ভান্ডারিয়ায় চোরাই ল্যাপটপ উদ্ধার-চোর গ্রেপ্তার

নিজস্ব সংবাদদাতা (সুমন মল্লিক): গত ০৪/০১/২০২৬ তারিখ বিকেল আনুমানিক ৪টা ৩০ মিনিটে ভান্ডারিয়া পৌরসভাধীন দারুল কুরআন সালসাবিল মাদ্রাসার অভ্যর্থনা কক্ষ থেকে একটি Acer Aspire ল্যাপটপ চুরি হয়। ঘটনার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। আজ রাতে অভিযান পরিচালনা করে মোঃ রাব্বি হাওলাদার (২৫), পিতা-রিয়াজ হাওলাদার, সাং-পূর্ব ভান্ডারিয়া ৬ নং ওয়ার্ড, ভান্ডারিয়া পৌরসভা, থানা ভান্ডারিয়া, জেলা পিরোজপুরকে ল্যাপটপ চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চোরাই ল্যাপটপটি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে মামলা রুজু করা হয়েছে এবং তাকে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।



স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ নিয়ে গণপূর্তে তোলপাড়: দুই নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন ও মেরামতের জন্য বরাদ্দ দেওয়া সরকারি অর্থ নিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে নতুন করে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগে উঠে এসেছে শেরে বাংলা নগর বিভাগ–২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম এবং ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–২ এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ও বর্তমানে প্রধান প্রকৌশলীর স্টাফ অফিসার (উন্নয়ন ও সমন্বয়) এ.এস.এম. সানাউল্লাহর নাম। পৃথক দুটি ঘটনায় সরকারি অর্থের অপব্যবহার, নিয়ম ভঙ্গ করে ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়া এবং কাজ শেষ না করেই বিল পরিশোধের অভিযোগ সামনে এসেছে।

সূত্র জানায়, ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন কয়েকটি হাসপাতালের মেরামত ও সংস্কার কাজের জন্য ৭৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ঢাকার শ্যামলীর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতাল, মোহাম্মদপুরের ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার এবং ১০০ শয্যা বিশিষ্ট মা ও শিশু হাসপাতাল অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের টয়লেট, ফ্লোর টাইলস, রং, ড্রেন, করিডোর আধুনিকায়ন ও বাহ্যিক সংস্কারের কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ কাজ শেষ না করেই পুরো অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম অর্থবছরের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে প্রাক্কলন অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। সময় স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও বাস্তব অগ্রগতি যাচাই না করে কাগজে–কলমে কাজ শেষ দেখিয়ে ঠিকাদারকে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়। কাজ শেষ করার শেষ সময়সীমা ছিল ২৬ জুন ২০২৫, অথচ ওই সময়ের মধ্যেই কাজ অসম্পন্ন থাকা অবস্থায় অর্থ ছাড় করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এসব প্রকল্পে এলটিএম (Limited Tendering Method) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যেখানে মাত্র একজন বা দুজন ঠিকাদার অংশ নেন। অভিযোগ রয়েছে, এই ঠিকাদাররা প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। পিপিআর অনুযায়ী দরপত্রে প্রতিযোগিতা না থাকলে তা বাতিল করে পুনরায় আহ্বান করার কথা থাকলেও সেই নিয়ম মানা হয়নি। বরং একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠীকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যাদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–২ এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী এ.এস.এম. সানাউল্লাহর বিরুদ্ধেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। বর্তমানে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর স্টাফ অফিসার (উন্নয়ন ও সমন্বয়) এ কর্মরত আছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি দায়িত্বে থাকাকালীন মাত্র ছয় মাসে বহু দরপত্রে নিয়ম পরিবর্তন করে নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিয়েছেন। এলটিএম হওয়ার কথা থাকলেও তা ওটিএম পদ্ধতিতে রূপান্তর করে কোটি টাকার কাজ বণ্টন করা হয়। কাজের অগ্রগতি না থাকলেও বিল ছাড় দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তিনি ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–২ এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। পরবর্তীতে তার দ্বায়িত্ব হস্তান্তর হয় জহুরুল ইসলাম এর কাছে। কিন্তু তারা দুজনই তাদের দ্বায়িত্বের আড়ালে দুর্নীতিতে লিপ্ত হন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এ.এস.এম. সানাউল্লাহ একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি বলয় তৈরি করেন, যেখানে কাজ পাওয়ার বিনিময়ে কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। জুন মাসে অনুমোদিত কয়েকটি কাজ এখনো অসম্পন্ন হলেও নিয়ম ভেঙে বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে জানা যায়। কিছু ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা কাজ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, কারণ তারা ওই বলয়ের বাইরে ছিলেন।

