গজারিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আখি সরকার: ক্ষমতা, প্রভাব আর বিতর্কের এক লুকানো অধ্যায়

এসএম বদরুল আলমঃ গজারিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক খাদিজা আক্তার আখি সরকার আবারও আলোচনায়। নিষিদ্ধ ঘোষণা করা আওয়ামী লীগকে পুনরায় সুসংগঠিত করার চেষ্টার অভিযোগে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে—নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া এলাকায় তাঁর কর্মস্থল যমুনা ব্যাংকের অফিস থেকেই তিনি নিয়মিত সাংগঠনিক কাজ পরিচালনা করছেন, যেখানে প্রতিনিয়ত গজারিয়ার বিভিন্ন নেতা-কর্মীদের যাতায়াত লক্ষ্য করা যায়।

আখি সরকারের সঙ্গে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলেও স্থানীয়ভাবে আলোচনা চলছে। দলীয় প্রতীকে তিনি গজারিয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ক্ষমতার শীর্ষে থাকা সময়ে তিনি নিজের একটি সন্ত্রাসী বাহিনীও গড়ে তুলেছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেই সময় উপজেলা পরিষদ নিতান্তই তাঁর একক নিয়ন্ত্রণে ছিল।

অভিযোগ রয়েছে, টি.আর., কাবিখা, বিভিন্ন টেন্ডার—সবকিছুই তাঁর নির্দেশেই পরিচালিত হতো। বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে কোটি কোটি টাকার চাঁদা আদায়ের অভিযোগ আছে তাঁর বিরুদ্ধে। এক সময় সাধারণ অবস্থায় থাকা আখি সরকার ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে রাতারাতি কোটি টাকার মালিক হয়ে ওঠেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।

গজারিয়ার সবচেয়ে বড় বাজার ভবেরচর বাজারটিও ছিল তাঁর পরিবারের চাঁদাবাজির দখলে। তাঁর ভাই-বোন এবং বাবা আয়নাল মিলেই নাকি ওই বাজারকে চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিলেন। শুধু বাজার নয়—সুপারবোর্ড, পলিক্যাবেলস, বসুন্ধরা গ্রুপসহ এলাকার বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও তাঁর সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বালুমহল থেকেও নিয়মিত মাসোহারা নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান পদ ব্যবহার করে তিনি যমুনা ব্যাংকে চাকরিও নিশ্চিত করেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গজারিয়া উপজেলার অসংখ্য আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু আখি সরকার সেই সময়েও বহাল তবিয়তে থাকেন। অভিযোগ আছে, তিনি উপরমহলের একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে ম্যানেজ করে নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করেছিলেন।

প্রায় বছরখানেক নীরব থাকার পর সম্প্রতি আবারও তাঁকে সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয় অনেক নেতা অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগকে পুনরায় সংগঠিত করার চেষ্টায় নেমেছেন আখি সরকার।

গজারিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দীর্ঘদিনের ক্ষমতার ছায়ায় থাকা আখি সরকারের এই নতুন কর্মকাণ্ডের পেছনে আসল লক্ষ্য কী? তদন্ত না হলে এসব অভিযোগের সত্যতা হয়তো জানা যাবে না, তবে স্থানীয়দের উদ্বেগ দিনদিন বাড়ছে।




গণপূর্ত অধিদপ্তরে অস্থিরতা: প্রধান প্রকৌশলীর চারপাশে বাড়ছে চাপ, বদরুল আলমের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাম্প্রতিক সময়ে অস্বস্তি ও অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী নাকি ধীরে ধীরে আটকা পড়ছেন সাভার গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের প্রভাবের মধ্যে। বিদেশে উচ্চশিক্ষা, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও স্বচ্ছ পেশাগত ভাবমূর্তি থাকায় খালেকুজ্জামানকে যারা বিভাগের জন্য আশার আলো ভেবেছিলেন, কয়েক মাসের মাথায় তারা এখন হতাশ।

অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, বদরুল আলম খান সাবেক সরকারের ঘনিষ্ঠ বলয়ের অংশ ছিলেন। ভোলা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ঢাকার নানা ঠিকাদারি কার্যক্রমে তিনি দাপটের সঙ্গে প্রভাব বিস্তার করতেন। তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ওবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর এলাকার লোক হওয়ায় নিয়োগ, বদলি ও টেন্ডারসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাঁর অবস্থান ছিল প্রভাবশালী। ভোলায় নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে—যা তাঁকে আরও বেপরোয়া করে তোলে বলে সহকর্মীদের অভিযোগ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলে গেলে বদরুলও নাকি দ্রুত নিজের অবস্থান পাল্টান। সূত্র জানায়, তিনি নিজেকে নতুন সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বর্তমান সচিব মো. নজরুল ইসলামের নিকটমহলে প্রবেশ করেন। এই পরিচয়ের জোরেই আবারও গণপূর্ত অধিদপ্তরে তাঁর অদৃশ্য প্রভাব অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে।

২৮ অক্টোবর মো. খালেকুজ্জামান প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক পরদিন থেকেই বদরুলের প্রভাব নিয়ে অভিযোগ উঠতে শুরু করে। হঠাৎ করে চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারকে সরিয়ে নতুন দায়িত্ব দেওয়ার পর বহু কর্মকর্তা বলেন—বদরুল নিয়োগ, বদলি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সরাসরি চাপ দিচ্ছেন এবং নতুন প্রধান প্রকৌশলী এই চাপের কাছে নরম হয়ে পড়ছেন।

অনেকের মতে, দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকার কারণে খালেকুজ্জামান অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। আর সেই সুযোগেই বদরুল তাঁর চারপাশে প্রভাবের বলয় গড়ে ফেলেছেন।

বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। ভোলা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লার ঠিকাদারদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্কে ঢাকার কয়েকজন বিএনপি–জামাতপন্থী ঠিকাদারও যুক্ত আছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা জানান, অনেক ক্ষেত্রেই পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পেতে চাপ প্রয়োগ করা হয়।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা কুমিল্লার ইএম টেন্ডার। অভিযোগ রয়েছে—একজন ভুয়া সার্টিফিকেটধারী ঠিকাদারকে কাজ দিতে বদরুল MIS সেল ও স্থানীয় প্রকৌশলীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। পরে কর্তৃপক্ষকে তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হতে হয়।

মিরপুর ডিভিশনেও ‘আসিফ’ নামের এক ঠিকাদারকে বিভিন্ন থানার ভবন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভাষানটেক থানার নতুন ভবন—পুলিশের ১০৭ থানা প্রকল্পের অংশ—পছন্দের ঠিকাদারকে দিতে বদরুলের জোরাজুরির কথাও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এমনকি আরবরিকালচার বিভাগের কাজও নিয়ম ভেঙে মিরপুর ডিভিশনের মাধ্যমে টেন্ডার করানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বদরুল আলম খান ও তাঁর ভাইদের মাধ্যমে প্রায় দুই দশক ধরে ডেভেলপার ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে। এক কর্মকর্তা বলেন, “বাইরের এসব ব্যবসা তদন্ত করলে পুরো চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।”

বদরুল আলম খান অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য—এগুলো সবই অপপ্রচার, তাঁকে প্রধান প্রকৌশলীর কাছ থেকে দূরে সরাতেই এসব প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, কোনো সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন না, বেআইনি চাপ প্রয়োগও করেননি; যদি কেউ তা মনে করেন, তবে সেটি “ভুল ব্যাখ্যা”।

অন্যদিকে অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তা বলছেন, বর্তমানে নিয়োগ-বদলি এককেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে, প্রশাসনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং কর্মকর্তারা চাপের মধ্যে কাজ করছেন। এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “প্রধান প্রকৌশলী ভালো মানুষ, কিন্তু তিনি পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছেন না। পুরো সিস্টেমটাই যেন এখন অঘোষিত এক শক্তির কাছে বন্দি।”

যারা নতুন নেতৃত্বে বিভাগটির পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিলেন, তারা এখন বলছেন—সিন্ডিকেট, টেন্ডারবাজি আর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পুরো বিভাগ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তে প্রমাণ হবে কি না সেটি ভবিষ্যৎই বলে দেবে, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন মোহাম্মদ বদরুল আলম খান।




৬৫০০ কোটি টাকার জলবায়ু‑সহনশীল প্রকল্পে পিডি মো. এনামুল কবিরকে ঘিরে জমেছে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার আর অর্থ লোপাটের অভিযোগ।

এসএম বদরুল আলমঃ এই মুহূর্তে আলোচনায় রয়েছে ৬,৫০০ কোটি টাকার জলবায়ু সহনীয়তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ক্ষুদ্র পানি সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক (পিডি) মো. এনামুল কবির দীর্ঘ সময় ধরেই ব্যক্তিগতভাবেই এই প্রকল্পকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। প্রায় ৫০০ জন আউটসোর্সিং কর্মী ও কনসালট্যান্ট নিয়োগ, বিলাসবহুল অফিস, ভুয়া বিল — সবকিছু মিলিয়ে এই প্রকল্প এক ধরনের “ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য”তে পরিণত হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়োগের জন্য যারা নেয়া হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই এনামুল কবিরের আত্মীয়-স্বজন বা ঘনিষ্ঠ। প্রতিটি পদে নিয়োগের সময় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া গেছে। একাধিক স্বজন–নিয়োগ, প্রতিযোগিতা ছাড়াই কাজ পাওয়ার ঘটনা, মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে — প্রশ্ন, এই টাকা কোথা থেকে এল?

অধিক উদ্বেগজনক হলো — অফিসের দৃষ্টিকোণ থেকে। অফিসকে সাজানো হয়েছে রাজকীয় স্টাইলে; বিলাসবহুল ফার্নিচার, প্রিপেইড বিল, ডেকোরেশনের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ, কিন্তু সংশ্লিষ্ট কোনো নথি জনসমক্ষে দেখা যায় না। বিল দেখানোর প্রয়োজন হলে ভুয়া বিল বা ভাউচার দেখানো হয় বলে অভিযোগ।

এলজিইডির নিজস্ব বড় ভবন থাকা সত্ত্বেও কেন নতুন অফিস ভাড়া নেওয়া হয়েছে — সেটাও প্রশ্নের মুখে। ভাড়া নেওয়া হয়েছে রাজধানীর শেওড়াপাড়ায়, আগোরা ভবনে, যা “কমার্শিয়াল স্পেস” হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু অফিস ভাড়া ও পরিচালনার জন্য কেন অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সব সাজানো হয়েছে — তারও সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি এনামুল বা সংশ্লিষ্ট কেউ।

তবে অভিযোগ শুধু অর্থ লোপাট এবং স্বজন চিনে চাকরি দানে সীমাবদ্ধ নয়। বলা হচ্ছে, এনামুল কবিরের বড় ভাইয়ের নামে করা হয়েছে অর্থ লেনদেন। দুই ভাই মিলে কিনেছেন শত শত বিঘা জমি; গ্রামের বাড়ি থেকে শুরু করে নতুন করে তৈরি হয়েছে রাজকীয় একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি। এমন ভাবা হচ্ছে, স্বাভাবিক বেতনের চেয়ে অনেক গুণ বেশি সম্পদ গড়েছেন তারা — কিন্তু তার উৎস কি?

