কাজ না করেই কোটি টাকার বিল: সরকারি গেজেটে প্রকাশ দুর্নীতির নথি, বরখাস্ত নির্বাহী প্রকৌশলী সাইফুজ্জামান

বিশেষ প্রতিবেদকঃ দীর্ঘদিন ধরে ঘুরে বেড়ানো অভিযোগ, গুঞ্জন আর নীরব প্রশ্নের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সরকারের নিজের প্রকাশিত গেজেটেই উঠে এলো ভয়াবহ এক দুর্নীতির চিত্র। লালমনিরহাট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. সাইফুজ্জামানকে সরকারি চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জারি করা এই প্রজ্ঞাপন শুধু একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত এক দুর্নীতির লিখিত স্বীকারোক্তি।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৪ এ কর্মরত থাকাকালে মো. সাইফুজ্জামান বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেকর্ড ভবন নির্মাণ প্রকল্পে গুরুতর অনিয়মে জড়ান। প্রকল্পটির W-1 প্যাকেজের আওতায় ‘অনাবাসিক ভবন’ সংক্রান্ত একটি কাজ অনুমোদিত ডিপিপি (DPP), সংশোধিত ডিপিপি (RDPP) কিংবা HOPE অনুমোদন ছাড়াই বেআইনিভাবে আটটি আলাদা প্যাকেজে ভাগ করা হয়। এরপর ই-জিপি পদ্ধতির মাধ্যমে এসব ভাঙা প্যাকেজে আলাদা আলাদা দরপত্র আহ্বান করা হয়।

এই কৃত্রিম প্যাকেজ বিভাজনের মাধ্যমে মোট ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়। তদন্তে উঠে আসে, এটি কোনো প্রশাসনিক ভুল নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে অর্থ আত্মসাতের একটি পরিচিত কৌশল। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে এই পদ্ধতিকে অনেকেই চেনেন “এক প্যাকেজ ভেঙে কমিশনের বন্যা” নামে।

সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্যটি হলো—এই আটটি প্যাকেজের বিপরীতে বাস্তবে কোনো কাজের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। কোনো ভবন নির্মাণ হয়নি, ব্যবহার হয়নি ইট, রড বা কংক্রিট। বাস্তব কাজ শূন্য, অথচ কোটি কোটি টাকার বিল অনুমোদন ও পরিশোধ করা হয়েছে। সরকারি তদন্তে একে সরাসরি “কাজ না করেই বিল উত্তোলন” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও গুরুতর বিষয় হলো, প্রকল্পটির জন্য নির্ধারিত মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড (NDEL)-কে পাশ কাটিয়ে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে অন্য আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে বিল পরিশোধ করা হয়। এই অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছে প্রকৌশলীর ক্ষমতার অপব্যবহার করে। তদন্ত প্রতিবেদনে এটিকে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, গুরুতর অনিয়ম এবং প্রশাসনিক বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সরকারি গেজেটে প্রকাশিত আদেশে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এসব কর্মকাণ্ড সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ধারা ৩৯(১) অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সেই আইনের ভিত্তিতেই ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে মো. সাইফুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অর্থাৎ, এটি কোনো অভিযোগের গল্প নয়—সরকার নিজেই লিখিতভাবে স্বীকার করেছে যে এখানে দুর্নীতি হয়েছে।

তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়। এই ৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা কি একজন নির্বাহী প্রকৌশলী একাই আত্মসাৎ করেছেন? তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, প্রকল্প পরিচালক, হিসাব শাখা এবং বিল অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা তাহলে কী করছিলেন? ই-জিপির মতো ডিজিটাল সিস্টেম ব্যবহার হলেও এসব ভুয়া টেন্ডার কীভাবে যাচাই ছাড়াই অনুমোদন পেল—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও অজানা।

মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম নয়। বরং এটি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি “সিস্টেমেটিক দুর্নীতি কাঠামো”-এর ছোট একটি অংশ। আজ একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বরখাস্ত হয়েছেন, কিন্তু যদি পুরো প্রকল্প, পুরো সার্কেল কিংবা পুরো সিন্ডিকেট খতিয়ে দেখা হয়, তাহলে সামনে আসতে পারে আরও বহু কাগুজে উন্নয়ন আর শত শত কোটি টাকার লুটপাটের তথ্য।

গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, টাকার অঙ্ক নির্দিষ্ট, অপরাধের বিবরণ পরিষ্কার। এখন দেখার বিষয় একটাই—এই বরখাস্তের পর সত্যিকারের তদন্ত, অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ এবং দায়ীদের শাস্তি হবে, নাকি সবকিছু আবার নীরবে ফাইলের ভেতর ঢুকে পড়বে?




কুরিয়ার ব্যবসা থেকে কথিত শত কোটি টাকার মালিক: বেনাপোলের কামাল হোসেনকে ঘিরে যত অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালান ও অবৈধ পণ্য পাচারের যে অভিযোগ শোনা যায়, সেই আলোচনায় বারবার উঠে আসছে এক নাম—কামাল হোসেন। স্থানীয় সূত্র ও ব্যবসায়ী মহলের দাবি, এক সময় সাধারণ কুরিয়ার এজেন্ট হিসেবে কাজ করা এই ব্যক্তি বর্তমানে কথিতভাবে শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।

জানা যায়, কর্মজীবনের শুরুতে কামাল মোবাইলের লোড ও ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বেনাপোল কন্টিনেন্টাল কুরিয়ার সার্ভিসের বেনাপোল অফিসের দায়িত্ব নেন। অভিযোগ রয়েছে, এই কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করেই ধীরে ধীরে চোরাচালান পণ্য পারাপারের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এখান থেকেই কামালের উত্থান শুরু।

