এলবিয়ন গ্রুপকে ঘিরে নানা অভিযোগ: নিম্নমানের ওষুধ, রাজস্ব ফাঁকি ও প্রতারণার তদন্ত চলছে

এসএম বদরুল আলমঃ দেশের ওষুধ শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এলবিয়ন গ্রুপ সম্প্রতি বারবার আলোচনায় আসছে নানা অভিযোগের কারণে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একদিকে প্রতারণা ও চাঁদাবাজির মামলা চলমান, অন্যদিকে নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন এবং শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করছে বিভিন্ন সংস্থা। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন বড় ধরনের বিতর্কের ঘূর্ণাবর্তে।

চট্টগ্রামের ইনোভেটিভ ফার্মার স্বত্বাধিকারী কাজী মোহাম্মদ শহিদুল হাসান ২০২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি কোতোয়ালিতে মামলা দায়ের করেন। তিনি অভিযোগ করেন, এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাইসুল উদ্দিন, এমডি মোহাম্মদ মুনতাহার উদ্দিন এবং চিফ অ্যাডভাইজার নিজাম উদ্দিন চুক্তিভঙ্গ ও প্রতারণা করেছেন। ১০ বছরের চুক্তি অনুযায়ী এলবিয়ন ওষুধ উৎপাদন করে লাভ ভাগাভাগি করার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে তারা চুক্তি ভেঙে ৫-৬ কোটি টাকার ওষুধ ইনোভেটিভ ফার্মার গুদামে জমা রেখে ৯টি খালি চেক জামানত হিসেবে নেয়। পরে আবার সেই ওষুধ ফেরত নিয়ে চেকগুলো ফেরত দিতে টালবাহানা শুরু হয়। এমনকি হুমকি দিয়ে ২ কোটি টাকার চাঁদা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়। মামলা নম্বর—১৫১/২৩। বিষয়টি তদন্ত করছে চট্টগ্রাম মেট্রোর পিবিআই।

এদিকে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবরের এক রিপোর্টে দেখা যায়, এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজের উৎপাদিত বেশ কিছু ওষুধের মান স্বাভাবিক মানদণ্ডের নিচে। ‘মিমক্স’ নামের অ্যান্টিবায়োটিক ক্যাপসুলে অ্যামোক্সিসিলিনই পাওয়া যায়নি, বরং ভিতরে ছিল সাদা দানা ধরনের পাউডার। ‘ইনডোমেথাসিন’ ক্যাপসুলেও নির্ধারিত পরিমাণের কম উপাদান পাওয়া গেছে। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো—মানুষ ও পশুর ওষুধ একই ভবনে তৈরি করা হচ্ছিল, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে। এছাড়া বাজারে অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামে ওষুধ বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে, যা নিম্নমানের উৎপাদনের ইঙ্গিত বহন করে।

দুদকে জমা পড়া অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কর বছরভিত্তিক গোপনে কোটি কোটি টাকার আমদানি-বিক্রয় করেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে ২০২১-২২ পর্যন্ত গোপন রাখা আমদানি ও বিক্রয়ের হিসাব মোটেই ছোট নয়—শুধু একটি বছরেই গোপন আমদের পরিমাণ ৪৯ কোটি টাকার ওপরে। আরও অভিযোগ রয়েছে মালিকপক্ষের নামে বেনামী জমি, একাধিক দামি গাড়ি, ৭টি প্রতিষ্ঠান ও ৯টি ব্যাংক হিসাব গোপন রাখা নিয়ে।

সংস্থাটি বিদেশে উচ্চমানের ওষুধ রপ্তানির দাবি করলেও তদন্তে জানা যাচ্ছে, এসব প্রচারণার অনেক তথ্যই ভ্রান্ত। দেশে মানহীন ওষুধ উৎপাদনের মাঝে রপ্তানি নিয়ে এমন প্রচারণা প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

