৭ বছরে কোটিপতি: রাজউকের ইমারত পরিদর্শক নির্মল মালোর বিরুদ্ধে ঘুষ ও সম্পদ পাহাড়ের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত একটি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, এখানে চাকরিতে ঢুকেই অল্প কয়েক বছরের মধ্যে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে গেছেন। ঘুষ, অনিয়ম আর ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা রহস্যজনক কারণে আলোর মুখ দেখে না। এমনই এক আলোচিত নাম রাজউকের ইমারত পরিদর্শক নির্মল মালো, যিনি মাত্র সাত বছরে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

নির্মল মালোর বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া পৌরসভা এলাকায়। তার বাবা নিত্য মালো পেশায় একজন মাছ বিক্রেতা ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্মল মালো একসময় বেকার ও ভবঘুরে জীবন যাপন করতেন। ২০১৮ সালে গোপালগঞ্জের এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার সুপারিশে ছাত্রলীগের কোটায় রাজউকে ইমারত পরিদর্শক পদে তার নিয়োগ হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই নিয়োগ প্রক্রিয়াও ছিল নিয়মবহির্ভূত—এমন অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই নির্মল মালো ঘুষ ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ। ভবন মালিকদের নিয়মিত ভয়ভীতি দেখিয়ে জিম্মি করে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র ও নকশা অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও ঘুষ না দিলে ভবন ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো বলে একাধিক ভবন মালিক জানিয়েছেন। আবার যেসব ভবনে নকশার ব্যত্যয় ঘটেছে, সেগুলো অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করে দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।

রাজউকের জোনাল অফিস ৪/৩-এর আওতাধীন দক্ষিণ খান এলাকার আর্মি সোসাইটি রোড, চালাবন, নোয়াপাড়া, আমতলা, কালভার্ট, কেন্দ্রীয় শাহী মসজিদ, আইনুছ বাগ ও কলেজ রোড এলাকায় একাধিক ভবনে নিয়মবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগ উঠেছিল। এসব ভবনের অনেকগুলোতে সাইনবোর্ড ছিল না, শ্রমিক ও পথচারীদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সেফটিনেটও ব্যবহার করা হয়নি। নকশা অনুযায়ী সেটব্যাক না রেখে চারপাশে ইচ্ছেমতো ডেভিয়েশন করা হলেও নির্মল মালো পরিদর্শনের সময় ভবন মালিকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে সবকিছু উপেক্ষা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভবন মালিক জানান, তার ভবনের সব অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও নির্মল মালো ভাঙার ভয় দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ রাজউকের চেয়ারম্যান বরাবর দেওয়া হলেও রহস্যজনক কারণে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই সাত বছরে নির্মল মালো বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে জানা গেছে। বাবার পুরোনো টিনের ঘর ভেঙে পাকা বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়েছে। অভিযোগ আছে, প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করে তার বাবা নিত্য মালোকে উপজেলা মৎস্যজীবী লীগের সাধারণ সম্পাদক বানানো হয়, যার ফলে পরিবারের প্রভাব আরও বেড়ে যায়।

কোটালীপাড়ার বাগান উত্তর পাড়া গ্রামে ১০ কাঠা জমির ওপর একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে ইতিমধ্যে কয়েক কোটি টাকা খরচ হয়েছে। নিত্য মালোর স্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেছেন যে বাড়িটি নির্মল মালোরই। ঢাকার আফতাব নগরের ডি-ব্লকের ৫ নম্বর সড়কে লেকভিউ কটেজের সি-২ ফ্ল্যাট প্রায় এক কোটি টাকা দিয়ে নিজের নামে কেনা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

এছাড়া কোটালীপাড়ায় ‘ক্যাফে জয়বাংলা’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি অনুযায়ী, উত্তর পাড়ায় ২০ বিঘা জমির ওপর পোল্ট্রি ফার্ম, কান্দি ইউনিয়নের আমবাড়িতে ৪০ বিঘা জমিতে মাছের ঘের এবং উজিরপুরের সাতলায় ৩৫ বিঘা জমিতে মাছের ঘের রয়েছে নির্মল মালোর নামে ও বেনামে। কুড়িল বিশ্বরোডে একটি প্লট এবং ওয়ারী ও মগবাজারে একাধিক ফ্ল্যাট থাকার কথাও শোনা যাচ্ছে, যার বেশিরভাগই তার স্ত্রী উর্মি সাহা ও পরিবারের সদস্যদের নামে কেনা হয়েছে—আইনের চোখ ফাঁকি দেওয়ার উদ্দেশ্যে।

