যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ঘিরে তোলপাড়: পরিচালক এম এ আখের ও সহযোগী মাসুদ আলমকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির ঝড়

বিশেষ প্রতিবেদকঃ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসন পরিচালক এম এ আখের এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মাসুদ আলমকে নিয়ে নানা ধরনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে আছে দুর্নীতি, অর্থ লেনদেনে অনিয়ম, নিয়োগে পক্ষপাত, এমনকি বিদেশে অর্থ পাচারের মতো বিষয়ও। অভিযোগগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত না হলেও অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে স্পষ্ট অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি—এম এ আখের দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে অধিদপ্তরের প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজের হাতে আটকে রেখেছেন। শুধু প্রশাসন পরিচালক হিসেবেই থেমে থাকেননি, একই সময়ে দুইটি ভিন্ন প্রকল্পের প্রজেক্ট ডিরেক্টরের দায়িত্বও ধরে রেখেছিলেন, যা অনেকের কাছে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—কীভাবে একজন ব্যক্তি এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদে একসঙ্গে থাকতে পারেন?

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি হচ্ছে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন। ‘ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ প্রকল্পে দুই দফায় মোট ৪৮ কোটি টাকা মাসুদ আলমের প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে তোলা হয়েছে—এমন দাবি করছে অভ্যন্তরীণ সূত্র। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, দুর্নীতির সন্দেহে মাসুদ আলম, তার স্ত্রী ও পরিবারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আগে থেকেই দুদক ও বিএফআইইউ দ্বারা ফ্রিজ করা ছিল। তবুও সেই হিসাব থেকে কোটি টাকা কীভাবে তোলা হলো—এই প্রশ্নে অনেকেই বিস্মিত।

প্রকল্পের কর্মীরা জানিয়েছেন, ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালীদের সহযোগিতা ছাড়া এমন ঘটনা সম্ভব নয়। তাদের ভাষায়, “হিসাব ফ্রিজ থাকা অবস্থায় টাকা তোলার ঘটনা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।”

এছাড়া তোলা টাকা কার কাছে গেছে—এই নিয়ে আরও বড় ধরনের অভিযোগ ঘোরাফেরা করছে। কিছু সূত্র বলছে, এই অর্থের একটি অংশ নাকি পলাতক সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এবং কারাগারে থাকা সাবেক সচিব মেজবাহ উদ্দিনের কাছে পৌঁছেছে। তবে এ ধরনের অভিযোগ এখনো কোনো তদন্তে সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি।

ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়েও অভিযোগ আছে। এম এ আখের কখনো সরকারের এক নেতার নাম, কখনো আবার বিএনপি মহাসচিবের নাম ব্যবহার করে নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছেন—এমন কথাও বহু কর্মকর্তা বলেছেন। এতে অধিদপ্তরের ভেতরে একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পান না।

নিয়োগ, বদলি, চুক্তিভিত্তিক চাকরি—এসব ক্ষেত্রেও নাকি অনিয়ম চলছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ আর টাকার লেনদেনই সবকিছু নির্ধারণ করে। অধিদপ্তর নাকি তরুণদের উন্নয়নের জায়গা না হয়ে কয়েকজনের জন্য ‘টাকা আয় করার ক্ষেত্র’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবশেষে বলা হয়, এই বিষয়ে এম এ আখের বা মাসুদ আলমের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের মন্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।




গুলশানের ‘চেয়ারম্যান বাংলো’ সংস্কার: ৩০ লাখের কাজ কীভাবে উঠলো ২ কোটির ওপরে—তদন্তে বেরিয়ে এলো লুকানো অনিয়মের স্তর

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকার গুলশান-৬ নম্বর সড়কে রাজউক চেয়ারম্যানের সরকারি বাসভবন, যেটি ‘চেয়ারম্যান বাংলো’ নামে পরিচিত—সেই ভবনের সংস্কারকাজ নিয়ে অবিশ্বাস্য সব অনিয়ম বেরিয়ে এসেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তদন্তে। শুরুতে এই সংস্কারের ব্যয় ধরা হয়েছিল মাত্র ৩০ লাখ টাকা; কিন্তু কোনো ঘোষণা-পর্ব বা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই সেই খরচ একসময় গিয়ে দাঁড়ায় দুই কোটি ১৬ লাখ টাকায়। অর্থাৎ অনুমান করা টাকার প্রায় সাত গুণ বেশি। বিস্ময়ের বিষয় হলো—এতো বড় ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও রাজউকের নিজস্ব তদন্ত কমিটি নাকি অনিয়মের ছায়াও খুঁজে পায়নি।

মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে—চেয়ারম্যান বাংলোর প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর দরপত্র আহ্বান করা হয়। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র ছাড়া সরকারি কাজ শুরু করা যায় না। কিন্তু এখানে পুরো উল্টোটা হয়েছে। যেন কাজ শেষ হওয়ার পর আনুষ্ঠানিকতার অভিনয় করা হয়েছে। নকশা ছিল না, প্রাক্কলন অনুমোদন ছিল না, ঠিকাদার নির্বাচনের নিয়ম মানা হয়নি, তারপরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই) এবং মেসার্স নিয়াজ ট্রেডার্স খুব স্বাভাবিকভাবেই কাজ চালিয়ে গেছে। এনডিই নিজেই মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে যে তারা এই বাংলোয় শ্রমিক পাঠিয়েছে—যা রাজউকের তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

তদন্তে অনিয়মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত হিসেবে যাদের নাম উঠে এসেছে, তারা হলেন রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. ছিদ্দিকুর রহমান (সম্প্রতি মারা গেছেন), প্রধান নগর স্থপতি মোস্তাক আহমেদ এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাহাত মুসলেমীন। তদন্ত কমিটির মতে, এদের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া এভাবে নিয়ম লঙ্ঘনের পর নিয়ম সাজিয়ে নেওয়া সম্ভবই ছিল না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—যখন নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কাইছার অনিয়মগুলো লিখিতভাবে জানান, তখনই পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। অভিযোগ ওঠে যে সাবেক চেয়ারম্যান তাঁর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেন, এবং শেষ পর্যন্ত কাইছারকে সেই চিঠি প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য করা হয়। একজন সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যখন নিয়মভঙ্গের কথা বলায় চাপে পড়ে মুখ বন্ধ করেন, তখন বুঝে নেওয়া কঠিন নয় যে ভেতরে কী ধরনের ক্ষমতার প্রভাব কাজ করেছে।

