ওয়াসার প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও চাকরিবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ, তদন্ত কমিটি গঠন করেও দেড় বছরে প্রতিবেদন দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ—প্রশ্নের মুখে প্রশাসনিক জবাবদিহি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও জরুরি পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক মো. আব্দুল মজিদের বিরুদ্ধে নিজের আওতাধীন প্রকল্পে স্ত্রীকে ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়া, সরকারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন, স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতার প্রভাব খাটানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের পর তদন্ত কমিটি গঠনের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই তদন্তের কোনো প্রতিবেদন জমা হয়নি। ফলে তদন্তের নামে অভিযোগটি কার্যত চাপা পড়ে আছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

ওয়াসার কর্মকর্তাদের একাংশের প্রশ্ন—১০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও দেড় বছরেও কেন প্রতিবেদন দেওয়া হলো না? তদন্ত কমিটির নিষ্ক্রিয়তার পেছনে কারও প্রভাব বা হস্তক্ষেপ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। এ অবস্থায় কেউ কেউ এখন ‘তদন্ত কমিটির বিষয়েই তদন্ত কমিটি’ গঠনের দাবি তুলেছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, মো. আব্দুল মজিদ ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জরুরি পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি ওয়াসা মডস্ সার্কেল-১-এ কর্মরত ছিলেন। ওই সময় তাঁর বিরুদ্ধে নিজের প্রভাবাধীন এলাকায় স্ত্রীকে ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে।

সরকারি কর্মকর্তা হয়েও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান : অভিযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আব্দুল মজিদের স্ত্রী তামান্না শারমিন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত একজন সরকারি কর্মকর্তা। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তিনি ‘প্রিমিয়াম কোয়ালিটি’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও অভিযোগ, জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধনের সময় সরকারি চাকরির তথ্য গোপন করে নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেন তামান্না শারমিন। শুধু তাই নয়, কোম্পানির নথিপত্রে স্ত্রীর অফিসের ঠিকানা-সংক্রান্ত কাগজে আব্দুল মজিদ নিজেই সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়।

নথিতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের বাসার ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—বাসা নম্বর ১০/সি, অনামিকা কনকর্ড, ৫৮৩ রোকেয়া সরণি, শেওড়াপাড়া, মিরপুর।

চাকরিবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ : সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা তাঁর ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি সরকারের ঠিকাদারি বা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারেন না। ফলে একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তামান্না শারমিনের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হওয়ার বিষয়টি গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে তদন্ত প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে আটকে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনাটি জানাজানি এবং গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর তামান্না শারমিন দ্রুত ওই কোম্পানির মালিকানা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন বলে জানা গেছে। তবে নাম প্রত্যাহারের আগে তিনি কীভাবে কোম্পানির চেয়ারম্যান হলেন, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় কীভাবে প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধিত হলো এবং ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার কোনো কাজের সম্পর্ক ছিল কি না—এসব প্রশ্নের সুরাহা এখনো হয়নি।

দেড় বছরেও তদন্ত শেষ হয়নি : ঘটনার পর গত বছরের ১৯ মার্চ ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে।

কমিটির আহ্বায়ক করা হয় ঢাকা ওয়াসার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সিনিয়র সহকারী সচিব রাসেদুজ্জামানকে। সদস্য হিসেবে রাখা হয় উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রাজিব আহমেদকে এবং শ্রম ও কল্যাণ বিভাগের উপ-সচিব নুরুজ্জামান মিয়াজিকে করা হয় সদস্য সচিব। তদন্ত কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্ধারিত সময় পেরিয়ে দেড় বছর পার হলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়নি। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—তদন্ত কমিটি কি আদৌ কার্যকরভাবে কাজ করেছে ? যদি কাজ করে থাকে, তাহলে প্রতিবেদন কোথায় ? আর যদি তদন্ত সম্পন্ন না হয়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘ সময় ধরে তা আটকে থাকার কারণই বা কী ?

তদন্ত কমিটির বিষয়েই তদন্ত কমিটি’ গঠনের দাবি : ওয়াসা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেই তদন্ত শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে না। এতে অভিযোগকারীদের মধ্যে যেমন হতাশা তৈরি হয়, তেমনি অভিযুক্ত কর্মকর্তারাও এক ধরনের দায়মুক্তির সুযোগ পেয়ে যান। মজিদকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তাই দীর্ঘদিনেও প্রতিবেদন না দেওয়ার কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনে তদন্ত কমিটির কার্যক্রম ও নিষ্ক্রিয়তা নিয়েই পৃথক তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে।

আগের সরকারের ‘বিশেষ সুবিধাভোগী’, বর্তমানেও প্রভাবশালী ? ঢাকা ওয়াসার একটি সূত্রের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিশেষ সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হিসেবে আবুল মজিদ ওয়াসায় প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। বর্তমান সরকারের সময়েও তিনি প্রভাব ধরে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রটির আরও দাবি, বিএনপির এক নেতার আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ধামাচাপা দিয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। তবে বিএনপির ওই নেতার সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদকের হাতে নেই। একইভাবে তাঁর রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পরিচয় ব্যবহার করে কোনো অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ছাড়া চূড়ান্তভাবে বলা যায় না।

একাধিক প্রশ্নের উত্তর নেই :
সব মিলিয়ে আব্দুল মজিদকে ঘিরে ওঠা অভিযোগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি—সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তাঁর স্ত্রী কীভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হলেন ? প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধনের সময় সরকারি চাকরির তথ্য গোপন করা হয়েছিল কি না ? কোম্পানির নথিতে মজিদের সাক্ষর কেন রয়েছে ? তাঁর দায়িত্বাধীন সময়ে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার কোনো ঠিকাদারি কাজের সম্পর্ক ছিল কি না ? আর এসব অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটি দেড় বছরেও কেন প্রতিবেদন দিতে পারল না ? এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হলে অভিযোগের প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা ওয়াসার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে একজন দায়িত্বশীল প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে দেড় বছরেও তদন্ত শেষ না হওয়ার কারণও জনসম্মুখে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।




ইকুরিয়া বিআরটিএতে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

ঢাকার কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সার্কেল-২ কার্যালয়। সরকারিভাবে এখান থেকে নিয়মতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক সেবাগ্রহীতার দাবি, এখানে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমেনি, বরং নতুন কৌশলে তা চালু রয়েছে। এখন সরাসরি ভেতরে না ঢুকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেবা পাইয়ে দিচ্ছে দালালরা। বিনিময়ে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অর্থ। ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন, মালিকানা বদলিসহ প্রায় সব সেবাতেই দালালচক্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের আগে যেমন দালালচক্রের প্রভাব ছিল, এখনো তার তেমন দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি।

কঠোর নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকলেও দালালদের ঠেকানো যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের একটি অংশ এখনো বাধ্য হয়ে এই চক্রের শরণাপন্ন হচ্ছেন। যদিও আগের তুলনায় প্রকাশ্য দৌরাত্ম্য কিছুটা কমেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, ইকুরিয়া বিআরটিএ কার্যালয়ের মূল ফটকে ঢোকার আগেই কয়েকজন দালাল ছুটে এসে সেবাগ্রহীতাদের জিজ্ঞেস করছেন—‘কোন কাজ করাবেন?’ কম সময়ে, কম খরচে কাজ করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসও দিচ্ছেন তারা।

এ সময় বিভিন্ন সেবা নিতে আসা লোকজনকে দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে আড়ালে নিয়ে যেতে দেখা যায় কয়েকজন দালালকে।

তবে প্রতিবেদকের গাড়ির সামনে ‘প্রেস’ লেখা দেখে কয়েকজন দ্রুত সরে গেলেও বাকিরা এসে খোশগল্পে মজেন এবং কোনো কাজে এসে থাকলে ভেতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন দালালের সঙ্গে খোলামেলা কথা হলে তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিআরটিএর কঠোর অবস্থানের কারণে আগের মতো সহজে ভেতরে ঢোকা যায় না। ফলে তাদের আয়-রোজগার কমে গেছে।

তবে তারা স্বীকার করেন, কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই ভেতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজ সেরে নেন।

ফোনে টোকেন নম্বর জানিয়ে দিলে কাজ সম্পন্ন করে দেন এবং পরে নির্ধারিত অংশ সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের কাজ করেন এমন একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দালাল বলেন, ‘আমরা তো ইকুরিয়ায় বিআরটিএর জন্মলগ্ন থেকেই এখানে এই কাজ করছি। অন্য কোনো কাজ শিখিনি। তাই সংসার চালাতে এই কাজ ছাড়া উপায় নেই। অনেকবার জেলে গিয়েছি। তারপরও ছাড়তে পারি না। এখন মোবাইল কোর্ট চলাকালে আমরা আশপাশেও থাকি না। ধরা পড়লে তিন মাস পর্যন্ত জেল খাটতে হয়। তাই দূরে থেকেই কাজ করি।’

বিআরটিএর মূল ভবনে প্রবেশের পর অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ দেখা যায়। কয়েকটি কক্ষে চার্জার লাইট ব্যবহার করে কর্মকর্তাদের কাজ করতে দেখা গেছে।

কয়েকজন সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেন, বিআরটিএ একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিস। এখানে প্রায়ই বিদ্যুৎ না থাকায় কাজের গতি ব্যাহত হয় এবং সেবায়ও বিলম্ব ঘটে। ‘কর্মকর্তারা কি এ সমস্যা সমাধানে কাজ করেন না?’—খেদ ঝাড়েন তারা।

মতিঝিল থেকে আগত ব্যাংকার আসলাম বলেন, ‘কোনো রকমের হয়রানি হয়নি, তবে অস্বস্তি হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না আসায় অন্ধকারে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। বিদ্যুৎ আসার পর কাজ সেরে ফিরছি।’

প্রায় আধা ঘণ্টা পরে বিদ্যুৎ এলেও অফিসের ভেতরের পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত দেখা গেছে। কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে গাড়ির ফিটনেস করাচ্ছেন, কেউ নতুন গাড়ির নম্বর প্লেট নিচ্ছেন। ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য অনলাইনে শিক্ষানবিশ কার্ড ও পরীক্ষার সময়সূচি দেওয়ার কারণে এখন আগের মতো ভিড় নেই বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কদমতলী থানার প্লাস্টিক বোতল রিসাইক্লিং ব্যবসায়ী শামীম বাংলানিউজকে জানান, ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে তিনি বিআরটিএর এক দালালের সঙ্গে ১২ হাজার টাকায় চুক্তি করেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নিজে শুধু অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করেছিলেন। লিখিত পরীক্ষায় তিনি নিজেই অংশ নেন। তবে সাধারণ জ্ঞান পরীক্ষায় দালালের যোগাযোগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাকে পাস করিয়ে দেন। পরবর্তী সময়ে গাড়ি চালানোর ব্যবহারিক পরীক্ষার সময়ও একইভাবে দালালের মাধ্যমে কর্মকর্তারা তাকে পাস করিয়ে দেন বলে তিনি দাবি করেন।

পরে লাইসেন্সের জন্য নির্ধারিত টাকা জমা দিতে বলা হলে শামীম অনলাইনে সেই টাকা জমা দেন। বর্তমানে তিনি লাইসেন্স হাতে না পেলেও অনলাইনে টাকা জমার রসিদ দেখিয়েই গাড়ি চালাচ্ছেন বলে জানান।