আরও অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই কর্মকর্তা নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক ফ্ল্যাট ও সম্পদের তথ্য ঘুরে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন মহলে। এমনকি রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে তথ্য পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগও আলোচনায় এসেছে, যদিও এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট তদন্তের ফল এখনও প্রকাশ হয়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জহুরুল ইসলাম ও এ.এস.এম. সানাউল্লাহ উভয়েই অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছেন। তারা দাবি করেছেন, সব কাজ নিয়ম মেনেই হয়েছে এবং অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিল দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, বাস্তব কাজ ও কাগজের হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল রয়েছে।

সচেতন মহল মনে করছে, স্বাস্থ্য খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক খাতে এ ধরনের অনিয়ম জনগণের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।




মহাখালী গণপূর্তে ঘুষ–সিন্ডিকেটের অভিযোগ, দুদকের নজরে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়জুল ইসলাম ডিউক

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত প্রকৌশল অধিদপ্তরের মহাখালী বিভাগের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির একটি শক্ত নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ওই বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়জুল ইসলাম ডিউক। ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টরা সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফয়জুল ইসলাম ডিউক বহুদিন ধরে ক্ষমতাধর মহলের ছত্রছায়ায় থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে, কাজ পাইয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে বিল ছাড় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ ও কমিশন আদায় করা হয়। অনেক ঠিকাদার জানিয়েছেন, কাজ পেতে হলে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়, নইলে ফাইলই নড়ে না।

আরও অভিযোগ রয়েছে, আগের সরকারের সময় থেকেই তিনি দল-ঘনিষ্ঠ কিছু ঠিকাদারকে নিয়মিত সুবিধা দিয়ে আসছেন। এসব ঠিকাদারকে ঘিরে একটি কমিশনভিত্তিক সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি রাজনৈতিক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর মেরামতের কাজ টেন্ডার ছাড়াই মৌখিক নির্দেশে শুরু করানো হয় এবং পরে নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ শেষ করা হয়। এসব কাজের বিপরীতে বড় অঙ্কের কমিশন নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

চলতি অর্থবছরে এলটিএম পদ্ধতিতে প্রায় ৬০টির মতো সংস্কার কাজ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, ওটিএম পদ্ধতি এড়িয়ে এলটিএম ব্যবহার করার মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজের সিন্ডিকেটভুক্ত ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় অর্ধকোটি টাকার কাজ অনিয়মের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গোপন দরপত্র ব্যবহার করেও অর্থ আত্মসাতের তথ্য সামনে এসেছে।

মহাখালী গণপূর্তের আওতায় হওয়া বিভিন্ন কাজের মান নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ভবন, ব্রিজ বিল্ডিংসহ একাধিক প্রকল্পে নিম্নমানের ইট, রড ও সিমেন্ট ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও কাজের মানে তার কোনো ছাপ নেই বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। এমনকি কিছু অসমাপ্ত কাজের বিলও ঘুষের বিনিময়ে আগেই পাস করিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রমতে, ফয়জুল ইসলাম ডিউক একটি বিশেষ “ভিআইপি তালিকা” তৈরি করেছেন, যেখানে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কাজ পাচ্ছে। অনিক ট্রেডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, এনএল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন এবং খান এন্টারপ্রাইজ—এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও বড় বড় সরকারি কাজ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়াও “প্রক্সি টেন্ডার” পদ্ধতিতে দুর্নীতি চালানোর অভিযোগ রয়েছে, যেখানে একজন ব্যক্তি একাধিক প্রতিষ্ঠানের হয়ে দরপত্র জমা দিয়ে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা তৈরি করেন। বাস্তবে সব কাজ একই সিন্ডিকেটের হাতে চলে যায়। এতে প্রকৃত ঠিকাদাররা বঞ্চিত হন এবং সরকারি অর্থ লুটপাটের পথ তৈরি হয়।

অফিস পরিচালনাতেও নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নিয়মিত অনুপস্থিতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রভাব খাটানোর কারণে সহকর্মীদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী এসডিই ওয়াহিদ বিন ফরহাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে যে, কাজ পেতে তার কাছেও নগদ অর্থ দিতে হয়।

এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন ইতোমধ্যে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। দুদক কমিশনার মিয়া মুহাম্মদ আলী আকবর আজিজী জানিয়েছেন, সরকারি দপ্তরগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং মহাখালী গণপূর্ত নিয়ে একটি তদন্ত দল কাজ করছে।