কামাল হোসেন বেনাপোল ৫ নম্বর দিঘীরপাড় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হক খোকেনের ছেলে। এলাকাবাসীর দাবি, যিনি একসময় নুন আনতে পানতা ফুরানোর অবস্থায় ছিলেন, তিনিই আজ বেনাপোল কাগজপুকুর এলাকায় বিলাসবহুল মার্কেট, দিঘীরপাড়ে আলিশান বাড়ি, যশোর শহরে একাধিক জমি ও ফ্ল্যাটের মালিক। দামি গাড়িতে চলাফেরা করাও তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ।

অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের চাপ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতে কামাল সাংবাদিকতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা সীমিত হলেও বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তিনি দেশের বহুল প্রচারিত দৈনিক যুগান্তর ও যমুনা টিভির বেনাপোল প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিতি পান। তার বিরুদ্ধে ভুয়া ও জাল সার্টিফিকেট ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে তিনি নাভারণ কলেজে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ কোর্সে অধ্যয়নরত, যার রোল নম্বর ২০-০-২৩-৯২৫-০০৫।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে জানান, সাংবাদিক পরিচয়ের ছত্রচ্ছায়ায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করাই ছিল তার মূল কৌশল। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট পত্রিকায় নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। এই নীরব চাঁদাবাজির মাধ্যমেই অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হন কামাল—এমনটাই দাবি স্থানীয়দের।

আরও অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকতার আড়ালে কামালের স্মাগলিং ও হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গেও সম্পৃক্ততা রয়েছে। বেনাপোল সীমান্ত এলাকার একাধিক চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার সখ্যতার কথাও উঠে এসেছে। কন্টিনেন্টাল কুরিয়ার সার্ভিস পরিচালনার সময় চোরাচালানি চন্দন কাঠ বহনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিজিবির মামলা রয়েছে বলেও জানা যায়।

কাস্টমস ও স্থলবন্দরের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, বেনাপোল কাস্টম হাউসে পণ্য খালাসকে কেন্দ্র করে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের সঙ্গে কামালের নাম জড়িত। সম্প্রতি একটি পার্টসের চালান আটক হওয়ার পর তা ছাড় করাতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলেও অভিযোগ ওঠে। এছাড়া শরিফুল নামের এক ব্যবসায়ীর পণ্য বিশেষ সুবিধায় খালাস করিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কথাও আলোচনায় এসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী জানান, বেনাপোল স্থলবন্দরে সাংবাদিক পরিচয়ধারী কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির একটি বলয় তৈরি হয়েছে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও এসব সিন্ডিকেটের মধ্যে পারস্পরিক যোগসাজশে সৎ কর্মকর্তারা চাপে পড়েন, আর বাধা দিলেই তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সংবাদ প্রকাশ করা হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, সাংবাদিকতার মতো পেশায় যেখানে স্বাভাবিকভাবে সংসার চালানো কঠিন, সেখানে দৃশ্যমান কোনো বড় ব্যবসা ছাড়াই কামালের বিপুল সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা জরুরি। তারা দুদকসহ সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত ও অবৈধ সম্পদের হিসাব চেয়েছেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কামাল হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে অভিযোগ সম্পর্কে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।




গণপূর্তে অদৃশ্য দুর্নীতির সাম্রাজ্য: জাতীয় স্মৃতিসৌধ থেকে কোটি টাকা লোপাটের ভয়ংকর নকশা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তর (পিডব্লিউডি) একসময় রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও অবকাঠামো বাস্তবায়নের অন্যতম ভরসাস্থল হলেও, সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে আসা চিত্র ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী চক্রের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে গড়ে উঠেছে একটি সুসংগঠিত দুর্নীতির কাঠামো, যেখানে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ যেন নিয়মিত ও নিরাপদ প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। চাকরিতে যোগ দেওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই অস্বাভাবিক সম্পদের মালিক হওয়া এখানে অলিখিত সংস্কৃতিতে রূপ নিয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে পাওয়া নথি, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং অডিট রিপোর্ট বলছে—এটি আর গুজব বা বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠা দুর্নীতির একটি পূর্ণাঙ্গ নকশা। এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রনিক ও মেকানিক্যাল (ই/এম) সার্কেল–ঢাকা।

অভিযোগের মূল কেন্দ্রে রয়েছেন ই/এম সার্কেল–ঢাকা-এর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর হোসেন, যিনি কিছু নথিতে আলমগীর খান নামেও পরিচিত। অভিযোগ অনুযায়ী, সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায় ‘নিরাপত্তা জোরদার’-এর নামে একটি সিসি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের কাগজপত্রে দেখা যায়, এতে তিনটি ১৬-চ্যানেল ডিভিআর, বারোটি পিটিজেড (PTZ) ক্যামেরা, দশটি ডে-নাইট ভিশন ক্যামেরা, তিনটি ডিসপ্লে মনিটরসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি দেখানো হয়েছে।

তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একাধিক ক্যামেরা অচল, কিছু যন্ত্রপাতি ব্যবহার অনুপযোগী এবং কোথাও কোথাও ক্যামেরা বসানোই হয়নি। এসব গুরুতর ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পটিকে “সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত” দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে ১ কোটি ১৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সরকারি আর্থিক বিধিমালা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। এ সংক্রান্ত লিখিত অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে বলেও জানা গেছে।