রাজউকের কয়েকজন কর্মচারীর ভাষ্য অনুযায়ী, নির্মল মালো নিয়মিত অফিসে আসেন না। দামি বিদেশি সিগারেট খাওয়ায় তার মাসিক খরচই কয়েক দশ হাজার টাকা, যা তার সরকারি বেতনের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বর্তমানে তিনি রাজউকের মহাখালী জোন (৪/৩)-এ চলতি দায়িত্বে ইমারত পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত।

দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজন হলে অনুসন্ধান চালানো হবে। তবে এত অভিযোগ ও সম্পদের পাহাড় থাকার পরও কীভাবে একজন দশম গ্রেডের কর্মকর্তা এত অল্প সময়ে এত বিপুল অর্থের মালিক হলেন—এই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।




নারী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের হয়রানির অভিযোগের তীর কানাডিয়ান ট্রিলিনিয়াম স্কুলের এমডির বিরুদ্ধে : তদন্তের দাবি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত কানাডিয়ান ট্রিলিনিয়াম স্কুল (সিটিএস) এবং মালিবাগ ও ওয়ারীতে অবস্থিত কানাডিয়ান ট্রিলিনিয়াম ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (সিটিআইএস)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাহমুদুর রহমান পিয়ালের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষক ও নারী কর্মকর্তাদের হয়রানি এবং কর্মক্ষেত্রে অনৈতিক আচরণের অভিযোগ উঠেছে।

একাধিক বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক-কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত স্টাফদের একটি বড় অংশ নারী। তাঁদের দাবি, নিয়োগ, পদোন্নতি ও চাকরি বহাল রাখার ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি প্রভাব ফেলেছে বলে তাঁদের ধারণা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এমডি মাহমুদুর রহমান পিয়ালের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে প্রশ্ন :
প্রতিষ্ঠানের এক নারী কর্মকর্তা দাবি করেন, কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার তুলনায় অন্যান্য বিবেচনায় নিয়োগ ও পদোন্নতির সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে স্কুলের একজন বিদেশি নাগরিক ভাইস প্রিন্সিপালের নিয়োগ প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন।

তাঁর ভাষায়, “যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার বাইরে অন্য কোন বিবেচনায় এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে— তা কর্তৃপক্ষই স্পষ্ট করতে পারে।” এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ভাইস প্রিন্সিপাল অথবা স্কুল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ :
একাধিক নারী শিক্ষক অভিযোগ করেন, কর্মক্ষেত্রে তাঁদের মানসিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা নেই। তাঁদের মতে, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করতে গেলে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়।
তবে স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো লিখিত নীতিমালা বা অভিযোগ কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগের প্রতিক্রিয়া : সম্প্রতি একজন শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্কুল সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা তুলে ধরে একটি পোস্ট দেন বলে জানা গেছে। ওই পোস্ট ঘিরে শিক্ষাঙ্গনে আলোচনার সৃষ্টি হলেও পরবর্তীতে পোস্টটি আর দৃশ্যমান নেই। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গ্রুপের প্রশাসকদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

কর্তৃপক্ষের নীরবতা : এ বিষয়ে স্কুল পরিচালনা পর্ষদ, এমডি মাহমুদুর রহমান পিয়াল এবং প্রশাসনিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আইন কী বলে : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা–২০০৯ অনুসারে— প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ গ্রহণ কমিটি থাকা বাধ্যতামূলক, ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখার নিশ্চয়তা দিতে হয়, অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই নীতিমালার বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর, সে প্রশ্নও উঠেছে।

মানবাধিকার দৃষ্টিকোণ :
মানবাধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা একটি মৌলিক অধিকার। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত না হলে তা প্রশাসনিক ও নৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই গুরুতর ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

শেষ কথা : কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দায় নয়— এটি রাষ্ট্র ঘোষিত মানবাধিকার অঙ্গীকারের অংশ। উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করাই এখন সময়ের দাবি।




গণপূর্তে বিধি লঙ্ঘনের মহোৎসব: আদালতের আদেশ উপেক্ষা, দ্বৈত বেতন ও অবৈধ পদোন্নতিতে জাহাঙ্গীর আলমের উত্থান

