সুজিত চক্রবর্তীকে ঘিরে বিতর্কের ঝড়: রাজনৈতিক যোগাযোগ, নিয়োগ বাণিজ্য ও সাংবাদিক হামলার অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ চ্যানেল এসের সিইও সুজিত চক্রবর্তীকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ, রাজনৈতিক বিতর্ক, নিয়োগ বাণিজ্য, সাংবাদিক নির্যাতন ও তথ্য গোপনের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তার অবস্থান, আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ, বিতর্কিত আর্থিক লেনদেন, গোপন রাজনৈতিক সমন্বয় এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ এখন বিভিন্ন মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

রাজনৈতিক অঙ্গন, সাংবাদিক সমাজ ও বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের সমপ্রকাশ্যে নিরপেক্ষতার কথা বললেও পর্দার আড়াল থেকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন সুজিত চক্রবর্তী। আন্দোলন-পরবর্তী সময়েও তিনি ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদন ছাড়াই লাইসেন্স?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গোয়েন্দা সূত্র দাবি করেছে, চ্যানেল এসের সম্প্রচার লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক গোয়েন্দা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। সূত্রটির দাবি, তৎকালীন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রভাব ও সরাসরি শেখ হাসিনার তত্ত্বাবধানে চ্যানেলটির লাইসেন্স অনুমোদন করানো হয়।

সূত্রটি আরও জানায়, আওয়ামী লীগের একাধিক প্রভাবশালী নেতার চাপের মুখে ইসমত কাদের গামা চ্যানেলটির অনুমোদন নেন। এমনকি লাইসেন্স প্রদানের আগে প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কোনো শক্ত ভিত্তি বা পর্যবেক্ষণও নথিভুক্ত নেই বলে দাবি করেছে ওই সূত্র।

ভারতে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ

সম্প্রতি ভারতের অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একাধিক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে সুজিত চক্রবর্তীর যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। একটি বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে চ্যানেল এসের পরিচয়ে কয়েকজন প্রতিনিধি ভারতে সফর করেছেন।

সূত্রটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতার সঙ্গে গোপন সমন্বয় ও যোগাযোগ রক্ষা করা। সুজিত চক্রবর্তীর নির্দেশনায় এসব যোগাযোগ পরিচালিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডারদের সাংবাদিক বানানোর অভিযোগ

সুজিত চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ হলো, চ্যানেল এসের কর্পোরেট অফিস থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ক্যাডারদের সাংবাদিক পরিচয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় একাধিক “টিম” গঠন করে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৮ থেকে ১০টি করে টিম নিয়োগ দিয়ে কোটি কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকতার ন্যূনতম অভিজ্ঞতা বা পেশাগত যোগ্যতা না থাকলেও রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে রাজনৈতিক ক্যাডারদের পুনর্বাসন, অন্যদিকে প্রভাব বিস্তারের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে বলেও দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের সমন্বয়?

বিভিন্ন অভিযোগ অনুযায়ী, সুজিত চক্রবর্তী বর্তমানে সারাদেশে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্ন পর্যায়ে চ্যানেলের প্রতিনিধি হিসেবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। একই সঙ্গে ভারতের আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, নিক্সন চৌধুরীসহ একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন বলেও দাবি করা হচ্ছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি অর্থনৈতিক সহায়তাও দিয়ে যাচ্ছেন এবং দেশে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে সক্রিয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করছেন।

এই কর্মকাণ্ডে তার অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উঠে এসেছে তুরাগ থানার সাবেক যুবলীগ নেতা ও বর্তমানে চ্যানেল এসের চিফ রিপোর্টার পরিচয়ধারী রুমনের নাম। এছাড়া ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের জামায়াতপন্থী আবুল কালাম, খোন্দকার আলমগীর এবং পল্টন এলাকার জামায়াতের এক নেতাকেও তার ঘনিষ্ঠ পরামর্শক হিসেবে উল্লেখ করছেন অভিযোগকারীরা।

মালিকানা বিক্রি ও অর্থ পাচারের অভিযোগ

সুজিত চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো চ্যানেল এসের মালিকানা গোপনে বিক্রি। বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে, শেখ হাসিনার আস্থাভাজন ও ১/১১-এর আলোচিত ব্যক্তি ক্যাপ্টেন (অব.) মোয়াজ্জেমের কাছে চ্যানেলের ২০ শতাংশ মালিকানা ১০ কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়েছে।

ক্যাপ্টেন (অব.) মোয়াজ্জেম বর্তমানে জননেত্রী পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে বরিশাল থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।

এছাড়া সিকদার গ্রুপের কাছে ১০ শতাংশ মালিকানা ৮ কোটি টাকায় বিক্রি এবং যুবলীগের আরও এক নেতার কাছে ৫ শতাংশ মালিকানা হস্তান্তরের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব লেনদেনের অর্থ কোনো ব্যাংকে সংরক্ষণ না করে হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে পাচার করা হয়েছে।

যদিও এসব বিষয়ে সুজিত চক্রবর্তীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যাচেষ্টা মামলা

সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায়ও সুজিত চক্রবর্তীর নাম আলোচনায় আসে। অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সকালের সংবাদের সম্পাদক হাফিজুর রহমান শফিক বাদী হয়ে চ্যানেল এসের চেয়ারম্যান ইসমত কাদের গামা, সিইও সুজিত চক্রবর্তীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাত আরও ৫০ জনকে আসামি করা হয়।

মামলাটি দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩২৫, ৩২৬, ৩০৭, ৩৭৯, ৫০৬ ও ১০৯ ধারায় দায়ের করা হয়। আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে রমনা থানাকে এফআইআর হিসেবে গ্রহণ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

এজাহারে অভিযোগ করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে দেশীয় অস্ত্র ও সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানো হয়। বাদীর অভিযোগ, রহস্যজনক কারণে ওই সময় সুজিত চক্রবর্তীকে গ্রেফতার করা হয়নি। পরবর্তীতে আদালত “ম্যানেজ” করে খাস কামরায় জামিন নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

গায়েব করা সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে নতুন বিতর্ক

সম্প্রতি চ্যানেল এসের গোপন রাখা সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সুজিত চক্রবর্তী ও তার ঘনিষ্ঠদের নেতৃত্বে সংঘটিত হামলার গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও ফুটেজ মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়নি। ফলে গত এক বছরে দুইবার তদন্ত কার্যক্রম প্রভাবিত ও ব্যাহত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে কর্মকাণ্ড নিয়ে বক্তব্য জানতে কয়েকজন সাংবাদিক চ্যানেল এস কার্যালয়ে গেলে তাদের আটকে রাখা হয়। পরে কার্যালয়ে অবস্থান করা ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডেকে এনে হামলা চালানো হয়।

