প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর: অভিযোগ, পাল্টা প্রচারণা ও নীরবতার রাজনীতি- মহাপরিচালককে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো উঠছে ?

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর দেশের অন্যতম বৃহৎ ও সংবেদনশীল প্রশাসনিক কাঠামো। প্রায় দেড় কোটি শিক্ষার্থী, কয়েক লক্ষ শিক্ষক এবং হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও নীতিগত সিদ্ধান্ত এ দপ্তরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ভূমিকা কেবল দাপ্তরিক নয়; বরং তা রাষ্ট্রীয় নীতি, সামাজিক আস্থা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এমন প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান–কে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও প্রচারণা দেখা যাচ্ছে, তা জনস্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে অনুসন্ধানযোগ্য হয়ে উঠেছে।

অভিযোগের সূত্রপাত ও বিস্তার : সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনির একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয়। সেখানে মহাপরিচালকের প্রশাসনিক আচরণ, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং একটি নির্দিষ্ট বলয়ের মাধ্যমে দপ্তর পরিচালনার অভিযোগ উত্থাপন করা হয়।

যদিও এটি একটি ব্যক্তিগত মতামত, তবে এর সঙ্গে মাঠপর্যায়ের শিক্ষক অসন্তোষ, বদলি–সংক্রান্ত অভিযোগ এবং প্রশাসনিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার প্রসঙ্গ যুক্ত হওয়ায় বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

মাঠপর্যায়ের একাধিক শিক্ষক নেতা ও জেলা–উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, বদলি, পদায়ন, প্রশিক্ষণ মনোনয়ন কিংবা প্রশাসনিক সুবিধার ক্ষেত্রে একটি অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী বলয়ের অস্তিত্ব রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক সিদ্ধান্ত লিখিত নথির পরিবর্তে মৌখিক নির্দেশনার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে—যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

আন্দোলন ও অসন্তোষের প্রতিফলন : গত কয়েক মাসে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় প্রাথমিক শিক্ষকদের একাধিক কর্মসূচি ও আন্দোলন হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে অন্যায্য বদলি, পদোন্নতিতে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগ উঠে আসে। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ সরাসরি মহাপরিচালকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সরকারি কর্মচারী বিধির কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন।

একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জরুরি বিষয়েও মহাপরিচালকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয় এবং মধ্যস্ততাকারীর ওপর নির্ভরতা বাড়ে—যা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

পাল্টা প্রচারণা ও প্রশংসামূলক প্রতিবেদন : অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও পত্রিকায় মহাপরিচালকের পক্ষে প্রশংসামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে—তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত অভিযোগগুলো “মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” এবং কিছু অসাধু কর্মকর্তা নিজেদের অনিয়ম আড়াল করতেই এ ধরনের প্রচারণা চালাচ্ছেন। ওই প্রতিবেদনগুলোতে মহাপরিচালকের যোগদানের পর অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নতুন ভবন নির্মাণ, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং তার ব্যক্তিগত সততা ও সহজলভ্যতার প্রশংসা করা হয়েছে।

তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব প্রতিবেদনের অধিকাংশই একই ভাষা ও বর্ণনার পুনরাবৃত্তি করেছে, যা সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও উৎসের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

মূল প্রশ্ন: তদন্ত কোথায়?
এই পুরো বিতর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের অনুপস্থিতি। এখন পর্যন্ত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুদক বা অন্য কোনো দায়িত্বশীল সংস্থা থেকে প্রকাশ্য তদন্তের ঘোষণা পাওয়া যায়নি।

মহাপরিচালকের পক্ষ থেকেও অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা নথিভিত্তিক জবাব সামনে আসেনি। একজন সাবেক শিক্ষা সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে সরকারের উচিত নিরপেক্ষ তদন্ত করা। অভিযোগ মিথ্যা হলে তাতেই কর্মকর্তার সম্মান রক্ষা পাবে, আর সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। নীরবতা সবসময় সন্দেহ বাড়ায়।”

উপসংহার : এই অনুসন্ধানে একটি বিষয় স্পষ্ট—প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে ঘিরে অভিযোগ, পাল্টা প্রচারণা ও নীরবতার একটি জটিল চক্র তৈরি হয়েছে। সব অভিযোগ যে সত্য, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না; আবার সব অভিযোগ যে ভিত্তিহীন, তাও বলা কঠিন।

কিন্তু একটি রাষ্ট্রীয় দপ্তরের প্রধানকে ঘিরে যদি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, যোগাযোগহীনতা ও সম্ভাব্য অনিয়মের প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে, তাহলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রাথমিক শিক্ষা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি। সেই ভিত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যদি আস্থার সংকট তৈরি হয়, তার প্রভাব সমাজ ও রাষ্ট্র—উভয় ক্ষেত্রেই গভীর হবে। তাই ব্যক্তি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষ তদন্তই হওয়া উচিত এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।




!! অনুসন্ধানী প্রতিবেদন !! প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে ভয়াবহ অনিয়মের ছায়া : বারবার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে বেকার সমাজের স্বপ্ন ভাঙছে !

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ (২০২৫–২৬) ঘিরে চলমান অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এখন আর গুঞ্জন নয়—এটি পরিণত হয়েছে দেশের শিক্ষিত বেকার সমাজের জন্য এক দুঃস্বপ্নে। মেধা, যোগ্যতা ও কঠোর পরিশ্রমকে উপেক্ষা করে টাকার বিনিময়ে চাকরি বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক নিয়োগ কার্যক্রমে সেই অভিযোগ আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

ভুক্তভোগী প্রার্থীদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র ও কিছু অসাধু মহলের যোগসাজশে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত মেধাবী ও পরিশ্রমী প্রার্থীরা বারবার বঞ্চিত হচ্ছেন, আর চাকরি পাচ্ছেন ‘আগাম লেনদেনের’ মাধ্যমে নির্বাচিতরা।

একাধিক শিক্ষিত বেকার তরুণ জানান, বছরের পর বছর ধরে নিরলস পড়াশোনা ও প্রস্তুতির পরও তারা চাকরি পাচ্ছেন না। এতে তরুণ সমাজের মধ্যে হতাশা ভয়াবহভাবে বেড়ে চলেছে এবং রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। প্রশ্ন উঠছে—এই দুর্নীতিগ্রস্ত বাস্তবতায় শিক্ষিত বেকারদের সঙ্গে প্রহসন কি কারও চোখে পড়ে না?

