রাজউকের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ: উত্তর কাফরুলে বহুতল নির্মাণ ঘিরে বিতর্ক, ভুক্তভোগীদের আইনি পদক্ষেপের দাবি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর উত্তর কাফরুল এলাকার এজার সিয়া গলি, বাড়ি নং–৫১২-এ একটি বহুতল ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে অবৈধ নির্মাণ, জমি দখল, নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন এবং স্থানীয়দের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘ দেড় বছর ধরে বিভিন্ন সংস্থার নোটিশ ও স্থানীয়দের আপত্তি সত্ত্বেও নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাজ্জাক নামে এক ব্যক্তি, যাকে তারা স্থানীয়ভাবে একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ বলে দাবি করছেন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বিধিমালা অনুসরণ না করেই পনে তিনকাটা জমির উপর (ফাউন্ডেশন) ভবন ১০ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করছেন।

এলাকাবাসীর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্লট-সংক্রান্ত বিভিন্ন সুবিধা নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো সরকারি নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের জোন-৩ (মহাখালী) কার্যালয় থেকে নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়ে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী নির্মাণকাজ শুরুর অন্তত ১৫ দিন আগে নির্ধারিত ফরমের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়নি এবং ভবনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর সাইনবোর্ডও প্রদর্শন করা হয়নি।

এছাড়া, অভিযোগে বলা হয়েছে যে, রাজউক অবৈধ নির্মাণ ঘোষণা করে কেন ভবনটি অপসারণ করা হবে না—সে বিষয়ে মালিকপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলেও তারা সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি এবং নির্দেশনা অনুযায়ী নির্মাণকাজে প্রয়োজনীয় সংশোধনও আনেননি।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, নির্মাণস্থলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় ভবনের ওপর থেকে ইট পড়ে পাশের একটি বাড়ির এক নারী বাসিন্দার চোখে আঘাত লাগে। পাশাপাশি ভবনের চারপাশে অন্যের জমির অংশ দখল করে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

বাসিন্দাদের ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার এলাকার মুরব্বি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সমাধানের উদ্যোগ নিলেও কোনো ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়নি। বরং প্রতিবাদ করলে বিভিন্ন ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে আওয়ামীঃ ফ্যাসিবাদের রাজ্জাক প্রভাবশালী হিসেবে পরিচয় দিয়ে কারও কথা আমলে নেন না এবং সামাজিক বা প্রশাসনিক উদ্যোগকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত রাজ্জাকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।

এ বিষয়ে এলাকাবাসী রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণকাজ অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।




বদলির পরও দায়িত্বে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরের উপপরিচালক উম্মে হাবিবা, টেন্ডার কারসাজি ও আর্থিক অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরের উপপরিচালক (উপসচিব) উম্মে হাবিবার বিরুদ্ধে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, সরকারি অর্থের অপচয়, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গঠন এবং অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একাধিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সম্প্রতি বস্ত্র অধিদফতরের পরিচালক পদে বদলি করা হলেও নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও তিনি আগের কর্মস্থল ছাড়েননি বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং বদলির আদেশ বাতিল করতে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, গত ১৬ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে উম্মে হাবিবাকে বস্ত্র অধিদফতরের পরিচালক হিসেবে বদলি করা হয়। একই প্রজ্ঞাপনে তাকে ২২ জুনের মধ্যে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে আরও বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর না করলে ওই দিন বিকেল থেকেই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত হিসেবে গণ্য হবেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সেই নির্দেশ কার্যকর হওয়ার পরও তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরেই দায়িত্ব পালন করছেন। এ অবস্থায় তার বদলির আদেশ বাতিলের জন্য বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলে যোগাযোগ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, উম্মে হাবিবা আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সে সময়ের স্বাস্থ্য সচিব জাহাঙ্গীর আলমের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে তাকে দেখা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ এবং আন্দোলন করেছিলেন। তবে সে সময় তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হলেও পরে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরের উপপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

অভিযোগ অনুযায়ী, নতুন কর্মস্থলে যোগদানের পর থেকেই তিনি দফতরের টেন্ডার, কোটেশন, কেনাকাটা এবং প্রচার-প্রচারণা সংক্রান্ত প্রায় সব কার্যক্রম নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। এসব কাজে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা ঠিকাদাররা নিয়ম মেনেও কাজ পান না বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত প্রতিযোগিতাকে উপেক্ষা করে বেশি দামে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে সরকারের লাখ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দফতরের প্রিন্টিং ও প্রচার-প্রচারণার বেশিরভাগ কাজ দেওয়া হয়েছে রায়আন প্রিন্টার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে। অন্যদিকে টেলিভিশন বিজ্ঞাপন ও ভিডিও নির্মাণের কাজ নিয়মিতভাবে দেওয়া হয়েছে রবিন নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের কাছে। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার ও কোটেশন প্রক্রিয়ায় নানা কৌশল অবলম্বন করে এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হতো।

এ বিষয়ে কয়েকটি টেন্ডারের তথ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আইডি নম্বর ১২৩৯৭৭৩-এর টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল তিথি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং। প্রতিষ্ঠানটি ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৫৪৪ টাকার দরপত্র জমা দিলেও তাদের বাদ দিয়ে পঞ্চম সর্বনিম্ন দরদাতা রায়আন ট্রেডার্সকে ১০ লাখ ৭৪ হাজার ৬৬১ টাকায় কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