কালিয়াকৈর থেকে আসা মো. ইউনুস আলী বলেন, ‘চার বছর আগের বিআরটিএ আর এখনকার বিআরটিএর মধ্যে অনেক পার্থক্য। আগে বাধ্য হয়ে দালালের মাধ্যমে কাজ করতে হতো। এখন দালাল আছে, তবে আগের মতো সহজে ভেতরে ঢুকতে পারে না বা সরাসরি সামনে থাকেন না। তাই হয়রানি কিছুটা কমেছে।’

মিরপুর থেকে আসা আবদুল জাব্বার জানান, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য সব পরীক্ষা শেষ করে টাকা জমা দিয়েছিলেন। চার বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো লাইসেন্স হাতে পাননি।

বারবার যোগাযোগ করেও কোনো সঠিক উত্তর পাননি—এমন আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘দালালের মাধ্যমে করলে হয়তো তিন বছর আগেই লাইসেন্স পেয়ে যেতাম। বিআরটিএর ভোগান্তি যেন শেষই হয় না।’

একাধিক সেবাগ্রহীতা জানান, অফিসে ঢোকার আগেই দালালরা জিজ্ঞেস করেন—লাইসেন্স, ফিটনেস নাকি রেজিস্ট্রেশন—দ্রুত লাগবে, নাকি নিয়মে করবেন? অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে দালালদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দালালচক্রের কয়েকজন সদস্য জানান, এখানে গাড়ির ফিটনেস করাতে গাড়িপ্রতি গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হয়। প্রতিদিন যদি প্রায় ২০০টি ফিটনেস সম্পন্ন হয়, তাহলে শুধু এই খাত থেকেই প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়।

ছোট পিকআপ ভ্যানের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। বাসের ক্ষেত্রে একটি ফিটনেস করাতে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় বলে দাবি তাদের। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০টি বাসের ফিটনেস হলে এই খাত থেকেই প্রায় ৫ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়।

এ ছাড়া মালিকানা বদলির ক্ষেত্রে প্রতিটি ফাইলে প্রায় ২ হাজার টাকা এবং রেজিস্ট্রেশন বা নম্বর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রায় ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৫০টি মালিকানা বদলি হলে শুধু এই খাত থেকেই প্রায় ১ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয় বলে দাবি তাদের।

ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। দালালচক্রের সদস্যদের দাবি, লেখাপড়ায় দুর্বল প্রার্থীদের লাইসেন্স করাতে প্রায় ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত এবং তুলনামূলকভাবে সক্ষম প্রার্থীদের ক্ষেত্রে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।

সব মিলিয়ে এসব খাত থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ লেনদেন হয় বলে দাবি দালালচক্রের সদস্যদের। তাদের ভাষ্য, ‘আমরা করলে টাকা কম লাগে, আর সেবাগ্রহীতারা সরাসরি করলে খরচ আরও বেশি পড়ে যায়।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো সার্কেল-২-এর উপপরিচালক প্রকৌশলী সৈয়দ আইনুল হুদা চৌধুরীকে মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো-২ সার্কেলে অবাধে চলছে ঘুষ বাণিজ্য। বর্তমানে পতিত আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতাদের মিলিত সিন্ডিকেট গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছে। এ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে রুট পারমিট, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, ফিটনেসবিহীন গাড়ির ছাড়পত্রসহ প্রায় সব সেক্টরেই সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি করে প্রতি মাসে অবৈধভাবে কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিআরটিএ-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ইকুরিয়া বিআরটিএ অফিস দুর্নীতির আঁতুড়ঘর। শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের একটি অংশ অবৈধ অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত। অফিসটি যেন টাকার মেশিন, যার নিয়ন্ত্রক আওয়ামী চালক লীগের সহসভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক, বিএনপির জামাই সেলিম ওরফে লেংড়া সেলিমসহ অন্তত ৫০ জনের একটি সিন্ডিকেট। অফিসে গেট থেকে শুরু করে বের হওয়া পর্যন্ত সব সেক্টর চলে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। বিআরটিএ অফিস ছাড়াও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিআরটিএর সামনে অবৈধভাবে গড়ে তোলা ৪৫টি দোকান ও ট্রাকস্ট্যান্ড। দোকানপ্রতি মাসিক পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হয়। অন্যদিকে ট্রাকস্ট্যান্ড ও বিআরটিএতে সেবা নিতে আসা ট্রাক থেকে ‘মালিক শ্রমিক ঐক্য সংগঠন’-এর নামে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষায় অনিয়ম হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষা দিয়েও অনেক আবেদনকারী লাইসেন্স পাচ্ছেন না। ঘুষ না দিলে পরীক্ষায় ফেল দেখানো হয়। অন্যদিকে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দালালের মাধ্যমে দিলে পরীক্ষা ছাড়াই পাস করিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়।

সূত্রগুলোর দাবি, অনলাইনে আবেদন করার পর বায়োমেট্রিক, লিখিত, মৌখিক ও ফিল্ড টেস্ট সম্পন্ন করে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন নিষ্পত্তির জন্য তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। ফিটনেস সনদের ক্ষেত্রে গাড়িভেদে এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত, মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তিন থেকে ১০ হাজার টাকা, গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে মোটরসাইকেলের জন্য দুই হাজার এবং অন্যান্য গাড়ির ক্ষেত্রে তিন থেকে ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়। এমন করে প্রতিটি সেক্টরে মাসে গড়ে চার থেকে সাড়ে চার হাজার আবেদনে অতিরিক্ত আদায় করা হয় এক থেকে দেড় কোটি টাকা।

একাধিক সূত্র জানায়, ইকুরিয়া বিআরটিএ অফিসের উপপরিচালক সৈয়দ আইনুল হুদা চৌধুরী, সহকারী পরিচালক রুহুল আমিন, জাহাঙ্গীর আলম, আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ আট মোটরযান পরিদর্শক, তিন এআরও, আট অফিস সহকারী এবং ১৫ পিয়ন ও আনসার সদস্য ঘুষের টাকার ভাগীদার।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী চালক লীগের সহসভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিকের নেতৃত্বে ২০০৯ সালে এ সিন্ডিকেটের জন্ম। তখন ২০-২৫ জন সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সিন্ডিকেটে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। আবু বক্কর সিদ্দিককে সঙ্গে রেখে স্থানীয় বিএনপির আরও প্রায় ৩০ জন এতে যুক্ত হন। এদের মধ্যে মালিকানা লাইসেন্স তৈরির সিন্ডিকেটে রয়েছেন—বিপ্লব, হালিম, বিল্লাল, ইয়াকুব ও আমান। এ ছাড়া ভলিউম দেখাশোনার সিন্ডিকেটে রয়েছেন লিটন, শাকিল, শাহাদাত, আলামিন ও ফারুক; পারমিট শাখায় রাজু, ফাইজুল, তুহিন ও সেন্টু; ফিটনেস শাখায় হাসান, নাদিম, কাইয়ুম, শাহীন, নাঈম, সাজু, হেলাল, হীরক ও ইলিয়াস; ফিটনেস ঢাকা জেলা শাখায় মিজান, রনি ও মনির; ভলিউম শাখায় নয়ন, আশিক ও আসলাম এবং রেজিস্ট্রেশন শাখায় হাবিব, জালাল, রাসেল, রায়হান, চান মিয়া ও নান্নু।

বিআরটিএর সামনে ৪৫টি অবৈধ দোকানের দায়িত্বে রয়েছেন হাতকাটা জয়, ইকুরিয়ার সুমন, হারিজ রাব্বি, ইয়াসিন, তাঁতী দলের রনি, শ্রমিক দলের রুকু, জামাই সেলিম ওরফে লেংড়া সেলিম, মৎস্যজীবী দলের আমান, ইসমাইল, ইয়ামিন, রানা, সোহাগ, ইমু, রনি, বাকুম উজ্জ্বল, মোকামপাড়ার সিএনজি সেলিম, সাজু, জুয়েল, মৎস্যজীবী দলের বাবুল, নাজিম, স্বেচ্ছাসেবক দলের ওসমান, সোহেল, মুন্না, হিমেল, যুবদলের স্বাধীন, ফারুক, মহসিন, ইয়াসিন, বিল্লাল, চান মিয়া ও ইয়াসিন। এ ছাড়া বিআরটিএর সিন্ডিকেটে রয়েছেন সবুজ, শিপন, সাব্বির, ইউসুফ, লেংড়া সেলিম, আমজাদ হোসেন, মনির হোসেন, মাসুদ হোসেন, মিজান মিয়া, মান্নানসহ বেশ কয়েকজন। এই দালালচক্র অফিস চত্বরে অবস্থান করে সেবাপ্রত্যাশীদের তাদের মাধ্যমে সেবা নিতে বাধ্য করে।

দালালচক্রের মূল হোতা আবু বক্কর

জানা গেছে, আওয়ামী চালক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আলী হোসেনের শ্যালক আবু বক্কর সিদ্দিক ২০০১ সালে ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এপিএস সাইফুজ্জামান শিখরের সুপারিশে কেরানীগঞ্জের বিআরটিএ অফিসে সিল কন্ট্রাক্টর পদে ‘নো ওয়ার্ক, নো পে’ শর্তে চাকরি পান। পরে তিনি বিআরটিএর নিচতলার ১১০ নম্বর রুম দখলে নিয়ে অবৈধ সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। ২০২২ সালে সিল কন্ট্রাক্টর পদ বিলুপ্ত হলেও বিআরটিএ অফিস ছাড়েননি আবু বক্কর সিদ্দিক।

শেখ মুজিবের এক সময়ের গাড়িচালকের ছেলে পুলিশ বাহিনীতে ওসি পদে কর্মরত ওমর ফারুক এবং বিজিবিতে কর্মরত মেয়ের জামাই রবিউলের দাপটে হাসিনার আমলে আবু বক্কর বিআরটিএ অফিসে অনিয়মের রামরাজত্ব কায়েম করেন। জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে ঢাকার গেন্ডারিয়া থানায় তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রুজু হয়। কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাকে ম্যানেজ করে তিনি বিআরটিএ অফিসে কর্তৃত্ব ধরে রাখেন। কোনো কর্মকর্তা না হয়েও তিনি বিআরটিএর ১১০ নম্বর রুম দখলে রেখেছেন শুধু দালাল ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের জন্য। বিআরটিএর অনেক কর্মকর্তাও তার দাপটে তটস্থ থাকেন।

স্থানীয়রা জানান, বিগত ১৫ বছরে বিআরটিএর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আবু বক্কর অন্তত ২০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। কেরানীগঞ্জের বোরহানিরবাগে তার ছয়তলা ভবন, নবরূপা ফরচুন টাওয়ারে আধুনিক ফ্ল্যাট এবং ১২ নম্বর কাজী আলাউদ্দিন রোডে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে তার একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট ও বাগানবাড়ি রয়েছে বলে জানা গেছে।

আনীত অভিযোগের বিষয়ে আবু বক্কর সিদ্দিককে ফোনে কয়েকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।




বন্ড কমিশনারেটে ৭০–৮০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ: কাস্টমস কর্মকর্তা রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে ঘুষ, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সহকারী কমিশনার রাসেল আল মামুনকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি পদোন্নতি পাওয়া কাস্টমস ক্যাডারের ১১ ব্যাচের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘ চাকরিজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, রাসেল আল মামুনের জন্ম ১৯৮৬ সালের ১ নভেম্বর। চাকরির শুরু থেকেই তিনি কাস্টমসের বিভিন্ন সংবেদনশীল দায়িত্বে ছিলেন। এসব দায়িত্ব পালনের সময় ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও বন্ড প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া এবং রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এভাবে কয়েক বছরে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছেন।

রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত কাস্টম বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আদায় করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময়ে তাঁর মাধ্যমে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আদায় করা হয়েছে।

বন্ড ব্যবস্থায় আমদানিকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক ও অন্যান্য রাজস্ব সুবিধা থাকায় সেখানে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাসেল আল মামুন প্রিভেন্টিভ টিমের সদস্যদের নিয়ে রাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান বা টহলের নামে চাপ সৃষ্টি করতেন। পরে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার বিনিময়ে বিভিন্ন জটিলতা মিটিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, বন্ড ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শুধু এককালীন অর্থই নেওয়া হতো না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত মাসিক টাকা আদায়ের একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল। কোনো প্রতিষ্ঠান ওই অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের কাগজপত্র আটকে রাখা, পণ্য খালাসে জটিলতা তৈরি কিংবা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির ভয় দেখানো হতো বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই কর্মকাণ্ডের পেছনে এনবিআরের একজন সাবেক সদস্য ও তৎকালীন অবিভক্ত বন্ড কমিশনারের প্রভাব ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে ওই কর্মকর্তার নাম সরাসরি উল্লেখ না করে তাকে রাসেল আল মামুনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মোংলা কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালনের সময় তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় এবং পরবর্তী সময়ে রাসেল ওই কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

অভিযোগে বলা হয়, মোংলা কাস্টমস দিয়ে খালাস হওয়া গাড়ির যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন ভারী আমদানিপণ্যের ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে বড় অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। এর বিনিময়ে রাসেল আল মামুন অর্থ নিতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে ওই সাবেক কর্মকর্তা ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পেলে ২০১৮ সালে রাসেলকেও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে হেডকোয়ার্টার্স ও প্রিভেন্টিভ শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তিনি দায়িত্ব পান। পরবর্তী সময়ে খুলনা আপিল বিভাগ থেকে আবার ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে পোস্টিং নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনের সময় গুলশান ও টঙ্গী এলাকার বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলো থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, গুলশান এলাকার বিভিন্ন ওয়্যারহাউস থেকে মাসে প্রায় এক কোটি টাকা এবং টঙ্গী সার্কেল থেকে আরও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা আদায় করা হতো।

রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট অডিটকে কেন্দ্র করে গুরুতর অনিয়মের কথাও বলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আনোয়ার গ্রুপের মালিকানাধীন ‘হোসেন ডাইং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অডিটের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি ৩৫ লাখ টাকার বিনিময়ে অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার চুক্তি করেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অডিটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব ফাঁকি শনাক্ত করার কথা থাকলেও ওই প্রতিষ্ঠানের ফাইল যথাযথভাবে পরীক্ষা না করেই অনুমোদন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে এনবিআরে অভিযোগ জমা পড়লে নতুন করে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় এক কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া যায় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

তবে ওই ঘটনায় রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে ৩৫ লাখ টাকার চুক্তি এবং ওই অর্থ গ্রহণের অভিযোগও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বন্ড কমিশনারেটের বাইরে কমলাপুর আইসিডি কাস্টম হাউসেও রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সেখানে দায়িত্ব পালনকালে আমদানিকৃত পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়া হতো।

অভিযোগে বলা হয়, সেখানে প্রতি মাসে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। যারা অর্থ দিতে চাইতেন না, তাদের পণ্য খালাসে জটিলতা তৈরি করা বা ভুয়া মামলায় জড়ানোর ভয় দেখানো হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে তৎকালীন কমিশনার এবং এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হলেও ওই অভিযোগের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়।

অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ রাসেল আল মামুনের সম্পদ নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরির আয় দিয়ে যে পরিমাণ সম্পদ অর্জন সম্ভব, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। ঘুষ ও অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে তাঁর পারিবারিক বাড়ি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একসময় সেখানে সাধারণ টিনের ঘর থাকলেও বর্তমানে বিপুল অর্থ ব্যয়ে একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি কেনার অভিযোগও রয়েছে।

রাজধানীতেও রাসেল আল মামুনের নামে ও বেনামে একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট এবং গাড়ি থাকার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, নিজের নামে সম্পদ দেখানোর পাশাপাশি বাবা-মা, ভাই-বোন এবং অন্যান্য নিকটাত্মীয়ের নাম ব্যবহার করেও সম্পদ কেনা হয়েছে।

এদিকে রাসেল আল মামুনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, পারিবারিক বিরোধের জেরে তাঁর স্ত্রী নারী নির্যাতন ও যৌতুক দাবির অভিযোগে আদালতে মামলা করেছেন।

সব মিলিয়ে রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন বেশ বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহার, আমদানিকারক ও বন্ড ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ আদায়, মাসিক মাসোহারা নির্ধারণ, রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তা, অডিটে অনিয়ম, সরকারি রাজস্ব আদায়ে বাধা সৃষ্টি, ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার এবং অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ।

অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন সময় এসব অনিয়মের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কারণে রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে এবার দুদকের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে। তার চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করা শাখা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাইল, বিল-ভাউচার, অডিট রিপোর্ট, রাজস্ব আদায়ের হিসাব এবং সম্পদের বিবরণ যাচাইয়ের দাবি করা হয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি প্রাথমিকভাবে যাচাই করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র, কর্মকর্তার সম্পদের তথ্য এবং তাঁর দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা হতে পারে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে রাসেল আল মামুনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এখন দুদকের অনুসন্ধানেই স্পষ্ট হতে পারে—অভিযোগে উল্লেখ করা অর্থ লেনদেনের বাস্তবতা কতটা, রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন, রাসেল আল মামুনের কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল কি না এবং তাঁর নামে ও স্বজনদের নামে থাকা সম্পদের প্রকৃত উৎস কী। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থায় গুরুতর অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।




বিআইডব্লিউটিএর মেগা প্রকল্পে পাইলিং কেলেঙ্কারির অভিযোগ: ৫০০ মিমির বদলে ৩০০, ৪০.৫০ মিটারের স্থলে ২৩ মিটার—১০ রডের জায়গায় ৭, নকশা বদলে কোটি টাকা আত্মসাতের দাবি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) একটি বড় প্রকল্পের পাইলিং কাজে অনুমোদিত নকশা ও নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন মানা হয়নি—এমন অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে পাইলের ব্যাস ও দৈর্ঘ্য কমানো এবং নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে কম রড ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় ও কাজের হিসাব নিয়ে যেমন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তেমনি ভবিষ্যতে স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবুল কালাম আজাদ মোল্লা এবং মূল ঠিকাদার আরশাদ পারভেজ। অভিযোগকারীদের দাবি, কার্যাদেশে যে ধরনের পাইলিং করার কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়ে ছোট আকারের পাইল তৈরি করা হয়েছে। অথচ এসব কাজের বিপরীতে বিল প্রস্তুত ও অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে কি না, সেটি যাচাই করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্পের অনুমোদিত কার্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথিতে প্রতি পাইলের ব্যাস ৫০০ মিলিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ৪০ দশমিক ৫০ মিটার রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি পাইলের জন্য ১৬ মিলিমিটার ব্যাসের ১০টি রড ব্যবহারের কথা রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, বাস্তবে ৫০০ মিলিমিটারের পরিবর্তে প্রায় ৩০০ মিলিমিটার ব্যাসের পাইল করা হয়েছে। একইভাবে নির্ধারিত ৪০ দশমিক ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের বদলে প্রায় ২৩ মিটার দৈর্ঘ্যের পাইল ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

শুধু পাইলের আকারেই নয়, রড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পার্থক্যের অভিযোগ রয়েছে। কার্যাদেশে ১০টি রড ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে সাতটি রড ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অর্থাৎ নকশা অনুযায়ী পাইলের ব্যাস, দৈর্ঘ্য ও রডের সংখ্যা—তিন ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনার অভিযোগ সামনে এসেছে।

এ ধরনের পরিবর্তন যদি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলগত অনুমোদন ছাড়া করা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি শুধু আর্থিক অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কারণ কোনো স্থাপনার ভিত্তি তৈরির ক্ষেত্রে পাইলের ব্যাস, গভীরতা, দৈর্ঘ্য এবং রডের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় প্রকৌশলগত হিসাবের ভিত্তিতে। তাই অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে এসব পরিবর্তন করা হলে স্থাপনার ধারণক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের মূল অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করে সাইটে ‘TYPE-1’ ও ‘TYPE-2’ নামে দুটি বিকল্প ড্রয়িং ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ড্রয়িংয়ের মাধ্যমে পাইলিংয়ের আকার বা নির্মাণ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়ে থাকলে তার পেছনে কার অনুমোদন ছিল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

প্রকল্পের মূল নকশা পরিবর্তন করতে হলে সাধারণত সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের যাচাই, প্রয়োজনীয় কারিগরি মতামত এবং অনুমোদন প্রয়োজন হয়। সংশোধিত নকশা অনুমোদনের পরই তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের সুযোগ থাকার কথা। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, ‘TYPE-1’ ও ‘TYPE-2’ ড্রয়িং ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন ও ভেটিংয়ের বিষয়টি পরিষ্কার নয়।

এই দুটি ড্রয়িং কে তৈরি করেছেন, কোন কর্তৃপক্ষ তা অনুমোদন করেছে এবং মূল ডিজাইনের পরিবর্তনের আগে কোনো কারিগরি কমিটি বা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব বিষয় নথিপত্র যাচাই করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাইলিংয়ের কাজ কম করার পাশাপাশি বিল তৈরিতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বাস্তবে যতটুকু কাজ করা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি কাজ দেখিয়ে মাপবই (এমবি) এবং রানিং বিল তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি অর্থের অতিরিক্ত বিল উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, এসব বিলের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মোল্লা ও ঠিকাদার আরশাদ পারভেজের মধ্যে অর্থ ভাগাভাগি হয়েছে। মূল কার্যাদেশ, বিল অব কোয়ান্টিটিজ বা BOQ, মাপবই, রানিং বিল, পেমেন্ট ভাউচার এবং প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের নথি পর্যালোচনা করার পাশাপাশি সরেজমিনে পাইলের ব্যাস ও গভীরতা পরিমাপ করা প্রয়োজন।

প্রকল্পের পাইলিংয়ের রড সংক্রান্ত কাজ ‘মায়ের দোয়া কনস্ট্রাকশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। মূল ঠিকাদার আরশাদ পারভেজের অধীনে থাকা কাজ অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

সরকারি প্রকল্পে সাব-কন্ট্রাক্টের সুযোগ থাকলে সেটি টেন্ডার ডকুমেন্ট ও মূল চুক্তির শর্ত অনুযায়ী হতে হয়। কোথাও অনুমোদন প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত সম্মতিও থাকার কথা। তাই ‘মায়ের দোয়া কনস্ট্রাকশন’ কীভাবে এই কাজে যুক্ত হলো, প্রতিষ্ঠানটির যোগ্যতা কী ছিল এবং এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন ছিল কি না—এসব তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মোল্লার পক্ষ থেকে পাঠানো ঠিকাদারি লাইসেন্স এবং কথিত সাব-কন্ট্রাক্টের মধ্যে কী সম্পর্ক রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট করা দরকার বলে অভিযোগকারীরা মনে করছেন।