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাবেক ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে একের পর এক ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য সামনে আসছে। অবৈধ নিয়োগ, বিধিবহির্ভূত পদোন্নতি, আদালতের আদেশ প্রকাশ্যে অমান্য এবং একই সময়ে দুই সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন উত্তোলনের মতো গুরুতর অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন মোঃ জাহাঙ্গীর আলম। সংশ্লিষ্ট নথি ও অভ্যন্তরীণ সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বছরের পর বছর ধরে একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতির নেটওয়ার্ক প্রশাসনের ভেতরেই সক্রিয় রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আদালতের স্পষ্ট স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের একটি গোষ্ঠীকে সরাসরি উচ্চতর পদে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী এ ধরনের সরাসরি নিয়োগ ‘ব্লক পোস্ট’ হিসেবে বিবেচিত, যেখানে পরবর্তী পদোন্নতির সুযোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু নিয়মের তোয়াক্কা না করে ষষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব কর্মকর্তাকে পরবর্তীতে পঞ্চম গ্রেডে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা সম্পূর্ণভাবে বিধিবহির্ভূত বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে মোঃ জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তিনি একই সময়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) থেকে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়মিত বেতন গ্রহণ করেছেন এবং একই সময় গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পদেও এককালীন বেতন উত্তোলন করেছেন। বেতন উত্তোলনের সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী একই সময়ে দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন গ্রহণ গুরুতর অপরাধ হলেও জাহাঙ্গীর আলম আজও নির্বিঘ্নে চাকরিতে বহাল রয়েছেন।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, সাবেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা বদরুল আলম খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন ধরে দরপত্র বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বদরুল আলম খানের ডানহাত হিসেবে পরিচিত থাকায় বিভাগের ভেতরে তার প্রভাব ছিল প্রশ্নাতীত। অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে বিভাগের বহু কর্মকর্তা তার ভয়ে নীরব থাকতে বাধ্য হন।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, এ অবৈধ নিয়োগ ও পদোন্নতির পেছনে সক্রিয় ভূমিকা ছিল সাবেক পূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূইয়া এবং রফিকুল ইসলামের। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও এসব নিয়োগে প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ছিল। একই সঙ্গে দাবি করা হচ্ছে, অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব প্রকৌশলী শুধু রাজনৈতিক ক্যাডার হিসেবেই পরিচিত নন, বরং জুলাই আন্দোলনের বিপরীতে ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। কয়েকজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলায় অর্থদাতা হিসেবে নাম থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।

এদিকে আদালতের নির্দেশে ১৭ জন বিসিএস কর্মকর্তার পদ সংরক্ষণের আদেশ থাকলেও গণপূর্ত অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তা আজও কার্যকর করেনি। বরং অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিসিএস কর্মকর্তাদের ওপরে জ্যেষ্ঠতা দিয়ে গ্রেডেশন তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর ভুক্তভোগী বিসিএস কর্মকর্তারা গ্রেডেশন পুনর্নির্ধারণের আবেদন জানালেও তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোঃ শামীম আখতার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলিয়ে রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আদালতের আদেশের প্রকাশ্য অবমাননা এবং স্বৈরাচারী দোসরদের অবৈধ সুবিধা টিকিয়ে রাখার কৌশল।

প্রশাসনের ভেতরেও এই অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জনপ্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই ধরনের পদোন্নতি কোনোভাবেই বিধিসম্মত হতে পারে না এবং এর পেছনে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ছাড়া এমন ঘটনা সম্ভব নয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলেন, আদালতের স্থগিতাদেশের মধ্যে যোগদান এবং একই সময়ে দুই দপ্তর থেকে বেতন উত্তোলন সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ আত্মসাতের শামিল। তার মতে, দুর্নীতি দমন কমিশনের উচিত জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে অবৈধভাবে উত্তোলিত অর্থ উদ্ধার করা এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়—আদালতের আদেশ, সরকারি চাকরি বিধি এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা উপেক্ষা করে কীভাবে বছরের পর বছর ধরে এমন ভয়াবহ অনিয়ম চলতে পারে? কোন ‘অদৃশ্য শক্তি’র ছত্রছায়ায় আজও বহাল রয়েছে এই দুর্নীতির নেটওয়ার্ক? জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।




ক্ষমতার ছায়ায় এলজিইডির প্রকৌশলী শাহাদাত হোসেন: দুর্নীতির অভিযোগে তোলপাড়

বিশেষ প্রতিবেদকঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) রাজশাহী অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো: শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী আব্দুস সামাদের স্বাক্ষর করা একটি লিখিত অভিযোগ দুর্নীতিদমন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগের সূত্র ধরে মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে তার দীর্ঘ কর্মজীবনে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা চিত্র উঠে এসেছে।

মো: শাহাদাত হোসেন ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৪ সালে এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পান। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করেই তিনি দ্রুত পদোন্নতি ও কাঙ্ক্ষিত পোস্টিং বাগিয়ে নেন।

বিশেষ করে বাগেরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য শেখ হেলালের ছেলে শেখ তন্ময়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে শেখ হেলালের তদবিরে মো: শাহাদাত হোসেন বাগেরহাট জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পান। সেখানে তিনি টানা প্রায় আট বছর দায়িত্ব পালন করেন। এই দীর্ঘ সময়ে স্থানীয় আওয়ামীপন্থী ঠিকাদারদের সঙ্গে তার গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বাগেরহাটে দায়িত্ব পালনকালে প্রায় সব উন্নয়ন কাজের টেন্ডারই অনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের হাতে তুলে দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন, কোন কাজ কে পাবে—তা আগেই ঠিক হয়ে যেত। প্রকাশ্যে দরপত্র হলেও বাস্তবে সিদ্ধান্ত হতো গোপন আলোচনায়। শাহাদাত হোসেনের সময়ে টেন্ডার বাণিজ্য ছিল “ওপেন সিক্রেট”।