অফিজিয়াল অভিযোগ হলো, অফিস পরিচালনায় নিয়োজিত রয়েছে পিএল এমন এক ব্যক্তি, ফরিদ — যিনি প্রকল্প বা সরকারের কোনো অফিসার নন। তারপরও অফিস ব্যবস্থাপনা, কেনাকাটা, রক্ষণাবেক্ষণ — সব দায়িত্ব তার হাতে। সন্ধ্যার পর অফিসে অতিথি, রাতভর আড্ডা; পৃথক একটি কক্ষ রয়েছে তার জন্য। এমনকি বেশ কিছু দিন হয়, সমাজের সচেতন মানুষ বা সাংবাদিকরা চেষ্টা করে অফিসে যাওয়ার — কিন্তু হয় না। অফিসে আছে তিন স্তরের নিরাপত্তা ফটক, এবং প্রবেশাধিকার পাওয়া যায় শুধুই এনামুল কবিরের অনুমতিতে। নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণ এমন — “মাস্তানসুলভ” — যে, কোনো সাংবাদিক বা সাধারণ মানুষ সেখানে যাওয়ার সাহস পান না। অনেকেই বলছেন, প্রকল্প অফিসে ঢুকতে পারা এমন যেন কোনো মন্ত্রণালয়ের সচিব বা মন্ত্রীর অফিসে ঢোকার সমান ঝামেলার।

এই অভিযোগগুলো শুধু গঞ্জন নয়। ২৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে, মোহাম্মদ শামীম বেপারী স্বাক্ষরিত চিঠি (নং ৪৬.০০.০০০০.০৬৮.৯৯.০৭১.২৪‑১০৮৭) জারির মাধ্যমে ৩ দিনের মধ্যে তথ্য প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, বিষয়টি এখন সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এই নিয়ে শুধু সাম্প্রতিক নয় — আগেও এনামুল কবিরকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যখন তিনি পূর্বে সিলেটে নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন, সেসময়েও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। পরবর্তীতে LGED‑র প্রধান প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমান‑র অধীনে স্টাফ অফিসার ছিলেন এনামুল — তৎকালীন সময়েও ভুয়া বিল এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকত।

কিন্তু ২০২৩–২৪ অর্থবছরে শুরু হওয়া এই জলবায়ু‑প্রকল্পে পিডি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে আমূল বদলে গেছে পরিস্থিতি। প্রকল্পকে বলা হচ্ছে এখন পিডির ‘ব্যক্তিগত দলে’ পরিণত — নিয়োগ, অর্থের লেনদেন, অফিস পরিচালনা, আর অফিসের হালচাল সবকিছু তার নিজের নিয়ন্ত্রণে।

সংবাদচেষ্টায় গিয়ে যখন এ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, এনামুল কবিরকে পাওয়া যায়নি। বরং, তিনি সাংবাদিককে জানিয়েছিলেন — “আমি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই”। এবং দেওয়া হয়েছে — “দেখে নেওয়ার” হুমকি। এমন আচরণ সামাজিকভাবে আবারও প্রমাণ করলো — শুধু অনিয়ম নয়, ভয়ভীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহার তাঁর সাধারণ হাতিয়ার।

এখন প্রশ্ন হলো — একজন সাধারণ ফরিয়া‑ব্যবসায়ীর ঘর থেকে উঠে আসা মানুষ কীভাবে গড়েছেন এমন বিশাল সম্পদ? কীভাবে নিয়োগ দিয়েছেন স্বজনকে, নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা ঘুষ, সাজিয়েছেন বিলাসবহুল অফিস, নিয়েছেন হেলিকপ্টারে যাতায়াত, এবং গড়েছেন নিজের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য?

সরকার ইতোমধ্যেই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে, এবং অফিস ডেকোরেশন, জনবল নিয়োগসহ অন্যmany অনিয়মের বিষয়ে শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন কোন তথ্য পাওয়া গেলে, বিষয়টি হয়তো আদালত বা তদন্ত কমিটিতে যেতে পারে।

এই মুহূর্তে, প্রকল্পের সঠিক হিসাব, নিয়োগ‑ভেন্ডরদের তালিকা, বিল ও ভাউচার — এগুলো জনসমক্ষে না আসা পর্যন্ত, অনেক প্রশ্নই থেকে যাবে। আর গ্রামের সেই সাধারণ একজন ফরিয়া‑ব্যবসায়ীর সন্তান থেকে “নতুন জমিদার” হওয়া — এ ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি শাসন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা, আর দায়বদ্ধতার বিরুদ্ধে বড় চ্যালেঞ্জ।




ডিপিডিসির তিন প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে তোলপাড়, তদন্তে নেমেছে দুদক

এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি—ডিপিডিসিকে ঘিরে এবার বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির অন্তত তিনটি বড় প্রকল্পে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা অনিয়ম ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ উঠতেই ডিপিডিসিতে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অনেকে নাকি চাকরি হারানো বা শাস্তির ভয়েই দিনরাত দুশ্চিন্তায় আছেন। এমনকি কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও ডিপিডিসির ভেতরের সূত্র জানিয়েছে।

দুদক তিন সদস্যের একটি দলকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে। গত ৫ মে দুদকের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম ডিপিডিসিকে চিঠি দিয়ে তিনটি প্রকল্পের সব নথি—দরপত্র, বিল, চুক্তিপত্র, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, চালানসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ১৪ মে-র মধ্যে জমা দিতে বলে। পরে ডিপিডিসি সাত দিনের অতিরিক্ত সময় চায়, যা শেষ হওয়ার কথা ২১ মে।

যে তিনটি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এই হৈচৈ—
১) পিডিএসডি প্রকল্প (বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন)
২) স্মার্ট মিটার ও উন্নত মিটারিং অবকাঠামো
৩) জিটুজি প্রকল্প (বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ)

