নিজস্ব প্রতিবেদকঃ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের দাবি করেছেন, ২০১৪ সালের পর থেকে দেশে যেসব জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, সবই আগে থেকেই পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত ছিল। তাঁর অভিযোগ, ভোটের ফল জনগণের রায়ে নয়, বরং কৌশল আর প্রভাব খাটিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। শনিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে নিজের দু’টি বইয়ের প্রকাশনা ও আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
জিএম কাদের বলেন, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনেও ভোটের প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভোটার সংখ্যা বাড়লেও ভোটকেন্দ্রের বুথ কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে। তিনি বলেন, দায়িত্বশীল মহল আগেই বুঝেছিল সাধারণ মানুষ ভোট দিতে কেন্দ্রে আসবে না। তাই কৃত্রিমভাবে ভোটের পরিবেশ তৈরি করতে এবং পরে ফলাফল নিজেদের মতো সাজাতে বুথ সংখ্যা কমানো হয়।
তিনি নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ভোটের হার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, ঘোষিত ভোটের হিসাব বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। তিনি গাণিতিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এত বিপুল সংখ্যক ভোট গ্রহণ করা বাস্তবে সম্ভব নয়। ভোটারের পরিচয় যাচাই, আঙুলে কালি দেওয়া, ব্যালট নেওয়া, ভোট দিয়ে বাক্সে ফেলা—সব মিলিয়ে যে সময় লাগে, তাতে ঘোষিত ভোটের সংখ্যা বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, বাস্তবে অধিকাংশ কেন্দ্রে দীর্ঘ সময় ভোটারশূন্য অবস্থা ছিল এবং প্রকৃত ভোট পড়েছে অনেক কম।
জাপা চেয়ারম্যান আরও অভিযোগ করেন, বিপুল সংখ্যক ভুয়া ভোট দেখিয়ে পছন্দের প্রার্থীদের জেতানো হয়েছে। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী বাস্তব ভোটের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যা দেখিয়ে ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারকে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।
গণমাধ্যম নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন জিএম কাদের। তিনি বলেন, দেশে এখন আর প্রকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই। সংবাদমাধ্যমের অনেকেই চাপ, ভয় কিংবা বিভিন্ন কারণে আত্মনিয়ন্ত্রণের মধ্যে কাজ করছে। তাঁর অভিযোগ, তিনি যে তথ্য ও হিসাব তুলে ধরেছেন, তা দেশের সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করতে সাহস পায়নি।
সাংবাদিক আনিস আলমগীর ও মঞ্জুরুল হাসান পান্না-সহ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপেরও সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর দাবি, ভিন্নমত দমন করতে এখনও আগের মতো ভয়ভীতি ও নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি চলছে। মানুষের বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও দুর্নীতি বেড়েছে বলে অভিযোগ করে জিএম কাদের বলেন, দেশে এখন নতুন ধরনের “মামলা বাণিজ্য” শুরু হয়েছে। নিরীহ মানুষকে মামলা, গ্রেফতার বা “শোন অ্যারেস্ট” দেখানোর ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে টাকা আদায় করা হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, কেউ রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মতের হলেই তাকে হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে। বিমানবন্দরে আটকে রেখে ভয় দেখানো, পরে অর্থ আদায়ের মতো ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি করেন তিনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-র সমালোচনা করে তিনি বলেন, একতরফাভাবে সংবিধান পরিবর্তনের চেষ্টা অতীতেও স্থায়ী হয়নি। বর্তমান সরকারও যদি রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মতামত উপেক্ষা করে নিজেদের মতো সংস্কার চালাতে চায়, তাহলে সেই উদ্যোগও দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে জিএম কাদের বলেন, প্রতীক নিয়ে তারা চিন্তিত নন। মামলা বা চাপ যাই আসুক, দলকে ধরে রেখে রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাবেন। তবে দলের ভেতরে বিশ্বাসঘাতকতা করলে কাউকে আর ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রকাশক আলমগীর সিকদার লোটন। প্রধান আলোচক ছিলেন আবুল কাশেম ফজলুল হক। এছাড়া বক্তব্য দেন আব্দুস সাত্তার, শামীম হায়দার পাটোয়ারী, কাজী রওনক হোসেন, মাসুদ কামাল-সহ আরও অনেকে।










