রাজউকের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় ঢাকার ভূমিকম্প ঝুঁকি ভয়াবহভাবে বেড়েছে

এসএম বদরুল আলমঃ নরসিংদীতে হওয়া ভূমিকম্পে কয়েক সেকেন্ডের ঝাঁকুনিতেই পুরো ঢাকা কেঁপে ওঠে। শুধু একবার নয়, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আরও তিনবার কম্পন হয়। এতে আবারও পরিষ্কার হলো—ঢাকা শহর ভীষণ ভঙ্গুর, আর বড় কোনও ভূমিকম্প হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে।

সরকারি হিসাব বলছে, শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটের কম্পনটি ছিল ৫.৭ মাত্রার। এতে ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী মিলিয়ে অন্তত ১০ জন মারা যান এবং ৩০০-রও বেশি মানুষ আহত হন। বহু ভবনে ফাটল ধরে, কিছু ভবন হেলে পড়ে—যা রাজধানীর বিপজ্জনক অবস্থার প্রমাণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও ঢাকার ঝুঁকি বড় হয়েছে মানুষের অবহেলা এবং দুর্নীতির কারণে। আর সবচেয়ে বেশি দায় রাজউক—যারা রাজধানীর ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করার কথা।

বাংলাদেশ তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে হওয়ায় ভূমিকম্প ঝুঁকি আগেই ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর রাজউকের দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়ম না মানা এবং অনুমোদন বাণিজ্য ঢাকাকে প্রকৃতির চেয়েও বেশি বিপদে ঠেলে দিয়েছে।

রাজউকের নিজের আইন—বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) এবং ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ডিএপি)—সবগুলোতেই কঠোর নিয়ম আছে। ভবন তৈরির আগে মাটি পরীক্ষা, সঠিক লোড ডিজাইন, নির্দিষ্ট সীমার বাইরে না যাওয়া, মানসম্পন্ন নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা—সবই লেখা আছে। কিন্তু বাস্তবে এসব নিয়ম খুব কমই মানা হয়।

রাজউকের এক জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী নাম না প্রকাশের শর্তে স্বীকার করেছেন, “এখন আর প্রকৌশল নয়—সবকিছু দরকষাকষিতে ঠিক হয়। ফাইল কত দ্রুত এগোবে, সেটা ঠিক করে টাকা।”

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকার অন্তত ৭০ শতাংশ ভবনে বড় ধরনের নিয়মভঙ্গ হয়েছে। অনুমোদনের চেয়ে বেশি তলা করা, ভিত্তির নকশা বদলে দেওয়া, নিম্নমানের রড-কংক্রিট ব্যবহার—সবই সাধারণ ব্যাপার। এসব ভবন মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও টিকবে কি না, তা নিয়ে বড় সন্দেহ রয়েছে।

একজন নির্মাতা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “কাগজপত্র ঠিক থাকলেও দালাল ছাড়া ফাইল এগোয় না। কমিশন দিলে এক সপ্তাহে অনুমোদন, না হলে মাসের পর মাস লাগে।”

বিশ্বব্যাংক ও রাজউকের যৌথ গবেষণা বলছে, ৬.৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৪০ শতাংশ ভবন—অর্থাৎ প্রায় ৮ লাখ ৬৪ হাজার ভবন—ধসে পড়তে পারে। এতে দিনে ভূমিকম্প হলে কমপক্ষে ২ লাখ ১০ হাজার এবং রাতে হলে ৩ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

বুয়েটের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী জানান, “ঢাকার ভবনগুলোর বড় সমস্যা—নিম্নমানের রড, দুর্বল কংক্রিট, মাটির রিপোর্ট না মানা, আর ভুল লোড ডিজাইন। ঢাকা এখন পুরোপুরি লাল ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, “প্রতিটি বিপর্যয়ের পর রিপোর্ট হয়, তদন্ত হয়, কিন্তু রাজউক কখনোই সেগুলো থেকে শিক্ষা নেয় না। ভুলে যায়। আর সেই সুযোগে আবারও অনিরাপদ ভবন গড়ে ওঠে।”

বিশেষজ্ঞদের প্রস্তুত করা ঝুঁকির মানচিত্রে পুরান ঢাকা, আফতাবনগর, বাড্ডা, রামপুরা, বসুন্ধরা—সবগুলোকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বলা হয়েছে। মাটি ঢিলা হওয়ায় বড় ভূমিকম্পে এসব এলাকায় ভবন ডুবে যাওয়া, হেলে যাওয়া বা সম্পূর্ণ ধসে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ইউএসজিএস জানিয়েছে, ঢাকার প্রায় এক কোটি মানুষ শুক্রবারের কম্পন খুব তীব্রভাবে অনুভব করেছেন। ৭ কোটির বেশি মানুষ মৃদু কম্পন টের পেয়েছেন। এই ভূমিকম্পকে তারা “কমলা ঝুঁকি” হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার মানে—মারাত্মক ক্ষতি এবং প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনও সময় আছে। চাইলে বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে—

  • অনুমোদন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা,

  • দালাল চক্র ভেঙে দেওয়া,

  • বিএনবিসি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন,

  • ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো রেট্রোফিটিং করা,

  • রাজউকের নিয়োগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে রাজনীতিমুক্ত করা।

অধ্যাপক আনসারীর বক্তব্যই যেন সবকিছু পরিষ্কার করে দেয়— “মানুষকে ভূমিকম্প মারে না। মারে দুর্নীতি, অবহেলা আর দুর্বল ভবন।”