নথি পর্যালোচনায় আরও ভয়ংকর অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) লঙ্ঘনের ঘটনায়। উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর স্মারক নং ৩৫০২ (১৪ জুন ২০১৬), স্মারক নং ৩৫০৭ (১৫ জুন ২০১৬) এবং স্মারক নং ৩৫০৮ (১৫ জুন ২০১৬)—এই তিনটি স্মারকের মাধ্যমে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে একই ঠিকাদারকে তিনটি কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিযোগিতা এড়িয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে বেআইনিভাবে সুবিধা দেওয়ার এই ঘটনা পিপিআর-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সূত্রের দাবি, এসব কার্যাদেশ অনুমোদন ও বিল ছাড়ের পেছনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর হোসেনের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও নির্দেশনা ছিল।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, ২০১৬–১৭ অর্থবছরের অডিট রিপোর্টে এসব অনিয়ম স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে অধিদপ্তরের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে—এত বড় আর্থিক অনিয়মের পরও অভিযুক্ত কর্মকর্তা কীভাবে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। এই নীরবতাই এখন সংশ্লিষ্ট মহলে রহস্যের জন্ম দিয়েছে।

এদিকে ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, ঘুষ ও দুর্নীতির অর্থে মো. আলমগীর হোসেন ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় একাধিক বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট, বাণিজ্যিক ও আবাসিক প্লট ক্রয় করেছেন। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পিডব্লিউডির ই/এম ঢাকা জোনকে ঘিরে একটি রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষিত দুর্নীতির বলয় গড়ে উঠেছে, যেখানে কিছু কর্মকর্তা বছরের পর বছর জবাবদিহির বাইরে রয়ে গেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি হুমকিমূলক আচরণের অভিযোগও উঠেছে আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রকাশ্যে বলেন—“আমার বিরুদ্ধে লেখালেখি করলে পরিণাম হবে ভয়াবহ… কাউকে ভয় পাই না।” এ ধরনের বক্তব্য সাংবাদিক মহলে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এবং এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের স্বার্থ রক্ষা করা হলে সাধারণ ঠিকাদাররা বঞ্চিত হন। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া কিংবা ভুয়া প্রকল্প দেখানো—এসবই সরাসরি দুর্নীতির উদাহরণ। অডিট রিপোর্ট থাকার পরও ব্যবস্থা না নেওয়াটা অত্যন্ত গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।

সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—অডিট রিপোর্ট থাকা সত্ত্বেও কেন কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই? হুমকিমূলক আচরণের অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তা কীভাবে এখনও ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন? দুর্নীতি দমন কমিশন আদৌ কবে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, নাকি রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাটের এই অভিযোগ আবারও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চাপা পড়ে যাবে—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।




গণপূর্তের ‘স্বর্ণখনি’ ঢাকা বিভাগ–৪: ফ্যাসিবাদী আমলে অবৈধ অর্থ সংগ্রহের নীরব কারখানা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গত জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরকে সাবেক আওয়ামী ফ্যাসিবাদী চক্রের অবৈধ অর্থ সংগ্রহের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিশেষ করে যেসব বিভাগে প্রকল্প ও বাজেটের পরিমাণ বেশি, সেসব জায়গায় দীর্ঘদিন ধরেই ঘুষ, কমিশন ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে আলোচিত। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই তথাকথিত ‘লাভজনক’ বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিল ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৪।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৪-এ সাধারণত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের আস্থাভাজন ও পরীক্ষিত প্রকৌশলীদেরই পদায়ন দেওয়া হতো। অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারসহ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি নিয়মিতভাবে এই বিভাগ থেকে বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করতেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ–৩-এ নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মো. মাসুদ রানা সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামীপন্থী মহলের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজনে পরিণত হন। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই তাকে পরবর্তীতে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

২০২২–২৩ এবং ২০২৩–২৪ অর্থবছরে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগ–৩-এ দায়িত্ব পালনকালে এপিপি প্রকল্পের কাজ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর ফলে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ আওয়ামীপন্থী ঠিকাদারদের হাতে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য, দরপত্র প্রক্রিয়ায় কৌশলগত পরিবর্তন এনে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হতো। গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ছাত্রজীবন থেকেই মো. মাসুদ রানা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ছাত্র ও জনতার ওপর হামলা ও গণহত্যা সংক্রান্ত একটি মামলায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারসহ ১৫ জন কর্মকর্তা আসামি হলেও রহস্যজনকভাবে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার নাম মামলার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। এই বিষয়টি প্রশাসনিক ও আইনগত মহলে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠে এসেছে, মামলাটি নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বাদীর সঙ্গে দেন-দরবার চালাচ্ছেন সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ও তার ঘনিষ্ঠ অনুসারীরা। মামলার মীমাংসার জন্য বিপুল অর্থ সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয় মোহাম্মদ শামীম আখতারের আস্থাভাজনদের ওপর। সেই তালিকায় নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার নামও রয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর এপিপির একাধিক প্রকল্পে এলটিএমের পরিবর্তে এনসিটি পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়, যা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কারণ এর আগেই প্রধান প্রকৌশলীর পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট ই-জিপি আইডি নম্বর—১০৩৫৯১০, ১০৩৫৯৩৩, ১০৩৫৯৮৯, ১০৩৬১২৯, ১০৩৬১৪৬, ১০৩৬৪১৫, ১০৩৬৯৫৮ ও ১০৩৭১৩৪—সংক্রান্ত দরপত্র বিষয়ে স্পষ্ট অফিস আদেশ জারি করা হয়েছিল। অথচ সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করেই দরপত্র আহ্বান করা হয়।

উল্লিখিত প্রকল্পগুলোর অধিকাংশই পূর্ত ভবন ও মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট সংশ্লিষ্ট। এর মধ্যে ১০৩৫৯১০ ও ১০৩৬১২৯ নম্বর আইডির কাজ ছিল ফার্নিচার সরবরাহের। প্রশ্ন উঠেছে—গণপূর্ত অধিদপ্তরের নিজস্ব গণপূর্ত কারখানা বিভাগ থাকা সত্ত্বেও কেন এই ফার্নিচার সরবরাহের দরপত্র ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৪ থেকে আহ্বান করা হলো। সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত অর্থ সংগ্রহই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