পরীক্ষার এক ঘণ্টা আগে বাতিল—চরম ভোগান্তি

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের ২৬ তারিখ বিকেলে অনুষ্ঠিতব্য প্রাথমিকের হিসাব সহকারী পদের পরীক্ষাটি প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা শুরুর ঠিক এক ঘণ্টা আগে বাতিল করা হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় আসা হাজারো পরীক্ষার্থী চরম বিপাকে পড়েন—অর্থনৈতিক ক্ষতি ও মানসিক ধাক্কা দুই-ই বহন করতে হয় তাদের।
একইভাবে খাদ্য অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষাতেও প্রশ্নফাঁস নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। পরীক্ষার্থীদের দাবি, বুয়েটের অধীনে প্রণীত প্রশ্নপত্রগুলো ধারাবাহিকভাবে ফাঁস হচ্ছে। এমনকি গুঞ্জন রয়েছে, আগামী ২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সহকারী শিক্ষক পরীক্ষার আসন (সিট) আগাম বুক করা এবং প্রশ্নফাঁসের প্রবল আশঙ্কাও রয়েছে। এই বাস্তবতা মেধাবী শিক্ষার্থীদের হতাশা কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তারই প্রতিফলন। প্রশ্ন উঠছে—মেধাবীদের মূল্যায়ন আর কবে হবে?

নির্বাচনী তফসিল ও নিরাপত্তা ঝুঁকি : এদিকে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সাধারণত যেখানে পরীক্ষা নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা থাকে না, সেখানে বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষা দেওয়া একজন শিক্ষার্থীর জন্য কতটা নিরাপদ—সে প্রশ্নও জোরালোভাবে উঠছে।

শিক্ষাবিদদের সতর্কবার্তা :
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক স্তরে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ হলে তার নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পুরো জাতিকে বহন করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি বন্ধ না হলে বেকার সমাজের হতাশা আরও গভীর হবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়বে।

শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট দাবি : এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষিত বেকার ও পরীক্ষার্থীরা কয়েকটি সুস্পষ্ট দাবি তুলে ধরেছেন— সুষ্ঠু পরীক্ষা নিশ্চিত ও প্রশ্নফাঁস রোধে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অবিলম্বে বুয়েটের অধীন থেকে সরিয়ে পিএসসির অধীনে নেওয়া হোক। পরীক্ষা যাতে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হয়, সে লক্ষ্যে যে পদক্ষেপগুলো প্রয়োজন তা অনতিবিলম্বে গ্রহণ করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের বারবার বিপাকে পড়তে না হয়। নির্বাচনী সময়কাল ও রাস্তাঘাটের নিরাপত্তা বিবেচনায় রেখে নিয়োগ পরীক্ষাগুলো সাময়িকভাবে পিছিয়ে দেওয়া হোক। প্রশ্নফাঁস ও নিয়োগ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
সচেতন নাগরিক সমাজের আহ্বান
সচেতন নাগরিক সমাজ দ্রুত, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত, কঠোর নজরদারি ও দালালচক্র নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

শেষ কথা : সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি শিক্ষার্থীদের কঠিন আবেদন—এই সংকটময় সময়ে শিক্ষার্থীদের মুখের দিকে তাকিয়ে, অন্তত জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে সম্মান করে, অসদুপায় রোধ করুন। প্রকৃত মেধাবীদের স্বপ্ন যেন আর ঝরে না পড়ে, সে লক্ষ্যে একটি সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

শিক্ষার্থীদের দাবি, ২ জানুয়ারির সহকারী শিক্ষক পরীক্ষা আপাতত স্থগিত করে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অন্যথায় দেশের এই অন্ধকার বাস্তবতায় শিক্ষিত বেকাররা আজীবন হতাশা ও অনিশ্চয়তার গহ্বরে গড়াগড়ি খাবে।
একটি সুন্দর, মানবিক ও শিক্ষিত সমাজ গড়তে হলে নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধ করতেই হবে। প্রকৃত মেধার বিকাশ হোক—এটাই এখন সময়ের দাবি।




যমুনা অয়েলে কারাগারে থেকেও হাজিরা ও ছুটি: দুই সিবিএ নেতাকে বাঁচাতে কোটি টাকার নেপথ্য তৎপরতা

এসএম বদরুল আলমঃ যমুনা অয়েল কোম্পানিতে একের পর এক চাঞ্চল্যকর অনিয়মের তথ্য সামনে আসছে। অভিযোগ উঠেছে, কারাগারে থাকা দুই নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা-কর্মচারীকে নিয়মিত কর্মস্থলে হাজির দেখানো হয়েছে, এমনকি জেল থেকেই তাদের ছুটির আবেদন গ্রহণ ও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চললেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানা গেছে।

যমুনা অয়েল লেবার ইউনিয়নের সভাপতি এবং নিষিদ্ধ সংগঠন জাতীয় শ্রমিক লীগের বন্দর থানা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল হোসেনকে ২০২৫ সালের ২০ জুলাই নগরীর ইপিজেড থানাধীন সিমেন্ট ক্রসিং এলাকা থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তার গ্রেপ্তারের খবর বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ হলেও আশ্চর্যজনকভাবে ২০ জুলাই থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত তাকে অফিসে নিয়মিত হাজির দেখানো হয়। প্রায় বিশ দিন ধরে এই বিষয়টি অফিসিয়ালি গোপন রাখা হয়।

ঘটনাটি প্রকাশ পেলে ১৯ আগস্ট প্রথমবারের মতো এজিএম টার্মিনাল (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মাকছুদুর রহমান মানব সম্পদ বিভাগের জিএম মো. মাসুদুল ইসলামকে লিখিতভাবে জানান যে আবুল হোসেন ১০ আগস্ট থেকে অনুপস্থিত। এরপর এক মাস বা কখনো ২০ দিন পরপর অনুপস্থিতির চিঠি দেওয়া হতে থাকে। অথচ এই পুরো সময়জুড়েই আবুল হোসেন ছিলেন কারাগারে।

অভিযোগ রয়েছে, মাকছুদুর রহমান মূলত আবুল হোসেনের পৃষ্ঠপোষক জিএম এইচআর মাসুদুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। হিসাব শাখায় কাজ করলেও অপারেশন বিভাগে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে এজিএম টার্মিনাল (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দেওয়া হয় এবং পরে চলতি দায়িত্বেও পদায়ন করা হয়। একই সময়ে আবুল হোসেনের কারাবন্দি থাকার তথ্য গোপন রেখে বিশেষাধিকার ছুটির আবেদন পাঠানো হয় এবং মাসুদুল ইসলাম সেসব ছুটি নিয়মিত অনুমোদন দেন। গত ছয় মাস ধরে এভাবেই একজন গ্রেপ্তারকৃত শ্রমিক লীগ নেতাকে নিয়ে চলেছে প্রশাসনিক লুকোচুরি।

