আন্তর্জাতিক ডেস্ক : টানা কয়েক মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার(আইইএ)। মঙ্গলবার (১৬ জুন) সংস্থাটির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্রুত জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য না আনলে এ অঞ্চলে শত শত কোটি ডলার ক্ষতি হতে পারে বলে উল্লেখ করেছে।
প্রতিবেদনটিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। যা এর জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি ‘কঠোর সতর্কবার্তা’।
এতে উল্লেখ করা হয়েছে, বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্রমবর্ধমান বিক্রি, পারমাণবিক শক্তির প্রতি নতুন করে আগ্রহ এবং ছাদের ওপর সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপনের ব্যাপক প্রসারের পর এটাই প্রমাণ করে, ইরান যুদ্ধ পরিবর্তনের প্রেরণা যোগাচ্ছে। এক্ষেত্রে আরও সংস্কার প্রয়োজন।
অন্যথায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জ্বালানি আমদানির বিল ২০৩৪ সালের ৮০ বিলিয়ন ডলার থেকে তিনগুণ বেড়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে ২৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
আইইএ-র নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল বলেন, জ্বালানির উৎস ও সরবরাহ পথের বৈচিত্র্য আনা এখন একটি প্রধান অগ্রাধিকার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে জ্বালানি সংকট মোকাবেলার এক কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে, যার ফলে জ্বালানির বিল বেড়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে।
আইইএ বলেছে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা পর্যায়ক্রমে কমানোর প্রচেষ্টার জন্য এটি একটি সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা এবং এই সংঘাত জ্বালানি সংকটের সময়ে কয়লার ওপর নির্ভর করার প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরদার করেছে।
প্রতিবেদনে ইরান যুদ্ধের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পারমাণবিক শক্তির পরিকল্পনাকেও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এর নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া এখনও বহু বছরের। ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং ফিলিপাইন পারমাণবিক শক্তি পরিকল্পনায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু তাদের সময়সীমা অনিশ্চিত।
সিঙ্গাপুরে অবস্থিত আইইএ আঞ্চলিক সহযোগিতা কেন্দ্রের প্রধান সু-আর্ন ট্যান বলেন, এই জ্বালানি সংকট শুধু স্বল্পমেয়াদী প্রতিক্রিয়াই নয়, বরং সরকারগুলোর নীতিগত অগ্রাধিকার এবং বিনিয়োগ কৌশলের একটি গভীর পুনর্মূল্যায়নের দিকেও চালিত করছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল অ্যানালাইসিস-এর স্যাম রেনল্ডস বলেন, আইইএ-এর প্রতিবেদনটিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বলে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। রেনল্ডস বলেন, ইরান যুদ্ধ শেষ করার জন্য অস্থায়ী চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও জীবাশ্ম জ্বালানির দাম সম্ভবত বেশিই থাকবে, যার অর্থ হলো আমরা আরও উচ্চাভিলাষী পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের দিকে একটি প্রবণতা দেখতে পাব।
আইইএ বলেছে, নিজেদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির সামগ্রিক চাহিদা কমাতে হবে। একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডগুলোকে আরও কার্যকর করা এবং সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ ও ভূতাপীয় শক্তির মতো সব ধরনের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
আইইএ ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস পাওয়ার গ্রিড’-এর মতো আঞ্চলিক জ্বালানি ভাগাভাগির উদ্যোগগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ারও সুপারিশ করেছে। বিরোল বলেন, এই জ্বালানি সংকট থেকে পাওয়া সতর্কবার্তা আশা করা যায় প্রতিবেশী দেশগুলোকে সেই রাজনৈতিক বাধাগুলো কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে যা এই প্রকল্পটিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতটি একদিকে যেমন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বর্তমান জ্বালানি ব্যবস্থার একটি কঠিন পরীক্ষা, তেমনি এটি কাঠামোগত পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করার একটি অনুঘটকও।
সূত্র: এএফপি।










