ফরিদপুর গণপূর্তের ক্যাশিয়ার জাহাঙ্গীরের সম্পদের পাহাড়, ২০ বছরে বিপুল সম্পত্তির মালিক

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগে উচ্চমান হিসাব সহকারী হিসেবে কর্মরত জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে ঘুষ, কমিশন বাণিজ্য, বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ প্রায় দুই দশক একই দপ্তরে কর্মরত থাকার সুযোগে তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজের বিল ছাড়, ঠিকাদারি সংক্রান্ত কার্যক্রম এবং দাপ্তরিক বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে ১৪তম গ্রেডের কর্মচারী। চাকরিজীবনের শুরুতে তার মূল বেতন ছিল ১০ হাজার ২০০ টাকা। দীর্ঘ কর্মজীবনে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য বৈধ আয় মিলিয়ে তার উপার্জনের তুলনায় বর্তমানে দৃশ্যমান সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। অনুসন্ধানে তার নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে জমি, প্লট, ফ্ল্যাট এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত বাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে।

কামারখালীতে কোটি টাকার চারতলা বাড়ি

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নসংলগ্ন এলাকায় জাহাঙ্গীর আলমের একটি চারতলা বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বাড়িটির নির্মাণ ও জমিসহ বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কামারখালী ও আশপাশের এলাকায় জাহাঙ্গীর আলম এবং তার স্ত্রীর নামে আরও জমি রয়েছে। এসব জমির পরিমাণ ও ক্রয়মূল্য নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানতে স্থানীয় ভূমি অফিসে যোগাযোগ করা হলেও সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

ফরিদপুর শহরেও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট

গ্রামের বাড়ির পাশাপাশি ফরিদপুর শহরেও রয়েছে জাহাঙ্গীর আলমের সম্পদ। শহরের ডিআইবি বটতলা সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত ‘বর্ণমালা’ নামে ১০তলা একটি বহুতল ভবনের ৪ নম্বর ভবনের চতুর্থ তলার ‘৫-সি’ ইউনিটে তার একটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা বলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের দাবি। ভবনের নিরাপত্তাকর্মীও জানিয়েছেন, জাহাঙ্গীর আলম তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ওই ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন।

বিল ছাড়ে ৫ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ

গণপূর্ত বিভাগের কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, কাজের বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে জাহাঙ্গীর আলমকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হয়। তাদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে বিলের প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন চাওয়া হয়। এর বাইরে প্রাক্কলন তৈরি, ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়ন, নতুন লাইসেন্স ইস্যুসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চাপও রয়েছে।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, দাবিকৃত অর্থ দিতে কেউ অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট ফাইল আটকে রেখে নানা ধরনের হয়রানি করা হয়। দীর্ঘদিন একই দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক দায়িত্বে থাকার কারণে জাহাঙ্গীর আলম দপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাবশালী একটি বলয় তৈরি করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, “দীর্ঘদিন একই জায়গায় থাকার কারণে তিনি দপ্তরের অনেক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। তার সঙ্গে সমঝোতা না করে কাজ করা কিংবা বিল ছাড় করানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।”

সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ

জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়ন ফি, ইজিপি চালুর আগের সময়ের সিডিউল ফি এবং অন্যান্য সরকারি রাজস্বের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব খাতে আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে সরাসরি বা বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসায় যুক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফল বা আদালতের সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

২০ বছরের চাকরিতে সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

জাহাঙ্গীর আলমের চাকরির শুরুতে মূল বেতন ছিল ১০ হাজার ২০০ টাকা। ওই বেতন ধরে ২০ বছরের মূল বেতন হিসাব করলে তা প্রায় ২৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। পরবর্তী সময়ে বেতন বৃদ্ধি, বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য বৈধ আয়ের বিষয় বিবেচনায় নিলেও তার দৃশ্যমান সম্পদের সঙ্গে সরকারি চাকরি থেকে অর্জিত আয়ের বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন।

অনুসন্ধানে ফরিদপুরে চারতলা বাড়ি, বহুতল ভবনে ফ্ল্যাট এবং বিভিন্ন এলাকায় জমি ও প্লটের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সম্পদের মোট মূল্য কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি। কেউ কেউ তার মোট সম্পদের পরিমাণ ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত বলে দাবি করলেও এ পরিমাণ সম্পদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি চাকরির বৈধ আয় দিয়ে এত বিপুল সম্পদ কীভাবে গড়ে উঠল এবং এসব সম্পদের অর্থের উৎস কী?

বক্তব্য পাওয়া যায়নি

অভিযোগগুলোর বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খায়রুজ্জামান সবুজের সঙ্গেও মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব না হওয়ায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সম্পদের দলিলপত্র, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব এবং সরকারি দাপ্তরিক রেকর্ড যাচাইসহ স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




গেজেটের নীতিমালা পাশ কাটিয়ে ‘লটারিতে’ বদলি-পদায়ন, প্রশ্নের মুখে গণপূর্তের সিদ্ধান্ত

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ উঠেছে, সম্প্রতি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যেসব বদলি-পদায়ন করা হয়েছে, তার কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যমান সরকারি নীতিমালা ও বাংলাদেশ গেজেটে নির্ধারিত পদায়ন কাঠামোর যথাযথ অনুসরণ করা হয়নি। বিশেষ করে ‘লটারির মাধ্যমে’ ব্যাপকভাবে বদলি-পদায়ন করা হলে তা নির্ধারিত নীতিমালার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।

অভিযোগকারীদের বক্তব্য, বদলি ও পদায়ন প্রশাসনের স্বাভাবিক ক্ষমতার অংশ হলেও সেই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরও প্রচলিত আইন, বিধি, প্রজ্ঞাপন ও নিজস্ব অনুমোদিত নীতিমালার সীমার মধ্যে আবদ্ধ। ফলে ব্যক্তির জ্যেষ্ঠতা, সততা, কর্মদক্ষতা, মেধা, কর্মস্পৃহা, পূর্ববর্তী কর্মস্থলের মেয়াদ ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বিবেচনা না করে যদি কেবল লটারি বা নির্বিচার পদ্ধতিতে পদায়ন করা হয়, তাহলে সেটি নীতিমালার উদ্দেশ্য ও কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

গেজেটেই রয়েছে পদায়নের স্পষ্ট কাঠামো : বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট নীতিমালার ১০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কোনো কর্মকর্তা যে কর্মস্থলে পদায়নের আগ্রহ প্রকাশ করবেন, সেখানে কর্মরত কর্মকর্তার মেয়াদের পূর্ণতা, দক্ষতা, সততা ইত্যাদি বিবেচনা করে তাকে পদায়ন করতে হবে। অর্থাৎ পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কর্মজীবনের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনার কথা নীতিমালাতেই রয়েছে।

১১ নম্বর ধারায় আরও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা, সততা ও সন্তোষজনক চাকরির ভিত্তিতে পদায়নের বিষয় বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আবেদনকারী কর্মকর্তাকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিজের সমস্যা, প্রয়োজন বা অবস্থান উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়ার কথাও রয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—এই ধারায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কোনো কর্মকর্তা, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বদলি সংক্রান্ত সুপারিশ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর পরিপন্থী হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ বদলি-পদায়নকে কোনো ব্যক্তিগত সুপারিশ, গোষ্ঠীগত প্রভাব কিংবা নির্বিচার প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে নির্ধারিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে রাখার বিষয়টি নীতিমালায় গুরুত্ব পেয়েছে।

‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’ শ্রেণির অফিস—লটারিতে কি মিলবে এই ভারসাম্য ? নীতিমালার ১২ নম্বর ধারায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের বিভাগ, উপ-বিভাগ ও শাখাগুলোকে কাজের পরিধি, প্রকৃতি, গুরুত্ব এবং রাজধানী/বিভাগ/জেলা শহর থেকে দূরত্ব বিবেচনায় ‘ক’, ‘খ’ ও ‘গ’—এই তিন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে। এরপর উপধারায় বলা হয়েছে, কর্মকর্তাদের এসব কার্যালয়ে পদায়নের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা, সততা, কর্মদক্ষতা, মেধা ও কর্মস্পৃহা বিবেচনা করতে হবে। এখানেই ‘লটারি’ পদ্ধতি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তৈরি হচ্ছে। কারণ একজন কর্মকর্তাকে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মস্থলে পাঠানোর ক্ষেত্রে যদি তার জ্যেষ্ঠতা, দক্ষতা, সততা, পূর্ববর্তী কর্মস্থলের অভিজ্ঞতা ও চাকরির মেয়াদ বিবেচ্য হয়, তাহলে শুধুমাত্র দৈবচয়ন বা লটারির মাধ্যমে পদায়ন করা হলে এসব মানদণ্ড বাস্তবে কীভাবে মূল্যায়ন করা হলো—তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

‘ক’ শ্রেণির অফিসে পদায়নেও রয়েছে বাধ্যবাধকতা :
নীতিমালার ১২(খ) ধারায় বলা হয়েছে, সরকারের পূর্বানুমতি ও বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া পদোন্নতির পর প্রথম পর্যায়ে ন্যূনতম দুই বছর ‘খ’ বা ‘গ’ শ্রেণির কার্যালয়ে কাজের অভিজ্ঞতা ছাড়া ‘ক’ শ্রেণির কার্যালয়ে পদায়ন করা যাবে না। একই ধারার ১২(গ)-তে বলা হয়েছে, কোনো কর্মকর্তাকে একই পদে পরপর দুই মেয়াদে ঢাকা বা চট্টগ্রাম মহানগরীর ‘ক’ শ্রেণির কার্যালয়ে পদায়ন করা যাবে না। এছাড়া উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের জোন/সার্কেল কার্যালয়ে Estimator হিসেবে পদায়নের ক্ষেত্রেও ‘ক’, ‘খ’ বা ‘গ’ শ্রেণির কার্যালয়ে ন্যূনতম তিন বছর চাকরির অভিজ্ঞতাকে পূর্বশর্ত করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—সাম্প্রতিক বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে প্রত্যেক কর্মকর্তার চাকরির ইতিহাস, পূর্ববর্তী কর্মস্থল, শ্রেণিভিত্তিক অভিজ্ঞতা ও একই ধরনের পদে পূর্ববর্তী মেয়াদ কি যাচাই করা হয়েছে ? যদি হয়ে থাকে, সেই যাচাইয়ের ভিত্তি কী ? আর যদি না হয়ে থাকে, তাহলে নীতিমালার সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর বাস্তব প্রয়োগ কোথায় ?