এ বিষয়ে বিপিসি কর্তৃপক্ষ অবগত থাকলেও মাসুদুল ইসলাম ও আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে জমা পড়া অভিযোগগুলো কার্যত ফাইলবন্দি হয়ে আছে বলে জানা গেছে।

একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে যমুনা অয়েলের লেবার ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও সিবিএ নেতা মুহাম্মদ এয়াকুবের বিরুদ্ধেও। তাকে ১২ ডিসেম্বর রাত দুইটায় চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে চান্দগাঁও থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় ১৪ ডিসেম্বর তাকে আদালতে পাঠানো হয়। কিন্তু গ্রেপ্তারের দিনই তিনি এক মাসের ছুটির আবেদন করেন এবং মানব সম্পদ বিভাগ তা অনুমোদন করে।

এভাবে দুইজন সিবিএ নেতা জেল হাজতে থেকেও অফিসিয়াল ছুটি ও হাজিরার সুবিধা ভোগ করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, এই দুই নেতার পেছনে সক্রিয় ছিলেন যমুনা অয়েলের তেল চোরাচালান সিন্ডিকেটের প্রধান, সদ্য বিদায়ী ডিজিএম (অপারেশন) হেলাল উদ্দিন।

বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, আত্মগোপনে থাকা হেলাল উদ্দিন এই দুই নেতাকে কারাগার থেকে বের করে আনতে কোটি টাকার ফান্ড সংগ্রহে নামেন। এই অর্থ সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয় তার সিন্ডিকেটের আটজন সদস্যকে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—ফতুল্লা ডিপোর গ্রেজার শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা জয়নাল আবেদীন টুটুল, দৌলতপুর ডিপোর সিবিএ নেতা দেলোয়ার হোসেন বিশ্বাস, বাড়াবাড়ি ডিপোর সহকারী ব্যবস্থাপক মাহবুবুল আলম, পার্বতীপুর ডিপোর আইয়ুব আলী (এয়াকুবের সহোদর), ভৈরব ডিপোর ডেপুটি ম্যানেজার মতিয়ার রহমান, এজিএম টার্মিনাল (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মাকছুদুর রহমান, ম্যানেজার (ফাইন্যান্স) ধীমান কান্তি দাস এবং ডেপুটি ম্যানেজার (এডমিন) হোসেন মোহাম্মদ ইয়াহিয়া।

অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেট দেশের বিভিন্ন ডিপো থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করছে এবং ডিপো ইনচার্জদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। দীর্ঘদিন ধরে তেল চুরির পুরনো নেটওয়ার্ক ধরে রাখতে ধীমান কান্তি দাস ও হোসেন মোহাম্মদ ইয়াহিয়া বিশেষভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

ধীমান কান্তি দাস ২০০৭ সালে হিসাব কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়ে বর্তমানে ম্যানেজার (ফাইন্যান্স) পদে আছেন। অন্যদিকে হোসেন মোহাম্মদ ইয়াহিয়া ২০১১ সালে চাকরিতে যোগ দেন এবং এখন এমডির দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে এই দুই কর্মকর্তার কোনো বদলি হয়নি। যদিও ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর বিপিসির সমন্বিত সভায় তিন বছরের বেশি একই জায়গায় কর্মরত কর্মকর্তাদের বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবুও এই দুজন সেই সিদ্ধান্তের বাইরে রয়ে গেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, এমডির দপ্তরে যেকোনো অভিযোগ প্রথমে হোসেন মোহাম্মদ ইয়াহিয়ার হাত দিয়েই যায়। ফলে তেল চুরির সিন্ডিকেট সংক্রান্ত বহু অভিযোগ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নজর এড়িয়ে গেছে। যমুনা অয়েলের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মনে করছেন, এই সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে দ্রুত এই দুই কর্মকর্তাকে বদলি করা অত্যন্ত জরুরি।




ক্ষমতার ছায়ায় গড়ে ওঠা টেন্ডার চক্র: গণপূর্তে মনিরুল ইসলামকে ঘিরে পুরনো অভিযোগ নতুন করে আলোচনায়

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তর দেশের সরকারি অবকাঠামো উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানেই কি দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী টেন্ডারচক্র সক্রিয় ছিল—এমন প্রশ্ন এখন জোরালোভাবে উঠছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলামকে কেন্দ্র করে ওঠা নানা অভিযোগ আবারও প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এই বিতর্ক নতুন নয়, তবে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি বদলি আদেশ পুরনো অভিযোগগুলোকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। ওই আদেশে মো. মনিরুল ইসলামকে ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-১ এ পুনরায় দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের পরপরই অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়—যাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের অভিযোগ, তাঁর ক্ষেত্রে কেন এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আবার দেওয়া হলো?

অধিদপ্তরের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তার দাবি, এই বদলিকে তাঁরা স্বাভাবিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না। বরং অনেকের মতে, এটি যেন একধরনের পুরস্কার। কারণ যেখানে নিয়ম ভাঙার অভিযোগে তদন্ত হওয়ার কথা, সেখানে দায়িত্ব আরও শক্ত করা হয়েছে। এই বদলির মাধ্যমেই পুরনো অনিয়মের গল্পগুলো নতুন করে আলোচনায় আসে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মো. মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রায় ১৬ বছর ধরে একই ধরনের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। তিনি যেখানেই বদলি হয়েছেন—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি বা ঢাকা—সেখানেই টেন্ডার সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দাবি করা হচ্ছে, এই দীর্ঘ সময়ে তিনি একটি শক্তিশালী ঠিকাদারি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন, যা স্থান বদলালেও কার্যত ভাঙেনি।

এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে গ্যালাক্সী অ্যাসোসিয়েটস, ডেল্টা কনস্ট্রাকশন এবং ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স নামের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম বারবার উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হতো এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া প্রভাবিত করা হতো। চট্টগ্রামে কর্মরত এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই সময় কমিশন লেনদেন ছিল অনেকটাই প্রকাশ্য বিষয়, কিন্তু কেউ মুখ খুলতে সাহস করত না।

ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার পর অভিযোগ আরও ঘনীভূত হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন দপ্তরের টেন্ডার নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অস্বাভাবিক হারে OTM (ওপেন টেন্ডার মেথড) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। বিভাগ-১ এ প্রায় ৭০ শতাংশ এবং বিভাগ-২ ও নগর বিভাগে ৮০ শতাংশের বেশি টেন্ডার এই পদ্ধতিতে হয়েছে বলে অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পদ্ধতি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা করে দেওয়া হতো এবং এখান থেকেই নিয়মিত কমিশন আদায় করা হয়েছে।

এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে বেশ কিছু নির্দিষ্ট টেন্ডার আইডি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যেমন—1102004, 1091460 থেকে 1091462, 1091815 থেকে 1091819, 1089451 থেকে 1089464, 1112907 থেকে 1112912 সহ আরও বহু টেন্ডার। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব টেন্ডারে গড়ে পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়েছে, যা মোট অঙ্কে কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

সবচেয়ে স্পর্শকাতর অভিযোগটি হলো ‘উচ্চপর্যায়ের আস্থা’। অধিদপ্তরের ভেতরে অনেকেই মনে করছেন, প্রভাবশালী মহলের সমর্থন থাকার কারণেই মনিরুল ইসলাম এত অভিযোগের পরও টিকে আছেন। এক কর্মকর্তা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, একই অপরাধে কেউ শাস্তি পান, আবার কেউ পদোন্নতি বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব—এটাই এখনকার বাস্তবতা।

এছাড়াও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ সামনে এসেছে। দাবি করা হচ্ছে, সুবিধাজনক জায়গায় নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি করিয়ে দিতে প্রভাব খাটানো হতো এবং এর বিনিময়ে আর্থিক লেনদেন চলত। কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি ছিল আরেকটি গোপন আয়ের উৎস।

সম্পদের বিষয়টিও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মনিরুল ইসলাম বা তাঁর ঘনিষ্ঠদের নামে ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, মোহাম্মদপুরে ১০ কাঠা জমির ওপর ৮ তলা ভবন, খুলনায় আলিশান বাড়ি, খুলনার ডুমুরিয়ায় ৫ একর জমি এবং কক্সবাজারে একটি হোটেল রয়েছে। অনেকের প্রশ্ন—একজন সরকারি কর্মকর্তার আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের কি কোনো সামঞ্জস্য আছে?

তবে এটাও সত্য, এই প্রতিবেদনভুক্ত কোনো অভিযোগই এখনো আদালতে প্রমাণিত নয়। সবই অভিযোগ ও বক্তব্যের ভিত্তিতে উঠে এসেছে। কিন্তু একটি বদলি আদেশকে ঘিরে যেভাবে পুরনো ও নতুন অভিযোগ একসঙ্গে সামনে এসেছে, তাতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভবিষ্যৎ ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এখন অনেকেই বলছেন, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত ছাড়া এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়।




প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে ঢাকা ওয়াসায় আউটসোর্সিং বাণিজ্য: উপসচিব নুরুজ্জামান মিয়াজীর বিরুদ্ধে কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ

সূত্র জানায়, মাত্র গত সপ্তাহেই প্রায় দুই শত আউটসোর্সিং কর্মচারী বদলি এবং প্রায় চল্লিশ জন বিলিং সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব বদলি ও নিয়োগের বিপরীতে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘুষ বাণিজ্যের নেপথ্যে কথিত সিবিএ নেতা আজিজ ও মনির মূল ভূমিকা পালন করছেন বলেও সূত্রের দাবি।

ঢাকা ওয়াসার এক উপসচিব, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন—নুরুজ্জামান মিয়াজীর মতো একজন চরম দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে প্রশাসন বিভাগে বহাল রাখা প্রতিষ্ঠানটির জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। তাকে দ্রুত অপসারণ করা না হলে ঢাকা ওয়াসা পুরোপুরি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা ওয়াসার পতিত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার সাবেক এমডি তাকসিম এ খানের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন উপসচিব (প্রশাসন-১) নুরুজ্জামান মিয়াজী। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি দাপটের সঙ্গে একই পদে বহাল রয়েছেন।

ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, ঘুষখোর কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত নুরুজ্জামান মিয়াজী ফাইল আটকে রেখে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতেন। ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একসময় তাকে ওয়াসার চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলেও প্রভাব ও তদবিরের মাধ্যমে তিনি পুনরায় চাকরিতে ফিরে আসেন। এমনকি পরীক্ষায় নবম স্থান অধিকার করেও প্রায় ১৪ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে বর্তমান পদে আসীন হয়েছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, ঘুষ না পেলে তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ উপেক্ষা করে ফাইল ফেরত পাঠাতেন। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুর্নীতির বরপুত্র হিসেবে পরিচিত ওয়াসার পলাতক সাবেক এমডি তাকসিম এ খানের দুর্নীতির অন্যতম সহযোগী ও সুবিধাভোগী ছিলেন নুরুজ্জামান মিয়াজী—এমন দাবিও উঠে এসেছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি প্লট, ফ্ল্যাট ও বাড়িসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, যা তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি। দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করলে তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রমাণ পাওয়া যাবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে নিজেকে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠতার প্রচারণা চালাতেন। ফেসবুকে আওয়ামী লীগের পক্ষে পোস্ট ও নেতাদের সঙ্গে তোলা ছবি প্রকাশ করে ওয়াসায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন। এমনকি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উস্কানিও দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি অবস্থান পরিবর্তন করে বিএনপির নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান বলে অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা ওয়াসার কথিত জাতীয়তাবাদী কর্মচারী ইউনিয়নের স্বঘোষিত নেতা আজিজুল আলম খান ও মনির হোসেন পাটোয়ারীকে মোটা অঙ্কের ডোনেশন দিয়ে তাদের ছত্রছায়ায় আবারও নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করছে।

উল্লেখ্য, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে একসময় নুরুজ্জামান মিয়াজীকে প্রশাসন বিভাগ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে আজিজ–মনির চক্রের সহায়তায় তিনি পুনরায় একই বিভাগে পোস্টিং পেয়েছেন। এ জন্য বড় অঙ্কের ডোনেশন দেওয়া হয়েছে বলেও একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়ের করা একটি অভিযোগে আওয়ামী লীগের শাসনামলে তাকসিম এ খানের ছত্রছায়ায় নুরুজ্জামান মিয়াজীর অনিয়ম, দুর্নীতি, কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।