ওই হামলায় হাফিজুর রহমান শফিকসহ অন্তত পাঁচ সাংবাদিক আহত হন। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিকদের উদ্ধার করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি প্রচারিত একটি সংবাদে হামলার ভিডিও ফুটেজের আংশিক অংশ প্রকাশ্যে আসার পর নতুন করে তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এতদিন গোপন রাখা ফুটেজের অংশবিশেষ প্রকাশ পাওয়ায় পুরো ঘটনাটি পুনরায় তদন্ত করা এখন জরুরি।

সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, একের পর এক গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও কেন সুজিত চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত দৃশ্যমান নয়? রাজনৈতিক যোগাযোগ, নিয়োগ বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন, মালিকানা হস্তান্তর, সাংবাদিক নির্যাতন ও তথ্য গোপনের মতো অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সুজিত চক্রবর্তী বা চ্যানেল এস কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।




ব্যান্ডরোল জালিয়াতির অভিযোগে বিতর্কিত কাস্টমস কর্মকর্তা শামীম উল আলম পেলেন যুগ্ম কমিশনার পদ, উঠছে জবাবদিহির প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার নকল সিগারেট স্ট্যাম্প (ব্যান্ডরোল) আমদানির মূল কারিগর হিসেবে অভিযোগ ওঠা কাস্টমসের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোঃ শামীম উল আলমকে যুগ্ম কমিশনার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তীব্র বিতর্ক ও গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাকে গ্রেড-৫ পদে এই পদোন্নতি দেওয়া হয়।

সম্প্রতি ঢাকা কাস্টমস হাউজের একটি বিশেষ অভিযানে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি পণ্যচালান থেকে ৯ লাখ ৬০ হাজার পিস নকল প্রিন্টেড সিগারেট স্ট্যাম্প (ব্যান্ডরোল) জব্দ করা হয়। এই জাল স্ট্যাম্পগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের প্রায় ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকার বিশাল রাজস্ব ফাঁকির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই জালিয়াতির ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় একটি নিয়মিত মামলাও দায়ের করা হয়। যেখানে কুরিয়ার কোম্পানির প্রতিনিধিসহ জড়িত ব্যক্তিদের আসামি করা হলেও এর মূল হোতা কাস্টমসের তৎকালীন উপ-কমিশনার (ডিসি) মোঃ শামীম উল আলমের নাম নেই। অথচ অভিযুক্ত একাধিক ব্যক্তির স্বীকারোক্তিতে এই চালান আমদানির মূল কারিগর হিসেবে কাস্টমসের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোঃ শামীম উল আলমের নাম উঠে আসে।

মামলার প্রাথমিক শুনানিতে ও বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এলেও এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তাকে মামলার আসামি না করে রহস্যজনকভাবে আড়াল করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এমনকি অভিযুক্তদের অফিসে ডিসি শামীমের যাতায়াতের প্রমাণ পাওয়ার পরেও তাকে মামলা থেকে আড়াল করার ঘটনা তুলেছে নানান প্রশ্ন।

মোঃ শামীম উল আলম এর আগে যখন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগ, বগুড়ায় কর্মরত ছিলেন, তখনও তার বিরুদ্ধে অপেশাদার আচরণ ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া মূল্যের আপ্যায়ন ও সুবিধা আদায়ের কারণে তিনি কাস্টমস সার্কেলে বিশেষভাবে সমালোচিত ছিলেন। এছাড়া বুয়েটের সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতা নিজের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নানাবিধ সুবিধা ভোগ করে আসছিলেন বলে কাস্টমসের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

রাজস্ব সুরক্ষায় যেখানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি করে, সেখানে ৯ কোটি টাকারও বেশি জালিয়াতির সাথে নাম জড়ানো একজন কর্মকর্তাকে শাস্তির মুখোমুখি করার পরিবর্তে পুরস্কৃত করার ঘটনায় হতবাক সচেতন মহল।




গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহম্মেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ, মামলার আসামি হয়েও গুরুত্বপূর্ণ পদে

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক প্রভাবশালী কর্মকর্তা ইলিয়াস আহম্মেদ। সরকারি দায়িত্বে থেকেই ঘুষ, কমিশন, অনিয়ম ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক বনে গেছেন তিনি এমনই অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে তিনি সিলেট গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। অথচ তার বিরুদ্ধে দায়ের রয়েছে একটি ফৌজদারি মামলা (সি.আর নং১১৮/২০২৫), যেখানে তিনি ১১০ নম্বর আসামী।

মামলাটি দণ্ডবিধির ১৪৭/১৪৮/৩২৬/৩০৭/৫০৬/৩৪ ধারায় চলমান। অভিযোগ রয়েছে-একজন মামলার আসামী ও দুর্নীতির অভিযুক্ত কর্মকর্তা হয়েও তিনি এখনও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল আছেন। সরকারি চাকরি বিধি অনুযায়ী অভিযুক্ত ও আদালতে চলমান মামলার কর্মকর্তা সাধারণত প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত থাকেন; কিন্তু ইলিয়াস আহম্মেদ তার ব্যতিক্রম। ইলিয়াস আহম্মেদ ২০১৫ সাল থেকে ঢাকার বিভিন্ন গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রশাসনিক নথি অনুসারে, তার চাকরির সময়সূচি নিম্নরূপ: ২২ এপ্রিল ২০১৫: ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬: নড়াইল গণপূর্ত বিভাগ, ১৮ জানুয়ারি ২০১৭: ঢাকা বিভাগ-২

