ডেস্ক নিউজ : বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে চার দিন টানা বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির সময় পাহাড়ধস ও দেয়ালচাপায় গত তিন দিনে এ অঞ্চলের তিন জেলায় ২২ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে গতকাল বুধবার মারা গেছে সাত শিশু।
ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম নগরে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরপানি জমেছিল। রেললাইনের ওপর পানি জমে থাকায় কক্সবাজারের সঙ্গে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞ ও আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, চট্টগ্রামে এবার যে পরিমাণ বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে, তা পুরোপুরি অস্বাভাবিক বলা যাবে না। তবে আবার স্বাভাবিকও নয়। কেননা এবার আষাঢ় মাসের প্রথম ২০ দিন প্রায় বৃষ্টি হয়নি। তাই এখন একসঙ্গে যে বৃষ্টি হয়েছে, তা অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। বর্ষাকালে সাগরে নিম্নচাপ সৃষ্ট হলে এ ধরনের বৃষ্টি হয়ে থাকে। এখন তা–ই হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে। এর প্রভাবে চট্টগ্রাম নগরে বৃষ্টি হচ্ছে চার দিন ধরে। গতকালও সকালে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। এই বৃষ্টি চলবে আরও দুই দিন।
গতকাল বেলা তিনটা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭৯ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। এর আগে গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে রেকর্ড পরিমাণ ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, যা ছিল ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলক পাল বলেন, এবার আষাঢ়ের ১ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত কোনো বৃষ্টি হয়নি। এখন অতি বৃষ্টির প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে সাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ। তবে গত ৪৩ বছরে এত ব্যাপক পরিমাণে বৃষ্টি হয়নি। সে হিসাবে এবারের বৃষ্টিকে অস্বাভাবিক বলা যায়।
এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর সমন্বয়হীনতা রয়েছে মন্তব্য করে অধ্যাপক অলক পাল বলেন, বর্ষার শুরুতে দুর্যোগ মোকাবিলায় যে রকম প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, প্রশাসন সেভাবে অনেক সময় নেয় না। শুরু থেকে সমন্বয় থাকলে অনেক প্রাণহানি কমানো যেত।
তবে আবহাওয়া ও ভূপ্রাকৃতিক কেন্দ্র চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান প্রথম আলোকে বলেন, ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে এমনিতেই বর্ষাকালে বৃষ্টি হয়। এ সময়ে দেশের উপকূলে কিংবা উপকূল ঘেঁষে কোনো লঘুচাপ সৃষ্টি হলে প্রচুর পরিমাণ বৃষ্টি হয়। এবার সে রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
পাহাড়ধসে তিন দিনে ২২ মৃত্যু
টানা বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটিতে পাহাড়ধসে তিন দিনে অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটিতে পাহাড়ধস ও দেয়ালচাপায় ৫ জনের মৃত্যু হয়। গত রোববার দিবাগত রাতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ৮ জন, জেলা সদরে ১ জন, পেকুয়ায় ১ জনসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সর্বশেষ গতকাল কক্সবাজারে ৫ জন ও চট্টগ্রামে ২ শিশু নিহত হয়।
কক্সবাজারের উখিয়ার ৫ নম্বর আশ্রয়শিবিরে মহিলা হেফজখানার (মাদ্রাসা) দেয়াল ও মাটিচাপার ঘটনায় পাঁচ ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চারজনের পরিচয় জানা গেছে।
আশ্রয়শিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) অধিনায়ক ও অ্যাডিশনাল ডিআইজি সিরাজ আমিন নিহত চার ছাত্রীর পরিচয় নিশ্চিত করেছেন। তারা হলো ৫ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা হাসিম উল্লাহর মেয়ে রাশিদা বেগম (১৩), আবদুস শুকুরের দুই মেয়ে উন্মে নেজাতুল (১৩) ও উন্মে সালমা (১২) এবং মো. ইলিয়াছের মেয়ে উমাইসা বিবি (১৩)।