ঠিকাদারদের দাবি, প্রতিটি টেন্ডার অনুমোদনের সময় তিনি ৫ শতাংশ এবং কাজের বিল ছাড় করার সময় আরও ২ শতাংশ অর্থ আদায় করতেন। এই কারণেই অনেক ঠিকাদার তাকে নাম ধরে না ডেকে ‘৫ শতাংশ’ নামেই চিনতেন। শুধু তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে কাজ না করেই বিল তুলে সেই টাকা ঠিকাদারদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

দুর্নীতির বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আসতে শুরু করলে পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি তৎকালীন মন্ত্রী তাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাগেরহাট থেকে সুনামগঞ্জে বদলি নেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে আরও বড় অঙ্কের ঘুষ দিয়ে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী আলী আকতারের সহায়তায় রাজশাহী অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদে পদায়ন হন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে রাজশাহী অঞ্চলেও একই কৌশলে তিনি অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিল প্রত্যয়ন দিতে ২ শতাংশ এবং তদন্ত কার্যক্রমে ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ আদায় করার প্রমাণ মিলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে।

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—সরকার পরিবর্তনের পর তিনি হঠাৎ রাজনৈতিক অবস্থান বদলে ফেলেছেন। আগে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রী তাজুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত থাকলেও এখন নিজেকে বিএনপির কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করে পুরোনো অপরাধগুলো আড়াল করার চেষ্টা করছেন বলে এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিশ্চিত করেছেন।

এছাড়া এলজিইডির এমএমটি (মেকানিক্যাল মেইনটেন্যান্স ট্রেনিং) ও যান্ত্রিক শাখার বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তদন্তে আরও জানা গেছে, বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন সম্পদের মালিক তিনি। অভিযোগ অনুযায়ী, তার নামে ও বেনামে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় দুটি ফ্ল্যাট, পূর্বাচলে দুটি প্লট, কল্যাণপুরে সাততলা ভবন, চট্টগ্রামে ছয়তলা একটি ভবন, চাঁদপুরে একটি বাড়ি এবং বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা রয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় শত কোটি টাকার কাছাকাছি।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো: শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

আইনি দিক থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাইকোর্ট একাধিক রায়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে কর্তৃপক্ষ চাইলে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রেখে তদন্ত করতে পারে এবং সেটাই সঠিক পদ্ধতি। একাধিক মামলার রায়ে বলা হয়েছে, দায়িত্বে রেখে তদন্ত করলে তা সুষ্ঠু তদন্তের পরিপন্থী এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

দুর্নীতিদমন কমিশন আইন ২০০৪ অনুযায়ী, দুদক অভিযোগ পেলেই অথবা স্বপ্রণোদিত হয়েও তদন্ত শুরু করতে পারে। এলজিইডির ভেতরের মহলে এখন একটাই প্রশ্ন—এতসব গুরুতর অভিযোগের পর মো: শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়।




দুর্নীতির অভিযোগের মাঝেই বালিশকান্ডের অন্যতম হোতা আশরাফুল ইসলামক ই/এম সার্কেল–২ এ পদায়ন

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। এই প্রতিষ্ঠানে অনেক সৎ, মেধাবী ও দক্ষ প্রকৌশলী কাজ করছেন। তবে কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কারণে পুরো দপ্তরের সুনাম আজ প্রশ্নের মুখে। সেই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেক্ট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল বিভাগের প্রকৌশলী ডক্টর আশরাফুল ইসলাম।