বিভাগীয় মামলা থাকলে আলাদা বিধান : ১৩ নম্বর ধারায় আরও একটি সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। কোনো কর্মকর্তা বিভাগীয় মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হলে দণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী পাঁচ বছর তাকে ‘ক’ শ্রেণির কার্যালয়ে পদায়ন না করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে বিভাগীয় মামলা চলমান থাকলে কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে যে কোনো সময় যে কোনো স্থানে পদায়ন করতে পারবে। অর্থাৎ একই নীতিমালায় বিভিন্ন প্রশাসনিক পরিস্থিতির জন্য পৃথক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো রাখা হয়েছে। ফলে একটি অভিন্ন লটারি পদ্ধতিতে সবাইকে একইভাবে বিবেচনা করলে ব্যক্তিভেদে প্রযোজ্য এসব বিধান কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ?

প্রথম নিয়োগ ও প্রশিক্ষণেও রয়েছে স্পষ্ট শর্ত : ১৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া চাকরিতে প্রথম যোগদানের পর ন্যূনতম তিন মাসের মৌলিক বিভাগীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা যাবে না।

১৫ নম্বর ধারায় প্রত্যেক কর্মকর্তাকে চাকরির প্রাথমিক পর্যায়ে মাঠপর্যায় ও দাপ্তরিক পর্যায়ে ন্যূনতম অভিজ্ঞতা অর্জনের লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে পদায়নের কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ পদায়নের দর্শনটি নিছক ‘কোথায় খালি পদ আছে’—এমন সরল হিসাবের ওপর দাঁড়ানো নয়। বরং কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ক্যারিয়ার কাঠামো তৈরির উদ্দেশ্য স্পষ্ট। লিয়েন, শিক্ষাছুটি ও প্রেষণেও সময়সীমা নির্ধারিত ১৬ নম্বর ধারায় অন্য মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা সংস্থার চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রেষণে পদায়নের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

১৭ নম্বর ধারায় লিয়েন ও শিক্ষাছুটি থেকে ফেরার পর কর্মকর্তাকে মাঠপর্যায়ে ন্যূনতম দুই বছর চাকরি করার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তাদের জন্য অবশ্য বিশেষায়িত পদে পদায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এসব বিধান থেকে স্পষ্ট যে, পদায়নের ক্ষেত্রে কর্মকর্তার পূর্ববর্তী কর্মস্থল ও কর্মজীবনের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করার নীতিগত উদ্দেশ্য রয়েছে।

বদলির আদেশ পাওয়া কর্মকর্তার ক্ষমতা নিয়েও বিধান : নীতিমালার ১৮ নম্বর ধারা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে বলা হয়েছে— বদলির আদেশপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা তার অধীনস্থ কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে বদলি করতে পারবেন না। এই বিধান প্রশাসনিক ক্ষমতার সম্ভাব্য অপব্যবহার ঠেকানোর একটি সুরক্ষা কাঠামো হিসেবে দেখা যেতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, সাম্প্রতিক বদলি-পদায়নের পর প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় এই বিধানগুলো কতটা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে ?

মন্ত্রণালয়ই অস্পষ্টতার চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ—কিন্তু নীতিমালার বাইরে নয় : নীতিমালার ২০ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, নীতিমালার কোনো অস্পষ্টতার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পার্থক্য রয়েছে। কোনো বিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতা থাকা আর সেই বিধানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার ক্ষমতা থাকা এক বিষয় নয়।

নীতিমালার কোনো ধারার প্রয়োগে অস্পষ্টতা দেখা দিলে মন্ত্রণালয় তার ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু সেই ব্যাখ্যার মাধ্যমে নীতিমালায় নির্ধারিত মৌলিক মানদণ্ড—যেমন জ্যেষ্ঠতা, সততা, দক্ষতা, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বা নির্ধারিত মেয়াদ—সম্পূর্ণ অকার্যকর করা যায় কি না, সেটিই এখন আইন ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের আলোচনার বিষয় হতে পারে।

‘জনস্বার্থে’ জারি করা নীতিমালা কি জনস্বার্থেই উপেক্ষিত হচ্ছে ? ২১ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, জনস্বার্থে জারীকৃত এ নীতিমালা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
এখানেই বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ বদলি-পদায়নের নীতিমালা যদি জনস্বার্থে জারি হয়ে থাকে এবং তা কার্যকর থাকে, তাহলে এর অধীনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বও স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।

তাই লটারির মাধ্যমে বদলি-পদায়ন করা হয়েছে—এমন অভিযোগ সত্য হলে প্রথমেই দেখতে হবে, লটারির আগে কি প্রতিটি কর্মকর্তার ক্ষেত্রে নীতিমালায় নির্ধারিত যোগ্যতা ও সীমাবদ্ধতাগুলো যাচাই করা হয়েছিল ?

‘লটারি’ কি প্রশাসনিক মূল্যায়নের বিকল্প হতে পারে ? প্রশাসনে লটারির মতো পদ্ধতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বা পক্ষপাত এড়ানোর উপায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু যেখানে একটি সরকারি গেজেটে পদায়নের ক্ষেত্রে কর্মকর্তা-ভিত্তিক একাধিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, সেখানে লটারি ব্যবহারের আগে সেই মানদণ্ডগুলো কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে—তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকা জরুরি।

অন্যথায় একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায় : যদি জ্যেষ্ঠতা, সততা, দক্ষতা, মেধা, কর্মস্পৃহা, পূর্ববর্তী কর্মস্থলের মেয়াদ, প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং বিভাগীয় মামলার অবস্থার মতো বিষয়গুলো বিবেচ্য হয়, তাহলে শুধু লটারির মাধ্যমে একই সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো ?

রাষ্ট্রের আইন বনাম প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—এখন প্রশ্নের মুখে : বদলি-পদায়ন
সরকারি প্রশাসনে বদলি ও পদায়ন নিঃসন্দেহে সরকারের প্রশাসনিক ক্ষমতার অংশ। কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সংবিধান, আইন, বিধি, প্রজ্ঞাপন ও কার্যকর নীতিমালার কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং সাম্প্রতিক বদলি-পদায়ন নিয়ে বিতর্কের মূল প্রশ্ন ‘মন্ত্রণালয় বদলি করতে পারবে কি না’—এটি নয়।

মূল প্রশ্ন হলো— মন্ত্রণালয় যে বদলি-পদায়নের ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে, সেটি কি কার্যকর সরকারি নীতিমালার নির্ধারিত পদ্ধতি ও মানদণ্ড মেনে করা হয়েছে ?

যদি নীতিমালার বাধ্যতামূলক শর্তগুলো যাচাই না করেই ঢালাওভাবে পদায়ন করা হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; বরং সংশ্লিষ্ট আদেশের আইনি ও বিধিগত বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ তৈরি হতে পারে।

আর যদি মন্ত্রণালয়ের দাবি হয় যে প্রতিটি বদলি-পদায়নের আগে সংশ্লিষ্ট গেজেটের সব শর্ত যাচাই করা হয়েছে, তাহলে সেই যাচাইয়ের প্রশাসনিক নথি, মূল্যায়ন-তালিকা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি প্রকাশ করলেই বিতর্কের অবসান হতে পারে।

কারণ সরকারি চাকরিতে বদলি কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা বা অসুবিধার বিষয় মাত্র নয়। এটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের জনবল ব্যবস্থাপনার অংশ। আর জনবল ব্যবস্থাপনা যখন গেজেটভুক্ত নীতিমালার অধীন, তখন কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার পাশাপাশি সেই ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতিও জবাবদিহির আওতায় থাকে।

এখন তাই গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— সাম্প্রতিক বদলি-পদায়নে গেজেটের প্রতিটি শর্ত কীভাবে যাচাই করা হয়েছে ? কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা, দক্ষতা, সততা, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, পূর্ববর্তী কর্মস্থলের মেয়াদ ও শ্রেণিভিত্তিক পদায়নের ইতিহাস কি মূল্যায়ন করা হয়েছে?