এলবিয়ন গ্রুপের অধীনে রয়েছে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড, এলবিয়ন অ্যানিমেল হেলথ, ব্লু অ্যাকোয়া ড্রিংকিং ওয়াটার, ফেভারিট লিমিটেড, ক্লিনজি ফরমুলেশন, ফবিটা, এলবিয়ন ট্রেডিং কর্পোরেশন, এলবিয়ন ডিস্ট্রিবিউশন, সেগাফ্রেডো জেনেতি এসপ্রেসো (ইতালি) ও এলবিয়ন স্পেশালাইজড ফার্মা লিমিটেডসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রতারণা মামলা, মানহীন ওষুধ উৎপাদন, বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণা—এই চার দিকের অভিযোগ এখন প্রতিষ্ঠানটিকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে। এসব বিষয়ে সত্যতা যাচাই এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য পিবিআই ও দুদকের সক্রিয় তৎপরতা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।

 




লন্ডন সফরকে ঘিরে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের আবুল বাশারকে নিয়ে নতুন বিতর্ক

এসএম বদরুল আলমঃ নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার ও শিপ সার্ভেয়ার মো. আবুল বাশার এবার ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) কাউন্সিল নির্বাচনে অংশ নিতে লন্ডনে যাচ্ছেন। কিন্তু তার এই সফর নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে, কারণ বর্তমান মহাপরিচালকের অনুমোদন ছাড়াই তাকে প্রতিনিধিদলে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং তালিকায় তার নাম যুক্ত করেছেন অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক এবং বর্তমানে নেভি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ডের কমান্ড্যান্ট রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মাকসুদ আলম।

অভিযোগ উঠেছে, বর্তমান মহাপরিচালক শফিউল বারী নির্বাচনী প্রচারণায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন না—এমন যুক্তিতে পুরোনো ডিজি মাকসুদকে বিশেষ আগ্রহে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। তিনি এখনো নৌপরিবহন উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ হিসেবে নৌসেক্টরে প্রভাব বজায় রেখেছেন, এমন মন্তব্যও রয়েছে কর্মকর্তাদের মধ্যে। অন্যদিকে আবুল বাশারসহ বাকি দল ২৪ থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত লন্ডনে অবস্থান করে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নেবেন।

এদিকে আবুল বাশারকে ঘিরে বহুদিন ধরেই নানা অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার বিরুদ্ধে পরীক্ষায় ঘুষ নিয়ে পাস করানো, প্রকল্পের বিল আটকে অর্থ আদায়, কন্ট্রাক্টরদের কাছ থেকে কমিশন নেয়া, পিজি আটকে রেখে টাকা দাবি, অডিট খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়—এরকম একাধিক অভিযোগ মন্ত্রণালয়ে জমা আছে। এসবের মধ্যে একটি বিভাগীয় মামলার তদন্তও চলছে। এমনকি তিনি নিজের শ্যালককে নিয়ম ভেঙে কন্ট্রাক্টরি কাজ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সতর্ক সূত্র বলছে, তিনি প্রায়ই বিভিন্ন স্টার হোটেলের বার ও স্পা সেন্টারে সময় কাটান এবং মদ্যপ হয়েই বের হন—যা সরকারি চাকরির বিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। গত পাঁচ বছরে এমন আচরণের জন্য কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। পাশাপাশি মার্চেন্ট ও ইনল্যান্ড পরীক্ষায় মোটা অঙ্কের বিনিময়ে ফল পরিবর্তনের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি—চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি অস্বাভাবিক হারে সম্পদশালী হয়ে উঠেছেন, বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর, ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও জমির মালিকানা তার নামে-বেনামে রয়েছে।

তার অতীত নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির ৩৮তম ব্যাচে প্রশিক্ষণকালীন সময়ে নীতিভ্রষ্ট আচরণের অভিযোগে পুরো ব্যাচ বহিষ্কারের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। পরে বিভিন্ন শিপিং কোম্পানিতে অপ্রফেশনাল আচরণের জন্য তাকে চাকরি থেকে বাদ দেয়া হয়। এমনকি এমভি জাহান মনির দ্বিতীয় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালে ইচ্ছাকৃতভাবে ইঞ্জিন নষ্ট করার ঘটনাও মালিকপক্ষ তাকে চিরতরে নিষিদ্ধ করে।

বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক তদবীরে তিনি সরকারি চাকরি পান এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও তিনি রাজনৈতিক খাতিরে গুরুত্ব পেয়েছেন।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আবুল বাশার দাবি করেন—সবকিছুই তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার। তবে ভুক্তভোগীদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া যাবে এবং তারা নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দ্রুত তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন।




এনবিআর সদস্য বদিউল আলমের বিদেশযাত্রায় আদালতের নিষেধাজ্ঞা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত এনবিআর-এর সদস্য (কর লিগ্যাল অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) এ কে এম বদিউল আলমের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের করা আবেদনের ভিত্তিতে বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজ এই আদেশ দেন। বিষয়টি আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. রিয়াজ হোসেন নিশ্চিত করেছেন।

দুদকের সহকারী পরিচালক পিয়াস পাল আদালতে আবেদনের মাধ্যমে জানান, বদিউল আলমের জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ে বর্তমানে অনুসন্ধান চলছে। তিনি দেশ ছাড়ার চেষ্টা করতে পারেন—এমন তথ্য পাওয়ায় অভিযোগের সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তার বিদেশযাত্রা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা প্রয়োজন বলে দুদক মনে করে। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করে তার বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।




স্বাস্থ্য সরঞ্জাম–এলজিইডি অফিস–স্কুল নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ, তিন জেলায় দুদকের আকস্মিক অভিযান

বিশেষ প্রতিবেদকঃ দুর্নীতি সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে দেশের তিন জেলায় একদিনে তিনটি অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার, ১৯ নভেম্বর, দুদকের পটুয়াখালী, রংপুর ও টাঙ্গাইল কার্যালয় থেকে আলাদা টিম এসব অভিযান পরিচালনা করে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম।

দুদক জানায়, প্রথম অভিযানে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে স্বাস্থ্য সরঞ্জাম ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ক্রয়ের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় সেখানে এনফোর্সমেন্ট টিম পাঠানো হয়। টিম প্রকল্প পরিচালকের কাছ থেকে টেন্ডার সংক্রান্ত সমস্ত কাগজপত্র সংগ্রহ করে এবং তাঁর বক্তব্য নেন। টেন্ডার জমা দেওয়ার সময়সীমা এখনো ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চলমান থাকলেও এর মধ্যেই অনিয়মের অভিযোগ উঠায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সব নথি যাচাই করে পরে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কমিশনে পাঠানো হবে।

অন্যদিকে রংপুরের গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা এলজিইডি অফিসে ঠিকাদারদের ভয়ভীতি দেখানো, ঘুষ দাবি এবং বিভিন্ন হয়রানির অভিযোগে আরেকটি দল অভিযান চালায়। সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়া হয় এবং প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়। অভিযানের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও পর্যবেক্ষণ করে টিম। ভিডিওতে একজনকে টাকা গ্রহণ করতে দেখা গেলেও এটি ঘুষ কিনা নিশ্চিত হতে আরও প্রমাণ প্রয়োজন বলে জানায় দুদক।

তৃতীয় অভিযানটি পরিচালিত হয় টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলায়। অভিযোগ ছিল—পিইডিপি–৪ প্রকল্পের অধীনে বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজে অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ এবং অগ্রিম বিল তুলার ঘটনা। এনফোর্সমেন্ট টিম নিরপেক্ষ প্রকৌশলীকে সঙ্গে নিয়ে সরেজমিনে কাজ পরিদর্শন করে এবং প্রাথমিকভাবেই কয়েকটি অনিয়মের সত্যতা পায়। এখানে পাওয়া নথিপত্র বিশ্লেষণ করে বিস্তারিত প্রতিবেদন পরে কমিশনে জমা দেওয়া হবে।

পুরো দিনজুড়ে হওয়া এসব তিনটি অভিযানে স্বাস্থ্য খাত থেকে শুরু করে সরকারি নির্মাণশিলা পর্যন্ত বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুদক, যাতে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়।




রাকাব কর্মকর্তা আবুল কালামের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ, তদন্তে নেমেছে দুদক

রাজশাহী প্রতিবেদকঃ রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)–এর আইসিটি বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. আবুল কালামের বিরুদ্ধে ডিজিটাইজেশনের নামে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ যাচাই করতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে একটি অনুসন্ধানকারী দল গঠন করে তদন্ত শুরু করেছে।

