খুলনার শিপইয়ার্ড সড়ক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, প্রধান প্রকৌশলীসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী মো. সাবিরুল আলমসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুসরণ না করা এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

রোববার (২৫ অক্টোবর) দুদকের খুলনা কার্যালয়ের অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগের উপপরিচালক বায়েজিদুর রহমান খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে মামলার অনুমোদনের বিষয়টি জানানো হয়। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে, তা মামলার মাধ্যমে তদন্তের আওতায় আসবে।

মামলায় আসামি করা হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান খান লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান এবং মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মাহাবুব রহমানকে। এ ছাড়া খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী মো. সাবিরুল আলম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শামীম জেহাদ, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরমান হোসেন, খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মুতাসির মামুন, সহকারী প্রকৌশলী বাসুদেব কুমার বিশ্বাস এবং উপসহকারী প্রকৌশলী শরীফ ওয়াহিদুজ্জামান মামলার আসামি হয়েছেন।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়নের কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্স লিমিটেডকে দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রকল্পের নির্ধারিত পরিকল্পনা ও শর্ত অনুযায়ী সড়ক নির্মাণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এভাবে কাজের ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে সরকারের কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দুদকের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্পের কাজের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ করা অর্থের বিপরীতে যথাযথভাবে কাজ সম্পন্ন হয়েছে কি না, কাজের মান ও পরিমাণ নির্ধারিত শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না এবং অর্থ ব্যয়ে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না—এসব বিষয় মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে অভিযোগের বিষয়ে আসামিদের দোষ আদালতে প্রমাণিত হওয়া এখনো বাকি।

এদিকে, খুলনা শিপইয়ার্ড সড়কের নির্মাণকাজ দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকা নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুলনা সফরে গিয়ে সড়কটির নির্মাণকাজে প্রায় ১৩ বছর ধরে চলা বিলম্বের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দীর্ঘ সময়েও গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের উন্নয়নকাজ নিয়ে প্রশ্ন, সরকারি অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলার উদ্যোগ—সব মিলিয়ে প্রকল্পটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, নির্মাণকাজের বাস্তব অবস্থা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দায় কতটুকু, তা নির্ধারিত হবে।




মোংলা কাস্টমসে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ, কর্মকর্তা মামুনের অপসারণ দাবি ব্যবসায়ীদের

বিশেষ প্রতিবেদকঃ মোংলা কাস্টমস হাউজের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, অনৈতিক সুবিধা দাবি, ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রতিবাদে তাঁর অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন শিপিং ব্যবসায়ীরা। রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে মোংলা কাস্টমস হাউজের সামনে এ কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। পরে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে কাস্টমস কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি দেন ব্যবসায়ীরা।

কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আব্দুল্লাহ আল মামুন দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে নিজের প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। বিভিন্ন অজুহাতে ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে ফেলা, অনৈতিক সুবিধা দাবি করা এবং তাঁদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং তাঁরা নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

ব্যবসায়ীরা আরও অভিযোগ করেন, মোংলা বন্দরে আসা বিদেশি জাহাজের ক্যাপটেনদের কাছ থেকে জোরপূর্বক মার্কিন ডলার, হুইস্কি ও সিগারেট নেওয়া হয়। পরে এসব সামগ্রী অবৈধভাবে বিক্রি করার অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, একজন সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং এর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

এ ছাড়া জাহাজের আগমনসংক্রান্ত তথ্য নথিভুক্ত করা এবং ক্লিয়ারেন্স কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আইজিএম শাখায় অনিয়মের অভিযোগও সামনে এনেছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের অভিযোগ, ওই শাখার কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অসদাচরণ করা হয় এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা চাওয়া হয়। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন শিপিং ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ, নুরউদ্দিন টুটুল, কামাল হোসেন, মো. শামিম, মো. ইউসুফ, মো. সেলিম, মো. মামুন ভুঁইয়া, মো. সুমন মল্লিক, মো. আল-আমিন, মো. বেল্লাল হোসেন, মো. মহসিন পাটোয়ারী, মো. সোহাগ ও মো. রাজ বাপ্পা। তাঁরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে দ্রুত বর্তমান কর্মস্থল থেকে অপসারণের দাবি জানান।

পরে ব্যবসায়ীরা মোংলা কাস্টমস হাউজের কমিশনার মো. গিয়াস কামালের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁর কাছে স্মারকলিপি জমা দেন। স্মারকলিপিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মোংলা কাস্টমস হাউজের কমিশনার মো. গিয়াস কামাল অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো তদন্ত করা হবে। তদন্তের ভিত্তিতে এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।




দিলীপ আগরওয়ালাকে ৭ দিনের রিমান্ডে চায় পুলিশ

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গুলিতে আহত এক শিক্ষার্থীর করা হত্যাচেষ্টা মামলায় ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেছে পুলিশ। এর আগে এ মামলায় তাকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

রবিবার (২৫ অক্টোবর) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. সুমন মিয়া।

ঢাকা মহানগর আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, চার দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে দিলীপ আগরওয়ালা গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দিলেও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও অনেক তথ্য গোপন করেছেন। তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করছে পুলিশ। মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটন, ঘটনায় জড়িত অন্য আসামিদের গ্রেফতার, তাদের নাম-ঠিকানা শনাক্ত এবং অপরাধে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের জন্য তাকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এর আগে বুধবার (২১ অক্টোবর) একই মামলায় দিলীপ আগরওয়ালাকে গ্রেফতার দেখিয়ে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ ফারজানা হক। ওই দিন পুলিশ তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেছিল। মামলাটি করা হয় ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ উত্তরা পশ্চিম থানায়।

এজাহার অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিএনএস সেন্টারের সামনে আন্দোলনের সময় গুলিতে আহত হন শিক্ষার্থী আ. জব্বার।

দিলীপ কুমার আগরওয়ালা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য ছিলেন।




শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের পরও বহাল বিতর্কিত কর্মকর্তারা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়নকাজে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি)। কিন্তু এই অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ, কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়ন, দরপত্র মূল্যায়ন এবং ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ নিয়ে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে বিল দেওয়া, পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রভাব বিস্তারের মতো বিষয়।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন বিতর্কিত কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের মধ্যে মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ, জাহেদুল করীম, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আবুল হাসেম সরদার ও সরোয়ার হোসেনের নাম আলোচনায় এসেছে। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন নেতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