একইভাবে আইডি নম্বর ১২৩৯৭৩৪-এর টেন্ডারে একুশে মিডিয়া ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৯৯২ টাকার সর্বনিম্ন দর দিলেও তাদের পরিবর্তে চতুর্থ সর্বনিম্ন দরদাতা রায়আন ট্রেডার্সকে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ১০২ টাকায় কাজ দেওয়া হয়।

আবার আইডি নম্বর ১১৮৮৩৫৯-এর টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল খন্দকার এন্টারপ্রাইজ। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা রায়আন ট্রেডার্সের অনুকূলে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শুধু টেন্ডার কারসাজিই নয়, অনেক ক্ষেত্রে যথাযথভাবে পণ্য বা সেবা গ্রহণ না করেই বিল পরিশোধ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও মাঠপর্যায়ে কাজ না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। এসব অনিয়মে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করেছে বলেও দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা।

অভিযোগ আরও রয়েছে, উম্মে হাবিবা দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর কঠোর চাপ প্রয়োগ করতেন। ঢাকাসহ চারটি আঞ্চলিক কার্যালয়ের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য করা হতো। কেউ আপত্তি জানালে চাকরি হারানোর ভয়, বেতন বন্ধের হুমকি কিংবা দুর্ব্যবহারের মুখে পড়তে হতো। ইতোমধ্যে তার অনিয়মের প্রতিবাদ করায় দুই কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, উম্মে হাবিবা নিজেকে অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে নিজের অবস্থান শক্ত রাখার চেষ্টা করতেন। এমনকি প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখেন—এ ধরনের কথাও তিনি বিভিন্ন মহলে প্রচার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পেতেন না।

দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, একজন বিতর্কিত কর্মকর্তার কারণে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা নষ্ট হয়েছে, কর্মপরিবেশে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং চেইন অব কমান্ড দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাদের দাবি, এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে দফতরের ভাবমূর্তি ও সংস্কার কার্যক্রম আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এদিকে সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে জনপ্রশাসন সচিবের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। মো. রাকিবুল আলম খান স্বাক্ষরিত ওই অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, উম্মে হাবিবা দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সুনাম নষ্ট হয়েছে এবং একক সিদ্ধান্তে দফতর পরিচালনার কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।

অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উপদেষ্টার দফতরের একজন কর্মকর্তাকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিষয় নিজের অনুকূলে রাখার চেষ্টা করতেন উম্মে হাবিবা। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।




সমবায় অধিদপ্তরে অতিরিক্ত নিবন্ধক নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট গড়ে শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সমবায় সমিতির নিবন্ধন, তদারকি, আইনগত সহায়তা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা সমবায় অধিদপ্তরের। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠতে থাকায় অধিদপ্তরটির কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব অনিয়মের কারণে সাধারণ সমবায়ী ও সেবাগ্রহীতারা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

এমন অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সমবায় অধিদপ্তরের অতিরিক্ত নিবন্ধক (প্রশাসন, মাসউ ও ফাইন্যান্স) মো. নবীরুল ইসলাম। ২০তম বিসিএসের মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাকরিজীবনের শুরু থেকেই বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অধিদপ্তরের ভেতরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে বদলি, পদোন্নতি, সমিতির নিবন্ধন, লাইসেন্স অনুমোদন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ সুবিধা আদায় করে আসছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় নবীরুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কোটার অপব্যবহার করেছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি সমবায় অধিদপ্তরে যোগদানের আগে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) কর্মরত ছিলেন এবং সেখানে দায়িত্ব পালনরত এক কর্মকর্তার সহযোগিতায় বিসিএস পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপে অনিয়মের আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে তার বাবা মৃত মো. সহিদুল ইসলামকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেখিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০০১ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর কাফরুল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। পরে বিষয়টি তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের ভিত্তিতে ২০০২ সালের ১৫ জুন তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলেও পরবর্তীতে প্রভাব খাটিয়ে তিনি সেই জটিলতা কাটিয়ে আবার চাকরিতে বহাল হন।

এছাড়া ২০১১ সালে সিরাজগঞ্জে উপ-নিবন্ধক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সিরাজগঞ্জ কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের ছয় শতক জমি বিক্রির ঘটনায় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত ও মামলার মুখোমুখি হলেও সেই তথ্য গোপন রেখেই তিনি পরবর্তীতে পদোন্নতি নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে নবীরুল ইসলাম অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তার করেন। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য, ঘুষ গ্রহণ, সমিতির নিবন্ধন ও লাইসেন্স অনুমোদনের নামে অর্থ আদায় এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান সময়েও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রেখেই তিনি অতিরিক্ত নিবন্ধক পদে পদোন্নতি নিয়েছেন।

সমবায় অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে একাধিক অভিযোগ ও তথ্য জমা থাকলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে তারা দাবি করেছেন।

আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০১২ সালে রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে বন্ধক রাখা জমির ওপর অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ করে দিয়ে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা পাইয়ে দেন নবীরুল ইসলাম। এতে সমবায় অধিদপ্তর এবং সরকারের সম্পদের ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই সময়ের বিভাগীয় যুগ্ম নিবন্ধক অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাকেও লাঞ্ছিত করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এছাড়াও বিভিন্ন সমবায় সমিতির নিবন্ধন, পরিদর্শন, তদন্ত প্রতিবেদন, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং অন্যান্য দাপ্তরিক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় অধিদপ্তরের স্বাভাবিক প্রশাসনিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সাধারণ সমবায়ীরা ন্যায্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো.নবীরুল ইসলাম এর সাথে যোগাযোগের জন্য কল করা হলে রিসিভ করেননি।




ঢাকা ওয়াসার উপ-সহকারী প্রকৌশলী নূর হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রতারণা ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকা ওয়াসার পানি (পূর্ব ও উত্তর) বিভাগ-২-এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোঃ নূর হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা, টেন্ডার বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম করার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে অপসারিত ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালাম বেপারীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নূর হোসেন বিভিন্ন সময় তার প্রভাব ব্যবহার করে ওয়াসার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরির বিধি লঙ্ঘন করে তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্যে জড়িয়ে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, চাকরি থেকে প্রাপ্ত বৈধ আয়ের তুলনায় নূর হোসেনের সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিক। তিনি ঢাকায় একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট ও ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক হয়েছেন। এছাড়া গ্রামের বাড়িতেও বিপুল পরিমাণ জমি কিনেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার নিজের নামে এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, তার এবং পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান করলে এসব অভিযোগের সত্যতা বেরিয়ে আসতে পারে।

নূর হোসেনের বিরুদ্ধে প্রতারণারও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জারিফ ট্রেডিং কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী মোঃ মজিবুল হাসানকে ব্যবসায়িক অংশীদার বানানো এবং ওয়াসার টেন্ডারের কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময়ে মোট ৪২ লাখ ৫০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। পরে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় মজিবুল হাসান অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ১৭ জুন ২০২৫ তারিখে এক অফিস আদেশে নির্বাহী প্রকৌশলী মাজহারুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়। একই ঘটনায় মজিবুল হাসান বাদী হয়ে যাত্রাবাড়ী থানায় নূর হোসেনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪০৬ ও ৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার বিধান থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থেকে সুবিধাজনক কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১১ সালে আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার সুপারিশে নূর হোসেন ঢাকা ওয়াসায় চাকরি পান। এরপর রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি দীর্ঘদিন নানা অনিয়মের মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন। তার আগের কর্মস্থল পাগলা পয়ঃশোধনাগার বিভাগে নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই ঘটনায় প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে একজন নিরীহ প্রকৌশলীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।

নূর হোসেনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পাশাপাশি শোক দিবসসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন আয়োজনে নিয়মিত আর্থিক সহযোগিতা করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের উদ্যোগে প্রকৌশলীদের করণীয় বিষয়ে আয়োজিত এক সেমিনারেও নূর হোসেন উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। আইইবির কাউন্সিল রুমে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং আইইবির তৎকালীন সভাপতি প্রকৌশলী আব্দুস সবুর।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান-এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ জুম সভায়ও নূর হোসেন অংশ নেন। সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মোকাবিলায় সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার বিষয়ে আলোচনা হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ওই জুম মিটিংয়ের রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করলে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

এদিকে নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন এবং সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।




সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও দুর্নীতির অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন শাখার সদ্য সাবেক উপপরিচালক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার এবং আয়কর ফাঁকির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া একটি অভিযোগে এসব তথ্য তুলে ধরে তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, পটুয়াখালীতে বদলি হলেও তিনি সেখানে যোগদান না করে এখনও প্রধান কার্যালয়ে অবস্থান করছেন এবং প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ধরনের তদবির বাণিজ্যে জড়িত রয়েছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি চাকরির বেতনের সঙ্গে আইয়ুব খানের বর্তমান সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই। একজন ষষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে মাসিক প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা বেতন পেলেও তিনি নামে-বেনামে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, নিবন্ধিত সংস্থাগুলোর ফাইল আটকে ঘুষ আদায়, অনুদান বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজধানীর শ্যামলীর ঢাকা গার্ডেন সিটিতে আইয়ুব খানের নামে ও ঘনিষ্ঠজনদের নামে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। হাসনাহেনা (এফ) টাওয়ারে একটি ফ্ল্যাট ও পার্কিং তার নিজের নামে রয়েছে। আরও একটি ফ্ল্যাট সমাজসেবা অধিদপ্তরের নরসিংদী জেলার উপপরিচালক মাসুদুল হাসান তাপসের নামে এবং আরেকটি তার জাপানপ্রবাসী ভাগ্নে মো. সোহেল রানার নামে কেনা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া একই আবাসিক প্রকল্পের মাধবীলতা (বি+সি) টাওয়ারেও তার আরও একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, প্রতিটি ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা।