প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএর কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছেন, তৎকালীন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর এপিএস বাশার এবং ঠিকাদার আরশাদ পারভেজের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর কাজের গুণগত মানের চেয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে কেউ তথ্য সংগ্রহ বা প্রশ্ন করলে তাকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এমনকি কথিত ভাড়াটে লোকজন ব্যবহার করে সাংবাদিকদের ভয় দেখানোর অভিযোগও করা হয়েছে।

তবে রাজনৈতিক প্রভাব, ভয়ভীতি কিংবা অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, আর্থিক লেনদেন এবং প্রকল্পের প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

এই প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা বের করতে প্রথমেই দেখা প্রয়োজন কার্যাদেশে ৫০০ মিলিমিটার ব্যাস ও ৪০ দশমিক ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের পাইল নির্ধারণের পর তা কীভাবে ৩০০ মিলিমিটার ও ২৩ মিটারে নামিয়ে আনা হলো। এই পরিবর্তনের লিখিত অনুমোদন ছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

একইভাবে ১০টির পরিবর্তে সাতটি রড ব্যবহারের অনুমতি কে দিয়েছেন, তার কোনো লিখিত নথি রয়েছে কি না, ‘TYPE-1’ ও ‘TYPE-2’ ড্রয়িং কারা তৈরি করেছেন এবং কোন কর্তৃপক্ষ তা অনুমোদন করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

এর পাশাপাশি প্রকল্পের মাপবইয়ে কী পরিমাণ কাজ দেখানো হয়েছে এবং বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে, তার তুলনা করা জরুরি। ঠিকাদার আরশাদ পারভেজকে যে পরিমাণ বিল দেওয়া হয়েছে, সেটি বাস্তব কাজের পরিমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে।

‘মায়ের দোয়া কনস্ট্রাকশন’-কে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল চুক্তিতে অনুমোদন ছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত সম্মতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তাও তদন্তের অংশ হওয়া প্রয়োজন।

প্রকল্পের পাইলিংয়ের কাজে অনিয়ম হয়ে থাকলে এর প্রভাব শুধু সরকারি অর্থের ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে ওই পাইলের ওপর নির্মিত স্থাপনার ভার বহনের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে পাইলের গভীরতা, ব্যাস ও রডের পরিমাণ প্রকৌশলগত হিসাবের বাইরে কমানো হলে কাঠামোর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।

এ কারণে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে শুধু কাগজপত্র দেখলেই হবে না; প্রয়োজনে প্রকল্পের পাইলগুলো প্রযুক্তিগতভাবে পরীক্ষা করাও প্রয়োজন। প্রকল্পের অনুমোদিত ডিজাইন, সংশোধিত ডিজাইন, ভেটিং নথি, BOQ, মাপবই, রানিং বিল, অর্থ পরিশোধের রেকর্ড, ব্যাংক লেনদেন, পাইলের বাস্তব মাপ এবং সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার রিপোর্ট একসঙ্গে পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

বিআইডব্লিউটিএর গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পে অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব কাজের পার্থক্য, বিকল্প ড্রয়িংয়ের বৈধতা, পাইলের প্রকৃত মাপ, ব্যবহৃত রডের সংখ্যা, বিল-ভাউচারের যথার্থতা এবং সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়ার প্রক্রিয়া যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।

এখন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সামনে মূল বিষয় হলো—প্রকল্পের নকশা ও কার্যাদেশ অনুযায়ী কাজ হয়েছে কি না, পরিবর্তন করা হয়ে থাকলে তার অনুমোদন ছিল কি না এবং সরকারি অর্থের বিপরীতে বাস্তবে যথাযথ কাজ সম্পন্ন হয়েছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে স্বাধীন প্রকৌশলগত ও আর্থিক তদন্ত প্রয়োজন।

তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সরকারি অর্থের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে তা উদ্ধারের পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রকৌশলগত পরীক্ষার মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করা দরকার। এতে প্রকল্পের স্বচ্ছতা যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়মের সুযোগও কমবে।




ঢাকা কাস্টম হাউসের উপকমিশনার আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি, ঘুষ ও চোরাচালানে সহযোগিতার অভিযোগ—৩০ কোটি টাকার পণ্য খালাসের তদন্ত দাবি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকা কাস্টম হাউসের প্রিভেন্টিভ শাখার উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি, ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে পণ্য খালাস, ঘুষ গ্রহণ, চোরাচালানে সহযোগিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে সোহেল রানা নামে এক ব্যক্তি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।

আবেদনে সবচেয়ে গুরুতর যে অভিযোগটি করা হয়েছে, সেটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সকে ঘিরে। সোহেল রানার দাবি, একটি এয়ারওয়ে বিলের বিপরীতে প্রায় ৫৬ কার্টন পণ্য কাস্টমসের নিয়মিত বিল অব এন্ট্রি ও ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই কার্গো এলাকা থেকে বের করে নেওয়া হয়েছে। এসব পণ্যের মোট ওজন আনুমানিক ১ হাজার ৯৬২ কেজি এবং অভিযোগকারীর হিসাবে এগুলোর মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই চালানে মোবাইল ফোন, মোবাইল ফোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, এলসিডি, ই-সিগারেট এবং সিগারেটের ব্যান্ডেরোল বা সরকারি রাজস্ব স্ট্যাম্পের মতো পণ্য থাকতে পারে। নিয়ম অনুযায়ী শুল্ক ও কর পরিশোধ এবং প্রয়োজনীয় কাস্টমস প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই এসব পণ্য বের হয়ে থাকলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাতে পারে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সোহেল রানা দাবি করেছেন, এই ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে বিমানবন্দরের কার্গো এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, গেট পাস, পণ্য বের হওয়ার রেকর্ড, ওয়্যারহাউসের মজুত তালিকা, কার্গো মুভমেন্টের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারওয়ে বিল ও বিল অব এন্ট্রি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ওই সময় দায়িত্বে থাকা কাস্টমস কর্মকর্তাদের ডিউটি রোস্টারও যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কয়েকটি বন্ধ বা কার্যক্রমহীন বন্ড প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে ভুয়া বা অসঙ্গতিপূর্ণ নথি তৈরি করে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য খালাস করা হয়ে থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোন প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য আমদানি হয়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলো তখন কার্যকর ছিল কি না, তাদের বন্ড সুবিধা বহাল ছিল কি না এবং আমদানির পর পণ্য কোথায় গেছে—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার অনুরোধ করা হয়েছে।

শিশুখাদ্য, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ এনেছেন সোহেল রানা। তাঁর দাবি, প্রয়োজনীয় বিএসটিআই ছাড়পত্র বা অন্যান্য বাধ্যতামূলক অনুমোদন না থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে এসব পণ্য খালাসের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট আমদানি নথি, পরীক্ষাগারের ছাড়পত্র এবং কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের কাগজপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও করা হয়েছে। সোহেল রানার দাবি, বিভিন্ন কাস্টমস কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে থাকেন। তবে এই অর্থ লেনদেনের কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংক রেকর্ড, রসিদ বা স্বাধীন তদন্তের তথ্য আবেদনের সঙ্গে রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে আবেদনকারী উল্লেখ করেছেন।

ঘুষের অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য আমিনুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেন, নগদ অর্থের গতিবিধি, সম্পত্তি কেনাবেচা এবং আয়কর নথি পরীক্ষা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও অন্যান্য সম্পদের তথ্যও যাচাইয়ের দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগে ‘গুনগুন এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানের কাস্টমস সরকার মো. আবু হানিফ এবং হানিফ/শরীফ নামে পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে আমিনুল ইসলামের যোগাযোগ ও যোগসাজশের কথাও বলা হয়েছে। তবে এই যোগাযোগের ধরন বা কোনো আর্থিক লেনদেনের নির্দিষ্ট প্রমাণ আবেদনে উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও তদন্তের অংশ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।

এ ছাড়া ‘ক্লোজেট ক্লাউড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানি করে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা, আমদানির নথি, বিল অব এন্ট্রি, পণ্যের প্রকৃত মূল্য, ঘোষিত মূল্য, পরিশোধিত শুল্ক এবং পণ্যের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।

মো. আমিনুল ইসলামের ব্যক্তিগত আয় ও সম্পদের মধ্যেও সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটি যাচাইয়ের দাবি করা হয়েছে। সোহেল রানার আবেদনে তাঁর আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল, গাড়ির মালিকানা, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব, বিনিয়োগ এবং দেশে-বিদেশে থাকা সম্ভাব্য সম্পদের তথ্য পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, কাস্টমস কার্যক্রম থেকে কথিতভাবে পাওয়া অবৈধ অর্থের একটি অংশ মার্কিন ডলারে রূপান্তর করে বিদেশে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোনো অর্থপাচারের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা যাচাই করতে ব্যাংকিং লেনদেন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, রেমিট্যান্স বা বৈদেশিক অর্থ স্থানান্তরের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি পরীক্ষা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সোহেল রানা দাবি করেছেন, আমিনুল ইসলাম এর আগে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেটসহ বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেসব কর্মস্থলেও তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা অনিয়মের নথি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অভিযোগকারীর মতে, আগের কর্মস্থলের দায়িত্বকালীন কার্যক্রমও পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগের সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যেতে পারে।

বিমানবন্দর কার্গোতে কথিত ৩০ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য খালাসের অভিযোগটি তদন্তের ক্ষেত্রে আলামত সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন সোহেল রানা। তাঁর আবেদনে কার্গো এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, ওয়্যারহাউস ইনভেন্টরি, কার্গো মুভমেন্ট রেকর্ড, গেট পাস, ডেলিভারি রেকর্ড, এয়ারওয়ে বিল, বিল অব এন্ট্রি, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডিউটি রোস্টার সংরক্ষণের অনুরোধ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা প্রশাসনিক নথি থাকলে সেগুলোও সংগ্রহ করে যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে। এতে পণ্যগুলো আসলে কখন কার্গোতে প্রবেশ করেছে, কোন প্রক্রিয়ায় বের হয়েছে এবং বের করার সময় কারা দায়িত্বে ছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন অভিযোগকারী।

তবে লিখিত আবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো এখনো তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। বিশেষ করে ঘুষের পরিমাণ, ৩০ কোটি টাকার পণ্য খালাস, অর্থপাচার এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথিত যোগসাজশের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সরকারি নথি ও আর্থিক তথ্য যাচাই প্রয়োজন।

এ বিষয়ে উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান, মো. আবু হানিফ, হানিফ/শরীফ নামে পরিচিত ব্যক্তিরা এবং ‘ক্লোজেট ক্লাউড’-এর সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তদন্তের চিত্র আরও পরিষ্কার হতে পারে।

সোহেল রানা তাঁর আবেদনে অভিযোগগুলোর স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও অন্যদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এখন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর, অর্থ মন্ত্রণালয় বা দুদক কী ধরনের অনুসন্ধান করে এবং বিমানবন্দরের কার্গো-সংক্রান্ত নথি ও আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের মাধ্যমে কী তথ্য বেরিয়ে আসে, সেটিই দেখার বিষয়। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা সরকারি রাজস্ব ক্ষতি, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক অনিয়মের গুরুতর ঘটনায় পরিণত হতে পারে; আর অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে তদন্তের মাধ্যমেই সেটিও স্পষ্ট হবে।