তদন্তে উঠে এসেছে অসমাপ্ত কাজের বিল পরিশোধের অভিযোগ

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো জোনে দায়িত্ব পালন করছেন মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর কাফরুল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছয়তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণের কাজ চলছিল। অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণকাজের অগ্রগতি অনুযায়ী বিল পরিশোধ না করে ঠিকাদারকে আগাম অর্থ দেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে তদন্ত করে দেখা যায়, ভবনের দ্বিতীয় তলার কাজও তখনো শেষ হয়নি। একই সময়ে চতুর্থ তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছিল বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কাজের বাস্তব অগ্রগতি ও পরিশোধ করা অর্থের মধ্যে অসংগতি ছিল। প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টাকার কাজ সম্পন্ন না করেই বিল পরিশোধের অভিযোগও ওঠে। এ ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত কমিটি মোজাহিদুল ইসলাম আলিফসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সেই সুপারিশের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাভার জোনে দায়িত্ব পালন করার সময়ও আলিফের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় প্রকল্পে অগ্রিম বিল পরিশোধের বিষয়টি সামনে আসে। কেরানীগঞ্জে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৮০ কোটি টাকার প্রকল্পে কাজের অগ্রগতির তুলনায় বেশি অর্থ পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে। এ প্রকল্পে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২০ কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া আগারগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়সংলগ্ন প্রায় ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আলিফকে ঢাকা মেট্রো জোনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রধান প্রকৌশলীর পদ নিয়ে আলোচনায় জাহেদুল করীম

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের আরেক কর্মকর্তা জাহেদুল করীমকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি অতীতে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন। ২০২২ সালের ২৭ জুলাই ঘোষিত ওই কমিটিতে তাঁর নাম ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সে সময় তিনি ঢাকা জেলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে অতীতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পরও তিনি এখন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর পদে আসীন হওয়ার চেষ্টা করছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পদায়ন ও প্রশাসনিক সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ থাকলেও এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই প্রয়োজন। একজন কর্মকর্তার রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে অতীতের সংশ্লিষ্টতা একাই অনিয়মের প্রমাণ নয়; বরং তাঁর পদায়ন, দায়িত্ব পালন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা যাচাই করাই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীর দায়িত্ব পালন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত, আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা বজায় রাখার দায়িত্ব তাঁর প্রশাসনের ওপর বর্তায়।

অভিযোগকারীদের দাবি, অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, বদলি-পদায়ন নিয়ে প্রভাব বিস্তার এবং দরপত্র মূল্যায়নে পক্ষপাতের অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এ পরিস্থিতিতে প্রধান প্রকৌশলীর প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি এবং গৃহীত প্রশাসনিক পদক্ষেপ যাচাই করা প্রয়োজন।

মোজাহিদুল ইসলাম আলিফ, জাহেদুল করীম, মো. শহিদুল ইসলাম, মো. আবুল হাসেম সরদার ও সরোয়ার হোসেনকে ঘিরে যেসব অভিযোগ আলোচনায় এসেছে, সেগুলোর প্রতিটির প্রকৃতি ও প্রমাণ আলাদাভাবে পরীক্ষা করা দরকার। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা মানেই তিনি অপরাধ করেছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং আর্থিক নথি গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি অর্থের ব্যবহার নিশ্চিত করতে তদন্তের দাবি

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্পগুলো সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত। এসব প্রকল্পে সরকারি অর্থের অপচয় হলে শুধু আর্থিক ক্ষতিই হয় না, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ তৈরির কাজও বাধাগ্রস্ত হয়। তাই নির্মাণকাজের বাস্তব অগ্রগতি অনুযায়ী বিল পরিশোধ, দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়নে নিয়ম অনুসরণ নিশ্চিত করা জরুরি।

অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কার্যাদেশ, কাজের পরিমাপ, বিল পরিশোধের হিসাব, বিভাগীয় তদন্তের সুপারিশ এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। একই সঙ্গে যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বক্তব্য নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্তের ব্যবস্থা করার দাবি উঠেছে।

শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ করা অর্থের প্রতিটি টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার করাও প্রয়োজন। এতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনআস্থা ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি হতে পারে।




খাগড়াছড়ি বন বিভাগের ডিএফও পদায়নে ৫০ লাখ টাকার লেনদেনের অভিযোগ, মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে অদক্ষ কর্মকর্তাকে নিয়োগ!

বিশেষ প্রতিবেদনঃ গণ-অভ্যূত্থানের পর দেশের আপামর জনসাধারণ মনে করেছিল দুর্নীতি শূণ্যের কোঠায় নেমে আসবে, কিন্তু মানুষের সেই আশা দূরাশায় পরিণত হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। দুর্নীতি অনেকাংশেই লাগামহীন অবস্থায় রয়েছে। এক শ্রেণীর দালাল, তদ্বিরবাজ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দুর্নীতিবাজ আমলারা গিলে খাচ্ছে সর্বত্র। সবকিছুই সামাল দিতে হচ্ছে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে।

আজকের এই প্রতিবেদন খাগড়াছড়ি বন বিভাগের নতুন ডিএফও’র পদায়ন নিয়ে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তের উপর ভিত্তি করেই এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বন অধিদপ্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা। এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির অনেক সুনামও রয়েছে। কিন্তু কোন কোন পোস্টিং বাণিজ্য নিয়েই সুনামের পরিবর্তে দুর্নাম ছড়াচ্ছে সর্বত্র। এতে করেই সমস্ত অর্জন ম্লাণ হয়ে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে সবচেয়ে বেশি বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হচ্ছে বন প্রশাসনকে।

সারা দেশের মাঠ পর্যায়ের বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। বন প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ের সদিচ্ছার উপর ভর করেই পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য লোভনীয় পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে জোরালো তদ্বিরসহ মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। তবে এই রেওয়াজটি দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদায়নের ক্ষেত্রে এ রকমই ঘটনার সৃষ্টি হওয়ায় তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে মাঠ পর্যায়ে।

গত ১৪ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন-৩ অধিশাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মাহমুদা বেগম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে ফরিদপুর সামাজিক বন বিভাগের ডিএফও (চলতি দায়িত্ব) তারিকুল ইসলামকে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের ডিএফও হিসেবে পদায়ন করা হয়। অর্থাৎ তিনি এখনও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদে চলতি দায়িত্বে পদোন্নতিপ্রাপ্ত। প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনা করে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়েছে তাকে অকালীন বদলী করে খাগড়াছড়ি বন বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে। তারিকুল ইসলামের পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। এতে বোদ্দামহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।