হাসপাতালের বিশেষ বরাদ্দের একাধিক প্রকল্পেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয় এবং নামমাত্র কাজ দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগাভাগি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এসব অনিয়মের মূল হোতা হিসেবে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার নাম উঠে এসেছে।

চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরেও এপিপি বরাদ্দের পাঁচটি কাজে এলটিএমের পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এসব কাজ থেকেও মোটা অঙ্কের কমিশন লেনদেন হয়েছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে গণপূর্ত অঙ্গনে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ–৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—অফিস আদেশ উপেক্ষা করে দরপত্র পদ্ধতি বদলের নেপথ্যে কারা জড়িত? নিজস্ব কারখানা থাকা সত্ত্বেও ফার্নিচার সরবরাহে বাইরের দরপত্র আহ্বানের উদ্দেশ্য কী? মামলা থেকে নাম বাদ পড়া কি নিছক কাকতালীয়, নাকি প্রভাব খাটানোর ফল? গণ–অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই ‘স্বর্ণখনি’ বিভাগগুলোতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।




রাজনীতি–প্রশাসন–অর্থনীতির যোগসাজশ: নাহিদ গ্রুপ ঘিরে আওয়ামী মাফিয়া নেটওয়ার্কের অনুসন্ধান

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের ছত্রচ্ছায়ায় যখন প্রশাসনিক জবাবদিহি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তখন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের আড়ালে জন্ম নেয় ভয়ংকর মাফিয়া কাঠামো। নাহিদ গ্রুপকে ঘিরে এমনই একটি সংগঠিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব উঠে এসেছে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে, যার নেপথ্যে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রযন্ত্রকে কার্যত জিম্মি করে রেখেছে বলে অভিযোগ।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের মূল ছায়া-নিয়ন্ত্রক হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠ ঝন্টু কুমার সাহা। তার নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে অপারেশনাল ভূমিকা পালন করছেন তন্ময় দাস ও কিতাব আলী। প্রশাসন, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে তারা গড়ে তুলেছেন এমন এক দমনযন্ত্র, যার বিরুদ্ধে কথা বলাই হয়ে উঠেছে বিপজ্জনক।

কিতাব আলীকে এই নেটওয়ার্কের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ‘ম্যানেজার’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন একাধিক সূত্র। আনোয়ার হোসেনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তি একটি ভ্যাট সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বে থাকলেও, অভিযোগ রয়েছে—তার অবস্থান ব্যবহার করে তিনি সিন্ডিকেটের অবৈধ কর্মকাণ্ডে প্রশাসনিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেন। কোনো অভিযোগ বা অনুসন্ধান শুরু হলেই তা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা কিংবা থামিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ—এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের।

এছাড়া কিতাব আলীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত জীবন ও অফিসিয়াল সুযোগ–সুবিধার অপব্যবহার সংক্রান্ত গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ হিসেবে কিছু ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নির্দিষ্ট মহলে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেও নীরব অস্বস্তি বিরাজ করছে।

ঝন্টু কুমার সাহার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ সামনে এলেই তা ‘ম্যানেজ’ করার দায়িত্বে থাকতেন কিতাব আলী—এমন অভিযোগ উঠেছে বারবার। রাজনৈতিক মহলে অর্থ পৌঁছে দেওয়া, প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি এবং মামলার ফাইল স্থবির করে দেওয়ার মতো কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই এই সিন্ডিকেট একটি সংগঠিত ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার রূপ নিয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

এই চক্রের আর্থিক মেরুদণ্ড হিসেবে উঠে এসেছে তন্ময় দাসের নাম। স্থানীয়দের ভাষায়, ঝন্টু কুমার সাহার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী এবং সিন্ডিকেটের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকারী হলেন তন্ময় দাস। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তার নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ নিয়ে এলাকায় তীব্র প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, তন্ময় দাসের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা। কোনো দৃশ্যমান ও বৈধ পেশা ছাড়াই এত অল্প সময়ে এমন বিপুল সম্পদ অর্জন কীভাবে সম্ভব—সে প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা। অভিযোগ রয়েছে, নাহিদ গ্রুপের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং আওয়ামী ঘনিষ্ঠ কালো টাকা সাদা করার প্রক্রিয়াতেই এই সম্পদের উত্থান ঘটেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ঝন্টু কুমার সাহার সব ধরনের অনৈতিক আর্থিক লেনদেন, অপরাধমূলক যোগাযোগ এবং কালো টাকার হিসাবরক্ষণ সরাসরি তন্ময় দাসই পরিচালনা করতেন। এই অর্থনৈতিক শক্তির ওপর ভর করেই সিন্ডিকেটটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে।

ফ্যাসিবাদী দমননীতির পরিচিত কৌশল—মামলা দিয়ে কণ্ঠরোধ—এই সিন্ডিকেটের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বলায় অন্তত ৫ থেকে ৬ জন ব্যক্তিকে টার্গেট করে তন্ময় দাসকে বাদী বানিয়ে ১৪ থেকে ১৫টি হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব মামলার পেছনে সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছেন ঝন্টু কুমার সাহা এবং কিতাব আলী। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে প্রতিবাদ ও সত্যের কণ্ঠ রুদ্ধ করা।

এই পরিস্থিতিতে জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির গল্প নয়; বরং আওয়ামী ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আইনের শাসনকে পরিকল্পিতভাবে ভেঙে ফেলা হচ্ছে।

নাগরিকদের পক্ষ থেকে তন্ময় দাসের সম্পদের উৎস দুদকের মাধ্যমে তদন্ত, কিতাব আলীকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করে আইনি পদক্ষেপ এবং সাজানো মামলাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। এক ভুক্তভোগীর ভাষায়, “ফ্যাসিবাদ যত শক্তিশালীই হোক, সত্য একদিন প্রকাশ হবেই। এই চক্রের বিচার বাংলার মাটিতেই হবে।”