অভিযোগ রয়েছে, ডক্টর আশরাফুল ইসলাম প্রায় আট বছর ধরে ঢাকায় একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল আছেন, যা সরকারি বদলি নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। নিয়ম অনুযায়ী কোনো নির্বাহী প্রকৌশলীর তিন বছরের বেশি একই কর্মস্থলে থাকার কথা নয়। ২০২১ সালের ৫ আগস্ট গণপূর্ত উপদেষ্টার দপ্তর থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকা প্রকৌশলীদের বদলি করতে হবে, যাতে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির সুযোগ কমে। কিন্তু সেই নির্দেশ আশরাফুল ইসলামের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বরং অভিযোগ আছে, নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা আলোচনায় থাকার পরও ২০২৩ সালের ১২ আগস্ট তাকে ভূতাপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এই প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব তাসমিন ফারহানা। পরে ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি তাকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) হিসেবে গণপূর্ত ই/এম সার্কেল–২ এ পদায়ন করা হয়। নির্বাচন কমিশনের সম্মতি নিয়ে এই পদায়ন হওয়ায় দপ্তরের ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা আরও বেড়ে যায়।যার স্বারক নং ২৫.০০.০০০০.১৩০.১২.০০৩.১৮.১০৮, তারিখ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫। এদিকে ১৫ জানুয়ারি উক্ত দুর্নীতিবাজ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিপ্রাপ্ত) ডক্টর আশরাফুল ইসলামকে তত্ত্বাধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) গণপূর্ত ই/এম সার্কেল-২ এ পদায়ন করা হয়েছে। যার স্মারক নং ২৫.০০.০০০০.১৩০.১২.০০৩.১৮-০৬, তারিখ: ১৫/০১/২০২৬ ইং। নির্বাচন কমিশনের সম্মতি নিয়ে উপরোক্ত দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী ডক্টর আশরাফুল ইসলামের পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। যা নিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে চলছে ব্যাপক আলোচনা। নানামুখী প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, আশরাফুল ইসলামের অধীনে কাজ করতে গেলে নিয়মের চেয়ে ‘ম্যানেজমেন্ট’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। অভিযোগ আছে, অনেক ক্ষেত্রে দরপত্র ছাড়াই কাজ শুরু করা হয়, পরে কাগজে-কলমে প্রাক্কলন ও টেন্ডার দেখানো হয়। ঠিকাদারদের নিয়ে একটি শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তুলে কমিশন আদায়ের ব্যবস্থাও চালু ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে আলোচিত দুর্নীতির ঘটনায় ডক্টর আশরাফুল ইসলামের নাম জড়িত ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। তিনি দুদকের একটি মামলার আসামি ছিলেন বলে জানা যায়। একই ঘটনায় অন্য কর্মকর্তারা শাস্তির মুখে পড়লেও রহস্যজনকভাবে তিনি বিভাগীয় ও দুদকের মামলায় অব্যাহতি পান। ওই ঘটনায় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জিল্লুর রহমান পদাবনতি পেলেও আশরাফুল ইসলাম বহাল থাকেন, যা বৈষম্যের অভিযোগকে আরও জোরালো করে।

এছাড়া তৎকালীন গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মেরামত ও সংস্কার কাজ দীর্ঘদিন তার অধীনে থাকায় তিনি দপ্তরের ভেতরে এক ধরনের অদৃশ্য প্রভাব তৈরি করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে একটি শক্তিশালী দুর্নীতিচক্র গড়ে উঠেছে বলে তারা মনে করছেন।

সোহবানবাগ মসজিদ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে সিভিল বিভাগের এক নির্বাহী প্রকৌশলীকে বদলি করা হলেও একই প্রকল্পে যুক্ত থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আশরাফুল ইসলামকে বহাল রাখা হয়। অনেকের মতে, আঞ্চলিক কোটা, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ের কারণেই তিনি বারবার বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন।

গণপূর্তের এক জুনিয়র প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দপ্তরে টিকে থাকতে হলে কেবল নিয়ম মানলেই হয় না, অন্য পথও জানতে হয়। তার ভাষায়, আশরাফুল ইসলাম সবাইকে ‘ম্যানেজ’ করতে জানেন বলেই তিনি এতদিন প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছেন।

এত অভিযোগ, বিতর্ক ও মামলার পরও তার পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন নিয়ে সচেতন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করছে। তাদের মতে, এটি শুধু একজন কর্মকর্তার বিষয় নয়; বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার জবাবদিহির অভাবের প্রতিফলন। এই ধারা চলতে থাকলে গণপূর্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও কার্যক্রম আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডক্টর আশরাফুল ইসলামের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।




ঢাকায় আট বছর ধরে একই পদে গণপূর্তের প্রকৌশলী আশরাফুল, বদলির বদলে পেলেন পদোন্নতি—উঠছে প্রভাব ও দুর্নীতির প্রশ্ন

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেক্ট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-১–এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম গত আট বছর ধরে ঢাকায় একই পদে বহাল রয়েছেন—যা সরকারি নীতিমালার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। নিয়ম অনুযায়ী কোনো নির্বাহী প্রকৌশলীর একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি থাকার কথা নয়। কিন্তু সেই নিয়ম উপেক্ষা করেই আশরাফুল ইসলাম দীর্ঘ সময় ধরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই দীর্ঘ সময়ের অবস্থানকে ঘিরে শুধু বদলির প্রশ্নই নয়, বরং তার বিরুদ্ধে প্রভাব খাটানো, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গড়ে তোলা এবং নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র দাবি করেছে, আশরাফুল ইসলামের অধীনে কাজ করতে গেলে নিয়মের চেয়ে “ম্যানেজমেন্ট”ই বেশি কার্যকর। অনেক ক্ষেত্রে দরপত্র ছাড়াই কাজ শুরু করা হয়, পরে প্রাক্কলন ও টেন্ডার প্রক্রিয়া দেখানো হয়—যা তার ডিভিশনে প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ।