১৮ ডিসেম্বর ২০১৭: আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগ, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩: তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত সার্কেল-১, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩: তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, গণপূর্ত সার্কেল, সিলেট ঢাকায় প্রায় এক যুগ দায়িত্ব পালনের সময় তিনি বিতর্কিত ঠিকাদার জি.কে. শামীমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন বলে সূত্র জানায়। এক সময় জিকে শামীমের সঙ্গে সরকারি কাজের “কমিশন বাণিজ্য” এবং “চুক্তি বণ্টনের কারসাজি” নিয়ে গণপূর্তের অভ্যন্তরে আলোচনা তৈরি হয়। জিকে শামীম-সংযোগে বিতর্ক : ২০১৯ সালে জিকে শামীমের বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও চাঁদাবাজির মামলার পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা অভিযুক্ত হন। ইলিয়াস আহম্মেদ সরাসরি অভিযুক্ত না হলেও, তার নাম শামীমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে আসে। একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইলিয়াস ঢাকায় জিকে শামীমের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ ও কাজ বণ্টনে প্রভাব খাটাতেন। সরকারি নির্মাণ কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও বিল ছাড়ের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়া ছিল প্রকাশ্য গোপন খবর।

আজিমপুর গণপূর্তে শিশু জিহাদ মৃত্যুর ঘটনা : ইলিয়াস আহম্মেদের নাম আলোচনায় আসে আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের একটি মর্মান্তিক ঘটনায়। ২০১৯ সালের শেষের দিকে আজিমপুরের পিলখানা উপবিভাগের কাজের সময় শিশু জিহাদের মৃত্যু ঘটে। এ ঘটনায় অবহেলা ও নির্মাণ ত্রুটির অভিযোগ ওঠে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ইলিয়াস আহম্মেদ নিহত শিশুর পরিবারকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে এবং শিশুর ভাই গোলজারকে গণপূর্ত বিভাগে পিয়ন পদে চাকরি দিয়ে বিষয়টি “মীমাংসা” করে ফেলেন। সেই ঘটনায় প্রশাসনিক তদন্ত হলেও, শেষ পর্যন্ত তিনি কোনোরূপ শাস্তি এড়িয়ে যান। আজিমপুর বিভাগের অধীনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ইলিয়াস আহম্মেদের বিরুদ্ধে ঠিকাদার পল্টন দাসের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

প্রকল্পটির ব্যয় ছিল প্রায় ১২০ কোটি টাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি “পছন্দের ঠিকাদার” বেছে নিয়ে কাজ দেন এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের বিনিময়ে প্রতি ফ্ল্যাটে ৫৭ লাখ টাকা করে কমিশন গ্রহণ করেন। একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ইলিয়াস স্যার চুক্তি অনুমোদনের আগে ৫ শতাংশ কমিশন দাবি করতেন। কাজের বিল ছাড় করতে চাইলে আরও ২ শতাংশ দিতে হতো। এই ঘুষ বাণিজ্যে তার নিকট আত্মীয়রাও যুক্ত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, তার আপন ভাইকে ঠিকাদার বানিয়ে তিনি গণপূর্তের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ পাইয়ে দেন এবং কমিশনের ভাগ নিতেন। অবৈধ সম্পদের পাহাড়- দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে ইলিয়াস আহম্মেদ দেশের ভেতর ও বাইরে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

তাদের ভাষায়-ঢাকার ধানমন্ডিতে দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, নিজ জেলা বরিশালে কোটি টাকায় নির্মিত একটি মসজিদ, বিদেশের মাটিতে দোতলা একটি বাড়ি, এবং ব্যাংক ও আত্মীয়দের নামে বিপুল অর্থের জমা- সবই তার অবৈধ উপার্জনের ফল। এছাড়া ঢাকার অভিজাত হোটেলে ঠিকাদারদের সঙ্গে বিলাসবহুল আসর ও পার্টিতে অংশ নেওয়া, মদ্যপান ও নারীসঙ্গের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, “তিনি নিয়মিতভাবে হোটেল র‌্যাডিসন ও সোনারগাঁওয়ে ঠিকাদারদের নিয়ে ‘গেট টুগেদার’ আয়োজন করতেন। সেখানে বিলাসিতা ছিল চোখে পড়ার মতো।” বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বিতর্কিত ভূমিকা : ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সহিংসতার পেছনে অর্থ সহায়তার অভিযোগ ওঠে ইলিয়াস আহম্মেদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ আছে, তিনি সরকারপন্থী একটি গোষ্ঠীর হয়ে “ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রমে অর্থ সরবরাহ” করেন। এ ঘটনায় সি.আর মামলা নং ১১৮/২০২৫এ তিনি ১১০ নম্বর আসামী হন। তবে মামলার তদন্ত শেষ না হলেও তাকে সিলেট সার্কেলে পদায়ন করা হয়।

সিলেটে যোগদানের পরও ইলিয়াস আহম্মেদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সূত্র জানায়, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কয়েকটি সরকারি নির্মাণ কাজে ‘নিজস্ব ঠিকাদার’ নিয়োগ দেন। এমনকি নতুন প্রজেক্ট অনুমোদনের ক্ষেত্রেও “কমিশন ছাড়া কোনো কাজ না হওয়া”এমন অভিযোগ স্থানীয় ঠিকাদারদের মুখে শোনা যায়। তাদের ভাষায়, “স্যার এখন সিলেটেও সেই পুরনো পদ্ধতিই চালু রেখেছেন। আগে কমিশন, পরে অনুমোদন। জনমনে প্রশ্ন-একজন অভিযুক্ত কর্মকর্তা কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বহাল থাকতে পারেন? প্রশাসনিকভাবে এমন কর্মকর্তা বরখাস্ত বা ওএসডি হওয়ার কথা থাকলেও ইলিয়াস আহম্মেদ বরং পদোন্নতি পেয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, “সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাধারণত বিভাগীয় তদন্ত হয়। কিন্তু প্রভাবশালী কর্মকর্তারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে তা এড়িয়ে যান।”

ইলিয়াস আহম্মেদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে। সূত্র অনুযায়ী, তিনি মালয়েশিয়া ও দুবাইতে একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে টাকা স্থানান্তর করেছেন। তার এক সহকর্মী জানান, “তিনি প্রায়ই বিদেশ সফরের নামে ভ্রমণ করতেন। সন্দেহ করা হয়, সেই সময় তিনি বিদেশে টাকা স্থানান্তর করেছেন।”যদিও এসব তথ্যের কোনো সরকারি স্বীকৃতি এখনো পাওয়া যায়নি। ইলিয়াস আহম্মেদের মতো বিতর্কিত কর্মকর্তা গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একজন সিনিয়র প্রকৌশলী বলেন, “যখন দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা পদোন্নতি পান, তখন সৎ কর্মকর্তারা নিরুৎসাহিত হন। ইলিয়াসের মতো কর্মকর্তাদের জন্যই সাধারণ মানুষ গণপূর্তকে দুর্নীতির কেন্দ্র বলে মনে করে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে ইলিয়াস আহম্মেদের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।