রাজশাহী গণপূর্তে টেন্ডারের আগেই ভাগ হচ্ছে কাজ: আত্মীয়–বন্ধুদের হাতে কোটি টাকার প্রকল্প, প্রশ্নের মুখে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ–১ এখন আর সাধারণ একটি সরকারি দপ্তরের মতো নেই—এমন অভিযোগ উঠেছে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা একাধিক ঠিকাদারের কাছ থেকে। তাঁদের দাবি, এই দপ্তরটি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ মহলের জন্য “নিশ্চিত কাজ পাওয়ার জায়গায়”। কাগজে-কলমে দরপত্র ডাকা হলেও বাস্তবে কে কাজ পাবে, তা নাকি ঠিক হয়ে যাচ্ছে আগেই।

চলতি অর্থবছরে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ–১ বিভিন্ন সরকারি ভবনের জরুরি সংস্কার ও মেরামত কাজে প্রায় ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের বড় অংশ প্রকৃত প্রতিযোগিতা ছাড়াই নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে। ইজিপি (e-GP) পদ্ধতিতে বহু ঠিকাদার অংশ নিলেও ফলাফল আগেই নির্ধারিত থাকায় তাঁরা কাজ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।

নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের দীর্ঘদিনের রাজশাহীতে অবস্থান এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগই এই অনিয়মের মূল শক্তি হয়ে উঠেছে—এমন অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে। নোয়াখালীর বাসিন্দা হলেও তিনি শৈশব থেকেই রাজশাহীতে বেড়ে উঠেছেন, এখানেই পড়াশোনা করেছেন এবং রুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করে গণপূর্ত বিভাগে যোগ দেন। প্রায় ১৬ বছর রাজশাহীতেই চাকরি করার সুবাদে তাঁর ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক এখন বেশ শক্তিশালী।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো আদালত ভবনের কাজ নিয়ে। রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ভবনের প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকার সংস্কারকাজ পেয়েছেন মো. রফিক নামের এক ঠিকাদার। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলামের স্ত্রীর আপন চাচাতো ভাই। শুধু এই কাজ নয়, একই ঠিকাদার গণপূর্ত বিভাগের জোন কার্যালয়ের ছাদ সংস্কার ও টাইলস বসানোর আরও দুটি কাজ করছেন বলেও জানা গেছে।

এছাড়া, রাশেদুল ইসলামের আরেক নিকটাত্মীয় ফয়সাল কবির রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরের একটি সংস্কারকাজ পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বঞ্চিত ঠিকাদারদের প্রশ্ন—একই পরিবারের মানুষ বারবার কীভাবে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাজ পেয়ে যাচ্ছেন?

আরও বিস্ফোরক অভিযোগ এসেছে রাজশাহীর সার্কিট হাউস ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সংস্কারকাজ নিয়ে। ঠিকাদারদের দাবি, এই দুটি কাজের সিদ্ধান্ত টেন্ডার প্রকাশের আগেই নির্বাহী প্রকৌশলীর বন্ধু ইয়াসির আরাফাতের জন্য চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের অনেকেরই এমন কাজ করার পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই, তবুও ব্যক্তিগত পরিচয়ের জোরে তারা একের পর এক প্রকল্প পেয়ে যাচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অভিজ্ঞ ও নিয়ম মেনে কাজ করা ঠিকাদাররা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তাঁর ভাষায়, “যোগ্যরা বসে থাকে, আর পরিচয় থাকলেই কাজ পাওয়া যায়।”

অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, ইজিপি পদ্ধতিতেই কাজ হয় এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই ঠিকাদাররা নির্বাচিত হন। তবে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে তাঁর বক্তব্য ছিল আরও বিতর্কিত। তিনি বলেন, “আপনারা নিউজ করেন, আমার কিছু হবে না।” এই বক্তব্যে বঞ্চিত ঠিকাদারদের সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে।

অন্যদিকে, তাঁর আত্মীয় ঠিকাদার মো. রফিক বলেন, জরুরি মেরামত কাজে অনেক সময় আগে কাজ শুরু হয়, পরে টেন্ডার হয়। কিন্তু অনেকের মতে, এই বক্তব্য সরাসরি সরকারি দরপত্র আইন ও স্বচ্ছতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বলছে, আত্মীয় হলেও কেউ টেন্ডারে অংশ নিতে পারেন, এতে আইনগত বাধা নেই। তবে যদি গোপন দরপত্র ফাঁস, আগাম কাজ ভাগ বা ক্ষমতার অপব্যবহার হয়ে থাকে, তাহলে তা তদন্তের আওতায় আনা হবে।

এদিকে বঞ্চিত ঠিকাদাররা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ–১ পুরোপুরি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে এবং ইজিপি ব্যবস্থা কেবল নামমাত্র নিয়মে পরিণত হবে।




দুদকের মামলা হলেও বহাল নির্বাহী প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়া, প্রশ্নে এলজিইডির নীরবতা

এসএম বদরুল আলমঃ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার পরও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ঢাকা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়া এখনও নিজ পদে বহাল রয়েছেন। রাজধানীর গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের ৪র্থ ও ৫ম তলার নির্মাণ কাজ না করেই বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হলেও তার বিরুদ্ধে এখনো দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ বিষয়টি নিয়ে এলজিইডির ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক আলোচনা ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

দুদকের মামলার এজাহার অনুযায়ী, নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ বাচ্চু মিয়া তার সহযোগী সিনিয়র প্রকৌশলী ছাবের আলী, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. শামস জাভেদ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নির্মাণ প্রকৌশলীর মালিক আবু সাইদ খানের সঙ্গে যোগসাজশে এই অনিয়ম করেন। অভিযোগে বলা হয়, ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলার কাজ বাস্তবে সম্পন্ন না করেই ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ ১৯ হাজার ৮০৬ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে, যা দণ্ডবিধি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের একাধিক ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর সহকারী পরিচালক স্বপন কুমার রায় বাদী হয়ে ২৮ অক্টোবর মামলাটি দায়ের করেন। মামলার নম্বর ৩৬ হলেও অভিযুক্তরা এখনো আইনের আওতার বাইরে রয়ে গেছেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

এলজিইডি ঢাকা জেলার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বাচ্চু মিয়ার প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণেই কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পান না। তিনি আরও বলেন, মামলার পর বাচ্চু মিয়া কিছুদিন অফিসে অনুপস্থিত থাকলেও বর্তমানে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অফিসে উপস্থিত থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

আরেক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, দুদকের মামলার পর থেকে তারা কোনো অনৈতিক কাজে সহযোগিতা না করায় নির্বাহী প্রকৌশলী তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন। অফিসে প্রায়ই রূঢ় আচরণ করেন এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করছেন বলেও অভিযোগ ওঠে।