কিছুদিন পূর্বে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের ডিএফও ফরিদ মিঞা অবসরোত্তর ছুটি যাওয়ায়  ডিএফওর পদটি শূণ্য হয়ে পড়ে। সূত্র জানায়, খাগড়াছড়ি বন বিভাগের ডিএফও’র পদ শূণ্য হওয়ার পূর্ব থেকেই একটি প্রভাবশালী মহল এই পদে একজন ডিএফও পদায়নের ক্ষেত্রে ফরিদপুর সামাজিক বন বিভাগে কর্মরত ডিএফও (চলতি দায়িত্ব) তারিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দুর্নীতিবাজ এই বন কর্মকর্তার গ্রীণ সিগনাল পেয়েই ঐ প্রভাবশালী মহলটি পরিবেশ, বন ও জলবায় পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির সন্তানের শরনাপন্ন হন।

সূত্র জানায়, যেহেতু খাগড়াছড়ি বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার পদটি যেমন লোভনীয় তেমনি স্পর্শকাতর। সেই বিবেচনায় ৫০ লাখ টাকার চুক্তিতে ডিএফও (চলতি দায়িত্ব) তারিকুল ইসলাম সম্মতি প্রকাশ করেন। এরপরই ফরিদপুর সামাজিক বন বিভাগের ডিএফও তারিকুল ইসলামের পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। সূত্র জানায়, তারিকুল ইসলামের পদায়নের পর গত ১৮ অক্টোবর রাজধানীর পান্থপথের কাছাকাছি অবস্থিত মোনায়েম টাওয়ারের পাশে একজন প্রভাবশালী নেতার ব্যবসায়িক অফিসে ঐ অর্থের লেনদেন করা হয়। আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি যখন জানাজানি তখন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং বন প্রশাসনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।

সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে একজন নন ক্যাডার বন কর্মকর্তাকে খাগড়াছড়ি বন বিভাগে পদায়নের জন্য বন প্রশাসনকে প্রস্তাব পাঠানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। পদায়নকৃত এই বন কর্মকর্তা ইতোপূর্বে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ মাটিরাঙ্গায় রেঞ্জ কর্মকর্তা (ফরেষ্ট রেঞ্জার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঐ সময় তিনি জোতের মাধ্যমে রিজার্ভের কাঠ পাচার করে মোটা অঙ্কের (কয়েক কোটি টাকা) আর্থিক লাভবান হয়েছেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়। যে কারণে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের আওতাধীন প্রতিটি রেঞ্জ, চেক স্টেশন কাম বিট এবং অন্যান্য বিট এলাকায় সম্পর্কে তার ব্যাপক ধারণাও রয়েছে বলে সূত্র জানায়। সেই হিসাব নিকাষ মাথায় রেখে তিনি মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেই খাগড়াছড়ি বন বিভাগের মতো লোভনীয় পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়েছেন।

বন প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাংবাদিককে বলেন, ‘খাগড়াছড়ি বন বিভাগে তারিকুল ইসলামের পদায়ন বন অধিদপ্তরের জন্য একটি আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত। তিনি একজন নন ক্যাডার কর্মকর্তা। এছাড়া অদক্ষ এবং অযোগ্যও বটে। বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে পদায়ন মানেই হচ্ছে খাগড়াছড়ি বন বিভাগকে গিলে খাবেন তিনি। সেখানে একজন সাহসী, চৌকস, দক্ষ এবং সৎ কর্মকর্তার পদায়ন একেবারেই জরুরী ছিল’। তারিকুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, খাগড়াছড়ি বন বিভাগের মাটিরাঙ্গা রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করেন। এরপর তিনি সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগে যোগদান করেন। সেখানে সাড়ে ৪ বছর কর্মরত থাকার সুযোগে সুফল প্রকল্পের উন্নয়ন কাজ থেকে শতকরা ৫ শতাংশ কমিশন আদায় করেন। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের মাধ্যমে এক পর্যায়ে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান। সেই অর্থ বিনিয়োগ করেই খাগড়াছড়ি বন বিভাগের লোভনীয় পোস্টিং বাগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন তারিকুল ইসলাম।

তারিকুল ইসলামের পদায়নের কারণে বন প্রশাসনে সাহসী, দক্ষ ও চৌকস বন কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা দুর্নীতি বন্ধে এ ধরনের পদায়ন বাণিজ্যের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, এতে দুর্নীতিবাজরা আরও উৎসাহিত হবে। তারিকুল ইসলামের পদায়নের বিষয়টি পুনঃবিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন বন প্রশাসনের সচেতন কর্মকর্তারা। একজন সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) যিনি বিভাগীয় বন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্বে রয়েছেন, তাকে পার্বত্যাঞ্চলের এই ঝুঁকিপূর্ণ বন বিভাগে পদায়ন করায় নানা রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্র নিশ্চিত করেছে, যিনি কোন যোগ্যতার মাপকাঠিতে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের ডিএফও হিসেবে পদায়নের ক্ষেত্রে মোটেই বিবেচ্য নয়, অথচ তাকেই পদায়ন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়েরও একটি সূত্র জানায়, একদিকে জোরালো তদ্বির অন্যদিকে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন এই দুই পরাশক্তির ফলেই এ ধরনের লোভনীয় পোস্টিং বাগিয়ে নিতে সক্ষম হন তারিকুল ইসলাম।

বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করলেও অর্থের লোভে কেউ কেউ এ ধরনের অনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলছেন। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ও সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। বিষয়টির গুরুত্বানুধাবন করে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে বদলী আদেশ বাতিল করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন সচেতনমহল। এ ব্যাপারে ডিএফও তারিকুল ইসলামের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়টি শুনেই লাইন কেটে দেন। এরপর কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন আর রিসিভ করেননি।