বন উজাড়, জোত-টিপি ও বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ: লামার ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম বনাঞ্চলের বান্দরবানের লামা বন বিভাগে চলছে অবৈধ অর্থ ও গাছ কেটে পাচারের হিড়িক। নিয়মের তোয়াক্কা না করে হরহামেশাই চলছে গাছ কাটা ও জবরদখলের রাজত্ব। এ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমান অধীনস্থ একাধিক অসাধু বন কর্মকর্তার যোগসাজশে বেপরোয়া লুটপাটের কারণে অবৈধ দখলদারত্ব থেকে অভিনব কায়দায় পাল্টে যাচ্ছে বনের নাম। যেন দুর্নীতির শীর্ষে উঠছে লামা বন বিভাগ। ফলে প্রতিদিনই লাখ লাখ টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বন বিভাগ তথা সরকার।

জানা গেছে, বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই উঠেছে বন উজাড়, জোত ও ট্রানজিট পারমিটের আড়ালে গাছ পাচার, বদলি-পদায়নে অনৈতিক অর্থ লেনদেন, বিভিন্ন চেকস্টেশনে মাসোহারা আদায় এবং বনায়ন প্রকল্পে সরকারি অর্থের অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ। এসব অভিযোগের তীর লামা বন বিভাগের ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে। তবে রহস্যজনক কারণে ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ-বাণিজ্য দেখেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দে। লামা বন বিভাগে বনাঞ্চল ধ্বংস, অবৈধ দখল, চাঁদাবাজি, গাছ কাটা কিংবা বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ নানা দুর্নীতি ও বদলি-বাণিজ্য নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না তিনি। একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার এমন নিষ্ক্রিয়তা ও পরোক্ষ প্রশ্রয়ের কারণে বন কর্মকর্তারা বনজ সম্পদ উজাড়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে জানান বন-সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে ফরেস্টার রনি পারভেজকে বন বিভাগে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে আরও ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে আব্দুল মালেক নামে এক রেঞ্জারকে লামা সদর রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া জোত পারমিট অনুমোদন থেকে শুরু করে রেঞ্জ, বিট ও চেকস্টেশনে পদায়ন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তো আছেই।

অভিযোগ অনুযায়ী, রনি পারভেজ বর্তমানে লামা বন আদালনের এফসিসিও, বমুবিলছড়ি বিট, বিশেষ টহল দল, লামা রেঞ্জ ও লামামুখ চেকস্টেশনের দায়িত্বে রয়েছেন। একই ব্যক্তির হাতে একসঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকায় বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে গাছ পাচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগকারীদের দাবি, সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ পাচারের সুযোগ করে দেওয়া এবং লাকড়ি পোড়ানো ইটভাটা থেকে ৫ লাখ টাকা করে ঘুষ নিয়েছেন ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান। ফার্নিচার পরিবহনের অনুমোদনের নামে ১ হাজার টাকা আদায়ের মতো অনৈতিক বা অবৈধ কর্মকাণ্ডও চলছে দীর্ঘদিন ধরে।

ইটভাটার মালিকরা অভিযোগ করেন, লামা বন বিভাগের আওতাধীন লাকড়ি পোড়ানো ৪০টি ইটভাটা থেকে এককালীন পাঁচ লাখ টাকা এবং মাসে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানকে। টাকা না দিলে ভাটায় কিনে আনা লাকড়ি জব্দ ও বারবার অভিযান পরিচালনা করেন ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ৮০ হেক্টর এলাকায় বাগান সৃজনের বিপরীতে বাস্তবে মাত্র ৩০ হেক্টর বাগান করা হয়েছে। বাকি ৫০ হেক্টরের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলেও দাবি করেছেন বন-সংশ্লিষ্টরা। ডলুছড়ি রেঞ্জ নিয়েও রয়েছে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের নানা অভিযোগ।

এদিকে, বর্ষা মৌসুমে বাঁশ কাটা ও পরিবহন বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনা থাকার পরও লামা বন বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে কাঁচা বাঁশ কাটা ও পরিবহনের জন্য মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে টিপি (পরিবহন পাশ) দেওয়া হচ্ছে। প্রতি বাঁশে ডিএফও ৫ টাকা করে নেন। কাগজে-কলমে মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনের বাঁশ মহাল বন্ধ থাকলেও রাতে বিপুল পরিমাণ বাঁশ ভুয়া টিপি দিয়ে পরিবহন করা হচ্ছে। তাতেও আলাদা টাকা নেন ডিএফও।

ডিএফওর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো লামা বন বিভাগের ইয়াংছা মৌজার ৫০ নম্বর এফএল জোত। বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, ওই জোতে সেগুন ও গামারীসহ মোট ২ হাজার ৬৬০টি গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৪২২টি সেগুন ও ২৩৮টি গামারী গাছ রয়েছে। এসব গাছের বিপরীতে সেগুনের প্রায় ১৮ হাজার ঘনফুট এবং গামারীর প্রায় ২ হাজার ৭০০ ঘনফুট কাঠের সাইজলিস্ট অনুমোদন দেওয়া হয়।

নথি অনুযায়ী, ২ হাজার ৩৮৮টি গাছের সাইজলিস্টের বিপরীতে প্রায় ১৬ হাজার ঘনফুট কাঠ পরিবহনের জন্য প্রায় ৪৮টি ট্রানজিট পারমিট (টিপি) নেওয়া হয়েছে লামা বন বিভাগ থেকে।

স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, বিভিন্ন বেকারিতে জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে প্রতি মাসে প্রায় ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের কথিত অনিয়মের ক্ষেত্রে ডলুছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা এ কে এম আলতাফ হোসেন ও ফরেস্টার রনি পারভেজ ক্যাশিয়ারের ভূমিকায় রয়েছেন বলেও অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আলতাফ হোসেন প্রায় দেড় বছর লামার চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনের পর প্রায় আট মাস আগে ডলুছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, ডলুছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা এ কে এম আলতাফ হোসেন ফাইতং সড়কটি কাঠ চোরাকারবারিদের কাছে মাসিক চুক্তিতে অঘোষিতভাবে লিজ দিয়েছেন। এর ফলে ওই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন সেগুন, গর্জনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ পাচার হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আলতাফের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের দাবি, জোত ও ট্রানজিট পারমিটের আড়ালে বনাঞ্চলের গাছ পাচারের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডে বিশেষ টহল দলের ওসি ফরেস্টার রনি পারভেজ সহযোগিতা করছেন বলেও অভিযোগ। এর আগে লামা বন বিভাগে জোত পারমিট ও ট্রানজিট পারমিট ব্যবহার করে বন উজাড়ের অভিযোগ নিয়ে তদন্তের আদেশ হলেও তা মাঝপথে থেমে যায় বলে জানা যায়।

আরও জানা যায়, লামা বন বিভাগের বিভিন্ন রেঞ্জে প্রতি মাসে বিপুলসংখ্যক জোত অনুমোদন দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব জোত থেকে কাঠ পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুটে ৪০ টাকা করে ডিএফও মোস্তাফিজের নামে আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। এছাড়া লামা বন বিভাগের সদর রেঞ্জের ট্রানজিট পারমিট (টিপি চলাচল পাশ) শাখায় গত প্রায় ১০ বছর ধরে মো. সেলিম নামে একজন দায়িত্ব পালন করছেন।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, লামা বন বিভাগে প্রতি মাসে আড়াই শতাধিক ট্রানজিট পারমিট (টিপি) পাশ হয়। প্রতিটি টিপির বিপরীতে ১০ হাজার টাকা করে ডিএফওর জন্য আদায় করেন সেলিম, এমন অভিযোগও রয়েছে। সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ অফিসের ট্রানজিট পারমিট (টিপি) শাখায় সরকারি কর্মচারীর পরিবর্তে একজন বেসরকারি ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন দায়িত্বে রাখার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থ আদায়ের বাইরে কথিতভাবে রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলকে ঘনফুটপ্রতি পাঁচ টাকা দেওয়ার একটি বিষয় স্থানীয় পর্যায়ে প্রচলিত রয়েছে। লামা বন বিভাগের বিভিন্ন রেঞ্জ, বিট ও চেকস্টেশনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পোস্টিং ও বদলিতেও লাখ লাখ টাকার লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

ডিএফও মোস্তাফিজের বিরুদ্ধে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্টরা বলেন, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন পেতে অর্থ দিতে হয় ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানকে। তবে এ অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে উঠে আসছে।

অভিযোগ রয়েছে, লামা বন বিভাগে ছয়জন আউটসোর্সিং কর্মচারী রয়েছেন। তাদের প্রত্যেককে সরকারিভাবে প্রায় ১৮ হাজার টাকা করে মাসিক বেতন-ভাতা দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারি কাজে ব্যবহার না করে এসব আউটসোর্সিং কর্মচারীকে ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে লামা বন বিভাগের ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলে তার নম্বরে সংযোগ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক সিএফ মিহির কুমার দের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গাড়িতে আছেন বলে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে কল কেটে দেন।

এদিকে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট জোত পারমিট, ট্রানজিট পারমিট, বনায়ন প্রকল্পের বরাদ্দ ও ব্যয়ের নথি, পোস্টিং-বদলির আদেশ, টিপি শাখার রেকর্ড এবং বিভিন্ন চেকস্টেশনের আদায়সংক্রান্ত হিসাব নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং সরকারি অর্থের লুটপাট বন্ধে পুরো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলেও জানিয়েছেন বন-সংশ্লিষ্টরা।




‘ক্যাশিয়ার’ পরিচয়ে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ, শত কোটি টাকার সম্পদের দাবিতে গণপূর্তের কায়কোবাদ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল/মেকানিক্যাল (ই-এম) বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. কায়কোবাদকে ঘিরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আবারও সামনে এসেছে। সহকর্মী প্রকৌশলী ও কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাধর কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কায়কোবাদ ই-এম বিভাগের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে কমিশন বাণিজ্যের একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন। একই সঙ্গে তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারের দাবি, কায়কোবাদকে ভেতরে ভেতরে ‘ক্যাশিয়ার’ নামে ডাকা হয়। তাদের অভিযোগ, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলম, পরে মোহাম্মদ শামীম আখতার এবং বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানের সময়েও তিনি প্রভাবশালী অবস্থানে ছিলেন। ক্ষমতাসীন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ থেকে কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ই-এম বিভাগের বিভিন্ন কাজের বরাদ্দ থেকে কায়কোবাদ ৪ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নিতেন। বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে এই কমিশনের অঙ্ক কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে তারা দাবি করেন। একটি সার্কেলে বছরে বিপুল পরিমাণ সরকারি কাজ হলে তার একটি অংশ কমিশন হিসেবে নেওয়ার মাধ্যমে বড় অঙ্কের অবৈধ আয় করা সম্ভব বলেও অভিযোগকারীরা মনে করেন।

কায়কোবাদের অধীন বা তার নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন ই-এম সার্কেলের কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধেও কাজের অগ্রগতি না থাকা সত্ত্বেও বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে নির্বাহী প্রকৌশলী পবিত্র কুমার দাসের বিরুদ্ধেও কাজ না করে বিল উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে। মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিল বলে জানা যায়।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে শেষ না করেই যদি শতভাগ বিল পরিশোধ করা হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ছাড়াও তদারকির দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা দরকার। তাদের প্রশ্ন, অধীন কর্মকর্তাদের কাজের অগ্রগতি যাচাই ও বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কায়কোবাদের দায়িত্ব কতটুকু ছিল।