পিরোজপুর এলজিইডির সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে’র বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ, তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ পিরোজপুর জেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ থেকে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে এবং কোনো ধরনের ঠিকাদারি কাজ সম্পন্ন না করেই বহুল আলোচিত ৬ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের বিশেষ সহযোগী ও তৎকালীন পিরোজপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে শত শত কোটি টাকার অবৈধ বিল প্রদান এবং কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও ঘুষবাণিজ্যের দায়ে সাময়িক বরখাস্ত হলেও এখনো রয়েছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ৩০ জুন প্রকৌশলী রঞ্জিত দে-কে পিরোজপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়। তিনি পিরোজপুরে যোগদানের পর থেকেই একটি বিশেষ মহলের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে তার পূর্ববর্তী নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিশেষ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের কাজ সম্পন্ন না হওয়া সত্ত্বেও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার বিল প্রদান করেন।

দুর্নীতিবাজ নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে’র বিরুদ্ধে মঠবাড়িয়া উপজেলার শিংগা গ্রামের বাসিন্দা হরিদাশ হাওলাদার শিপন গত ৬ জানুয়ারি প্রধান প্রকৌশলী বরাবর, ২৬ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব বরাবর এবং ৫ মার্চ দুদক চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। লিখিত অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, কাজ না করা সত্ত্বেও নির্বাহী প্রকৌশলী তার পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রায় শত কোটি টাকা বিল দিয়েছেন। এছাড়াও ভান্ডারিয়ার ইফতি ইটিসিএল নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোনো কাজ না করেই ৮৯ কোটি টাকা বিল প্রদান করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পিরোজপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে-কে গত বছরের ১৪ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট বিভাগ কুড়িগ্রামে স্ট্যান্ড রিলিজ করে। তিনি ২৮ নভেম্বর বিভিন্ন কৌশলে তার প্রত্যাহারাদেশ স্থগিত করান। আবারও রাষ্ট্রপতির আদেশে সংশ্লিষ্ট বিভাগ গত ৪ ফেব্রুয়ারি তাকে পুনরায় বদলির আদেশ দেয়। কিন্তু অজ্ঞাত শক্তির বলে তিনি স্বপদে বহাল থাকেন।

নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে’র বিরুদ্ধে এরপর দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন মহলে আবারও আবেদন করা হলে তাকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে পুনরায় সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্ত হওয়ার পর রঞ্জিত দে অফিসিয়ালি কাউকে কিছু না জানিয়ে রাতের অন্ধকারে পিরোজপুর ত্যাগ করেন।

একটি সূত্র জানায়, পিরোজপুর থেকে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যাওয়ার পর পিরোজপুরের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দীর্ঘদিন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করেন। পরে বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে আবারও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। এরপর নিজেকে বিএনপি কর্মী পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন বিএনপি নেতার মাধ্যমে চাকরিতে পুনর্বহালের চেষ্টা করেন।

বর্তমানে দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী রঞ্জিত দে ঢাকায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে আবারও চাকরিতে পুনর্বহাল হয়ে পিরোজপুরে পুনরায় নির্বাহী প্রকৌশলী পদে যোগদানের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

পিরোজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে। প্রায় শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগে স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়া এই নির্বাহী প্রকৌশলী এক অদৃশ্য শক্তির বলে বারবার পুনর্বহাল থাকায় সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।

ঠিকাদার মো. মামুন মিয়া বলেন, “নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। তার বদলির আদেশ হলেও অদৃশ্য শক্তির কারণে তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন। আমরা সাধারণ ঠিকাদাররা শঙ্কিত।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঠিকাদার বলেন, “এ ইঞ্জিনিয়ার মহা দুর্নীতিবাজ এবং অফিসে অনিয়মিত ছিলেন। তার পছন্দের ঠিকাদারদের সঙ্গে আঁতাত করে কাজ ভাগিয়ে দেন। কাজ না করলেও সেসব প্রতিষ্ঠানকে শত কোটি টাকা বিল প্রদান করেছেন। ইঞ্জিনিয়ার অফিসে আমার মোটা অঙ্কের বিল বকেয়া রয়েছে। আমি প্রকাশ্যে কিছু বললে আমার সমস্যা হয়ে যাবে।”

সূত্র জানায়, পিরোজপুরের সাবেক দুর্নীতিবাজ নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে নেছারাবাদ উপজেলার শফিক সুমন নামে এক ঠিকাদারকে বেশ কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে কোনো ধরনের কাজ না হলেও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ১২২ কোটি টাকা বিল প্রদান করেছেন।

মো. আব্দুল্লাহ নামে এক ব্যক্তি বলেন, “কাজ না করলেও ইঞ্জিনিয়ার ঠিকাদারকে টাকা দিয়েছেন। এ কাজ আদৌ হবে কি না জানি না। আমরা সাধারণ মানুষ ইঞ্জিনিয়ারের এ কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ।”

দুর্নীতির মাধ্যমে কাজ না করেই বিল প্রদান করায় পিরোজপুরের সাধারণ জনগণ এবং নিয়মিত ঠিকাদাররা পিরোজপুরের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের সাবেক দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী রঞ্জিত দে-কে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত বিচারের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপকর্ম করার সাহস কেউ না পায়।

এদিকে পিরোজপুরের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জিত দে’র সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।




নকল নোভো নরডিস্ক ইনসুলিন জব্দ: চট্টগ্রামে অভিযানে ধরা পড়ল সরবরাহকারী, উঠে এলো মিটফোর্ড নেটওয়ার্ক

বিশেষ প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামের অলংকার মোড় এলাকার সৌদিয়া ফার্মেসিতে অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন নকল ইনসুলিন বিতরণ চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ সময় মোজাম্মেল হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে নকল নোভো নরডিস্ক ব্র্যান্ডের ইনসুলিন সরবরাহের অভিযোগে আটক করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিজিএফআইয়ের সহযোগিতায় পরিচালিত অভিযানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং নোভো নরডিস্কের প্রতিনিধিরা যৌথভাবে অংশ নেন। আটক মোজাম্মেলকে সৌদিয়া ফার্মেসিতে ডেকে আনা হলে তাকে হাতেনাতে আটক করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মোজাম্মেল জানান, জব্দকৃত ইনসুলিনসহ বিভিন্ন ওষুধ তিনি ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার হিমেল নামে এক দালালের মাধ্যমে সংগ্রহ করতেন। তদন্তকারীদের ধারণা, একটি সংঘবদ্ধ চক্র ঢাকার বিভিন্ন উৎস থেকে নকল ও অনুমোদনবিহীন ওষুধ সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করে আসছে।