রাজউকের নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদন ছিল সাত দিনের একটি চটজলদি প্রক্রিয়া, যেখানে বলা হয়—সবকিছু নাকি নিয়ম মেনেই হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের স্বাধীন তদন্ত টানা দুই মাস সময় নিয়ে বিপরীত ছবি তুলে ধরে: কাজ শুরু হয়েছে অনুমতি ছাড়া, নকশা ছাড়াই দর দরপত্রের আগেই ঠিকাদারকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, পরে প্রাক্কলন বানিয়ে অনুমোদনের নাটক করা হয়েছে। এমনকি প্রথমে প্রাক্কলন বানানো হয় দুই কোটি ৮৫ লাখ টাকায়, পরে চাপের মুখে তা কমিয়ে দুই কোটি ১৬ লাখ টাকায় নামানো হয়—যাতে কাগজে-কলমে দেখানো যায় যে প্রক্রিয়া বুঝি ঠিক ছিল।

সবশেষে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় শাস্তিমূলক কোনো ব্যাবস্থা না দেখে অভিযোগকারীরা আরও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বরং ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—যা অনেকের কাছে ‘দায়ী বাঁচানোর কৌশল’ হিসেবেই মনে হয়েছে। রাজউকও কেবল দু’জন কর্মকর্তাকে শোকজ করে দায় সেরে ফেলেছে।

এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক জহিরুল ইসলাম খান বলেন—তারা যা পেয়েছেন, রিপোর্টে দিয়েছেন, ব্যবস্থা নেওয়া মন্ত্রণালয় ও রাজউকের কাজ। অন্যদিকে রাজউকের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের সদস্য ড. মো. আলম মোস্তফা দাবি করেন—তারা নাকি এখনো কোনো নির্দেশনা পাননি। সচিব মো. নজরুল ইসলামের সঙ্গেও যোগাযোগ করা গেলেও তিনি কোনো মন্তব্য দেননি।

পুরো ঘটনা মিলিয়ে রাজউক চেয়ারম্যানের বাংলো সংস্কার এখন ঢাকা প্রশাসনিক অঙ্গনে বড় আলোচনায়। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন খুব সহজ—একটি সরকারি বাড়ির সংস্কারেই যদি এতো অস্বচ্ছতা থাকে, তাহলে আরও বড় প্রকল্পগুলোর হিসাব-নিকাশ কতটা স্বচ্ছ তা কি কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে?




গণপূর্তে সিন্ডিকেট আর সম্পদের অভিযোগ — প্রকৌশলী উজির আলী ও প্রকৌশলী কাজী মাশফিক প্রশ্নবিদ্ধ

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরকে বহুদিন ধরেই অভিযোগ আর অবিশ্বাসের চোখে দেখা হচ্ছে। সরকারি প্রকল্প করাবেই না, তা নয়—অভিযোগ করছে অনেকে, এখানে বড় ধরনের ঠিকাদার সিন্ডিকেট, কমিশন-ব্যবহার আর ক্ষমতার অপব্যবহারেই কাজ চলছে। গতকালের রাজনৈতিক ছায়ায় এই দপ্তরটি এমন এক সংকীর্ণ গ্রুপের হাতে চলে গেছে বলেই অনেকের দাবী। সেই তালিকার দুই নাম—তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. উজির আলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী মাশফিক আহমেদ—সবসময় সামনে আসে। এখন তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো পুনরায় আলোচনায় এসেছে এবং জনগনের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে যে, ঠিকাদারি কাজ কি সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে না, নাকি কমিশন আর সিন্ডিকেটই প্রধান?

উজির আলী সম্পর্কে অভিযোগগুলো গুরুতর। বলা হয়, গত সতেরো বছরে তিনি ঢাকায় খুব বেশি ছিলেন এবং আজিমপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরীয় দায়িত্ব দীর্ঘদিন ধরে ধরে রেখেছেন; সূত্র বলছে ঢাকার বাইরে মাত্র চার মাস ছিলেন। আজিমপুর জোনে দায়িত্বে থাকার সময় তার নিকটস্থ ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, কমিশন-লেনদেন ও প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে—নামভাবে নুরানী কনস্ট্রাকশনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ও বিভিন্ন প্রকল্পে অস্বচ্ছতা ভুক্তভোগীদের কণ্ঠে শোনা যায়। ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল জাজেস কমপ্লেক্সে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় তার প্রতি দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগও উঠে। কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রকল্পে গোপন একটি তদন্তেও ৩৭ কর্মকর্তার তালিকায় তার নাম ওঠার কথাও সূত্র বলেছে। অতিরিক্ত বিল কেলেঙ্কারিতে (জি কে শামিম কেস) তদন্ত কমিটিতেও তার উপস্থিতি ছিল—অভিযোগ আছে যে ওই কেলেঙ্কারিতে বা ফলস স্বীকারোক্তির মধ্যে তার সম্পর্ক ছিল; উজির আলী এসব কথা অস্বীকার করেন এবং বলেন তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি। আরেকটি বড় অভিযোগ হলো রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের AAP কাজগুলো একেবারে OTM (ওভার দ্য ট্যাবল) পদ্ধতিতে নেয়া; ২০২৩–২৪ অর্থবছরে শতভাগ AAP কাজ OTM করার অনুমতিতেই তার বিরুদ্ধে “তিনগুণ কমিশন” নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্যক্তিগত সম্পদের বিষয়েও বড় ধরনের সন্দেহের কথা বলা হচ্ছে—উত্তরা সেক্টর ১২-এ ছয়তলা বাড়ি, বসুন্ধরা ডি-ব্লকে ফ্ল্যাট, ধানমন্ডির স্টার কাবাব গলিতে ফ্ল্যাট, গাজীপুরে ৫ একর জমি (স্ত্রীর নামে) এবং ব্যাংক লেনদেন-ভিত্তিক “অস্বাভাবিক” রেকর্ড—এসবের কথা বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে। এগুলো সম্পর্কে উজির আলীর নিজের বক্তব্য ছিলো, “আমি কখনো ক্ষমতার অপব্যবহার করিনি। আমাকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাই পালন করেছি।”