নাকি সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে ‘লটারি’ই হয়ে উঠেছে পদায়নের প্রধান ভিত্তি?
এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট উত্তরই নির্ধারণ করবে—সাম্প্রতিক বদলি-পদায়ন স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার উদাহরণ, নাকি গেজেটভুক্ত নীতিমালার সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত।।




১০ হাজার টাকার বেতন, ৪ কোটি টাকার প্রাসাদ: ফরিদপুর গণপূর্তের ক্যাশিয়ার জাহাঙ্গীরের সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় মূল বেতন ছিল ১০ হাজার ২০০ টাকা। পদটি উচ্চমান হিসাব সহকারী, গ্রেড ১৪। প্রায় দুই দশকের চাকরিজীবনে বেতন-ভাতা থেকে অর্জিত বৈধ আয়ের সঙ্গে বর্তমান সম্পদের হিসাব মিলাতে গিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের ক্যাশিয়ার মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ—দীর্ঘদিন একই দায়িত্বে থাকার সুযোগে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন আদায় ও বিভিন্ন কাজে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

অনুসন্ধানে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালী এলাকায় তার প্রায় চার কোটি টাকা মূল্যের একটি চারতলা বাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে। ফরিদপুর শহরেও রয়েছে একটি অভিজাত ফ্ল্যাট। এ ছাড়া জাহাঙ্গীর আলম ও তার স্ত্রীর নামে বিভিন্ন এলাকায় জমি রয়েছে বলেও স্থানীয়দের দাবি। একজন সরকারি কর্মচারীর ঘোষিত বা বৈধ আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য কতটা, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের অনেকে।

বিল ছাড়ে ৫ শতাংশ কমিশনের অভিযোগ

একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, গণপূর্ত বিভাগের কাজের বিল ছাড় করাতে ক্যাশিয়ার জাহাঙ্গীর আলমকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হয়। তাদের দাবি, বিলের পরিমাণের ওপর প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়। শুধু বিল পরিশোধ নয়, প্রাক্কলন প্রস্তুত, ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়ন কিংবা নতুন লাইসেন্স সংক্রান্ত কাজেও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, নির্ধারিত অর্থ দিতে কেউ অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট ফাইল আটকে রাখা কিংবা নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা হয়। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে বিভাগটির আর্থিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে।

তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন জাহাঙ্গীর আলম।

কামারখালীতে কোটি টাকার বাড়ি

সরেজমিনে দেখা যায়, মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নসংলগ্ন এলাকায় জাহাঙ্গীর আলমের একটি চারতলা বাড়ি রয়েছে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাড়িটির নির্মাণ ও জমির বর্তমান বাজারমূল্যসহ মোট মূল্য প্রায় চার কোটি টাকা হতে পারে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, ওই এলাকায় জাহাঙ্গীর আলম এবং তার স্ত্রীর নামে একাধিক জমিও রয়েছে। তবে তাদের নামে মোট কত জমি রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে স্থানীয় ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে তথ্য জানতে চাওয়া হলেও জাহাঙ্গীর আলমের সম্পদসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য দিতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

২০ বছরের আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মেলে?

সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় জাহাঙ্গীর আলমের মূল বেতন ছিল ১০ হাজার ২০০ টাকা। ওই বেতন ধরে ২০ বছরের হিসাবে মূল বেতন থেকে আয় দাঁড়ায় প্রায় ২৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। অবশ্য চাকরিজীবনে পর্যায়ক্রমে বেতন বৃদ্ধি, বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য বৈধ আয়ের সুযোগ রয়েছে।

তারপরও বর্তমানে দৃশ্যমান স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণের সঙ্গে দীর্ঘ চাকরিজীবনের বেতন-ভাতার হিসাবের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে গ্রামে কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি, শহরে ফ্ল্যাট এবং জমিজমার মালিকানা কীভাবে অর্জিত হয়েছে—এ প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ফরিদপুর শহরেও রয়েছে ফ্ল্যাট

গ্রামের সম্পদের পাশাপাশি ফরিদপুর শহরেও জাহাঙ্গীর আলমের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। শহরের ডিআইবি বটতলা সংলগ্ন ১০ তলা ভবন ‘বর্ণমালা’র ৪ নম্বর ভবনের চারতলায় ৫-এর ‘সি’ ইউনিটে ওই ফ্ল্যাটটি অবস্থিত। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা।

ভবনের নিরাপত্তাকর্মী কুদ্দুস শেখ জানান, জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন ধরে ওই ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।

সম্পদের উৎস সম্পর্কে জাহাঙ্গীরের ব্যাখ্যা

অভিযোগের বিষয়ে মো. জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘুষ, কমিশন আদায় ও সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, তার নামে থাকা সম্পদ বৈধ আয়ের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে।

বাড়ি নির্মাণের অর্থের উৎস সম্পর্কে জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি ব্যাংক থেকে ৬০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। এ ছাড়া বড় বোনের কাছ থেকে চেকের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা, স্ত্রীর নামে সোনালী ব্যাংক থেকে ৮ লাখ টাকা ঋণ এবং নিজের প্রায় ১০ লাখ টাকার সঞ্চয় ব্যবহার করেছেন বলে দাবি করেন।

তবে এসব ঋণ ও অর্থের উৎসের সমর্থনে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা নথিপত্র তিনি দেখাতে পারেননি।

সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার অনুরোধও করেন জাহাঙ্গীর আলম। এ সময় অর্থের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশ না করার প্রস্তাব দেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বক্তব্য

কামারখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চৌধুরী ইরান হোসেন বলেন, জাহাঙ্গীর আলমের বাবা ভূমি কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করতেন। তবে তার জানা মতে, বাবার রেখে যাওয়া সম্পদের পরিমাণ এত বেশি ছিল না যে তা থেকে জাহাঙ্গীর আলমের বর্তমান সম্পদের মতো বড় সম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব।

তবে বর্তমানে এলাকায় থাকা সম্পত্তিগুলোর সবগুলো জাহাঙ্গীর আলমের নিজের নামে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য তার কাছে নেই বলেও জানান চেয়ারম্যান।

নির্বাহী প্রকৌশলী জানেন না সম্পদের উৎস

অভিযোগের বিষয়ে ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খায়রুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তার জানা মতে সঠিক নয়।

তবে জাহাঙ্গীর আলমের ব্যক্তিগত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ কত এবং এসব সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে—এ বিষয়ে তার কোনো তথ্য নেই বলে জানান নির্বাহী প্রকৌশলী।

ফলে সরকারি চাকরিতে দীর্ঘদিন একই পদে থাকা একজন কর্মচারীর দৃশ্যমান বিপুল সম্পদের প্রকৃত উৎস কী, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং সম্পদের বৈধ উৎস নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




ডিজিটাল নম্বর প্লেটের নামে ১,৫১৬ কোটি টাকা আদায়, ১৪ বছরেও মিলল না প্রতিশ্রুত সেবা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ চুরি যাওয়া গাড়ি শনাক্ত, অপরাধে ব্যবহৃত যানবাহনের গতিবিধি অনুসরণ এবং সেতু ও মহাসড়কে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালে ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (আরএফআইডি) ব্যবস্থা চালু করেছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। প্রায় ১৪ বছর ধরে এ ব্যবস্থার আওতায় অর্ধকোটির বেশি যানবাহন মালিকের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে ১ হাজার ৫১৬ কোটি টাকার বেশি।

তবে বিপুল অর্থ আদায়ের পরও বাস্তবে মিলছে না প্রকল্পটির ঘোষিত সুবিধা। চুরি যাওয়া গাড়ি শনাক্ত বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যানবাহনের গতিপথ অনুসরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। এমনকি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যে চেকপোস্ট স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল, তার বড় অংশও বাস্তবায়ন হয়নি।

এর মধ্যেই আগের ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে নতুন করে গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। আগামী দিনের এই ব্যবস্থাও আগের আরএফআইডি প্রকল্পের মতো অব্যবহৃত হয়ে পড়বে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

২০১২ সালে যাত্রা, বড় প্রত্যাশা

২০১২ সালের ৩১ অক্টোবর সব ধরনের যানবাহনের জন্য ডিজিটাল নম্বর প্লেট বাধ্যতামূলক করে বিআরটিএ। তখন বলা হয়েছিল, প্রতিটি গাড়িতে নম্বর প্লেটের পাশাপাশি আরএফআইডি ট্যাগ থাকায় চুরি হয়ে যাওয়া গাড়ি শনাক্ত করা সহজ হবে। কোনো যানবাহন অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার হলেও প্রযুক্তির মাধ্যমে সেটির অবস্থান ও গতিপথ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বিভিন্ন সেতু ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে আরএফআইডি প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় টোল আদায়ের পরিকল্পনাও ছিল।

তৎকালীন নির্ধারিত হিসাবে মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যানবাহনের ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগের জন্য ২ হাজার ২৬০ টাকা এবং চার চাকার যানবাহনের জন্য ৪ হাজার ৬২৮ টাকা নেওয়া হয়।

৫৪ লাখের বেশি প্লেট, আদায় ১,৫১৬ কোটি টাকা

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণির যানবাহনের জন্য ৫৪ লাখ ৭১ হাজার ৪৮৯টি আরএফআইডি ট্যাগযুক্ত ডিজিটাল নম্বর প্লেট সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ লাখ ৭০ হাজার ৮৬৯টি নম্বর প্লেট যানবাহনে সংযোজন করেছেন মালিকরা। আরও ৫ লাখ ৬২০টি প্লেট বিভিন্ন সার্কেল অফিসে পড়ে আছে।

এসব নম্বর প্লেটের বিপরীতে যানবাহন মালিকদের কাছ থেকে মোট ১ হাজার ৫১৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা আদায় করেছে বিআরটিএ।

এর মধ্যে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৭৪৪টি ভারী যানবাহন থেকে আদায় হয়েছে ১১৫ কোটি ১১ লাখ ৮৭ হাজার ২৩২ টাকা। ৯ লাখ ৩৩ হাজার ২৮৭টি হালকা ও মধ্যম শ্রেণির যানবাহন থেকে নেওয়া হয়েছে ৪৩১ কোটি ৯২ লাখ ৫২ হাজার ২৩৬ টাকা।

সবচেয়ে বেশি অর্থ এসেছে মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যানবাহন থেকে। ৪২ লাখ ৮৯ হাজার ৪৫৮টি এসব যানবাহনের বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯৬৯ কোটি ৪১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

অধিকাংশ মালিকই জানেন না আরএফআইডির কাজ

ডিজিটাল নম্বর প্লেটের সঙ্গে আরএফআইডি প্রযুক্তি থাকলেও এর কার্যকারিতা সম্পর্কে অনেক যানবাহন মালিকই অবগত নন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের ১৪ জন মালিকের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে মাত্র একজন ছাড়া অন্যরা জানেন না, গাড়িতে থাকা আরএফআইডি ট্যাগটি কী কাজে ব্যবহারের কথা।