ফয়জুল ইসলাম ডিউকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পর্কে দুদকের একজন মহাপরিচালক জানিয়েছেন, অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামন চৌধুরী বলেছেন, কোনো প্রকৌশলী দুর্নীতিতে জড়িত প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে ফয়জুল ইসলাম ডিউক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, এসব অভিযোগ পুরোনো এবং তার সঙ্গে এসব অনিয়মের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।




নির্বাচনী বিধি উপেক্ষা করে এলজিইডিতে বদলি-বাণিজ্য, দুর্নীতির অভিযোগে শীর্ষ কর্মকর্তারা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সরকারি দপ্তরগুলোতে বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি থাকার কথা থাকলেও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যেন সেই নিয়ম মানতেই নারাজ। অভিযোগ উঠেছে, এলজিইডির রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফা দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নির্বিচারে বদলি ও পদায়ন করে যাচ্ছেন। এ কাজে তাকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করছেন খুলনা বিভাগের চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ শফিকুল ইসলাম এবং প্রকিউরমেন্ট শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ গোলাম ইয়াজদানী।

গত ১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে কাজী গোলাম মোস্তফা প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি নিয়মনীতি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা উপেক্ষা করে একের পর এক বদলি ও পদায়নের আদেশ দিতে শুরু করেন। অথচ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিল যে, নির্বাচনকালীন সময়ে কমিশনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কোনো ধরনের বদলি বা ছুটির আদেশ দেওয়া যাবে না। সেই নির্দেশনা এলজিইডিতে কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে দেওয়া একটি আধা-সরকারি পত্রে, যেখানে নির্বাচন ব্যাহত হতে পারে—এমন যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়। এরপরও এলজিইডিতে একের পর এক বদলি ও পদায়ন চলতে থাকায় প্রশ্ন উঠেছে, কে বা কারা এসব সিদ্ধান্তের পেছনে মূল ভূমিকা রাখছেন।

অভিযোগ রয়েছে, সৈয়দ শফিকুল ইসলামকে ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে খুলনা বিভাগে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তিনি সেখানে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন না। বরং তিনি প্রায় সারাক্ষণ প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফার কক্ষে অবস্থান করছেন। তার সঙ্গে থাকেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ গোলাম ইয়াজদানী। এলজিইডির ভেতরে আলোচনা রয়েছে, এই দুই কর্মকর্তার পরামর্শ ছাড়া প্রধান প্রকৌশলী কোনো নথিতে স্বাক্ষর করেন না।

এলজিইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে জনশ্রুতি রয়েছে, বর্তমানে বদলি ও পদায়ন কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বড় প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক কিংবা প্রশাসন শাখার মতো ক্ষমতাশালী পদগুলো পাচ্ছেন মূলত যাদের অর্থের জোর বেশি। এই সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আওয়ামী সমর্থিত প্রকৌশলীরা।

এমন অভিযোগও উঠেছে যে, নির্বাচনী আইন অমান্য করে এবং কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই অর্থের বিনিময়ে জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী বদলি ও বড় প্রকল্পের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। এসব প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন মহলকে ‘ম্যানেজ’ করার কথাও শোনা যাচ্ছে, যা এলজিইডির ভাবমূর্তিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের শীর্ষ দুই নেতার প্রভাব খাটিয়ে চাঁদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান কবিরকে আম্পান প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং বগুড়া অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী নাসির উদ্দীনকে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া সাবেক প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের সময় বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কমিটির সদস্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ মোশারফ হোসেনকে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়। পরে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সৈয়দ শফিকুল ইসলাম ও মোঃ গোলাম ইয়াজদানীর আগ্রহে কাজী গোলাম মোস্তফা তাকে আবার সদর দপ্তরে ফিরিয়ে আনেন বলে অভিযোগ ওঠে।

প্রকিউরমেন্ট শাখা নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। মোঃ গোলাম ইয়াজদানী দায়িত্ব নেওয়ার পর এই শাখাটি দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঠিকমতো উৎকোচ না দিলে টেন্ডার অনুমোদনে নানা ধরনের হয়রানি, রি-টেন্ডার বা রি-ইভ্যালুয়েশনের মাধ্যমে কাজ আটকে দেওয়ার অভিযোগ করছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রকৌশলীরা।

আরও অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন আওয়ামী ঘরানার সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত মোঃ গোলাম ইয়াজদানী বর্তমানে নিজেকে বিএনপি অনুসারী হিসেবে তুলে ধরতে চেষ্টা করছেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপস্থিত থেকে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