অভিযানকালে নোভো নরডিস্কের ‘মিক্সটার্ড’ ইনসুলিনের নামে বাজারজাত করা সন্দেহভাজন নকল পণ্য জব্দ করা হয়। পরে পাহাড়তলী থানায় একটি মামলা দায়ের করে মোজাম্মেলকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তদন্তে জানা গেছে, মোজাম্মেল কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন ফার্মেসিতে দীর্ঘদিন ধরে এসব ইনসুলিন সরবরাহ করছিলেন। তার বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার হারপাকনা মাস্টারবাড়ি এলাকায়। বর্তমানে তিনি পাহাড়তলী থানার হেফাজতে রয়েছেন এবং তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, হিমেল নামে আরেক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে চক্রটির অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি ঢাকার মিটফোর্ড এলাকাকে কেন্দ্র করে নকল ও অনুমোদনবিহীন ওষুধ সংগ্রহ ও সরবরাহের কাজ পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মোজাম্মেলের সঙ্গে তার প্রায় দুই থেকে তিন বছরের পরিচয় এবং গত দুই মাস ধরে নিয়মিত লেনদেন চলছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্তকারী সূত্রের দাবি, চক্রটির সরবরাহ নেটওয়ার্ক ঢাকার মিটফোর্ড থেকে নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ট্রানজিট পয়েন্ট হয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিস্তৃত। জব্দকৃত ইনসুলিন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদে মোজাম্মেল দাবি করেন, পণ্যটি এসকেএফ (SK+F) থেকে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা এ দাবিকে অত্যন্ত সন্দেহজনক বলে মনে করছেন, কারণ এটি নোভো নরডিস্কের বৈধ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নকল ইনসুলিন ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। এসব পণ্য ব্যবহারে চিকিৎসা ব্যর্থতা, গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতা এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। তাই জব্দকৃত ওষুধের ফরেনসিক পরীক্ষা ও ল্যাব বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি মিটফোর্ড এলাকায় বিশেষ অভিযান, সরবরাহ চেইন শনাক্তকরণ, সংশ্লিষ্ট ফার্মেসিগুলোর মজুদ যাচাই এবং পরীক্ষাগার রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত সন্দেহভাজন পণ্য জব্দ ও কোয়ারেন্টাইনে রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি শুধু নকল ইনসুলিন নয়, বরং বৃহত্তর নকল ওষুধ ব্যবসার একটি সংগঠিত নেটওয়ার্কের অংশ হতে পারে। তাই পুরো চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।




এক বছরে দুই বদলি, কোটি টাকার প্রশ্ন: বিআরটিসির জামিল হোসেনকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি)-এ বদলি-বাণিজ্য, প্রভাব বিস্তার, সুবিধাজনক পদায়ন এবং ঠিকাদারকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন কর্মকর্তা মো. জামিল হোসেন। গত এক বছরের ব্যবধানে তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ বদলিকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং একটি ঠিকাদার নির্যাতন মামলার তথ্য সামনে আসায় বিআরটিসির অভ্যন্তরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, সরকারি তদন্ত বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এক বছরে দুই বদলি, দুই দফা লেনদেনের অভিযোগ : বিআরটিসির একাধিক সূত্রের দাবি, প্রায় এক বছর আগে জামিল হোসেন বরিশাল বাস ডিপো থেকে টুঙ্গিপাড়া বাস ডিপোতে বদলি হন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো অভিযোগ করেছে, ওই বদলিকে কেন্দ্র করে প্রায় ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছিল।

এর এক বছরের মাথায় ২০২৬ সালের জুনে তিনি টুঙ্গিপাড়া বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ইউনিট প্রধান হিসেবে বদলি হন। ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে জারি হওয়া বিআরটিসির একটি প্রশাসনিক আদেশে এ বদলির তথ্য উল্লেখ রয়েছে। এ বদলিকে ঘিরেও প্রায় ২০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি নথি বা তদন্ত প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।

‘প্রাইজ পোস্টিং’-এর অভিযোগ : বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো দীর্ঘদিন ধরেই সংস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী কর্মস্থল হিসেবে বিবেচিত। এ ধরনের পদায়নকে ঘিরে অতীতে নানা সময়ে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ বা কাঙ্ক্ষিত পদায়নের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জামিল হোসেন ধারাবাহিকভাবে সুবিধাজনক কর্মস্থল পেয়ে আসছেন এবং প্রতিটি পদায়নের পেছনে প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।

সাবেক রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ : বিআরটিসির একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জামিল হোসেন সাবেক চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও প্রশাসনিক সুবিধা পেয়েছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো আরও অভিযোগ করেছে, সরকার পরিবর্তনের পরও তিনি নতুন প্রশাসনিক বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে জামিল হোসেনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঠিকাদারকে অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ : জামিল হোসেনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি এসেছে ঠিকাদার মোহাম্মদ আবুল হাসানের কাছ থেকে। অভিযোগ অনুযায়ী, গাবতলী ডিপোতে দায়িত্ব পালনকালে জামিল হোসেনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে তাকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়া, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অচেতন অবস্থায় ফেলে রাখার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় জামিল হোসেনসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে মামলাটির বর্তমান অবস্থা, তদন্ত অগ্রগতি বা আদালতের পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।

চেয়ারম্যানকে ঘিরেও অভিযোগ : বিআরটিসির বর্তমান : চেয়ারম্যান অতিরিক্ত সচিব আব্দুল লতিফ মোল্লাকে ঘিরেও বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, একাধিক বাস ও ট্রাক ডিপোতে কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন এবং মাসিক আর্থিক সুবিধার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ হয়নি। চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার আনুষ্ঠানিক অবস্থানও স্পষ্টভাবে জানা যায়নি।