দুদকের চিঠিতে বলা হয়েছে, জিটুজি প্রকল্পের তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক ফজিলাতুন্নেসা, আরও কয়েকজন কর্মকর্তা এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু–এর সহায়তায় প্রকল্পে নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করা হয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ইউরোপ থেকে যন্ত্রপাতি আনার কথা থাকলেও আসলে সেসব পণ্য আনা হয় চীন থেকে, অনেক কমদামে। অথচ কাগজপত্রে দেখানো হয় উচ্চমূল্য। এতে প্রকল্পের অর্থ বিদেশে পাচারের সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে।

ডিপিডিসির একাধিক সূত্র দাবি করেছে, নসরুল হামিদ বিপুর ঘনিষ্ঠ একজন ব্যবসায়ীকে সুবিধা দিতে ইউরোপের নাম ব্যবহার করে দরপত্র দেওয়া হলেও যন্ত্রপাতি চীন থেকেই আনা হয়। তারা আরো বলেন, প্রকল্পগুলোর মধ্যে কিছু ছিল এমন, যেগুলোর বাস্তব প্রয়োজনই ছিল না; শুধু কমিশন ও ব্যক্তিগত সুবিধার আশায় এসব নেওয়া হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়া নাকি অনেক ক্ষেত্রেই ঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি। টার্নকি ভিত্তিতে কাজ দেওয়ার পরও বাস্তবে নানান ত্রুটি ছিল।

আরও অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময় ডিপিডিসি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা—যাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দুই মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস ও আবুল কালাম আজাদ, ডিপিডিসির সাবেক দুই এমডি, জিটুজি প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক মাহবুবুর রহমানসহ কিছু প্রভাবশালী প্রকৌশলী—এই অনিয়মে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা।

ডিপিডিসির কয়েকজন সাধারণ প্রকৌশলী জানান, জিটুজি প্রকল্প আসলে ডেসকোতে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। সে সময়কার প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বেশ চাপ প্রয়োগ করেছিলেন বলেও তাদের দাবি। কিন্তু ডেসকো গ্রহণ না করায় শেষ পর্যন্ত এটি ডিপিডিসির উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। প্রকৌশলীরা বলেন, কাগজে-কলমে এই প্রকল্পের অনেক কাজকে জনস্বার্থের বলে দেখানো হলেও বাস্তবে তেমন প্রয়োজন ছিল না। একটি দরিদ্র দেশের জন্য এই ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্প অযৌক্তিক বলেই তারা মনে করেন।

তাদের অভিযোগ—প্রকল্পটি মূলত নেওয়া হয়েছিল নানা ধরনের লুটপাটের সুযোগ তৈরি করতে। রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল, আমলা এবং প্রকল্পে যুক্ত কিছু কর্মকর্তা নাকি এই সুযোগে মোটা অঙ্কের টাকা বানিয়েছেন।

দুদক জানিয়েছে, অভিযুক্ত বর্তমান ও সাবেক অনেক কর্মকর্তা এখন গোয়েন্দাদের নজরদারিতে রয়েছেন।

ডিপিডিসির পক্ষ থেকে তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা হয়নি। প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিষয়টি খুবই সংবেদনশীল। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্দেশ না দিলে এ বিষয়ে আমরা মন্তব্য করতে পারি না।”

এই অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, বিশ্লেষকদের মতে এটি বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি বড় কেলেঙ্কারি হিসেবে ধরা পড়বে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে জিটুজি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।




গণপূর্তের প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানকে ঘিরে সম্পদ ও প্রকল্প–অনিয়মের অভিযোগে তোলপাড়

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল সার্কেল–৩-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানকে ঘিরে নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা দাবি করছেন—তার জীবনযাপন, সম্পত্তি আর আর্থিক লেনদেন তার সরকারি বেতন–ভাতার সঙ্গে কোনোভাবেই মিলছে না। তাদের মতে, তিনি যত সম্পদের মালিক হয়েছেন, তার অনেকটাই “স্বাভাবিক আয়ের উৎস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।”

অভিযোগে বলা হয়, ঢাকার মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে প্রায় ৩৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, পশ্চিম আগারগাঁওয়ের ৬০–ফিট রোডের মাথায় চারতলা একটি ভবন, এবং বনশ্রী আমুলিয়া এলাকায় জমি—এসব সম্পত্তির মালিকানা তার নামে বা তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষায়, একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নিয়মিত বেতনে এত বড় সম্পদ গড়ে তোলা “বাস্তবে সম্ভব নয়।”

শুধু সম্পদই নয়, প্রকল্প সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ই/এম সার্কেল–৩ এর কিছু প্রকল্পে বিল পরিশোধ, সরঞ্জাম কেনা, কাজের মান যাচাই আর টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। তাদের একজন উল্লেখ করেন যে, একটি প্রকল্পে ১৭ কোটি ৮ লাখ টাকার বেশি বিল প্রক্রিয়ায় অনিয়ম পাওয়া গেছে বলে তাদের নথিতে দেখা যায়।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছু অভ্যন্তরীণ সূত্রের কথায়ও একই ধরনের অভিযোগ শোনা যায়। তাদের দাবি—মাহবুবুর রহমান কিছু ঠিকাদারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতেন, কোন ঠিকাদার কাজ পাবেন বা বাজেট কীভাবে সমন্বয় হবে—এসব বিষয়ে তিনি অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ রাখতেন। এমনকি সরকারি যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের টাকা ব্যক্তিগতভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ এসেছে।

একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—এ ধরনের অভিযোগ খুবই গুরুতর, এবং প্রাথমিক তথ্য মিলে গেলে অবশ্যই তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি ক্ষমতা অপব্যবহার বা আর্থিক কারসাজি প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, কোনো সরকারি কর্মচারীর আয়–ব্যয়ের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেলে তারা প্রথমে প্রাথমিকভাবে যাচাই করেন, এরপর প্রয়োজন হলে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে বলেও তিনি জানান।