শুধু রাজধানীতেই নয়, নিজ জেলা কুমিল্লার হোমনায়ও আইয়ুব খানের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সেখানে মার্কেট, বিলাসবহুল বাংলো, খামারবাড়ি এবং বিভিন্ন স্থাবর সম্পদের পাশাপাশি কয়েক কোটি টাকা মূল্যের একাধিক ব্যক্তিগত গাড়ি কিনে ভাড়ায় পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ এফডিআর এবং ঢাকা গার্ডেন সিটিতে আরও একটি প্লট কেনার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি অংশ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে কানাডায় পাচার করা হয়েছে। সেখানে বাড়ি কেনার অভিযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের প্রকৃত সম্পদের তথ্য আয়কর নথিতে গোপন রেখে দীর্ঘদিন ধরে আয়কর ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আইয়ুব খান ঢাকা ও কুমিল্লার হোমনায় একাধিক কাগুজে বা অস্তিত্বহীন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তুলে বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে সরকারি অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। হোমনার শ্যামপুর এলাকার সুরাইয়া-খালেক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন নামে সংগঠন তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।

এছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন ও নিবন্ধনসংক্রান্ত ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রেখে ঘুষ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতাকে পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা আদায় করেছেন এবং সেই অর্থে নিজের ও আত্মীয়-স্বজনের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। এমনকি নিজের সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আড়াল করতে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, সহকর্মী ও সিন্ডিকেটের সদস্যদের নামও ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা গার্ডেন সিটিতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন জেলার কর্মকর্তাদের নামে অন্তত ১৫টি ফ্ল্যাট রয়েছে এবং এসব সম্পদের দেখভালের দায়িত্বও আইয়ুব খানই পালন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস ও অর্থের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতির পরিচালনা পর্ষদকে ঘিরেও আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সমিতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও প্রশাসক নিয়োগ না দিয়ে অবৈধ পরিচালনা পর্ষদকে সুবিধা দিতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এ কাজে আইয়ুব খানের সঙ্গে ঢাকা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক রকনুল হকের যোগসাজশ ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২২ সালে জমা দেওয়া একটি আবেদনকে ভিত্তি করে দুই বছর পর নতুন করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অথচ এর আগেই তদন্ত সম্পন্ন হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হয়েছিল। এরপরও নতুন করে তদন্ত কমিটি গঠন করে পুরো বিষয়টি দীর্ঘায়িত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একই বিষয়ে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সাংঘর্ষিক বলে অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতির বিতর্কিত পরিচালনা পর্ষদকে সহযোগিতা করতে আইয়ুব খান ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্ত প্রতিবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্ব করেন। পরে তিনি মতামতে উল্লেখ করেন যে, মহাপরিচালকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং ঢাকা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়কে নতুন করে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এভাবে তদন্ত প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করে বিতর্কিত পরিচালনা পর্ষদকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে আইয়ুব খানের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া সংগঠনের মাধ্যমে অনুদান গ্রহণ, অর্থপাচার, আয়কর ফাঁকি এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।




ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ, ঢাকা ওয়াসার এআরও আনোয়ারুল ইসলামকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব জোন-৫-এর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ বাণিজ্য, অনিয়ম এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বিভিন্ন কৌশলে ওয়াসার রাজস্ব ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন। তার কর্মকাণ্ডের কারণে রাজস্ব খাতে বড় ধরনের ক্ষতির পাশাপাশি অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, আনোয়ারুল ইসলাম প্রথমে ঢাকা ওয়াসার পিপিআই রাজস্ব জোনে আউটসোর্সিং বিলিং সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সে সময় তিনি তৎকালীন সিবিএ সভাপতি ও আওয়ামী শ্রমিক লীগের নেতা সামসুজ্জামানের পারিবারিক আত্মীয় হওয়ায় বিশেষ সুবিধা পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সামসুজ্জামানের মেয়ের জামাই হওয়ায় শ্বশুরের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি অফিসে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় থেকেই আন্ডার বিলিং, পানির মিটারে কারসাজি (মিটার টেম্পারিং) এবং অবৈধ পানির সংযোগ দেওয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। এসব কাজের বিনিময়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে থাকা অবস্থায় আনোয়ারুল ইসলাম নিয়মিত নিজের দায়িত্ব পালন না করে ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ দেওয়া অন্য একজনকে দিয়ে অফিসের কাজ করাতেন। এভাবে সরকারি দায়িত্বে অবহেলা করেও তিনি কোনো জবাবদিহির মুখে পড়েননি। বরং শ্বশুরের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখতেন। একই সময় তৎকালীন সিবিএ নেতার ভাতিজা ফাহাদ আল রশীদ এবং নেতার শ্যালককে সঙ্গে নিয়ে ওয়াসার ভেতরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে। এই সিন্ডিকেট বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক সুবিধা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।

পরবর্তীতে স্থায়ী সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) পদে নিয়োগের সময়ও আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ পরীক্ষায় অসাধু উপায় অবলম্বন করে এবং প্রভাবশালী আত্মীয়ের সহযোগিতায় তিনি স্থায়ী পদ লাভ করেন। এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পরিধি আরও বাড়তে থাকে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তিনি যেসব রাজস্ব জোনে দায়িত্ব পালন করেছেন, প্রায় প্রতিটি জায়গাতেই ঘুষ ও অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেছিলেন। তার অধীনস্থ রাজস্ব পরিদর্শক ও বিলিং সহকারীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ঘুষের বিনিময়ে লাভজনক সাইট বা দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী চক্র পরিচালনা করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে সৎ কর্মকর্তারা নানা ধরনের চাপের মধ্যে থাকতেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া হেড অফিসের সেন্ট্রাল ফাংশনে কর্মরত থাকাকালে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির গুরুত্বপূর্ণ নথি মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে গায়েব করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব ফাইল সরিয়ে ফেলার কারণে কয়েকটি অভিযোগ আর তদন্তের পর্যায়ে এগোয়নি।