পুরানা পল্টন এলাকায় এক মোটরসাইকেল মালিক হাফিজুর রহমান বলেন, গাড়ি কেনার পর ডিজিটাল নম্বর প্লেট নিতে হয় এবং তিনি এটিকে মূলত গাড়ির রেজিস্ট্রেশনেরই একটি অংশ হিসেবে মনে করেন।

ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসক শুব্রত মন্ডলের মোটরসাইকেল আট মাসেরও বেশি সময় আগে চুরি হয়েছে। থানায় সাধারণ ডায়েরি করার পর কয়েকবার যোগাযোগ করেও গাড়িটির সন্ধান পাননি তিনি। অথচ চুরি যাওয়া গাড়ি শনাক্ত ও উদ্ধারে সহায়তা করাই ছিল আরএফআইডি ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।

৯৪টি চেকপোস্টের পরিকল্পনা, হয়েছে মাত্র ১২টি

ডিজিটাল নম্বর প্লেট প্রকল্পের আওতায় শুরুতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ৯৪টি স্থানে চেকপোস্ট স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। এসব চেকপোস্টের মাধ্যমে আরএফআইডি ট্যাগ শনাক্ত করে সন্দেহজনক বা চুরি যাওয়া গাড়ির বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।

কিন্তু ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১২টি চেকপোস্ট। সবগুলোই ঢাকার মধ্যে। এসব কেন্দ্র নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পৃথক জনবলও নিয়োগ করতে পারেনি বিআরটিএ।

ফলে সারাদেশে বিপুলসংখ্যক গাড়িতে প্রযুক্তিটি যুক্ত থাকলেও সেটিকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর মতো ব্যবস্থা তৈরি হয়নি।

পরিকল্পনায় ছিল আরও অনেক সুবিধা

ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা ছিল শুধু গাড়ির পরিচয় নিশ্চিত করা নয়; বরং একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিবহন ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আরএফআইডির মাধ্যমে কোনো গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা সম্ভব হওয়ার কথা। নম্বর প্লেট রাতে প্রায় ৪০ ফুট দূর থেকেও দৃশ্যমান এবং আরএফআইডি চিপ প্রায় ১১ মিটার দূর থেকে স্ক্যান করা যাবে—এমন প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কথাও বলা হয়েছিল।

এসব তথ্য বিআরটিএর কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষিত থাকার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থাও করার কথা ছিল।

বাস্তবে সেই সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় আরএফআইডির সম্ভাবনা অনেকটাই কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

পুলিশের সঙ্গে নেই সরাসরি ডিজিটাল সংযোগ

প্রকল্প শুরুর প্রায় ১৪ বছর পরও বিআরটিএর কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে পুলিশের কার্যকর ডিজিটাল সংযোগ স্থাপিত হয়নি। ফলে আরএফআইডি ব্যবহার করে পুলিশ চুরি যাওয়া গাড়ি বা অপরাধে ব্যবহৃত যানবাহন শনাক্ত করার সুযোগ পাচ্ছে না।

পুলিশকে নিজস্ব প্রযুক্তি, তথ্যসূত্র ও প্রচলিত তদন্ত পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেই গাড়ি চুরি ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া শাখার অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. নিয়াজ মেহেদী বলেন, আরএফআইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করা না যাওয়ায় পুলিশ নিজস্ব প্রযুক্তি ও তথ্যসূত্র কাজে লাগিয়ে অপরাধ দমন এবং চুরি যাওয়া গাড়ি উদ্ধারের চেষ্টা করে। বিআরটিএর মাসিক প্রতিবেদন থেকে মূলত ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।

এবার গণপরিবহনে বাধ্যতামূলক জিপিএস

ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডির কাঙ্ক্ষিত সুফল নিশ্চিত না হওয়ার মধ্যেই গণপরিবহনে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ গত ১১ জুন জিপিএস ডিভাইস ব্যবহারের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে ১ আগস্ট থেকে গণপরিবহনে জিপিএস ডিভাইস সংযোজন এবং সেটি সচল রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বিআরটিএ জানিয়েছে, নির্ধারিত কারিগরি বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী জিপিএস ডিভাইস স্থাপন করতে হবে। ডিভাইস সংযুক্ত ও কার্যকর থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই গণপরিবহনের রেজিস্ট্রেশন এবং ফিটনেস সনদ দেওয়া বা নবায়ন করা হবে।

নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং গণপরিবহনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বিআরটিএর দাবি, সুফল মিলবে

বিআরটিএর উপপরিচালক ফারুক হোসেন বলেন, গত ১৪ বছরে প্রায় অর্ধকোটি যানবাহনে ডিজিটাল নম্বর প্লেট সংযোজন করা হয়েছে। দীর্ঘ সময়ের এ কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি ভিত্তি তৈরি হয়েছে এবং এখন এর সুফল পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

চেকপোস্টের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব না হওয়ার পেছনে জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিদ্যমান জনবল দিয়েই সার্ভার মনিটরিংসহ বিভিন্ন কাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির ডিজিটাল নম্বর প্লেট বিভাগের প্রজেক্ট ম্যানেজার মেজর রেজাউল ইসলাম বলেন, এ ব্যবস্থার সঙ্গে একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ জড়িত। প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে জনগণ এর সুফল পাবেন। তাঁর দাবি, বিএমটিএফের ওপর অর্পিত দায়িত্ব অনুযায়ী ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে।

নতুন জিপিএস উদ্যোগেও পুরোনো ভুলের আশঙ্কা

পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, ডিজিটাল নম্বর প্লেট ও আরএফআইডি প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল ইতিবাচক। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি না করায় জনগণ এর সুফল পায়নি।

তিনি বলেন, অনেক গাড়িতে আরএফআইডি ট্যাগ বসানো হলেও স্বয়ংক্রিয় টোল আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় স্থানে রিডার স্থাপন করা হয়নি। ফলে প্রযুক্তি থাকার পরও সেটি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে প্রথম দিকে স্থাপন করা অনেক আরএফআইডি ট্যাগ বর্তমানে কার্যকর আছে কি না, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।

তাঁর মতে, গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার চালুর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো যায়। তবে আগের প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার শুরুতেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, তথ্য ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

তা না হলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে চালু করা নতুন জিপিএস ব্যবস্থার পরিণতিও পুরোনো আরএফআইডি প্রকল্পের মতো হতে পারে—প্রযুক্তি থাকবে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেবা পৌঁছাবে না জনগণের কাছে।




মজুরি ‘কর্তন’ থেকে ২৪ লাখের মেরামত বিল: জোয়ার সাহারা ডিপো ম্যানেজারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) জোয়ার সাহারা বাস ডিপোতে দৈনিকভিত্তিক সাময়িক শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে গুরুতর অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ডিপোর ম্যানেজার মো. মফিজ উদ্দিন। অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিসি প্রধান কার্যালয়ের জারি করা অফিস আদেশ উপেক্ষা করে ডিপোর ৩৩ জন কারিগর ও সংশ্লিষ্ট দৈনিকভিত্তিক শ্রমিককে নির্ধারিত হারের চেয়ে কম মজুরি দেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রধান কার্যালয়ের আদেশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৭০০ টাকা নির্ধারিত হলেও প্রায় এক বছর ধরে তাদের ৬০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ প্রত্যেক শ্রমিকের দৈনিক মজুরি থেকে ১০০ টাকা কম দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
শুধু মজুরি কম দেওয়ার অভিযোগই নয়, ডিপোর একটি গাড়ি মেরামতের ব্যয় নিয়েও উঠেছে বড় ধরনের প্রশ্ন। অভিযোগ অনুযায়ী, গাড়িটি মেরামতের জন্য বিআরটিসি প্রধান কার্যালয় থেকে ৩ লাখ টাকা অনুমোদন দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে একই গাড়ির মেরামত বাবদ ২৪ লাখ টাকার ভাউচার/প্রস্তাবনা প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়ে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় প্রকৃত ব্যয়, ভাউচার ও অনুমোদনের নথি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

অফিস আদেশেই ৭০০ টাকা, ডিপোতে দেওয়া হচ্ছে ৬০০?
বিআরটিসির হিসাব বিভাগ (পে-রোল) থেকে জারি করা অফিস আদেশে দৈনিকভিত্তিক সাময়িক শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

প্রাপ্ত নথিতে পত্র নং-৩৫.০৪.০০০০.০১৫.১৩.০০১.১৪/৩১৬ উল্লেখ রয়েছে। আদেশে অর্থ মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং-০৭.০০.০০০০.১৭৩.৬৬০৫৯.১৫ (অংশ-৩)-১৩০, তারিখ: ২২ মে ২০২৫ খ্রি.-এর আলোকে এবং বিআরটিসি করপোরেশনের আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা ও পর্ষদ সভার সুপারিশ অনুযায়ী দৈনিকভিত্তিক সাময়িক শ্রমিকদের মজুরি হার পুনর্নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। নথিতে কারিগর ও চালকসহ বিভিন্ন শ্রেণির শ্রমিকের দৈনিক মজুরি পুনর্নির্ধারণের হার উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কারিগর শ্রেণির ক্ষেত্রে ৭০০ টাকা দৈনিক মজুরি দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে নথিতে থাকা পুনর্নির্ধারিত হারের সামঞ্জস্য যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অফিস আদেশে আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, উল্লেখিত দৈনিক মজুরি হারে শ্রমিক নিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যয়ের ক্ষেত্রে যাবতীয় বিধি-বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করে কোনো অর্থ প্রদান করা যাবে না এবং Online Banking ব্যতীত কোনো অর্থ প্রদান করা যাবে না বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