বিআরটিসির ভেতরে অস্বস্তি : বিআরটিসির কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে এখনও বিভিন্ন সময়ের প্রভাবশালী বলয়ের সদস্যরা সক্রিয় রয়েছেন। তাদের দাবি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বদলি এবং পদায়নকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি অস্বচ্ছ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ পদায়নগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং সেবার মান আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সরকারি নথিতে নতুন পদায়ন : ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে জারি হওয়া বিআরটিসির আদেশ অনুযায়ী মো. জামিল হোসেনকে টুঙ্গিপাড়া বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ইউনিট প্রধান হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। আদেশে ২৫ জুনের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর ও নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তদন্তের দাবি : এক বছরের ব্যবধানে একাধিক পদায়ন, আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং ঠিকাদার নির্যাতনের মামলাকে কেন্দ্র করে মো. জামিল হোসেনকে ঘিরে বিআরটিসিতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযোগগুলো নিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকারি নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন বিআরটিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

অনুসন্ধান চলমান : অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।)




ক্ষমতার পালাবদলে পরিচয় বদলের অভিযোগ, আলোচনায় প্রাণিসম্পদ পরিচালক শাহজামান খান

বিশেষ প্রতিবেদকঃ দেশের প্রশাসনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কর্মকর্তা নিজেদের অবস্থান বদল করছেন—এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কৃত্রিম প্রজনন দপ্তরের পরিচালক মো. শাহজামান খানকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে সুবিধা নেওয়া এই কর্মকর্তা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নিজেকে বিএনপন্থী হিসেবে পরিচয় দিয়ে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

রাজনৈতিক পরিচয় বদলের অভিযোগ : অধিদপ্তরের একাধিক সূত্রের দাবি, মো. শাহজামান খান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় তিনি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সুবিধা অর্জন করেন।

অন্যদিকে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি বিএনপন্থী পরিচয় ব্যবহার করে উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে যোগাযোগ শুরু করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মো. শাহজামান খানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মহাপরিচালক হওয়ার তদবিরের অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনিয়র কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার থাকার কথা থাকলেও মো. শাহজামান খান বিভিন্ন মহলে তদবির চালাচ্ছেন।

অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, প্রশাসন, সম্প্রসারণ, উৎপাদন এবং বিভাগীয় পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা তার চেয়ে জ্যেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তিনি শীর্ষ পদে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এ ঘটনায় অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ : সূত্রগুলো দাবি করছে, সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে তিনি পদোন্নতিতে সুবিধা পেয়েছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, কুমিল্লায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে পরিচালক পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগ পান।

আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ : মো. শাহজামান খানের বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণ ও আনুষঙ্গিক খাতে অর্থ আত্মসাৎ, বিশেষ বরাদ্দ গ্রহণ, সরকারি গাড়ির অপব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাছ থেকে অনিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। সূত্রের দাবি, সাভারে দায়িত্ব পালনকালে প্রশিক্ষণ খাতের অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম হয়েছে। এছাড়া সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

৪ আগস্টের কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক : অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর কৃষি খামার সড়কে অনুষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার অবস্থানের পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা দাবি করেন, তিনি সব সময় ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল অবলম্বন করেছেন।

ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক পরিচয় : বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্রলীগ ও পরে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগও উঠে এসেছে। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

প্রশাসনে ‘জার্সি বদল’ সংস্কৃতি : বিশ্লেষকরা মনে করেন, প্রশাসনে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পদোন্নতি ও পদায়নের সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কর্মকর্তার রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগ নতুন নয়। এতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব প্রশ্নের মুখে পড়ে।

বক্তব্য পাওয়া যায়নি : মো. শাহজামান খানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে তার মোবাইলে একাধিক বার যোগাযোগ করা হলে তিনি মোবাইল রিসিভ না করায় তার কোন প্রকার বক্তব্য প্রকাশিত হলো না।




২২ বছর গৃহবন্দি, নির্যাতনের অভিযোগ কুমু বেগমের; ন্যায়বিচার চেয়ে সংবাদ সম্মেলনে কান্না

বিশেষ প্রতিবেদকঃ দীর্ঘ ২২ বছর ধরে গৃহকর্মী হিসেবে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার এবং পরবর্তীতে ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ তুলে প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কুমু বেগম (২৭)।

গতকাল বিকালে ঢাকার মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার সেনপাড়া পর্বতার ৬ নম্বর রোডের ১৫ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত ‘মিরপুর প্রেস ক্লাব’-এ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে এই অভিযোগগুলো তুলে ধরেন।

শৈশব থেকে গৃহবন্দি জীবনের অভিযোগ-
সংবাদ সম্মেলনে কুমু বেগম দাবি করেন, ছোটবেলায় পরিবারহীন হয়ে পড়ার পর ২০০৫ সালের দিকে মাত্র ৭ বছর বয়সে তাকে ঢাকার কাফরুল থানার উত্তর ইব্রাহিমপুর এলাকার মুন্সি বাড়ির বাসিন্দা মো: জাহাঙ্গীর লতিফ (৫০)-এর বাসায় গৃহপরিচারিকা হিসেবে নিয়ে আসা হয়।

তার অভিযোগ অনুযায়ী, শুরুতে স্বাভাবিকভাবে কাজ করালেও পরবর্তীতে তাকে দীর্ঘদিন ধরে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করানো হয় এবং ধীরে ধীরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে গৃহকর্তা তার ওপর যৌন নির্যাতন চালান, যা ভয়ের কারণে দীর্ঘদিন প্রকাশ করতে পারেননি।

অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর লতিফ বর্তমানে নিজের উত্তর ইব্রাহিমপুর এলাকায় ৪০৫ নাম্বার বাড়িতে অবস্থান করছেন। এছাড়াও পাশেই তার আরেকটি ৬ তলা বিশিষ্ট বাড়িসহ আরোও অসংখ্য ফ্ল্যাট এবং প্লট রয়েছে।

আটক রাখা ও বাসা থেকে বিতাড়নের অভিযোগ-
ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুযায়ী, তাকে বহুবার বাসার ভেতরে আটকে রাখা হয় এবং এক পর্যায়ে তিন দিন পর্যন্ত তালাবদ্ধ অবস্থায় রাখা হয়েছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

এছাড়া, বিয়ের বয়স হলে বিয়ের খরচ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও পরে তা না দিয়ে তাকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।

তার ভাষ্যমতে, ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই তাকে কোনো প্রকার অর্থ বা নিরাপত্তা ছাড়াই চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে একটি বাসে তুলে দেওয়া হয়।

