ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়ন জমি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে একজন নিহত

মামুনুর রহমান, পাবনাঃ  বুধবার ১৭ ডিসেম্বর’ ২৫ সকালে লক্ষ্মিকুন্ডার কামালপুর গ্রামে। সে ঐ গ্রামের আবুল মোল্লার ছেলে এবং লক্ষ্মিকুন্ডা ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক। মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর’২৫) নিহত বিরু মোল্লার আপন চাচাতো ভাই মৃত ইসলাম মোল্লার ছেলে জহুরুল মোল্লা বিরু মোল্লার মালিকানা দাবিকৃত জমি থেকে ইটভাটায় ব্যবহারের জন্য মাটি কেটে নিয়ে যায়। এই জমিটি নিয়ে উভয়ে মালিকানা দাবি করার কারণে দীর্ঘদিন থেকে বিরোধ।
এই জমিটি নিয়ে উভয়ে মালিকানা দাবি করার কারণে দীর্ঘদিন থেকে বিরোধ চলে আসছে। সাম্প্রতিককালে এ নিয়ে দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে। বুধবার (১৭ ডিসেম্বর’২৫) সকালে বিরু মোল্লা লোকজন নিয়ে জহুরুল মোল্লার বাড়িতে যায় এবং কেন মাটি কাটা হয়েছে এপ্রসঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করার এক পর্যায়ে উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি, বাকবিতন্ডা ও চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এসময় বিরু মোল্লার লোকজন ইটপাটকেল ছুঁড়লে জহুরুল মোল্লা ও তার ছেলে ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে বিরু মোল্লাসহ তার লোকজনকে সরে যেতে বলেন। কিন্তু বিরু মোল্লার লোকজন সরে না গিয়ে মারমুখী আচরণে অনড় থাকে। পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে গেলে বিরু মোল্লাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়। এসময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে বিরু মোল্লা ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার সরকার ও ঈশ্বরদী থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ মমিনুজ্জামানকে জিজ্ঞাসা করা হলে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে তারা বলেন, জমিজমা সংক্রান্ত পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে বিরু মোল্লা নিহত হয়েছেন। নিহত বিরু মোল্লার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাবনা মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে এবং আইনী ব্যবস্থা গ্রহণে যথাযথ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আকস্মিক এই হত্যাকান্ড সংঘটিত হওয়ার পর এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে পুলিশ দাবি করেছেন। উল্লেখ্য, নিহত বিরু মোল্লা এবং ঘাতক জহুরুল মোল্লা উভয়ই বিএনপি রাজনীতির সাথে জড়িত এবং তারা দুজনেই বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও পাবনা জেলা বিএনপির আহবায়ক হাবিবুর রহমান হাবিবের ঘনিষ্ঠ সহচর ও সমর্থক বলে উভয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করেন।



তদন্ত নয় কেন মানববন্ধন? গণপূর্ত নিয়ে উঠছে কঠিন প্রশ্ন

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ যখন ক্রমেই জনসমক্ষে আসছে, ঠিক সেই সময়েই জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে হঠাৎ করে আয়োজন করা হলো এক ‘প্রতিবাদী মানববন্ধন’। ব্যানারে লেখা ছিল—গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘অসত্য ও ভিত্তিহীন অভিযোগ’-এর প্রতিবাদ। তবে অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য বলছে, এই মানববন্ধন আদতে কোনো প্রতিবাদ নয়; বরং এটি একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সুসংগঠিত আত্মরক্ষামূলক শক্তি প্রদর্শন।

বুধবার সকালে অনুষ্ঠিত এই মানববন্ধন ঘিরে সাধারণ ঠিকাদার ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র আলোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাদের ভাষায়, যাঁরা বছরের পর বছর ধরে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন, ঠিকাদারি কাজ বণ্টনে প্রভাব বিস্তার করেছেন, আজ তারাই নিজেদের ‘নির্দোষ’ দাবি করে রাজপথে দাঁড়ানো কতটা যৌক্তিক—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা দাবি করেন, বাংলাদেশ ঠিকাদার সমিতির নাম ব্যবহার করে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়াচ্ছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগকারীরা প্রকৃত ঠিকাদার নন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই এসব তথ্য ছড়াচ্ছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা যায়, মানববন্ধনে উপস্থিত অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রভাবশালী নির্বাহী প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সহযোগী।

অভিযোগ রয়েছে, এই ঠিকাদার সিন্ডিকেটই বছরের পর বছর ধরে দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, কাজ ভাগাভাগি, বিল ছাড় এবং প্রকল্প বণ্টনে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছে। নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি ছাড়া অন্য কোনো ঠিকাদারের পক্ষে নিয়ম মেনে কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই মানববন্ধনের উদ্দেশ্য কি সত্যিই গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি রক্ষা, নাকি নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সাধারণ ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা নিয়ম মেনে দরপত্রে অংশ নিলেও নানা অদৃশ্য বাধার মুখে পড়েন। অধিকাংশ কাজই চলে যায় একটি নির্দিষ্ট বলয়ের হাতে। তাদের ভাষায়, “যারা সব সুযোগ নিজেরা নেয়, তারাই আজ প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে চাইছে—এটা আমাদের জন্য চরম হতাশাজনক।”