অন্য দিকে কাজী মাশফিক আহমেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোও ততটাই মারাত্মক। তেজগাঁও বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দীর্ঘদিনের অবস্থানকে নিয়ে ঠিকাদারদের অভিযোগ—তিনি রাজনৈতিক প্রভাবে একটি অনিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট চালাচ্ছেন। ঠিকাদারদের দাবি, কমিশন না দিলে বিল আটকে রেখে ভবিষ্যৎ কাজ বাতিলের হুমকি দেয়া, কোটেশন জালিয়াতি ও প্রকল্পে ভুয়া মেজারমেন্ট করে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করা—এসবই তাদের অভিযোগের তালিকার শীর্ষে। সাংবাদিক বা অভ্যন্তরীণ সূত্রে বলা হয়, তিনি ঠিকাদার নিয়োগে গোপন নিয়ন্ত্রণকারী, কমিশন রেট নির্ধারক এবং প্রতিটি বিল পাসে ‘কাট’ নির্ধারণের ক্ষমতাও প্রয়োগ করেছেন—ফলত: কাজ না করেও ভুয়া বিল পাশ হয়ে গেছে এমন অভিযোগও আছে। আর ব্যক্তিগত সম্পদের দিক থেকেও তাকে নিয়ে প্রশ্ন ওঠে—রাজধানীতে একাধিক বাড়ি ও ফ্ল্যাট, বিলাসবহুল গাড়ি, বিভিন্ন জেলায় জমি এবং ব্যাংক লেনদেনে কোটি কোটি টাকার অস্তিত্বের কথাও শোনা যায়; এমনকি বিদেশ ভ্রমণে অবৈধ অর্থ ব্যবহার নিয়ে কথাও উঠেছে। অনেক কর্মকর্তা বলছেন, “মাশফিক সিন্ডিকেট থামানো না গেলে গণপূর্তের সুনাম ফেরানো মুশকিল।”

গণপূর্তের ভেতরে কাজ করা সৎ কর্মকর্তা ও বাইরের মানুষের মধ্যে অসন্তোষ দিনের পর দিন বাড়ছে। তারা বলছেন—এখানে ‘কাজ’ গুরুত্বখন্ডিত হয়ে ‘কমিশন’ প্রধান হয়ে গেছে। ঠিকাদাররা ভুক্তভোগী হিসেবে অভিযোগ করেন যে যদি তারা সিন্ডিকেটের নিয়ম মেনে না চলে, তাদের প্রকল্প আটকে দেয়া হয় বা ভবিষ্যৎ কাজ বাতিলের হুমকি দেয়া হয়। ফলে প্রকল্পের মান ও নিরাপত্তা খামতি পায়; উদাহরণ হিসেবে জাজেস কমপ্লেক্সে শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাটি তোলা হচ্ছে, যেখানে নিরাপত্তার সরঞ্জাম না দেয়ার অভিযোগও আছে। অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও গোপন সূত্রে থাকা রিপোর্টগুলোর কথা বিবেচনায় নিয়ে অনেকে মনে করেন এখন বড় কোনো স্বাধীন ও সার্বিক তদন্তের প্রয়োজন — না হলে গণপূর্তের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রতিষ্ঠানগত ভাবমূর্তি ফেরানো সম্ভব হবে না।

সবশেষে, যে কেউ বিশ্বাসঘাতকতা বা দুর্নীতির দায়ে দোষী প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া উচিত—তবে এই প্রতিবেদনে যা তুলে ধরা হয়েছে তা হলো অভিযোগ ও সূত্রের ভিত্তিক বক্তব্য; অভিযুক্তরা এসব অনেক অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাই জনগণ ও নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—স্বচ্ছতা আনা, রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব থেকে মুক্ত করে গণপূর্তকে প্রকৃত অর্থে প্রকৌশলগত কাজ ও জনসেবায় ফেরানো।




গজারিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু আখি সরকার: ক্ষমতা, প্রভাব আর বিতর্কের এক লুকানো অধ্যায়

এসএম বদরুল আলমঃ গজারিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক খাদিজা আক্তার আখি সরকার আবারও আলোচনায়। নিষিদ্ধ ঘোষণা করা আওয়ামী লীগকে পুনরায় সুসংগঠিত করার চেষ্টার অভিযোগে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে—নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া এলাকায় তাঁর কর্মস্থল যমুনা ব্যাংকের অফিস থেকেই তিনি নিয়মিত সাংগঠনিক কাজ পরিচালনা করছেন, যেখানে প্রতিনিয়ত গজারিয়ার বিভিন্ন নেতা-কর্মীদের যাতায়াত লক্ষ্য করা যায়।

আখি সরকারের সঙ্গে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলেও স্থানীয়ভাবে আলোচনা চলছে। দলীয় প্রতীকে তিনি গজারিয়া উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ক্ষমতার শীর্ষে থাকা সময়ে তিনি নিজের একটি সন্ত্রাসী বাহিনীও গড়ে তুলেছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেই সময় উপজেলা পরিষদ নিতান্তই তাঁর একক নিয়ন্ত্রণে ছিল।

অভিযোগ রয়েছে, টি.আর., কাবিখা, বিভিন্ন টেন্ডার—সবকিছুই তাঁর নির্দেশেই পরিচালিত হতো। বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে কোটি কোটি টাকার চাঁদা আদায়ের অভিযোগ আছে তাঁর বিরুদ্ধে। এক সময় সাধারণ অবস্থায় থাকা আখি সরকার ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে রাতারাতি কোটি টাকার মালিক হয়ে ওঠেন বলে স্থানীয়রা দাবি করেন।