গতকাল বেলা দুইটার দিকে ভারী বর্ষণে দেয়াল ধসে পড়লে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার আগে মাদ্রাসাটিতে ৩০ জন শিশু ছিল। ফায়ার সার্ভিস, ক্যাম্প প্রশাসন, এপিবিএন ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা সেখানে উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেন। সন্ধ্যায় উদ্ধারকাজ শেষ হয়।
গুরুতর আহত অবস্থায় আশ্রয়শিবিরের কুতুপালং ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে তিন শিশু-কিশোরীকে। তারা হলো ৩ নম্বর ক্যাম্পের দিল মোহাম্মদের মেয়ে আসরা বেগম (৯), একই ক্যাম্পের এফ-১ ব্লকের নুরুল আমিনের মেয়ে বেগম জান (১৫) ও ৫ নম্বর ক্যাম্পের এ-৭ ব্লকের বশির আহমদের মেয়ে ফারেসা বিবি (১২)। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরসি) এবং অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বিকেলে দুর্ঘটনাস্থল থেকে ৩০ শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচজন মারা গেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনজনকে কুতুপালং ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পাহাড়ের খাদে নির্মিত দেয়াল মাদ্রাসার ওপর ধসে পড়লে এ ঘটনা ঘটে।
এদিকে চট্টগ্রামে পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকাল নয়টায় জঙ্গল সলিমপুরের বাগানবাড়ির ৬ নম্বর সমাজ এলাকায় একটি পাহাড়ধসে ১০ মাস বয়সী আশরাফুল ইসলাম মারা যায়। শিশুটির মা লামিয়া আক্তার মাটিচাপা পড়ে আহত হন। দুপুরে নগরের চশমা হিলের মেয়র গলি এলাকায় পাহাড়ধসে সামিয়া ইসলাম (১৩) নামের এক শিশু মারা যায়।
টানা দ্বিতীয় দিন ডুবেছে চট্টগ্রাম
টানা ভারী বৃষ্টিতে আগের দিনের মতো গতকালও নগরের কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, বাদুড়তলা, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, রেয়াজউদ্দিন বাজার, তিন পোলের মাথা, চান্দগাঁও, শমসেরপাড়া, খরমপাড়া, খাজা রোড, সুন্নিয়া মাদ্রাসা, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, উত্তর আগ্রাবাদ, রামপুরা, হালিশহর, আকবরশাহ সিডিএ আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। এসব এলাকায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত পানি ছিল।
ভারী বর্ষণে নগরের মূল সড়কসহ বিভিন্ন রাস্তায় যান চলাচলের সংখ্যা ছিল কম। লোকজন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হননি। এ ছাড়া বৈরী আবহাওয়ার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণি ও পরীক্ষা কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের রামপুরা এলাকায় সড়কে হাঁটুপানি জমেছিল। এর মধ্যে লোকজন চলাচল করছেন। এখানে নিচতলার বাসা, আধা পাকা বসতঘর, দোকানে পানি ঢুকে পড়ে। এর মধ্যে রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন কাজ সারতে হয় পরিবারের সদস্যদের। পানিতে ঘরের আসবাব ভিজে যায়।
নুরজাহান বেগম নামের এক নারী বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে পানি জমে আছে ঘরে। বারবার পানি পরিষ্কার করতে হয়। আবার পানি উঠে যায়। কী যে কষ্ট হয়, তা বলার মতো নয়।’
নগরের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার বিভিন্ন সড়ক হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে যায়। সরকারি কমার্স কলেজের পাশে একটি খাবারের দোকানে জমে ছিল পানি। এর মধ্যে চলছিল বেচাবিক্রি।
খাবারের দোকানি মো. রাশেদ অভিযোগ করেন, এবার অনেক বেশি পানি হয়েছে। নালা-নর্দমাগুলো ঠিকভাবে পরিষ্কার করলে এ অবস্থা হতো না। বৃষ্টি হলে পানি ওঠে। জলাবদ্ধতার কারণে লোকজন কম বের হন। এতে বেচাবিক্রি কমে গেছে। দিনের খরচও উঠছে না।