অন্যদিকে, এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে মাহবুবুর রহমানের সরকারি নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে অনেকদিন ধরেই গুঞ্জন ছিল যে, প্রকল্প অনুমোদন, টেন্ডার বণ্টন, বিল প্রক্রিয়াকরণ—এসব জায়গায় তিনি প্রভাব খাটান। অনেকে ভয়ের কারণে প্রকাশ্যে কিছু বলেন না, তবে গোপনে তথ্য দিচ্ছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

সর্বশেষ প্রশ্নটি এখনো সবার মুখে—তার সম্পদের প্রকৃত উৎস কী? অভিযোগকারীদের মতে, তার সম্পত্তির পরিমাণ এখন “শত কোটি টাকার কাছাকাছি” হতে পারে, যার কোনো স্বচ্ছ উৎস তাদের কাছে পরিষ্কার নয়।

এই অভিযোগগুলো এখন গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে ও বাইরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অভিযোগগুলো সত্য কিনা, তা তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়। মাহবুবুর রহমানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।




নভেম্বরে নারী-শিশুসহ নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার ১৮১ জন

ডেস্ক নিউজঃ ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে নারী ও শিশুসহ মোট ১৮১ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২৯ জন কন্যাশিশু ও ১৬ জন নারীসহ মোট ৪৫ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

সংস্থাটি জানায়, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদে সংরক্ষিত ১৫টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এ পরিসংখ্যান উঠে আসে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্যাতনের শিকার এসব নারী ও কন্যাদের মধ্যে ১৯ জন কন্যাসহ ২৮ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ৯ জন কন্যাসহ ১৪ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পরে হত্যার শিকার হয়েছে ১ জন কন্যাসহ ৩ জন। এছাড়াও ৫ জন কন্যাসহ ৭ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

বিভিন্ন কারণে ৭ জন কন্যা ও ৪৬ জন নারীসহ মোট ৫৩ জন হত্যার শিকার হয়েছে, এরমধ্যে ৪ জন কন্যা ও ২১ জন নারীসহ ২৫ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। ৯ জন কন্যা ও ৫ জন নারীসহ ১৪ জন আত্মহত্যার শিকার হয়েছে, এরমধ্যে আত্মহত্যার প্ররোচনার শিকার হয়েছে ২ জন কন্যাসহ ৩ জন। যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে ৮ জন কন্যা ও ৩ জন নারীসহ মোট ১১ জন, এরমধ্যে ৭ জন কন্যাসহ ৯ জন যৌন নিপীড়নের শিকার, ১ জন কন্যাসহ ২ জন উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছে।

এসিডদগ্ধের শিকার হয়েছে ১ জন কন্যাসহ ২ জন। অগ্নিদগ্ধের শিকার হয়েছে ৩ জন নারী। ৬ জন কন্যাসহ ৭ জন অপহরণের ঘটনার শিকার হয়েছে। পাচারের শিকার হয়েছে ৬ জন কন্যাসহ ১২ জন।

শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩ জন কন্যাসহ ১৩ জন। ফতোয়া ঘটনার শিকার হয়েছে ১ জন। বাল্যবিবাহের চেষ্টা করা হয়েছে ১ জন কন্যার। যৌতুকের কারণে হত্যার শিকার হয়েছে ৪ জন নারী। এছাড়াও ৫ জন কন্যাসহ ৮ জন  বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে।




দুই বছরে শত কোটি টাকার সম্পদ–বিস্তার! তেজগাঁও গণপূর্তের ‘অঘোষিত সম্রাট’ জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে টেন্ডার ও বিল–বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ তেজগাঁও গণপূর্ত বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (ইএম) জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে একের পর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠে আসছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য—সরকারি দপ্তরের দায়িত্বে মাত্র দুই বছরেই তিনি নাকি গড়ে তুলেছেন “শত কোটি টাকার অঘোষিত সাম্রাজ্য।” নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও তিনি বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন—এমন দাবি করেছে একাধিক সূত্র। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে একটি প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলেও জানা গেছে।

জিগাতলা প্রকল্প, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গ্লাস টাওয়ার এবং রায়েরবাজার বদ্ধভূমি প্রকল্প—এসব কাজকে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, জিগাতলায় ১,০০০ বর্গফুটের দুটি ভবনের প্রায় ৮ কোটি টাকার প্রকল্পে ঠিকাদার মাহবুব কনস্ট্রাকশনের সঙ্গে নাকি হয় আঁতাত। প্রকৃত কাজ অর্ধেকেরও কম সম্পন্ন হলেও বিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে পুরোপুরি, এমনকি কোথাও কোথাও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ছাড়াই বিল উত্তোলনের অভিযোগও শোনা গেছে। প্রকল্পের কিছু বিল–নথিতে “অদৃশ্য” বা “অনুপস্থিত” স্বাক্ষর দেখা গেছে—যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নজিরবিহীন বলে দাবি করেছেন।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গ্লাস টাওয়ারেও উঠে এসেছে আরেকটি বিতর্ক। অভিযোগকারীরা জানান—এনার্জি গ্লাস কোম্পানির সহযোগিতায় বিশেষ লাইটের দাম বাজারদরের তিনগুণ দেখিয়ে অতিরিক্ত বিল তোলা হয়। শুধু এই প্রকল্পেই প্রায় ৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ দেখানোর অভিযোগ করা হয়েছে। একজন কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেছেন, বাজারে যে জিনিসের দাম ১, প্রকল্পের কাগজে তার মূল্য দেখানো হয়েছে ৩—এবং অতিরিক্ত অর্থের বড় অংশ নাকি গেছে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের পকেটে।