গজারিয়ার সবচেয়ে বড় বাজার ভবেরচর বাজারটিও ছিল তাঁর পরিবারের চাঁদাবাজির দখলে। তাঁর ভাই-বোন এবং বাবা আয়নাল মিলেই নাকি ওই বাজারকে চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিলেন। শুধু বাজার নয়—সুপারবোর্ড, পলিক্যাবেলস, বসুন্ধরা গ্রুপসহ এলাকার বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও তাঁর সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বালুমহল থেকেও নিয়মিত মাসোহারা নিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান পদ ব্যবহার করে তিনি যমুনা ব্যাংকে চাকরিও নিশ্চিত করেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গজারিয়া উপজেলার অসংখ্য আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। কিন্তু আখি সরকার সেই সময়েও বহাল তবিয়তে থাকেন। অভিযোগ আছে, তিনি উপরমহলের একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে ম্যানেজ করে নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করেছিলেন।

প্রায় বছরখানেক নীরব থাকার পর সম্প্রতি আবারও তাঁকে সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয় অনেক নেতা অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগকে পুনরায় সংগঠিত করার চেষ্টায় নেমেছেন আখি সরকার।

গজারিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দীর্ঘদিনের ক্ষমতার ছায়ায় থাকা আখি সরকারের এই নতুন কর্মকাণ্ডের পেছনে আসল লক্ষ্য কী? তদন্ত না হলে এসব অভিযোগের সত্যতা হয়তো জানা যাবে না, তবে স্থানীয়দের উদ্বেগ দিনদিন বাড়ছে।




৬৫০০ কোটি টাকার জলবায়ু‑সহনশীল প্রকল্পে পিডি মো. এনামুল কবিরকে ঘিরে জমেছে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার আর অর্থ লোপাটের অভিযোগ।

এসএম বদরুল আলমঃ এই মুহূর্তে আলোচনায় রয়েছে ৬,৫০০ কোটি টাকার জলবায়ু সহনীয়তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ক্ষুদ্র পানি সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক (পিডি) মো. এনামুল কবির দীর্ঘ সময় ধরেই ব্যক্তিগতভাবেই এই প্রকল্পকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। প্রায় ৫০০ জন আউটসোর্সিং কর্মী ও কনসালট্যান্ট নিয়োগ, বিলাসবহুল অফিস, ভুয়া বিল — সবকিছু মিলিয়ে এই প্রকল্প এক ধরনের “ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য”তে পরিণত হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়োগের জন্য যারা নেয়া হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই এনামুল কবিরের আত্মীয়-স্বজন বা ঘনিষ্ঠ। প্রতিটি পদে নিয়োগের সময় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া গেছে। একাধিক স্বজন–নিয়োগ, প্রতিযোগিতা ছাড়াই কাজ পাওয়ার ঘটনা, মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে — প্রশ্ন, এই টাকা কোথা থেকে এল?

অধিক উদ্বেগজনক হলো — অফিসের দৃষ্টিকোণ থেকে। অফিসকে সাজানো হয়েছে রাজকীয় স্টাইলে; বিলাসবহুল ফার্নিচার, প্রিপেইড বিল, ডেকোরেশনের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ, কিন্তু সংশ্লিষ্ট কোনো নথি জনসমক্ষে দেখা যায় না। বিল দেখানোর প্রয়োজন হলে ভুয়া বিল বা ভাউচার দেখানো হয় বলে অভিযোগ।

এলজিইডির নিজস্ব বড় ভবন থাকা সত্ত্বেও কেন নতুন অফিস ভাড়া নেওয়া হয়েছে — সেটাও প্রশ্নের মুখে। ভাড়া নেওয়া হয়েছে রাজধানীর শেওড়াপাড়ায়, আগোরা ভবনে, যা “কমার্শিয়াল স্পেস” হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু অফিস ভাড়া ও পরিচালনার জন্য কেন অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সব সাজানো হয়েছে — তারও সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি এনামুল বা সংশ্লিষ্ট কেউ।

তবে অভিযোগ শুধু অর্থ লোপাট এবং স্বজন চিনে চাকরি দানে সীমাবদ্ধ নয়। বলা হচ্ছে, এনামুল কবিরের বড় ভাইয়ের নামে করা হয়েছে অর্থ লেনদেন। দুই ভাই মিলে কিনেছেন শত শত বিঘা জমি; গ্রামের বাড়ি থেকে শুরু করে নতুন করে তৈরি হয়েছে রাজকীয় একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি। এমন ভাবা হচ্ছে, স্বাভাবিক বেতনের চেয়ে অনেক গুণ বেশি সম্পদ গড়েছেন তারা — কিন্তু তার উৎস কি?

অফিজিয়াল অভিযোগ হলো, অফিস পরিচালনায় নিয়োজিত রয়েছে পিএল এমন এক ব্যক্তি, ফরিদ — যিনি প্রকল্প বা সরকারের কোনো অফিসার নন। তারপরও অফিস ব্যবস্থাপনা, কেনাকাটা, রক্ষণাবেক্ষণ — সব দায়িত্ব তার হাতে। সন্ধ্যার পর অফিসে অতিথি, রাতভর আড্ডা; পৃথক একটি কক্ষ রয়েছে তার জন্য। এমনকি বেশ কিছু দিন হয়, সমাজের সচেতন মানুষ বা সাংবাদিকরা চেষ্টা করে অফিসে যাওয়ার — কিন্তু হয় না। অফিসে আছে তিন স্তরের নিরাপত্তা ফটক, এবং প্রবেশাধিকার পাওয়া যায় শুধুই এনামুল কবিরের অনুমতিতে। নিরাপত্তাকর্মীদের আচরণ এমন — “মাস্তানসুলভ” — যে, কোনো সাংবাদিক বা সাধারণ মানুষ সেখানে যাওয়ার সাহস পান না। অনেকেই বলছেন, প্রকল্প অফিসে ঢুকতে পারা এমন যেন কোনো মন্ত্রণালয়ের সচিব বা মন্ত্রীর অফিসে ঢোকার সমান ঝামেলার।

এই অভিযোগগুলো শুধু গঞ্জন নয়। ২৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে, মোহাম্মদ শামীম বেপারী স্বাক্ষরিত চিঠি (নং ৪৬.০০.০০০০.০৬৮.৯৯.০৭১.২৪‑১০৮৭) জারির মাধ্যমে ৩ দিনের মধ্যে তথ্য প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, বিষয়টি এখন সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এই নিয়ে শুধু সাম্প্রতিক নয় — আগেও এনামুল কবিরকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যখন তিনি পূর্বে সিলেটে নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন, সেসময়েও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। পরবর্তীতে LGED‑র প্রধান প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমান‑র অধীনে স্টাফ অফিসার ছিলেন এনামুল — তৎকালীন সময়েও ভুয়া বিল এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকত।