পরিবারবিরোধী অভিযোগ-
সংবাদ সম্মেলনে কুমু বেগম আরও অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর লতিফের স্ত্রী ও দুই কন্যা (বড় কন্যা জেবা রাইসা ও ছোট কন্যা দিয়া রাইসা) তার ওপর নির্যাতন ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করতেন, যাতে তিনি বাসা ছাড়তে বাধ্য হন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

বকেয়া মজুরি ও ক্ষতিপূরণের দাবি-
ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে পাঠানো আইনি নোটিশে শ্রম আইনের আওতায় বকেয়া মজুরি ও প্রতিশ্রুত অর্থসহ মোট ৮ লাখ ৮৪ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে।

তার হিসাব অনুযায়ী, ১৯ বছরের বকেয়া বেতন (মাসিক ৩,০০০ টাকা হারে) ৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা এবং বিয়ের খরচ বাবদ প্রতিশ্রুত ২ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে।

আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ-
কুমু বেগম বাদী হয়ে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর লতিফের বিরুদ্ধে কাফরুল থানায় ৪০৬/৪২০/৩২৩/৫০৬ (প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, নারী ও শিশু নির্যাতন, শ্রম আইন লঙ্ঘন এবং মানব পাচার) সহ একাধিক ধারায় মামলা করেছেন। মামলা নং- ১০৬/২০২৬।




দীর্ঘদিন পর বিটিআরসির ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন, উঠল অনিয়মের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)-এর আটজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই তারা চাকরিতে যোগ দেন এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পদোন্নতিও লাভ করেন। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি এবং স্বাধীনভাবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে কেউ কেউ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিটিআরসিতে কর্মরত রয়েছেন। চাকরিজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তারা পদোন্নতিও পেয়েছেন। সম্প্রতি তাদের নিয়োগ-সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনার দাবি তুলে কিছু মহল অভিযোগ করেছে যে, নিয়োগের সময় প্রযোজ্য বিজ্ঞপ্তির শর্তাবলি অনুসরণ করা হয়নি।

অভিযোগের আওতায় যাদের নাম এসেছে তারা হলেন— সেলিনা পারভীন, বর্তমানে উপ-পরিচালক (প্রশাসন); মো. মাহবুবুর রহমান, উপ-পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং); মোহাম্মদ কামরুল হাসান, উপ-পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং); মুহাম্মদ জাকারিয়া ভূঁইয়া, সিনিয়র সহকারী পরিচালক (ইএন্ডও); তৌসিফ শাহরিয়ার, সিনিয়র সহকারী পরিচালক; তানজারা বিনতে আনসার, সিনিয়র সহকারী পরিচালক; মাসুদ কামাল, স্টোর অফিসার; এবং এফএম সোয়েব শাহরিয়ার, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা।

অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে নির্ধারিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা অথবা অন্যান্য শর্ত পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও তাদের চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে নিয়োগের বৈধতা নিয়ে কোনো কার্যকর পর্যালোচনা না হওয়ায় তারা চাকরিতে বহাল থাকেন এবং নিয়মিতভাবে পদোন্নতি লাভ করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তির শর্ত, নিয়োগবিধি এবং প্রযোজ্য আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক। এসব শর্ত উপেক্ষা করে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হলে তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে। তবে অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি, নিয়োগ বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং তৎকালীন প্রশাসনিক অনুমোদন পর্যালোচনা ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘ সময় পর কোনো নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ একদিকে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যদিকে অভিযোগের মুখে থাকা ব্যক্তিদের ন্যায়সঙ্গত প্রতিরক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এ বিষয়ে বিটিআরসির বর্তমান প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা অভিযোগগুলোর মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্যও প্রয়োজন, যাতে অভিযোগের বিপরীতে তাদের অবস্থান জানা যায়।

প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উচিত পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজন হলে স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা করা। এতে একদিকে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা পায়, অন্যদিকে অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।

অভিযোগকারীরা বিষয়টির তদন্ত এবং নিয়োগ-সংক্রান্ত নথিপত্র প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, নিয়োগ ও পদোন্নতির পুরো প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। অন্যদিকে, অভিযোগের মুখে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।

ফলে বিটিআরসির এই আট কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার চূড়ান্ত উত্তর নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট নথি, কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা এবং সম্ভাব্য তদন্তের ফলাফলের ওপর। অভিযোগের বিষয়গুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান বা তদন্ত শুরু হলে তার ফলাফলই নির্ধারণ করবে অভিযোগগুলোর ভিত্তি কতটা শক্তিশালী এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না।




ডিএই প্রশাসন শাখায় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ: সিন্ডিকেট, বদলি বাণিজ্য ও অনিয়মের জালে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকা খামারবাড়িস্থ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রশাসন শাখার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক এ এ মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুদকের চার্জশিটভুক্ত পলাতক আসামিদের আশ্রয় প্রদান, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন এবং রমরমা বদলি ও টেন্ডার বাণিজ্যের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে অধিদপ্তরের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই কর্মকর্তার সিন্ডিকেটের কাছে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

মহাপরিচালক (ডিজি) মোঃ আব্দুর রহিমের সাথে একই এলাকায় বাড়ি হওয়ার সুবাদে এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে বিশেষ সখ্যের কারণে মাসুম বিল্লাহ খামারবাড়িতে স্বঘোষিত ‘সেকেন্ড ডিজি’ হিসেবে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।

১. দুদকের চার্জশিটভুক্ত ও পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের আগলে রাখার অভিযোগ
অনুসন্ধানে জানা যায়, খামারবাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক লুটপাট ও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ-সহকারী পরিচালক এস এম আনিসুজ্জামান বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন (মামলা নং: সিআর-৯০/২০২২)।

কারাগারে প্রধান আসামি: এই মামলার চার্জশিটভুক্ত অন্যতম শীর্ষ আসামি সাবেক সহকারী পরিচালক (অর্থ) সৈয়দ শরিফুল ইসলাম বর্তমানে দুর্নীতির দায়ে কারাগারে আছেন।

পলাতক আসামিদের পুনর্বাসন: তবে এই মামলার ২ নং আসামি উচ্চমান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক অলিউল্লাহ প্রধান (বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে কর্মরত) এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মূল হোতা প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ের সাবেক ক্যাশিয়ার মোঃ জাহিদ হাসান—উভয়েই গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি হওয়া সত্ত্বেও মাসুম বিল্লাহর ছত্রছায়ায় বহাল তবিয়তে রয়েছেন।