দুদকের সহকারী পরিচালক ও অনুসন্ধানকারী দলের প্রধান মো. আমির হোসাইন গত ৩০ অক্টোবর রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে অভিযোগ তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন নথি ও রেকর্ড সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়। বিশেষ করে ব্যাংকের ‘নেটওয়ার্ক ডিভাইস ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি (এএমসি), টেন্ডার আইডি: ৭৪৪০৭২’–সংক্রান্ত কোনো তদন্ত হয়ে থাকলে তার সত্যায়িত কপি ৪ নভেম্বরের মধ্যে দুদক কার্যালয়ে পাঠাতে বলা হয়।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, সদর দফতরের নির্দেশে রাজশাহী সমন্বিত জেলা কার্যালয় এই তদন্ত পরিচালনা করছে। অনুসন্ধানকারী দলে উপ-সহকারী পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমানও রয়েছেন।

প্রতিষ্ঠানটির ভেতর আগে থেকেও বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ রয়েছে—পদোন্নতিতে স্বজনপ্রীতি, ঋণ বিতরণে জালিয়াতি এবং কর্মকর্তাদের লাঞ্চ ভাতার নামে বেআইনি অর্থ প্রদানসহ নানা ঘটনা ব্যাংকের সুনাম ও আর্থিক অবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

নতুন অভিযোগের বিষয়ে জানতে মো. আবুল কালামকে ফোন করা হলেও তিনি কোনো কল রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সাধারণ নিয়মে প্রতি তিন বছর অন্তর কর্মকর্তাদের বদলি হওয়ার কথা। কিন্তু মো. আবুল কালাম ক্ষমতা ও টাকার জোরে একই কর্মস্থলে ১৭ বছর ধরে অবস্থান করছেন। পাশাপাশি তারা অভিযোগ করেন, সম্প্রতি ডিজিএম মো. মিজানুর রহমানের বদলি ঠেকাতে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সিবিএ নেতা মো. রায়হান আলীকে দিয়ে ‘মব’ তৈরি করেন এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চাপ প্রয়োগ করেন। প্রতিষ্ঠানের একটি ভিডিও ফুটেজেও ঘটনাটির প্রমাণ মিলেছে বলে জানানো হয়েছে।

সূত্র বলছে, আবুল কালাম আজাদ, মো. মিজানুর রহমান ও সিবিএ সভাপতি মো. রায়হান আলী—এই তিনজন মিলে ব্যাংকের মধ্যে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট হিসেবে কাজ করছেন।

দুদকের চলমান তদন্তে ব্যাংকের ভেতরের অনিয়ম প্রকাশ পাবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে—এমন আশা সংশ্লিষ্টদের।




শেখ হাসিনা-কামালকে দেশে ফেরাতে ইন্টারপোলকে চিঠির প্রস্তুতি এনসিবির

ডেস্ক নিউজঃ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সহায়তা চেয়ে নতুন চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)। চিঠির সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের কপিও সংযুক্ত করা হবে।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, রায়ের কপি হাতে পাওয়া মাত্রই চিঠি পাঠানো হবে। এর আগে ইন্টারপোলকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির অনুরোধ করে দুইবার চিঠি পাঠানো হলেও সংস্থাটি নোটিশ জারির যৌক্তিকতা সম্পর্কে ব্যাখ্যা চেয়েছিল।

গত সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তিনটি অভিযোগে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরও দুটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দেন। রায় ঘোষণার সময় দুজনেই পলাতক ছিলেন। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগের পর শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও একই সময়ে ভারতে আশ্রয় নেন।

রায় কার্যকর করতে এখন তাদের দেশে ফেরানোর দাবি জোরালো হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, শেখ হাসিনাকে ফেরানোর চেষ্টা আগে থেকেই চলছিল। তখন মামলা বিচারাধীন থাকায় দণ্ডের বিষয়টি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়নি। এখন রায় ঘোষণা হওয়ায় মৃত্যুদণ্ডের তথ্য যুক্ত করে নতুন করে চিঠি পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও সেই চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে। তাই ইন্টারপোলের মাধ্যমে প্রচেষ্টাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও আলাদা উদ্যোগ নিয়েছে।