কিন্তু ২০২৩–২৪ অর্থবছরে শুরু হওয়া এই জলবায়ু‑প্রকল্পে পিডি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে আমূল বদলে গেছে পরিস্থিতি। প্রকল্পকে বলা হচ্ছে এখন পিডির ‘ব্যক্তিগত দলে’ পরিণত — নিয়োগ, অর্থের লেনদেন, অফিস পরিচালনা, আর অফিসের হালচাল সবকিছু তার নিজের নিয়ন্ত্রণে।

সংবাদচেষ্টায় গিয়ে যখন এ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, এনামুল কবিরকে পাওয়া যায়নি। বরং, তিনি সাংবাদিককে জানিয়েছিলেন — “আমি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই”। এবং দেওয়া হয়েছে — “দেখে নেওয়ার” হুমকি। এমন আচরণ সামাজিকভাবে আবারও প্রমাণ করলো — শুধু অনিয়ম নয়, ভয়ভীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহার তাঁর সাধারণ হাতিয়ার।

এখন প্রশ্ন হলো — একজন সাধারণ ফরিয়া‑ব্যবসায়ীর ঘর থেকে উঠে আসা মানুষ কীভাবে গড়েছেন এমন বিশাল সম্পদ? কীভাবে নিয়োগ দিয়েছেন স্বজনকে, নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা ঘুষ, সাজিয়েছেন বিলাসবহুল অফিস, নিয়েছেন হেলিকপ্টারে যাতায়াত, এবং গড়েছেন নিজের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য?

সরকার ইতোমধ্যেই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে, এবং অফিস ডেকোরেশন, জনবল নিয়োগসহ অন্যmany অনিয়মের বিষয়ে শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন কোন তথ্য পাওয়া গেলে, বিষয়টি হয়তো আদালত বা তদন্ত কমিটিতে যেতে পারে।

এই মুহূর্তে, প্রকল্পের সঠিক হিসাব, নিয়োগ‑ভেন্ডরদের তালিকা, বিল ও ভাউচার — এগুলো জনসমক্ষে না আসা পর্যন্ত, অনেক প্রশ্নই থেকে যাবে। আর গ্রামের সেই সাধারণ একজন ফরিয়া‑ব্যবসায়ীর সন্তান থেকে “নতুন জমিদার” হওয়া — এ ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি শাসন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা, আর দায়বদ্ধতার বিরুদ্ধে বড় চ্যালেঞ্জ।




ডিপিডিসির তিন প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে তোলপাড়, তদন্তে নেমেছে দুদক

এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি—ডিপিডিসিকে ঘিরে এবার বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির অন্তত তিনটি বড় প্রকল্পে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা অনিয়ম ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ উঠতেই ডিপিডিসিতে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অনেকে নাকি চাকরি হারানো বা শাস্তির ভয়েই দিনরাত দুশ্চিন্তায় আছেন। এমনকি কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও ডিপিডিসির ভেতরের সূত্র জানিয়েছে।

দুদক তিন সদস্যের একটি দলকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে। গত ৫ মে দুদকের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম ডিপিডিসিকে চিঠি দিয়ে তিনটি প্রকল্পের সব নথি—দরপত্র, বিল, চুক্তিপত্র, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, চালানসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ১৪ মে-র মধ্যে জমা দিতে বলে। পরে ডিপিডিসি সাত দিনের অতিরিক্ত সময় চায়, যা শেষ হওয়ার কথা ২১ মে।

যে তিনটি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এই হৈচৈ—
১) পিডিএসডি প্রকল্প (বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন)
২) স্মার্ট মিটার ও উন্নত মিটারিং অবকাঠামো
৩) জিটুজি প্রকল্প (বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ)

দুদকের চিঠিতে বলা হয়েছে, জিটুজি প্রকল্পের তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক ফজিলাতুন্নেসা, আরও কয়েকজন কর্মকর্তা এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু–এর সহায়তায় প্রকল্পে নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করা হয়েছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ইউরোপ থেকে যন্ত্রপাতি আনার কথা থাকলেও আসলে সেসব পণ্য আনা হয় চীন থেকে, অনেক কমদামে। অথচ কাগজপত্রে দেখানো হয় উচ্চমূল্য। এতে প্রকল্পের অর্থ বিদেশে পাচারের সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে।

ডিপিডিসির একাধিক সূত্র দাবি করেছে, নসরুল হামিদ বিপুর ঘনিষ্ঠ একজন ব্যবসায়ীকে সুবিধা দিতে ইউরোপের নাম ব্যবহার করে দরপত্র দেওয়া হলেও যন্ত্রপাতি চীন থেকেই আনা হয়। তারা আরো বলেন, প্রকল্পগুলোর মধ্যে কিছু ছিল এমন, যেগুলোর বাস্তব প্রয়োজনই ছিল না; শুধু কমিশন ও ব্যক্তিগত সুবিধার আশায় এসব নেওয়া হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়া নাকি অনেক ক্ষেত্রেই ঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি। টার্নকি ভিত্তিতে কাজ দেওয়ার পরও বাস্তবে নানান ত্রুটি ছিল।

আরও অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময় ডিপিডিসি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা—যাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দুই মুখ্য সচিব আহমেদ কায়কাউস ও আবুল কালাম আজাদ, ডিপিডিসির সাবেক দুই এমডি, জিটুজি প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক মাহবুবুর রহমানসহ কিছু প্রভাবশালী প্রকৌশলী—এই অনিয়মে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা।