আদেশটি মার্চ ২০২৬ মাস থেকে কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। নথিতে আদেশদাতা হিসেবে আব্দুল লতিফ মোল্লা, অতিরিক্ত সচিব ও চেয়ারম্যান, বিআরটিসি-এর নাম রয়েছে। তবে সরবরাহ করা কপিতে তারিখের ঘরে ০৫/০৩/২৬২ মুদ্রিত/পাঠযোগ্য অবস্থায় রয়েছে—এটি নথির মূল কপি থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

৩৩ শ্রমিকের মজুরি থেকে দৈনিক ১০০ টাকা করে কম ?
ডিপোর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কারিগর ও চালকের অভিযোগ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে সামান্য আয়ের ওপর নির্ভর করে তাদের সংসার চালাতে হচ্ছে। দৈনিক মজুরি থেকে ১০০ টাকা কম পাওয়ায় তারা আর্থিক সংকটে পড়ছেন এবং কখনো কখনো ধারদেনা করে সংসারের খরচ চালাতে হচ্ছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নির্ধারিত হারে মজুরি দেওয়া হলে তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি আসত। হিসাবটি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে ৩৩ জন শ্রমিকের ক্ষেত্রে। অভিযোগ সত্য হলে প্রত্যেক শ্রমিকের দৈনিক ১০০ টাকা করে কম দেওয়ার অর্থ দাঁড়ায়— ৩৩ জন × ১০০ টাকা = ৩,৩০০ টাকা প্রতিদিন। মাসে ৩০ দিন হিসাবে এ অর্থ দাঁড়ায় প্রায় ৯৯,০০০ টাকা। আর ১২ মাসে তা দাঁড়ায় প্রায় ১১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ অভিযোগ অনুযায়ী, ৩৩ জন শ্রমিকের ক্ষেত্রে এক বছর ধরে প্রতিদিন ১০০ টাকা করে কম দেওয়া হয়ে থাকলে সম্ভাব্য ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। তবে প্রকৃত অর্থের পরিমাণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের হাজিরা খাতা, মজুরি বিল, ব্যাংক লেনদেন, পে-রোল এবং বিআরটিসির হিসাব নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

‘এই টাকা আমি কি একা খাই, চেয়ারম্যানকে দিয়ে খাই’ ! অভিযোগকারীর দাবি
বিষয়টি নিয়ে ডিপো ম্যানেজার মো. মফিজ উদ্দিনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী এমন মন্তব্য করেন— “আপনার কি এই টাকা আমি কি একা খাই। আমি চেয়ারম্যানকে দিয়ে খাই।”

এ সময় তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে অশালীন ও অকথ্য ভাষায় কথা বলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে ডিপোর ট্রাফিক অফিসার মো. তালেব-এর মাধ্যমে প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তালেব বলেন, “স্যারের মাথা ঠিক নাই, কী বলতে কী বলেছে। আপনি এদিকে খেয়াল করবেন না। স্যার আপনার সঙ্গে পরে কথা বলবেন।”

মো. মফিজ উদ্দিনের এই বক্তব্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে ‘চেয়ারম্যানকে টাকা দেওয়ার’ দাবিটিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা গেলে অভিযোগটির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে।

৩ লাখের অনুমোদন, ২৪ লাখের ভাউচার—কোথায় গেল অতিরিক্ত ২১ লাখ ?
জোয়ার সাহারা ডিপোর আরেকটি গাড়ি মেরামত নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, গাড়িটি মেরামতের জন্য বিআরটিসির প্রধান কার্যালয় থেকে ৩ লাখ টাকা অনুমোদন করা হয়েছিল। কিন্তু একই গাড়ির মেরামতের জন্য পরবর্তীতে ২৪ লাখ টাকার ভাউচার/প্রস্তাবনা প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়ে অনুমোদন নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যদি অভিযোগের নথিপত্র সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে অনুমোদিত ৩ লাখ টাকা ও পরবর্তী ২৪ লাখ টাকার দাবির মধ্যে পার্থক্য দাঁড়ায় ২১ লাখ টাকা।

এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কেন একই গাড়ির মেরামত ব্যয় ৩ লাখ টাকা থেকে ২৪ লাখ টাকায় উন্নীত হলো? অতিরিক্ত ২১ লাখ টাকার ব্যয়ের যৌক্তিকতা কী? কোন কাজের জন্য কত টাকা ব্যয় হয়েছে? মেরামতের আগে ও পরের এস্টিমেট, ওয়ার্ক অর্ডার, বিল-ভাউচার, বিল অনুমোদন, গাড়ির ওয়ার্কশপ রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমোদন—এসব নথি যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

অফিস আদেশের শর্তও কি মানা হচ্ছে ? বিআরটিসির ওই অফিস আদেশে দৈনিকভিত্তিক সাময়িক শ্রমিক নিয়োগ ও অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে একাধিক শর্ত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—দৈনিক মজুরি ভিত্তিক চালকের হেভি লাইসেন্স থাকতে হবে, চালককে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে, বয়স ন্যূনতম ২০ বছর হতে হবে এবং ন্যূনতম ২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কোনো মামলায় অপরাধী বা এজাহারভুক্ত হলে দৈনিক মজুরি ভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না;

অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দৈনিকভিত্তিক সাময়িক শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না, শ্রমিকের সংখ্যা যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে, উল্লেখিত দৈনিক মজুরি হারেই শ্রমিক নিয়োগ করতে হবে এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিধি-বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে;।

Online Banking ছাড়া কোনো অর্থ প্রদান করা যাবে না। ফলে জোয়ার সাহারা ডিপোর ৩৩ জন কারিগরের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মজুরি, হাজিরা, পে-রোল, ব্যাংক লেনদেন ও অনুমোদিত জনবলের তালিকা পাশাপাশি পরীক্ষা করলেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।

অনুসন্ধানের দাবি :
অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু কয়েকজন শ্রমিকের মজুরি কম দেওয়ার ঘটনা নয়; বরং সরকারি মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের বেতন ব্যবস্থাপনা, আর্থিক শৃঙ্খলা, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে। তাই জোয়ার সাহারা ডিপোর গত এক বছরের— হাজিরা খাতা, দৈনিক মজুরি বিল, পে-রোল শিট, শ্রমিকদের ব্যাংক হিসাব/অনলাইন ব্যাংকিং রেকর্ড, অনুমোদিত জনবল তালিকা, গাড়ি মেরামতের এস্টিমেট, ওয়ার্ক অর্ডার, ভাউচার, বিল, সংশ্লিষ্ট গাড়ির মেরামত রেকর্ড এবং প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদনপত্র—স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে ৩৩ জন শ্রমিকের দৈনিক ১০০ টাকা করে মজুরি কম দেওয়ার অভিযোগ এবং ৩ লাখ টাকার অনুমোদনের বিপরীতে ২৪ লাখ টাকার মেরামত ব্যয়ের প্রস্তাব/ভাউচার—এই দুটি বিষয়েই বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ অডিট ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি তদন্ত প্রয়োজন।

অভিযোগের সত্যতা তদন্তে প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের প্রাপ্য অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আসতে পারে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিআরটিসি চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং জোয়ার সাহারা ডিপো ম্যানেজার মো. মফিজ উদ্দিনের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।




পদোন্নতির দৌড়ে সাইদুর রহমান, নাকি দুর্নীতির অভিযোগের আড়ালে অন্য খেলা?

# বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনে একই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি # প্রশ্ন উঠছে তথ্যের উৎস ও উদ্দেশ্য নিয়ে #

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমানকে ঘিরে গত কয়েক দিনে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও সংবাদমাধ্যমে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। নদী খনন প্রকল্পে শত কোটি টাকা আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ, জাল সনদ, টেন্ডার সিন্ডিকেট, বদলি-বাণিজ্য, দুদকের অনুসন্ধান প্রভাবিত করার চেষ্টা—এমন নানা অভিযোগ স্থান পেয়েছে এসব প্রতিবেদনে।

তবে চারটি প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু পাশাপাশি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একই অভিযোগ, একই ধরনের সূত্রনির্ভর বক্তব্য এবং একই তথ্য বারবার উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে, অভিযোগগুলোর বিপরীতে সাইদুর রহমানের বক্তব্যও রয়েছে—তিনি এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, কাল্পনিক ও বাস্তবতাবিবর্জিত বলে দাবি করেছেন।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—এগুলো কি সত্যিই দুর্নীতির তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান, নাকি বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদকে ঘিরে চলমান অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা ও পদোন্নতির লড়াইয়ের অংশ?

একই অভিযোগ, ভিন্ন শিরোনাম : সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে প্রায় অভিন্নভাবে দাবি করা হয়েছে, কংস ও ভোগাই নদ খনন প্রকল্পে ১৩৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে সাইদুর রহমানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

কোথাও এই অর্থের পরিমাণ ১৩৪ কোটি, কোথাও ১৩৮ কোটি টাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার কোথাও সাইদুর রহমানকে প্রকল্পের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রতিবেদনগুলোতে অভিযোগ, অনুসন্ধান ও চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত দুর্নীতির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য সবসময় রাখা হয়নি।

কোনো বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান চলা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দুর্নীতির জন্য দায়ী—এমন সিদ্ধান্ত সাংবাদিকতার মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলা এবং আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া—প্রতিটি পর্যায় আলাদা।

সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানের কথা প্রতিবেদনে বলা হলেও সেই অনুসন্ধানের সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, মামলা দায়ের, চার্জশিট কিংবা আদালতের কোনো রায় প্রকাশ্যে উপস্থাপন করা হয়নি।

১৩৪ কোটি টাকার অভিযোগ—সাইদুরের ভূমিকা কোথায় ?
কংস ও ভোগাই নদ খনন প্রকল্প নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদী খনন না করেই ঠিকাদাররা বিল তুলে নিয়েছেন। প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু একই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে এবং দুদকের অনুসন্ধানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের কথাও বলা হয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো—প্রকল্পের অনুমোদন, দরপত্র, কার্যাদেশ, পরিমাপ, বিল অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের প্রতিটি প্রশাসনিক ধাপে কার কী দায়িত্ব ছিল?