তবে অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর স্বাক্ষর ছাড়াই বিল প্রক্রিয়া করা, একই ব্যক্তির হাতে প্রাকলন প্রস্তুত ও প্রাকলন যাচাই—এসবকেও বড় ধরনের অনিয়ম হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। জিগাতলা ও রায়েরবাজার প্রকল্প—দুই জায়গাতেই নাকি স্বাক্ষরবিহীন বিলের ঘটনা ঘটেছে। এক প্রকৌশলীর ভাষায়—“স্বাক্ষর আমাদের, টাকা অন্যের।”

নিয়োগ–বাণিজ্য এবং এলাকা–কেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। সূত্রের দাবি, ই/এম বিভাগের উপ–বিভাগ ৩ ও ৪–এ রাজশাহীর একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যেখানে আত্মীয়–স্বজন বা ঘনিষ্ঠদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অর্থের বিনিময়ে। একাধিক কর্মী নাকি কাজ না করেও অতিরিক্ত বেতন পেয়ে আসছিলেন। এমনকি কোথাও কোথাও হিসাবসহকারী বা ‘বড়বাবু’র জায়গায় ঠিকাদারের লোকজন দিয়ে কাজ করানো হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

প্রধান বিচারপতির সরকারি বাসভবনের কাজেও নিন্মমান, দেরিতে সরবরাহ এবং ভুল মালামাল দেওয়ার কারণে উচ্চপর্যায়ের ক্ষোভের সৃষ্টি হয়—এমনটাও দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের মতে, এর ফলেই শেষ পর্যন্ত জাহাঙ্গীর আলমকে বদলি করা হয়।

এছাড়া ২০১২–১৬ সালে বিআইডব্লিউটিএতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিয়মিত ডিউটিতে না গিয়েও বেতন নেওয়ার অভিযোগও আবার সামনে এসেছে। একই সময় তার সম্পদ দ্রুত বাড়তে থাকে বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয়—জাহাঙ্গীর আলম ও তার পরিবার–ঘনিষ্ঠদের সম্ভাব্য সম্পদ। অভিযোগ অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরে আলিশান বাড়ি, কুয়াকাটা ও কক্সবাজারে রিসোর্ট বা ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়িতে বহু বিঘা জমি, মিরপুরে ৬ তলা বাড়ি, বসুন্ধরা আবাসিকে ৫ কাঠার ৩টি প্লট, পশ্চিম মনিপুরের মোল্লাপাড়ায় বাড়ি (বাসা নং–৮৯), উত্তরা সেক্টর–১৩–তে স্ত্রী–নামে ফ্ল্যাট (২য় ও ৩য় তলা), স্ত্রীর নামে কোটি টাকার এফডিআর, শাশুড়ীর নামে সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেন এবং একটি ব্র্যান্ড–নিউ লেক্সাস হ্যারিয়ার গাড়ির মালিকানা সম্পর্কিত অভিযোগ ইতোমধ্যে দুদকের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে বলে জানা গেছে।

এদিকে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। অভিযোগকারীরা বলছেন, গত জুলাইয়ে রাজশাহীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে তিনি স্থানীয় একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা তার বিরুদ্ধে মিছিলও করে।

দুদক সূত্র জানায়, সব অভিযোগ যাচাই করে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে জিজ্ঞাসাবাদ, সম্পদ জব্দ এবং মানি–ট্রেইল অনুসন্ধানসহ সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। সচেতন মহল বলছে—এতসব গুরুতর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া ন্যায়বিচার সম্ভব নয়।সব মিলিয়ে, জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে যে বিস্তৃত অভিযোগের চিত্র উঠে এসেছে—তা শুধু একজন ব্যক্তির নয়, বরং একটি বড় সিন্ডিকেটের সম্ভাব্য নেটওয়ার্ককেও ইঙ্গিত করছে। সত্যতা প্রমাণিত হলে এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে নানা মহলে।




ঘুষ, নিম্নমানের সরঞ্জাম আর গোপন ব্যবসা—গণপূর্তের কর্মকর্তা মালিক খসরুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল শাখার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) মালিক খসরুকে ঘিরে অনেক দিন ধরেই নানা অভিযোগ ঘুরছে অফিসের ভেতরে। সহকর্মীরা ব্যঙ্গ করে তাকে “মালের খসরু” বলে ডাকেন। কারণ, অভিযোগ আছে—তিনি সরকারি পদে থেকেও টাকা-পয়সার দিকে অতিরিক্ত ঝোঁক দেখান এবং সুযোগ পেলেই সুবিধা নেন।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি, মালিক খসরু বহু বছর ধরে ঢাকাতেই গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে কাজ করছেন। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী একজন কর্মকর্তাকে বারবার একই এলাকায় রাখার নিয়ম নেই। কিন্তু তার ক্ষেত্রে নাকি অনেক নিয়মই আলাদা ভাবে কাজ করেছে। অভিযোগ আছে—একজন প্রভাবশালী সাবেক প্রধান প্রকৌশলী, শামীম আখতারের ঘনিষ্ঠ “মুরীদ” হওয়ায় তিনি এমন সুবিধা পেতেন।

অধিদপ্তরের ভেতরের লোকজন বলেন, শামীম আখতারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে খসরু নিজের পদোন্নতি, পদায়নসহ নানা সুবিধা নিতেন। শোনা যায়, এমন সম্পর্কের কারণেই তিনি ই/এম শাখার লোভনীয় পদগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে থেকে গেছেন।

সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে ঢাকা আজিমপুর সরকারি আবাসিক কোয়ার্টারের বহুতল ভবন ও কার পার্কিং প্রকল্প নিয়ে। খসরু এখানে ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজ তদারকির দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ আছে—প্রকল্প চলাকালীন সময় ঠিকাদারদের কাছে বিভিন্ন অজুহাতে কমিশন দাবি করতেন। যেমন—ফাইল আটকে রাখা, রিপোর্টে সাইন না করা বা সাইট ভিজিট প্রয়োজন—এসব দেখিয়ে নাকি তাদের চাপ দিতেন। কিছু ঠিকাদারের ভাষায়, “টাকা ছাড়া তিনি কোনো কাগজ সই করতেন না।”

আরও অভিযোগ আছে—আজিমপুরের কয়েকটি ভবনে যেসব সাবস্টেশন, জেনারেটর, ফায়ার সেফটি বা ইলেকট্রিকাল সরঞ্জাম বসানো হয়েছে, সেগুলোর মান অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল। ঠিকাদারদের দাবি, মালিক খসরু ইচ্ছে করেই কম দামের ব্র্যান্ড অনুমোদন করতেন, কারণ সেখান থেকেই নাকি কমিশন পাওয়া সহজ ছিল। এ কারণে ভবনগুলোর কিছু জায়গায় এখন বিদ্যুৎ সমস্যা, ফায়ার অ্যালার্ম না বাজা বা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে।

অর্থবছর ২০২৪–২৫ এ ছোটো কিছু মেরামত কাজের পাশাপাশি প্রায় ৮ কোটি টাকা মূল্যের সাবস্টেশন ও যন্ত্রপাতি সরবরাহের বড় কাজও ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, এই বড় কাজ থেকেই তিনি ঠিকাদারের সঙ্গে গোপন লেনদেন করে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন।

আরেকটি বড় অভিযোগ হলো—মালিক খসরুর নামে ও তার পরিবার-আত্মীয়দের নামে নাকি বেশ কিছু ব্যাংক হিসাব রয়েছে। গোপন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—ঘুষ নেওয়ার টাকাগুলো এসব হিসাব ব্যবহার করে লেনদেন করা হত। এমনকি, কিছু টাকা বিদেশেও পাঠানো হতো বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। খিলগাঁওয়ে অ্যাপার্টমেন্ট, টাঙ্গাইলে জমি, ডেভেলপার ব্যবসায় সম্পৃক্ততা—এসব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

কিছু ঠিকাদার অভিযোগ করেন, খসরুর সঙ্গে কাজ করতে গেলে তাদের ব্যক্তিগত আপ্যায়ন পর্যন্ত করতে হত—হোটেলে খাওয়ানো থেকে শুরু করে বাইরে ঘোরানো পর্যন্ত। তবুও নাকি তিনি সাইটে গিয়ে নানা কারণে হয়রানি করতেন।

অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন—বেশি প্রভাবশালী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ খুব কম আসে। অভিযোগ এলেও তদন্ত অনেক সময় এগোয় না। কারণ, অভিযোগ এসেছে—উচ্চ পর্যায় থেকে ফোন যায় মামলা বা তদন্ত থামানোর জন্য।

এখন দুদক ও অর্থনৈতিক গোয়েন্দা ইউনিট তার সম্পদের উৎস, ব্যাংক হিসাব ও লেনদেন নিয়ে নজরদারিতে রেখেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর পক্ষে এত সম্পদ অর্জন স্বাভাবিক নয়। তাই প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।




নিয়ম ভেঙে রাজউকে গণপূর্তের তিন প্রকৌশলীর পদায়ন, ক্ষোভে ফুঁসছে কর্মকর্তারা

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে তিন সহকারী প্রকৌশলী—রকিবুল হাসান, মেহেদী রায়হান নাদিম এবং হাসানুর রেজাকে—রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ‘অথরাইজড অফিসার’ হিসেবে প্রেষণে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এ পদায়ন ঘিরে রাজউকের ভেতরে বেশ অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, এ ধরনের দায়িত্ব সাধারণত পূর্ণাঙ্গ নির্বাহী প্রকৌশলী বা সমমানের কাউকে দেওয়া হয়। অথচ যাদের পাঠানো হয়েছে, তারা সবাই ষষ্ঠ গ্রেডের সহকারী প্রকৌশলী।

রাজউকের নিয়োগবিধি অনুযায়ী, অথরাইজড অফিসার হতে হলে কমপক্ষে পঞ্চম গ্রেডের নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) বা সহকারী প্রধান স্থপতি, উপস্থপতি, উপনগর পরিকল্পনাবিদ হতে হয়। নিচের পদের কেউ এ দায়িত্ব নিতে পারেন না। অথচ এই তিনজনের পদবি সহকারী প্রকৌশলী, যা নিয়মের সঙ্গেই যায় না। অভিযোগ আরও আছে, রাজউকের নিজস্ব ১১ জন অথরাইজড অফিসার থাকলেও তাদের কাজ দেওয়া হচ্ছে না, বরং তাদের পাশ কাটিয়ে গণপূর্ত থেকে নতুন লোক আনা হচ্ছে—যা স্বাভাবিক নয় এবং প্রশ্ন তোলে পদায়নের উদ্দেশ্য নিয়ে।

আগেও এমন ঘটনা ঘটেছিল। ২০১৯ সালে দুই সহকারী প্রকৌশলীকে একইভাবে রাজউকে দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তখন যোগ্যতার অভাবে তারা রাজউকে যোগ দিতে পারেননি, এবং পরে মন্ত্রণালয় সেই আদেশ বাতিল করে। এবারও অনেকে মনে করছেন, একই নিয়মবহির্ভূত সিদ্ধান্ত আবার পুনরাবৃত্তি হল।

এই প্রেষণ আদেশে স্বাক্ষর করেছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব তাসমিন ফারহানা। তবে তিনি বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই তিনজন যদিও সহকারী প্রকৌশলী, তবে তারা গণপূর্তে ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব সামলেছেন। আর তারা রাজউকে গেলেও নির্বাহী প্রকৌশলীর বেতন পাবেন না—সহকারী প্রকৌশলীর বেতনই পাবেন। তাঁর মতে, তাই এটিকে বড় ধরনের নিয়মভঙ্গ বলা যাবে না। তবে তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে বিষয়টিতে বিতর্কের জায়গা আছে।