এদিকে সম্প্রতি নির্বাহী প্রকৌশলী (অর্থ) মোঃ জামাল হোসেনকে নিয়োগ ও পদায়ন শাখার দায়িত্ব দেওয়া নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রধান প্রকৌশলীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে জোরপূর্বক এই দায়িত্ব নিয়েছেন। এ কাজে তাকে সহায়তা করেছেন সৈয়দ শফিকুল ইসলাম ও মোঃ গোলাম ইয়াজদানী।

মোঃ জামাল হোসেনের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অর্থ শাখার দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি নারী সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন এবং নিয়মিত উৎকোচ দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে সন্তুষ্ট না করলে ফাইল আটকে রাখা হয়। এমন পরিস্থিতিতে হয়রানি এড়াতে নারী সহকর্মীরা পালাক্রমে তার জন্য বাসা থেকে খাবার রান্না করে নিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। বিষয়টি বর্তমানে প্রশাসন শাখায় প্রকাশ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব অভিযোগ ও অনিয়ম দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনা হলে ইতোমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ এলজিইডির সুনাম আরও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।




ইডেনের সামনে চাঁদাবাজির অভিযোগ: ঢাকা কলেজের ৪ ছাত্র গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ চাঁদাবাজির অভিযোগে ঢাকা কলেজের চার জন ছাত্রকে গ্রেপ্তার করেছে সেনাবাহিনী। রাজধানীর সোমবার (৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় লালবাগ এলাকায় ইডেন মহিলা কলেজের ১ নম্বর গেটের সামনে থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। একই অপরাধে এর আগেও একবার তাদের আটক করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর একটি টহল দল ইডেন কলেজের ১ নম্বর গেটের সামনে চারজনকে চাঁদা আদায় করতে দেখে। এ সময় বাপ্পি নামের এক ব্যক্তি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ওই যুবকেরা তাকে মারধর করে আহত করেন। পরে চারজনকেই আটক করে ক্যাম্পে নিয়ে যায় সেনাবাহিনী।

জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিজেদের ঢাকা কলেজের ছাত্র বলে পরিচয় দেন। ওই চার ছাত্র হলেন– মো. বাইজিদ, মাসুদ রানা, আবির হোসেন ও মো. আমজাদ। রাত ৯টা ১০ মিনিটে তাদের লালবাগ থানার একজন উপপরিদর্শকের (এসআই) কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা গেছে, গত ৪ জানুয়ারি একই অভিযোগে ইডেন কলেজের সামনে থেকে এই চারজনকে আটক করা হয়েছিল। সে সময় ক্যাম্প কমান্ডার তাদের শিক্ষার্থী বিবেচনা করে মৌখিক সতর্কতার মাধ্যমে ছেড়ে দেন। তবে মাত্র এক দিন পরই তারা পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।

মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী জানান, চাঁদাবাজি ও মারধরের ঘটনায় আটক চারজনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে সেনাবাহিনী। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা হিসেবে তাদের আজ আদালতে পাঠানো হবে।




বরিশাল গণপূর্তে নির্বাহী প্রকৌশলীকে ঘিরে অনিয়ম ও পক্ষপাতের অভিযোগে তোলপাড়

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বরিশাল গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলমকে ঘিরে আবারও অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও গণপূর্ত কার্যালয়ে স্বস্তি ফেরেনি বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা। তাদের অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তা হয়েও মো. ফয়সাল আলম দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক পরিচয় বহন করেছেন এবং সেই প্রভাব ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে নিয়মবহির্ভূত সুবিধা দিয়ে আসছেন।

ঠিকাদারদের অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনকালে মো. ফয়সাল আলম নৌকার ব্যাজ পরিধান করতেন এবং নিজেকে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিতেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি কৌশলে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, এখন তিনি নিজেকে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে উপস্থাপনের চেষ্টাও করছেন, যাতে ক্ষমতা ও প্রভাব অক্ষুণ্ন থাকে।

বরিশাল গণপূর্তে কাজ করা একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন, কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিয়ম ভেঙে বারবার কাজ পাচ্ছে। বিশেষ করে খান বিল্ডার্স ও খান ট্রেডার্স নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একচেটিয়াভাবে প্রকল্প পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকলেও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় তাদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

