বিশেষ প্রতিবেদক: ঢাকা বন বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমি দখল, গাছ কেটে রাস্তা নির্মাণ, অবৈধ ঘরবাড়ি ও দোকানপাট তৈরি এবং এসব কর্মকাণ্ডে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কোথাও কোথাও অর্থের বিনিময়ে সরকারি বনভূমিতে স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আবার অভিযান চালিয়ে জমি উদ্ধারের পরও কিছুদিনের মধ্যে তা পুনরায় দখল হয়ে যাচ্ছে। এসব ঘটনায় ঢাকা বন বিভাগের ডিএফও বশিরুলসহ একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, চন্দ্রা, মৌচাক, রাথুরা, কাশিমপুর ও বাড়ইপাড়া বনবিটসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বনভূমি দখল এবং অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ চলছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব কাজে জড়িত ব্যক্তিদের একটি অংশ বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করছেন। কোথাও অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ঘর নির্মাণের অনুমতি পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, আবার কোথাও গাছ কেটে রাস্তা ও বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরির ঘটনাও সামনে এসেছে। এসব বিষয়ে অভিযোগ জমা পড়লেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা বিট এলাকায় বনভূমি দখলের একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। চন্দ্রা স্পিনিং মিলের পাশে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কসংলগ্ন কারিগরপাড়ায় আশরাফ হোসেন ইটের দেয়াল দিয়ে চার কক্ষের একটি অর্ধপাকা ভবন নির্মাণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, চন্দ্রা টাওয়েল টেক্সের কাছের সংরক্ষিত বনভূমিতে আকাশমণি গাছ কেটে রাস্তা তৈরির অভিযোগ উঠেছে তৌহিদুল ইসলাম সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আবারও রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বন বিভাগের সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কালিয়াকৈরের ভুলুয়া, কালামপুর, কুঁচপাড়া, বটতলা ও চান্দরা মৌজায় বনভূমিতে ঘরবাড়ি ও দোকান নির্মাণের অভিযোগ আরও বিস্তৃত। অভিযোগ অনুযায়ী, ভুলুয়া এলাকায় শাকিল প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা দিয়ে বনভূমিতে বাড়ি নির্মাণ করছেন। কালামপুরে সামাদ বিটের কর্মীদের ১ লাখ ৫ হাজার টাকা দিয়ে তিন কক্ষের একটি টিনশেড ঘর তুলেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। কুঁচপাড়ায় রতন নামের এক দালালের মাধ্যমে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা দিয়ে রনজিত পাঁচ কক্ষের একটি ভবন নির্মাণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বটতলায় সাবেক কমিশনার ইসমাইলের ছেলে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি পাকা দোকান নির্মাণ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
চান্দরা মৌজায় রিমা নামের এক নারী প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে তিন কক্ষের টিনশেড ঘর নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর পাশেই শাহীন ও মাহবুবের বিরুদ্ধে প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিয়ে ৪০ হাত লম্বা একটি পাটের গোডাউন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।
চন্দ্রা বিটের শিল্প কুঞ্জ পার্কের কাছেও দোকান নির্মাণ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মোতালেব ডাক্তার বিট কর্মকর্তা ইকবাল হোসেনকে প্রায় ৪ লাখ টাকা দিয়ে পাকা দেয়াল তুলে দোকান নির্মাণ করছেন। সকিনার মোড়ে জাকিরের বিরুদ্ধে প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা দিয়ে পাঁচ কক্ষের একটি ঘর নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইকবাল হোসেন, লুৎফর, মামুন ও লতিফের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে কাজটি করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। অভিযোগ ওঠার পর ইকবাল সামান্য একটি বারান্দা ভেঙে দিলেও মূল ঘরটি রয়ে গেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
চান্দরা খেলার মাঠসংলগ্ন এলাকায় শাহিনের মামার আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘর নতুন করে নির্মাণের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। এ কাজের সঙ্গে ইকবাল, লুৎফর, মামুন ও লতিফের একটি চক্রের নাম উঠে এসেছে। মাটিকাটা ইনক্রেটেবল ফ্যাক্টরির কাছাকাছি সাবেদ ওরফে পীর সাহেবের বিরুদ্ধে প্রায় ১ লাখ টাকা দিয়ে বনভূমিতে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। একই এলাকার ভুলুয়া মৌজায় কফিল উদ্দিনের ছেলে আনোয়ার হোসেন ওরফে ব্ল্যাক আনোয়ারের বিরুদ্ধে প্রায় ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ইটের দেয়াল তুলে বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ করা হয়েছে।
মৌচাক বনবিটের ভান্নারা সাব-বিটেও বনভূমি দখল এবং অবৈধ দোকান নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বনফুল বাজার এলাকায় নতুন করে ৩৪টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি দোকানের জন্য ৩০ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আলিফ কম্পোজিট লিমিটেড নামের একটি কারখানার বিরুদ্ধে বনভূমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। ওই কারখানার বিরুদ্ধে উচ্ছেদ কার্যক্রম ঠেকাতে বিট কর্মকর্তা শাজাহান মিয়ার মাধ্যমে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে।