ঢাকা বন বিভাগে বনভূমি দখল ও গাছ কাটার অভিযোগ, ডিএফও বশিরুলকে ঘিরে প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদক: ঢাকা বন বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমি দখল, গাছ কেটে রাস্তা নির্মাণ, অবৈধ ঘরবাড়ি ও দোকানপাট তৈরি এবং এসব কর্মকাণ্ডে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কোথাও কোথাও অর্থের বিনিময়ে সরকারি বনভূমিতে স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আবার অভিযান চালিয়ে জমি উদ্ধারের পরও কিছুদিনের মধ্যে তা পুনরায় দখল হয়ে যাচ্ছে। এসব ঘটনায় ঢাকা বন বিভাগের ডিএফও বশিরুলসহ একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, চন্দ্রা, মৌচাক, রাথুরা, কাশিমপুর ও বাড়ইপাড়া বনবিটসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বনভূমি দখল এবং অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ চলছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব কাজে জড়িত ব্যক্তিদের একটি অংশ বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করছেন। কোথাও অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ঘর নির্মাণের অনুমতি পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, আবার কোথাও গাছ কেটে রাস্তা ও বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরির ঘটনাও সামনে এসেছে। এসব বিষয়ে অভিযোগ জমা পড়লেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা বিট এলাকায় বনভূমি দখলের একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। চন্দ্রা স্পিনিং মিলের পাশে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কসংলগ্ন কারিগরপাড়ায় আশরাফ হোসেন ইটের দেয়াল দিয়ে চার কক্ষের একটি অর্ধপাকা ভবন নির্মাণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, চন্দ্রা টাওয়েল টেক্সের কাছের সংরক্ষিত বনভূমিতে আকাশমণি গাছ কেটে রাস্তা তৈরির অভিযোগ উঠেছে তৌহিদুল ইসলাম সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আবারও রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বন বিভাগের সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কালিয়াকৈরের ভুলুয়া, কালামপুর, কুঁচপাড়া, বটতলা ও চান্দরা মৌজায় বনভূমিতে ঘরবাড়ি ও দোকান নির্মাণের অভিযোগ আরও বিস্তৃত। অভিযোগ অনুযায়ী, ভুলুয়া এলাকায় শাকিল প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা দিয়ে বনভূমিতে বাড়ি নির্মাণ করছেন। কালামপুরে সামাদ বিটের কর্মীদের ১ লাখ ৫ হাজার টাকা দিয়ে তিন কক্ষের একটি টিনশেড ঘর তুলেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। কুঁচপাড়ায় রতন নামের এক দালালের মাধ্যমে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা দিয়ে রনজিত পাঁচ কক্ষের একটি ভবন নির্মাণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বটতলায় সাবেক কমিশনার ইসমাইলের ছেলে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি পাকা দোকান নির্মাণ করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

চান্দরা মৌজায় রিমা নামের এক নারী প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে তিন কক্ষের টিনশেড ঘর নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁর পাশেই শাহীন ও মাহবুবের বিরুদ্ধে প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিয়ে ৪০ হাত লম্বা একটি পাটের গোডাউন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।

চন্দ্রা বিটের শিল্প কুঞ্জ পার্কের কাছেও দোকান নির্মাণ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মোতালেব ডাক্তার বিট কর্মকর্তা ইকবাল হোসেনকে প্রায় ৪ লাখ টাকা দিয়ে পাকা দেয়াল তুলে দোকান নির্মাণ করছেন। সকিনার মোড়ে জাকিরের বিরুদ্ধে প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা দিয়ে পাঁচ কক্ষের একটি ঘর নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইকবাল হোসেন, লুৎফর, মামুন ও লতিফের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে কাজটি করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। অভিযোগ ওঠার পর ইকবাল সামান্য একটি বারান্দা ভেঙে দিলেও মূল ঘরটি রয়ে গেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

চান্দরা খেলার মাঠসংলগ্ন এলাকায় শাহিনের মামার আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘর নতুন করে নির্মাণের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। এ কাজের সঙ্গে ইকবাল, লুৎফর, মামুন ও লতিফের একটি চক্রের নাম উঠে এসেছে। মাটিকাটা ইনক্রেটেবল ফ্যাক্টরির কাছাকাছি সাবেদ ওরফে পীর সাহেবের বিরুদ্ধে প্রায় ১ লাখ টাকা দিয়ে বনভূমিতে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। একই এলাকার ভুলুয়া মৌজায় কফিল উদ্দিনের ছেলে আনোয়ার হোসেন ওরফে ব্ল্যাক আনোয়ারের বিরুদ্ধে প্রায় ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ইটের দেয়াল তুলে বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ করা হয়েছে।

মৌচাক বনবিটের ভান্নারা সাব-বিটেও বনভূমি দখল এবং অবৈধ দোকান নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বনফুল বাজার এলাকায় নতুন করে ৩৪টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি দোকানের জন্য ৩০ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আলিফ কম্পোজিট লিমিটেড নামের একটি কারখানার বিরুদ্ধে বনভূমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। ওই কারখানার বিরুদ্ধে উচ্ছেদ কার্যক্রম ঠেকাতে বিট কর্মকর্তা শাজাহান মিয়ার মাধ্যমে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগও সামনে এসেছে।

মাঝুখান মৌজায় আজিজুল ডাক্তার ও তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে বিপুলসংখ্যক গজারি ও আকাশমণি গাছ কাটার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব গাছ কাটার ফলে ওই এলাকার বনভূমির ক্ষতি হয়েছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গাছ কাটা ও জমি দখলের অভিযোগ সত্য হলে তা পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষার দায়িত্ব পালনে গুরুতর ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়।

শ্রীপুর রেঞ্জের রাথুরা বিটেও গাছ কাটার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ৪ জুন রাতে রাথুরা বিটের সিএস ১৩৬৯ ও ১৩৭১ দাগের জমি থেকে ১০টি বড় গজারি গাছ কেটে মোজাম্মেল নামের এক ব্যক্তির কাছে মাত্র ৮ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। এ ঘটনায় বিট কর্মকর্তা শেখ ইমদাদ হোসেনের নাম এসেছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর তাঁকে রাথুরা এলাকা থেকে সিলেটে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বন সংরক্ষকের গাড়িচালক বিল্লাল ও প্রধান অফিস সহকারী আতিয়ার রহমানের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে তিনি একই এলাকায় থেকে যান বলে দাবি করা হয়েছে।

রাথুরা বিটের বেলতলী এলাকায় বশির হোসেনের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে বনভূমিতে ঘর নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। কবরঘাটা এলাকায় রফিকুল ইসলামও অর্থের বিনিময়ে বনের জমিতে ঘর তৈরি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে বন বিভাগের অনুমতি ছিল কি না, জমির প্রকৃত শ্রেণি কী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