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও একই ধরনের অসন্তোষ লক্ষ্য করা গেছে। তারা বলছেন, প্রকৃত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত না করে বরং যাঁরা প্রশ্ন তুলছেন, তাঁদের ‘ভুয়া’ বা ‘অসৎ’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। এতে প্রকৃত সত্য আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন গণপূর্ত ঠিকাদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রফিক হাওলাদার। তিনি বলেন, গণপূর্ত ঠিকাদার সমিতি একটি সারাদেশব্যাপী সংগঠিত প্রতিষ্ঠান এবং এর নেতৃত্বে রয়েছেন তালিকাভুক্ত প্রথম শ্রেণির ঠিকাদাররা। তার দাবি অনুযায়ী, যারা আজ গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন, তারা কেউই প্রকৃত ঠিকাদার নন।

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে কেউ মানববন্ধনের নামে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করলে গণমাধ্যমকর্মীদের উচিত হবে তাদের পরিচয় যাচাই করা। প্রয়োজনে সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করারও আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে উল্লেখ করেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে তাদের নিজস্ব অফিস রয়েছে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন—যদি সবকিছুই স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক হয়, তাহলে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তে আপত্তির কারণ কী?

এই মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন গণপূর্ত ঠিকাদার সমিতির সহ-সভাপতি আবু রায়হান, সিটি ডিভিশনের ঠিকাদার সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান খোকন এবং ঢাকা গণপূর্ত বিভাগের ২ নম্বর ডিভিশনের সভাপতি আশরাফসহ আরও কয়েকজন নেতা। তবে উপস্থিত অনেকের প্রকৃত পরিচয় ও ভূমিকা নিয়েই তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। সাধারণ ঠিকাদারদের দাবি, এদের বড় একটি অংশ নিয়মিত কাজ পাওয়া সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

সব মিলিয়ে প্রশ্নটা এখন স্পষ্ট—গণপূর্ত অধিদপ্তরকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ যদি সত্যিই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন হয়, তাহলে তার জবাব কি মানববন্ধন? নাকি একটি নিরপেক্ষ তদন্তই হতে পারে প্রকৃত সমাধান? কেন বারবার একই গোষ্ঠী সব কাজ পায়, কেন অভিযোগ তুললেই ‘ভুয়া ঠিকাদার’ তকমা দেওয়া হয়, আর কেন দুর্নীতির তদন্তের বদলে প্রেসক্লাবে শক্তি প্রদর্শনের আয়োজন—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অধরাই।

এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট জবাব না আসা পর্যন্ত জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত এই মানববন্ধনকে অনেকেই দেখছেন একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেট রক্ষার নাটকীয় আয়োজন হিসেবে। গণপূর্ত অধিদপ্তর নিয়ে চলমান অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ আর মানববন্ধনের এই সংঘাতে শেষ পর্যন্ত কারা জবাবদিহির মুখোমুখি হবে—সেদিকেই এখন তাকিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল ও সাধারণ মানুষ।




তেজগাঁও সাবরেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষের রাজত্ব: দুদকের অভিযানেও নড়েনি সিন্ডিকেট

এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এলাকা তেজগাঁও। এই এলাকার সাবরেজিস্ট্রি অফিস ও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স প্রতিদিন শত শত মানুষ জমি সংক্রান্ত সেবা নিতে আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এখানে বৈধ ফি দিয়ে কাজ করানো প্রায় অসম্ভব। বছরের পর বছর ধরে অভিযোগ উঠছে, এই অফিসে একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট সক্রিয়, যারা রেজিস্ট্রার বদল হলেও নিজেদের অবস্থান অটুট রেখেছে।

দীর্ঘদিনের অভিযোগের পর গত ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তেজগাঁও সাবরেজিস্ট্রি অফিস ও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে ছদ্মবেশে অভিযান চালায়। দুদকের জনসংযোগ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। এ সময় দুইজন নকলনবিশ ও একজন দালালকে অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগে হাতেনাতে আটক করা হয়। পরে তাদের জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য হস্তান্তর করা হয়।

অভিযানে দুদক টিম দেখতে পায়, দলিল সার্চ, দলিল যাচাই ও দলিলের নকল উত্তোলন—এই প্রতিটি ধাপেই সরকার নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে। গ্রাহকদের কাছ থেকে জোর করে টাকা নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন অজুহাতে। আরও গুরুতর বিষয় হলো, অফিসে কোথাও নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত সিটিজেন চার্টার টাঙানো নেই। নকল উত্তোলন ও সার্টিং সেবার নামে আদায় করা টাকার সঙ্গে সরকারি ট্রেজারিতে জমা দেওয়া টাকার স্পষ্ট গরমিল পাওয়া গেছে, যা রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

দুদকের অভিযানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে রেকর্ডরুম নিয়ে। সংরক্ষিত ও সংবেদনশীল এই কক্ষে অবাধে ঢুকছে দালাল ও এখতিয়ারবহির্ভূত ব্যক্তিরা। এমনকি দৈনিক হাজিরাভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত লোক দিয়ে দলিল যাচাই করানো হচ্ছে, যা প্রচলিত আইন ও বিধির সরাসরি লঙ্ঘন। সেবা নিতে আসা ভুক্তভোগীরা দুদক টিমকে জানান, ঘুষ না দিলে এখানে একটি কাজও এগোয় না। প্রতিটি ধাপে টাকা দিতে হয়।

একই দিনে দুদক তেজগাঁও ভূমি অফিসেও আলাদা অভিযান চালায়। সেখানে ভূমি সেবা দিতে গড়িমসি, হয়রানি এবং দালালনির্ভর কার্যক্রমের প্রমাণ মেলে। গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অফিসের ভেতরে না ঢুকেই দালালের মাধ্যমে কাজ করাতে বাধ্য করা হয়। এছাড়া গত জানুয়ারিতে জেলা প্রশাসনের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ছয়জন দালালের বিরুদ্ধে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় দায়ের হওয়া মামলার নথিও সংগ্রহ করে দুদক।

দুদক জানিয়েছে, এই দুই অভিযানের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেওয়া হবে। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন উঠছে—এই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর আদৌ কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? অভিযানে ধরা পড়া দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কি কোনো বিভাগীয় বা ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? ট্রেজারি অর্থের গরমিল নিয়ে কি আলাদা তদন্ত শুরু হয়েছে?