সাধারণ ঠিকাদার আব্দুর রহিম বলেন, ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনকালের মতো একই ধরণের অনিয়ম বরিশালেও চলছে। তার ভাষায়, নিয়ম মানা ঠিকাদাররা পিছিয়ে পড়ছেন, আর নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়মের তোয়াক্কা না করেই কাজ পাচ্ছে। আরেক ঠিকাদার তসলিম মৃধা অভিযোগ করেন, সরকারি কর্মকর্তা হয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বহন করা এবং গোপন সমঝোতার মাধ্যমে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি ও অনৈতিক।

একাধিক টেন্ডারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা বা সক্ষমতা নেই, তাদের দরপত্র প্রথমে বাতিল করা হলেও পরে যৌথ উদ্যোগ দেখিয়ে আবার কাজ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ঠিকাদারদের মতে, এটি টেন্ডারের শর্তের সরাসরি লঙ্ঘন। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করলে গণপূর্ত কার্যালয়ে বাকবিতণ্ডা হয় এবং প্রতিবাদী ঠিকাদারদের লাইসেন্স বাতিলের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঠিকাদার এটিএম আশরাফুল হক রিপন জানান, তিনি শুধু প্রশ্ন তুলেছেন—ওয়ার্ক ক্যাপাসিটি না থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে টেন্ডারে অংশ নিচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কাউকে হুমকি বা অপমান করা হয়নি। তবে মো. ফয়সাল আলমের দাবি, কয়েকজন ঠিকাদার তার অফিসে এসে তাকে হুমকি দিয়েছেন।

মো. ফয়সাল আলম ৩২তম বিসিএসের একজন কর্মকর্তা এবং ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা। ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সে সময়ও নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, কমিশন বাণিজ্য ও নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনেও অভিযোগ জমা পড়েছিল বলে জানা যায়, যদিও সেগুলোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

বরিশালে বদলির পরও ঠিকাদারদের অভিযোগ, অনিয়ম থামেনি। বরং নতুন জায়গায় এসে একই কৌশলে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এই অবস্থার মধ্যেই ২০২৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি বরিশালের নবগঠিত ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব নেন। এই পদ পাওয়ার পর তার প্রভাব আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

ঠিকাদারদের আরও অভিযোগ, বরিশাল গণপূর্তে কাজ পেতে হলে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপন সমঝোতায় যেতে হয়। এতে করে সাধারণ ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। নিয়ম মেনে দরপত্র জমা দিয়েও তারা কাজ পাচ্ছেন না, যা স্পষ্টভাবে বৈষম্যমূলক আচরণ।

সংবাদ প্রকাশের আগে মো. ফয়সাল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত না হলে সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অনিয়ম স্থানীয় ঠিকাদারদের আস্থা নষ্ট করছে এবং সরকারি প্রকল্পের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বরিশাল গণপূর্তে ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।




তেজগাঁও শিল্প এলাকা ও টেন্ডার ঘিরে গণপূর্তের এক নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা লুটের অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩–এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে তেজগাঁও শিল্প এলাকায় উচ্ছেদের নামে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শিল্প প্লটের মালিকদের কাগজপত্র যাচাইয়ের কথা বলে নানা ত্রুটি ধরিয়ে অর্থ আদায় করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্লট দখল দেখিয়ে আবার মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সেই জমি অন্য মালিকের কাছে হস্তান্তরের অভিযোগও রয়েছে।

তেজগাঁও গভর্নমেন্ট হকার্স মার্কেট এলাকাতেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি বরাদ্দের বাইরে প্রায় একশ’টি অবৈধ দোকান বসিয়ে সেখান থেকে কোটি কোটি টাকা আদায় করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অভিযোগে বলা হয়, এই অবৈধ দোকান বসানোর পেছনে সরাসরি নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মইনুল ইসলামের ভূমিকা রয়েছে এবং এখান থেকেই অন্তত দশ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এছাড়া এক বছরে প্রায় পঞ্চাশ কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে। কেরানীগঞ্জ মডেল থানা উত্তর ও দক্ষিণ এলাকার দরপত্রে টেন্ডার ওপেনের আগেই নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নাম ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে দেখা যায়, দরপত্র খোলার পর একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১০ শতাংশ কম দরে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় এবং অন্য অংশগ্রহণকারীরা সুযোগ পান না।

অভিযোগে আরও বলা হয়, টেন্ডার অনুমোদনের বিনিময়ে নিয়মিত কমিশন আদায় করা হয়। বিল পাসের সময় হিসাব শাখার মাধ্যমে পাঁচ শতাংশ কমিশন নেওয়ার কথাও উঠে এসেছে। এসব অর্থ লেনদেনের কারণেই একজন সরকারি কর্মকর্তার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের অমিল দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