কাশিমপুর বিটের মাধবপুর এলাকায় ইমরান নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিট কর্মকর্তা চান মিয়াকে ম্যানেজ করে দুই কক্ষের একটি আধাপাকা ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের নিশ্চিন্তপুরে আউলিয়ার টেক মাজারের সামনে বনাঞ্চলের গাছপালা কেটে নতুন পিচঢালাই রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কালীগঞ্জের এক প্রভাবশালী ঠিকাদারের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে এ কাজ করা হচ্ছে। বনভূমির ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের অনুমোদন ছিল কি না এবং পরিবেশগত ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

মৌচাক বিটের ভান্নারা মৌজায় আগে উদ্ধার করা জমি আবারও দখল হওয়ার অভিযোগ বিশেষভাবে সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সেখানে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৪ কোটি টাকা মূল্যের জমির প্রায় ৭০ শতাংশ উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কাঁটাতারের বেড়া ও খুঁটি কেটে ওই জমিতে আবারও মার্কেট নির্মাণের কাজ শুরু হয়। বনপ্রহরী আমিনুল, জামাল ও মোবারকের সহযোগিতায় রাতের বেলায় পুনরায় দখল কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি সার্ভেয়ার রনি হোসেন সরেজমিনে জমি মেপে দখলের প্রমাণ পেয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। তারপরও গত দুই মাসে সেখানে উচ্ছেদ অভিযান না চালানোর কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করতে গেলে বিট কর্মকর্তা শাজাহান সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বাড়ইপাড়া বনবিটে প্রায় এক হাজার বিঘা বনভূমি দখলের প্রতিযোগিতা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় শাহ আলম নামের এক ব্যক্তির বক্তব্যও আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ক্যামেরার সামনে বনভূমিতে ঘর নির্মাণের জন্য বিট অফিসে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্যের অর্থ হলো, টাকা না দিলে সেখানে ঘর নির্মাণ করা সম্ভব নয়। একইভাবে আশরাফ নামের আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার কক্ষের পাকা বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। তিনি বন বিভাগকে ম্যানেজ করে স্থাপনা নির্মাণের কথা প্রকাশ্যে বলেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

এসব ঘটনার সামগ্রিক চিত্রে ঢাকা বন বিভাগের ডিএফও বশিরুলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন বিটে অনিয়ম ও বনভূমি দখলের ঘটনা চলতে থাকলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি সরকারি বন বিভাগের গেস্টহাউস আত্মীয়স্বজন নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, গেস্টহাউস ব্যবহারের রেজিস্টার, দাপ্তরিক নির্দেশনা এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা অপরাধে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বনভূমি দখল, গাছ কাটা এবং অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিই নয়, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও বড় হুমকি। বিশেষ করে উদ্ধার করা জমি আবারও দখল হয়ে যাওয়ার ঘটনা বন বিভাগের নজরদারি ও আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। তাই চন্দ্রা, মৌচাক, রাথুরা, কাশিমপুর ও বাড়ইপাড়া বনবিটের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার দাবি উঠেছে।

অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং প্রয়োজন হলে স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জমির রেকর্ড, উচ্ছেদ অভিযানের নথি, গাছ কাটার ঘটনা, বদলির আদেশ, অবৈধ স্থাপনার তালিকা এবং কথিত অর্থ লেনদেনের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ডিএফও বশিরুল, সংশ্লিষ্ট বিট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণের মাধ্যমে সরকারি বনভূমি উদ্ধার ও সংরক্ষণের কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।




রেলের মেগা প্রকল্পে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ, আল ফাত্তাহ ও সুবক্তগীনকে ঘিরে প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ রেলওয়ের একাধিক বড় উন্নয়ন প্রকল্পে দরপত্র মূল্যায়ন, প্রকল্পের ব্যয়, ঠিকাদার নির্বাচন, কেনাকাটা এবং সরকারি জমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। যমুনা রেলসেতু, কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু এবং সিডিআরপিসহ বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম, অডিট আপত্তি উপেক্ষা, অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা এবং রেলের জমি অবৈধভাবে দখলের মতো বিষয় সামনে এসেছে। এসব অভিযোগে রেলওয়ের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) মো. সুবক্তগীনের নাম আলোচনায় এসেছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি উঠেছে।

যমুনা রেলসেতু প্রকল্পে সবচেয়ে বড় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের বিশেষ নিরীক্ষায় ৩৪টি আপত্তি তোলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব আপত্তির সঙ্গে প্রায় ৩ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকার অনিয়মের বিষয় যুক্ত রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্র মূল্যায়নের সময় কিছু প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা ও শর্ত পূরণের বিষয় নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও তাদের কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে দরপত্রের মূল শর্ত পরিবর্তন এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের আপত্তি উপেক্ষা করার অভিযোগও রয়েছে।

প্রকল্পটির দর নির্ধারণ ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের হাতে লেখা একটি নোটের মাধ্যমে প্রাক্কলিত দর নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছিল। এ ছাড়া চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ না করে ঠিকাদারকে ১ হাজার ৭২৬ কোটি টাকার সুবিধা দেওয়া, বাজারদরের তুলনায় বেশি দামে মালামাল কিনে ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় এবং অনুমোদিত নকশা ছাড়াই ১২৭ কোটি টাকা খরচ দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণের জন্য ১১৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয়ের বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

যমুনা রেলসেতু প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য জাপান থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা কিছু গাড়ির অবস্থান নিয়েও নিরীক্ষায় প্রশ্ন তোলার কথা বলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরেজমিনে এসব গাড়ির হদিস পাওয়া যায়নি। গাড়িগুলো কোথায় রয়েছে, কারা ব্যবহার করেছে এবং প্রকল্পের কাজে সেগুলোর ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। নিরীক্ষায় উত্থাপিত আপত্তি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রেও যোগ্যতা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের আন্তর্জাতিক টিম লিডার পদে নিয়োগের জন্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি থাকার শর্ত ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্যামবো-জেভির প্রস্তাবিত একজন প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কৃষি প্রকৌশলসংশ্লিষ্ট ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান একটি চিঠির মাধ্যমে ওই ডিগ্রিকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমমান হিসেবে বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে নিয়োগের শর্ত যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, সংশ্লিষ্ট শিক্ষাগত সনদ ও মূল্যায়ন নথি যাচাই করে তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