সবশেষে বলা যায়, নাহিদ গ্রুপের নাম ব্যবহার করে গড়ে ওঠা এই আওয়ামী ফ্যাসিবাদী মাফিয়া সিন্ডিকেট এখন রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়ের জন্যই হুমকি। আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে ঝন্টু কুমার সাহা, তন্ময় দাস ও কিতাব আলীর কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের কোনো বিকল্প নেই।





বিআইডব্লিউটিএর অঘোষিত ক্ষমতার কেন্দ্র নিজাম উদ্দিন পাঠান: উন্নয়নের আড়ালে দুর্নীতির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআইডব্লিউটিএ—দেশের নদীপথ, নৌ-বন্দর ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় সংস্থা। নদীমাতৃক বাংলাদেশের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অপরিসীম। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিআইডব্লিউটিএর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে নিয়োগ, পদোন্নতি, টেন্ডার বণ্টন ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ সামনে আসছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার নাম—নিজাম উদ্দিন পাঠান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আত্মীয়তার সূত্র ধরেই বিআইডব্লিউটিএতে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন নিজাম উদ্দিন পাঠান। তার এক আত্মীয় সংস্থাটিতে চাকরিরত ছিলেন, সেই পরিচয়কে পুঁজি করেই তিনি অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদে নিয়োগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই কিছু প্রভাবশালী ঠিকাদারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই সম্পর্ক ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলীর পদে উন্নীত হন।

এরপর ধাপে ধাপে নিজাম উদ্দিন পাঠানের ক্ষমতা বাড়তে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে তিনি বিআইডব্লিউটিএর ভেতরে এমন অবস্থানে পৌঁছে যান, যেখানে প্রকল্পের অনুমোদন, টেন্ডার বণ্টন কিংবা বিল ছাড়—সবকিছুতেই তার অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাষায়, তিনি কার্যত সংস্থার এক ধরনের ‘অঘোষিত চেয়ারম্যান’ বা গডফাদারে পরিণত হন।

ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে তার সম্পদের পরিমাণও অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, রাজধানীর বনশ্রী ও রামপুরা এলাকায় নিজাম উদ্দিন পাঠানের নামে ও বেনামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদ রয়েছে। বনশ্রীর জে ব্লকে দুটি, এস ব্লকে একটি এবং সি ব্লকে তিনটি অ্যাপার্টমেন্টের মালিকানা তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানা গেছে। এ ছাড়া আশপাশের এলাকায় রয়েছে একাধিক প্লট ও বাড়ি। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে তার এসব সম্পদ নিয়ে তেমন আলোচনা না হলেও রাজধানীতে তার সম্পদের বিস্তার নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করছেন অনেকে। ব্যক্তিজীবন নিয়েও রয়েছে নানা গুঞ্জন—অফিস ও ব্যক্তিগত জীবনে আলাদা সংসার পরিচালনার অভিযোগ থাকলেও এসব বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে বাঘাবাড়ি নদী বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিজাম উদ্দিন পাঠান এই প্রকল্পকে উন্নয়নের বদলে লুটপাটের উৎসে পরিণত করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রায় ৫০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মোহাম্মদ জাফর নামে এক ঠিকাদারকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। বিনিময়ে নিজাম উদ্দিন পাঠান আনুমানিক ১০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নগরবাড়ী–বাঘাবাড়ি প্রকল্পে মাঠপর্যায়ে কাজ না করেই কাগজে কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলনের অভিযোগও উঠেছে। বাস্তব কাজের সঙ্গে নথিপত্রের মিল পাওয়া যায়নি বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। আত্মসাৎ করা অর্থ দিয়ে মোহাম্মদ জাফরের সঙ্গে যৌথভাবে ডেভেলপার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন নিজাম উদ্দিন পাঠান—এমন তথ্যও পাওয়া গেছে। পাশাপাশি “এস এস রহমান কোম্পানি”-র মালিক মোহাম্মদ দিপুকে প্রায় ২৪০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দিয়ে সেখান থেকেও বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে খানপুর প্রকল্পের এসি পিডি প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও ফাইল প্রস্তুত করে সচিবালয়ে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে। সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্তে ইতোমধ্যে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে বিআইডব্লিউটিএর ভেতরের আরও একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির প্রকৌশল বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে ‘পারিবারিক কোটায়’ নিয়োগ ও পদোন্নতির অভিযোগ রয়েছে। কোনো কর্মকর্তা অবসর নিলে বা মারা গেলে তার আত্মীয়স্বজন নানা প্রভাব খাটিয়ে একই বা সংশ্লিষ্ট পদে সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। এতে যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন, আর পুরো প্রতিষ্ঠানটি প্রভাবনির্ভর এক কাঠামোয় রূপ নিচ্ছে।

নগরবাড়ী নদী বন্দর আধুনিকায়ন, বাঘাবাড়ি টার্মিনাল উন্নয়ন ও খানপুর পোর্ট ডেভেলপমেন্টসহ একাধিক বড় প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ ও বাস্তব কাজের মধ্যে মারাত্মক অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। কাজের মান যাচাই না করেই বিল পরিশোধ করা হয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। এক অভিজ্ঞ ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিয়ম মেনে কাজ করতে গেলে উল্টো বাধার মুখে পড়তে হয়, আর যাদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে তারাই সুবিধা পান।

সচিবালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিআইডব্লিউটিএর বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা পড়েছে। কোথাও একই কাজের জন্য একাধিকবার বিল তোলা হয়েছে, কোথাও কাগজে উন্নয়ন দেখিয়ে মাঠপর্যায়ে শূন্য বাস্তবতা পাওয়া গেছে। এসব অনিয়ম বিআইডব্লিউটিএকে আজ এক ভয়ংকর দুর্নীতিচক্রের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে—আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় গড়ে ওঠা এই প্রভাবশালী দুর্নীতির নেটওয়ার্ক কি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারেও বহাল থাকবে? নাকি অবশেষে রাষ্ট্রীয় সংস্থায় জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পাবে?