পতেঙ্গা টার্মিনালে তেলচুরির সাম্রাজ্য ও ৪৮১ কোটি টাকার লেনদেন; সবকিছুর নেপথ্যে আছেন ডিএম সাঈদুল রহমান

এসএম ব্দরুল আলমঃ জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে যে অদৃশ্য ক্ষমতার জাল নিয়ে নানা গুঞ্জন ছিল, সেই জালের মাঝখানের মানুষ হিসেবে এবার সামনে আসছে রিভার অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজার (অপারেশন) সাঈদুল রহমানের নাম। তার শ্যালক আজিম উদ্দিন, যিনি নিষিদ্ধ সংগঠন সমুদ্র যুব ঐক্য পরিষদ–এর সভাপতি ছিলেন, বর্তমানে ভারতে পলাতক। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—আজিম উদ্দিন দেশ ছাড়া হলেও তার “অর্থ আর প্রভাবের রুট” এখনও সক্রিয়, আর সেই রুটের বাংলাদেশ অংশ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছেন সাঈদুল।

রিভার অয়েলের পতেঙ্গা টার্মিনালকে বলা হয় দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জ্বালানি লোডিং-পয়েন্টগুলোর একটি। প্রতিদিন এখানে ৭,০০০–৮,২০০ মেট্রিক টন ডিজেল, অকটেন আর পেট্রল ওঠানামা করে। বিশেষজ্ঞদের হিসাবে—এখানকার মাপে মাত্র ১% কম দেখালেই দিনে ৮–১০ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় ক্ষতি হয়। বছরজুড়ে সেই অঙ্ক দাঁড়ায় ৩,০০০ কোটি টাকার বেশি। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটির নিয়ন্ত্রণ তিন দশক ধরে একচ্ছত্রভাবে ধরে রেখেছেন সাঈদুল রহমান। ১৯৯৭ সালে স্থায়ী হওয়ার পর কাগজে কলমে তার বদলির আদেশ বহুবার হলেও, অফিসে সবাই বলে—“সাঈদুলের বদলি পাঁচ মিনিটও টেকে না।”

পতেঙ্গা টার্মিনালকে কেন্দ্র করে যে তেলচুরির সিন্ডিকেট সক্রিয়, তা ৮ ধাপে পরিচালিত হয়—এমন তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। ভুয়া লোডশিট বানানো, ট্যাংকারে গোপন চেম্বার রাখা, মিটার কম দেখানোর মাধ্যমে তেল লুকানো, ল্যাবে গ্রেড কম দেখিয়ে তেলের অংশ সরিয়ে ফেলা, রাতের শিফটে ট্যাংকারের গন্তব্য বদলানো, মাঝপথে আনলোড, পুলিশ ‘ম্যানেজ’, শেষে নথি সামঞ্জস্য করা—সব মিলিয়ে বিশাল এক নেটওয়ার্ক। আর এই পুরো অপারেশন পরিচালনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন—ডিএম সাঈদুল। রিভার অয়েলের এক ডেপুটি কন্ট্রোলার পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন— “টার্মিনালে কোন লাইনের মিটার কখন নষ্ট হলো, কে নষ্ট করল, কেন করল—অন্যেরা জানুক বা না জানুক, সাঈদুল জানতেন।”

এত বড় নেটওয়ার্ক চালাতে মানুষের যোগ্যতার চেয়ে বেশি লাগে প্রভাব। আর সেই প্রভাবের পরিচয় মিলেছে সাঈদুল ও তার স্ত্রীর নামের ৭টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাওয়া ৪৮১ কোটি ৬০ লাখ টাকার রহস্যজনক লেনদেনে। সিটি ক্রেডিট ব্যাংকে ৮৭ কোটি, গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ ব্যাংকে ৬২ কোটি, ইস্ট ওয়েস্ট ট্রাস্টে ৫৫ কোটি, সাউথ এশিয়া ফিন্যান্সে ৭৬ কোটি, হিল ভিউ ব্যাংকে ৪৩ কোটি, সিকিউরিটি ট্রেড ব্যাংকে ৯৭ কোটি এবং ইউনিয়ন প্রাইম ব্যাংকে ৬১ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। আশ্চর্যের ব্যাপার—এই লেনদেনের ৬৫%ই ক্যাশ উত্তোলন, যা ব্যাংক আইনে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত হয়। আরও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৮ কোটি টাকা সিঙ্গাপুর হয়ে কানাডায় গেছে, তার ছেলে-মেয়েদের নামে।

সাঈদুলের নিয়ন্ত্রণ শুধু টার্মিনালেই নয়—তার শ্যালক আজিম উদ্দিনের লুকোনো বাহিনীকেও তিনি আশ্রয় দিচ্ছেন। কাসালগঞ্জের ৭৭৫/৮৮৫ নম্বরের “আরিজ হাউজ” নামের ভবনে অন্তত ৯ জন পলাতক কর্মী, ৩ জন অস্ত্রধারী এবং বিদেশফেরত আরও কয়েকজন সদস্যের অবস্থানের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফ্ল্যাট বরাদ্দ থেকে শুরু করে মাসে মাসে রহস্যজনক গাড়ি আসা–যাওয়া—সবই পরিচালনা করেন সাঈদুল। স্থানীয়রা জানান—“মাসে একবার দুটো গাড়ি আসে, ব্যাগ বদলায়। কেউ কিছু বলেনা।”

সরকারি চাকরিতে থাকা একজন মানুষের পক্ষে এত সম্পদ অর্জন কিভাবে সম্ভব—এটাই এখন বড় প্রশ্ন। কাসালগঞ্জে তার ৫ তলা বাড়ি ‘আরিজ হাউজ’-এর বাজারমূল্য ১০–১২ কোটি টাকা। পাশাপাশি ৮ শতাংশ জমিতে ১০ তলা ভবন নির্মাণাধীন, প্রকল্প মূল্য ৩০–৩৫ কোটি। গ্রামের পাঁচ ভাইয়ের জন্য আলাদা পাঁচটি বাড়ি—প্রায় ১৫ কোটি টাকার প্রকল্প। বিদেশে তিনটি ফ্ল্যাট—কানাডা, মালয়েশিয়া ও ভারতে—যার মূল্য ৫০–৬০ কোটি। গাড়ির বহর, অফিসিয়াল গাড়ির ব্যক্তিগত ব্যবহারসহ মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৮০–৫২০ কোটি টাকায়।

এত বড় কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পরও তিনটি সংস্থা—জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, রিভার পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)—চুপ করে আছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, দুদকের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে “লেনদেন” হয়ে গেছে। তদন্ত শুরুর চেষ্টা হলেই কিছু কর্মকর্তা তড়িঘড়ি করে বদলি করা হয়েছে। এক জ্যেষ্ঠ আমলা পর্যন্ত বলেছেন—“তিনটা সংস্থা নীরব মানেই বোঝা যায়, কেউ একজন খুব শক্তিশালী তাকে রক্ষা করছে।”

রিভার অয়েলের ভেতরে এখন আতঙ্ক আর নীরবতা। যে কথা বলবে, তার বদলির অর্ডার নাকি পরদিনই আসে। তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দুইবার দেওয়া হলেও “অজ্ঞাত কারণে” বাতিল হয়েছে। সেখানে কাজ করা কর্মকর্তাদের মতে—“এটা সরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও বাস্তবে এটি সাঈদুলের ব্যক্তিগত রাজ্য।”

হাজার হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ বছরের পর বছর অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেখলে মনে হয়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভেতরে এমন একটি বলয় তৈরি হয়েছে যা সহজে ভাঙা সম্ভব হয়নি। তিন দশক ধরে একজন ব্যক্তি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়টিও ইঙ্গিত করে যে পুরনো রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনের ভেতরের যোগসাজশ এবং বিপুল অর্থের প্রভাব মিলেই একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যার বাইরে রাষ্ট্র নিজেও কার্যত সীমাবদ্ধ।

ডিএম সাঈদুল রহমানকে ঘিরে অভিযোগ যতই জমতে থাকুক, তদন্ত এখনো শুরু হয়নি—এ বিষয়টি দেখায় যে জনগণের সম্পদের হিসাব আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব ও জবাবদিহিতে বড় ধরনের শূন্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।




ভুয়া রপ্তানির ফাঁদ: মানিলন্ডারিং ও প্রণোদনা আত্মসাতে কাস্টমস কর্মকর্তা-ব্যাংকারসহ ২৬ জন অভিযুক্ত

এসএম বদরুল আলমঃ রপ্তানি না করেই কাগজে-কলমে পণ্য পাঠানোর গল্প তৈরি করে সাড়ে ১৮ কোটি টাকার মানিলন্ডারিং ও আরও ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকার রপ্তানি প্রণোদনা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মোট ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এদের মধ্যে রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ১১ জন কাস্টমস কর্মকর্তাও রয়েছেন। দুদকের উপপরিচালক মো. আহসান উদ্দিন ঢাকায় সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলাটি করেন।

মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান দো এম্পেক্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. জিয়া হায়দার মিঠু এবং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলোক সেনগুপ্তকে। তাদের সহায়তা করেন বিভিন্ন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট — কেএইচএল এক্সাম লিমিটেডের এমডি মোহাম্মদ রাকিবুল ইসলাম রাসেল, এ কে এন্টারপ্রাইজের মালিক আবুল কাসেম খান, প্যান বেঙ্গল এজেন্সিস লিমিটেডের এমডি মো. সেলিম। আরও জড়িত ছিলেন জি আর ট্রেডিং করপোরেশন সি অ্যান্ড লিমিটেডের পরিচালক বেগম রাসিদা পারভীন রুনু, এ অ্যান্ড জে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক মো. আলতাফ হোসেন ও মো. আব্দুল জলিল আকন।

এ ছাড়াও বেশ কয়েকটি অডিট প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ পাওয়া গেছে। দুদকের মামলায় নাম আছে— এ কাসেম অ্যান্ড কো.-এর মালিক মোহাম্মদ মোতালেব হোসেন ও জিয়াউর রহমান জিয়া, এমএবিএস অ্যান্ড জে পার্টনারের দায়িত্বে থাকা জগদীশ চন্দ্র বিশ্বাস, মুহাম্মদ সাজিদুল হক তালুকদার, নাসির উদ্দিন আহমেদ।

সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল কাস্টমস বিভাগের কিছু কর্মকর্তার। মামলায় থাকছে ১১ জনের নাম— সহকারী কমিশনার জাহাঙ্গীর কবির, মবিন উল ইসলাম, সাবেক সহকারী কমিশনার জয়নাল আবেদীন, রাজস্ব কর্মকর্তা জমির হোসেন, এ এইচ এম নজরুল ইসলাম, আমির হোসেন সরকার, গৌরাঙ্গ চন্দ্র চৌধুরী, ফরিদ উদ্দিন সরকার, মো. মঞ্জুরুল হক, সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুস সাত্তার ও বাসুদেব পালক। একই সঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের এক্সপোর্ট বিভাগের প্রিন্সিপাল অফিসার মো. রফিকুল ইসলাম এবং মোহাম্মদ আনোয়ার জাহানকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, আসামিরা মিলেমিশে আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, কানাডা ও সিঙ্গাপুরে পণ্য রপ্তানি হয়েছে—এমন নথি তৈরি করে ব্যাংকে টাকা আনার ব্যবস্থা করে। এভাবে দো এম্পেক্স লিমিটেডের নামে দেশে এসেছে ২২ লাখ ১৮ হাজার ১৭.৪৪ মার্কিন ডলার, যার বাংলাদেশি মূল্য ১৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার বেশি। অথচ এসব রপ্তানির বেশিরভাগই ছিল ভুয়া—ব্যবহার করা হয়েছিল শুধু কাগুজে চালান।

২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৪১টি বিল অব এক্সপোর্ট জমা দেয়। এর মধ্যে মাত্র ৭টির রপ্তানির সত্যতা পাওয়া গেলেও বাকি ৩৪টি চালান সম্পূর্ণ ভুয়া ছিল। কিন্তু এই ভুয়া রপ্তানির ওপর ভিত্তি করেই তারা সরকার থেকে প্রায় ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকার নগদ প্রণোদনা তুলে নেয় এবং আত্মসাৎ করে।

দুদকের মতে, রপ্তানি না করেই রপ্তানি হয়েছে এমন নথি বানিয়ে ব্যাংক ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের সহায়তায় বিদেশ থেকে টাকা আনা এবং সরকারি প্রণোদনা নেওয়া—এটাই ছিল পুরো চক্রের মূল কৌশল। এই প্রতারণার মধ্য দিয়ে তারা রাষ্ট্রকে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলে।




লালমনিরহাট সীমান্তে বিজিবি’র অভিযানে তারকাঁটার বেড়া কর্তনের সময় গরু চোরাকারবারি আটক

জহুরুল হক জনি, লালমনিরহাট প্রতিনিধিঃ  লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা সীমান্তে তারকাঁটার বেড়া কর্তন করার সময় মোঃ লাভলু হোসেন (৪০) নামে এক চিহ্নিত গরু চোরাকারবারিকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গত রোববার (২৩ নভেম্বর) দিবাগত গভীর রাতে এ ঘটনা ঘটে। গরু চোরাচালানের উদ্দেশ্যে ভারতীয় সীমান্তে বে-আইনিভাবে প্রবেশের চেষ্টার সময়ই তাকে হাতেনাতে ধরে তিস্তা ব্যাটালিয়ন (৬১ বিজিবি)-এর টহলদল।

বিজিবি সূত্র জানায়, তিস্তা ব্যাটালিয়ন (৬১ বিজিবি)-এর অধীন বড়খাতা বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি)-এর একটি টহলদল হাতিবান্ধা উপজেলার বুড়াসারডুবি এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় তারা ভারতীয় সীমান্তে বে-আইনিভাবে তারকাঁটার বেড়া কর্তনকালে মোঃ লাভলু হোসেনকে হাতেনাতে আটক করে। চোরাচালানের উদ্দেশ্যে তিনি এই বেড়া কর্তন করেছিলেন বলে বিজিবি নিশ্চিত করেছে।

আটককৃত মোঃ লাভলু হোসেন হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতা বুড়াসারডুবি গ্রামের মৃতঃ খলিল মিয়ার ছেলে। আটকের পর বিজিবি মোঃ লাভলু হোসেনের কাছ থেকে গরু চোরাচালানের কাজে ব্যবহৃত একটি তারকাঁটার বেড়া কাটার প্লাস (কাটার), একটি স্মার্ট ফোন এবং দুটি সিমকার্ড জব্দ করে।

বিজিবি আরো জানায়, আটককৃত আসামিকে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা দিয়ে পরবর্তী আইনি কার্যক্রমের জন্য হাতিবান্ধা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। হাতীবান্ধা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহমুদুন্নবী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “বিজিবি আসামিকে থানায় সোপর্দ করেছে। তার বিরুদ্ধে যথাযথ ধারায় মামলা রুজু করে তাকে লালমনিরহাট জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।




এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ: কাজ করিয়ে না বিল কাটলো

এসএম বদরুল আলমঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো: বেলাল হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হচ্ছে—কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন না করেই ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করে অগ্রিম বিল অনুমোদন করা হয়েছে এবং সেই বিল থেকে বড় অঙ্কের কমিশন নেওয়া হয়েছে। পরে ঠিকাদার মিলিয়ে যায় বলে স্থানীয় অফিসে শোরগোল পড়েছে এবং নানা তথ্য উঠে এসেছে যেগুলো এখন যাচাই করা হচ্ছে।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকার দৃষ্টি নন্দন প্রকল্পের অধীন মানিকনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণের কাজটি (প্রকল্প: ঢাকা মহানগরী ও পূর্বাচলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন ও অবকাঠামো উন্নয়ন) পেয়েছিল মেসার্স ইফাত এন্টারপ্রাইজ—প্রোপাইটার দালিয়া ইমামের (ঠিকানাঃ ৮৪২, মধ্য বাড্ডা, ঢাকা)। চুক্তিমূল্য ছিল ৫২,৮৩,৬০,০০ টাকা এবং কার্যাদেশ তারিখ ছিল ২/৫/২০২৪; কাজ সমাপ্তির নির্ধারিত তারিখ ১৫/০৮/২০২৫। তবু প্রকল্পের কাজ না করেই ২,৮৭৫,০০০ টাকার বিল আগেই অনুমোদন করে দেয়া হয়েছে—এমনটাই অভিযোগ। বিলটি অনুমোদনকারী হিসেবে নাম উল্লেখ রয়েছে মো: বেলাল হোসেনের। পরে ঠিকাদার এফেক্টিভভাবে দফায় দফায় নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়।

অভিযোগকারীরা বলছেন, উপ-সহকারী প্রকৌশলী বেলাল হোসেন বিভিন্ন সময়ে ঠিকাদারদের সঙ্গে গোপনে বুঝে নিয়ে কাজ না করেই অগ্রিম বিল কেটে দেন; সিনিয়র কর্মকর্তাদেরকে উৎসাহিত করে কমিশন বণ্টন করা হয়—ফলশ্রুতিতে কয়েকটি প্রকল্পে কোটি টাকার বদলে লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক্সেঞ্জ অফিসে কর্মরত এক সূত্র বলেছেন, অফিসের বিল বুক যাচাই করে এমন অনিয়মের আলামত পাওয়া গেছে। বর্তমানে ঠিকাদার আত্মগোপনে রয়েছেন, ফলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা কঠিন হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

প্রতিবাদ বা জিজ্ঞাসা করা হলে অভিযুক্ত মো: বেলাল হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এলজিআইডির ঢাকাস্থ নির্বাহী প্রকৌশলী বাচ্চু মিয়া বলেছেন, তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এসব বিষয়ে কথা বলতে পারবেন না; তবে তিনি সরেজমিন তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করার অনুরোধ করেছেন। বর্তমানে যারা অভিযোগটি করেছেন তারা চাইছেন—চোখ বন্ধ না রেখে গোছানোভাবে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কোনো অনিয়ম হওয়া রোধ করা যায়।

এ ঘটনায় স্থানীয় অফিসে শোরগোল আর বিস্তার পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্তের দাবি ওঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী মূল অপরাধগুলোর মধ্যে রয়েছে: কাজ করানো ছাড়া অগ্রিম বিল অনুমোদন করা, ঠিকাদারের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে কমিশন নেওয়া, এবং অফিসের বিল নথি জালিয়াতির মাধ্যমে লেনদেন আড়াল করা—যেগুলো নিয়মানুগ তদন্তে প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।




১১ মাসে দুর্নীতির ২৬ হাজার কোটি টাকা দুদকের কব্জায়

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ গণ অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে দুর্নীতিবাজদের ধরপাকড়ে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধে রেকর্ড সাফল্য দেখিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১১ মাসে দেশে-বিদেশে দুর্নীতিবাজ, অর্থপাচারকারী, সরকারি লোপাটকারী এবং ঋণখেলাপিসহ তিন শতাধিক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৬ হাজার ১৩ কোটি টাকার বেশি স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

যেখানে ২০২৪ সালের পুরো সময়ে ক্রোক ও অবরুদ্ধের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৬১ কোটি টাকা। শুধু তাই নয় ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ক্রোক ও অবরুদ্ধ সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ গেল ১১ মাসে সম্পদ ক্রোক ও ফ্রিজে নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে দুদক।

দুদকের বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় গত ১১ মাসে (ডিসেম্বর-অক্টোবর) আদালতের নির্দেশনায় ওই সব সম্পদ ক্রোক বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সার্বিক বিষয়ে দুদকের কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী বলেন, দুদকের দন্ত ও নক রয়েছে। যা আরও শার্প করা হয়ত দরকার আছে। একটা কথা বলতে চাই, দুদক কিন্তু যথার্থ আইনি শক্তিতে মহিয়ান। বিচারকাজে গতিশীল করতে দুদকের আরও বিশেষ আদালত প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

আদালত ও দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত ১১ মাসে দেশে ৩ হাজার ৪৫৭ কোটি ৮৩ লাখ ৪৭ হাজার ক্রোক করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দেশে ফ্রিজ ২২ হাজার ২২৬ কোটি ৭৯ লাখ ৩২ হাজার ও বিদেশে ৩২৮ কোটি ৩৮ লাখ ১৩ হাজার ফ্রিজ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে প্রায় ২৬ হাজার ১৩ কোটি ২ লাখ ৯৩ হাজার টাকা ক্রোক ও ফ্রিজ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ১১ মাসে বিচারাধীন মামলার মধ্যে ২৪৯টি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। যেখানে সাজা হয়েছে ১২৬টির, খালাস ১২৩টি, জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৫ হাজার ৫৮ কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে ৩২১ কোটি টাকা।

১১ মাসের মামলা ও চার্জশিটের পরিসংখ্যানের বিষয় জানা যায়, গত ১১ মাসে ১১ হাজার ৬৩০টি অভিযোগ এলেও মাত্র ৯৬০টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় এনফোর্সমেন্ট হয়েছে ৭৯৮টি। এর মধ্যে অনুসন্ধান হচ্ছে ১৮৮টির, মামলা হয়েছে ২৮টি এবং চারটি ফাঁদ পেতে অভিযুক্তকে ধরা হয়েছে। আর গণশুনানি হয়েছে ২৩টি।

দুদক জানায়, উল্লিখিত সময়ের মধ্যে মোট ৫১২টি মামলা দায়েরের মাধ্যমে ২ হাজার ১৯১ জনকে আসামি করা হয়েছে। মোট চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ৩১৫টির, এতে আসামি করা হয়েছে ১ হাজার ৭৮ জনকে। এফআরটি বা মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে ৭৩টি।

গত বছরের ৫ আগস্ট জনবিক্ষোভের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শীর্ষ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। তাদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও দুর্নীতির প্রমাণ পায় সংস্থাটি। এর পরই একের পর এক মামলা করতে থাকে অন্যদিকে আদালতের নির্দেশে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হচ্ছে। যা এখনও চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।




এলজিইডিতে অনিয়মের অভিযোগ: ভুল রায় ও ঘুষে ওহাব গ্রুপের পদোন্নতি, সরকারের ক্ষতি কোটি টাকায়

এসএম বদরুল আলমঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-র কিছু কর্মচারীর পদোন্নতি ঘিরে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন, আদালতের ভুল রায়কে কাজে লাগানো এবং ঘুষের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অনিয়মের ফলে প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমসহ কয়েকজন ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও সরকারের ক্ষতি হবে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।

সূত্র জানায়, এলজিইডির বিভিন্ন পদের ২৪ জন কর্মচারী নিজেদের উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতির দাবিতে ২০১১ সালে হাইকোর্টে রিট করেন। মামলার প্রথম ও শেষ শুনানির তারিখের মধ্যে অসংগতি থাকায় রায়ের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। রায়ে বলা হয়েছিল তাদের চাকরি রেভিনিউ খাতে নিতে হবে, অথচ অধিকাংশের চাকরিই শুরু থেকেই রেভিনিউ খাতে ছিল।

ওই গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন আব্দুল ওহাব। ২৪ জনের মধ্যে কেউ অবসরে গেছেন, কেউ মারা গেছেন—তবে বেঁচে থাকা ১২ জন এই রায়ের অপব্যবহার করে পদোন্নতির জন্য চেষ্টা করতে থাকেন। ২০১২ সাল থেকে ১৬ জন প্রধান প্রকৌশলী এলজিইডিতে দায়িত্ব নিলেও কেউ এই বিতর্কিত রায় বাস্তবায়ন করেননি। কিন্তু চলতি বছরে ওহাব গ্রুপ বড় অঙ্কের ঘুষের তহবিল গড়ে পদোন্নতির জন্য জোরালো তদবির শুরু করে।

সূত্র দাবি করে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রশীদ মিয়াকে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়া হয়। তিনি ফাইল মুভ করলেও প্রশাসন শাখার কিছু কর্মকর্তা ভুল রায় বাস্তবায়নের ফাইলে স্বাক্ষর না করায় প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। পরবর্তীতে প্রধান প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনের সময়ও প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিম দায়িত্ব নেওয়ার পর ওহাব গ্রুপ নতুনভাবে তৎপর হয়। সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী (প্রশাসন) শফিকুর রহমানের সঙ্গে আব্দুল ওহাবের কথিত দেড় কোটি টাকার চুক্তি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এই ঘুষের এক কোটি টাকা দেওয়া হয় প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিমকে, ৩০ লাখ নেন শফিকুর রহমান এবং ২০ লাখ নেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাইফুল কবির।

প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয় যে, ১২ জন সদস্য ২০০৬ সাল থেকে উপসহকারী প্রকৌশলীর বেতন স্কেলে বকেয়া সুবিধা পাবেন। যদিও আদালতের রায়ে ‘ইফেকটিভ ডেট’ সম্পর্কে কোনো নির্দেশনা ছিল না। এই বেতন–বকেয়ার কারণে সরকারের বাড়তি ক্ষতি হবে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষের বিনিময়ে অন্যদের মতো তাদেরও অতীত থেকে বকেয়া বেতন অনুমোদন করানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

এলজিইডির ২০০৯ সালের নিয়োগ বিধিতে স্পষ্ট বলা আছে—সার্ভেয়ারদের ১৫ বছর এবং কার্য সহকারীদের ২০ বছর চাকরি পূর্ণ হলে বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সাপেক্ষে তারা পদোন্নতি পেতে পারে। কিন্তু কমিউনিটি অর্গানাইজার বা স্টোর কিপার কখনোই টেকনিক্যাল পদে (উপসহকারী প্রকৌশলী) উন্নীত হতে পারে না। কোনো কোর্ট, কমিটি বা কর্তৃপক্ষের বিধি অমান্য করার এখতিয়ার নেই।

এলজিইডির সাবেক দুই অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবং বর্তমান কয়েকজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জানান, এই পদোন্নতি সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং নিয়োগবিধি পরিপন্থী। তাই প্রধান প্রকৌশলী জাবেদ করিম, শফিকুর রহমান, সাইফুল কবিরসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।




এলজিইডির প্রকল্প পরিচালক রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, নীরব দায়িত্বশীলরা

এসএম বদরুল আলমঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্প পরিচালক রুহুল আমিন খানের বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের আইনগত উদ্যোগ নেয়নি। অভিযোগ প্রকাশের পরও এলজিইডি, স্থানীয় সরকার বিভাগ কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না আসায় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগে বলা হয়, আইআরআইডিপি-০৩ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক রুহুল আমিন খান তার স্ত্রী পারভীন আক্তার শিউলীর নামে ৩১ লাখ টাকার বেশি দামের একটি বিলাসবহুল গাড়ি কিনেছেন এবং লালমাটিয়ার বুলবুলিকা ভবনে প্রায় ৬ কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাটসহ ঢাকার গুলশান, বনানী, উত্তরা ও বরিশালে একাধিক সম্পত্তি সংগ্রহ করেছেন। এসব সম্পদের বৈধ উৎস দেখাতে না পারা এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগই এখন তদন্তের দাবি তুলছে।

আইন অনুযায়ী এমন অভিযোগ উঠলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে দণ্ডবিধি, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের কোনো ধারা কার্যকর করা হয়নি। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অন্তত সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করা উচিত ছিল। বিশেষ করে যখন দুদক ইতিমধ্যে এলজিইডির বেশ কয়েকটি প্রকল্পে অনিয়মের তদন্ত করছে।

তবে অভিযোগ প্রকাশের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মহাপরিচালক, সচিব বা মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য দেননি এবং তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগও নেননি। এমনকি প্রাথমিক তদন্তের স্বার্থে রুহুল আমিন খানকে পদ থেকে সরানোর সিদ্ধান্তও হয়নি।

জনস্বার্থে এই অভিযোগগুলো তদন্ত করা জরুরি বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজ ও আইন বিশেষজ্ঞরা। জনগণের করের টাকা দিয়ে পরিচালিত প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উপেক্ষা করা হলে তা দুর্নীতিবাজদের আরও উৎসাহিত করবে বলে তারা মনে করেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত শুরুর আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রুহুল আমিন খান বা তদন্ত গ্রহণকারী কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে আরও তথ্য পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রকাশনায় জানানো হবে।




ভণ্ড হাকিম আব্দুল কাদেরের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতারণার অভিযোগ; ভুয়া চিকিৎসায় সর্বস্ব হারাচ্ছেন সাধারণ রোগীরা

এসএম বদরুল আলমঃ মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় বহুদিন ধরে নিজেকে হাকিম পরিচয় দিয়ে রোগী দেখছেন আব্দুল কাদের। বাহিরে থেকে দেখতে তার চেম্বারটা খুব জমজমাট মনে হলেও, ভেতরে লুকিয়ে আছে নানা অভিযোগ আর প্রতারণার অভিযোগ। রোগীদের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি নানাভাবে টাকা আদায় করেন বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। তার রয়েছে দামি গাড়ি, বাড়ি ও বিপুল সম্পদ, আর এসবের পেছনে কত মানুষের কষ্টের টাকা লুকানো আছে, সেটাই এখন প্রশ্ন।

হাকিম আব্দুল কাদেরের চেম্বারে সব সময়ই ঘিরে থাকে বিশজনেরও বেশি দালালের একটি বড় দল। এই দালালরা কথার জাদু দেখিয়ে রোগীদের তার কাছে নিয়ে আসে। কমিশনের লোভে তারা রোগীদের ভুল তথ্য দেয়, ভয় দেখায়, এমনকি চিকিৎসার নাম করে মিথ্যা প্রতিশ্রুতিও দেয়। রোগীরা যখন ভরসা করে তার কাছে যান, তখন শুরু হয় টাকা নেওয়ার পালা।

তিনি দাবি করেন যে লিভার, জন্ডিস, হাঁপানি, বাতসহ চর্মরোগ, ডায়াবেটিস, গ্যাস্টিক, অনিয়মিত ঋতুস্রাব, নাকের পলিপাস—প্রায় সব ধরনের রোগই তিনি নাকি সারাতে পারেন। এমনকি তিনি বলেন পৃথিবীর সব রোগের চিকিৎসা তার কাছে আছে। এতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে আরও বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন। বাস্তবে দেখা গেছে, অনেক রোগী তার চিকিৎসা নিতে নিতে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। পরে বাধ্য হয়ে তারা ডাক্তার দেখানোর পর সুস্থ হন। তাদের অভিযোগ—এমন ভণ্ড চিকিৎসককে দ্রুত আইনের আওতায় আনা উচিত।

জন্ডিসের রোগীদের তিনি ‘ডাব পরে’ নামের একটি পদ্ধতি দেখান। রোগীরা বলে, টেবিলের নিচে থেকে তিনি কিছু একটা দেন, তারা জানেন না সেটা কী। কাদের দাবি করেন তিনি খাবার সোডা দেন, যা চিকিৎসকদের মতে শরীরের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি পর্যন্ত তৈরি করতে পারে। ডাব বিক্রির মাধ্যমেই তিনি প্রতিদিন প্রচুর টাকা আয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও গুরুতর বিষয় হলো—তিনি বিএসটিআই অনুমোদন ছাড়া নিজে ট্যাবলেট বানান, ওষুধ তৈরি করেন এবং এসব রোগীদের খেতে দেন। এটি আইন অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ। অথচ তিনি নিজেকে “বাংলাদেশ বোর্ড অফ ইউনানী অ্যান্ড আয়ুর্বেদিক”-এর নিবন্ধন বহি নং ২১২৫ দেখিয়ে পরিচয় দেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন—এ ধরনের কোনো রেজিস্ট্রেশন নম্বর তাদের নেই।

তার কাছে লাইসেন্স সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন তার নাকি আয়ুর্বেদিক কোম্পানি আছে, কিন্তু লাইসেন্স নম্বর বলতে পারেন না। পরে চাপ দিলে বলেন ড্রাগ লাইসেন্স ও ট্রেড লাইসেন্স আছে, কিন্তু সেগুলোর কোনো কাগজও দেখাতে পারেন না। বরং কথার মারপ্যাঁচে রোগীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তিনি বহু বছর ধরে কবিরাজি করছেন এবং তার হাত খুবই “যশস্বী”।

অভিযোগকারীরা বলেন—তার কোনো বৈধ সনদ, প্রশিক্ষণ বা চিকিৎসা করার যোগ্যতা নেই। অথচ তিনি বিভিন্ন গুরুতর রোগের চিকিৎসা করার নামে মানুষকে ধোঁকা দিয়ে টাকা নেন। অনেক রোগী ধীরে ধীরে মারাত্মক অবস্থায় চলে যান, অথচ তিনি তা বুঝেও কিছু করেন না। তারা মনে করেন, এমন বিপজ্জনক প্রতারণা বন্ধ করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।




ডিপিএইচই প্রকল্প নিয়ে অভিযোগের ঝড়: জনস্বাস্থ্যের তবিবুর রহমানকে ঘিরে অনিয়ম–দুর্নীতির নানা তথ্য

এসএম বদরুল আলমঃ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)-এর বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত প্রকল্প “মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি প্রকল্প” নিয়ে সম্প্রতি বড় ধরনের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটির পরিচালক মোঃ তবিবুর রহমান তালুকদারকে ঘিরেই এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিভিন্ন সূত্রের দাবি—প্রকল্পের বিপুল অর্থ ব্যয়ের হিসাব, কাজের মান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি সব দিক থেকেই গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। সূত্রের দাবি, তবিবুর রহমান ঘুষের মাধ্যমে এলজিআরডি উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়ার বিশেষ সহকারী মাহফুজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেন এবং সেই প্রভাব ব্যবহার করে নিজের সুবিধা নেন।

তবিবুর রহমানের জীবন শুরু হয়েছিল সিরাজগঞ্জের এক দরিদ্র পরিবার থেকে। ছোটবেলায় তাঁর ডাকনাম ছিল “শুক্কুর”। পড়ালেখায় অত্যন্ত মেধাবী হওয়ায় এলাকাবাসী তাঁকে সহযোগিতা করত। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি, এসএসসি–এইচএসসিতে ভালো ফল এবং পরে বুয়েটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া—সব মিলিয়ে ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল উজ্জ্বল। এরপর তিনি ডিপিএইচইতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি পান এবং ধীরে ধীরে উচ্চপদে পৌঁছান।

তবে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ—চাকরির শুরু থেকেই বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, টেন্ডার কারচুপি, ঘুষ লেনদেন ও নিম্নমানের কাজের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদ অর্জন করেন। বগুড়া, পাবনা, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় পোস্টিং থাকার সময়ে তিনি রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় বাড়ি–ফ্ল্যাট কেনেন এবং নিজ এলাকায় কিনেন একশ্রেণীর জমি। এসব সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রায় ১ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ের এই বিশ্বব্যাংক প্রকল্পে তবিবুর রহমান প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি—এই পদে আসার পেছনেও নানারকম যোগসাজশ ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। কিছু সূত্র বলছে, সেই সময়ের এলজিআরডি মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং তাঁর এপিএস জাহিদ চৌধুরীর মাধ্যমে পদ পেতে বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে। এসব অভিযোগ অবশ্য এখন পর্যন্ত আদালতে প্রমাণিত নয়।

মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প মনিটরিং কমিটির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির অগ্রগতি এখনো মাত্র ৪৬ শতাংশ, অথচ শেষ হতে বাকি আর দেড় মাস। অর্থাৎ, অর্ধেকের বেশি কাজই অসম্পূর্ণ। মাঠপর্যায়ের রিপোর্ট বলছে—অনেক টয়লেট ব্যবহারযোগ্য নয়, কমিউনিটি ক্লিনিকের টয়লেট দূরে হওয়ায় কাজে লাগছে না, আর পাইপ লাইনের জন্য ব্যবহৃত বেশিরভাগ পাইপই নিম্নমানের হওয়ায় দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ৩০ জেলার ৯৮টি উপজেলায় কাজ হলেও অভিযোগ—মানের দিক থেকে বেশিরভাগই ত্রুটিপূর্ণ।

সূত্র জানায় টেন্ডার মেনিপুলেশন, ঠিকাদারের সাথে ১০-২০% চুক্তিতে কার্যাদেশ, নিম্নমানের কাজে ঘুষ নিয়ে বিল প্রদান, প্রকল্পের কেনাকাটায় ভুয়া বিল ভাউচার দিয়ে টাকা আত্মসাৎ, আউটসোর্সিং নিয়োগে ঘুষ, কনসালটেন্ট ফার্ম নিয়োগে মোটা অংকের ঘুষ। সূত্র আরো জানায় এই প্রকল্পে নানান ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক মোঃ তবিবুর রহমান কামিয়েছেন প্রায় ২০০ কোটি টাকা। সূত্র জানায় প্রকল্পের শেষ দিকে এই দুর্নীতির মাত্রা আরো বেড়ে যাবে।

টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ঠিকাদার নিয়োগ, ভুয়া বিল–ভাউচার, নিম্নমানের কাজের বিল অনুমোদন—সবকিছুতেই অনিয়ম থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, এসব মাধ্যমে তবিবুর রহমান নাকি বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন—যা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রকল্প দপ্তরের ভেতরেও অসন্তোষ রয়েছে।

তবিবুর রহমানের ব্যক্তিগত জীবন ঘিরেও নানা আলোচনা আছে অফিসে ও এলাকায়। সহকর্মীদের অনেকেই তাঁকে ডাকেন “বিয়ে পাগলা তবিবুর” নামে। অভিযোগ আছে—তিনি যেখানেই পোস্টিং পেতেন, সেখানে বিয়ে করতেন। তাঁর বিবাহ সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় গুঞ্জন রয়েছে, এবং সূত্রের দাবি—এখন পর্যন্ত তাঁর কমপক্ষে চারটি বিয়ের খোঁজ মিলেছে। কেউ কেউ বলেন, তিনি সাধারণত অফিসের কম আয়ের কর্মচারী বা এলাকার স্বল্প আয়ের পরিবার থেকে বিয়ে করতেন, পরে তাঁদের নানা সুবিধা দিয়ে সাবলম্বী করে দিতেন। এছাড়া ঢাকাতেও নাকি তাঁর দুই স্ত্রী আলাদা দুই ফ্ল্যাটে থাকেন।

সবকিছুর মধ্যেই সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—প্রকল্পের টাকার অপচয়, অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিম্নমানের কাজ। সূত্রের দাবি—প্রকল্পের শেষ দিকেই এসব অনিয়ম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। যদিও এসব অভিযোগের অনেকটাই এখনো তদন্তাধীন এবং প্রমাণীকরণ বাকি।