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে সাবেক আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর মানুষ আশা করেছিল প্রশাসনে শুদ্ধতা আসবে। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও তেজগাঁও সাবরেজিস্ট্রি অফিস ও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে দুর্নীতি থামেনি। বরং অভিযোগ উঠেছে, আগের চেয়েও আরও সংঘবদ্ধ ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এই সিন্ডিকেট।

দুদকের অভিযান দুর্নীতির চিত্র সামনে এনেছে ঠিকই, কিন্তু সিন্ডিকেট ভাঙার বাস্তব কোনো উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। যতদিন পর্যন্ত দালাল চক্র ও তাদের মদদদাতা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হবে, ততদিন তেজগাঁও সাবরেজিস্ট্রি অফিস শুধু একটি অফিসের দুর্নীতির গল্প নয়—পুরো রাষ্ট্রীয় সেবা ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতীক হয়েই থাকবে।




ঢাকা বিভাগের খাদ্য পরিবহন ব্যবস্থায় ঘুষের ছক: ৩০ কোটি টাকার ঠিকাদারি নিয়ে ডিজি-আরএফসি যোগসাজশের অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ সরকারি খাদ্য পরিবহন ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত ঢাকা বিভাগে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, খাদ্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ মদদে একটি সংগঠিত ঘুষ-নির্ভর সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সড়কপথে খাদ্য পরিবহনের ঠিকাদারি বণ্টনে অন্তত ৩০ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন করা হয়েছে। এই ঘটনায় খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবুল হাসনাত হুমায়ূন কবীর এবং ঢাকা বিভাগের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুরাইয়া খাতুনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।

গত ৯ ডিসেম্বর রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের কার্যালয়ে আইন ও মানবাধিকার সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের প্রধান উপদেষ্টা সুফি সাগর শামস এই অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়, খাদ্য অধিদপ্তরের নিবন্ধিত ৮১৯টি পরিবহন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার সুযোগ না দিয়ে পূর্বনির্ধারিতভাবে মাত্র ৩০০টির মতো প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই তালিকায় জায়গা পেতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা করে ঘুষ দাবি করা হয়, যার মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০ কোটি টাকা।

অভিযোগ অনুযায়ী, পুরো এই প্রক্রিয়ার নেপথ্যে ছিলেন মহাপরিচালক মো. আবুল হাসনাত হুমায়ূন কবীর এবং আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুরাইয়া খাতুন। মাঠপর্যায়ে ঘুষ আদায়ের দায়িত্ব পালন করেন সুরাইয়া খাতুন, যিনি সরাসরি টাকা না নিয়ে কয়েকজন প্রভাবশালী ঠিকাদারকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করেন। অভিযোগে যেসব ঠিকাদারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তারা হলেন আবুল কালাম আজাদ (জননী এন্টারপ্রাইজ), জাহাঙ্গীর আলম (সেতারা অ্যান্ড সন্স), আব্দুল হাই রাজু (এ. হাইএন্ড ব্রাদার্স), আনসার হাজী (তালুকদার এন্টারপ্রাইজ), আলী নূর (এ আর এন্টারপ্রাইজ) এবং হারুন অর রশিদ (রিমি এন্টারপ্রাইজ)। এই ব্যক্তিদের মাধ্যমে ঘুষ সংগ্রহ করে পছন্দের তালিকায় নাম তোলার নিশ্চয়তা দেওয়া হতো বলে অভিযোগে বলা হয়।

ই-টেন্ডার পদ্ধতি থাকলেও বাস্তবে সেটিকে কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। গত ২২ সেপ্টেম্বর দরপত্র আহ্বান করা হলেও ভালো দর পাওয়ার আশ্বাস দিয়ে অনেক ঠিকাদারের আর্থিক ও কারিগরি নথি নিজেদের কাছে রেখে দেন সুরাইয়া খাতুন। যারা ঘুষ দিতে রাজি হন, তাদের নথি ঠিকঠাক রাখা হয়। আর যারা অস্বীকৃতি জানান, তাদের কাগজপত্র ফেরত না দিয়ে দরপত্র প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো দরপত্র কারসাজি। অভিযোগে বলা হয়, প্রায় ৪৬৭ জন ঠিকাদারের দরপত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল চিহ্ন ও অস্বাভাবিক উচ্চ দর দেখানো হয়। অন্যদিকে যাদের নির্বাচিত করা হয়েছে, তাদের শত শত দরপত্র একই কলম, একই হাতের লেখা ও একই লেখনীর ধরনে লেখা, যা পরিকল্পিত জালিয়াতির প্রমাণ বলে দাবি করা হয়। প্রশ্ন উঠেছে, কোথায় বসে এবং কার নির্দেশে এতগুলো দরপত্র একই হাতে লেখা হলো।