রাজউক–রূপায়ণ গ্রুপ ঘিরে বড় দুর্নীতি মামলা, ঋণ জালিয়াতি ও জমি দখলের অভিযোগে তোলপাড়

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও রূপায়ণ গ্রুপকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের একটি দুর্নীতি মামলার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলাটিতে মোট ৪৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান, পরিচালক ও তাদের পরিবারের সদস্যসহ ছয়জন এবং রাজউকের বিভিন্ন স্তরের ৩৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। দুদকের তদন্ত নম্বর অনুযায়ী এই মামলা ইতোমধ্যে নথিভুক্ত হয়েছে এবং প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত এগোচ্ছে।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গুলশানসহ ঢাকার কয়েকটি অভিজাত এলাকায় সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি বেআইনিভাবে দখল করে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের নকশা অনুমোদন ও প্ল্যান পাসের ক্ষেত্রে রাজউকের কিছু কর্মকর্তার অনৈতিক সহায়তা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম না মেনেই ভবনের অনুমোদন দেওয়া, কাগজপত্রে অসঙ্গতি রাখা এবং জলাভূমি ভরাটের মতো গুরুতর অনিয়মের কথাও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও অভিযোগ করা হয়েছে, একই জমিকে ভিন্ন ভিন্ন নামে একাধিক ব্যাংকে বন্ধক রেখে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, এভাবে নেওয়া ঋণের পরিমাণ চার হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। এসব ঋণের একটি বড় অংশ প্রকল্পে ব্যবহার না করে বিভিন্ন পথে বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে সন্দেহ করছে তদন্ত সংস্থা। জমি ও প্রকল্পসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রেখে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে।

দুদক জানিয়েছে, মামলার এজাহারে আসামিদের পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় নথি সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাব, শেয়ার, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেউ যেন দেশত্যাগ করতে না পারে, সে জন্য ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। মামলার বিষয়ে আগে থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ (BFIU) এবং পুলিশের সংশ্লিষ্ট শাখাকে অবহিত করা হয়েছিল।

দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্ত চলাকালে কোনো ধরনের প্রভাব, সুযোগ-সুবিধা দেওয়া বা সম্পত্তি লুকানোর চেষ্টা ঠেকাতে নজরদারি আরও জোরদার করা হবে। আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও, তদন্তের ব্যাপ্তি ও আইনি জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আদালতেই বিস্তারিত শুনানি ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।




অবসরের আগের কয়েক দিনে এলজিইডিতে বদলি–বাণিজ্য, আলোচনায় জাবেদ করিম

বিশেষ প্রতিবেদকঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমকে ঘিরে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অবসরে যাওয়ার ঠিক আগে কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি নিয়োগ, পদায়ন ও বদলিকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার লেনদেনে জড়ান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, সবকিছু করা হয় অত্যন্ত গোপনে এবং দ্রুততার সঙ্গে।

গত ৩ নভেম্বর রুটিন দায়িত্বে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পান জাবেদ করিম। এই দায়িত্বকাল ছিল মাত্র ২৭ দিনের। এ সময় তাকে খুব একটা সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যায়নি বলে সহকর্মীরা জানান। নিয়মিত অফিসে এলেও তিনি হাতে গোনা কয়েকটি ফাইলে সই করতেন, দুপুরের পরই বের হয়ে যেতেন। বেশিরভাগ সময় তিনি মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক থাকতেন। তবে ২৬ নভেম্বর হঠাৎ করেই তার কর্মকাণ্ডে নাটকীয় পরিবর্তন আসে।

ওই দিন তিনি এলজিইডি ভবনের সপ্তম তলায় নিজের পুরোনো কক্ষে যান এবং সেখানে গোপন বৈঠক করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখান থেকেই একাধিক নিয়োগ ও বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রশাসন শাখার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শফিক আহমেদ এসব কাজে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন বলে কর্মচারীদের একাংশ দাবি করেছেন।

একই দিনে সহকারী প্রকৌশলী ও উপজেলা প্রকৌশলীদের বেশ কয়েকটি বদলি ও পদায়ন চূড়ান্ত হয়। পাশাপাশি রুরাল ট্রান্সপোর্ট আপগ্রেডেশন প্রজেক্ট (আরইউটিডিপি)-এর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রশাসন) ফারুক আহমেদকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি।

৩০ নভেম্বর, তার শেষ কর্মদিবসেও দুপুর পর্যন্ত তিনি আরও কিছু বদলির আদেশে সই করেন। এরপর সন্ধ্যায় বিদায় নেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই পুরো প্রক্রিয়ায় অন্তত সাত কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়েছে। অনেকের মতে, চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর আশায় কিংবা ভবিষ্যৎ সুবিধা নিশ্চিত করতেই তিনি এই অর্থ সংগ্রহে তৎপর ছিলেন।

এছাড়া নিজের জেলা নোয়াখালীর বিভিন্ন সড়ক সংস্কারের জন্য ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, রুটিন দায়িত্বে থাকা একজন প্রধান প্রকৌশলীর এসব বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইনগত ক্ষমতা আদৌ ছিল কি না। তবে সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তর এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি।