মাদক নিরাময় কেন্দ্র প্রকল্প, বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ, মডেল মসজিদসহ একাধিক প্রকল্পে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ডিপিপির নিয়ম ভেঙে একাধিক প্যাকেজ একত্র করে দরপত্র আহ্বান, একই কাজের জন্য বারবার ভেরিয়েশন দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন এবং ওটিএম পদ্ধতিতে পছন্দের ঠিকাদারকে রেট কোট দিয়ে কাজ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

এই অভিযোগের সঙ্গে কয়েকজন ঠিকাদারের নামও উঠে এসেছে, যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে কাজ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বিশেষ করে বাবর এসোসিয়েটসসহ কিছু প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কেরানীগঞ্জ জেলখানা ও মডেল মসজিদের একাধিক প্রকল্পে একই কৌশলে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সীমিত বেতনের সরকারি কর্মকর্তা হয়েও সম্প্রতি ৬৫ লাখ টাকার একটি বিলাসবহুল গাড়ি কেনা হয়েছে। কুড়িগ্রামে প্রায় ১০ একর জমিতে রিসোর্ট নির্মাণ এবং নিয়মিত বিমানে যাতায়াতের তথ্যও সামনে এসেছে। এসব বিষয় মিলিয়ে অভিযোগকারীরা বলছেন, এক বছরের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন মোঃ মইনুল ইসলাম।

সব মিলিয়ে তেজগাঁও শিল্প এলাকা থেকে শুরু করে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত একাধিক প্রকল্পে টেন্ডার বাণিজ্য, কমিশন আদায় ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩–এর এই নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে তদন্ত দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।




নোয়াখালীতে নিলাম কেলেঙ্কারি: ছয় ঘণ্টা কার্যালয়ে অবরুদ্ধ জনস্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী

বিশেষ প্রতিবেদকঃ নোয়াখালীর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ে রোববার দীর্ঘ সময় ধরে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। পানি সরবরাহ ও নলকূপ স্থাপনের কাজে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ সরকারি মালামাল গোপনে নামমাত্র দামে নিলাম দেওয়ার অভিযোগ তুলে একদল ঠিকাদার কার্যালয়টি ঘেরাও করেন। এ সময় নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম প্রায় ছয় ঘণ্টা নিজ কক্ষে অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন। সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলা এই ঘটনায় পুরো কার্যালয়ের কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, জেলা কার্যালয়ের গুদামে মজুত থাকা সাত থেকে আট কোটি টাকা মূল্যের পাইপ, যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ম না মেনে অত্যন্ত কম দামে নিলাম দেওয়া হয়েছে। তাঁদের দাবি, নির্বাচনী ব্যস্ততা ও রাজনৈতিক কর্মসূচির সুযোগ নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী নিজের ঘনিষ্ঠ ও পছন্দের লোকদের কাছে এসব মালামাল বিক্রি করার ব্যবস্থা করেন। এতে প্রকৃত ঠিকাদারেরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

বিকেলের দিকে কার্যালয়ে উপস্থিত শতাধিক ঠিকাদার ও তাঁদের সহযোগীরা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তোলেন। কার্যালয়ের ভেতরেও কয়েকজন ঠিকাদার ঢুকে পড়েন এবং সেখানে মো. সাইফুল ইসলামের সঙ্গে তাঁদের তীব্র বাক্যবিনিময় হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।

জেলা বিএনপির সদস্য ও ঠিকাদার আবদুল মোতালেব ওরফে আপেল অভিযোগ করেন, শুধু মালামাল নিলাম নয়, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে নির্বাহী প্রকৌশলী গত কয়েক মাসে তাঁর কাছ থেকে এবং অন্য ঠিকাদারদের কাছ থেকেও প্রায় পাঁচ কোটি টাকা আদায় করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কাজ পেতে হলে মোটা অঙ্কের ঘুষ দেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এতে অনেক ঠিকাদার সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন এবং বাধ্য হয়েই তাঁরা কার্যালয় ঘেরাওয়ের মতো কঠোর কর্মসূচিতে নামেন।

ঠিকাদারদের আরও অভিযোগ, সরকারি বিধি অনুযায়ী নিলামের আগে প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি, দরপত্র ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা থাকলেও এখানে তা মানা হয়নি। সবকিছু গোপনে করা হয়েছে, যাতে নির্দিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি লাভবান হন এবং সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের শামিল বলেও তাঁরা দাবি করেন।