অন্যদিকে রাজউকের বোর্ড সদস্য (প্রশাসন) গিয়াস উদ্দিনের ফোন বন্ধ থাকায় তাঁর মন্তব্য পাওয়া যায়নি। রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি দেশের বাইরে আছেন এবং এখনো এ ধরনের কোনো আদেশের খবর পাননি। দেশে ফিরে অফিসে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলেও জানান।

সব মিলিয়ে, যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও গণপূর্তের তিন প্রকৌশলীকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানো নিয়ে রাজউকের ভেতরে ব্যাপক ক্ষোভ, প্রশ্ন আর অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।




আজিমপুর প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ: মালিক খসরুকে ঘিরে প্রশ্নে সরগরম গণপূর্ত

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল শাখার ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মালিক খসরু দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন। সহকর্মীদের একাংশ তাকে কটাক্ষ করে ডাকেন “মালের খসরু”—নামটি নাকি এসেছে তার বিরুদ্ধে বছরের পর বছর জমতে থাকা টাকার লেনদেনসংক্রান্ত অভিযোগ থেকে। অভিযোগের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সরকারি চাকরিতে থেকেও টাকার প্রতি অস্বাভাবিক আগ্রহ দেখিয়ে অফিসের ভেতরে ভীতি ও প্রভাব তৈরির পরিবেশ বানিয়ে ফেলেছেন।

সাধারণ নিয়মে সরকারি কর্মকর্তাদের তিন বছর পর বদলি হওয়ার কথা থাকলেও মালিক খসরু ঢাকাতেই ৩, ৫ ও ৭ নম্বর ডিভিশনের “আকর্ষণীয়” পোস্টে টানা এক দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। অধিদপ্তরের বিভিন্ন সূত্র দাবি করে, এক সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর “আধ্যাত্মিক ঘনিষ্ঠতা” তাকে সব সময় ঢাকায় রাখার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল। একই অফিসে থেকেই তার পদোন্নতি হওয়াও অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে আজিমপুরে সরকারি আবাসিক ভবন ও কার পার্কিং প্রকল্পে তার দায়িত্ব পালনকে ঘিরে। বিভিন্ন ঠিকাদার এবং অভ্যন্তরীণ সূত্র অভিযোগ করছে—মালিক খসরু নাকি ফাইল আটকে রেখে কমিশন আদায় করতেন, সাইট ভিজিট বা রিপোর্ট সই করার আগে টাকা দাবি করতেন, এমনকি কারও বিল দেওয়ার ক্ষেত্রেও নানা অজুহাতে চাপ তৈরি করতেন। একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছে, “টাকা না দিলে কাগজে সই পাওয়া যেত না,” এবং “হোটেলে আপ্যায়ন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত সুবিধা—সবকিছুর দাবি ছিল।”

ইলেকট্রিক্যাল সাবস্টেশন, জেনারেটর, সোলার প্যানেল, ফায়ার সেফটি সহ নানা যন্ত্রপাতিতে নিম্নমানের ব্র্যান্ড অনুমোদনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, কম দামের পণ্য পাস করাতেই নাকি তার কমিশন বেশি উঠত। এর ফল হিসেবে আজিমপুরের ভবনগুলোতে বারবার বিদ্যুৎ সমস্যার সৃষ্টি, ফায়ার সিস্টেম অকার্যকর হওয়া, যান্ত্রিক যন্ত্রপাতির দ্রুত নষ্ট হওয়া—এগুলো দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। এতে বাসিন্দারা ঝুঁকিতে পড়ছেন এবং ভবিষ্যতে সরকারের বাড়তি খরচের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—মালিক খসরুর পরিবারের সদস্যদের নামে ২৫টির বেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। পাশাপাশি খিলগাঁওয়ে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, টাঙ্গাইলের মধুপুরে বিশাল জমি, এমনকি ঠিকাদারদের সঙ্গে যৌথ ব্যবসা করার অভিযোগও শোনা যায়। কিছু সূত্র দাবি করেছে, নামে-বেনামে তার সম্পদের পরিমাণ নাকি ২০ কোটি টাকারও বেশি, যার একাংশ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো এবং পরে দেশে ফেরত আনার অভিযোগও আলোচনা হয়।

অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, পরিবারের নামে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান—যেমন ব্রাদার্স ইলেকট্রিক—গণপূর্তের প্রকল্পে অংশ নিয়েছে বলেও অভিযোগ আছে, যা স্পষ্টভাবে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করে। ঠিকাদারদের কেউ কেউ বলছেন, “কাজ না দিলে হুমকি, আর কাজ দিলে কমিশন না দিলে বিল আটকে রাখা—এটাই ছিল নিয়ম।”

তবে অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, “অভিযোগ আছে ঠিকই, কিন্তু লিখিত অভিযোগ ছাড়া ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন।” আবার অন্য সূত্রের দাবি—অভিযোগ উঠলেই নাকি “উচ্চ পর্যায় থেকে ফোন এসে ফাইল থামিয়ে দেওয়া হয়,” আর সেখানে তদন্ত এগোয় না।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে—একজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী কীভাবে এত সম্পত্তি গড়লেন? তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বিদেশ যাতায়াত বা অর্থ লেনদেন—এসব কি কখনও খতিয়ে দেখা হয়েছে?

আজিমপুর প্রকল্পের এই বিতর্ক এখন আরও বড় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে—গণপূর্তের ভেতরে স্বচ্ছতা কি আদৌ সম্ভব, যদি এ ধরনের অভিযোগের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়?