আরও অভিযোগ রয়েছে, ২৪ অক্টোবর চিটাগাং রোড এলাকার একটি তাজমহল কমিউনিটি সেন্টারে সাধারণ ঠিকাদারদের ডেকে এনে জোর করে দরপত্র নথিতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। যারা স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের মতে, এটি ছিল প্রশাসনিক ক্ষমতার সরাসরি অপব্যবহার।

এই পুরো অনিয়মের বিষয়ে মো. আলাউদ্দিন (নিবন্ধন নং ৮১৬), মেসার্স সাদিয়া এন্টারপ্রাইজ (নং ৪৬৮), মেসার্স আমির ব্রাদার্স (নং ৮৫৬) এবং মেসার্স জেড এ এন্টারপ্রাইজ (নং ৮৯২) গত ২৩ অক্টোবর মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগকারীদের দাবি, এই নীরবতাই দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দেয়।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, বর্তমান মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে অতীতেও সরকারি পরিবহন পুলে দায়িত্ব পালনকালে অর্থ আত্মসাৎ এবং সরকারি গাড়ির তেল বিক্রির মাধ্যমে বিদেশে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ছিল। তবে সেসব অভিযোগ কখনো পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মুখ দেখেনি।

এখন দুদকের সামনে বড় প্রশ্ন হলো—ই-টেন্ডার ব্যবস্থাকে কীভাবে ভেঙে হাতে লেখা দরপত্র চালু করা হলো, কার নির্দেশে শত শত দরপত্র একইভাবে তৈরি হলো এবং লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরও কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগকারীরা দরপত্র প্রক্রিয়া জব্দ, ব্যাংক লেনদেন তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবুল হাসনাত হুমায়ূন কবীর সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং তিনি সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।




ই-ডিএলএমএসে চাকরির আশায় সর্বস্ব হারালেন প্রার্থীরা, এমডি মিজান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ ভূমি অধিদপ্তরের ই-ডিএলএমএস (ই-ডিজিটাল ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) প্রকল্পে আউটসোর্সিং নিয়োগকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বহু চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। টাকা দিয়েও কেউ চাকরি পাননি, আবার অর্থ ফেরতও দেওয়া হয়নি। ফলে অনেক ভুক্তভোগী আজ নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

এই ঘটনায় মো. হাবিবুজ্জামান নামের এক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তার অভিযোগে বলা হয়, স্টেট সার্ভিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজানুর রহমান এবং তার শ্যালক জাকির হোসেন চাকরি নিশ্চিত করার কথা বলে প্রথমে ২ লাখ টাকা নেন। পরে বিভিন্ন অজুহাতে আরও ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। ভুক্তভোগীকে ইসলামী ব্যাংকের একটি নির্দিষ্ট হিসাব নম্বর ২০৫০২০৫০২১৪৪৮৪১০-এ টাকা জমা দিতে বাধ্য করা হয়।

অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত নথিতে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি তারিখে ২ লাখ টাকা অগ্রিম জমা দেওয়ার লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। পরে আরও ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নগদ দেওয়ার কথাও নথিতে উল্লেখ ছিল। একই অ্যাকাউন্ট নম্বর বারবার ব্যবহার করা হয়েছে, যা পুরো লেনদেনকে পরিকল্পিত প্রতারণার ইঙ্গিত দেয়। এসব কাগজপত্র ও ব্যাংক লেনদেনকে ঘুষ, আর্থিক জালিয়াতি এবং প্রতারণার সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে কিছু নির্দিষ্ট আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানকে ই-ডিএলএমএস প্রকল্পে যুক্ত করা হয়। পরে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে চেইনম্যান, সার্ভেয়ার ও কম্পিউটার অপারেটরের মতো পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়। প্রার্থীদের বলা হতো, সবকিছু “উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনে” হচ্ছে এবং “প্রকল্প পরিচালকের সুপারিশ” রয়েছে। পরে এসব কথাই যে মিথ্যা ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে যায়।

এই প্রতারণার শিকারদের বেশিরভাগই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। অনেকেই পরিবারের জমানো টাকা, ঋণ কিংবা স্বর্ণ বন্ধক রেখে টাকা জোগাড় করেছিলেন। কিন্তু চাকরি না পেয়ে তারা এখন ঋণের বোঝায় জর্জরিত। কেউ কেউ পাওনাদারদের চাপ সহ্য করতে না পেরে এলাকা ছেড়ে বস্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। শক্তিশালী এই চক্রের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে মুখ খুলতেও সাহস পাচ্ছেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, সরকারি বা সরকারি প্রকল্পের নিয়োগে টাকা নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। লিখিত নির্দেশনা ও টাকা নেওয়ার প্রমাণই দেখায় যে এটি একটি সাজানো নিয়োগ বাণিজ্য। টাকা নেওয়ার পর অভিযুক্তরা চাকরি দেয়নি, আবার অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগও নেয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আউটসোর্সিং নিয়োগে যথাযথ সরকারি নজরদারি না থাকায় এ ধরনের দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে শুধু চাকরিপ্রার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, বরং সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এত বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন উচ্চপর্যায়ের প্রভাব ছাড়া সম্ভব নয়।

এই অবস্থায় ভুক্তভোগীরা দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চান। তারা অভিযুক্ত এমডি মিজানুর রহমান, জাকির হোসেনসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, নেওয়া অর্থ ফেরত, ক্ষতিপূরণ ও জরিমানার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।




বিজ্ঞাপনে ‘মিথ্যা’ দাবি, নথিতে ভিন্ন চিত্র: পিডি ইনামুল কবীরকে ঘিরে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন

এসএম বদরুল আলমঃ সাম্প্রতিক সময়ে পিডি ইনামুল কবীরকে ঘিরে জলবায়ু ও পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। এসব অভিযোগের জবাবে সংশ্লিষ্ট সংবাদে প্রতিবাদ না জানিয়ে তিনি ভিন্ন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন আকারে একটি লিখিত প্রতিবাদ প্রকাশ করেন, যা প্রতিবেদকের নজরে আসে। সেই প্রতিবাদে তিনি অভিযোগগুলোকে “মিথ্যা” বলে দাবি করলেও, তার বক্তব্যে উঠে আসা কিছু তথ্য নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

প্রতিবাদে পিডি ইনামুল কবীর জানান, ২৪৬১ কোটি টাকার জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীল ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে ২৫৫ জন আউটসোর্সিং স্টাফ নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী বুয়েটের তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত সব কাগজপত্র তার দপ্তরে সংরক্ষিত আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা আয়োজনের জন্য যে বড় অঙ্কের ব্যয় হয়, সেই অর্থের উৎস সম্পর্কে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি অনুযায়ী, ২৫৫ জন নিয়োগের একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে ঘুষের বিনিময়ে আত্মীয়করণ ও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে, প্রায় ৮০ শতাংশ জনবল এভাবে নিয়োগ পেয়েছেন। প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে যে, নিয়োগের দায়িত্বে দেখানো জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এলকেএসএস নামে বাস্তবে বৈধভাবে কার্যকর কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব স্পষ্ট নয়। নিয়ম অনুযায়ী জনবল সরবরাহ প্রতিষ্ঠানের অন্তত তিন বছরের ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধের অভিজ্ঞতা থাকার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তা পূর্ণ হয়নি।

এছাড়া যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ দেখানো হয়েছে, তাদের নিবন্ধিত নাম এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার হলেও টেন্ডার দাখিল করা হয়েছে ভিন্ন সংক্ষিপ্ত নামে। একই নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বও পাওয়া গেছে, যা বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—এই প্রতিষ্ঠানের একক মালিক হিসেবে মো. বেলাল হোসেনের নাম পাওয়া যায়, যিনি এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) এবং বর্তমানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে রয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি একই সঙ্গে ফার্মের মালিক, সিডিউল বিক্রেতা এবং নিয়োগ কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা স্বার্থের সুস্পষ্ট সংঘাতের ইঙ্গিত দেয়।

পিডি ইনামুল কবীর তার প্রতিবাদে দাবি করেন, গত দুই বছরে প্রকল্পের জনবল বেতন ও অন্যান্য খাতে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ২১ কোটি টাকা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই অঙ্কে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির সুযোগ নেই। তবে অনুসন্ধানে প্রশ্ন উঠেছে—প্রত্যেক নিয়োগপ্রাপ্তের কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে, মোট কত অর্থ লেনদেন হয়েছে এবং সেই অর্থ কোথায় গেছে, এসব বিষয় এখনো অস্বচ্ছ রয়ে গেছে।

অফিস ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। প্রতিবাদে বলা হয়, ৮০ থেকে ৯০ জন জনবলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনুমতি নিয়ে শেওড়াপাড়ায় আলাদা অফিস ভাড়া নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এলজিইডির একাধিক সিনিয়র প্রকৌশলীর দাবি, মূল ভবনের চতুর্থ তলায় পর্যাপ্ত খালি জায়গা রয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী পিডি ও হিসাব শাখার অফিস মূল ভবনের মধ্যেই থাকার কথা। নিয়ম অনুসরণ না করে ব্যয়বহুল ও অতিরিক্ত নিরাপত্তাবেষ্টিত অফিস স্থাপন করায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।

প্রতিবেদকের হাতে আসা সরকারি নথি অনুযায়ী, কাজ না করেই বিল পরিশোধ, টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য এবং বদলি বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে ২৮ অক্টোবর উপসচিব মোহাম্মদ শামীম বেপারীর স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে গুরুতর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির অভিযোগে ইনামুল কবীরের বিরুদ্ধে সিলেট এলজিইডি বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (অব.) কাজী আব্দুস সামাদ লিখিতভাবে তদন্তের সুপারিশ করেন।

এছাড়া এলজিইডি সিলেট অফিস কম্পাউন্ডে অবৈধভাবে জীবিত গাছ কাটার অভিযোগে সিলেট বন বিভাগের পক্ষ থেকেও একাধিক চিঠির মাধ্যমে তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। এসব চিঠির অনুলিপি সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের দপ্তরগুলোতেও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

সব মিলিয়ে, বিজ্ঞাপন আকারে প্রকাশিত প্রতিবাদের পর এলজিইডি ভবনে বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, লিখিত প্রতিবাদে যেসব দাবি করা হয়েছে, তার সঙ্গে নথি ও অভিযোগের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক রয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তই পারে প্রকৃত সত্য সামনে আনতে।




গোল পাহাড়ের জমি নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ: মোঃ শরফুল হকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও হয়রানির গুরুতর দাবি

চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ চট্টগ্রামের গোল পাহাড় এলাকায় একটি জমি ও সেখানে থাকা দোকানঘর ঘিরে মোঃ শরফুল হক (পিতা: মৃত তৈয়ব উল্লাহ) এর বিরুদ্ধে অভিনব কৌশলে প্রতারণা, অবৈধ দখল এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছেন একাধিক ভুক্তভোগী। তাদের দাবি, চুক্তির শর্ত মানা তো দূরের কথা, পরিকল্পিতভাবে জমির মালিকদের অন্ধকারে রেখে তিনি দীর্ঘদিন ধরে জমি ও দোকান ব্যবহার করে কোটি টাকার সুবিধা নিয়েছেন।

ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ১৯ জুন চট্টগ্রামের গোল পাহাড় এলাকায় অবস্থিত একটি তফসিলভুক্ত সম্পত্তি নিয়ে মোঃ শরফুল হকের সঙ্গে একটি লিখিত চুক্তি হয়। ওই চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, জমিটির বিএস রেকর্ড ও খাজনা সংক্রান্ত সব কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ভূমি অফিসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা খরচ হবে। এই টাকা জমির দুই মালিক মোঃ ওমর ফারুক এবং মোঃ শরফুল হকের যৌথ অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই টাকা কখনোই জমা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।

আরও অভিযোগ রয়েছে, জমিটির মালিক দুইজন থাকা সত্ত্বেও মোঃ শরফুল হক কৌশলে একজন মালিকের সঙ্গে আলাদা সমঝোতায় যান এবং যৌথ অ্যাকাউন্ট খোলার শর্ত এড়িয়ে যান। চুক্তি অনুযায়ী বিএস ও খাজনা সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন না করেই তিনি জমির ওপর থাকা দোকানগুলো বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ভাড়া দেন। এ সময় দোকান ভাড়া দেওয়ার নামে প্রায় ৮০ লাখ টাকা অগ্রিম অর্থ গ্রহণ করেন তিনি, যা জমির প্রকৃত মালিকদের অজান্তেই করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে জমিটি নিজের দখলে রেখে দোকান ভাড়া দিয়ে মোঃ শরফুল হক প্রায় আড়াই কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ আদায় করেছেন। অথচ এই পুরো সময়ের মধ্যে মালিকপক্ষকে ভাড়া বাবদ মাত্র ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকি বিপুল অর্থ এখনো পাওনা রয়েছে বলে মালিকরা দাবি করছেন। টাকা চাইতে গেলেই অভিযুক্ত ব্যক্তি হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং মিথ্যা মামলার ভয় দেখান বলে অভিযোগ ওঠে। এমনকি তিনি আইন ও আদালতকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আছে—এমন কথাও বলেছেন বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন, যা আদালত অবমাননার শামিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এক পর্যায়ে জমির মালিকরা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে জমি ও দোকান খালি করার অনুরোধ জানালে মোঃ শরফুল হক আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি হুমকি দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করেন এবং পরবর্তীতে আদালতে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করে জমির মালিক ও সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে তথ্য গোপন ও মিথ্যা উপস্থাপনের মাধ্যমে মামলা করা মানহানিকর এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়ে।

এদিকে, দোকান ভাড়া নেওয়ার জন্য যারা মোঃ শরফুল হকের কাছে অগ্রিম টাকা দিয়েছিলেন, তারাও নিজেদের অর্থ ফেরত না পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। এসব ভুক্তভোগীর কেউ কেউ আলাদাভাবে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বলেও জানা গেছে। ফলে একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক পক্ষের অভিযোগ সামনে এসেছে।

ভুক্তভোগীরা এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বলেন, দেশে আইন ও বিচার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে প্রতারণা ও হয়রানি করতে পারে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও নিরপরাধ মানুষ এ ধরনের ফাঁদে পড়তে পারে।

এই ঘটনায় ভুক্তভোগীরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তারা নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান। একই সঙ্গে সমাজ থেকে এ ধরনের প্রতারণা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।




শাওন-আনিস আলমগীরসহ চারজনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযোগ

ডেস্ক নিউজঃ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সাংবাদিক আনিস আলমগীর ও অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

রোববার (১৪ ডিসেম্বর) রাতে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় জুলাই রেভ্যুলেশনারী এলায়েন্সের কেন্দ্রীয় সংগঠক আরিয়ান আহমেদ এই অভিযোগ করেন। অভিযুক্ত অন্য দুজন হলেন মারিয়া কিশপট্ট ও ইমতু রাতিশ ইমতিয়াজ।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লেও তার অনুসারীরা বিভিন্ন কৌশলে দেশে অবস্থান করে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা চালিয়ে আসছেনৎ

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ৫ আগস্টের পর থেকে অভিযুক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন টেলিভিশন টকশোতে অংশ নিয়ে নিষিদ্ধ সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রচারণা চালাচ্ছেন, যা আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের অপচেষ্টা হিসেবে দেখানো হয়েছে।

এতে বলা হয়, এসব বক্তব্য ও পোস্টের মাধ্যমে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা উৎসাহিত হয়ে রাষ্ট্রে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও অবকাঠামো ধ্বংসের লক্ষ্যে ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে।

এদিকে অভিযোগ দায়েরের পর রোববার রাতেই সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। ডিবি প্রধান চ্যানেল ২৪-কে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ধানমন্ডি ২ নম্বরে অবস্থিত একটি জিম থেকে বের হওয়ার পর আনিস আলমগীরকে ডিবিতে নেওয়া হয়। জিমটির ম্যানেজার আরেফিন গণমাধ্যমকে জানান, সন্ধ্যায় জিমে এসে ব্যায়াম শেষে রাত আটটার দিকে তিনি বের হয়ে যান। জিমের ভেতরে পুলিশের কাউকে তিনি দেখেননি বলেও জানান।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি বিভিন্ন টেলিভিশন টকশোতে দেওয়া বক্তব্যের কারণে আলোচনায় ছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীর। তিনি দৈনিক আজকের কাগজসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।