আরও অভিযোগ রয়েছে, রাজস্ব পরিদর্শক হারুনুর রশিদ রানার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিতে আনোয়ারুল ইসলামকে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তদন্ত চলাকালে হারুনুর রশিদ রানার কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঘুষ নিয়ে তার পক্ষে অনুকূল প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় তদন্ত প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য, রাজস্ব ফাঁকি, অবৈধ সংযোগ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে আনোয়ারুল ইসলাম বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। স্বল্প বেতনের একজন কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। অভিযোগ রয়েছে, তার অর্জিত সম্পদের সঙ্গে বৈধ আয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।




অভিযোগের মুখে এলজিইডির প্রকৌশলী আমিরুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জের একাধিক প্রকল্পে অনিয়মের তদন্ত দাবিতে উদ্বেগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কিশোরগঞ্জ জেলার সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, কাজ শেষ হওয়ার আগেই অগ্রিম বিল প্রদান, নিম্নমানের সড়ক নির্মাণ এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত কিশোরগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রকল্পে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিল অনুমোদন দেন এবং এতে সরকারের শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, Haor Infrastructure and Livelihood Improvement Project (HILIP)-এর আওতায় কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ভুয়া LCS (Labour Contracting Society) কমিটির মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থের বড় একটি অংশ উত্তোলন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে কাজের বাস্তব অগ্রগতি ছিল না। একই সঙ্গে ওইসব এলাকায় নির্মিত অনেক সাবমার্জিবল (ডুবন্ত) সড়ক নিম্নমানের হওয়ায় এক বছরের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও সড়কের অস্তিত্ব পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

শুধু HILIP নয়, ময়মনসিংহ অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প, আমফান পুনর্বাসন প্রকল্প, আইআরআইডিপি (IRIDP) এবং জিওবি মেইনটেন্যান্স প্রকল্পসহ আরও কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পেও কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই বড় অঙ্কের অগ্রিম বিল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বিলের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অবৈধ সুবিধা নেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, এটি ছিল পরিকল্পিতভাবে সরকারি অর্থ ব্যবহারের নিয়ম লঙ্ঘনের একটি অংশ।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, অষ্টগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাহপুর উত্তরপাড়া থেকে ঘোষের কান্দি পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের জন্য সরকার কনস্ট্রাকশনকে প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ টাকা অগ্রিম বিল দেওয়া হয়। একইভাবে মিঠামইন উপজেলার কাঠখাল বাজার থেকে বৈরাটি ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের কাজে মোজাহার এন্টারপ্রাইজকে প্রায় তিন কোটি ৭৫ লাখ টাকা অগ্রিম বিল দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ দুটি ঘটনা কেবল উদাহরণ; তাঁর দায়িত্বকালে আরও অনেক প্রকল্পে একই ধরনের অনিয়ম হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিশোরগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও তাঁর পরিবারের প্রভাব ব্যবহার করে আমিরুল ইসলাম প্রশাসনের ভেতরে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন। এ কারণে এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেক নির্দেশও তিনি গুরুত্ব দিতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে এলজিইডি, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিকবার তদন্ত কমিটি গঠন করলেও সেসব তদন্ত শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ফল দেয়নি। অভিযোগকারীদের দাবি, সে সময়ের প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে তদন্তগুলো আর এগোয়নি।

এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন The Southern Chattogram Regional Development Project (SCRDP)-এর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে মো. আমিরুল ইসলামের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, যার বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও অগ্রিম বিল প্রদানের মতো অভিযোগ রয়েছে, তাকে বিদেশি অর্থায়নের বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দিলে ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকা এবং দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে সচেতন মহল কিশোরগঞ্জে তাঁর দায়িত্বকালীন সব প্রকল্পের আর্থিক লেনদেন, কাজের মান এবং অগ্রিম বিল প্রদানের বিষয়গুলো নতুন করে তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, মন্ত্রণালয়ে জমা থাকা অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথিপত্র নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. আমিরুল ইসলাম সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, কাজ ছাড়াই অগ্রিম বিল দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে নিয়ম অনুযায়ী বিল প্রস্তুত হয়ে বিভিন্ন দপ্তর অতিক্রম করে নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে আসে এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিল পরিশোধ করা হয়। তিনি দাবি করেন, তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।

প্রকল্প পরিচালক পদে তাঁর নাম প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় অংশ হিসেবে তিনি একাধিক ভাইভায় অংশ নিয়েছেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারও একটি প্রকল্পের জন্য ভাইভা দিয়েছেন বলে জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।