জাবেদ করিমের চাকরি জীবনের শুরুটাও ছিল বিতর্কে ঘেরা। কুয়েটের পুরকৌশল বিভাগ থেকে বিএসসি পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগেই তিনি এলজিইডির রাজস্ব খাতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পান। অথচ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাসের শর্ত ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, এমন অনিয়ম প্রমাণিত হলে চাকরি বাতিলসহ শাস্তির বিধান থাকলেও তার ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময় লক্ষ্মীপুরের জিয়া উল হক জিয়া স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। একই জেলার বাসিন্দা হওয়ায় জাবেদ করিম তখন জুনিয়র সহকারী প্রকৌশলী হয়েও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে লক্ষ্মীপুর জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব পান। তৎকালীন এলজিইডি প্রধান প্রকৌশলী শহিদুল হাসান বিষয়টিকে নিয়মবহির্ভূত বলে আপত্তি জানালেও মন্ত্রীর চাপের মুখে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হন।

নিয়ম অনুযায়ী যেখানে দুই বছরের বেশি কোনো কর্মকর্তা একই দায়িত্বে থাকতে পারেন না, সেখানে জাবেদ করিম প্রায় পাঁচ বছর ওই পদে ছিলেন। এ সময় তিনি জেলার উন্নয়ন তহবিল ও আর্থিক ক্ষমতার বড় অংশ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। অভিযোগ রয়েছে, হাতে লেখা টেন্ডারের সুযোগ নিয়ে তিনি শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন।

২০০৭ সালে এক-এগারোর সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে তার নাম উঠে আসে। তবে উচ্চশিক্ষার অজুহাতে দ্রুত তাকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলানোর পর তিনি হঠাৎ করেই নিজেকে জাতীয়তাবাদী ঘরানার সঙ্গে যুক্ত করেন বলে আলোচনা রয়েছে।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, প্রকল্প পরিচালক হওয়ার জন্য ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। বদলি ও পদায়নেও নিয়মিত কোটি টাকার বাণিজ্য চলত। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করতে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত আরইউটিডিপি প্রকল্প পরিচালক ফারুক আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। এরপর একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে আর পাওয়া যায়নি।

অভিযুক্ত জাবেদ করিমের মোবাইল নম্বরেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি কল ফরওয়ার্ড অবস্থায় পাওয়া যায়। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।




ভুয়া কাজ আর কাগুজে বিলে কোটি টাকার অভিযোগ: বারবার ঢাকায় ‘সুবিধার পোস্টিং’ পাচ্ছেন কায়সার ইবনে সাঈখ

এসএম বদরুল আলমঃ কাজ না করেই সরকারি টাকা তুলে নেওয়া, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং একের পর এক লাভজনক পোস্টিং—গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে এমনই একটি বিতর্কিত অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কায়সার ইবনে সাঈখের নাম। বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহুল দপ্তরে দায়িত্ব পাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।

বর্তমানে তিনি প্রেষণে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকা ডিভিশন-১ (মিরপুর)-এ কর্মরত। এর আগে ঝিনাইদহ, চাঁদপুর, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন জোনে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব জায়গায় দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও কার্যকর কোনো শাস্তি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে ২০২১-২২ অর্থবছরে তিনি প্রায় ২২৫টি কাজের চাহিদাপত্র জমা দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কাজের বড় অংশ বাস্তবে করা হয়নি অথবা খুবই সামান্য কাজ করে কাগজে-কলমে পুরো কাজ শেষ দেখানো হয়। এরপর ঠিকাদারদের বিল ছাড় করে সরকারি অর্থ তুলে নেওয়া হয়। যেসব টাকা নিয়ম অনুযায়ী সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার কথা ছিল, সেগুলো নানা হিসাবের গোঁজামিলের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

২০২২ সালের ৫ জুন তেজগাঁওয়ের ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের বাংলো-১ এবং কেন্দ্রীয় রেকর্ড ভবনের বিভিন্ন মেরামতের জন্য প্রায় ১৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকার প্রাক্কলন অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অর্থবছরের শেষ দিকে এসব কাজ বাস্তবে শেষ না করেই কায়সার ইবনে সাঈখ কাগজে সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারকে পুরো বিল পরিশোধ করেন। এটি সরকারি আর্থিক বিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও অভিযোগ আছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলেও বিলম্ব জরিমানা (LD) কাটা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ঠিকাদারি ইনস্যুরেন্স ছাড়াই বিল দেওয়া হয়েছে। পরিমাপের চেয়ে বেশি কাজ দেখিয়ে বিল তৈরি করা হয়েছে এবং এসব অনিয়মের বিনিময়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের সুবিধা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

ঝিনাইদহ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে তার বিরুদ্ধে প্রায় ১০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৯ সালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সচিব পর্যায়ের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন অতিরিক্ত সচিব মো. ইয়াকুব আলী পাটওয়ারী। সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন তারিক হাসান এবং সদস্য ছিলেন ড. মইনুল ইসলাম। একই সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের যশোর অফিস থেকেও বিষয়টি খোঁজ নেওয়া হয়।

বিশ্বস্ত সূত্রগুলো বলছে, তদন্ত প্রতিবেদনে কায়সার ইবনে সাঈখের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ থাকলেও বাস্তবে তার কোনো শাস্তি হয়নি। বরং ঝিনাইদহ থেকে তাকে চাঁদপুরে এবং পরে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ পদায়ন করা হয়। প্রশাসনের ভেতরে এ ধরনের বদলিকে অনেকেই ‘পুরস্কার বদলি’ বা ‘প্রাইজ পোস্টিং’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

ঝিনাইদহে দায়িত্ব পালনকালে ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পেও তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ৪৩ কোটি ৬১ লাখ টাকার এই প্রকল্পে ৩ কোটি টাকার একটি বিল ছাড় করতে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছিল বলে ঠিকাদারদের অভিযোগ। একইভাবে ৩টি মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পে, যার মোট ব্যয় প্রায় ৩৬ কোটি টাকা, সেখানে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা কমিশন দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘুষ না দেওয়ায় কাজ বন্ধ রাখা, ঠিকাদারদের হয়রানি করা এবং পরে কাজ পুনর্বণ্টনের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এই অনিয়মের প্রভাব হাসপাতাল চালু হওয়ার পর আরও স্পষ্ট হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ভবনের টাইলস খসে পড়া, পাইপলাইনে লিক, এক বছরের মধ্যে প্রায় ৭০ বার লিফট বিকল হওয়া এবং অপারেশন থিয়েটারের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ার মতো সমস্যার মুখে পড়তে হয়। এসব বিষয় নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগও জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