২০২১ সালের ৫ আগস্ট গণপূর্ত উপদেষ্টা দপ্তর থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, তিন বছরের বেশি সময় ধরে একই পদে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি করতে হবে। উদ্দেশ্য ছিল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অদক্ষতার চক্র ভাঙা। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ওই সিদ্ধান্ত আশরাফুল ইসলামের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়নি। বরং এত অভিযোগের পরও ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে তাকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের আলোচিত দুর্নীতির মামলায় প্রকৌশলী ড. আশরাফুল ইসলামের নাম জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সূত্রের দাবি, ওই ঘটনায় অনেক কর্মকর্তা শাস্তির মুখে পড়লেও রহস্যজনক কারণে আশরাফুল ইসলাম বিভাগীয় ও দুদকের মামলা থেকে অব্যাহতি পান। একই ঘটনায় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জিল্লুর রহমানকে পদাবনতি করা হলেও আশরাফুল ইসলাম বহালই থাকেন, যা বৈষম্যের অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।

গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মেরামত ও সংস্কার কাজ দীর্ঘদিন তার অধীনে থাকায় তিনি এক ধরনের ‘অদৃশ্য কর্তৃত্ব’ তৈরি করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এতে করে অধিদপ্তরের ভেতরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোহবানবাগ মসজিদ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে সিভিল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে বদলি করা হলেও একই প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও আশরাফুল ইসলামকে বহাল রাখা হয়। উত্তরবঙ্গীয় কোটা, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়—এসব কারণে তিনি বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন বলে দাবি করছেন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

একজন জুনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এই দপ্তরে টিকে থাকতে হলে নিয়মের চেয়ে অন্য কিছু মানতে হয়। আশরাফুল স্যার জানেন কাকে কীভাবে সামলাতে হয়। তাই সবাই তাকে ‘ম্যানেজার’ হিসেবেই চেনে।”

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—এত অভিযোগ, মামলা ও বিতর্কের পরও তার পদোন্নতি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একজন কর্মকর্তার প্রশ্ন নয়; বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাবের প্রতিচ্ছবি। নিয়ম ভেঙে বছরের পর বছর একই জায়গায় থাকা, দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন—এসব বিষয় সরকারি ব্যবস্থাপনার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. আশরাফুল ইসলামের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব মেলেনি।




দুর্নীতির অভিযোগে এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আজহারুল ইসলামকে ঘিরে তোলপাড়

এসএম বদরুল আলমঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও বর্তমানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. আজহারুল ইসলামকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এলজিইডিরই একজন নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী আব্দুস সামাদ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আশ্রয়ে থেকে আজহারুল ইসলাম এলজিইডির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরির শুরু থেকেই তিনি রাজনৈতিক পরিচিতিকে পুঁজি করে বিশেষ সুবিধা ভোগ করে আসছেন এবং সরকারি দায়িত্বের আড়ালে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

মো. আজহারুল ইসলাম ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯২ সালে তিনি এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। ছাত্রজীবনে তিনি চুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। সেই সূত্র ধরে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে চাকরিজীবনে প্রভাব বিস্তারে সহায়ক হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

নাটোর জেলায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র অনুমোদনের সময় তিনি ঠিকাদারদের কাছ থেকে পাঁচ শতাংশ হারে টাকা আদায় করতেন। পাশাপাশি চলতি বিল ও চূড়ান্ত বিল ছাড় করাতে আরও দুই শতাংশ করে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ স্তর বাদ দিয়ে নিম্নমানের কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে সরকারি অর্থ ভাগাভাগি করার কথাও বলা হয়েছে।

নাটোরে এসব অনিয়ম নিয়ে ভেতরে ভেতরে আলোচনা শুরু হলে তিনি কৌশলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সুপারিশে সেখান থেকে বদলি হয়ে এলজিইডির সদর দপ্তরে যোগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বাপার্ড) স্থাপন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পে প্রকৃত প্রয়োজন না থাকলেও একাধিকবার প্রাক্কলন সংশোধন করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।

এছাড়াও পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিবাস নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সারাদেশজুড়ে একই ধরনের অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রায় ১৬ বছর ধরে তিনি সুবিধাজনক ও লাভজনক পদে বহাল থেকে ধারাবাহিকভাবে সরকারি অর্থ লোপাট করেছেন।

বর্তমানে সিলেট এলজিইডি অফিসে কর্মরত অবস্থায়ও অনিয়মের অভিযোগ থেমে নেই। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি বিলের চূড়ান্ত সুপারিশের সময় অধস্তন কর্মকর্তার মাধ্যমে ঠিকাদারদের কাছ থেকে দুই শতাংশ হারে অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