এলেনবাড়ি গণপূর্ত সম্পদ বিভাগে অনিয়মের অভিযোগ: নির্বাহী প্রকৌশলী ড. শফিউল ইসলামকে ঘিরে ক্ষোভ, টেন্ডার ও সংস্কার কাজে প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকার তেজগাঁওয়ের এলেনবাড়ি এলাকায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের সম্পদ বিভাগে নানা ধরনের অনিয়ম, আর্থিক দুর্নীতি ও টেন্ডার কারসাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সম্পদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মো. শফিউল ইসলাম। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সরকারি বাসভবনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে। বিভাগটির একাধিক নিবন্ধিত ঠিকাদার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসব অভিযোগ তুলে ধরে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন সরকারি বাসভবনের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে প্রায় ৮ কোটি টাকার কাজ দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে কাজ শেষ হওয়ার আগেই কিংবা কাজ না করেই বিল উত্তোলন করা হয়েছে। পরে সেই অর্থ ভাগাভাগি করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী ড. শফিউল ইসলাম, সহকারী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম, উপসহকারী প্রকৌশলী সুশান্ত দত্ত এবং সম্পদ বিভাগের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে। অভিযোগে স্টাফ অফিসার এবং অফিস সহকারী-কাম-এস্টিমেটরদের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, ড. শফিউল ইসলাম সম্পদ বিভাগে যোগ দেওয়ার পর থেকেই একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্বাচিত কিছু ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় এবং অন্য ঠিকাদারদের বিভিন্ন অজুহাতে টেন্ডার থেকে বাদ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডারের শর্ত এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ কার্যত প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে না পারে। ফলে বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও অনেক ঠিকাদার কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বিশেষ করে চলতি বছরের ৪ মে আহ্বান করা সুইমিং পুল মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের একটি টেন্ডার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একাধিক ঠিকাদার। তাদের দাবি, এই টেন্ডারের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই সুবিধা পায়। প্রায় ২৫ জন নিবন্ধিত ঠিকাদার এই প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বাদ পড়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া এলেনবাড়ি এলাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত ১ নম্বর ও ২ নম্বর ভবনের সংস্কার কাজ নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৬০ লাখ টাকার সংস্কার কাজের বিল দেখানো হলেও বাস্তবে তেমন কোনো কাজ হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১ নম্বর ভবনের এক বাসিন্দা, যিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলে পরিচয় দিয়েছেন, দাবি করেন গত দুই বছরে ভবনটিতে উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার কাজ চোখে পড়েনি। অথচ সরকারি নথিতে এসব কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দেখিয়ে বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ১২ মে ২০২৬ প্রকাশিত আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগসংক্রান্ত টেন্ডার। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই নিয়োগ প্রক্রিয়াও আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল এবং একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা।

এদিকে কয়েকজন ঠিকাদার আরও অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ৭ নম্বর ওয়ার্ড তেজকুনিপাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং মা এন্টারপ্রাইজের মালিক জামাল হোসেন এখনও সম্পদ বিভাগে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। তাদের দাবি, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জামাল হোসেনকে বিভিন্ন কাজ পাইয়ে দিতে নির্বাহী প্রকৌশলী ড. শফিউল ইসলাম এবং সহকারী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডারের প্রাক্কলন ও অন্যান্য শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয় যাতে মা এন্টারপ্রাইজ সুবিধা পায় এবং অন্য ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতা করতে না পারেন।

আরও অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ বা কমিশনের দাবি পূরণ করতে না পারলে অনেক ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয় না। বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও তারা টেন্ডারে সুযোগ পান না। বিপরীতে ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ঠিকাদারদের ভাষ্য, এভাবে কমিশন বাণিজ্য এবং টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে এবং একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সুবিধা ভোগ করছে।

এছাড়া অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে দায়িত্ব পালন করা হলেও বর্তমানে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে একই ধরনের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে টেন্ডার কারসাজি, সংস্কার কাজের অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য এবং জনবল নিয়োগে সিন্ডিকেটের প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মো. শফিউল ইসলামের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে জানান, তিনি একটি বৈঠকে ব্যস্ত আছেন এবং পরে কথা বলবেন। এরপর আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের স্বার্থে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

 

 

 




৬ কোটি টাকার ঘুষে পিডি নিয়োগের অভিযোগ, এলজিইডির ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার ‘ইমপ্রুভিং আরবান গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রোগ্রাম (আইইউজিআইপি)’ প্রকল্পকে ঘিরে নতুন করে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে তোফায়েল আহমেদকে নিয়োগ দিতে প্রায় ৬ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগটি করেছেন মোহাম্মদ আলী নামে এক ব্যক্তি।

লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এলজিইডির গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে এখনো আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তারা বহাল রয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এবং বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদকে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আইইউজিআইপি প্রকল্পের পরিচালক করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এর আগে তোফায়েল আহমেদকে একই প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে দাতা সংস্থা আপত্তি তোলে। পরে প্রকল্পের অভিজ্ঞ পরিচালক মো. আব্দুল বারেককে দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু এবার হঠাৎ করেই তাকে সরিয়ে তুলনামূলক জুনিয়র কর্মকর্তা তোফায়েল আহমেদকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দেশের ৮৮টি পৌরসভার অবকাঠামো উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নেওয়া এই বৃহৎ প্রকল্পটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।