ডিপিডিসির কয়েকজন সাধারণ প্রকৌশলী জানান, জিটুজি প্রকল্প আসলে ডেসকোতে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। সে সময়কার প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বেশ চাপ প্রয়োগ করেছিলেন বলেও তাদের দাবি। কিন্তু ডেসকো গ্রহণ না করায় শেষ পর্যন্ত এটি ডিপিডিসির উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। প্রকৌশলীরা বলেন, কাগজে-কলমে এই প্রকল্পের অনেক কাজকে জনস্বার্থের বলে দেখানো হলেও বাস্তবে তেমন প্রয়োজন ছিল না। একটি দরিদ্র দেশের জন্য এই ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্প অযৌক্তিক বলেই তারা মনে করেন।

তাদের অভিযোগ—প্রকল্পটি মূলত নেওয়া হয়েছিল নানা ধরনের লুটপাটের সুযোগ তৈরি করতে। রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহল, আমলা এবং প্রকল্পে যুক্ত কিছু কর্মকর্তা নাকি এই সুযোগে মোটা অঙ্কের টাকা বানিয়েছেন।

দুদক জানিয়েছে, অভিযুক্ত বর্তমান ও সাবেক অনেক কর্মকর্তা এখন গোয়েন্দাদের নজরদারিতে রয়েছেন।

ডিপিডিসির পক্ষ থেকে তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা হয়নি। প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিষয়টি খুবই সংবেদনশীল। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্দেশ না দিলে এ বিষয়ে আমরা মন্তব্য করতে পারি না।”

এই অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, বিশ্লেষকদের মতে এটি বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি বড় কেলেঙ্কারি হিসেবে ধরা পড়বে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে জিটুজি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।




গণপূর্তের প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানকে ঘিরে সম্পদ ও প্রকল্প–অনিয়মের অভিযোগে তোলপাড়

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল সার্কেল–৩-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানকে ঘিরে নানা ধরনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা দাবি করছেন—তার জীবনযাপন, সম্পত্তি আর আর্থিক লেনদেন তার সরকারি বেতন–ভাতার সঙ্গে কোনোভাবেই মিলছে না। তাদের মতে, তিনি যত সম্পদের মালিক হয়েছেন, তার অনেকটাই “স্বাভাবিক আয়ের উৎস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।”

অভিযোগে বলা হয়, ঢাকার মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে প্রায় ৩৫০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, পশ্চিম আগারগাঁওয়ের ৬০–ফিট রোডের মাথায় চারতলা একটি ভবন, এবং বনশ্রী আমুলিয়া এলাকায় জমি—এসব সম্পত্তির মালিকানা তার নামে বা তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষায়, একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নিয়মিত বেতনে এত বড় সম্পদ গড়ে তোলা “বাস্তবে সম্ভব নয়।”

শুধু সম্পদই নয়, প্রকল্প সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ই/এম সার্কেল–৩ এর কিছু প্রকল্পে বিল পরিশোধ, সরঞ্জাম কেনা, কাজের মান যাচাই আর টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। তাদের একজন উল্লেখ করেন যে, একটি প্রকল্পে ১৭ কোটি ৮ লাখ টাকার বেশি বিল প্রক্রিয়ায় অনিয়ম পাওয়া গেছে বলে তাদের নথিতে দেখা যায়।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিছু অভ্যন্তরীণ সূত্রের কথায়ও একই ধরনের অভিযোগ শোনা যায়। তাদের দাবি—মাহবুবুর রহমান কিছু ঠিকাদারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতেন, কোন ঠিকাদার কাজ পাবেন বা বাজেট কীভাবে সমন্বয় হবে—এসব বিষয়ে তিনি অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ রাখতেন। এমনকি সরকারি যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের টাকা ব্যক্তিগতভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ এসেছে।

একজন সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—এ ধরনের অভিযোগ খুবই গুরুতর, এবং প্রাথমিক তথ্য মিলে গেলে অবশ্যই তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি ক্ষমতা অপব্যবহার বা আর্থিক কারসাজি প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, কোনো সরকারি কর্মচারীর আয়–ব্যয়ের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেলে তারা প্রথমে প্রাথমিকভাবে যাচাই করেন, এরপর প্রয়োজন হলে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে বলেও তিনি জানান।

অন্যদিকে, এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে মাহবুবুর রহমানের সরকারি নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে অনেকদিন ধরেই গুঞ্জন ছিল যে, প্রকল্প অনুমোদন, টেন্ডার বণ্টন, বিল প্রক্রিয়াকরণ—এসব জায়গায় তিনি প্রভাব খাটান। অনেকে ভয়ের কারণে প্রকাশ্যে কিছু বলেন না, তবে গোপনে তথ্য দিচ্ছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

সর্বশেষ প্রশ্নটি এখনো সবার মুখে—তার সম্পদের প্রকৃত উৎস কী? অভিযোগকারীদের মতে, তার সম্পত্তির পরিমাণ এখন “শত কোটি টাকার কাছাকাছি” হতে পারে, যার কোনো স্বচ্ছ উৎস তাদের কাছে পরিষ্কার নয়।

এই অভিযোগগুলো এখন গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে ও বাইরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অভিযোগগুলো সত্য কিনা, তা তদন্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়। মাহবুবুর রহমানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।




নভেম্বরে নারী-শিশুসহ নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার ১৮১ জন

ডেস্ক নিউজঃ ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে নারী ও শিশুসহ মোট ১৮১ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২৯ জন কন্যাশিশু ও ১৬ জন নারীসহ মোট ৪৫ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

সংস্থাটি জানায়, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদে সংরক্ষিত ১৫টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এ পরিসংখ্যান উঠে আসে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্যাতনের শিকার এসব নারী ও কন্যাদের মধ্যে ১৯ জন কন্যাসহ ২৮ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ৯ জন কন্যাসহ ১৪ জন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের পরে হত্যার শিকার হয়েছে ১ জন কন্যাসহ ৩ জন। এছাড়াও ৫ জন কন্যাসহ ৭ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

বিভিন্ন কারণে ৭ জন কন্যা ও ৪৬ জন নারীসহ মোট ৫৩ জন হত্যার শিকার হয়েছে, এরমধ্যে ৪ জন কন্যা ও ২১ জন নারীসহ ২৫ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। ৯ জন কন্যা ও ৫ জন নারীসহ ১৪ জন আত্মহত্যার শিকার হয়েছে, এরমধ্যে আত্মহত্যার প্ররোচনার শিকার হয়েছে ২ জন কন্যাসহ ৩ জন। যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে ৮ জন কন্যা ও ৩ জন নারীসহ মোট ১১ জন, এরমধ্যে ৭ জন কন্যাসহ ৯ জন যৌন নিপীড়নের শিকার, ১ জন কন্যাসহ ২ জন উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছে।