মাঝুখান মৌজায় আজিজুল ডাক্তার ও তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে বিপুলসংখ্যক গজারি ও আকাশমণি গাছ কাটার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব গাছ কাটার ফলে ওই এলাকার বনভূমির ক্ষতি হয়েছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গাছ কাটা ও জমি দখলের অভিযোগ সত্য হলে তা পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্ব পালনে গুরুতর ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।
শ্রীপুর রেঞ্জের রাথুরা বিটেও গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ৪ জুন রাতে রাথুরা বিটের সিএস ১৩৬৯ ও ১৩৭১ দাগের জমি থেকে ১০টি বড় গজারি গাছ কেটে মোজাম্মেল নামের এক ব্যক্তির কাছে মাত্র ৮ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। এ ঘটনায় বিট কর্মকর্তা শেখ ইমদাদ হোসেনের নাম এসেছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর তাঁকে রাথুরা এলাকা থেকে সিলেটে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বন সংরক্ষকের গাড়িচালক বিল্লাল ও প্রধান অফিস সহকারী আতিয়ার রহমানের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে তিনি একই এলাকায় থেকে যান বলে দাবি করা হয়েছে।
রাথুরা বিটের বেলতলী এলাকায় বশির হোসেনের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে বনভূমিতে ঘর নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। কবরঘাটা এলাকায় রফিকুল ইসলামও অর্থের বিনিময়ে বনের জমিতে ঘর তৈরি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে বন বিভাগের অনুমতি ছিল কি না, জমির প্রকৃত শ্রেণি কী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কাশিমপুর বিটের মাধবপুর এলাকায় ইমরান নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিট কর্মকর্তা চান মিয়াকে ম্যানেজ করে দুই কক্ষের একটি আধাপাকা ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের নিশ্চিন্তপুরে আউলিয়ার টেক মাজারের সামনে বনাঞ্চলের গাছপালা কেটে নতুন পিচঢালাই রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কালীগঞ্জের এক প্রভাবশালী ঠিকাদারের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে এ কাজ করা হচ্ছে। বনভূমির ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের অনুমোদন ছিল কি না এবং পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
মৌচাক বিটের ভান্নারা মৌজায় আগে উদ্ধার করা জমি আবারও দখল হওয়ার অভিযোগ বিশেষভাবে সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সেখানে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৪ কোটি টাকা মূল্যের জমির প্রায় ৭০ শতাংশ উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কাঁটাতারের বেড়া ও খুঁটি কেটে ওই জমিতে আবারও মার্কেট নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বনপ্রহরী আমিনুল, জামাল ও মোবারকের সহযোগিতায় রাতের বেলায় পুনরায় দখল কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি সার্ভেয়ার রনি হোসেন সরেজমিনে জমি মেপে দখলের প্রমাণ পেয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। তারপরও গত দুই মাসে সেখানে উচ্ছেদ অভিযান না চালানোর কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করতে গেলে বিট কর্মকর্তা শাজাহান সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বাড়ইপাড়া বনবিটে প্রায় এক হাজার বিঘা বনভূমি দখলের প্রতিযোগিতা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় শাহ আলম নামের এক ব্যক্তির বক্তব্যও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ক্যামেরার সামনে বনভূমিতে ঘর নির্মাণের জন্য বিট অফিসে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্যের অর্থ হলো, টাকা না দিলে সেখানে ঘর নির্মাণ করা সম্ভব নয়। একইভাবে আশরাফ নামের আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার কক্ষের পাকা বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। তিনি বন বিভাগকে ম্যানেজ করে স্থাপনা নির্মাণের কথা প্রকাশ্যে বলেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এসব ঘটনার সামগ্রিক চিত্রে ঢাকা বন বিভাগের ডিএফও বশিরুলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন বিটে অনিয়ম ও বনভূমি দখলের ঘটনা চলতে থাকলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি সরকারি বন বিভাগের গেস্টহাউস আত্মীয়স্বজন নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, গেস্টহাউস ব্যবহারের রেজিস্টার, দাপ্তরিক নির্দেশনা এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা অপরাধে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বনভূমি দখল, গাছ কাটা এবং অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিই নয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও বড় হুমকি। বিশেষ করে উদ্ধার করা জমি আবারও দখল হয়ে যাওয়ার ঘটনা বন বিভাগের নজরদারি ও আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। তাই চন্দ্রা, মৌচাক, রাথুরা, কাশিমপুর ও বাড়ইপাড়া বনবিটের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার দাবি উঠেছে।
অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং প্রয়োজন হলে স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জমির রেকর্ড, উচ্ছেদ অভিযানের নথি, গাছ কাটার ঘটনা, বদলির আদেশ, অবৈধ স্থাপনার তালিকা এবং কথিত অর্থ লেনদেনের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ডিএফও বশিরুল, সংশ্লিষ্ট বিট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণের মাধ্যমে সরকারি বনভূমি উদ্ধার ও সংরক্ষণের কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।