শুধু একটি পদে থাকা একজন কর্মকর্তাকে পুরো প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে তার নির্দিষ্ট স্বাক্ষর, নথি, অনুমোদন, আর্থিক লেনদেন কিংবা প্রত্যক্ষ নির্দেশনার প্রমাণ সামনে আসা প্রয়োজন। অভিযোগের গুরুত্ব যত বেশি, প্রমাণের মানদণ্ডও তত বেশি হওয়া উচিত।

‘দুদকের ফাইল আটকে আছে’—দাবিটিরও প্রমাণ প্রয়োজন৷ : প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান বছরের পর বছর ধরে চলছে এবং কোনো এক ‘অদৃশ্য ইশারায়’ তা আটকে রাখা হয়েছে। এমনকি কিছু দুদক কর্মকর্তা অভিযুক্তদের ‘শেল্টার’ দিচ্ছেন—এমন গুরুতর অভিযোগও করা হয়েছে। কিন্তু এমন অভিযোগ প্রমাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নাম, নথি, যোগাযোগের প্রমাণ, তদন্তের আদেশ, ফাইলের নোটশিট কিংবা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য দলিল থাকা জরুরি।

দুদকের অনুসন্ধান দীর্ঘায়িত হওয়া নিজেই দুর্নীতির প্রমাণ নয়। একইভাবে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা বদলি হওয়াও কোনো ব্যক্তিকে দায়মুক্তি দেওয়ার ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না, যদি না তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকে।

জাল সনদ ও চাকরিচ্যুতির অভিযোগ: সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন এখানেই : সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি এলজিইডি থেকে চাকরিচ্যুত হওয়ার তথ্য গোপন করে ২০০৩ সালে বিআইডব্লিউটিএতে চাকরি নেন এবং তার শিক্ষাগত সনদ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুতর। কিন্তু এমন দাবির ক্ষেত্রে চাকরিচ্যুতির আদেশ, নিয়োগের সময় দেওয়া তথ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন—এসব নথি প্রকাশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একজন সরকারি কর্মকর্তার চাকরির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে ‘শোনা যায়’ বা ‘সূত্রের দাবি’ যথেষ্ট নয়।

সম্পদের অভিযোগেও প্রয়োজন নথিভিত্তিক যাচাই :
সাইদুর রহমানের নামে একাধিক ফ্ল্যাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ইটভাটা ও বিপুল সম্পদের অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি আয়কর নথিতে স্বর্ণ বিক্রির রসিদ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

কিন্তু এসব সম্পদ কার নামে নিবন্ধিত, অর্থের উৎস কী, ক্রয়ের সময় কে অর্থ পরিশোধ করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদের সঙ্গে সাইদুর রহমানের প্রত্যক্ষ মালিকানা বা উপকারভোগী সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব যাচাই না করে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে সম্পদকে ‘অবৈধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা সাংবাদিকতার বিচারে ঝুঁকিপূর্ণ। অবশ্যই এসব অভিযোগের অনুসন্ধান হওয়া উচিত। কিন্তু অনুসন্ধান এবং রায়—দুটি এক বিষয় নয়।

‘জীবিত বাবাকে মৃত দেখানো’র অভিযোগও যাচাইযোগ্য নথির বিষয় :
একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সাইদুর রহমান ২০১৭ সালের নথিতে তার জীবিত পিতাকে মৃত দেখিয়ে উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পদের মালিকানা দাবি করেছেন।

অভিযোগটি সত্য হলে তা অত্যন্ত গুরুতর। কিন্তু এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট বছরের সরকারি মৃত্যু নিবন্ধন, উত্তরাধিকার সনদ, আয়কর নথি এবং সম্পত্তির দলিল পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

শুধু একটি পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে এমন অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রকাশ করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ন্যায়সংগত বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ ক্ষুণ্ন হতে পারে।

তাহলে পদোন্নতির বিষয়টি কি গুরুত্বপূর্ণ ? এই পুরো বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্যটি এসেছে সাইদুর রহমানের পক্ষের বক্তব্যে।

বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগের চিফ ইঞ্জিনিয়ার পদটি বর্তমানে শূন্য হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পদে পদোন্নতির সম্ভাব্য তালিকায় সাইদুর রহমানের নাম আলোচনায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর পক্ষের বক্তব্য—পদোন্নতির প্রতিযোগিতায় থাকা প্রতিদ্বন্দ্বী মহলের কেউ কেউ তাঁকে ঠেকাতে ধারাবাহিকভাবে সংবাদমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছেন। এই দাবি সত্য কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। তবে ঘটনাপ্রবাহের সময়কাল বিবেচনায় বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের অভিযোগ প্রকাশিত হওয়ার পর যদি একই সময়ে তার পদোন্নতি নিয়ে প্রশাসনিক আলোচনা চলে, তাহলে সাংবাদিকতার স্বার্থেই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন—অভিযোগগুলো প্রথমে কোথা থেকে এসেছে, কে তথ্য সরবরাহ করেছে, অভিযোগের নথি কার কাছে রয়েছে এবং সংবাদ প্রকাশের পেছনে কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না।

অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক, কিন্তু তদন্তের আগেই রায় নয় : সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। কংস-ভোগাই নদ খনন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, কাজের পরিমাণ, ড্রেজিংয়ের গভীরতা, জিপিএস/মেজারমেন্ট রেকর্ড, বিল-ভাউচার, ঠিকাদারদের কার্যাদেশ, মাটি উত্তোলনের হিসাব এবং প্রকল্প-পরবর্তী নদীর বাস্তব অবস্থা—সবকিছুই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব। একইভাবে তাঁর সম্পদের ক্ষেত্রেও ভূমি রেজিস্ট্রি, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন, কোম্পানি মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদের প্রকৃত উপকারভোগী যাচাই করা যেতে পারে।

যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর যদি অভিযোগ প্রমাণিত না হয়, তাহলে একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের দায়ও নির্ধারণ করা জরুরি।

সাইদুর রহমানের বক্তব্য :
অভিযোগের বিষয়ে মো. সাইদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন এবং তাঁর কোনো অবৈধ সম্পদও নেই। তাঁকে ঘিরে প্রচারিত অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও বাস্তবতাবিবর্জিত।

তাঁর পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, ড্রেজিং বিভাগের শীর্ষ পদকে কেন্দ্র করে পদোন্নতির প্রতিযোগিতা থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বী একটি পক্ষ তাঁকে বিতর্কিত করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক প্রচারণা চালাচ্ছে। এই দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

শেষ কথা : বিআইডব্লিউটিএর মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা দরকার। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অর্থ কোনো ব্যক্তিকে প্রমাণ ছাড়াই অপরাধী বানানো নয়।

সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আর যদি অভিযোগগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে থাকে, তবে কারা কেন এই প্রচারণা চালাচ্ছে—সেটিও তদন্তের আওতায় আসা উচিত।

কারণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই যেমন জরুরি, তেমনি মিথ্যা অভিযোগ ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট অপপ্রচার থেকেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে সুরক্ষা দেওয়া জরুরি।

এখন মূল প্রশ্ন একটাই—সাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা কি নথি ও নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হবে, নাকি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে চলমান প্রতিযোগিতাই এসব ধারাবাহিক প্রচারণার নেপথ্যে রয়েছে? উত্তরটি সংবাদ শিরোনামে নয়—নথি, তদন্ত ও প্রমাণেই খুঁজে বের করতে হবে।




অ্যাগ্রো ট্যুরিজমের স্বপ্ন দেখিয়ে শত কোটি টাকার বিনিয়োগ ফাঁদ? ডায়মন্ড রিসোর্টের বিরুদ্ধে এমএলএম কাঠামোয় অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ কৃষি পর্যটনের নামে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক রিসোর্ট নির্মাণের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। প্রচার করা হয়েছিল শত একর জমির ওপর গড়ে উঠবে বিলাসবহুল বিনোদন কেন্দ্র, যেখানে বিনিয়োগ করলেই মিলবে নিয়মিত উচ্চ মুনাফা। চটকদার প্রচারণা, আকর্ষণীয় প্যাকেজ এবং ভবিষ্যতের সমৃদ্ধির আশ্বাসে এগিয়ে এসেছিলেন অসংখ্য সাধারণ মানুষ। কিন্তু এখন সেই স্বপ্নই অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় ‘অ্যাগ্রো ট্যুরিজম’ প্রকল্পের নামে পরিচালিত ডায়মন্ড রিসোর্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে উঠেছে শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রকল্পের আড়ালে পরিচালিত হয়েছে একটি বহুস্তর বিপণন (এমএলএম) ধাঁচের অর্থ সংগ্রহ কার্যক্রম, যেখানে নতুন সদস্য যুক্ত করার ওপরই ছিল মূল গুরুত্ব।

উচ্চ মুনাফার প্রলোভন, বিনিয়োগে আকৃষ্ট হাজারো মানুষ : ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ৩ লাখ, ৬ লাখ এবং ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিভিন্ন বিনিয়োগ প্যাকেজ চালু করে। এসব প্যাকেজে নির্দিষ্ট সময় পরপর আকর্ষণীয় লভ্যাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো। শুধু তাই নয়, নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত করতে পারলে দেওয়া হতো কমিশন ও বিশেষ বোনাস। ফলে অনেকেই নিজের সঞ্চয়, জমি বিক্রির অর্থ কিংবা পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার টাকা এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করেন।

বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, শুরুতে কয়েক মাস নিয়মিত লভ্যাংশ দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন মূল টাকা ফেরত চাইলে নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে।

প্রকল্পের চেয়ে সদস্য সংগ্রহেই বেশি গুরুত্ব ? অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে প্রকৃত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের তুলনায় নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং কমিশনভিত্তিক আয়ের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের আয় যদি মূলত নতুন সদস্য যুক্ত করার ওপর নির্ভর করে এবং প্রকৃত পণ্য বা সেবাভিত্তিক ব্যবসা দুর্বল থাকে, তাহলে সেটি পিরামিড বা অবৈধ এমএলএম কাঠামোর ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

১০০ বিঘা জমির প্রকল্প, বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন : বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে শিবপুরের কামারগাঁও এলাকায় প্রায় ১০০ বিঘা জমির ওপর আধুনিক রিসোর্ট নির্মাণের প্রচারণা চালানো হয় বলে অভিযোগ।

তবে কয়েকজন বিনিয়োগকারী দাবি করেছেন, প্রচারিত জমির মালিকানা, প্রকল্প অনুমোদন এবং বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে তারা এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। তাদের অভিযোগ, প্রচারণায় দেখানো নানা নকশা ও ভিজ্যুয়ালের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

নেপথ্যে কারা ? উঠছে কয়েকজনের নাম : ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামছুল আলম সজলের নেতৃত্বে একটি চক্র এই কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, এমএলএম ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত এম আর খানসহ কয়েকজন ব্যক্তি এই কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া নারী বিনিয়োগকারীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে সালমা আক্তার (মনি) নামের এক নারীর ভূমিকার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গুলশান কার্যালয় নিয়েও প্রশ্ন৷ : বিনিয়োগকারীদের কয়েকজন জানান, রাজধানীর গুলশান এলাকায় একটি কার্যালয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। কিন্তু অভিযোগ ওঠার পর যোগাযোগের চেষ্টা করলে অনেক সময় কার্যালয় বন্ধ পাওয়া যায়।

একই এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির মালিকের সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যবসা নিয়েও নানা অভিযোগের কথা জানিয়েছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

বিনিয়োগকারীদের আর্তনাদ : এক ভুক্তভোগী বলেন, “উচ্চ মুনাফার আশায় জীবনের সব সঞ্চয় বিনিয়োগ করেছিলাম। এখন লাভ তো দূরের কথা, আসল টাকাই ফেরত পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা পাচ্ছি না।” আরেক বিনিয়োগকারীর ভাষ্য, “প্রকল্পের স্বপ্ন দেখিয়ে আমাদের আস্থা তৈরি করা হয়েছিল। এখন যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে গেছে।”

বক্তব্য পাওয়া যায়নি : ডায়মন্ড রিসোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শামছুল আলম সজল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোন এবং কার্যালয়ের মাধ্যমে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তদন্তের দাবি : ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারীরা সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দেওয়া যেকোনো বিনিয়োগ প্রকল্পে অর্থ দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের আইনগত অনুমোদন, আর্থিক সক্ষমতা, সম্পদের মালিকানা এবং ব্যবসার বাস্তব ভিত্তি যাচাই করা জরুরি।




পদ্মা রেল প্রকল্পে ১৩ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তি, অনিয়মের অভিযোগের পরও দায়িত্বে আফজাল

বিশেষ প্রতিবেদকঃ পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে সরকারি বিশেষ নিরীক্ষায়। প্রকল্পে ২০টি অডিট আপত্তিতে মোট ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কম কাজ করেও ঠিকাদারকে বেশি বিল দেওয়া, চুক্তির বাইরে ব্যয়, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত মালামাল আমদানি, উচ্চমূল্যে কাজের চুক্তি এবং অনুমোদন ছাড়া বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয়ের মতো বিষয়গুলো অডিটে উঠে এসেছে। এই প্রকল্পের সঙ্গে তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক ও বর্তমানে রেলের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের নাম আলোচনায় এসেছে। অডিট আপত্তির বিষয়গুলোতে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও তাকে পরবর্তীতে রেলের মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও পরবর্তীতে তা বেড়ে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এর মধ্যেই সরকারি নিরীক্ষায় বিপুল অঙ্কের আর্থিক আপত্তি ওঠায় প্রকল্পটির অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অডিট কর্তৃপক্ষের দাবি, বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রকৃত কাজের পরিমাণ কম হলেও ঠিকাদারকে চুক্তিতে নির্ধারিত পুরো অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।

সবচেয়ে বড় আপত্তিগুলোর একটি ঢাকা-যশোর রেললাইন নির্মাণকে ঘিরে। অডিটে বলা হয়েছে, মূল নকশায় রেললাইনের বাঁধের গড় উচ্চতা ৭ দশমিক ৩ মিটার নির্ধারণ করা হলেও পরে তা কমিয়ে ৫ দশমিক ৬ মিটার করা হয়। এতে মাটি ভরাটসহ পিভিডি, জিওটেক্সটাইল, সিমেন্ট মিক্সিং পাইল, সেতু ও কালভার্টের কাজের পরিমাণ কমে যায়। কিন্তু কাজ কম হওয়ার পরও ঠিকাদারকে বিল অব কোয়ান্টিটিজ অনুযায়ী শতভাগ অর্থ দেওয়া হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় অডিট প্রায় ২ হাজার ১৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধের অভিযোগ তুলেছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশোধিত নকশার পর প্রকৃত কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ার বিষয়টি প্রকল্প কর্তৃপক্ষের জানা ছিল। এরপরও অতিরিক্ত অর্থ ফেরত নেওয়া হয়নি। বরং পরবর্তী বিল থেকে টাকা সমন্বয়ের সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি। অডিট কর্তৃপক্ষ এই অর্থ ঠিকাদারের কাছ থেকে আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

তবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়। তাদের দাবি, ঠিকাদারকে চুক্তি অনুযায়ী ডলারে বিল পরিশোধ করা হয়েছে এবং অডিট বর্তমান ডলার বিনিময় হার ব্যবহার করে অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব করেছে। কিন্তু নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি। তাদের বক্তব্য, মূল দর বাংলাদেশি টাকায় নির্ধারিত হওয়ায় বর্তমান বিনিময় হার বিবেচনায় নেওয়া যৌক্তিক।

প্রকল্পে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত রেল আমদানির অভিযোগও রয়েছে। অডিট বলছে, ২ হাজার ৮৫৫ টন ইউআইসি-৬০ রেল অতিরিক্ত আমদানি করা হয়েছে। এর ফলে শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর বাবদ প্রায় ১২ কোটি ৫১ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, প্রকল্পের কাজের পরিধি বাড়ায় বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত রেলের প্রয়োজন হয়েছিল। তবে এই ব্যাখ্যাও অডিট কর্তৃপক্ষ গ্রহণযোগ্য মনে করেনি।

এ ছাড়া মূল নকশার তুলনায় প্রায় ২০০ মিলিমিটার কম গ্রানুলার স্যান্ড ব্যবহার করেও ২১৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে। টার্নকি বা ইপিসি চুক্তির শর্ত ভেঙে বিল অব কোয়ান্টিটিজ বাড়িয়ে প্রায় ৭২৮ কোটি টাকা ব্যয়, দেশীয় মালামালের মূল্য ডলারে পরিশোধ করে ৫১৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় এবং প্রকল্পকে বিশেষায়িত কাজ দেখিয়ে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি দামে চুক্তি করার মাধ্যমে প্রায় ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির অভিযোগও অডিটে এসেছে।

নিরীক্ষায় আরও বলা হয়েছে, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি প্রতিবেদনের তুলনায় বেশি কাজ দেখিয়ে প্রায় ১ হাজার ১১ কোটি ১৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়েছে। একই জমির মূল্য দুইবার নির্ধারণ করে ১৭১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত অনুদান, ভাঙ্গা রেলস্টেশনের নকশা পরিবর্তনে ২৮৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া গাড়ি কেনায় ১১০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগও রয়েছে।

অন্যদিকে ব্যালাস্ট বা রেললাইনের পাথরের পুরুত্ব কম দেওয়ার পরও ২৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা পরিশোধ, উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়া জমির সীমানা পিলার স্থাপনে ৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়, চুক্তির বাইরে ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার কেনায় ২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা এবং সরকারি জমির মূল্য ব্যক্তির নামে পরিশোধ দেখিয়ে ১১ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ করেছে অডিট।

প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় আরও একটি বড় প্রশ্ন উঠেছে অতিরিক্ত অর্থ ডিএসসিসিকে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে। অডিটের হিসাবে, অতিরিক্ত ৪১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা দিয়ে এফডিআর করা হয়েছে। ভাঙ্গা জংশনে অতিরিক্ত মাটি ভরাট দেখিয়ে ৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা, প্রভিশনাল সামের ওপর ওভারহেড চার্জ বাবদ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং অতিরিক্ত স্থাপনা নির্মাণে পরামর্শককে অনিয়মিত অর্থ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অডিট প্রতিবেদনে এসব ব্যয়ের বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দেওয়া জবাবের বড় একটি অংশকে আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য যথেষ্ট নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিরীক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, প্রকৃত কাজের তুলনায় বেশি অর্থ দেওয়া কিংবা চুক্তির বাইরে ব্যয় করার ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায় রয়েছে। অতিরিক্ত পরিশোধ করা অর্থ ফেরত আনা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে।