এছাড়া বাচ্চু মিয়ার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও বড় অঙ্কের আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে, তিনি এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভুইয়ার নাম ব্যবহার করে ঠিকাদারদের কাছ থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা দাবি করেন। শুধু তাই নয়, প্রকল্প পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে নিয়মিতভাবে ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, গত জুন মাসে কাজ শেষ না করেই বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অঙ্কের অগ্রিম বিল ছাড় করেছেন। দৃষ্টিনন্দন স্কুল প্রকল্পে প্রায় ৩০ কোটি টাকা, কেরানীগঞ্জ প্রকল্পে তিনটি প্যাকেজে ৩০ কোটি টাকা এবং বান্দুরা ব্রিজ প্রকল্পে প্রায় ৫ কোটি টাকার বিল দেওয়া হয়, যেখানে কাজের অগ্রগতি ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোবাইল মেইনটেনেন্স খাতে কাজ না করেই প্রায় ৫০ লাখ টাকার বেশিরভাগ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। একই রাস্তার ছবি বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যবহার করে অর্থ উত্তোলনের তথ্য রয়েছে। এলজিইডির মেইনটেনেন্স ইউনিটের ডাটাবেজ পরীক্ষা করলেই এসব অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো নিজের পরিবারের নামে কাজ বাগিয়ে নেওয়া। বাচ্চু মিয়া তার ভাই শহিদুল ইসলাম (সুমন)-এর নামে দুটি তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি লাইসেন্স করিয়েছেন, যা নিয়মবহির্ভূত। একটি লাইসেন্স মাহমুদ এন্টারপ্রাইজ এবং অন্যটি মোহনা এন্টারপ্রাইজ নামে নিবন্ধিত। এই লাইসেন্স ব্যবহার করে বিনা দরপত্রে অফিস ভবন রক্ষণাবেক্ষণের কাজ দেওয়া হয় এবং কাজ না করেই প্রায় ৪৮.৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এছাড়া তার মেয়ের নামে থাকা লাইসেন্সে আরও প্রায় ৩.৯৮ লাখ টাকার কাজ দেখানো হয়েছে।

অফিস সূত্রে জানা যায়, বাচ্চু মিয়া দিনের বেলায় দাপ্তরিক কাজের পরিবর্তে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সময় কাটান। সন্ধ্যার পর বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের নিয়ে অফিসে বসে সিদ্ধান্ত নেন। অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই তার যাতায়াতের সময় ও কর্মকাণ্ড স্পষ্ট হবে বলে দাবি করা হচ্ছে।

কর্মস্থলে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগও কম নয়। নিয়মিত কর্মচারীদের বাদ দিয়ে নিজের নিয়োগ করা বহিরাগত লোক দিয়ে অফিস চালানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আনিস নামের এক বহিরাগত ব্যক্তিকে তিনি তার প্রধান সহকারী হিসেবে ব্যবহার করেন, যার মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়ম পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব কারণে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী বাধ্য হয়ে ঢাকা জেলা এলজিইডি অফিস ছেড়ে অন্যত্র বদলি নিয়েছেন।




ঘুষ, ভুল রায় আর ক্ষমতার অপব্যবহারে এলজিইডিতে চাকরি স্থায়ীকরণের নামে কোটি টাকার লুট

এসএম বদরুল আলমঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত। সাম্প্রতিক সময়ে চাকরি স্থায়ীকরণ ও পদোন্নতির নামে ঘুষ লেনদেনের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে কিছু কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও সরকারকে গুনতে হচ্ছে বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি। অভিযোগ উঠেছে, এসব অনিয়মের ফলে সরকারের প্রায় ছয় কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে, অথচ যাদের প্রকৃতপক্ষে আদালতের বৈধ রায় রয়েছে তারা ঘুষ দিতে না পারায় চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

সর্বশেষ আলোচনায় এসেছে এলজিইডির তথাকথিত “ওহাব গ্রুপ”। এই গ্রুপের ১২ জন কর্মচারীকে ১০ম গ্রেডে পদোন্নতি দিয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, যার তারিখ ১৭ নভেম্বর ২০২৫। জানা যায়, এই গ্রুপের মোট ২৪ জন ২০১১ সালে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। রিটের রায়ে আদালত তাদের এলজিইডির রাজস্ব খাতে স্থায়ী করার নির্দেশ দেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রিট দায়েরের সময়ই তারা রাজস্ব খাতের কর্মচারী ছিলেন। অর্থাৎ আদালতের রায়টি বাস্তব প্রেক্ষাপটে অপ্রয়োজনীয় ও বিভ্রান্তিকর ছিল।

হাইকোর্টের রায়ে কোথাও পদোন্নতি, গ্রেড পরিবর্তন বা কার্যকর তারিখ উল্লেখ ছিল না। শুধু বলা হয়েছিল, শূন্য স্থায়ী পদে রাজস্ব খাতে নিয়মিত করতে। তবুও সেই রায়কে বিকৃতভাবে ব্যবহার করে বছরের পর বছর ধরে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যান ওহাব গ্রুপের সদস্যরা। গত প্রায় সাড়ে চব্বিশ বছরে এলজিইডিতে দায়িত্ব পালন করেছেন ১৩ থেকে ১৪ জন প্রধান প্রকৌশলী। তাদের কেউই এই রায় বাস্তবায়নে সম্মতি দেননি, কারণ এটি নিয়োগ বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আব্দুর রশীদ মিয়াকে ম্যানেজ করে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে ফাইল নড়াচড়া শুরু করা হয়। প্রশাসন শাখার একাধিক কর্মকর্তা ও উচ্চমান সহকারীও মোটা অঙ্কের ঘুষ নেন বলে অভিযোগ আছে। তবে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রশাসন) ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, ভুল রায়ের ভিত্তিতে তারা কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করবেন না।

পরবর্তী সময়ে প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ার হোসেনও একই অবস্থান নেন। তিনি বলেন, নিয়োগ বিধি অনুযায়ী সার্ভেয়ার ও কার্য সহকারী পদের জন্য নির্দিষ্ট চাকরিকাল ও বিভাগীয় পরীক্ষার শর্ত রয়েছে। অথচ ওহাব গ্রুপে কমিউনিটি অর্গানাইজার ও স্টোর কিপারের মতো পদও রয়েছে, যাদের পদোন্নতির জন্য নিয়োগ বিধি সংশোধন প্রয়োজন, যা রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়।

