মুখস্থ বিদ্যা ও সার্টিফিকেট নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

image_pdfSaveimage_print
ডেস্ক নিউজঃ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কর্মসংস্থানের নতুন বাজারে প্রবেশ করতে হলে আমাদেরকে মুখস্থ বিদ্যা এবং সার্টিফিকেট নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মঙ্গলবার (১২ মে) সকালে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও টেকসই রূপান্তর নিয়ে ইউজিসির জাতীয় কর্মশালা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী আমাদের প্রচলিত ধারার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। কারণ, শিক্ষা শুধু ব্যক্তির পরিবর্তনের জন্যই নয়, বরং বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং বিশ্বমানের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা তৈরিরও প্রধান নিয়ামক। ফলে উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাকে অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে আরও শক্তিশালী সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। কারিকুলাম প্রণয়নে শিল্পখাতের চাহিদাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তিনি বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বিশ্ববাসীর সামনে যে বার্তাটি স্পষ্ট করেছে, সেটি হলো শিক্ষা কেবল স্কুল-কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে জ্ঞানের চর্চা কেবল একটি নির্দিষ্ট বিষয়েই আবদ্ধ নয়।  বরং আমরা দেখি, ডাটা সায়েন্সের সাথে বায়োলজি, বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাথে হয়তো সমাজবিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটছে। এই সংযোগের ফলে জ্ঞানের সীমানা প্রতিনিয়ত প্রসারিত ও গতিশীল হচ্ছে। এই পরিবর্তনের গতি প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের নিবিড় সম্পর্ক থাকা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে পা দিয়েছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চলমান এই সময়ে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স ও অটোমেশন, ইন্টারনেট অব থিংস, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি, সাইবার সিকিউরিটি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টারনেট অব থিংস, বিগ ডাটা, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ন্যানো টেকনোলজি, পঞ্চম প্রজন্মের ওয়্যারলেস প্রযুক্তি, এইসব উন্নততর প্রযুক্তি একদিকে আমাদের আমাদের চিন্তার জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে, অপরদিকে শাসন করছে মানুষের কর্মক্ষেত্র বা কর্মসংস্থান। এর ফলে নিত্যনতুন প্রযুক্তির ব্যবহার একদিকে প্রথাগত চাকুরীর বাজারে বেকারত্ব বাড়াচ্ছে  অন্যদিকে তৈরি করছে নিত্য নতুন কর্মসংস্থান।

তারেক রহমান বলেন, দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হচ্ছে, একবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানের উৎকর্ষ অর্জনের ক্ষেত্রে  বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এখনো প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছুতে পারেনি। র‍্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত গবেষণা প্রকাশনা, সাইটেশন এবং উদ্ভাবন এই বিষয়গুলোকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। সেই ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান কোথায় এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের শিক্ষাবিদগণ নিশ্চয় আরও চিন্তাভাবনা করবেন। শুধু পুঁথিগত শিক্ষাই নয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা এবং উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ না দিলে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমাদের টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবন কিংবা গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সরকার অর্থ বরাদ্দ দেবে এটাই স্বাভাবিক। তবে আমি জানি, ব্রিটেনসহ বিশ্বের অনেক দেশেই যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলামনাই তাদের অনেকেই কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গবেষণা এবং উদ্ভাবন’ কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে  পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন। এ জন্যই অনেকে বলে থাকেন, “শিক্ষার্থীরা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ, আর এলামনাইরা হলো তার মেরুদণ্ড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বর্তমানে  যারা দেশে বিদেশে জ্ঞানে বিজ্ঞানে অর্থ বিত্তে প্রতিষ্ঠিত সেইসব এলামনাইদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণা’ উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ  নেয়ার জন্য আমি উপস্থিত শিক্ষাবিদদের প্রতি বিনীত আহবান জানাই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আরও একটি বিষয়ের দিকে আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতিবছর প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী বের হয়। উচ্চ শিক্ষা নিয়েও অনেককে বেকার থাকতে হয়। অর্থাৎ বেকারত্বের সংখ্যা উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেশি। এর কারণ সম্পর্কে নানামত রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে অনেকেই একমত  একাডেমিক শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি দক্ষতা অর্জন করতে না পারাই শিক্ষিত মধ্যে বেকারত্বের হার বেশির অন্যতম কারণ।

বর্তমান সরকার মনে করে, প্রাথমিক সিলেবাসে থেকে শুরু করে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা কারিকুলাম ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি। নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষা ছাড়া বেকারত্ব নিরসন সম্ভব নয়। সময়োপযোগী শিক্ষা কারিকুলাম ছাড়া বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। এ কারণেই বর্তমান সরকার একাডেমিক সিলেবাসকে সময়োপযোগী করার কাজ শুরু করেছে।

তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে বর্তমান সরকার এপ্রেন্টিসশীপ, ইন্টার্নশিপ এবং ইন্ড্রাষ্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়ানোর জন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে স্থানীয় শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক স্থাপন করে এই কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীগণ পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের পাশাপাশি হাতে কলমে শিক্ষা লাভ করে শিক্ষার্থী অবস্থাতেই কর্মদক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হবেন। ফলে শিক্ষা জীবন শেষে তাকে আর বেকার থাকতে হবেনা।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনোভেটিভ বিজনেস আইডিয়া বাণিজ্যিকীকরণ করতে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় সিড ফান্ডিং বা ইনোভেশন গ্রান্ট প্রদান করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর  উদ্দেশ্য হচ্ছে,  ক্যাম্পাস থেকে ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা তৈরি করা। ফলে এই উদ্যোক্তারা নতুন এবং সৃজনশীল ব্যবসায়িক ধারণা বাস্তবায়ন করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন। শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় কর্মদক্ষতা অর্জনের ফলে এমনও হতে পারে একজন শিক্ষার্থী চাকুরীর জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আরও কয়েকজনের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন।

এসব উদ্যোগ ছাড়াও সরকার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইন্সটিটিউট’, ‘সায়েন্স পার্ক’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে। দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্বেও ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞান মেলা, ইনোভেশন ফেয়ার, প্রোডাক্ট সোর্সিং ফেয়ারসহ এ ধরণের শিক্ষা ও দক্ষতা বিষয়ক আয়োজনকে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে।  শুধু উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, স্কুল পর্যায় থেকেই সরকার শিক্ষা কারিকুলামে কারিগরি এবং ব্যবহারিক শিক্ষা  বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নিয়েছে।

  • Related Posts

    তিন জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ, আগামী পাঁচ দিনে বাড়তে পারে বৃষ্টিপাত

    ডেস্ক নিউজ : রাজশাহী, পাবনা ও যশোর জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যা আপাতত অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দমকা হাওয়া, বজ্রপাত ও বৃষ্টির সম্ভাবনা…

    গণমাধ্যম খাতে সহযোগিতায় বাংলাদেশ-চীনের ৪ চুক্তি

    ডেস্ক নিউজ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের উপস্থিতিতে চীনের সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি ও চায়না মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি) প্রধানদের সঙ্গে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    নকল নোভো নরডিস্ক ইনসুলিন জব্দ: চট্টগ্রামে অভিযানে ধরা পড়ল সরবরাহকারী, উঠে এলো মিটফোর্ড নেটওয়ার্ক

    • By admin admon
    • জুন ২৬, ২০২৬
    • 7 views
    নকল নোভো নরডিস্ক ইনসুলিন জব্দ: চট্টগ্রামে অভিযানে ধরা পড়ল সরবরাহকারী, উঠে এলো মিটফোর্ড নেটওয়ার্ক

    তিন জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ, আগামী পাঁচ দিনে বাড়তে পারে বৃষ্টিপাত

    • By Reporter
    • জুন ২৬, ২০২৬
    • 7 views
    তিন জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ, আগামী পাঁচ দিনে বাড়তে পারে বৃষ্টিপাত

    যুদ্ধের নতুন কৌশল, ৫ লাখ সেনার হাতে ড্রোন তুলে দিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া

    • By Reporter
    • জুন ২৬, ২০২৬
    • 7 views
    যুদ্ধের নতুন কৌশল, ৫ লাখ সেনার হাতে ড্রোন তুলে দিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া

    চীনে ১০৯ তলা ভবনে বিমান বিধ্বস্ত, আতঙ্কে স্থানীয়রা

    • By Reporter
    • জুন ২৬, ২০২৬
    • 7 views
    চীনে ১০৯ তলা ভবনে বিমান বিধ্বস্ত, আতঙ্কে স্থানীয়রা

    মা ও তিন মেয়ে খুন: লক্ষ্মীপুরে জানাজা শেষে লাশ নেওয়া হল কুমিল্লায়

    • By Reporter
    • জুন ২৬, ২০২৬
    • 7 views
    মা ও তিন মেয়ে খুন: লক্ষ্মীপুরে জানাজা শেষে লাশ নেওয়া হল কুমিল্লায়

    এমবাপ্পে-হালান্ড লড়াই আজ

    • By Reporter
    • জুন ২৬, ২০২৬
    • 7 views
    এমবাপ্পে-হালান্ড লড়াই আজ