অন্যদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, গুদামের মালামালের নিলাম জেলা কার্যালয় থেকে নয়, ঢাকার ঊর্ধ্বতন দপ্তর থেকে সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর দাবি, যেসব ঠিকাদার কাজ পাননি, তাঁরাই ক্ষোভ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়াচ্ছেন। তবে পরিস্থিতি শান্ত করতে ঠিকাদারদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিলামের কার্যাদেশ বাতিল করার আশ্বাস দেওয়া হয়।

শেষ পর্যন্ত নিলাম বাতিলের আশ্বাস পেয়ে বিকেল পাঁচটার দিকে ঠিকাদারেরা কার্যালয় থেকে সরে যান এবং নির্বাহী প্রকৌশলী অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হন। তবে এই ঘটনার মাধ্যমে নোয়াখালীর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে সামনে এলো। সংশ্লিষ্ট মহলে এখন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি উঠেছে।




ক্ষমতার আড়ালে গণপূর্তে দুর্নীতির বিস্তার: কুষ্টিয়ার প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকা লুটের অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প মানেই যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকার কথা, সেখানে বারবার প্রশ্ন উঠছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভূমিকা নিয়ে। কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জাহিদুল ইসলামকে ঘিরে উঠেছে এমনই একাধিক গুরুতর অভিযোগ, যা এখন শুধু কুষ্টিয়াতেই নয়, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়েও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সীমিত সরকারি বেতনের বাইরে গিয়ে তিনি বিপুল অঙ্কের অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন, যার সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুলনার জোড়াকল বাজার এলাকায় বহুতল ভবনের মালিক এই প্রকৌশলীর সম্পদের সঙ্গে তার চাকরিজীবনের আয়ের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি প্রকল্পের কাজ বণ্টনের নামে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনা করে তিনি কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এসব কাজ নাকি হয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার ছত্রছায়ায়।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পকে ঘিরে। এই প্রকল্পে অনিয়ম ছিল বিচ্ছিন্ন নয়, বরং পরিকল্পিত ও সংগঠিত। অভিযোগ অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা মাহবুব উল আলম হানিফের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে জাহিদুল ইসলাম কার্যত অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন। স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা-কে সঙ্গে নিয়ে তিনি টেন্ডার বণ্টনে একটি শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন, যেখানে নিয়মের কোনো মূল্য ছিল না।

দরপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজে বারবার সর্বনিম্ন দরদাতাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের ওটি, আইসিইউ, সিসিইউ, একাডেমিক ভবনের লিফটসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোতে ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি দর দেওয়া ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ আছে, টেন্ডার ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হতো এবং ‘কমিশন’ না দিলে কাজ অনুমোদন মিলত না। এই প্রক্রিয়ায় সুপারস্টার ইঞ্জিনিয়ারিং, ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ারিংসহ কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ পেত।

শুধু বড় ভবন নয়, সড়ক, ড্রেন, পুকুরসহ ছোট-বড় আনুষঙ্গিক কাজেও একই অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। মেসার্স শামীম এন্টারপ্রাইজ সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও কাজ পায়নি, অথচ গ্যালাক্সি অ্যাসোসিয়েটসকে কাজ দেওয়া হয়েছে, যাদের হাতে তখনই বিপুল অঙ্কের প্রকল্প চলমান ছিল। একইভাবে কুষ্টিয়ার নতুন সার্কিট হাউস, মডেল মসজিদসহ বিভিন্ন প্রকল্পে একই ধরনের অনিয়মের ধারাবাহিকতা দেখা গেছে।

আরও ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে তথাকথিত ‘ওভারল্যাপিং টেন্ডার’ নিয়ে। কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন সরকারি ভবনে একই অর্থবছরে একাধিকবার মেরামতের নামে টেন্ডার ডেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ৪০ বছর পুরোনো এক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর সরকারি বাসভবনে একই বছরে বারবার কাজ দেখিয়ে টাকা তোলা হয় বলে অভিযোগ। একই কৌশলে ডিসি অফিসের বাউন্ডারী ওয়াল, সদর হাসপাতাল, জজ কোর্টসহ বিভিন্ন স্থাপনায় বারবার টেন্ডার আহ্বান করে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এসব অনিয়ম নিয়ে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নীরব ভূমিকা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এত বড় অভিযোগ থাকার পরও কীভাবে বছরের পর বছর ধরে একই পদ্ধতিতে দুর্নীতি চলতে পারে—তা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।