এই ঘটনায় মো. সুবক্তগীনের নামও এসেছে। তিনি রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রকল্পটির বিভিন্ন কার্যক্রমে ভূমিকা রেখেছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ এবং কাজের মান নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অতীতেও অভিযোগ ওঠার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায় পৌঁছায়।

দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে তমা কনস্ট্রাকশনসহ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিল ছাড়ের সময় কমিশন নেওয়া, কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই বিল অনুমোদন এবং ঠিকাদারদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও ম্যাক্স ও তমা গ্রুপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অব্যাহত থাকার কথাও বলা হয়েছে।

রেলওয়ের আরেকটি প্রকল্পে ম্যাক্স গ্রুপের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামকে কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্রের ITB 37.4 শর্তে WD-1 ও WD-2 নামের দুটি প্রধান চুক্তির কাজ পেতে দরদাতাদের সম্মিলিত বার্ষিক টার্নওভার কমপক্ষে ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ম্যাক্সের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ ২০৮ দশমিক ১৭ মিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, নির্ধারিত আর্থিক সক্ষমতার শর্ত পূরণে প্রায় ১১ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি থাকার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, অন্যান্য দরদাতার ক্ষেত্রে ছোটখাটো কাগজপত্র বা পরীক্ষার প্রতিবেদনে ঘাটতি থাকলেও তাদের প্রস্তাব বাতিল করার নজির রয়েছে। অথচ ম্যাক্সের আর্থিক সক্ষমতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে প্রায় ১ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের যুক্তি দেখিয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সম্মতি চাওয়ার জন্য একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরির অভিযোগও উঠেছে। তবে প্রকৃত সাশ্রয়ের হিসাব, দরপত্রের শর্ত শিথিল করার বৈধতা এবং এডিবির কাছে প্রস্তাব পাঠানো বা অনুমোদনের বিষয়টি নথির মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর্থিক সক্ষমতা যাচাই না করে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রকল্পের সময়সীমা, কাজের মান এবং সরকারি অর্থের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

প্রকল্পের বাইরেও রেলওয়ের সরকারি জমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রেলওয়ের ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়ালের ২০৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রেলের জমি রক্ষা এবং অবৈধ দখল প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দায়িত্ব রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু রাজধানীর খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় রেলের জমিতে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে খিলগাঁও এলাকায় রেলের জমিতে ৫৬০টিরও বেশি স্থায়ী বাণিজ্যিক দোকান গড়ে ওঠার দাবি করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, এসব স্থাপনা থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয় এবং এর সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশ থাকতে পারে।

সরকারি জমি অবৈধভাবে দখল হয়ে থাকলে তা উদ্ধার, দখলদারদের পরিচয় শনাক্ত এবং জমি ব্যবহারের বিনিময়ে কোনো অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জমিগুলো ইজারা দেওয়া হয়েছিল কি না, ইজারা থাকলে তা নিয়ম মেনে দেওয়া হয়েছে কি না এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের হিসাব ঠিক আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। কারণ রেলওয়ের জমি থেকে নিয়মিত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা এবং অবৈধ দখল বন্ধ করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

এতগুলো অভিযোগের মধ্যেও আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান ও মো. সুবক্তগীনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) এবং মো. সুবক্তগীনকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) পদে পদায়ন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাঁদের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে রেলওয়ের বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে পদায়ন নিজে কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়; অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ তদন্ত এবং প্রমাণের আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানিয়েছেন, মেগা প্রকল্পগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক তথ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে এসেছে। বিস্তারিত তদন্তের পর দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও বর্তমান তদন্তের অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

রেলওয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু অডিট আপত্তি উত্থাপন বা তদন্তের আশ্বাস দিলেই চলবে না। দরপত্র মূল্যায়ন, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ, কেনাকাটা, শুল্কমুক্ত গাড়ির ব্যবহার এবং সরকারি জমি দখলের অভিযোগগুলো আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে। কোনো কর্মকর্তা বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা গেলে রেলওয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি বাড়বে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধ করা সহজ হবে।




ফায়ার সার্ভিসে ডিডি ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে দৈনিক ১০ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ

নিজেস্ব প্রতিনিধি: অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি উদ্ধার সেবার দায়িত্বে থাকা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। বিভাগের উপপরিচালক (ডিডি) মো. ছালেহ উদ্দিনকে ঘিরে লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্টে অর্থ আদায়, সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম, জ্বালানি ও বিভিন্ন বিল আটকে রাখা, অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশাসনিক চাপের মধ্যে রাখা এবং বদলি-পদায়নে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের নতুন ও গুরুতর অংশ হলো, কথিতভাবে ঘুষের অর্থের হিসাব সরাসরি টাকায় না লিখে কোডের মাধ্যমে একটি ডায়েরিতে সংরক্ষণ করা হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, ডিডির পিএ হিসেবে পরিচিত জাকিরের কাছে থাকা কথিত ডায়েরিতে এসব হিসাব রাখা হয়। প্রতিটি কোডের আর্থিক মূল্য ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বলে দাবি করা হয়েছে। দিন শেষে হিসাব মিলিয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে ঢাকার তেজগাঁও এলাকায় ছালেহ উদ্দিনের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।

পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন

ছালেহ উদ্দিনের পদোন্নতি নিয়েও অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন। সরকারি গেজেট অনুযায়ী, তিনি সহকারী পরিচালক থেকে উপপরিচালক/সমমান পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, পদোন্নতির আগে তাঁর বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার নেতিবাচক প্রতিবেদন ছিল এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয় উল্লেখ ছিল।

ঢাকা বিভাগে পদায়ন নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, পদোন্নতির পর ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক পদে আসতেও প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে তদবির ও অর্থ লেনদেন করা হয়েছে।

এ অভিযোগে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে নুর উদ্দিন আনিসের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

লাইসেন্সে ‘রেট’, ফায়ার রিপোর্টে ৫% কমিশন

অভিযোগের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ও ফায়ার রিপোর্ট।

অভিযোগকারীদের দাবি, নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ হাজার বর্গফুট ফ্লোর সংযোজনের জন্য ৫ হাজার টাকা এবং ফায়ার রিপোর্টের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কমিশনের একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে।

আরও অভিযোগ, প্রত্যাশিত অর্থ না পেলে ফাইল আটকে রাখা হয় এবং সংশ্লিষ্ট রিপোর্টে স্বাক্ষর করতে গড়িমসি করা হয়।