এই প্রকল্পের সঙ্গে তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক ও বর্তমানে রেলের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের অডিট আপত্তির বিষয়গুলোতে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও তাকে পরবর্তীতে রেলের মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুধু পদ্মা রেল প্রকল্পের অডিট নয়, আফজাল হোসেনকে ঘিরে নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ কেনায় প্রায় ৬৫৮ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগের পর রেলপথ মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব খালেদা আখতার স্বাক্ষরিত চিঠিতে সংশ্লিষ্টদের প্রমাণপত্রসহ শুনানিতে হাজির হতে বলা হয়। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার পরও প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানেও আফজাল হোসেনকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগের কথা জানা গেছে। দুদকের অনুসন্ধানে পাথর সরবরাহ ও মোটর মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করে অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ব্যাংকে তার সন্তানদের নামে রাখা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে দুদকের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তার মতে, এত বড় প্রকল্পে ওঠা অভিযোগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তদন্তের স্বার্থে রেলের মহাপরিচালককে সাময়িক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখার বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করতে পারত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অভিযোগের বিষয়ে মো. আফজাল হোসেনের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদে বার্তায় তিনি জানান, অডিটের অধিকাংশ আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং অনেক আপত্তি প্রত্যাহারও করা হয়েছে। সর্বশেষ তথ্যের জন্য তিনি প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলেন।

বর্তমান প্রকল্প পরিচালক নাজনীন আরা কেয়াও জানিয়েছেন, ১৩ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তির বিষয়গুলো নিয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ একে একে জবাব দিচ্ছে। তার ভাষ্য, অডিট আপত্তি উঠলেই সেটিকে সরাসরি অনিয়ম বলা যায় না; উত্থাপিত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া চলমান।

রেলের এই প্রকল্পে অর্থের অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি এখন নতুন করে নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগের বিভিন্ন এলাকায় আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম চুরি হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। মাওয়া, শ্রীনগর ও নিমতলা স্টেশন এলাকায় একাধিকবার ক্যাবল, সিগন্যাল সরঞ্জাম এবং ট্রেন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ চুরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

মাওয়া রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার সাইফুল ইসলাম খোকনের দাবি, চুরির কারণে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থার প্রায় ৭০ শতাংশ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে স্বাভাবিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার পরিবর্তে ফোনে যোগাযোগ এবং চালকদের লিখিত নির্দেশনা দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে ট্রেন চলাচলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হচ্ছে।

রেলসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সিগন্যাল ব্যবস্থা কেবল ট্রেনকে থামানো বা চালানোর নির্দেশ দেওয়ার বিষয় নয়। এটি ট্রেনের অবস্থান শনাক্ত করা এবং সংঘর্ষসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনা প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা অচল থাকলে রেলপথের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান জানিয়েছেন, পদ্মা সেতু রেলপথের বিভিন্ন এলাকায় চুরির ঘটনা ঘটেছে। সিগন্যাল সরঞ্জাম রক্ষায় খাঁচা বসানো হয়েছে। এতে চুরি কিছুটা কমেছে। তবে এরই মধ্যে কয়েক দফায় কোটি কোটি টাকার যন্ত্রাংশ চুরি হয়েছে। তার মতে, সরঞ্জাম চুরির পাশাপাশি জনবল সংকটের কারণেও নিমতলা ও শ্রীনগর স্টেশনে অস্থায়ী লোকবল দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে।

এরই মধ্যে আগামী ১০ আগস্ট ঢাকা-পদ্মা সেতু-গোপালগঞ্জ পথে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ ট্রেন চালুর প্রস্তুতি চলছে। নতুন ট্রেনটিতে থাকবে আটটি কোচ এবং ৬০৯টি আসন। ঢাকা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টায় ছেড়ে ট্রেনটি গোপালগঞ্জে পৌঁছাবে সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে। এরপর সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে গোপালগঞ্জ থেকে ছেড়ে রাত ১০টা ২৫ মিনিটে ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে। শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকবে।

নতুন ট্রেনটি কেরানীগঞ্জ, শ্রীনগর, মাওয়া, শিবচর, ভাঙ্গা জংশন, নগরকান্দা ও মহেশপুরে থামবে। তবে নতুন যাত্রীসেবা চালুর আগে সিগন্যাল ব্যবস্থার দুর্বলতা, সরঞ্জাম চুরি এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা দ্রুত সমাধান করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে একদিকে হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তি ও ব্যয়ের অনিয়মের অভিযোগ, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল সরঞ্জাম চুরি—দুটি বিষয়ই প্রকল্পটির ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। এখন মূল বিষয় হলো, অডিটে ওঠা বিপুল অঙ্কের অর্থের প্রকৃত দায় কার, অতিরিক্ত অর্থ আদৌ ফেরত এসেছে কি না এবং অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।




ডাল ও তেলবীজ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ: পিডি শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে টেন্ডার, ভুয়া বিল ও সিন্ডিকেটের প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সরকারের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম উদ্যোগ ‘ডাল ও তেলবীজ উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’ বাস্তবায়ন ঘিরে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও অভিযোগকারীদের দাবি, কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের সহায়তার লক্ষ্যে নেওয়া এ প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়ম, ভুয়া বিল-ভাউচার, টেন্ডারে প্রভাব বিস্তার এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিযোগের কারণে কৃষি বিভাগের একটি অংশে তাকে ‘গুপ্ত শফিক’ নামে সমালোচনা করা হচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বীজ, সার ও আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি বিতরণের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ কাগজে-কলমে ব্যয় দেখানো হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ভুয়া কৃষকের তালিকা তৈরি করে বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী খামার স্থাপনের নামে বিল তোলা হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই সেসব খামারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের চাপ দিয়ে ভুয়া ভাউচারে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় বীজ ও কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বাজারমূল্যের তুলনায় বেশি দামে নিম্নমানের বীজ ক্রয় করে তা কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এর ফলে অনেক এলাকায় প্রত্যাশিত ফলন পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগও উঠেছে।
কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সেমিনারের জন্য বরাদ্দ অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণের পরিবর্তে স্বল্প সময়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে পুরো বরাদ্দ উত্তোলন করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত না হলেও ভুয়া উপস্থিতি তালিকা ও স্বাক্ষরের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া টিএ/ডিএ বাবদ সরকারি কর্মকর্তাদের নামে অর্থ উত্তোলন করা হলেও প্রকৃত মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
প্রকল্পের ভেতরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, যেসব কর্মকর্তা বিতর্কিত নথিতে স্বাক্ষর করতে রাজি হননি, তাদের দূরবর্তী এলাকায় বদলি করা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রকল্প পরিচালকের ঘনিষ্ঠ ও সহযোগীদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণেই কৃষি বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী তাকে ‘গুপ্ত শফিক’ নামে অভিহিত করছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প নিয়ে একাধিক অডিট আপত্তি ও লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অভিযোগকারীদের ধারণা, মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও প্রভাবের কারণে এসব অভিযোগ কার্যকর তদন্তের মুখ দেখেনি। তবে এ দাবির স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ৪ আগস্ট ২০২৪ সালে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে আন্দোলনকারীদের দমনে শফিকুল ইসলাম সক্রিয় ছিলেন। তাদের ভাষ্য, পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর তিনি নিজেকে ছাত্রদলের ত্যাগী ও বঞ্চিত কর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং বিএনপির নাম ব্যবহার করে মন্ত্রণালয় ও বিএডিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে নেই।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একটি টেন্ডারে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত আরোপ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার দাবি করেন, এমন শর্ত আরোপের ফলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারই সুবিধা পাবেন। তার ভাষ্য, বিগত ১৫ বছরে রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে অনেক ঠিকাদার কাজের সুযোগ পাননি, ফলে নতুন শর্ত প্রতিযোগিতা সীমিত করতে পারে। একই সঙ্গে কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, ঊর্ধ্বতন মহলকে ম্যানেজ করার কথা বলে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে নেই।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ সীমিত সংখ্যক পরিচিত ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ কারণে প্রকল্পের টেন্ডার বাণিজ্যের অনেক বিষয় প্রকাশ্যে আসে না।

সম্প্রতি বিএডিসির প্রকৌশলীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিএনপির নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ থাকলেও নির্বাচনে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থিত প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে তারা দাবি করেন।

ডাল ও তেলবীজ উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অনিয়মের এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন, টেন্ডার প্রক্রিয়া, অর্থ ব্যয় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।




২১ কোটি টাকার সম্পদ আড়াই কোটিতে বিক্রির অভিযোগ, গৃহায়নের প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদকে ঘিরে প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মিরপুর হাউজিং এস্টেটের ১৪ নম্বর সেকশনে অবস্থিত ২১টি চারতলা পুরাতন ভবনের নিলামকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মিরপুর গৃহসংস্থান বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়ে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।

আবেদনকারী দলিল হোসেনের অভিযোগ, ২০২৬ সালের ৯ জুলাই দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও একই দিন সকাল ১১টার মধ্যেই নিলাম কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।

ফলে দেশের বিভিন্ন জেলার আগ্রহী ব্যবসায়ীরা নিলামে অংশগ্রহণের সুযোগ পাননি। তার দাবি, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর অংশগ্রহণকারীদের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার কথা থাকলেও এ ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি।

আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সংশ্লিষ্ট ২১টি ভবনের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২১ কোটি টাকা হলেও সেগুলো মাত্র আড়াই কোটি টাকায় নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে বলে তিনি বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছেন। অভিযোগকারী দাবি করেন, এ তথ্য সঠিক হলে সরকার প্রায় ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

এ ঘটনায় নিলাম প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগকারী পুরো নিলাম বাতিল করে পুনরায় উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে নিলাম আয়োজনের দাবি জানান।

একই সঙ্গে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।