অভিযোগে তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়েও গুরুতর দাবি করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নওগাঁয় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে প্রায় চার বছর দায়িত্ব পালনকালে তিনি তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নকাজে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থের মালিক হন। অভিযোগ অনুযায়ী, নিজের নামে এবং স্ত্রী দিলরুবা হোসেনসহ পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে প্লট, ফ্ল্যাট, বাড়ি, গাড়ি এবং ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ গড়ে তুলেছেন তিনি। এসব সম্পদের বেশিরভাগই তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি উঠেছে রাস্তা নির্মাণকাজে অনিয়ম নিয়ে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় থ্রি-আরসিসি সড়ক নির্মাণে ১২ ইঞ্চি পুরু ঢালাই এবং প্রতি ৪ ইঞ্চি পরপর রড ব্যবহারের নকশা ও নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে মাত্র ৬ ইঞ্চি ঢালাইয়ের মাধ্যমে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে রাস্তার স্থায়িত্ব ও মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এই অনিয়মের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাছ থেকে তোফায়েল আহমেদ প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন বা ঘুষ আদায় করছেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এলজিইডিতে বর্তমানে ঘুষ, বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অন্তত ১১ জন বিতর্কিত প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সিনিয়র কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে জুনিয়রদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং পদোন্নতি, বদলি কিংবা ভালো পদায়নের ক্ষেত্রেও ঘুষ ছাড়া কিছুই হচ্ছে না বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ে এখনো প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ, দক্ষ ও যোগ্য প্রকৌশলীরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগকারীর বক্তব্য।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় অর্থ এবং বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের আশঙ্কা রয়েছে। তাই পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন প্রকল্প পরিচালক তোফায়েল আহমেদ। এ বিষয়ে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং এগুলোর কোনো সত্যতা নেই।




অস্তিত্বহীন অফিসে গণপূর্তের ৩১১ কর্মকর্তার পদায়ন, ১০ মাসেও নেই বেতন-ভাতা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের নবসৃষ্ট পদগুলোতে সবার আগে পোস্টিং হয়েছিল ঢাকা ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সানাউল্লাহর। তাকে বদলি করা হয় শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-৪-এ। গত বছরের আগস্টে বদলি করা হলেও এখন পর্যন্ত তিনি অফিস খুঁজে পাননি। শেরেবাংলানগর-৪-এর আওতাধীন এলাকাও বুঝে পাননি। উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, স্টাফ অফিসারসহ সাপোর্টিং স্টাফও নেই তার। ১০ মাস ধরে পাচ্ছেন না বেতন-ভাতাও। অফিস কোড না হওয়ায় তার আওতাধীন এলাকার টেন্ডারসহ সকল উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে শেরেবাংলানগর-১ বিভাগ থেকে। 

জাতীয় সংসদ ভবনসহ শেরেবাংলানগর এলাকার বড় অংশের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন মো. আনোয়ার হোসেন। সংসদের সাউন্ড সিস্টেম বিপর্যয়ের সময়ে ব্যাপক আলোচিত হয় তার নাম। তাকে ইএম ডিভিশন-১২ তে বদলি করা হয়েছে গত মার্চ মাসে। কিন্তু সেই ডিভিশন-১২-এর অফিস কিংবা এর আওতাধীন এলাকার কোনোটিই তিনি এখনও খুঁজে পাননি। এমন অস্তিত্বহীন পোস্টিংয়ের কারণে মাঝেমধ্যে পূর্ত ভবনের সংস্থাপন বিভাগে হাজিরা দেওয়া ছাড়া আর কোনো কাজও নেই তার। তিনিও কোনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। নেই কোনো স্টাফ এবং গাড়ি সুবিধা।

নবসৃষ্ট সার্কেল-৫-এর অধীনে রয়েছে মহাখালী গণপূর্ত বিভাগ, নতুন ঢাকা ডিভিশন-৫ ও জরিপ বিভাগ। এই বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকা ডিভিশন-৫-এর কোনো অস্তিত্বই নেই। গণপূর্ত অধিদপ্তরে এমন ঘটনা একটি-দুটি নয়, বরং অনেক। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পোস্টিং আছে, কিন্তু অফিস নেই। নেই বেতন-ভাতাও। একইভাবে নেই পরিদর্শক গাড়ি। এমন পরিস্থিতি দেখা দেওয়ার কারণ সেখানে নতুন এক সেটআপ তৈরির সিদ্ধান্ত।

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে অনেক স্থাপনা নির্মিত হওয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিদ্যমান জনবলে তা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যাচ্ছিল না। এর প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে নতুন সেটআপ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। নানা কাটাছেঁড়ার পর গত বছরের ৭ আগস্ট ৩১১টি পদ সৃজনে জনপ্রশাসন, অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সম্মতি জ্ঞাপন করে। কাজ বৃদ্ধি পাওয়ায় কয়েকটি জেলা সদরে ইলেকট্রো মেকানিক্যালের ডিভিশনও অনুমোদন পায়। কিন্তু জনবল অনুমোদন দিয়েই যেন দায়িত্ব শেষ করেছে জনপ্রশাসন, অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

ফলে অনুমোদিত পদগুলোতে পদোন্নতি ও পোস্টিং দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত নবসৃষ্ট পদে যোগদানকারী কর্মকর্তারা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা। ওয়ার্কিং ডিভিশনগুলোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অফিস কোড অনুমোদন করা হয়নি। পাশাপাশি আইবাস কোড তৈরি না হওয়ায় টেন্ডার প্রক্রিয়াসহ নির্মাণ-রক্ষণাবেক্ষণের কোনো কাজ করা যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ব্যাপক চেষ্টা-তদ্বির করা হলেও এখনও কোনো ফল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) খালেকুজ্জামান চৌধুরী। তবে তিনি বলেন, ‘শিগগিরই অফিস কোড ও আইবাস কোড সৃজন সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’

জানা গেছে, নবসৃষ্ট পদগুলোর মধ্যে বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের ১০৭টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সিভিল) ১টি, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ইএম) ১টি, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) ২টি, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ইএম) ১টি, নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) ১৪টি, নির্বাহী প্রকৌশলী (ইএম) ১১টি, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল) ১৭টি, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ইএম) ৩টি, সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) ৪০টি, সহকারী প্রকৌশলী (ইএম) ১৮টি। অবশিষ্ট পদগুলো নন-ক্যাডার থেকে শুরু করে অফিস সহায়ক পর্যন্ত। গত বছরের ৭ আগস্ট গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারির পর নবসৃষ্ট পদে পোস্টিং ও পদোন্নতি দেয় গণপূর্ত অধিদপ্তর। কিন্তু আইবাস কোড ও অফিস কোড সৃষ্টি না হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াই ভেস্তে যায়।

চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব শেখ নাজমুস সাকিব স্বাক্ষরিত এক পত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়কে নবসৃষ্ট পদের বিপরীতে ১৯টি অফিসের আইবাস কোড সৃজনের অনুরোধ জানিয়ে পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ মাসেও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নতুন অফিস কোড না থাকায় এসব পদের বিপরীতে যোগদানকৃত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। আইবাস কোড না থাকায় টেন্ডারসহ উন্নয়ন ও সংস্কারের কাজও করা যাচ্ছে না।

অভিযোগ উঠেছে, গণপূর্ত অধিদপ্তর নবসৃষ্ট পদে বদলি ও পদোন্নতি দিতে যতটা আগ্রহী ছিল ঠিক ততটাই অনাগ্রহী এসব অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকা চিহ্নিত করে তা সংশ্লিষ্ট অফিসকে বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়ে। নবসৃষ্ট পদগুলোর কর্মকর্তারা জানেনই না, তার দায়িত্বের অধীন কোনো কোনো এলাকা। বিসিএস গণপূর্তের ১৫ ব্যাচের কর্মকর্তা মো. কায়কোবাদ ২০২৫ সালে অনুমোদিত গণপূর্ত অধিদপ্তরের নতুন সেট-আপে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চট্টগ্রাম) হয়েছেন। নবসৃষ্ট এ পদে তার নেই কোনো অফিস, নেই কোনো ব্যবস্থাপনা, এমনকি নেই কোনো বেতন-ভাতাও। গত ৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে বেতন না পাওয়ায় তিনি মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। আগামী ডিসেম্বরে অবসরে যাবেন তিনি। কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে এমন পরিস্থিতিতে তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

ময়মনসিংহে কর্মরত গণপূর্তের ২১ ব্যাচের কর্মকর্তা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোস্তফা কামালকে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে নবসৃষ্ট সার্কেল-৫-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে। ঢাকায় পোস্টিং পেয়ে বেশ আনন্দিতই হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি কোনো অফিস এবং সাপোর্টিং স্টাফ পাননি। অগত্যা সার্কেলের অধীনে থাকা মহাখালী ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীর অফিসে বসছেন তিনি। কিন্তু অফিস কোড সৃষ্টি না হওয়ায় অধস্তন কর্মকর্তার অফিস ‘দখল করে’ বসতে পারলেও কোনো কাজ করতে পারছেন না। ওদিকে তিনি বসার কারণে অফিসে উদ্বাস্তুর মতো ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে মহাখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী রাজিবুল ইসলাম। মোস্তফা কামালও বেতন-ভাতা পান পাচ্ছেন না আট মাস ধরে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, এমন পোস্টিং আমাদের মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। আমাদের অফিসের কথা বলা হলেও কার্যত কোনো অফিস নেই, চলাচলের জন্য কোনো যানবাহন নেই, কাজ নেই এমনকি জীবনধারণের জন্য বেতনটা পর্যন্ত নেই। এই পোস্টিং আমাদের পারিবারিকভাবেও ছোট করেছে। আসলেই আমাদের চাকরি আছে কি না? যে প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই আমাদের কাছে। অপর এক প্রকৌশলী জানান, গণপূর্ত অধিদপ্তরের আগে উচিত ছিল অফিস কোড সৃজন করা এবং পরবর্তীতে পোস্টিং ও পদোন্নতি দেওয়া। নতুন অফিস সৃষ্টি, কর্মবণ্টন, লজিস্টিক সাপোর্ট, জনবল, চেয়ার-টেবিল, পরিদর্শন গাড়ি সরবরাহ করে পদায়ন করলে আজকের এই উদ্ভট সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো না।