অভিযোগকারীদের একজন দাবি করেছেন, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ অর্থ আদায় করা হয়।

কোডে টাকার হিসাব রাখার অভিযোগ

ঘুষ-বাণিজ্যের অভিযোগকে আরও গুরুতর করেছে কথিত ‘কোড হিসাবের’ বিষয়টি।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, টাকা আদায়ের হিসাব সরাসরি টাকার অঙ্কে না লিখে বিভিন্ন কোডে লেখা হয়। প্রতিটি কোডের মূল্য ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বলে দাবি করা হয়েছে।

পিএ জাকিরের কাছে থাকা একটি ডায়েরিতে এই হিসাব সংরক্ষিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

দিন শেষে টাকা ‘সেটেলমেন্ট’

অভিযোগে বলা হয়েছে, সারা দিনের কথিত অর্থ আদায়ের পর দিনের শেষে কোড অনুযায়ী হিসাব করা হয় এবং অর্থ বুঝে নেওয়া হয়।

আরও দাবি করা হয়েছে, বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ গাড়িতে করে সংগৃহীত অর্থ তেজগাঁওয়ে ছালেহ উদ্দিনের বাসায় পৌঁছে দেন।

৪০–৫০ লাখ টাকার কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ

অভিযোগপত্রে ছালেহ উদ্দিনের দায়িত্বকালে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার কেনাকাটা নিয়মবহির্ভূতভাবে সম্পন্ন করার দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, স্টেশনারি, গাড়ির পাম্পসহ বিভিন্ন খাতের অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে এসব ব্যয় ‘আসবাবপত্র’ ক্রয়ের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে।

জ্বালানি ও বিল আটকে থাকার অভিযোগ

অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা বিভাগের কয়েকটি ফায়ার স্টেশনে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন এবং খাবারের বিল নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে।

বারিধারা ফায়ার স্টেশনের জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও সংকটের কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ফিলিং স্টেশনগুলো জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

‘মাসোহারা’ না দিলে ছুটি বন্ধের অভিযোগ

অধীনস্থ সিনিয়র স্টেশন অফিসার ও ডিএডিদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ না পেলে ছুটি আটকে দেওয়া বা প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সিনিয়র স্টেশন অফিসারদের সাপ্তাহিক ছুটি নিয়েও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

বদলি ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ

ছালেহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অতীতে বদলি-বাণিজ্য ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগও ওঠার কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে সহকারী পরিচালক আনিসের নামও এসেছে, যিনি আর্থিক লেনদেন পরিচালনায় ভূমিকা রাখেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে ডিডি ছালেহ উদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।




রাজউকের জোন-৫/১-এ নকশা অনুমোদন নিয়ে ঘুষ দাবির অভিযোগ, ফাইল আটকে হয়রানির দাবি সেবাগ্রহীতাদের

বিশেষ প্রতিবেদক: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জোন-৫/১ কার্যালয়ে ভবনের নকশা অনুমোদন, ফাইল নিষ্পত্তি ও অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত অথরাইজড অফিসার সাইদা ইসলামের বিরুদ্ধে বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি, অনুমোদনের ফাইল আটকে রাখা এবং মোবাইল কোর্টের নামে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। তাঁদের দাবি, সরকারি নিয়মে সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও অতিরিক্ত টাকা দিতে না চাইলে কাজ এগোয় না।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ থেকে ছয়তলা আবাসিক ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, ভবনের উচ্চতা ছয়তলা হোক কিংবা ১০ থেকে ১২ তলা, নকশা অনুমোদনের ফাইল এগিয়ে নিতে বড় অঙ্কের অর্থ চাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে নির্মাণসামগ্রীর খরচ, সরকারি ফি এবং অন্যান্য ব্যয়ের পাশাপাশি বাড়তি অর্থের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বাড়ির মালিকেরা। তাঁদের প্রশ্ন, নিয়ম অনুযায়ী ফি পরিশোধের পরও যদি নকশা অনুমোদনের জন্য অতিরিক্ত লাখ লাখ টাকা দিতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের পক্ষে বৈধভাবে ভবন নির্মাণ করা কতটা সম্ভব?

একাধিক অভিযোগকারীর দাবি, ঘুষের পরিমাণ নিয়ে আপত্তি জানালে সাইদা ইসলাম নাকি বলেছেন, এই অর্থ শুধু তাঁর কাছে থাকে না; পরিচালক থেকে শুরু করে ওপরের পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও ভাগ দিতে হয়। তবে কথিত এই বক্তব্যের পক্ষে কোনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে অভিযোগে যাঁদের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তাঁদের কারও বিরুদ্ধে নির্দিষ্টভাবে দায় চাপানোর সুযোগ নেই।

অবৈধ ও অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মিত ভবনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো ভবনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পরও নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে না। কোথাও বিদ্যুৎ বা গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা কিংবা মিটার খুলে নেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে আবার নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি। তাঁদের মতে, শুধু সাময়িক ব্যবস্থা নিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে অবৈধ নির্মাণ বন্ধ করা সম্ভব নয়।

রাজউকের মাঠপর্যায়ের ইমারত পরিদর্শকদের কাজেও হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে সাইদা ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কোনো পরিদর্শক নিয়ম অনুযায়ী ভবনের বিরুদ্ধে নোটিশ দেওয়া বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিলে তাঁকে আগে অথরাইজড অফিসারকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এ কারণে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মালিকানাধীন কিছু ভবনের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোন ভবনে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে এবং কোন কর্মকর্তা কী নির্দেশ দিয়েছেন, তা নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক সূত্রের দাবি, সাইদা ইসলামের ব্যক্তিগত আইডিতে অনুমোদনের অর্ধশতাধিক ফাইল আটকে রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ফাইল পড়ে থাকায় আবেদনকারীদের বারবার রাজউক কার্যালয়ে যেতে হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ায় ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা, অর্থ বিনিয়োগ ও অন্যান্য কাজেও বিঘ্ন ঘটছে। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, অতিরিক্ত অর্থের চাহিদা পূরণ না হলে কিছু ফাইলের কাজ এগোয় না।