রায় ঘোষণার পর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ইতিমধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে; প্রয়োজনে আরও চিঠি দেওয়া হবে।

পুলিশের কর্মকর্তারা বলেন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নয়, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে দেশে ফেরানোর আইনি প্রক্রিয়ায়ই এই উদ্যোগ। আগের চিঠির সময় তিনি শুধু পরোয়ানাভুক্ত ছিলেন, এখন তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত, ইন্টারপোলের নোটিশ জারির ক্ষেত্রে যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।




গণপূর্তে অনিয়ম ঢাকতে ‘সাফাই সাংবাদিকতা’: বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এটি গণমাধ্যমের জন্য ভয়াবহ সংকেত

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে যখন নানা পত্রিকা অনুসন্ধানী খবর প্রকাশ করছে, তখনই একদল স্বার্থান্বেষী সাংবাদিককে নিয়ে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। তারা নিজেরা সংবাদকর্মী হলেও দায়িত্ব পালন না করে বরং কিছু প্রভাবশালী প্রকৌশলীর প্রতি আনুগত্য দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। নানা অনলাইন পোর্টালে হঠাৎ করে দেখা যাচ্ছে এমন কিছু প্রতিবেদন, যেগুলো আসলে সাংবাদিকতা নয়—বরং নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের রক্ষায় ‘সাফাই প্রচার’।

সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম শাখার প্রকৌশলী মো. কায়কোবাদ–এর নাম জড়িয়ে কয়েকটি অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে ইতিবাচক, অতিরিক্ত প্রশংসামূলক ও প্রশ্নবোধক কিছু রিপোর্ট। এসব রিপোর্টে দেখা গেছে—একটি পত্রিকা অনিয়ম নিয়ে যখন অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশ করেছে, তখনই আরেক পত্রিকা বা পোর্টাল ঠিক তার উল্টো সুরে কায়কোবাদকে ‘সৎ, দক্ষ ও নিন্দিত হওয়ার অযোগ্য’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। যেন গণমাধ্যমের দায়িত্ব তথ্য তুলে ধরা নয়—কাউকে রক্ষা করা।

গণযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকরা বলছেন—এ ধরনের পাল্টা-রিপোর্ট আসলে সংবাদপত্র আইন ১৯৭৩–এর মৌলিক চেতনার পরিপন্থী। সাংবাদিকতার পেশাগত নীতিমালায় ‘স্বার্থসংঘাত’ স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ, কিন্তু এখানে সংবাদকে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘পিআর টুল’ হিসেবে। আইনজীবীদের মতে, কোনো রিপোর্টে অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি প্রমাণসহ আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিতে পারেন—কিন্তু এক পত্রিকার রিপোর্ট ঢাকতে আরেক পত্রিকার পক্ষে গিয়ে ব্যক্তিগত সাফাই দেওয়া আইনসম্মত নয়, এটি সরাসরি প্রেস এথিকস ভঙ্গ।

এই পাল্টা সাংবাদিকতার আরেকটি বড় সমস্যা হলো—ভুল ছবি, ভুল পরিচয়, অযথা ব্যক্তির প্রশংসা, অসংগত তথ্য জোড়া লাগানো। অভিজ্ঞ এক সম্পাদক তীব্র সমালোচনা করে বলেন, এসব ভুল কেবল অদক্ষতা নয়, বরং জনমত বিভ্রান্ত করার কৌশল। যেসব পত্রিকা সাধারণত অনিয়ম উন্মোচন করে, সেগুলোকে টার্গেট করেই এই ‘সাফাই সাংবাদিকতা’ চালানো হয়।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ভেতরের অবস্থার কথা তুলে ধরেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে। তাঁদের ভাষায়, গণপূর্তের প্রভাবশালী কয়েকজন প্রকৌশলী দীর্ঘদিন ধরে কয়েকজন সাংবাদিককে ব্যবহার করছেন নিজেদের ভাবমূর্তি ঠিক রাখতে। কোনো অনিয়ম প্রকাশিত হলেই শুরু হয়—অভিযুক্ত কর্মকর্তার ছবি এড়িয়ে অন্য কারো ছবি ব্যবহার, অনলাইনে হঠাৎ প্রশংসামূলক নিউজের বন্যা, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের কাছে ফোন করে ‘নরম করার চেষ্টা’, এবং আরেক পত্রিকার মাধ্যমে প্রথম রিপোর্টকে ভুল প্রমাণের খেলা। তাদের কথায়, “দুর্নীতির রিপোর্ট দেখলেই ওরা দালাল সাংবাদিক পাঠায়।”

দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য হলো সত্য প্রকাশ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে ঠিক উল্টো—যেখানে একটি পত্রিকা প্রশ্ন তুলছে, সেখানে অন্য পত্রিকা সেই প্রশ্নকে ভুল প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগছে। এতে প্রকৃত সত্য আড়ালে পড়ে যায়, জনমত বিভ্রান্ত হয় এবং দুর্নীতিবাজরা বাঁচার সুযোগ পায়।

দেশের সিনিয়র সাংবাদিক ও গণযোগাযোগবিদরা এ পরিস্থিতিকে গণমাধ্যমের জন্য একটি ভয়ংকর বিপদ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, সংবাদ কখনোই ব্যক্তিবিশেষের ঢাল হতে পারে না। সাংবাদিকতা সত্য উদ্ঘাটনের জায়গা, কারো ব্যক্তিগত প্রচারের প্ল্যাটফর্ম নয়। এভাবে স্বার্থান্বেষী প্রকৌশলী ও কিছু সাংবাদিকের যোগসাজশ চলতে থাকলে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আরো অস্বচ্ছ হবে, আর দুর্নীতি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

গণপূর্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হয়। এখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—যে পত্রিকা অনিয়ম প্রকাশ করে, তারা হয় চাপের মুখে পড়ে; আর যে পত্রিকা অনিয়ম আড়াল করে, তারা নানা সুবিধা পায়। এটি রাষ্ট্র, গণমাধ্যম এবং জনগণ—তিন পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর।

সবশেষে বলা যায়—সংবাদকে অস্ত্র বানিয়ে অনিয়ম আড়াল করা গণতন্ত্রের জন্য সরাসরি হুমকি। এক পত্রিকার রিপোর্ট ঠেকাতে আরেক পত্রিকার সাফাই কেবল অপেশাদার সাংবাদিকতা নয়, এটি সত্যকে চাপা দেওয়ার ভয়ংকর প্রচেষ্টা। প্রকৃত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, তথ্যভিত্তিক রিপোর্টিং এবং যথাযথ তদন্ত—গৃহপালিত সাংবাদিকতা নয়।




বিআরটিসিতে অনিয়মের শীর্ষে উপমহাব্যবস্থাপক গোলাম ফারুকের বিরুদ্ধে কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত। পুরোনো সরকারের সময় যেসব কর্মকর্তা প্রকাশ্যে দুর্নীতি করে তদন্ত প্রতিবেদনে ধরা পড়েছিলেন, তাদের অনেকেই এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল আছেন। সেই তালিকার সবচেয়ে আলোচিত নাম হচ্ছে বিআরটিসির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) গোলাম ফারুক। তার বিরুদ্ধে সরাসরি ৪ কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ বিভিন্ন তদন্তেই উঠে এসেছে। কিন্তু শাস্তির বদলে তিনি পেয়েছেন পদোন্নতি; এমনকি এখনো তিনি বিভিন্ন ডিপো, বাস, কাউন্টার লিজসহ নানা জায়গায় অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লাও তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে সহযোগিতা করছেন বলেই সংগঠনের অনেক কর্মচারীর দাবি।

বিভিন্ন তদন্তে দেখা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন ডিপোতে বাস মেরামত, যন্ত্রাংশ ক্রয়, রক্ষণাবেক্ষণ—এসব কাজে গোলাম ফারুক ও তৎকালীন ম্যানেজার (অপারেশন) নূর-ই-আলম ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে বিপুল টাকা লোপাট করেছেন। কোথাও অকেজো বাস কেটে বিক্রি করে অর্থ গায়েব করা, কোথাও আবার বিআরটিসির নিজস্ব চালকদের বাদ দিয়ে বাইরের চালকদের দিয়ে বাস চালিয়ে রাজস্ব জমা না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ আছে, এখনও তিনি মেয়াদোত্তীর্ণ লিজ বহাল রেখে বা লিজ দেওয়ার নামে নিয়মিত টাকা তুলছেন।