তবুও থেমে থাকেনি ওহাব গ্রুপ। রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমের সময় তারা আবার সক্রিয় হয়। অভিযোগ আছে, জাবেদ করিমকে প্রায় এক কোটি টাকা ঘুষ দেওয়া হয়। তাকে আশ্বস্ত করা হয় যে, ২০০৬ সাল থেকে চাকরি স্থায়ী দেখানো হলে প্রত্যেকে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাবদ অতিরিক্ত ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা পাবেন। এই আশায় তারা আরও টাকা তুলে ‘ফান্ড’ তৈরি করেন।

জাবেদ করিম প্রশাসন শাখার নতুন কর্মকর্তাদের দিয়ে প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করালেও বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে সমালোচনার মুখে পড়েন। এরপর তিনি আর স্থায়ীকরণের অফিস আদেশে স্বাক্ষর করতে রাজি হননি। কিন্তু বর্তমান রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফার সময় প্রশাসন শাখার কর্মকর্তারা আবার সক্রিয় হন। অভিযোগ অনুযায়ী, অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ১২ জনসহ মোট ১৪ জনের চাকরি স্থায়ীকরণের অফিস আদেশ জারি করা হয়।

এই অফিস আদেশে সুযোগ বুঝে আরও দু’জনের নাম যুক্ত করা হয়, যারা ওহাব গ্রুপের সদস্য নন। প্রশাসন শাখার কর্মকর্তা ও এক উচ্চমান সহকারী ঘুষের বিনিময়ে এই কাজটি করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে, একই সময়ে এলজিইডিতে কর্মরত বুল বুল আহমদের ঘটনা এই বৈষম্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তার চাকরি স্থায়ীকরণের পক্ষে হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, কনডেম অব কোর্ট, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, পিএসসি ও আইন মন্ত্রণালয়—সব জায়গা থেকেই নির্দেশ এসেছে। তবুও ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তার চাকরি আজও স্থায়ী হয়নি।

অন্যদিকে, আবু ফাত্তাহ নামের একজন ব্যক্তি দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর নকল সনদের মাধ্যমে এলজিইডিতে কনসালটেন্ট হিসেবে মোটা বেতনে চাকরি করেছেন। তিনি নিজেকে স্নাতক পরিচয় দিলেও বাস্তবে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাশ ছাড়া আর কোনো ডিগ্রির প্রমাণ দেখাতে পারেননি। শিক্ষা সনদের কপি চাইলে তা দিতে ব্যর্থ হন সংশ্লিষ্ট দপ্তর। অভিযোগ আছে, এলজিইডির মিডিয়া কনসালটেন্ট পরিচয় ব্যবহার করে তিনি কর্মকর্তাদের ভয় দেখানো, মিথ্যা সংবাদ ছড়ানো এবং টাকা আদায়ের মতো কাজ করেছেন।

চাকরি না থাকলেও বিভিন্ন সুপারিশ ও চাপের মুখে বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফা তাকে আবার একটি বড় প্রকল্পে কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিতে নির্দেশ দেন। এতে এলজিইডির ভেতরে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে এলজিইডিতে আইন, আদালতের রায় ও নিয়োগ বিধির চেয়ে ঘুষ ও তদবিরই বেশি কার্যকর।




তেল চুরি, শত কোটি টাকার সম্পদ আর কানাডা পালানোর ছক: হেলাল উদ্দিনকে ঘিরে যেসব অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম (অপারেশন) হেলাল উদ্দিনকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসছে। অনুসন্ধানী সূত্রগুলোর দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী তেল চোরাচালান সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছিলেন। তার সিন্ডিকেটের দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত সিবিএ নেতা মুহাম্মদ এয়াকুব গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই আত্মগোপনে চলে যান হেলাল উদ্দিন। ১২ ডিসেম্বর ভোর রাতে চট্টগ্রামের কাতালগঞ্জে তার বাসায় গোয়েন্দা পুলিশের অভিযান চালানোর পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ নেই।

সূত্র জানায়, আত্মগোপনে থেকেই হেলাল উদ্দিন বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি গোপনে কানাডা যাওয়ার সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করেছেন। এরই অংশ হিসেবে যমুনা অয়েল কোম্পানি থেকে তার প্রাপ্য সব টাকা উত্তোলনের দায়িত্ব নিজের ছোট ভাই জালাল উদ্দিন বাদলের হাতে তুলে দেন। ১৭ ডিসেম্বর, নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের ঠিক আগের দিন, হেলাল উদ্দিনের অনুপস্থিতিতে তার ভাইয়ের নামে সব পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য একটি অনুমোদন নেওয়া হয়। সে সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাসুদুল ইসলাম সেই আবেদন অনুমোদন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর ফলে শ্রমিক অংশীদারিত্ব তহবিল, গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ হেলাল উদ্দিনের বিপুল অঙ্কের পাওনা অর্থ তার ভাই গ্রহণ করবেন বলে জানা গেছে। তবে যমুনা অয়েলের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, নতুন এমডি মো. আমির মাসুদ এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে তা বাতিল করতে পারেন।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, শুধু চাকরিজীবনের পাওনাই নয়—হেলাল উদ্দিন তার নামে-বেনামে থাকা শত শত কোটি টাকার সম্পত্তি বিক্রি ও দেখভালের দায়িত্বও ছোট ভাইয়ের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ প্রশাসনের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সঙ্গে তার পরিবারের যোগাযোগ ও দেনদরবার চলছে, যাতে তিনি নির্বিঘ্নে দেশ ছাড়তে পারেন।

হেলাল উদ্দিনের ছেলে ও মেয়ে আগে থেকেই কানাডায় অবস্থান করছে এবং সেখানে তার একটি নিজস্ব ফ্ল্যাট রয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ আছে, চাকরি জীবনের শেষ দিকে তিনি ও তার স্ত্রী বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করেছেন। চট্টগ্রামের একাধিক ব্যাংকে তাদের নামে থাকা এসব হিসাব থেকে তোলা অর্থের বড় একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এই অর্থের একটি অংশ ভারতে অবস্থানরত তার আত্মীয় সাবেক এমপি ও যুবলীগ নেতা মহিউদ্দিন বাচ্চু এবং কানাডাপ্রবাসী সন্তানদের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালে হেলাল উদ্দিন, মুহাম্মদ এয়াকুব ও তেল টুটুলের নেতৃত্বে যমুনা অয়েলে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক তেল চুরির ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ আছে, হাজার হাজার কোটি টাকার তেল আত্মসাতের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হয়েছেন। শুধু হেলাল উদ্দিনই চাকরি জীবনে অন্তত পাঁচশ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তার অবৈধ সম্পদের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধানে নেমেছে বলেও জানা গেছে, যদিও তাকে প্রভাব খাটিয়ে বিষয়টি সামাল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