গণপূর্তে ক্ষমতার অপব্যবহার: নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলমকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই স্বেচ্ছাচারিতা, নিয়ম ভাঙা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। সরকারি দপ্তরকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পদের মতো ব্যবহার করে তিনি বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দায়িত্ব ও শৃঙ্খলার প্রতি তার এই অবহেলা দেখে অনেক সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ।

একসময় নিয়াজ মো. তানভীর আলম বঙ্গভবনে এসডিই হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি আজিমপুর এলাকায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে টানা পাঁচ বছরের বেশি সময় দায়িত্বে ছিলেন। সেখান থেকে ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তাকে সচিবালয়ে বদলি করা হলেও তিনি নির্ধারিত নিয়ম মানেননি। অভিযোগ রয়েছে, বদলির পর এক মাসেরও বেশি সময় তিনি একসঙ্গে দুটি ডিভিশনের দায়িত্ব পালন করেন, যা স্পষ্টভাবে সরকারি আদেশের লঙ্ঘন। এমনকি দায়িত্ব হস্তান্তর না করেই তিনি বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ শেষ না করে ঠিকাদারদের কোটি কোটি টাকার বিল ছাড় করেন এবং এর মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্যে জড়ান।

আরও অভিযোগ রয়েছে, তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করার নির্দেশ দেওয়া হলেও তিনি তা মানেননি। বরং একই সময়ে দুই জায়গায় অফিস চালিয়েছেন, ব্যবহার করেছেন দুটি সরকারি গাড়ি ও জ্বালানি সুবিধা। বিভিন্ন বিল-ভাউচারের মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ উত্তোলন করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনা ঘিরে সরকারি দপ্তরে প্রশ্ন উঠেছে—কোন শক্তির জোরে তিনি বারবার আইন ও নিয়ম ভেঙে পার পেয়ে যাচ্ছেন?

আজিমপুর সরকারি কলোনির ভেতরে নির্মাণাধীন বহুতল মেকানিক্যাল কার পার্কিং শেড নিয়েও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই প্রকল্পে প্রায় ৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। ডিপিপিতে যেখানে ২৮৮টি গাড়ি রাখার ব্যবস্থা থাকার কথা ছিল, সেখানে অনুমোদন ছাড়াই তা কমিয়ে ২৪০টিতে নামিয়ে আনা হয়। এতে প্রায় ১১ কোটি টাকা সাশ্রয় হলেও সেই টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত না দিয়ে আত্মসাতের পরিকল্পনা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একই কাজের জন্য আলাদা আলাদা দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা টাকা ভাগাভাগি করার চেষ্টা করেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।

এই অনিয়মের তদন্তে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পওবিপ্র) শফিকুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে সদস্য সচিব ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শেখর চন্দ্র বিশ্বাস এবং সদস্য ছিলেন আশেক আহমেদ শিবলী। তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অনুমোদন ছাড়া পার্কিংয়ের ধারণক্ষমতা কমানো স্থপতির এখতিয়ার বহির্ভূত এবং এটি প্রকল্প পরিচালনা কমিটির অনুমোদন ছাড়া করা ঠিক হয়নি। তবুও এসব অনিয়মের পরও প্রকৌশলী তানভীর আলম কার্যত ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।

লিফট স্থাপনের টেন্ডারেও গুরুতর কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। মতিঝিল ও আজিমপুর সরকারি কলোনিতে মোট ৬৮টি লিফট স্থাপনের কাজ দেওয়া হয় রওশন এলিভেটরসকে। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী লিফট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কমপক্ষে ২০ বছরের উৎপাদন অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সার্টিফিকেশন থাকার কথা ছিল। কিন্তু রওশন এলিভেটরসের ইতালীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘মোভিলিফট’ এসব শর্ত পূরণ করতে পারেনি। তবুও যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাদের দরপত্রকে বৈধ ঘোষণা করা হয়, যা সরকারি ক্রয়বিধির সরাসরি লঙ্ঘন।

এ ছাড়া আজিমপুর নতুন কলোনিতে রক্ষণাবেক্ষণের নামে গত পাঁচ বছরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। অথচ বেশিরভাগ ভবন নতুন হওয়ায় সেখানে বড় ধরনের মেরামতের প্রয়োজনই ছিল না। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক ভবনের নামে যে বৈদ্যুতিক কাজের বিল দেখানো হয়েছে, সেসব ভবনের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। এমনকি যেসব বাসার নামে বিল করা হয়েছে, সেই বাসার বাসিন্দারাও কোনো কাজ হওয়ার কথা জানেন না। এতে করে ধারণা করা হচ্ছে, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এই পুরো সময়ে আজিমপুর ইএম বিভাগ-৩-এর দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলম। তার সঙ্গে ছিলেন এ কে এম গোলাম মোস্তফা। অভিযোগ রয়েছে, এই দুই প্রভাবশালী প্রকৌশলী রক্ষণাবেক্ষণের নামে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা ব্যয়ের ব্যবস্থা করেছেন, যার বড় একটি অংশ অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে লোপাট করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ মো. তানভীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই তিনি দুই জায়গায় দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এ বিষয়ে তার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।