এসব অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে দুটি বড় ফ্ল্যাট, চট্টগ্রামের হালিশহরে একটি ছয়তলা ভবন, ঢাকার বসুন্ধরা এলাকায় দুটি প্লটসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া জনস্বার্থের পরিপন্থী। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী, দুদক অভিযোগের ভিত্তিতে বা স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত করতে পারে এবং অবৈধ সম্পদের বৈধ উৎস প্রমাণে ব্যর্থ হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

অন্যদিকে, এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মো. আজহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি দাবি করেন, তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এবং পদায়নের জন্য কোনো তদবিরও করেননি। কর্তৃপক্ষ যেখানে দায়িত্ব দিয়েছে, সেখানেই তিনি সততার সঙ্গে কাজ করেছেন বলে তার বক্তব্য।




জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য চুরি করে অনলাইন বাজারে বিক্রি, মাসে কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাতীয় পরিচয়পত্রের গোপন তথ্য হাতিয়ে নিয়ে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন চ্যানেলের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করার একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই চক্রের মাধ্যমে প্রতি মাসে কোটি টাকারও বেশি অবৈধ আয় করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যুক্ত দুই কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার হওয়া দুজন হলেন মো. হাবীবুল্লাহ ও মো. আলামিন। তাদের দুজনেরই বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলায়। তারা দুজনই নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, যা এই অপরাধকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের সাইবার পুলিশ সেন্টারের একটি বিশেষ ইউনিট গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালনা করে। বুধবার প্রথমে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন অফিসে অভিযান চালিয়ে মো. আলামিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় নির্বাচন কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তদন্তে সহযোগিতা করেন।

আলামিনকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী একই রাতে মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা হাউজিং এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সেখানে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় চক্রের আরেক সদস্য মো. হাবীবুল্লাহকে। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়, যেগুলো ব্যবহার করে তারা তথ্য পাচার ও লেনদেন করত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তদন্তে জানা গেছে, মো. হাবীবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন দপ্তরে কাজ করছিলেন। তিনি ২০১৩ সাল থেকে ঢাকায় নির্বাচন কমিশনের অফিসে কর্মরত ছিলেন এবং ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসে বদলি হন। সেখানে তিনি অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

অন্যদিকে মো. আলামিন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। তার দায়িত্ব ছিল জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত তথ্য এন্ট্রি ও হালনাগাদ করা। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের নাম, ঠিকানা, জন্মতারিখ, জাতীয় পরিচয় নম্বরসহ স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহ করতেন।

এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজ থেকে অবৈধভাবে তথ্য সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন দালাল, অনলাইন প্রতারক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় অপরাধীদের কাছে বিক্রি করছিল। এসব তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া সিম নিবন্ধন, অনলাইন প্রতারণা, জালিয়াতি করে ব্যাংক হিসাব খোলা এবং বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছিল।

প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, তারা প্রতিটি তথ্যের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নিত এবং বড় অর্ডারে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হতো। এভাবেই মাসে কোটি টাকার বেশি অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিল এই চক্র। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে এবং তাদের শনাক্তে অভিযান চলমান রয়েছে।




পেনশনের ফাইল আটকে রেখে ঘুষ, বাঁশখালীতে পরিবার পরিকল্পনা অফিসের সহকারী আটক

বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে পেনশনের কাগজপত্র নিয়ে ভয়াবহ অনিয়মের ঘটনা সামনে এসেছে। ওই কার্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অফিস সহায়ক আ ন ম মুদ্দাছেরুল হক পেনশনের টাকা তুলতে প্রয়োজনীয় কাগজ ঠিক করতে গেলে বিপাকে পড়েন। অভিযোগ অনুযায়ী, একই অফিসে কর্মরত অফিস সহকারী শাহ আলম তাঁর কাছে ফাইল এগিয়ে দেওয়ার নাম করে মোট ৯০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন।

আ ন ম মুদ্দাছেরুল হক বাধ্য হয়ে প্রথম দফায় ব্যাংক চেকের মাধ্যমে কিছু টাকা দেন। এরপরও শাহ আলম থামেননি। তিনি আরও টাকা দাবি করতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত ২০ হাজার টাকা নেওয়ার জন্য চাপ দেন। পেনশনের টাকা না পেলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে—এই অবস্থায় ভুক্তভোগী বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনকে জানান।

অভিযোগ পাওয়ার পর পরিকল্পনা অনুযায়ী বুধবার সকালে বাঁশখালী উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়। ওই সময় ঘুষের টাকা নেওয়ার মুহূর্তে শাহ আলমকে হাতেনাতে আটক করা হয়। অভিযানের সময় তাঁর ব্যবহৃত ড্রয়ার থেকে ঘুষের টাকা উদ্ধার করা হয় বলে জানানো হয়েছে।

