিযোগ রয়েছে ভয়ভীতি প্রদর্শনেরও। অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মী ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের চাপে রাখা, টাকা ফেরত চাইলে হুমকি দেওয়া—এসব অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

চেক জালিয়াতি ও বিলাসী প্রতারণা : ৬৬ লাখ টাকার চেক ডিজঅনার, ২৫ লাখ টাকার বাড়ি ভাড়া বকেয়া, এমনকি রোলেক্স ঘড়ি জামানত রেখে কোটি টাকার প্রতারণা—সব মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন বহুমাত্রিক।

শেষ কথা: আইনের কাঠগড়ায় ‘প্রভাবশালী মুখ’ : সব অভিযোগ, মামলা, তদন্ত ও আদালতের আদেশ মিলিয়ে স্পষ্ট—শফিউল্লাহ আল মুনিরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক বিস্তৃত অনিয়মের জাল। যদিও কিছু মামলায় তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন, তবে একাধিক মামলায় চার্জশিট এবং দুদকের চলমান তদন্ত প্রমাণ করে—আইনি লড়াই এখনো শেষ হয়নি।

এই ঘটনা আবারও সামনে আনছে একটি কঠিন বাস্তবতা—রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও ভুয়া প্রভাবের আড়ালে কত বড় প্রতারণার সাম্রাজ্য গড়ে উঠতে পারে। এখন দেখার বিষয়, বিচারব্যবস্থা কত দ্রুত এবং কতটা নিরপেক্ষভাবে এই জটিল অভিযোগের জাল ছিন্ন করতে পারে।

  • Related Posts

    লোহাগড়ায় জমি নিয়ে বিরোধ, ছোট ভাইকে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ বড় ভাই ও ভাবীর বিরুদ্ধে!

    মো: শওকত হোসেন: নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার নোয়াগ্রাম ইউনিয়নের আড়পাড়া গ্রামে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আপন ছোট ভাইকে লোহার রড ও কাঠের বাটাম দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখম করার অভিযোগ উঠেছে বড়…

    জুলাই হত্যা মামলার আসামিদের হাতেও ডিএনসিসির শত শত কোটি টাকার কাজ, ৫ আ.লীগ নেতার ৬ প্রতিষ্ঠানের নামে ৮০৫ কোটি টাকার ঠিকাদারি

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনকে গুমের স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন কিসমৎ হায়াৎ। তিনি ছাড়াও গত এক বছরে ডিএনসিসির ঠিকাদারি কাজের বড় একটি অংশ গেছে আ.লীগ…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    লোহাগড়ায় জমি নিয়ে বিরোধ, ছোট ভাইকে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ বড় ভাই ও ভাবীর বিরুদ্ধে!

    লোহাগড়ায় জমি নিয়ে বিরোধ, ছোট ভাইকে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ বড় ভাই ও ভাবীর বিরুদ্ধে!

    বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের জন্য ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছিল: রিজভী

    বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের জন্য ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছিল: রিজভী

    মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু ৩১ অক্টোবর, আগের রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য নয়

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 9 views
    মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু ৩১ অক্টোবর, আগের রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য নয়

    ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 9 views
    ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৪৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে

    নেতানিয়াহুর নির্বাচনী ভাগ্য বদলে দেয়ার দাবি ট্রাম্পের

    নেতানিয়াহুর নির্বাচনী ভাগ্য বদলে দেয়ার দাবি ট্রাম্পের

    ভিজিট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে কাজের বিধিনিষেধ জানাল দূতাবাস

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 6 views
    ভিজিট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে কাজের বিধিনিষেধ জানাল দূতাবাস