২. বদলি আদেশকে ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি’: ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে খামারবাড়িতেই অবস্থান
বিগত ১৯/০৫/২০২৬ খ্রি. তারিখে খামারবাড়ির ক্যাশিয়ার মোঃ জাহিদ হাসানকে ময়মনসিংহে এবং একই শাখার ক্যাশ সরকার মোঃ হাবিবুর রহমানকে চাঁদপুরে বদলি করা হয়। এরপর ২১/০৫/২০২৬ খ্রি. তারিখে তাদের তাৎক্ষণিক অবমুক্তির (রিলিজ) আদেশও দেওয়া হয়।

অভিযোগ উঠেছে, নতুন পদায়নকৃত ক্যাশিয়ার মোঃ আল-আমিন যোগদান করলেও জাহিদ হাসান তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে না দিয়ে উল্টো ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন এবং কর্মস্থলে বহাল আছেন। খামারবাড়ির সূত্র মতে:

ক্যাশিয়ার জাহিদ হাসান ৫ লক্ষ টাকা এবং ক্যাশ সরকার হাবিবুর রহমান ১ লক্ষ টাকা ঘুষের বিনিময়ে মাসুম বিল্লাহর কাছ থেকে বদলি আদেশ বাতিলের মৌখিক আশ্বাস পেয়ে আগের আসনেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

মূলত জুন মাসের বিল পরিশোধ সংক্রান্ত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কয়েক কোটি টাকার টেন্ডার ও কোটেশনের ‘ভাগবাটোয়ারা’ নিশ্চিত করতেই এই পলাতক আসামিকে খামারবাড়িতে রেখে দেওয়া হয়েছে।

৩. জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী ‘আওয়ামী পুনর্বাসন’ ও বদলি বাণিজ্য
স্বৈরাচারী সরকার পতনের পর ফ্যাসিষ্ট আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে যেসকল দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে দোষী সাব্যস্ত করে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছিল, মাসুম বিল্লাহর সিন্ডিকেট তাদের খামারবাড়ির লাভজনক পদে ফিরিয়ে আনছে।

নন-ক্যাডার ও উপ-সহকারী বদলি: কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলে পদায়নের জন্য উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

গোপন অর্ডার ও ব্যাকডেটেড সই: বিগত এক মাসে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের বদলি আদেশ ডিএই-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশ না করে, গোপনে হার্ডকপি প্রার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পদ শূন্য না থাকলেও মোটা অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে সালাহ্উদ্দিন ভূঞা নামের এক উপ-সহকারী উদ্যান উন্নয়ন কর্মকর্তাকে নরসিংদী হর্টিকালচার সেন্টারে বদলি করা হয়। ঢাকা অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পরিচালক গোলাম মোস্তফা খানকে দিয়ে ০৫/০৬/২০২৬ খ্রি. তারিখে আদেশ কার্যকর দেখানো হলেও চিঠিতে ১৪/০৫/২০২৬ খ্রি. তারিখের ব্যাকডেট ব্যবহার করা হয়েছে।

৪. ক্যাডার কর্মকর্তাদের সরিয়ে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ
প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে মাসুম বিল্লাহ বড় কর্মকর্তাদের তোয়াক্কা না করে একক সিদ্ধান্তে বদলি বাণিজ্য চালাচ্ছেন।

বিসিএস (কৃষি) ক্যাডার কর্মকর্তাদের বদলি নিয়ন্ত্রণ করতে তিনি চক্রান্তের মাধ্যমে অতিরিক্ত পরিচালক (প্রশাসন-১) মোঃ হাসানুজ্জামানকে বদলি করান।

এরপর উপপরিচালক (প্রশাসন) মোঃ মুরাদুল হাসান ২৭/০৪/২০২৬ খ্রি. তারিখে হজে যাওয়ার পর মাসুম বিল্লাহ পুরোপুরি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ৯ম গ্রেড হতে ৬ষ্ঠ গ্রেডে সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত উপজেলা কৃষি অফিসারদের সুবিধাজনক স্থানে পদায়নের নাম করে তিনি লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

৫. সরকারি গাড়ি ও জ্বালানির নজিরবিহীন অপব্যবহার
নিয়ম অনুযায়ী ৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও প্রভাব খাটিয়ে মাসুম বিল্লাহ ফুলটাইম সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন।

তিনি ঢাকা মেট্রো-ঠ-১৩-৬১৬৭ নম্বরের গাড়িটি গভীর রাত পর্যন্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে ব্যবহার করছেন।

তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যেও তিনি মাসে ৪০০ থেকে ৫০০ লিটার সরকারি তেল অপচয় করছেন।

তার এই অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে খামারবাড়ির কোনো চালক কথা বললে বা গাড়ি চালাতে অস্বীকৃতি জানালে, ক্ষমতার জোরে তাকে খামারবাড়ির বাইরে বদলি বা চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেওয়া হয়।

৬. অতীতের দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে ‘অদৃশ্য বাধা’
খামারবাড়িতে যোগদানের আগে ১৬/০১/২০১৮ থেকে ০৫/০৬/২০২৪ পর্যন্ত পাবনা সদর ও চাটমোহর উপজেলায় কৃষি অফিসার হিসেবে কর্মরত থাকাকালীনও মাসুম বিল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও সরকারি প্রণোদনার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ছিল। কৃষকের বরাদ্দ লোপাট করে তিনি পাবনা জেলা সদরে একটি ৫ তলা বিলাসবহুল ভবনসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, বিগত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর খামারবাড়ির মেইন গেটে তালাবদ্ধ করে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া, প্রশাসন ক্যাডারের অফিসারদের ওপর শারীরিক নির্যাতন এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে গত মার্চ/২০২৫-এ তাকে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছিল। তার জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তাকে ঢাকার বাইরে বদলি এবং সাময়িক বরখাস্তসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হলেও, এক ‘অদৃশ্য শক্তির’ ইশারায় তিনি এখনো বহাল তবিয়তে খামারবাড়িতে রয়ে গেছেন।

উপসংহার: সরকারের কৃষি খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই অধিদপ্তরে একজন অতিরিক্ত উপ-পরিচালকের এমন প্রকাশ্য জবরদস্তিমূলক দুর্নীতি এবং আদালতের পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের আশ্রয় দেওয়ার ঘটনাটি সুশাসনের চরম পরিপন্থী। অধিদপ্তরের সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সচেতন মহল অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও উপদেষ্টা মহোদয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও কঠোর আইনি শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।