এ বিষয়ে মোঃ জাহিদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—একজন সরকারি প্রকৌশলীর এই বিপুল সম্পদের উৎস কী? কারা তাকে দীর্ঘদিন ধরে সুরক্ষা দিয়েছে? দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কি আদৌ এই অভিযোগগুলোর কার্যকর তদন্ত করবে? জনস্বার্থে এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখন সময়ের দাবি।




কাজ না করেই সরকারি অর্থ উত্তোলনের গুরুতর অভিযোগে গণপূর্ত অধিদপ্তর নতুন করে প্রশ্নের মুখে

বিশেষ প্রতিবেদকঃ স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ করা ৭৮ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে—কিন্তু বাস্তবে সেই টাকার কাজ কোথায়, তা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগ উঠেছে, মাঠে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ না করেই পুরো অর্থের বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে ঘিরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের শেরে বাংলা নগর বিভাগ-২–এর নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলামকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজের জন্য এই অর্থ বরাদ্দ ছিল। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—শ্যামলীর ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতাল, মোহাম্মদপুরের ফার্টিলিটি সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার এবং ১০০ শয্যার মা ও শিশু হাসপাতাল। বরাদ্দ পাওয়ার পর অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করা হয় এবং কাজ সম্পন্ন হয়েছে—এমন দেখিয়ে জুন মাসের মধ্যেই পুরো বিল পরিশোধ করা হয়।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, বাস্তবে এসব স্থানে কাজ খুবই সীমিত হয়েছে। কোথাও ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কাজ হয়েছে, কোথাও শ্রমিকই দেখা যায়নি, আবার কোথাও আগের ভাঙা অবকাঠামো আগের মতোই রয়ে গেছে। তবুও কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে—সব কাজ সম্পূর্ণ ও ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় শেষ।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ কাজ LTM পদ্ধতিতে দেখানো হয়েছে এবং সেখানে এক বা দুইজন একই ঠিকাদার বারবার কাজ পেয়েছেন। অভিযোগ আছে, এই ঠিকাদাররা নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ বলয়ে থাকেন। সরকারি ক্রয়বিধি (PPR) অনুযায়ী, দরপত্রে পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা না থাকলে তা বাতিল করার কথা থাকলেও, এখানে সেই নিয়ম মানা হয়নি বলে দাবি করা হচ্ছে।

অভিযোগ আরও গুরুতর হয়েছে তখনই, যখন বলা হচ্ছে—কাজ শেষ হওয়ার আগেই পরিমাপপত্র, প্রত্যয়নপত্র ও বিল সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ মাঠে কাজ না হলেও কাগজে সবকিছু আগে থেকেই ‘পরিকল্পিতভাবে’ ঠিক করে রাখা হয়। সংশ্লিষ্টরা এটিকে সাধারণ অনিয়ম নয়, বরং সরকারি অর্থ আত্মসাতের একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া বলেই দেখছেন।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, সব কাজ নিয়ম মেনেই হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হওয়ার পরই বিল পরিশোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কথাও উল্লেখ করেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, তার মামা হাদী, মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম এবং তথ্য উপদেষ্টা কার্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্কের কথা। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনেও তার ঘনিষ্ঠজন রয়েছেন—এমন মন্তব্য তিনি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এসব দাবি মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, মাঠপর্যায়ে বাস্তব কাজ না থাকলেও কাগজপত্র নিয়ন্ত্রণ করে পুরো অর্থ ছাড় করানো হয়েছে। এটি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার গুরুতর লঙ্ঘন।

সরকারি বিধি অনুযায়ী, কাজ না করে বা অসম্পূর্ণ কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা ফৌজদারি অপরাধ। এর সঙ্গে দরপত্রে প্রতিযোগিতা না রাখা, একই ঠিকাদারকে বারবার কাজ দেওয়া এবং সিন্ডিকেট তৈরি করাও শাস্তিযোগ্য। এসব অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, সাময়িক বরখাস্ত, আর্থিক জরিমানা এবং আত্মসাৎ করা অর্থ রাষ্ট্রের কোষাগারে ফেরত দেওয়ার বিধান রয়েছে।

সচেতন নাগরিক ও স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযোগ সত্য হলে এটি শুধু একজন প্রকৌশলীর দায় নয়—এটি পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। তারা নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানাচ্ছেন।

৭৮ লাখ টাকার কাজ না করেই বিল তুলে নেওয়ার এই ঘটনা প্রশাসনের জন্য বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। কাগজে কাজ দেখিয়ে বাস্তবে কিছুই না করা—এটাই কি এখন উন্নয়নের নতুন মডেল? এই প্রশ্নের জবাব এখন দেশের মানুষ জানতে চায়।