বিআরটিসি কর্মীদের ভাষায়, গোলাম ফারুক নামটি শুনলেই সবার মনে আসে ঘুষ, অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতার কথা। অনেকে দাবি করেন, আগের সরকার আমলে তিনি ব্যাপকভাবে সুবিধা পেয়েছেন এবং এখনো পূর্ববর্তী প্রভাবশালী মহলের লোকজনকে নানা উপায়ে সহায়তা করে যাচ্ছেন। কোনো ফাইল তার টেবিলে গেলে ঘুষ ছাড়া তা নড়াচড়া করে না—অনেক ভুক্তভোগী পরিবহন ব্যবসায়ী এমন অভিযোগই তুলে ধরেছেন।

তদন্ত নথিতে দেখা যায়, বগুড়া ডিপোতে কর্মরত অবস্থায় তিনি ২ কোটি ৩৩ লাখ ১১ হাজার ৭৫০ টাকা রাজস্ব তহবিলে জমা দেননি। আবার অন্য এক তদন্তে উল্লেখ আছে, বাইরের চালকদের দিয়ে গাড়ি চালিয়ে ১ কোটি ১২ লাখ ৬২ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে তার নেতৃত্বে। মোহাম্মদপুর ডিপোতে দায়িত্ব পালনের সময়ও রক্ষণাবেক্ষণ, বেতন, জ্বালানি—এসব খাতে অনিয়ম করে ২৮ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি করেছেন বলে বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে জানা যায়।

এতসব অনিয়মের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময় তদন্ত হলেও কোনো শাস্তি হয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব খাটিয়ে তিনি মামলা খারিজ করে নিয়েছেন এবং পরবর্তীতে পদোন্নতিও পেয়েছেন। শাজাহান খানের সময় তিনি বিশেষভাবে প্রভাবশালী ছিলেন—এমন কথাও বহু কর্মকর্তার মুখে শোনা যায়। ফলে এখনো কেউ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহস পান না।

গাবতলী ডিপোর ম্যানেজার থাকাকালীন তিনি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৩৫ লাখ টাকার বেশি পরিশোধ করেননি—এমন অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে বিআরটিসির বিভিন্ন নথিতে গোলাম ফারুকের বিরুদ্ধে মোট ৪ কোটি ৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

বিআরটিসির কর্মীদের মতে, বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লাও কোনোভাবে তাকে ঠেকাতে আগ্রহী নন, বরং নিজেও সুবিধাভোগী। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখন সীমাহীন অনিয়ম আর দুর্নীতির মধ্যে আটকে গেছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ কয়েকবার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করলেও তা কার্যকর না হওয়ায় অনেকেই হতাশ।

অনেক কর্মচারী প্রশ্ন তুলছেন—যদি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারেও এমন বিতর্কিত কর্মকর্তাদের সরানো না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে দুর্নীতিগ্রস্ত একটি গোষ্ঠীই আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসবে। আর এর দায় কে নেবে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।




অবৈধ সম্পদ গোপন ও অর্জন: দুদকের ফাঁদে কাস্টমস সিএন্ডএফ এজেন্ট শাহজাহান দম্পতি

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিএন্ডএফ) এজেন্ট ও আমদানি–রপ্তানিকারক মোহাম্মদ শাহজাহান এবং তার স্ত্রী ফারজানা আক্তারের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে সংস্থাটির উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে এই দুই মামলা দায়ের করেন।

দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে, মোহাম্মদ শাহজাহান জ্ঞাত আয়–বহির্ভূত দুই কোটি ৮৩ হাজার ৭৩৪ টাকার সম্পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। নথি যাচাই করে দুদক জানায়, এই সম্পদের উৎস তিনি প্রমাণ করতে পারেননি। এ কারণে তার বিরুদ্ধে দুদক আইন ২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় মামলা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, শাহজাহানের স্ত্রী ফারজানা আক্তারের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। দুদক জানায়, তিনি তার দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ৫১ লাখ ৯৩ হাজার ৩৪৮ টাকার সম্পদ গোপন করেছেন এবং আরও দুই কোটি ৩২ লাখ ৪৬ হাজার ৮৬৮ টাকার সম্পদ অবৈধভাবে অর্জন করেছেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, তার মোট সম্পদের পরিমাণ ১৩ কোটি ৪৭ লাখ ৯৬ হাজার ৬৮ টাকা হলেও এর মধ্যে বৈধ আয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে মাত্র ১১ কোটি ১৫ লাখ ৪৯ হাজার ২০০ টাকার। ফলে বাকি দুই কোটি ৩২ লাখ ৪৬ হাজার ৮৬৮ টাকা জ্ঞাত আয়–বহির্ভূত বলে প্রমাণিত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।

দুদক জানায়, দীর্ঘ অনুসন্ধান ও নথিপত্র যাচাই–বাছাইয়ের পরই এই দুই মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।




চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের অনিয়ম অভিযোগে দুদকের সক্রিয় অনুসন্ধান

চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে রেকর্ডপত্র ধরে গভীর অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দায়িত্বের অপব্যবহার করে অর্থ আত্মসাৎ, মানিলন্ডারিংসহ অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। এসব অভিযোগের প্রাথমিক ভিত্তি নিশ্চিত করতে দুদকের দুই সদস্যের একটি টিম দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের বিভিন্ন প্রকল্পের নথিপত্র খুঁটিয়ে দেখছে। বন্দর কর্তৃপক্ষও দুদকের চিঠি পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ফাইল সরবরাহ করেছে।

দুদক শুধু বন্দরেই নয়, নির্বাচন কমিশন, এনবিআরসহ কয়েকটি সরকারি দফতরের কাছেও মনিরুজ্জামান সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে। অনুসন্ধান শুরু হলেও এখনো অভিযোগের সত্যতা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানাতে চায়নি দুদক। জানা যায়, অভিযোগ পাওয়ার পর দুদক প্রথমে প্রাথমিক অনুসন্ধান করে, পরে গত জুলাই মাসে সহকারী পরিচালক মো. নওশাদ আলীকে প্রধান করে একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। তার সঙ্গে দায়িত্বে আছেন উপ-সহকারী পরিচালক মো. ইমরান আকন। দায়িত্ব পাওয়ার পর তারা বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে কর্ণফুলী নদীর ড্রেজিংসহ বিভিন্ন প্রকল্পের অনুমোদনপত্র, টেন্ডার ডকুমেন্ট, চুক্তিপত্র, বাস্তবায়ন বিবরণী থেকে শুরু করে বিল-ভাউচার পর্যন্ত সব নথিপত্র চেয়েছেন।

অন্যদিকে দুদক সূত্র বলছে, সিএজি দফতরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অডিট রিপোর্টে চট্টগ্রাম বন্দরের ৭২টি বড় অনিয়ম চিহ্নিত হয়, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৪টি অনিয়মেই রয়েছে প্রায় ২৬৫ কোটি টাকার গড়মিল। এসব অনিয়মের বেশির ভাগই হয়েছে দরপত্র ও চুক্তি প্রক্রিয়ায় কারসাজির মাধ্যমে—এ কারণেই দুদক সরাসরি অনুসন্ধানে নেমেছে।

অনুসন্ধান দলের প্রধান সহকারী পরিচালক নওশাদ আলী জানিয়েছেন, তারা অভিযোগ খতিয়ে দেখছেন এবং বন্দর প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছে। তবে অনুসন্ধান এখনো চলমান, তাই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে কিনা তা বলতে রাজি নন তিনি। তদন্ত শেষ হলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বন্দরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, দুদক যে নথি চাইছে তারা তা দিচ্ছেন। তিনি জানান, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত বছরের ১১ আগস্ট এস এম মনিরুজ্জামান চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন। এর আগে চেয়ারম্যান থাকাকালীন মোহাম্মদ সোহায়েল আহমদকে একই বছর ২০ আগস্ট গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে বন্দর সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি ছাড়াও র‌্যাবে দায়িত্ব পালনকালে গুম-খুনের অভিযোগ রয়েছে।