নির্বাহী প্রকৌশলীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ভিন্ন একাউন্টে ১৫টি চেক নগদায়ন, বিপুল সরকারি অর্থ আত্মসাৎয়ের অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগে (PWD) সরকারি বিল পরিশোধের নিরাপদ ও নির্ধারিত প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে সংঘটিত হয়েছে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম। অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, হাতিয়া মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদারের বিলের চেকগুলো নির্দিষ্ট ব্যাংক একাউন্টে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও অন্তত ১৫টি চেক ভিন্ন একাউন্টের মাধ্যমে নগদায়ন করা হয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনায় পূবালী ব্যাংক দত্তেরহাট শাখা আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে এবং নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০ সালের ৭ ডিসেম্বর হাতিয়া মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান KE-OG-DESH (JV)-এর সঙ্গে নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগের প্রায় ১৪ কোটি ৯২ লাখ টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কাজ বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদার পূবালী ব্যাংক দত্তেরহাট শাখা থেকে ওয়ার্ক অর্ডারের বিপরীতে ঋণ গ্রহণ করে। সরকারি প্রকল্পে এ ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে একটি বাধ্যতামূলক শর্ত হলো—কাজের বিপরীতে ইস্যুকৃত প্রতিটি বিলের চেক সরাসরি ব্যাংকের নির্ধারিত ঋণ একাউন্টে জমা দিতে হবে, যাতে ঠিকাদার অন্য কোনোভাবে অর্থ উত্তোলন করতে না পারেন।

এই শর্ত পূরণে নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগ ২০২১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি লিখিতভাবে ব্যাংককে জানায় যে, হাতিয়া মডেল মসজিদ প্রকল্পের বিপরীতে ইস্যুকৃত সব চেক পূবালী ব্যাংক দত্তেরহাট শাখার অধীন KE-OG-DESH (JV)-এর নির্দিষ্ট একাউন্ট নম্বরের বরাবর ইস্যু করা হবে। এমনকি প্রতিটি চেকের গায়ে ওই একাউন্ট নম্বর, ব্যাংকের নাম ও শাখার নাম উল্লেখ করার নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়। এই লিখিত নিশ্চয়তার ভিত্তিতেই ব্যাংক ঠিকাদারের অনুকূলে প্রায় ৭৪ লাখ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি এবং ৩ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করে।

কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এই নিশ্চয়তার পরও বাস্তবে ঘটেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনা। ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ পূবালী ব্যাংক দত্তেরহাট শাখা ঋণের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তা নবায়নের জন্য গণপূর্ত বিভাগে একটি চিঠি পাঠায় এবং নির্মাণ কাজের অগ্রগতি ও বিল সংক্রান্ত চেকের বিস্তারিত তথ্য জানতে চায়। এই চিঠির পরই সামনে আসে ভয়াবহ আর্থিক অসঙ্গতি।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, তখন পর্যন্ত ইস্যুকৃত ১৩টি চেকের মধ্যে প্রথম সাতটি ও শেষ একটি—মোট আটটি চেক নির্ধারিত ঋণ একাউন্টে জমা দেওয়া হলেও মাঝের পাঁচটি চেক ওই একাউন্টে ইস্যু করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি ধরা পড়ার পর বিভাগীয় হিসাবরক্ষক মো. ইমরান হোসেন ব্যাংকে গিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেন, ঘটনা প্রকাশ পেলে তার চাকরি থাকবে না।

তবে এখানেই শেষ নয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এর পরবর্তী সময়ে একই প্রকল্পের বিপরীতে আরও ১০টি চেক ইস্যু করা হলেও একটিও নির্ধারিত ঋণ একাউন্টে জমা দেওয়া হয়নি। ফলে মোট ২৩টি চেকের মধ্যে মাত্র আটটি সঠিক একাউন্টে জমা হয় এবং বাকি ১৫টি চেক ভিন্ন একাউন্টের মাধ্যমে নগদায়ন করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত একাউন্টে জমা হওয়া আটটি চেকের মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। কিন্তু বাকি ১৫টি চেকের অর্থ ভিন্ন পথে চলে যাওয়ায় ঠিকাদারের বিপরীতে পূবালী ব্যাংক দত্তেরহাট শাখার অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এই অনিয়মের কারণে ব্যাংকটি আরেকটি বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের মুখে পড়েছে।

এই চেক জালিয়াতির পেছনে গণপূর্ত বিভাগের ভেতরের লোকজনের যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে। বিশেষ করে বিভাগীয় হিসাবরক্ষক মো. ইমরান হোসেন ও ক্যাশিয়ারের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ইমরান হোসেন নোয়াখালীর বাসিন্দা হওয়ায় স্থানীয় প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাহী প্রকৌশলীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ২৭ জুলাই ইমরান হোসেন পদোন্নতি পেয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের তদবিরে নিজ জেলা নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগে পদায়ন নিশ্চিত করেন। একই কর্মস্থলে তিনি সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে, ক্যাশিয়ারও ২০০৪ সাল থেকে একই বিভাগে কর্মরত থাকায় স্থানীয় ঠিকাদারদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায় এড়িয়ে হিসাবরক্ষক ও ক্যাশিয়ারের দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে ঠিকাদারদের ঋণ থাকে এবং চেক প্রস্তুতের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের। তারা চেক সইয়ের জন্য তার কাছে নিয়ে আসে এবং বলে যে একাউন্ট নম্বর রেজিস্টার দেখে চেকের গায়ে লিখে দেওয়া হবে। এরপর যদি তারা চেকের গায়ে নির্ধারিত একাউন্ট নম্বর না লিখে ঠিকাদারের হাতে তুলে দেয়, তাহলে তা তার জানার কথা নয় বলে তিনি দাবি করেন।