কায়কোবাদের সম্পদ নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, সরকারি চাকরি থেকে পাওয়া বৈধ আয়ের সঙ্গে তার জীবনযাপন ও কথিত সম্পদের পরিমাণের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। তার নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের নামে দেশে-বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগে রাজধানীর ইকবাল রোডের ‘এ’ ব্লকের ‘আমেনাস ড্রিম’ ভবনে প্রায় ৭ কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তরায় দুটি, ধানমন্ডিতে একটি এবং বনানীতে দুটি ফ্ল্যাট থাকার দাবিও করা হয়েছে।

পূর্বাচলের আমুলিয়া এলাকায় প্রায় ৪০ কাঠা জমি থাকার অভিযোগও রয়েছে। এর বাইরে ধামরাইয়ে একটি ১০ তলা ভবন এবং কায়কোবাদের নিজ জেলা শেরপুরে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি ও স্থাবর সম্পত্তি থাকার দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবারের ব্যবহারের জন্য নতুন মডেলের একটি টয়োটা এক্সিও গাড়ি থাকার কথাও অভিযোগে এসেছে। গাড়িটি আলআমিন নামে এক চালকের নামে থাকার দাবি করা হয়।

এ ছাড়া আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নামে আরও সম্পদ রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও অর্থের উৎস অনুসন্ধান করা হলে কায়কোবাদের কথিত সম্পদের পরিমাণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

কায়কোবাদের চাকরিজীবনের বিভিন্ন পর্যায় নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের দায়িত্বকালে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে গণপূর্ত ই-এম প্ল্যানিং সার্কেলে কর্মরত ছিলেন। পরে চট্টগ্রাম ই-এম সার্কেলে দায়িত্ব পালন করে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ই-এম সার্কেল-২-এর দায়িত্ব পান।

সহকর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হওয়ার কারণে কায়কোবাদ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। এমনকি তার নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন কাজ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। এ কারণেই দপ্তরের ভেতরে তার ‘ক্যাশিয়ার’ পরিচিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন।

সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধানের কথা থাকলেও তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কায়কোবাদের সম্পদ ও আয় নিয়ে আলাদাভাবে কোনো অনুসন্ধান হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান হলে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এবং একই ধরনের আর্থিক অভিযোগে আলোচিত ব্যক্তিদের ভূমিকাও যাচাই করা প্রয়োজন।

কায়কোবাদকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—তার অধীন বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বিল উত্তোলনে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তিনি তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে কী ভূমিকা পালন করেছেন। কোনো প্রকল্পে কাজের তুলনায় বেশি বিল দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট নথিতে তার অনুমোদন বা সুপারিশ ছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীরা মনে করেন, কায়কোবাদের সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের পাশাপাশি তার দায়িত্ব পালনকালের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোও যাচাই করা দরকার। কোন ঠিকাদার কোন সময়ে কাজ পেয়েছেন, দরপত্রে কারা অংশ নিয়েছেন, কাজের মূল্য কত ছিল, কত টাকা বিল দেওয়া হয়েছে এবং কাজ বাস্তবে কতটুকু হয়েছে—এসব তথ্য পাশাপাশি পর্যালোচনা করলে কমিশন বা অনিয়মের অভিযোগের কোনো ভিত্তি আছে কি না, তা বোঝা সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে তার আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল, ফ্ল্যাটের মালিকানা, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অভিযোগে উল্লেখ করা ইকবাল রোড, উত্তরা, ধানমন্ডি, বনানী, পূর্বাচল, ধামরাই ও শেরপুরের সম্পত্তিগুলোর প্রকৃত মালিকানা যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

অভিযোগকারীদের দাবি, একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয় ও ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে যদি বাস্তব সম্পদের বড় পার্থক্য পাওয়া যায়, তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনকালে তার সিদ্ধান্তে কোনো ঠিকাদার বা প্রতিষ্ঠান বিশেষ সুবিধা পেয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ৪ ও ৫ অক্টোবর মো. কায়কোবাদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হয়। হোয়াটসঅ্যাপেও তার কাছে বার্তা পাঠিয়ে অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য চাওয়া হয়। তবে প্রতিবেদন প্রস্তুত পর্যন্ত তিনি কোনো সাড়া দেননি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

সব মিলিয়ে, মো. কায়কোবাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখনো তদন্তে প্রমাণিত নয়। তবে কমিশন নেওয়া, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, অধীন কর্মকর্তাদের বিলসংক্রান্ত অভিযোগে তদারকির ভূমিকা এবং বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার দাবিগুলো আলাদাভাবে যাচাইয়ের দাবি রাখে।

অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে তার সম্পদ ও আয়ের হিসাব যাচাই এবং দায়িত্ব পালনকালের প্রকল্পগুলোর নথি পর্যালোচনা। সরকারি বেতন-ভাতা ও বৈধ আয়ের সঙ্গে তার নামে-বেনামে থাকা কথিত সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই হলেই প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।




সরকারি জমি দখল ও ২৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, প্রকৌশলী শাহ-আলম ফারুকসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় সরকারি জমি দখলে রাখা এবং ভাড়া বাবদ বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও বর্তমানে বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক চৌধুরীসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ঘটনায় আগ্রাবাদ কনভেনশন হলের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফাহিম আহমেদও আসামি হচ্ছেন।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার, জাল কাগজপত্র তৈরি ও ব্যবহার, সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে দখলে রাখা এবং বকেয়া ভাড়া পরিশোধ না করে সরকারি অর্থের ক্ষতি করার অভিযোগে মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে আত্মসাতের পরিমাণ ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৬৮ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তারা পরস্পরের যোগসাজশে নিজেদের আর্থিকভাবে লাভবান করার পাশাপাশি অন্যদেরও সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সরকারি সম্পত্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি ও রেকর্ডে জালিয়াতির আশ্রয় নেন। এসব নথি ব্যবহার করে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার প্রায় ২৪ দশমিক ৯৬ শতক সরকারি জমি দখলে রাখা হয় বলে দুদকের অভিযোগ।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি জমি ব্যবহারের বিপরীতে যে ভাড়া বা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার কথা ছিল, তা যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়নি। এর ফলে দীর্ঘ সময়ের বকেয়া ভাড়া, সরকারি সম্পত্তির আর্থিক ক্ষতি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট হিসাব মিলিয়ে সরকারের মোট ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৬৮ টাকা ক্ষতি বা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

মামলার অন্যতম আসামি মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক চৌধুরী গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রায় পাঁচ বছর তিনি ওই পদে ছিলেন। দায়িত্ব পালনকালে গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার দেখভালের দায়িত্বও তার অধীনে ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বর্তমানে তিনি বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বে থাকার কথা থাকলেও গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলীর দাবি, তিনি এক বছরের বেশি সময় ধরে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনি কানাডায় অবস্থান করছেন বলেও সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি রয়েছে। তবে বিদেশে অবস্থানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এই প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।

দুদকের অভিযোগে শুধু সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিষয়টিই নয়, নথি জালিয়াতির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা সরকারি জমি ও তার ব্যবহার সংক্রান্ত প্রকৃত তথ্য আড়াল করতে ভুয়া রেকর্ডপত্র তৈরি ও ব্যবহার করেন। এসব নথির মাধ্যমে জমিটি অবৈধভাবে দখলে রাখার সুযোগ তৈরি করা হয় এবং সরকারি পাওনা আদায় বাধাগ্রস্ত করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সরকারি সম্পত্তির মালিকানা ও ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্য বিকৃত হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করছে দুদক। একই সঙ্গে সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও মামলার তদন্তে গুরুত্ব পাবে।

দুদকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারায় এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা করা হবে। এসব ধারার মধ্যে সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির মাধ্যমে বিশ্বাসভঙ্গ ও অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা, মূল্যবান দলিল জাল করা, জাল দলিলকে আসল হিসেবে ব্যবহার এবং অপরাধে সহযোগিতা বা যোগসাজশের মতো অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এখানে ৪০৯ ধারার অভিযোগ মূলত সরকারি দায়িত্ব বা বিশ্বাসের অবস্থান ব্যবহার করে সম্পদ বা অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। ৪২০ ধারায় প্রতারণার বিষয়টি আসে। অন্যদিকে ৪৬৭ ও ৪৬৮ ধারায় গুরুত্বপূর্ণ দলিল জাল করা এবং প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। ৪৭১ ধারায় জাল দলিলকে আসল হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়টি এবং ১০৯ ধারায় অপরাধে সহযোগিতা বা প্ররোচনার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়।

অভিযোগের মূল কেন্দ্র আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার ২৪ দশমিক ৯৬ শতক সরকারি জমি। দুদকের দাবি, ওই জমি অবৈধভাবে দখলে রাখার পাশাপাশি নির্ধারিত ভাড়া বা সরকারি পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। পরবর্তীতে জাল ও ভুয়া নথির মাধ্যমে দখল ও ব্যবহারকে বৈধ দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

দুদকের মামলার অনুমোদনের পর এখন তদন্তের মাধ্যমে এসব অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা হবে। জমিটির প্রকৃত মালিকানা, কীভাবে দখল নেওয়া হয়েছিল, কোন সময় থেকে সরকারি ভাড়া বকেয়া ছিল, কারা নথি তৈরি বা অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সরকারি কর্মকর্তার ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে—এসব বিষয় তদন্তে উঠে আসতে পারে।

একই সঙ্গে ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৬৮ টাকা কীভাবে হিসাব করা হয়েছে এবং এই অর্থের সঙ্গে আসামিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা কতটুকু, সেটিও তদন্তের বিষয় হবে। সরকারি নথি, জমির রেকর্ড, ভাড়া সংক্রান্ত হিসাব, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ফাইল এবং অন্যান্য আর্থিক কাগজপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে অর্থের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।

মামলার অনুমোদনের বিষয়টি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক চৌধুরীর কর্মস্থলে অনুপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তিনি বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন এবং দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অনুমোদন বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল কি না, সেটিও আলাদাভাবে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

তবে মামলার অনুমোদন মানেই অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। দুদকের তদন্ত, মামলা এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই হবে। আসামিরাও আদালতে নিজেদের বক্তব্য ও প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন।

এখন দুদকের তদন্তে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্ব পাবে—সরকারি ২৪ দশমিক ৯৬ শতক জমি কীভাবে দখলে রাখা হয়েছিল, জমির বিপরীতে সরকারি পাওনা কেন পরিশোধ করা হয়নি এবং জাল নথি তৈরির সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক চৌধুরী তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন কি না, সেটিও তদন্তে নির্ধারণ করা হবে।

সব মিলিয়ে, আগ্রাবাদ কনভেনশন হলকে ঘিরে সরকারি জমি ব্যবহার, ভাড়া বকেয়া এবং নথি জালিয়াতির অভিযোগ এখন দুদকের মামলার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক তদন্তের পর্যায়ে যাচ্ছে। ২৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকার বেশি অর্থের এই অভিযোগের প্রকৃত চিত্র তদন্ত শেষ হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে।