এসিডদগ্ধের শিকার হয়েছে ১ জন কন্যাসহ ২ জন। অগ্নিদগ্ধের শিকার হয়েছে ৩ জন নারী। ৬ জন কন্যাসহ ৭ জন অপহরণের ঘটনার শিকার হয়েছে। পাচারের শিকার হয়েছে ৬ জন কন্যাসহ ১২ জন।

শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩ জন কন্যাসহ ১৩ জন। ফতোয়া ঘটনার শিকার হয়েছে ১ জন। বাল্যবিবাহের চেষ্টা করা হয়েছে ১ জন কন্যার। যৌতুকের কারণে হত্যার শিকার হয়েছে ৪ জন নারী। এছাড়াও ৫ জন কন্যাসহ ৮ জন  বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে।




দুই বছরে শত কোটি টাকার সম্পদ–বিস্তার! তেজগাঁও গণপূর্তের ‘অঘোষিত সম্রাট’ জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে টেন্ডার ও বিল–বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ তেজগাঁও গণপূর্ত বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (ইএম) জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে একের পর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠে আসছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য—সরকারি দপ্তরের দায়িত্বে মাত্র দুই বছরেই তিনি নাকি গড়ে তুলেছেন “শত কোটি টাকার অঘোষিত সাম্রাজ্য।” নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও তিনি বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন—এমন দাবি করেছে একাধিক সূত্র। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে একটি প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলেও জানা গেছে।

জিগাতলা প্রকল্প, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গ্লাস টাওয়ার এবং রায়েরবাজার বদ্ধভূমি প্রকল্প—এসব কাজকে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, জিগাতলায় ১,০০০ বর্গফুটের দুটি ভবনের প্রায় ৮ কোটি টাকার প্রকল্পে ঠিকাদার মাহবুব কনস্ট্রাকশনের সঙ্গে নাকি হয় আঁতাত। প্রকৃত কাজ অর্ধেকেরও কম সম্পন্ন হলেও বিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে পুরোপুরি, এমনকি কোথাও কোথাও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ছাড়াই বিল উত্তোলনের অভিযোগও শোনা গেছে। প্রকল্পের কিছু বিল–নথিতে “অদৃশ্য” বা “অনুপস্থিত” স্বাক্ষর দেখা গেছে—যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নজিরবিহীন বলে দাবি করেছেন।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গ্লাস টাওয়ারেও উঠে এসেছে আরেকটি বিতর্ক। অভিযোগকারীরা জানান—এনার্জি গ্লাস কোম্পানির সহযোগিতায় বিশেষ লাইটের দাম বাজারদরের তিনগুণ দেখিয়ে অতিরিক্ত বিল তোলা হয়। শুধু এই প্রকল্পেই প্রায় ৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ দেখানোর অভিযোগ করা হয়েছে। একজন কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেছেন, বাজারে যে জিনিসের দাম ১, প্রকল্পের কাগজে তার মূল্য দেখানো হয়েছে ৩—এবং অতিরিক্ত অর্থের বড় অংশ নাকি গেছে নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের পকেটে।

তবে অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর স্বাক্ষর ছাড়াই বিল প্রক্রিয়া করা, একই ব্যক্তির হাতে প্রাকলন প্রস্তুত ও প্রাকলন যাচাই—এসবকেও বড় ধরনের অনিয়ম হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। জিগাতলা ও রায়েরবাজার প্রকল্প—দুই জায়গাতেই নাকি স্বাক্ষরবিহীন বিলের ঘটনা ঘটেছে। এক প্রকৌশলীর ভাষায়—“স্বাক্ষর আমাদের, টাকা অন্যের।”

নিয়োগ–বাণিজ্য এবং এলাকা–কেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। সূত্রের দাবি, ই/এম বিভাগের উপ–বিভাগ ৩ ও ৪–এ রাজশাহীর একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যেখানে আত্মীয়–স্বজন বা ঘনিষ্ঠদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অর্থের বিনিময়ে। একাধিক কর্মী নাকি কাজ না করেও অতিরিক্ত বেতন পেয়ে আসছিলেন। এমনকি কোথাও কোথাও হিসাবসহকারী বা ‘বড়বাবু’র জায়গায় ঠিকাদারের লোকজন দিয়ে কাজ করানো হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

প্রধান বিচারপতির সরকারি বাসভবনের কাজেও নিন্মমান, দেরিতে সরবরাহ এবং ভুল মালামাল দেওয়ার কারণে উচ্চপর্যায়ের ক্ষোভের সৃষ্টি হয়—এমনটাও দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের মতে, এর ফলেই শেষ পর্যন্ত জাহাঙ্গীর আলমকে বদলি করা হয়।

এছাড়া ২০১২–১৬ সালে বিআইডব্লিউটিএতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিয়মিত ডিউটিতে না গিয়েও বেতন নেওয়ার অভিযোগও আবার সামনে এসেছে। একই সময় তার সম্পদ দ্রুত বাড়তে থাকে বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয়—জাহাঙ্গীর আলম ও তার পরিবার–ঘনিষ্ঠদের সম্ভাব্য সম্পদ। অভিযোগ অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরে আলিশান বাড়ি, কুয়াকাটা ও কক্সবাজারে রিসোর্ট বা ফ্ল্যাট, গ্রামের বাড়িতে বহু বিঘা জমি, মিরপুরে ৬ তলা বাড়ি, বসুন্ধরা আবাসিকে ৫ কাঠার ৩টি প্লট, পশ্চিম মনিপুরের মোল্লাপাড়ায় বাড়ি (বাসা নং–৮৯), উত্তরা সেক্টর–১৩–তে স্ত্রী–নামে ফ্ল্যাট (২য় ও ৩য় তলা), স্ত্রীর নামে কোটি টাকার এফডিআর, শাশুড়ীর নামে সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেন এবং একটি ব্র্যান্ড–নিউ লেক্সাস হ্যারিয়ার গাড়ির মালিকানা সম্পর্কিত অভিযোগ ইতোমধ্যে দুদকের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে বলে জানা গেছে।