আইন অনুযায়ী, অনুমোদিত নকশা ও নির্ধারিত শর্ত ভঙ্গ করে ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এবং প্রযোজ্য বিধিমালার আওতায় সংশ্লিষ্ট নির্মাণের ধরন ও অপরাধের ভিত্তিতে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় ঘুষ দাবি বা গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রযোজ্য দুর্নীতিবিরোধী আইন ও সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থায় নকশা অনুমোদন ও ভবন তদারকির কাজে অনিয়ম হলে তার প্রভাব শুধু বাড়ির মালিকদের ওপর পড়ে না, নগর পরিকল্পনা, ভবনের নিরাপত্তা এবং জনস্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই জোন-৫/১ কার্যালয়ে জমা থাকা ফাইলের অবস্থা, অনুমোদনের প্রক্রিয়া, মোবাইল কোর্টের প্রতিবেদন এবং অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।

অভিযোগের বিষয়ে সাইদা ইসলামের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে, অভিযোগকারীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি নির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর সরাসরি উত্তর না দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুন ও বিধিমালার কথা উল্লেখ করেন।

এ পরিস্থিতিতে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগকারীরা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, নকশা অনুমোদনের ফাইল, সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তথ্য, মোবাইল কোর্টের নথি এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি রাজউকের সেবা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।




চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে পণ্য ছাড় নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ, আলোচনায় দুই কর্মকর্তা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। সহকারী কমিশনার (এসি) ওমর কাউসার এবং রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন কান্তি বিশ্বাসের বিরুদ্ধে পণ্য ছাড়ে অযথা দেরি, ফাইল আটকে রাখা এবং অনৈতিকভাবে টাকা আদায়ের চাপ তৈরির অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও সিএন্ডএফ কর্মচারী। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন অজুহাতে পণ্য ছাড়ের কাজ দীর্ঘায়িত করায় ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম বন্দরের পিসিটিসহ পাঁচটি আনস্টাফিং গেটকে কেন্দ্র করে নিয়মিত অর্থ আদায়ের একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তাঁদের দাবি, প্রতিটি গেট থেকে সপ্তাহে দেড় লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। এভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও পণ্য খালাসের স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক পণ্য ছাড় করাতে গিয়ে সিএন্ডএফ কর্মচারীদের বিভিন্ন পর্যায়ে বাধার মুখে পড়তে হয়। পণ্য খালাসের জন্য সহকারী কমিশনার ওমর কাউসারের অনুমতি প্রয়োজন বলে জানিয়ে তাঁদের তাঁর কার্যালয়ে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট গেটের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা পণ্য পরীক্ষা করার পরও আবার পরীক্ষা করার কথা বলে ছাড়পত্র দিতে দেরি করা হয় বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের অভিযোগ, এভাবে একই পণ্য নিয়ে বারবার যাচাইয়ের কথা বলায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

সিএন্ডএফ কর্মচারীদের অভিযোগ, কোনো দিন পণ্য পরীক্ষা না করে পরদিন আসতে বলা হয়, আবার কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন থাকার পরও ফাইল আটকে রাখা হয়। এতে পণ্য খালাসের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যায়। বন্দরে পণ্য পড়ে থাকলে ডেমারেজসহ বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় ব্যবসায়িক ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই আর্থিক চাপের কারণে কিছু ব্যবসায়ী ও তাঁদের প্রতিনিধিরা বাধ্য হয়ে অনৈতিক অর্থের দাবি মেনে নেওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েন।

এমবিবি আনস্টাফিং গেটের দায়িত্বে থাকা রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন কান্তি বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের দাবি, তিনি নিয়মিত সহকারী কমিশনারের কার্যালয়ে যাতায়াত করেন এবং পণ্য ছাড়ের কাজ বিলম্বিত হওয়ার ঘটনাগুলোর সঙ্গে তাঁর ভূমিকা রয়েছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া কোনো নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযোগের প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট নথি, পণ্য পরীক্ষার সময়সূচি, ফাইল নিষ্পত্তির তথ্য এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারীর অভিযোগ, পণ্য ছাড়ের কাজে দেরি হলে ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে থাকেন। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে অর্থ দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে তাঁর দাবি। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পণ্য দ্রুত ছাড় করানোর তাগিদে ব্যবসায়ীরা একদিকে অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কায় থাকেন, অন্যদিকে তাঁদের পণ্য কখন পরীক্ষা করা হবে বা কখন ছাড়পত্র পাওয়া যাবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় ভোগেন।

ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানানোর পর এবং সংবাদ প্রকাশের পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং তাঁদের হয়রানি বেড়েছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন সিএন্ডএফ কর্মচারী। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের বেশির ভাগ সময় অপেক্ষা করিয়ে রাখার পর রাত ১০টা থেকে ১১টার দিকে জানানো হয় যে পণ্য পরদিন পরীক্ষা করা হবে। ফলে পণ্য ছাড়ের জন্য আরও এক দিন অপেক্ষা করতে হয় এবং ডেমারেজসহ অতিরিক্ত খরচ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের বিলম্বের কারণে পণ্য দ্রুত ছাড় করাতে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চাপও তৈরি হয়।

এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে পণ্য পরীক্ষার রেকর্ড, ফাইল আটকে থাকার কারণ, গেটভিত্তিক কার্যক্রম, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন এবং কথিত অর্থ লেনদেনের তথ্য পরীক্ষা করা জরুরি। একই সঙ্গে যেসব ক্ষেত্রে পণ্য ছাড়ে অস্বাভাবিক বিলম্ব হয়েছে, সেগুলোর কারণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। নিয়ম অনুযায়ী কোনো পণ্য পরীক্ষা বা ছাড়পত্রের জন্য অতিরিক্ত যাচাই দরকার হলে তার কারণ ও প্রক্রিয়া স্পষ্ট থাকা উচিত, যাতে ব্যবসায়ীরা অযথা হয়রানির শিকার না হন।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও সিএন্ডএফ কর্মচারীরা। তাঁদের মতে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা দরকার। তদন্তে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অবৈধ অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি পণ্য ছাড়ের প্রক্রিয়ায় অযথা বিলম্ব বন্ধ করে ব্যবসায়ীদের হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ সম্পর্কে কী জানে, কোনো তদন্ত শুরু হয়েছে কি না এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। সহকারী কমিশনার ওমর কাউসার এবং রাজস্ব কর্মকর্তা সুমন কান্তি বিশ্বাসের বক্তব্যও এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে যুক্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণই হতে পারে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনার কার্যকর উপায়।