কর্মজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হেলাল উদ্দিন যমুনা অয়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পোস্টিংগুলোতেই ছিলেন। ১৯৯৫ সালে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পর ১৯৯৭ সালে তার চাকরি স্থায়ী হয়। পতেঙ্গা টার্মিনাল অফিস ও আগ্রাবাদ প্রধান কার্যালয়—এই দুই জায়গাতেই মূলত তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। একবার বগুড়ায় বদলির আদেশ হলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তা বাতিল করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ব্যক্তিগত জীবনেও তার বিলাসবহুল সম্পদের তালিকা দীর্ঘ। চট্টগ্রামে একাধিক বহুতল ভবন, রাউজানে নিজ গ্রামে পাঁচ ভাইয়ের জন্য আলাদা বাড়ি নির্মাণ, প্রিমিও মডেলের ব্যক্তিগত গাড়ি ও স্ত্রীর জন্য বিলাসবহুল জিপ—সব মিলিয়ে তার জীবনযাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পদের বড় অংশই তেল চুরি ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে গড়ে তোলা।

সব মিলিয়ে, হেলাল উদ্দিনকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ এখন দেশজুড়ে আলোচনার বিষয়। তদন্ত সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপই এখন দেখার অপেক্ষা।




অভিযোগের পাহাড়ে ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব পরিদর্শক হারুন অর রশিদ রানা: আয়ের সঙ্গে সম্পদের মিল নেই বলে দাবি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব পরিদর্শক হারুন অর রশিদ, যিনি রানা নামেও পরিচিত, তার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গির কবির নানক ও সাবেক এমপি গোলন্দাজ বাবেলের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তিনি আন্ডার বিলিং, মিটার টেম্পারিং এবং অবৈধ পানির সংযোগে সহযোগিতা করে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। এসব অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরে হারুন রানার চারটি বাড়ি রয়েছে। এগুলো টিক্কাপাড়া, ঢাকা উদ্যান, নূরজাহান রোড ও চাঁন মিঞা হাউজিং এলাকায় অবস্থিত। এছাড়াও ঢাকায় একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগ আছে। গাজীপুরের শ্রীপুর ও মাওনা, ময়মনসিংহের ভালুকা, পাইথল ও গফরগাঁও এলাকাতেও তার স্থাবর সম্পদের কথা বলা হয়েছে। গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার পাগলা থানার মাখল গ্রামে তিনি বিলাসবহুল দুইতলা বাড়ি তৈরি করেছেন, যার বাজারমূল্য কোটি টাকার বেশি বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হারুন রানার মাসিক বেতন প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। অথচ চাকরিতে যোগদানের সময় তার বেতন ছিল ১০ হাজার টাকারও কম। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ায় সহকর্মী ও গ্রামবাসীরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এসব সম্পদ তিনি নিজের নামে না রেখে স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়দের নামে করেছেন।

ময়মনসিংহের বিল মাখল মৌজায় বিভিন্ন দাগ ও খতিয়ানে বহু কাঠা থেকে শুরু করে একরের পর একর জমি কেনার বিস্তারিত বিবরণ অভিযোগে দেওয়া হয়েছে। এসব জমি তিনি আবুল হাসমে, সুরুজ গং, মোতালেব গং, মিরাজ মেম্বার গং, আঃ রহমান, আঃ হেকিম, নাজিম উদ্দিন, কালাম হাফেজ, আবু সাঈদসহ বহু ব্যক্তির কাছ থেকে কিনেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। একই মৌজায় একাধিক একর চাষি জমি কেনার পাশাপাশি গাজীপুর ও ভালুকাতেও জমি রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে।

এছাড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, গাজীপুরের শ্রীপুর ও মাওনায় টিনশেড বাড়ি, ভালুকায় জমি ও ঘর, পাগলার গয়েশপুর বাজারে বাড়ি এবং রেলওয়ের জমি দখল করে দোকান নির্মাণের কথাও রয়েছে। গফরগাঁওয়ের পাইথলে এক একর জায়গায় মুরগির খামার, পাইথল মৌজায় বাড়ি এবং শিলাশী মৌজায় জমির মালিকানার অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, মরহুম আবু তাহেরের পরিবারের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে বাড়ি-ভিটা ও কবরস্থানের জমি লিখে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে নুরুল ইসলাম, গিয়াস উদ্দিন ও সামছুদ্দিনসহ কয়েকজনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে উচ্ছেদ করার অভিযোগ রয়েছে। যারা তার বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাদের মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হতে হয়—এমন অভিযোগও করা হয়েছে।

হারুন রানার বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, তার স্ত্রী ও কন্যার ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ রয়েছে এবং তার ও পরিবারের নামে বিভিন্ন ব্যাংক ও পোস্ট অফিসে কোটি টাকা জমা আছে। তিনি একাধিক গাড়ির মালিক বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে, যার মধ্যে ঢাকা মেট্রো-গ-১৭-৪৭৬৩০ নম্বরের একটি গাড়ির কথাও বলা হয়েছে।

অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, এর আগেও দুই দফা তদন্তের পর দুর্নীতি দমন কমিশন হারুন রানাকে দায়মুক্তি দেয়। ২০১৬ ও ২০২০ সালে দেওয়া চিঠিতে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে জানানো হয়। তবে গ্রামবাসী ও ওয়াসার কর্মচারীদের দাবি, তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সম্পদের কোনো মিল নেই। তাই নতুন করে তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছে।

বর্তমানে হারুন রানা ঢাকা ওয়াসার ৩ নম্বর রাজস্ব জোনে কর্মরত। অভিযোগে বলা হয়েছে, আগের জোনগুলোতেও তিনি একই ধরনের অনিয়ম করেছেন। তিনি নিজে ডিউটি না করে বহিরাগত লোক দিয়ে কাজ করান, যা ওয়াসার নিয়মের পরিপন্থী। এমনকি তার সহকারী ও ড্রাইভারকে তিনি নিজের বেতনের কাছাকাছি বেতন দেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সব মিলিয়ে অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শূন্য থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া হারুন অর রশিদ রানার উত্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে তার ও পরিবারের নামে বিপুল সম্পদের বিবরণসহ আরও একটি অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে।