ভুয়া বিল-ভাউচারে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ, তথ্য চাইলে ‘এমপির অনুমতি’ দাবি প্রকৌশলী রেজওয়ানের

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সরকারি প্রকল্পের তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন নরসিংদী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রেজওয়ান হোসেন, যার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। তথ্য জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘তথ্য নিতে চাইলে স্থানীয় এমপির অনুমতি লাগবে।’ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকৌশলী মোহাম্মদ রেজওয়ান হোসেন তিন বছর ধরে নরসিংদী জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন। বিগত সরকারের আমলে অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে চললেও, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার বাহ্যিক আচরণে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তবে তার দুর্নীতি থামেনি। বিভিন্ন সরকারি বড় প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি অর্থ আত্মসাৎ করে চলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

নরসিংদীর স্থানীয় সাংবাদিকরা তথ্য অধিকার আইনে নির্ধারিত ফরমে এবং লিখিত আবেদনের মাধ্যমে বিভিন্ন অর্থবছরের মাঠপর্যায়ের কাজের অগ্রগতি ও তথ্য জানতে চাইলে তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি অধিকাংশ সাংবাদিকদের ফোন কলও তিনি রিসিভ করেন না। সশরীরে অফিসে গিয়ে তথ্য চাইলে তিনি জানান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কোনো তথ্য জানতে হলে স্থানীয় এমপির অনুমতি লাগবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ প্রকৌশলীর বাড়ি পাবনা জেলায়। বিগত সরকারের আমল থেকেই ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি নরসিংদীতে স্বেচ্ছাচারীভাবে দপ্তর চালিয়ে আসছেন। ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে কাজ না করিয়েই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জনস্বার্থে সাধারণ দরিদ্র পরিবারে নলকূপ এবং গভীর নলকূপ সরকারের নির্ধারিত ফির মাধ্যমে স্থাপন করা হয়ে থাকে। সে কাজগুলো করে থাকে প্রতিটি উপজেলাভিত্তিক জনস্বাস্থ্য অফিস এবং এর মূল নিয়ন্ত্রণ করেন নরসিংদী জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী। প্রকৌশলীর সেই নির্বাহী ক্ষমতাবলে টানা প্রায় তিন বছর কোটি কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। সেগুলো কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি অনেকের বাড়িতে নলকূপ স্থাপনের কথা বলে সরকারি নির্ধারিত ফির চেয়েও বেশি টাকা নেওয়ার পরও নলকূপ স্থাপনের শতভাগ কাজ সম্পন্ন করেননি। এক বাড়িতে প্রায় দেড় বছর আগে নলকূপের শুধু পাইপ স্থাপন করেছে জনস্বাস্থ্যের ঠিকাদারের লোকজন। কিন্তু অবশিষ্ট কাজ আজ পর্যন্ত করেনি। এ রকম শত শত অনিয়মের মধ্যে চলছে নরসিংদী জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এমনও অভিযোগ উঠছে, বিভিন্ন নামে-বেনামে মাঠপর্যায়ে নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাস্তবে এর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী সরকারি দপ্তরের নলকূপ অপেক্ষাকৃত দরিদ্র ফ্যামিলিতে দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, পৌর শহরের অনেক বিত্তশালীদের বাসাবাড়িতেও দেওয়া হয়েছে। আবার দেখা গেছে, অনেক জনপ্রতিনিধির সুপারিশের ভিত্তিতে বিভিন্ন জনকে নলকূপ বরাদ্দের হিসাব কাগজপত্রে দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো হদিস খুঁজে পাওয়া যায়নি।

রায়পুরার ডৌকারচর ইউনিয়নের তেলিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কৃষক রুমান মিয়া জানান, প্রায় দেড় বছর আগে তাদের বাড়িতে একটি নলকূপের শুধু পাইপ স্থাপন করে চলে গেছে। অবশিষ্ট কাজ এখন পর্যন্ত করেনি। অফিসে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, ‘আপনার নামে তালিকা খুঁজে পাচ্ছি না’।

নরসিংদী প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. মোবারক হোসেন বলেন, প্রায় ৯ মাস আগে নির্ধারিত তথ্য অধিকার ফর্মে তথ্য চেয়ে আবেদন করি। পরে তথ্য নেওয়ার জন্য প্রকৌশলীর সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করলেও তিনি নানা টালবাহানা করতে থাকেন। একপর্যায়ে প্রকৌশলী জানান, কোনো তথ্য নিতে হলে ঠিকাদারদের অনুমতি লাগবে। ঠিকাদারদের অনুমতি ছাড়া কোনো তথ্য দেওয়া যাবে না। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য না দেওয়ায় ফের আপিল আবেদন করি। তারপরও কোনো তথ্য দেননি। পরে নির্ধারিত ফরমে প্রধান তথ্য কমিশনার বরাবর অভিযোগ দায়ের করি। এ ছাড়া এ প্রকৌশলী তার বন্ধুর একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নানা কৌশলে কাজ দিচ্ছেন এবং দুই বন্ধু মিলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ রেজওয়ান হোসেন বলেন, ‘কোনো তথ্য নিতে হলে সংশ্লিষ্ট এমপির অনুমতি লাগবে। তথ্য অধিকার ফরমে বা যেভাবেই আবেদন করেন না কেন, এমপির অনুমতি ছাড়া কোনো তথ্য দেওয়া যাবে না।’

এ ব্যাপারে নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মো. আশরাফ উদ্দিন বকুল বলেন, আমি কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে সাংবাদিকদের তথ্য দিতে নিষেধ করিনি। নিয়ম অনুযায়ী তথ্য দিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রত্যেক কর্মকর্তা বাধ্য। সরকারি প্রতিটি প্রজেক্টে কী কাজ হচ্ছে না হচ্ছে, কী যাচ্ছে, কী ব্যবহার হচ্ছে এবং তা মানসম্মত কি না বা নিয়মমাফিক হচ্ছে কি না, তা প্রত্যেক সাংবাদিকের জানা উচিত এবং জানার অধিকার রাখে। এটাই হচ্ছে তারেক জিয়ার রাজনীতি। নেই কোনো ভয়ভীতি, থাকবে না কোনো ধান্ধাবাজি ও দুর্নীতি।




বরখাস্ত ও বদলির পরও সাভারে প্রভাবের অভিযোগ: রেজায়ে রাব্বিকে ঘিরে লাইসেন্স বাণিজ্য ও নিয়োগে অর্থ আদায়ের দাবি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা-২ (সাভার) এলাকার সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর রেজায়ে রাব্বিকে ঘিরে আবারও গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ২০২৬ সালের ২ জুলাই অধিদপ্তরের ৩৯৯ স্মারকে তাকে তৃতীয়বারের মতো সাময়িক বরখাস্ত করে একই তারিখে প্রশাসনিক কারণে ৮৮৬১/ক(৪৩) স্মারকে ময়মনসিংহ-৮-এ বদলি করা হলেও তিনি এখনো ঢাকায় অবস্থান করে আগের মতোই বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ময়মনসিংহে নামমাত্র যোগদান করার পর রেজায়ে রাব্বি সম্পূর্ণ সুস্থ থেকেও মেডিকেল ছুটি নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। এরপর পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) শহীদ আতাহার হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদে ঢাকা-২ (সাভার) এলাকায় ফায়ার লাইসেন্স নবায়নের নামে শিল্প কল-কারখানা থেকে অবৈধ অর্থ আদায় এবং চলমান নিয়োগ কার্যক্রমে অর্থ সংগ্রহে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রেজায়ে রাব্বিকে বরখাস্ত করা হলেও তার চাহিদা অনুযায়ী ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর হাসিবুর রহমান দিপু আকন্দকে লোক দেখানোভাবে সাময়িক দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে অদ্যবধি সাভার জোনের ফায়ার লাইসেন্স কার্যক্রম এখনো রেজায়ে রাব্বির নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এই কার্যক্রমে ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর দিপু আকন্দ, সাভার ফায়ার স্টেশনের লিডার ভোজন এবং কমিউনিটি ভলেন্টিয়ার সাদ্দাম হোসেন সহযোগিতা করছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিদিন সংগ্রহ করা অবৈধ এসব অর্থ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র রেজায়ে রাব্বির কথিত এক চাচাতো ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচালক শহীদ আতাহার হোসেন এবং সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহকারী পরিচালক, ঢাকা এই পদটি। যার অধীনে রাজধানী ঢাকা জেলাসহ জোনভুক্ত অঞ্চল তথা (ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদি জেলা) এর মত গুরুত্বপূর্ণ জেলার দায়িত্বে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠ বিবেচনায় কাজী নাজমুজ্জামানকে এই পদে পদায়ন করা হয়। যিনি সাবেক মন্ত্রী আব্দুল সামাদ আজাদের নিকট আত্মীয় হিসেবে পরিচিত। অভিযোগে বলা হয় বাহিনীতে তিনি শারীরিকভাবে আনফিট হওয়া সত্ত্বেও তাকে বিশেষ বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তৎকালীন সময়ে খুনি হাসিনা সরকার পদায়ন প্রদান করেন। সর্বশেষ তিনি গত ২৬ মার্চ প্যারেড গ্রাউন্ডের কমান্ডারের দায়িত্বে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃক মনোনীত করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের নিরাপত্তা জনিত বিষয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় নিরাপত্তা বাহিনী ও ডিজিএফআই এর নিরাপত্তা পাশ প্রদান না করায় প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। অথচ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ ফাকি দিয়ে এই কর্মকর্তার নেতৃত্বে প্রতিদিনই প্রধানমন্ত্রীসহ ভিআইপিদের অগ্নি নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। অনাকাঙ্ক্ষিত কোন ঘটনা ঘটার পূর্বেই দেশের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে এই বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিগোচর হওয়া একান্ত জরুরী বলে বাহিনীর সচেতন কর্মকর্তা/কর্মচারীগন মনে করেন।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অধিদপ্তরের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরায় এসব কার্যক্রম দৃশ্যমান হওয়া সত্ত্বেও মহাপরিচালকের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে বাহিনীর সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন।

রেজায়ে রাব্বির অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও অভিযোগে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, এর আগেও তিনি একাধিকবার শৃঙ্খলাভঙ্গ ও নারী সহকর্মীর শ্লীলতাহানির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন যার স্মারক নং ৯৯৫/১ তারিখ ০৯/১২/২০১৫। এছাড়া ২৪ এর ছাত্র আন্দোলনের সময়ে জরুরী অবস্থা চলাকালীন সময়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে ছাত্র গণহত্যার সাথে জড়িত থাকার ও অন্যান্য বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অধিদপ্তরের ৩৯৯ নং স্মারক তারিখ ০৫/০৯/২০২৪ তারিখে ৩০/২৪ নং আদেশে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।

অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) জাহেদ কামাল দায়িত্ব গ্রহণের পর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন, বিতর্কিত-সুবিধাভোগী ও আওয়ামীদের বহালসহ পুনর্বাসন করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ঢাকার সকল গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে অতীতের ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বসানো হয়েছে, ফলশ্রুতিতে প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে অপরদিকে বাহিনীতে শৃঙ্খলা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে রেজায়ে রাব্বি, মহাপরিচালক, পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) শহীদ আতাহার হোসেন, ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর হাসিবুর রহমান দিপু আকন্দ, ঢাকার সরকারী পরিচালক, কাজী নজমুজ্জামান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগকারীরা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বাহিনীতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।




সন্ধ্যার মধ্যে ১৯ জেলায় বজ্রবৃষ্টির আশঙ্কা, চার নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে

আবহাওয়া ডেস্কঃ দেশের ১৯টি অঞ্চলের ওপর দিয়ে দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। সেই সঙ্গে এসব এলাকায় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

শনিবার (১১ জুলাই) সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর পূর্বাভাসে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এতে বলা হয়, আজ সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, টাংগাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট অঞ্চল সমূহের ওপর দিয়ে দক্ষিণ/দক্ষিণ-পূর্বদিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। তাই এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

এদিকে দেশের উত্তর–পূর্ব ও দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় বন্যা পরিস্থিতি এখনো অব্যাহত রয়েছে। তবে গত দুই দিনের তুলনায় গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি কমে আসায় পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা কিছুটা কমেছে।

তা সত্ত্বেও আগামী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় ওই এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি মোটামুটি অপরিবর্তিত থাকতে পারে। একইসঙ্গে ফেনী অঞ্চলে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

এদিকে আজ সকাল ৯টার তথ্যের ভিত্তিতে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের চারটি নদীর ছয়টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এগুলো হলো বান্দরবানে সাঙ্গু নদের বান্দরবান ও দোহাজারী পয়েন্ট; কুশিয়ারা নদীর সুনামগঞ্জের মারকুলি ও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্ট; মৌলভীবাজারে মনু নদ এবং হবিগঞ্জে খোয়াই নদের বল্লা পয়েন্ট।

জানা যায়, দেশের ১২৭টি পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে ৫৭টিতে নদীর পানি বেড়েছে, ৬৪টিতে কমেছে এবং ৬টিতে অপরিবর্তিত রয়েছে। পাশাপাশি তিস্তা, সুরমা, কুশিয়ারা, সোমেশ্বরী, মুহুরী ও মাতামুহুরী নদীর কয়েকটি স্টেশনে পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।

এসব নদীর পানি বাড়লে স্থানীয়ভাবে বন্যা পরিস্থিতি আরও বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে বলে জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে।




সচিবালয়ের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ডের অপব্যবহারের অভিযোগ, কথিত সাংবাদিক রুমনের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে রাষ্ট্রের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়কে ঘিরে নানামুখী অপতৎপরতা, চাঁদাবাজি এবং পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পক্ষে ‘গুপ্তচরবৃত্তির’ এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। ‘চ্যানেল এস’ টেলিভিশনের পরিচয়ধারী কথিত সাংবাদিক মোস্তাফিজুর রহমান রুমনের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয়ে তার অবাধ প্রবেশ নিয়ে সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া লিখিত অভিযোগ ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, কথিত এই সাংবাদিক দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে রাজধানীজুড়ে এক বিশাল চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।

ফুটপাতের চাঁদাবাজি থেকে বিলাসবহুল জীবন: অনুসন্ধানে জানা যায়, মোস্তাফিজুর রহমান রুমন মূলত তুরাগ থানা যুবলীগের একজন সক্রিয় সদস্য। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার কথিত মামা এবং ঢাকা উত্তর যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা আবু কালামের ছত্রছায়ায় রুমনের উত্থান ঘটে। তৎকালীন সময়ে উত্তরা এলাকার ফুটপাতকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন সেক্টর থেকে মাসোহারা তোলার মূল কারিগর ছিলেন এই রুমন। ফুটপাতের চাঁদাবাজির টাকায় বর্তমানে তিনি উত্তরায় নিজস্ব বিলাসবহুল অফিস ও দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

গুলশানে স্পা সেন্টারগুলোতে চাঁদাবাজির জাল: আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও রুমনের অপতৎপরতা কমেনি, বরং কৌশল বদলেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর উত্তরা থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকা গুলশান ও বনানীর বিভিন্ন স্পা সেন্টার, আবাসিক হোটেল এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করছেন তিনি। বর্তমানে ফ্যাসিবাদের আরেক দোসর সুজিত চক্রবর্তীর সহযোগী হিসেবে কথিত সাংবাদিকতার আড়ালে এই চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন রুমন।

সচিবালয়ের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড ব্যবহার করে ‘গুপ্তচরবৃত্তি’: সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই কথিত সাংবাদিকের কাছে রয়েছে সচিবালয়ে প্রবেশের বিশেষ ‘প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড’। অভিযোগকারীদের দাবি, রুমন মূলত নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একজন ‘গুপ্তচর’ হিসেবে সচিবালয়ে সক্রিয় রয়েছেন। তিনি এই কার্ডের অপব্যবহার করে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহ করছেন এবং সরকারের ভেতরকার তথ্য বাইরে পাচার করে রাষ্ট্রবিরোধী ও সরকারবিরোধী অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছেন। তার এই সিন্ডিকেট দিন দিন আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে, যা সচিবালয়ের সার্বিক নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে।

আইনানুগ ব্যবস্থা ও কার্ড বাতিলের দাবি: সচিবালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একজন চিহ্নিত ফ্যাসিস্ট দোসর এবং চাঁদাবাজির একাধিক মামলার আসামির অবাধ যাতায়াত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগকারীরা অবিলম্বে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তুরাগ থানা কমিটির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান রুমনের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তার নামে ইস্যুকৃত সচিবালয়ের প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন কার্ডটি বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে মোস্তাফিজুর রহমান রুমনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।




ফ্যাসিবাদের দোসর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি সাচ্চুর ক্যাশিয়ার খ্যাত জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে গৃহকর্মী কুমু বেগমকে ১৯ বছর গৃহবন্দি রেখে নির্যাতনের অভিযোগ ও মামলা; সংবাদ সম্মেলনে গৃহকর্মীর ন্যায়বিচারের আকুতি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ফ্যাসিবাদের দোসর তৎকালীন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি গাজী মেজবাউল হোসেন সাচ্চুর ক্যাশিয়ার ও অত্যন্ত কাছের মানুষ মোঃ জাহাঙ্গীর লতিফ। সাচ্চুর বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজের সাথে এই জাহাঙ্গীর জড়িত। সাচ্চু পালিয়ে গেলেও জাহাঙ্গীর ধরা ছোয়ার বাইরে।

দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে গৃহকর্মী হিসেবে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন, বিনা বেতনে কাজ করানো, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ তুলে অভিযুক্ত মোঃ জাহাঙ্গীর লতিফের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কুমু বেগম। রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের জীবনের দীর্ঘ কষ্টের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। একই সঙ্গে তিনি প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাঙ্গীর লতিফ একপর্যায়ে তার ওপর যৌন নির্যাতন চালান। ভয় ও অসহায়ত্বে তিনি এতদিন বিষয়টি প্রকাশ করতে পারেননি। তিনি দাবি করেন, বছরের পর বছর শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সামান্য ভুলের জন্যও তাকে মারধর, অপমান এবং ভয়ভীতি দেখানো হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, জাহাঙ্গীর লতিফের দুই মেয়ে জেবা রাইসা ও দিয়া রাইসাও বিভিন্ন সময় তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করতেন। কুমু বেগমের দাবি, জাহাঙ্গীর লতিফের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তার ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। পরিবারের কয়েকজন সদস্য মিলে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতেন যাতে তিনি নিজেই বাসা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।

কুমু বেগম জানান, বিয়ের বয়স হলে তার বিয়ের সব খরচ বহনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে সেই প্রতিশ্রুতি রাখা হয়নি। বরং ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই তাকে কোনো অর্থ, নিরাপত্তা বা ভবিষ্যতের ব্যবস্থা না করেই চট্টগ্রামগামী একটি বাসে তুলে দিয়ে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে আদালতের মাধ্যমে মামলা করা হয়। মামলায় বলা হয়েছে, ১৯ বছরের বকেয়া বেতন (মাসিক ৩,০০০ টাকা হিসাবে) ৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা এবং বিয়ের খরচ বাবদ প্রতিশ্রুত ২ লাখ টাকাসহ মোট ৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে। মামলার নম্বর ১০৬/২০২৬। যা এখন কাফরুল থানার তদারকিতে রয়েছে।

কুমু বেগমের অভিযোগ, জাহাঙ্গীর লতিফ বর্তমানে উত্তর ইব্রাহিমপুরে নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। তার নামে একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে এসব সম্পদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো যাচাইয়ের তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।

মামলায় জাহাঙ্গীর লতিফের বিরুদ্ধে প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে কুমু বেগম অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর বর্তমানে বিভিন্ন বিএনপি নেতাদের নাম ব্যবহার করে তাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন এবং নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করছেন। এবং তার সাথে বিএনপির বড় নেতা ও পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে সখ্যতার কথা সবাইকে বলে বেড়ান ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে নানা ধরণের অনৈতিক কাজ করে থাকেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, মিলন নামে জাহাঙ্গীর লতিফের এক সহযোগী দীর্ঘদিন ধরে তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সহায়তা করে আসছেন এবং তার একান্ত সহকারী ও ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া জাহাঙ্গীর লতিফকে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি গাজী মেজবাউল হোসেন সাচ্চুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের আর্থিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আছেন। আরও দাবি করা হয়, ২০২৪ এর ৫ আগস্ট মিরপুরে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। তবে এসব রাজনৈতিক অভিযোগের পক্ষে সংবাদ সম্মেলনে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত মোঃ জাহাঙ্গীর লতিফ, তার সহযোগী মিলন এবং গাজী মেজবাউল হোসেন সাচ্চুর বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত, ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান।   




চাকরির এক দশকে শতকোটি টাকার সম্পদ, ঘুষ, সিন্ডিকেট ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগে আলোচনায় কাস্টমস কর্মকর্তা তুহিন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) অধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তা তুহিন চৌধুরীকে ঘিরে একের পর এক দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে তিনি রংপুর ভ্যাট কমিশনারেটে কর্মরত থাকলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মাত্র এক দশকের চাকরিজীবনেই তিনি শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি চাকরির বৈধ আয়ের সঙ্গে তার সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই।

অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, ২০১৪ সালে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তুহিনের প্রথম কর্মস্থল ছিল যশোর ভ্যাট কমিশনারেট। সেখানে প্রায় দুই বছর দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী সূত্রের দাবি, বিভিন্ন অজুহাতে প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অর্থ আদায় করা হতো।

২০১৬ সালে তার বদলি হয় তৎকালীন ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে, যা বর্তমানে দক্ষিণ বন্ড কমিশনারেট নামে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, এই পদায়নের জন্য তিনি বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেন। এরপর বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফাইল আটকে রাখা, ছাড়পত্র দিতে ঘুষ দাবি এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় ছিল নিয়মিত ঘটনা। অনুসন্ধানে আরও দাবি করা হয়েছে, এসব কর্মকাণ্ডের অভিযোগে এক পর্যায়ে তাকে ছয় মাসের জন্য সাময়িক বরখাস্তও করা হয়। তবে পরে তিনি পুনরায় কাজে যোগ দেন এবং আগের মতোই প্রভাব খাটিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যান বলে অভিযোগ।

অভিযোগ অনুযায়ী, বন্ড কমিশনারেটে কর্মরত থাকাকালীন সময়েই রাজধানীর রামপুরায় প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনেন তুহিন। একই সময়ে নেত্রকোনার বারহাট্টায় তার পরিবারের সদস্যদের নামে জমিসহ বাড়ি কেনা হয়। এছাড়া সেখানে একটি পার্ক নির্মাণ এবং প্রায় ২০ বিঘা জমি ক্রয়েরও অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানকারী সূত্রগুলোর দাবি, ওই সময়েই তার সম্পদের পরিমাণ কয়েক দশ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়।

পরবর্তীতে সিলেটের তামাবিল শুল্ক স্টেশনে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, সীমান্ত দিয়ে প্রবেশকারী পণ্যবাহী ট্রাক থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হতো এবং প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ সংগ্রহ করতেন তিনি। একই সঙ্গে মাদক সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, এক পর্যায়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে মদসহ আটক হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এছাড়া সিলেটে অর্জিত অবৈধ অর্থ গ্রামের একটি মুদি দোকানের ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের অভিযোগও রয়েছে। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অর্থ দিয়ে বিষয়টি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

এরপর চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোন পণ্য কখন খালাস হবে, কোন ফাইল আগে নিষ্পত্তি হবে কিংবা কোন আমদানিকারককে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হবে—এসব বিষয় ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতো। একাধিক সিএন্ডএফ ব্যবসায়ীর দাবি, বিভিন্ন পণ্য ছাড়ের ক্ষেত্রে কমিশনারের নাম ব্যবহার করে ঘুষ আদায় করতেন তুহিন। এছাড়া কাস্টমস হাউসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের পছন্দের লোক বসাতে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, চট্টগ্রামে কর্মরত অবস্থায়ও তিনি বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করেন এবং রাজধানীর গুলশানে একটি অভিজাত ফ্ল্যাট কেনেন।

তুহিনের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার বারোঘর গ্রামে। তার বাবা মৃত চন্দন চৌধুরী একজন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন এবং মা নিলিমা দেবনাথ ছিলেন একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বড় ভাই তুষার চৌধুরী ও বড় বোন বাণী চৌধুরীও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। মেজ ভাই সরকারি কলেজের শিক্ষক। অভিযোগ রয়েছে, পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নামে বিপুল পরিমাণ জমি, বাড়ি, ব্যাংকে এফডিআর ও ডিপিএসসহ বহু সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, স্বল্প সময়ে এত সম্পদ অর্জন তাদের কাছেও বিস্ময়ের বিষয়।

ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে তুহিনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১২ সালে প্রথম বিয়ে করলেও পরবর্তীতে চাকরিসংক্রান্ত সুবিধার জন্য সেই বিয়ের তথ্য গোপন করেন। পরে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় আরেকজন বিবাহিত নারীকে বিয়ে করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর গুলশানের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কাস্টমস ও ভ্যাট কর্মকর্তা তুহিন অভিযোগ অস্বীকার না করে বলেন, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগে কম-বেশি অনেকেরই অবৈধ সম্পদ রয়েছে। নিজের সম্পদের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আপনাকে কি উত্তর দিতে হবে? দুদকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিষয়টি দেখবে। আপনি দেখার কে?”—এ কথা বলেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।




১২ বছরের চাকরিতে শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ, কাস্টমস কর্মকর্তা আলতাফকে ঘিরে নানা প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা আলতাফ হোসেনকে ঘিরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কর্মরত রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, মাত্র ১২ বছরের চাকরি জীবনে তিনি শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার নামে এবং স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনের নামে বিভিন্ন স্থানে ফ্ল্যাট, প্লট, স্থাবর সম্পত্তি ও ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জ উপজেলার ফুলহাতা গ্রামে তার নির্মিত বিলাসবহুল বাড়িও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

তথ্য অনুযায়ী, আলতাফ হোসেন ২০১৪ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। এরপর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। সে সময় প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক ছিলেন ড. শহিদুল ইসলাম। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময় আলতাফ হোসেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিভিন্ন অভিযানে প্রভাব বিস্তার করতেন এবং সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ঘুষ, তদবির ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার ফ্রেইট ইউনিটে তিনি নিয়মের চেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। যেখানে সাধারণত একটি পদে ছয় মাসের বেশি থাকার নিয়ম না থাকলেও তিনি প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় সেখানে ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। ওই সময়ে আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত বিভিন্ন ফাইল নিষ্পত্তি, পণ্য ছাড় এবং তদন্ত কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে তৎকালীন শুল্ক গোয়েন্দা প্রধানও অবগত ছিলেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, দশম গ্রেডের একজন সরকারি কর্মকর্তার চাকরিজীবনে বৈধ আয়ের সঙ্গে তার বর্তমান সম্পদের কোনো মিল পাওয়া যায় না। হিসাব অনুযায়ী গত এক যুগে তার মোট সরকারি বেতন ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। অথচ তিনি ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লটের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যাত্রাবাড়ীর দনিয়া এলাকার ৩০০/১ পূর্ব রসুলপুরে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং রসুলপুরের মাস্টারবাড়িতে নির্মাণাধীন ১১ তলা ভবনের নবম তলায় আরেকটি ফ্ল্যাট রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া তার স্ত্রী ও আত্মীয়-স্বজনের নামে বিভিন্ন স্থানে সম্পদ এবং ফিক্সড ডিপোজিট থাকারও দাবি করা হয়েছে।

বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জ উপজেলার ফুলহাতা গ্রামে আলতাফ হোসেনের বাড়ি। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ায় এলাকায় তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরিতে মুন্সীগঞ্জ কোটার সুবিধা নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। এসব বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তদন্ত করলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন।

সম্প্রতি এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনেও আলতাফ হোসেনের সক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আন্দোলন পরিচালনা ও সংগঠিত করতে তিনি এবং তার ঘনিষ্ঠ একটি সিন্ডিকেট বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন এবং সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ বিষয়ে ভিডিও ফুটেজও রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

আরও অভিযোগ রয়েছে, এনবিআরের একজন সাবেক প্রভাবশালী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সুপারিশে আলতাফ হোসেনের সরকারি চাকরি হয়। পরবর্তীতে সেই কর্মকর্তার প্রভাব ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন দপ্তরে নিজের ক্ষমতা বিস্তার করেন এবং ঘুষ, তদবির ও প্রভাব খাটিয়ে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এভাবেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

চাকরি জীবনে কিশোরগঞ্জ, খুলনা, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং বর্তমানে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালন করেছেন আলতাফ হোসেন। চট্টগ্রামে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত ফাইল নিষ্পত্তিতে ঘুষ ছাড়া কাজ করেন না—এমন অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী ও সিএন্ডএফ এজেন্ট। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের অর্থ না দিলে ফাইল আটকে রেখে হয়রানি করা হতো। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের নতুন কমিশনার তাকে অন্যত্র বদলির সিদ্ধান্ত নেন বলেও জানা গেছে। এরপর সেই বদলি ঠেকাতে এনবিআরের বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির চালানোর অভিযোগও উঠেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে আলতাফ হোসেনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার না করে দুটি ফ্ল্যাট থাকার কথা স্বীকার করেন। এছাড়া তার আরও সম্পদ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, ফোনালাপে তিনি দুদক ও এনবিআরকে অর্থের মাধ্যমে প্রভাবিত করার কথাও বলেছেন। তবে এই বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

আলতাফ হোসেনের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ এখন সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।




মৌলভীবাজারে পানি প্রকল্পে লুটপাটের অভিযোগ, ঠিকাদার উধাও, সেবা থেকে বঞ্চিত শতাধিক পরিবার

বিশেষ প্রতিবেদকঃ মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সুপেয় পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার স্থাপন প্রকল্পের কাজ নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নিজস্ব এক কর্মী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কাজটি বাগিয়ে নেন। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। এরই মধ্যে কোটি টাকার বিল তুলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লাপাত্তা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, ‘প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড লিবার্টি ট্রেডার্স (জেভি)’ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে কাজটি নেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের এক ড্রাফটসম্যান। মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামানের যোগসাজশে তিনি কাজটি পেয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

২০২৩ সালে প্রায় ১০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ পায় প্রতিষ্ঠানটি। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয়। এরপরও কাজ শেষ না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোটি টাকার বিল তুলে উধাও হয়ে যায় বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির অর্থায়নে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের যৌথ বাস্তবায়নে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যবিধি’ শীর্ষক প্রকল্পের কাজ ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল।

প্রকল্পের আওতায় মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার সব ইউনিয়নে ৭৬টি পানি সরবরাহ লাইন স্থাপন এবং কমিউনিটিভিত্তিক পাইপলাইনের মাধ্যমে হতদরিদ্র ৩০ থেকে ৪০টি পরিবারে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মৌলভীবাজার সদরের ৩৮টির মধ্যে মাত্র ২টিতে আংশিক কাজ হয়েছে। আর রাজনগরের ৩৮টির একটিতেও কোনো কাজ হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক বছর ধরে উধাও।

রাজনগরের বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই প্রকল্পের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। স্থানীয়রাও প্রকল্প সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না।

মৌলভীবাজার সদরের চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের কির্তার মহলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আংশিক কাজ করে চলে যায়। পরে স্থানীয়রা নিজেদের প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ করে মোটর, পাইপ ও মিটার সংযোগ দিয়ে পানি সরবরাহ চালু করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা সুমন মালাকার বলেন, “এখানে ৩০টি পরিবার এই লাইন থেকে পানি পায়। মোটর, সিঁড়ি কিছুই দেওয়া হয়নি। ঠিকাদার যে পাইপ লাগিয়েছিল, তা কয়েক দিনের মধ্যেই ফেটে যায়। কাজ খুবই নিম্নমানের হয়েছে।”

এদিকে জেলা ও উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরও জানে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কত টাকা বিল তুলেছে। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদুজ্জামানের কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, শাহিন আলম একসময় ফেনী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের ড্রাফটসম্যান ছিলেন। ২০১৮ সালের নভেম্বরে ২১ হাজার ৪৭০ টাকা বেতন স্কেলে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। গত বছর একটি জাতীয় দৈনিকে তার বিরুদ্ধে ছয় বছরে শতকোটি টাকার মালিক হওয়ার অভিযোগ প্রকাশিত হয়।

প্রাইম ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড লিবার্টি ট্রেডার্সের অন্যতম পরিচালক রমিজ মিয়া বলেন, “এই কাজের মালিক শাহিন। সে জনস্বাস্থ্যে চাকরি করে আবার ঠিকাদারিও করছে। আমি থাকা অবস্থায় ৯০ লাখ টাকার বিল তুলেছিলাম। এরপর আর জানি না।”

মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের এই কাজের বিষয়ে আমাদের কিছু জানা নেই। কত বিল তোলা হয়েছে, তাও জানি না। নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে কাজ শেষ করা হবে।”

প্রকল্প পরিচালক তবিবুর রহমান তালুকদার বলেন, “সে নিজের নামের লাইসেন্সে কাজ করেনি। অন্য লাইসেন্স ব্যবহার করেছে।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে শাহিন আলমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।




ই/এম বিভাগ-৫-এর টেন্ডার মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগ, নির্বাহী প্রকৌশলী তামজিদ হোসেনকে আইনি নোটিশ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-৫-এর একটি সরকারি টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করার পরও একটি যৌথ উদ্যোগ (JV) প্রতিষ্ঠানকে অন্যায়ভাবে ‘নন-রেসপনসিভ’ (অযোগ্য) ঘোষণা করে অন্য একটি সংস্থাকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
আজ শুক্রবার নির্ভরযোগ্য সূত্র ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

কী ঘটেছিল?
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ‘Baset Prokousholi Limited–Versatile Technology Ltd JV’ নামের একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান উক্ত টেন্ডারে অংশ নেয়। প্রতিষ্ঠানের আইনজীবীদের দাবি, টেন্ডারের শর্ত মোতাবেক প্রয়োজনীয় সমজাতীয় কাজের অভিজ্ঞতা (Similar Nature Work Experience), সমাপ্তি সনদ (Completion Certificate) এবং কাজের পরিধি (Scope of Work) সংক্রান্ত সব বৈধ কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। টেন্ডার নথিতে নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পের নাম নয়, বরং কাজের ধরন ও কারিগরি জটিলতার সামঞ্জস্যতা চাওয়া হয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, উক্ত যৌথ প্রতিষ্ঠানটি এর আগে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম প্রকল্পে ইন্টারনাল ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কস, স্টেজ লাইটিং, সাউন্ড সিস্টেম, এলইডি ডিসপ্লে, এয়ার কন্ডিশনিং এবং অ্যাকোস্টিক ওয়ার্কসের মতো অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তিগত কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। কিন্তু মূল্যায়ন কমিটি রহস্যজনকভাবে সেই অভিজ্ঞতাকে আমলে না নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে অযোগ্য ঘোষণা করে এবং অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ‘Notification of Award (NOA)’ বা কার্যাদেশ জারির নোটিশ দেয়।

এই অনিয়মের প্রতিবাদে বঞ্চিত প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. সাজ্জাদ হোসেন পলাশ গত ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর একটি আইনি নোটিশ পাঠান।
নোটিশে বলা হয়, এই ধরনের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সরকারি ক্রয়বিধির (PPR) স্বচ্ছতা, সমতা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার নীতির পরিপন্থী। নোটিশে অবিলম্বে ৩টি দাবি জানানো হয়েছে:
১. প্রতিষ্ঠানটিকে ‘নন-রেসপনসিভ’ ঘোষণার সুনির্দিষ্ট কারণ লিখিতভাবে জানাতে হবে।
২. জমাকৃত অভিজ্ঞতার সনদসমূহ পুনরায় নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
৩. তড়িঘড়ি করে জারি করা NOA-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
একই সাথে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যথাযথ ও সন্তোষজনক পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বিষয়টি বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (BPPA) রিভিউ প্যানেল এবং উচ্চ আদালতে নিয়ে যাওয়া হবে।

​আইনি নোটিশে শুধু বর্তমান টেন্ডারই নয়, বরং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নির্বাহী প্রকৌশলী তামজীদ হোসেনের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত একাধিক উচ্চমূল্যের প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নোটিশে সুনির্দিষ্টভাবে তিনটি বড় প্রকল্পের আর্থিক অনিয়মের খতিয়ান তুলে ধরা হয়:

​১. শাহবাগ বিসিএস প্রশাসন একাডেমি প্রকল্প (টেন্ডার আইডি-১১০৯৩০১): প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ৩২ হাজার টাকা ব্যয়ে আধুনিক ক্লাসরুম নির্মাণ, সাউন্ড, কনফারেন্স ও ইন্টারনেট সিস্টেম স্থাপন।

২. কাকরাইল বিএমইটি ভবন প্রকল্প (টেন্ডার আইডি-১০৮১৮১০): প্রায় ৮৯ লাখ ৩৬ হাজার ৯০৩ টাকা ব্যয়ে ৫০০ কেভিএ সাবস্টেশন প্রতিস্থাপন।

৩. জিএসবি ভবন প্রকল্প (টেন্ডার আইডি-১০৭২১৪৫৮): প্রায় ১ কোটি ৫১ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে ১২৫০ কেভিএ সাবস্টেশন স্থাপন।

​নোটিশে অভিযোগ করা হয়, এসব প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার ন্যূনতম পরিবেশ বজায় রাখা হয়নি। বিশেষ করে লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড (LTM)-এর অপব্যবহার করে অনেক ক্ষেত্রে মাত্র একটি সিডিউল বিক্রি ও একটি মাত্র দরপত্র জমা নিয়েই তড়িঘড়ি করে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের একতরফা প্রক্রিয়া সরকারি ক্রয়ের প্রতিযোগিতামূলক এবং উন্মুক্ত নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক বলে নোটিশে দাবি করা হয়।

সাংবাদিকতার নীতি মেনে এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী তামজিদ হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। গত ০২ জুলাই ২০২৬, বিকেল ৫টা পর্যন্ত চেষ্টা করেও তিনি কোনো লিখিত বা মৌখিক বক্তব্য দেননি। অভিযোগের বিষয়ে তার এই নীরবতা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি উন্নয়ন কাজে স্বচ্ছতা ও সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম আইনি দায়িত্ব। যদি এই অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা কেবল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি অন্যায় নয়, বরং গোটা সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার (Public Procurement) নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। সচেতন মহল এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।




রাজনৈতিক প্রভাবে বারবার শাস্তি এড়ানোর অভিযোগ, বিআরটিসির কর্মকর্তা নায়েব আলীকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

বিশেষ প্রতিবেদক: বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি)-এর বিভিন্ন ডিপোতে সীমাহীন অনিয়ম, রাজস্ব আত্মসাৎ এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিপুল আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে বর্তমান গাবতলী বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ইউনিট প্রধান এবং ম্যানেজার (টেকনিক্যাল) নায়েব আলীর বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একাধিক ঘটনায় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক তদবির এবং প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করার মাধ্যমে তিনি বারবার শাস্তি এড়িয়ে গেছেন।

বিআরটিসির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নায়েব আলীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হলে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ, দায়িত্বে অবহেলা এবং প্রশাসনিক অনিয়মের একাধিক গুরুতর ঘটনা সামনে আসতে পারে। এ কারণে তার বিরুদ্ধে পূর্বের সব অভিযোগ পুনরায় তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৬ সালে জোয়ারসাহারা বাস ডিপোর ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাসের মেরামত না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ওই বছরের ৮ মে তৎকালীন মন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনে ডিপোর ৫৭৩৯, ৫৭৪১ এবং ৫৩৮১ নম্বর বাস অত্যন্ত নিম্নমানের ও চলাচলের অনুপযোগী হিসেবে শনাক্ত হয়। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কর্পোরেশনের আদেশ নং-৩৫.০৪.০০০০.০১১.০০.৪৬৬.৮৮৭ অনুযায়ী নায়েব আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ওই বরখাস্তাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে পুনরায় কর্মস্থলে যোগদান করেন।

নায়েব আলীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে মতিঝিল বাস ডিপোতে ম্যানেজার (অপারেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে, যা ছিল ২৭ মার্চ ২০১৯ থেকে ৩০ অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত। অভিযোগ অনুযায়ী, LoC-2 ঋণ প্রকল্পের আওতায় ভারত থেকে আমদানিকৃত নতুন ৩৫টি বাস সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার পরিবর্তে অনুমোদনহীনভাবে কম ভাড়ায় পরিচালনা করা হয়। এতে প্রতিদিন গড়ে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৮৭ টাকা হারে কর্পোরেশনের মোট ৮ কোটি ২০ লাখ ৬২ হাজার ৬৮৩ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়।

কর্পোরেশনের অডিট বিভাগের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নায়েব আলীর দায়িত্বে অবহেলার কারণে সরাসরি ১ কোটি ৭৭ লাখ ৪১ হাজার ৮০৭ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২০ সালের ১৩ অক্টোবর পত্র নং-১৭৮৫ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামকে প্রভাবিত করে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি প্রথমে প্রাপ্ত দুই বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের দণ্ড (আদেশ নং-২৪২২) কমিয়ে এক বছরে নামিয়ে আনতে সক্ষম হন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্তযোগ্য গুরুতর অভিযোগ।

খুলনা বাস ডিপোতে ম্যানেজার (অপারেশন) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেও তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর কর্পোরেশনের পত্র নং-২১০৯ অনুযায়ী ভুল তথ্য উপস্থাপন করে ৪ লাখ ৮৭ হাজার ১৯০ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যয়ের অভিযোগে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে তিনি ওই অভিযোগও ধামাচাপা দিতে সক্ষম হন এবং কার্যকর কোনো শাস্তির মুখোমুখি হননি।

বিআরটিসির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, বিগত সরকারের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে নায়েব আলীর মতো বিতর্কিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, বিআরটিসিকে দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে নায়েব আলীর বিরুদ্ধে ওঠা অতীতের সব অভিযোগের ফাইল পুনরায় খুলে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে রাষ্ট্রীয় অর্থ উদ্ধার, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিভাগীয়ভাবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিও জোরালোভাবে উঠেছে।
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো বিভিন্ন নথি, বিভাগীয় কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। অভিযুক্ত কর্মকর্তা নায়েব আলীর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।