কমলাপুর কাস্টম হাউসে মঈনুল-সুমি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ, ১১ মাসে ৫১ হাজার টন শিট খালাস নিয়ে প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরে পণ্য খালাস ও রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়াকে ঘিরে প্রভাবশালী একটি চক্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মঈনুল হোসেন এবং কাস্টম হাউসের সাবেক আনস্টাফিং কর্মকর্তা, বর্তমানে উপকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খাদিজা পারভীন সুমি। অভিযোগকারীদের দাবি, কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার, পদায়ন ও বদলি নিয়ে চাপ সৃষ্টি এবং ঘোষণার ভিত্তিতে পণ্য খালাসের সুযোগ তৈরি করে চক্রটি বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির সুবিধা নিয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট নথি, চালান, মূল্যায়ন ও খালাস-সংক্রান্ত রেকর্ড পর্যালোচনা এবং অভিযুক্তদের বক্তব্যের ভিত্তিতেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাসিন্দা মঈনুল হোসেন কাস্টমস-সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে যুক্ত হন ‘কাস্টমস সরকার’ হিসেবে। পরে অন্যের লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায় যুক্ত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালে কমলাপুর কাস্টম হাউসে শিট খালাসের কাজ শুরু করার পর তার ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

বর্তমানে ‘পারভীন ট্রেডার্স’ ও ‘মা অ্যাসোসিয়েট’ নামের দুটি সিঅ্যান্ডএফ লাইসেন্সের মাধ্যমে শিট আমদানির বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগকারীদের দাবি, ব্যবসায়িক প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করে মঈনুল তার পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা আদায় করেছেন।

১১ মাসে প্রায় ৫১ হাজার টন শিট খালাসের দাবি

অনুসন্ধানে পাওয়া নথির বরাতে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, খাদিজা পারভীন সুমি আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বে থাকা প্রায় ১১ মাসে মঈনুল হোসেনের পারভীন ট্রেডার্স থেকে প্রায় ৫১ হাজার টন শিট খালাস হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ হাজার টন ছিল তুলনামূলক কম শুল্কের এইচআর ও সিআর শিট বলে দাবি করা হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, কিছু চালানে ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে বাস্তবে আমদানি করা পণ্যের মিল ছিল না। বিশেষ করে উচ্চ শুল্কের পণ্যকে কম শুল্কের পণ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন।

তাদের আরও অভিযোগ, এসব চালানের ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী কায়িক পরীক্ষা না হওয়ায় প্রকৃত পণ্য ও ঘোষিত পণ্যের পার্থক্য শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়নি। এতে প্রতি টনে কয়েক হাজার টাকা করে রাজস্ব ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

তবে মোট রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ কত, তা নির্ধারণে প্রতিটি চালানের বিল অব এন্ট্রি, ঘোষণাপত্র, পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, মূল্যায়ন ও শুল্ক পরিশোধের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময় মঈনুলের কোনো চালানই যথাযথভাবে খুলে পরীক্ষা করা হয়নি। তার পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া তদারকিতে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা কামরুল ও শাহ আলম ভূমিকা রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নতুন কর্মকর্তা আসতেই ধরা পড়ে সাত চালান

পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে খাদিজা পারভীন সুমিকে আনস্টাফিং দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ৪০ ব্যাচের সহকারী কমিশনার আসিফ আহমেদ অনিককে দায়িত্ব দেওয়ার পর—এমন দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর।

নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঈনুল হোসেনের পারভীন ট্রেডার্সের কয়েকটি চালানে তল্লাশি চালান বলে জানা গেছে। সূত্রগুলোর দাবি, সাতটি চালানে ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পরে কমিশনারের মাধ্যমে এসব ঘটনায় প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এই ঘটনাকে ঘিরেই প্রশ্ন উঠেছে, একই ধরনের চালান এর আগে কীভাবে নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার বাইরে থেকে খালাস হয়েছে।

বদলির চাপের অভিযোগ

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের দাবি করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সহকারী কমিশনার দায়িত্ব নেওয়ার পর কম শুল্কের এইচআর ও সিআর শিটের খালাস উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। একই সময়ে উচ্চ শুল্কের জিপি শিট হিসেবে খালাসের হার বেড়ে প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছায় বলে দাবি করা হচ্ছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নিয়ম মেনে কাজ শুরু করার এক সপ্তাহের মধ্যেই ওই কর্মকর্তাকে আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে সেখানে ৪১ ব্যাচের আরেক কর্মকর্তা সামিয়া তাইছিরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এই বদলিকে ঘিরে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, অনিয়ম শনাক্ত করার পরই যদি কোনো কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে কাস্টমসের আইন প্রয়োগ ও রাজস্ব সুরক্ষার কার্যক্রম কতটা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রশাসনিক প্রভাবের অভিযোগ

এনবিআর-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগ রয়েছে, খাদিজা পারভীন সুমির স্বামী প্রশাসন ক্যাডারের ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তা। অভিযোগকারীদের দাবি, এই প্রশাসনিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে সুমি কাস্টমসের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন।

আনস্টাফিংয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও শিটের ‘অ্যাসেসমেন্ট গ্রুপ’-সংক্রান্ত দায়িত্বে তার প্রভাব এখনও রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে কোনো কর্মকর্তার স্বামী বা পরিবারের সদস্যের সরকারি পদমর্যাদা নিজেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। অভিযোগটি যাচাই করতে হলে পদায়ন, দায়িত্ব বণ্টন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট চালানের নথিপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ছুটির দিনে ৮২০ টন শিট খালাসের অভিযোগ

কমলাপুর কাস্টম হাউসের কার্যক্রম নিয়ে আরও কিছু প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, শুল্ক ফাঁকি নিয়ে কাজ করায় সিআইসির এক উপপরিচালককে কুমিল্লায় বদলি করা হয়েছিল। তবে এ সংক্রান্ত কোনো আদেশ বা নথি প্রকাশ্যে না থাকায় বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া সাবেক এক কমিশনারের বিদায়ের পর সরকারি ছুটির দিনে মাত্র দুই ঘণ্টায় প্রায় ৮২০ টন শিট খালাসের অভিযোগও উঠেছে। এত বিপুল পরিমাণ পণ্য অল্প সময়ে কীভাবে খালাস হলো, ওই সময়ে দায়িত্বে কারা ছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট চালানগুলোতে কী ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নথিপত্র পর্যালোচনা জরুরি।

রাজস্ব সুরক্ষায় জবাবদিহি জরুরি

কাস্টম হাউস আইসিডি কমলাপুরে যদি ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও নিয়মিতভাবে চালান খালাস হয়ে থাকে, তাহলে এর সঙ্গে শুধু কোনো সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট নয়, সংশ্লিষ্ট পুরো প্রক্রিয়ার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

বিশেষ করে ১১ মাসে প্রায় ৫১ হাজার টন পণ্য খালাসের দাবি, সাতটি চালানে ঘোষণার অসঙ্গতি শনাক্ত হওয়ার পর প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়গুলো পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

একই সঙ্গে প্রতিটি চালানের বিল অব এন্ট্রি, পণ্য পরীক্ষার রেকর্ড, অ্যাসেসমেন্ট নথি, শুল্ক পরিশোধের হিসাব, আনস্টাফিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত এবং বদলি-পদায়নের আদেশ পর্যালোচনা করা হলে অভিযোগগুলোর ভিত্তি যাচাই করা সম্ভব হবে।

অভিযোগের বিষয়ে মঈনুল হোসেন, খাদিজা পারভীন সুমি এবং সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু রাজস্ব ক্ষতির বিষয় নয়, বরং কাস্টমসের পণ্য খালাস ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার ওপরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে।




ট্রাইব্যুনালে পদোন্নতির বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ, এর মধ্যেই গণপূর্তে ‘পদোন্নতি বাণিজ্যের’ অভিযোগ: দেড় কোটি টাকার দাবিতে ৭৫ লাখ অগ্রিম নেওয়ার দাবি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম (ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল) বিভাগে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব ও পদোন্নতি ঘিরে এবার উঠেছে দেড় কোটি টাকার কথিত উৎকোচ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ।অভিযোগের তীর গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান বিপ্লবের দিকে। সংশ্লিষ্ট দুটি পৃথক সূত্রের দাবি, পদোন্নতির সুপারিশ ও প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে কথিত ভাবে ৭৫ লাখ টাকা অগ্রিম নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদন, প্রশাসনিক জটিলতা ও মামলার কারণে বিলম্বিত হওয়ায় ওই টাকা ফেরত চাইলে তা ফেরত দিতে গড়িমসি করা হচ্ছে বলেও সূত্রগুলোর দাবি।

অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে এ কারণে যে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে পদোন্নতি/চলতি দায়িত্বের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-১ ইতোমধ্যে কারণ দর্শানোর আদেশ দিয়েছেন। ৩১ আগস্ট ২০২৬-এর আদেশে ট্রাইব্যুনাল গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর ৩ মার্চ ২০২৬-এর সেই স্মারককে চ্যালেঞ্জ করা মামলাটি প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করে সংশ্লিষ্টদের কারণ দর্শাতে বলেছেন। প্রশ্ন উঠেছে—যে পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্বের বৈধতা নিয়েই আদালতে মামলা বিচারাধীন, সেই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে যদি অর্থ লেনদেনের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে কারা এই প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছেন এবং সরকারি দপ্তরের নথিপত্র কীভাবে এগোচ্ছে ?

১৪ বছরের জটিলতা, এবার ঘুষের অভিযোগ : গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের জটিলতা চলছে প্রায় ১৪ বছর ধরে। ২০১১ সালে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) পদে নিয়োগ পাওয়া ১১ কর্মকর্তাকে ঘিরে এই বিরোধের সূত্রপাত। ২০১২ সালে তারা যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তাদের নিয়োগের বৈধতা ও ক্যাডার মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।

বিতর্কের মূল জায়গা হলো—২০১১ সালের নিয়োগটি কোন কাঠামোর অধীনে হয়েছিল এবং ওই কর্মকর্তারা পরবর্তী সময়ে বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের উচ্চতর পদে পদোন্নতির জন্য কোন বিধি অনুসরণ করবেন।

২৭তম, ২৮তম ও ৩০তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা নন-ক্যাডার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং তাদের অনেকেই সিনিয়র স্কেল পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করেই ক্যাডারের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দাবি, পিএসসির মাধ্যমে তাদের নিয়োগ হয়েছে এবং পিএসসি, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বিভিন্ন চিঠিতে তাদের নিয়োগকে ক্যাডার পদে নিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তারা নিজেদের ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করছেন।

ট্রাইব্যুনালের আদেশে সরাসরি প্রশ্ন তোলা হয়েছে ৩ মার্চের স্মারক নিয়ে এই বিরোধের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল-১-এর এ.টি. মামলা নং ২৭৯/২০২৬। মামলার বাদী মো. আবদুল হালিমসহ ১০ জন এবং বিবাদী গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা।

৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সদস্য মো. আমিরুল ইসলাম মামলাটি প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করে সংশ্লিষ্টদের ওপর নোটিশ জারি করেন। আদেশে বলা হয়, বাদীরা গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর ৩ মার্চ ২০২৬-এর স্মারক নং ২৫.০৩৬.০০০০.২১৫.১২.১০৭.১৮-৩৫২-এর বৈধতা ও যৌক্তিকতা চ্যালেঞ্জ করেছেন।