চট্টগ্রাম দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক রিয়াজ উদ্দিন জানান, শাহ আলম সরকারি দায়িত্বে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর পেনশনের ফাইল আটকে রেখে তিনি বারবার টাকা দাবি করেন, যা সরাসরি ঘুষ ও দুর্নীতির শামিল। সরকারি সেবার বিনিময়ে টাকা নেওয়া, জোর করে অর্থ আদায় এবং দায়িত্বে অবহেলা—এই সব অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

এই ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হয়েছে, সরকারি দপ্তরে কিছু অসাধু কর্মকর্তা সাধারণ মানুষের প্রাপ্য অধিকার আদায়ের পথকে কতটা কঠিন করে তুলছে। পেনশনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে ঘুষ চাওয়ার ঘটনা প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।




চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ নিয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ, দুদকের অভিযান থামল নথি না পাওয়ায়

বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে গুরুতর অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অভিযান চালালেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না পাওয়ায় তদন্ত কার্যক্রম পুরোপুরি এগোতে পারেনি। উপাচার্যের কার্যালয়ে সব গুরুত্বপূর্ণ নথি তালাবদ্ধ থাকায় দুদকের কর্মকর্তারা সেগুলো যাচাই করতে ব্যর্থ হন।

বুধবার সকালে দুদকের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়-১-এর একটি দল বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছায়। তবে সে সময় উপাচার্য ঢাকায় অবস্থান করায় তার দপ্তরের নথিপত্র খোলা সম্ভব হয়নি। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলো আইন অনুযায়ী হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যায়নি।

দুদক চট্টগ্রাম-১-এর সহকারী পরিচালক সায়েদ আলম জানান, গত প্রায় ১৫ মাসে নিয়ম ভেঙে প্রায় ২৫০ জন শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ তাদের কাছে এসেছে। এসব নিয়োগে স্বচ্ছতা ছিল না এবং বেশ কয়েকটি বিভাগে আত্মীয়-স্বজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ফিন্যান্স বিভাগ, ফার্সি বিভাগ, ক্রিমিনোলজি বিভাগ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিয়োগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রেই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষার নম্বর বণ্টন, ভাইভা বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং চূড়ান্ত সুপারিশে প্রশাসনিক প্রভাব খাটানো হয়েছে। মেধার চেয়ে ব্যক্তিগত পরিচয় ও ক্ষমতার সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি এসেছে ফিন্যান্স বিভাগ থেকে। অভিযোগ করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান তার প্রভাব খাটিয়ে নিজের মেয়ে মাহিরা শামীমকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দিতে ভূমিকা রেখেছেন। জানা যায়, গত ১৯ ডিসেম্বর ফিন্যান্স বিভাগের চারটি প্রভাষক পদের জন্য নিয়োগ বোর্ড বসে। এতে ৫১ জন আবেদনকারীর মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৮ জন ভাইভা ও প্রেজেন্টেশনে অংশ নেন। সেখান থেকে চারজনকে চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়, যাদের একজন মাহিরা শামীম।

মাহিরা শামীম ওই বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এবং মাস্টার্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন। নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ও প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এস. এম. নসরুল কাদির দাবি করেন, এখানে ব্যক্তিগত পরিচয়ের কোনো বিষয় ছিল না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মাহিরা শামীমের আন্তর্জাতিক জার্নালে দুটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত থাকায় তিনি তুলনামূলকভাবে এগিয়ে ছিলেন।

এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান বলেন, তিনি ওই নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ছিলেন না এবং বোর্ডের সভাপতি ছিলেন উপাচার্য নিজেই। তার দাবি, তার মেয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতেই আবেদন করেছে এবং বোর্ড স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এদিকে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে তার ভাই মো. আব্দুল কাইয়ুমকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে নিয়োগ দিয়েছেন। এই নিয়োগেও স্বচ্ছতা মানা হয়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, তার ভাই যখন চাকরির জন্য আবেদন করেন, তখনই তিনি নিয়োগ বোর্ড থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। তার দাবি, মো. আব্দুল কাইয়ুমের শিক্ষাগত যোগ্যতা ভালো এবং তিনি এর আগে সৌদি আরবের জেদ্দা ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে চলমান বিতর্কের কারণে তার ভাই আদৌ এই চাকরিতে যোগ দেবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযুক্ত সব নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা, ভাইভা, নম্বরপত্র ও বোর্ডের সুপারিশ সংক্রান্ত নথি সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এসব কাগজপত্র যাচাই না করা পর্যন্ত কোনো নিয়োগে আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা চূড়ান্তভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে অভিযান শেষে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে কমিশনে জমা দেওয়া হবে।