এদিকে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। অভিযোগকারীরা বলছেন, গত জুলাইয়ে রাজশাহীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে তিনি স্থানীয় একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা দেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা তার বিরুদ্ধে মিছিলও করে।

দুদক সূত্র জানায়, সব অভিযোগ যাচাই করে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে জিজ্ঞাসাবাদ, সম্পদ জব্দ এবং মানি–ট্রেইল অনুসন্ধানসহ সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। সচেতন মহল বলছে—এতসব গুরুতর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া ন্যায়বিচার সম্ভব নয়।সব মিলিয়ে, জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে যে বিস্তৃত অভিযোগের চিত্র উঠে এসেছে—তা শুধু একজন ব্যক্তির নয়, বরং একটি বড় সিন্ডিকেটের সম্ভাব্য নেটওয়ার্ককেও ইঙ্গিত করছে। সত্যতা প্রমাণিত হলে এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে নানা মহলে।




ঘুষ, নিম্নমানের সরঞ্জাম আর গোপন ব্যবসা—গণপূর্তের কর্মকর্তা মালিক খসরুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল শাখার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) মালিক খসরুকে ঘিরে অনেক দিন ধরেই নানা অভিযোগ ঘুরছে অফিসের ভেতরে। সহকর্মীরা ব্যঙ্গ করে তাকে “মালের খসরু” বলে ডাকেন। কারণ, অভিযোগ আছে—তিনি সরকারি পদে থেকেও টাকা-পয়সার দিকে অতিরিক্ত ঝোঁক দেখান এবং সুযোগ পেলেই সুবিধা নেন।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি, মালিক খসরু বহু বছর ধরে ঢাকাতেই গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে কাজ করছেন। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী একজন কর্মকর্তাকে বারবার একই এলাকায় রাখার নিয়ম নেই। কিন্তু তার ক্ষেত্রে নাকি অনেক নিয়মই আলাদা ভাবে কাজ করেছে। অভিযোগ আছে—একজন প্রভাবশালী সাবেক প্রধান প্রকৌশলী, শামীম আখতারের ঘনিষ্ঠ “মুরীদ” হওয়ায় তিনি এমন সুবিধা পেতেন।

অধিদপ্তরের ভেতরের লোকজন বলেন, শামীম আখতারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে খসরু নিজের পদোন্নতি, পদায়নসহ নানা সুবিধা নিতেন। শোনা যায়, এমন সম্পর্কের কারণেই তিনি ই/এম শাখার লোভনীয় পদগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে থেকে গেছেন।

সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে ঢাকা আজিমপুর সরকারি আবাসিক কোয়ার্টারের বহুতল ভবন ও কার পার্কিং প্রকল্প নিয়ে। খসরু এখানে ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজ তদারকির দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ আছে—প্রকল্প চলাকালীন সময় ঠিকাদারদের কাছে বিভিন্ন অজুহাতে কমিশন দাবি করতেন। যেমন—ফাইল আটকে রাখা, রিপোর্টে সাইন না করা বা সাইট ভিজিট প্রয়োজন—এসব দেখিয়ে নাকি তাদের চাপ দিতেন। কিছু ঠিকাদারের ভাষায়, “টাকা ছাড়া তিনি কোনো কাগজ সই করতেন না।”

আরও অভিযোগ আছে—আজিমপুরের কয়েকটি ভবনে যেসব সাবস্টেশন, জেনারেটর, ফায়ার সেফটি বা ইলেকট্রিকাল সরঞ্জাম বসানো হয়েছে, সেগুলোর মান অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল। ঠিকাদারদের দাবি, মালিক খসরু ইচ্ছে করেই কম দামের ব্র্যান্ড অনুমোদন করতেন, কারণ সেখান থেকেই নাকি কমিশন পাওয়া সহজ ছিল। এ কারণে ভবনগুলোর কিছু জায়গায় এখন বিদ্যুৎ সমস্যা, ফায়ার অ্যালার্ম না বাজা বা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে।

অর্থবছর ২০২৪–২৫ এ ছোটো কিছু মেরামত কাজের পাশাপাশি প্রায় ৮ কোটি টাকা মূল্যের সাবস্টেশন ও যন্ত্রপাতি সরবরাহের বড় কাজও ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, এই বড় কাজ থেকেই তিনি ঠিকাদারের সঙ্গে গোপন লেনদেন করে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন।

আরেকটি বড় অভিযোগ হলো—মালিক খসরুর নামে ও তার পরিবার-আত্মীয়দের নামে নাকি বেশ কিছু ব্যাংক হিসাব রয়েছে। গোপন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—ঘুষ নেওয়ার টাকাগুলো এসব হিসাব ব্যবহার করে লেনদেন করা হত। এমনকি, কিছু টাকা বিদেশেও পাঠানো হতো বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। খিলগাঁওয়ে অ্যাপার্টমেন্ট, টাঙ্গাইলে জমি, ডেভেলপার ব্যবসায় সম্পৃক্ততা—এসব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

কিছু ঠিকাদার অভিযোগ করেন, খসরুর সঙ্গে কাজ করতে গেলে তাদের ব্যক্তিগত আপ্যায়ন পর্যন্ত করতে হত—হোটেলে খাওয়ানো থেকে শুরু করে বাইরে ঘোরানো পর্যন্ত। তবুও নাকি তিনি সাইটে গিয়ে নানা কারণে হয়রানি করতেন।

অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন—বেশি প্রভাবশালী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ খুব কম আসে। অভিযোগ এলেও তদন্ত অনেক সময় এগোয় না। কারণ, অভিযোগ এসেছে—উচ্চ পর্যায় থেকে ফোন যায় মামলা বা তদন্ত থামানোর জন্য।

এখন দুদক ও অর্থনৈতিক গোয়েন্দা ইউনিট তার সম্পদের উৎস, ব্যাংক হিসাব ও লেনদেন নিয়ে নজরদারিতে রেখেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর পক্ষে এত সম্পদ অর্জন স্বাভাবিক নয়। তাই প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।