এই দুর্নীতির সঙ্গে সহযোগী হিসেবে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমেদের নামও উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ভুয়া কাজের সার্টিফিকেট দিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতে সহায়তা করেছেন।

এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কায়সার ইবনে সাঈখের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন কর্মকর্তা বারবার ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পোস্টিং পান? কার প্রভাব ও আশ্রয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগের বাইরে থেকে যাচ্ছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে এখন তাকিয়ে আছে সচেতন নাগরিক সমাজ।




গণপূর্তে ভুয়া কাজের অভিযোগ: কোটি টাকা তুলে নেওয়ার পরও নিরাপদ এক প্রকৌশলী

এসএম বদরুল আলমঃ কাজ না করেই সরকারি টাকা তুলে নেওয়া, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং একের পর এক লাভজনক পোস্টিং—গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে এমনই একটি বিতর্কিত অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কায়সার ইবনে সাঈখের নাম। বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহুল দপ্তরে দায়িত্ব পাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।

বর্তমানে তিনি প্রেষণে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকা ডিভিশন-১ (মিরপুর)-এ কর্মরত। এর আগে ঝিনাইদহ, চাঁদপুর, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন জোনে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব জায়গায় দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও কার্যকর কোনো শাস্তি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে ২০২১-২২ অর্থবছরে তিনি প্রায় ২২৫টি কাজের চাহিদাপত্র জমা দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কাজের বড় অংশ বাস্তবে করা হয়নি অথবা খুবই সামান্য কাজ করে কাগজে-কলমে পুরো কাজ শেষ দেখানো হয়। এরপর ঠিকাদারদের বিল ছাড় করে সরকারি অর্থ তুলে নেওয়া হয়। যেসব টাকা নিয়ম অনুযায়ী সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার কথা ছিল, সেগুলো নানা হিসাবের গোঁজামিলের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

২০২২ সালের ৫ জুন তেজগাঁওয়ের ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের বাংলো-১ এবং কেন্দ্রীয় রেকর্ড ভবনের বিভিন্ন মেরামতের জন্য প্রায় ১৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকার প্রাক্কলন অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অর্থবছরের শেষ দিকে এসব কাজ বাস্তবে শেষ না করেই কায়সার ইবনে সাঈখ কাগজে সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারকে পুরো বিল পরিশোধ করেন। এটি সরকারি আর্থিক বিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও অভিযোগ আছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলেও বিলম্ব জরিমানা (LD) কাটা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ঠিকাদারি ইনস্যুরেন্স ছাড়াই বিল দেওয়া হয়েছে। পরিমাপের চেয়ে বেশি কাজ দেখিয়ে বিল তৈরি করা হয়েছে এবং এসব অনিয়মের বিনিময়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের সুবিধা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

ঝিনাইদহ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে তার বিরুদ্ধে প্রায় ১০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৯ সালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সচিব পর্যায়ের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন অতিরিক্ত সচিব মো. ইয়াকুব আলী পাটওয়ারী। সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন তারিক হাসান এবং সদস্য ছিলেন ড. মইনুল ইসলাম। একই সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের যশোর অফিস থেকেও বিষয়টি খোঁজ নেওয়া হয়।

বিশ্বস্ত সূত্রগুলো বলছে, তদন্ত প্রতিবেদনে কায়সার ইবনে সাঈখের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ থাকলেও বাস্তবে তার কোনো শাস্তি হয়নি। বরং ঝিনাইদহ থেকে তাকে চাঁদপুরে এবং পরে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত গণপূর্ত বিভাগ-৩-এ পদায়ন করা হয়। প্রশাসনের ভেতরে এ ধরনের বদলিকে অনেকেই ‘পুরস্কার বদলি’ বা ‘প্রাইজ পোস্টিং’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

ঝিনাইদহে দায়িত্ব পালনকালে ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পেও তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ৪৩ কোটি ৬১ লাখ টাকার এই প্রকল্পে ৩ কোটি টাকার একটি বিল ছাড় করতে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছিল বলে ঠিকাদারদের অভিযোগ। একইভাবে ৩টি মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পে, যার মোট ব্যয় প্রায় ৩৬ কোটি টাকা, সেখানে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা কমিশন দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘুষ না দেওয়ায় কাজ বন্ধ রাখা, ঠিকাদারদের হয়রানি করা এবং পরে কাজ পুনর্বণ্টনের ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এই অনিয়মের প্রভাব হাসপাতাল চালু হওয়ার পর আরও স্পষ্ট হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ভবনের টাইলস খসে পড়া, পাইপলাইনে লিক, এক বছরের মধ্যে প্রায় ৭০ বার লিফট বিকল হওয়া এবং অপারেশন থিয়েটারের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ার মতো সমস্যার মুখে পড়তে হয়। এসব বিষয় নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগও জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

এই দুর্নীতির সঙ্গে সহযোগী হিসেবে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমেদের নামও উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ভুয়া কাজের সার্টিফিকেট দিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতে সহায়তা করেছেন।

এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কায়সার ইবনে সাঈখের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন কর্মকর্তা বারবার ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পোস্টিং পান? কার প্রভাব ও আশ্রয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগের বাইরে থেকে যাচ্ছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে এখন তাকিয়ে আছে সচেতন নাগরিক সমাজ।