ওই স্মারকে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মত দেওয়া হয়েছিল যে, সরাসরি গ্রেড-৬ উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পদোন্নতির জন্য পরীক্ষা) বিধিমালা, ২০১৭ প্রযোজ্য নয় এবং তাদের গ্রেড-৪ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছিল। ট্রাইব্যুনাল এই সিদ্ধান্তের পরিণতিতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি বা চলতি দায়িত্ব দেওয়ার পদক্ষেপগুলো কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা ২০ দিনের মধ্যে জানাতে সংশ্লিষ্টদের কারণ দর্শাতে বলেছেন। মামলার পরবর্তী সার্ভিস রিটার্নের তারিখ নির্ধারিত হয়েছে ১৭ নভেম্বর ২০২৬। অর্থাৎ, বিষয়টি এখন নিছক প্রশাসনিক মতপার্থক্য নয়; এর আইনগত বৈধতা নিয়ে বিচারিক কার্যক্রমও চলমান।

সেই অবস্থাতেই তিন প্রকৌশলীকে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব : এর মধ্যেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখা-১ থেকে ২৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে সচিব, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব পাঠানো হয়।

স্মারক নং ২৫.৩৬.০০০০.২১৫.১২.১০৭.১৮-১৩৫৭-এ বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম)-এর মঞ্জুরিকৃত পদ রিজার্ভসহ ১১টি। বর্তমানে সাতজন নিয়মিত কর্মকর্তা কর্মরত এবং বিভিন্ন কারণে চারটি পদ শূন্য হয়েছে। এর মধ্যে একটি পদে পদোন্নতির প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানোয় মাঠ পর্যায়ে আরও তিনটি পদ শূন্য রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। সরকারি কাজের স্বার্থে ওই তিনটি পদ জরুরি ভিত্তিতে পূরণের কথা বলে তিনজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। প্রস্তাবিত তিন কর্মকর্তা হলেন— মো. জিয়াউর রহমান—নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম), গণপূর্ত ই/এম ডিজাইন বিভাগ-১, ঢাকা; প্রস্তাবিত পদায়ন ঢাকা গণপূর্ত ই/এম সার্কেল-২। মো. জাহাঙ্গীর আলম—নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম), রিজার্ভ, সংযুক্ত গণপূর্ত ই/এম কাঠের কারখানা বিভাগ; প্রস্তাবিত পদায়ন চট্টগ্রাম গণপূর্ত ই/এম সার্কেল।

তাসফিন মুহাইমীন হক—নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম), গণপূর্ত ই/এম প্ল্যানিং বিভাগ-৩; প্রস্তাবিত পদায়ন রাজশাহী গণপূর্ত ই/এম সার্কেল। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন/সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান।

অভিযোগ,‘পদোন্নতি প্যাকেজে’ দেড় কোটি টাকা !
এখন অভিযোগ উঠেছে, এই পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্বের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দেড় কোটি টাকার একটি ‘পদোন্নতি প্যাকেজ’ তৈরি হয়েছিল। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুটি পৃথক সূত্রের দাবি, এই কথিত লেনদেনের অংশ হিসেবে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে ৭৫ লাখ টাকা অগ্রিম নেওয়া হয়েছিল।

সূত্রগুলোর দাবি, পদোন্নতির বিষয়টি দ্রুত এগিয়ে না যাওয়ায় এবং একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি বিলম্বিত হওয়ায় জাহাঙ্গীর আলম ওই টাকা ফেরত চান। কিন্তু সারওয়ার জাহান বিপ্লব টাকা ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যদি অভিযোগটি সত্য না হয়, তাহলে ৭৫ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়ার অভিযোগের ভিত্তি কী ? আর যদি অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে, তাহলে সেটি কীসের বিনিময়ে এবং কার মাধ্যমে ?

অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সারওয়ার জাহান বিপ্লবের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তার নীরবতা অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণ করে না; তবে এত বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না আসায় প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

বিধির ব্যাখ্যা নিয়ে দুই পক্ষ মুখোমুখি : ২৭তম, ২৮তম ও ৩০তম বিসিএসের কর্মকর্তাদের দাবি, একই ক্যাডারের উচ্চতর পদে যেতে হলে সংশ্লিষ্ট বিধিমালার যোগ্যতা সবার ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য হতে হবে।

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পদোন্নতির জন্য পরীক্ষা) বিধিমালা, ২০১৭-এর বিধি ৮(২) অনুযায়ী গ্রেড-৫-এর ঊর্ধ্বতন পদে যাওয়ার প্রশ্নে আইনগত বাধা রয়েছে।

তাদের আরও দাবি, একই পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে একদল কর্মকর্তার জন্য একটি যোগ্যতার মানদণ্ড এবং অন্য দলের জন্য ভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণের সুযোগ নেই।

অন্যদিকে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের নিয়োগ পিএসসির মাধ্যমে হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো তাদের ক্যাডার কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করেছে। ফলে তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে নন-ক্যাডার কর্মকর্তার বিধি প্রয়োগের প্রশ্নই ওঠে না। এই দুই অবস্থানের চূড়ান্ত আইনগত নিষ্পত্তি এখন আদালতের বিষয়। জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরেও আলাদা তদন্ত : নথিপত্রে দেখা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগের তদন্তও চলমান।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা অধিশাখার ২০২৬ সালের একটি চিঠিতে বলা হয়, স্বাধীন বাংলা পত্রিকায় প্রকাশিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য গঠিত কমিটির সভা ৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

তদন্ত কমিটিতে ছিলেন রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদিউল আলম এবং গণপূর্ত ই/এম ডিজাইন বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী অজান্তা শুক্লা তন্মা। অর্থাৎ, একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে যখন পৃথক তদন্ত কার্যক্রমের নথি রয়েছে, তখন তাকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব বা পদোন্নতির বিবেচনায় নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও বেশি স্বচ্ছতা ও সতর্কতা দেখানো প্রয়োজন—এমন প্রশ্নই উঠছে।

পিডব্লিউডির নথিতেই সরোয়ার জাহানের ভূমিকা :
এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরোয়ার জাহান বিপ্লবের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের কারণ শুধু অভিযোগ নয়; তিন নির্বাহী প্রকৌশলীকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবের নথিতে তার স্বাক্ষর রয়েছে। অর্থাৎ, যাকে ঘিরে এখন পদোন্নতি প্যাকেজের কথিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে, সেই কর্মকর্তাই সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন—নথি অন্তত সেটিই দেখাচ্ছে।

প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের শোকজের পরও প্রশ্ন : আরও গুরুতর বিষয় হলো, ৩১ আগস্ট ২০২৬-এর ট্রাইব্যুনালের আদেশে সংশ্লিষ্ট পদোন্নতি/চলতি দায়িত্বের আইনগত বৈধতা নিয়ে সরাসরি কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৮০ অনুযায়ী সরকারি চাকরির শর্ত ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার রয়েছে। তাই এখন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের সামনে দুটি আলাদা প্রশ্ন— এক. যে নিয়োগ ও পদোন্নতি কাঠামো নিয়ে ১৪ বছর ধরে বিরোধ চলছে, তার আইনগত অবস্থান কী ? দুই. বিষয়টি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট পদে চলতি দায়িত্ব বা পদোন্নতির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সতর্কতা কতটা মানা হয়েছে ? এর সঙ্গে যদি দেড় কোটি টাকার কথিত উৎকোচ এবং ৭৫ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়ার অভিযোগ সত্যতার ভিত্তি পায়, তাহলে বিষয়টি আর কেবল পদোন্নতি-সংক্রান্ত প্রশাসনিক বিরোধ থাকবে না; তা দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগে পরিণত হতে পারে।

জাহাঙ্গীরের বক্তব্য : ‘পিএসসি নিয়োগ দিয়েছে’
২০১১ সালে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া এবং বর্তমানে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত মো. জিয়াউর রহমান, মো. জাহাঙ্গীর আলম ও সমীরণ মিস্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেছেন, তাদের পিএসসি নিয়োগ দিয়েছে এবং তারা বিসিএস ক্যাডার প্রকৌশলী হিসেবেই নিয়োগ পেয়েছেন।

অন্যদিকে বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোর্শেদ ইকবাল বলেছেন, সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা নন-ক্যাডার এবং সিনিয়র স্কেল পরীক্ষা ছাড়া তারা পদোন্নতির চেষ্টা করছেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিষয়টি জটিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিসিএস (গণপূর্ত) নামে স্বতন্ত্র ক্যাডার থাকা অবস্থায় নিয়মিত বিসিএস প্রক্রিয়ার বাইরে শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে এক ধাপ ওপরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়ার যৌক্তিকতা এবং পরবর্তী পদোন্নতির যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

প্রধান প্রকৌশলীর নীরবতা, সংস্থাপন শাখার ‘কোনো মন্তব্য নেই’ : অভিযোগের বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মুহাম্মদ সারওয়ার জাহান বিপ্লব এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—দেড় কোটি টাকার কথিত পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিযোগ কি কেবল অভ্যন্তরীণ গুঞ্জন, নাকি এর পেছনে বাস্তব কোনো অর্থ লেনদেনের তথ্য রয়েছে ?

মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রী–সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ : গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের প্রতি সংশ্লিষ্টদের দাবি—বিষয়টি আর ফাইল চালাচালির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা হোক।

বিশেষ করে— ৭৫ লাখ টাকা অগ্রিম নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা যাচাই, দেড় কোটি টাকার পদোন্নতি প্যাকেজের অভিযোগের উৎস অনুসন্ধান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব ও বৈধ আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা পরীক্ষা।

৩ মার্চ ২০২৬-এর স্মারকের আইনগত ভিত্তি যাচাই;
২৬ অক্টোবর ২০২৫-এর চলতি দায়িত্ব প্রদানের প্রস্তাবের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া পরীক্ষা;
২৭তম, ২৮তম ও ৩০তম বিসিএস কর্মকর্তাদের যোগ্যতা এবং সরাসরি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তদের আইনগত মর্যাদা নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ;
মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা;

এবং প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের বিচারাধীন বিষয় নিষ্পত্তির আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বা চলতি দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত সীমা স্পষ্ট করা— এসব বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। কারণ, একদিকে পদ শূন্য রেখে সরকারি কাজ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে পদোন্নতির বৈধতা নিয়ে আদালতে মামলা এবং তার মধ্যেই কোটি টাকার কথিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে চলতে পারে না।

১৪ বছর ধরে চলা ক্যাডার-নন-ক্যাডার বিরোধের নিষ্পত্তি না করে যদি পদোন্নতির ফাইলকে কেন্দ্র করে নতুন করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তৈরি হয়, তাহলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষেরও।

এখন দেখার বিষয়—গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অভিযোগটি তদন্ত করে প্রকৃত সত্য বের করবে, নাকি বছরের পর বছর ধরে চলা ফাইল, মামলা ও প্রশাসনিক জটিলতার আড়ালেই থেকে যাবে কথিত ‘পদোন্নতি প্যাকেজ’-এর রহস্য।

আইনগত সতর্কতা: প্রতিবেদনে “দেড় কোটি টাকা”, “৭৫ লাখ টাকা অগ্রিম” এবং টাকা ফেরত না দেওয়ার বিষয়গুলোকে আমি সূত্রের অভিযোগ হিসেবে রেখেছি। এগুলোকে প্রমাণিত দুর্নীতি হিসেবে লেখা হয়নি। একইভাবে “অবৈধ পদোন্নতি”র বদলে যেখানে প্রয়োজন “অভিযোগকৃত/বিতর্কিত পদোন্নতি” বলা নিরাপদ, কারণ ট্রাইব্যুনালের মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো হয়নি। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার মূলত সরকারি চাকরির শর্ত ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে।