গণপূর্ত অধিদপ্তরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনায় ‘মিথ্যা প্রচারণা’: নতুন প্রধান প্রকৌশলীর পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ পুরনো সিন্ডিকেট

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরে নতুন প্রধান প্রকৌশলী মোঃ খালেকুজ্জামান চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব ও অনলাইন পোর্টালে “বদলি-বাণিজ্য” সংক্রান্ত মিথ্যা প্রচারণা শুরু হয়েছে। অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, এই প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য হলো নতুন প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পথে বাধা সৃষ্টি করা।

প্রধান প্রকৌশলী ২৮ অক্টোবর গণপূর্তে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ফরিদপুরের নগরকান্দায় জন্মগ্রহণ করেন, নাজিমুদ্দিন স্কুল ও রাজেন্দ্র কলেজে পড়াশোনা করেছেন। স্নাতক করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (CUET) থেকে এবং পরবর্তীতে Monash University থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মোঃ খালেকুজ্জামান চৌধুরী অফিস-পরিকল্পনা, আর্থিক নথি, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় কঠোর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার ফলে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, লুটপাট এবং সুবিধাবাদী সিন্ডিকেটের কার্যক্রম কঠোরভাবে সীমিত হচ্ছে।

অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, “যারা বছরের পর বছর অনিয়মে অভ্যস্ত ছিলেন, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি চিৎকার করছে।” অন্যদিকে প্রধান প্রকৌশলী নিজেও বলেছেন, “আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। আমি মিথ্যা প্রচারণার জবাব দিয়ে দেশের উন্নয়নের পথে কাজ চালিয়ে যাব।”

অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বদলি ও দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস সম্পূর্ণ আইনানুগ ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পভিত্তিক কাজের মান, সময় ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ জনবলকে উপযুক্ত স্থানে নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোনো আর্থিক লেনদেন বা সিন্ডিকেটের প্রভাবের প্রশ্নই ওঠে না। বরং বদলি-বাণিজ্যের গুজব ছড়িয়ে কিছু বিতর্কিত কর্মকর্তা নিজেদের অবস্থান রক্ষার চেষ্টা করছেন।

মোঃ খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বে গণপূর্ত অধিদপ্তরে কর্মক্ষেত্রে শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা ও পেশাগত দক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ইতোমধ্যেই Several দীর্ঘমেয়াদি অনিয়ম শনাক্ত ও সংস্কারের পথে নিয়ে গেছে। অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একমত যে, এই পদক্ষেপ গণপূর্ত অধিদপ্তরকে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলবে।

অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, “যারা পুরনো সুবিধাবাদী সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারা এই শুদ্ধি অভিযানে অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে। তবে দেশের স্বার্থে এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।”

বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগকে কেবল প্রভাব হারানো একটি গোষ্ঠীর অসার চিৎকার হিসেবে ধরা হচ্ছে, যা নৈতিকভাবে ভ্রান্ত, বাস্তবিকভাবে মিথ্যা এবং প্রশাসনিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। গণপূর্ত অধিদপ্তর এখন স্বচ্ছ ও পেশাদার প্রশাসনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী মোঃ খালেকুজ্জামান চৌধুরী।




ক্ষমতার রং বদলে বাঁচতে চাওয়া আবু সায়েম জুয়েলের অতীত-বর্তমানের চমকানো কাহিনি; ১৬ বছর সরকারের ছত্রছায়ায় থাকা জুয়েলের হঠাৎ ‘বিরোধী সাজা’ নিয়ে বিস্তর বিতর্ক

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী এ এস এম আবু সায়েম জুয়েল—একসময়ের ক্ষমতাবান একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে স্বৈরাচার সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্ট আন্দোলনের পর সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই তার আচরণে দেখা যায় নাটকীয় পরিবর্তন। যিনি আগে বঙ্গবন্ধু পিডব্লিউডি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং নিয়মিত “জয় বাংলা” লেখা স্ট্যাটাস দিতেন, হঠাৎ করেই নিজেকে আওয়ামীবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন। নিজের অতীত ঢাকতে যেন নতুন মুখোশ পরে মাঠে নামলেন তিনি।

ছাত্রজীবনে ছিলেন কুখ্যাত ছাত্রলীগ ক্যাডার। ২০০৬ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই ঢাকা শহরের বিভিন্ন ডিভিশনে ঘুরে ঘুরে তৈরি করেন নিজের এক প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক। ঠিকাদার থেকে শুরু করে অফিসের করিডর—সবখানেই তার নাম উচ্চারিত হতো ভয় আর বিতর্কের সঙ্গে। অভিযোগ রয়েছে, গত ২০ বছরে নাম-বেনামে প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন তিনি—বাড়ি, প্লট, গাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট—সবই ক্ষমতার আড়ালে করা অনিয়মের ফল বলে সহকর্মীদের দাবি।

তোফায়েল আহমেদ ও আমির হোসেন আমুর আত্মীয় পরিচয় দেখিয়ে জুয়েল পূর্ত অধিদপ্তরে ছিলেন এক ‘অঘোষিত সম্রাট’। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে সাধারণ কর্মচারী—যার সঙ্গেই তার বিরোধ হতো, গালি-হুমকি আর হয়রানি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। কয়েকজন প্রকৌশলী অভিযোগ করেছেন, তাকে প্রতিবাদ করলে তারা শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন।

এমনকি বদলিকেও তিনি বানিয়েছিলেন নিজের ক্ষমতা দেখানোর হাতিয়ার। গত ৩ জুলাই প্রধান প্রকৌশলীর আদেশে যখন তাকে রেলওয়ে ডাইভারশন উপবিভাগে বদলি করা হয়, তখনো তিনি ঢাকার বাইরে না গিয়ে রাজধানীতেই থেকে যান। একাধিক সূত্র বলছে, এই বদলির পেছনে ভূমিকা ছিল ছাত্র উপদেষ্টা হাসনাত আব্দুল্লাহর শ্বশুরের। এমনকি একজন জামায়াত নেতা পর্যন্ত তার পক্ষে সুপারিশ করেছেন—যা এখন পুরো অধিদপ্তরে আলোচনার বিষয়।

অন্যদিকে, যিনি আগে বুকে নৌকার ব্যাজ ঝুলিয়ে মন্ত্রণালয়ে ঘুরতেন, বঙ্গবন্ধুর মাজার সফরে নিয়মিত অংশ নিতেন, তিনিই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় হঠাৎ করেই বিরোধী দলের মতাদর্শ ছড়াচ্ছেন। সহকর্মীদের চোখে বিষয়টি মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাদের মতে, পরিস্থিতি বদলেছে দেখে তিনি শুধু নিজের অতীত পাপ লুকানোর চেষ্টা করছেন।

ঠিকাদারদের সঙ্গে তার লেনদেন নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। সচিবালয় ও মিরপুর ডিভিশনে দায়িত্বে থাকার সময় চুক্তিমূল্যের বড় অংশ নিজের পকেটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কেউ বিল নিতে গেলে তার প্রথম কথা ছিল—“কাজ শেষ, এখন টাকা দাও।” পাইকপাড়া ও শিয়ালবাড়ির বড় প্রকল্পগুলোতেও কাজ না হয়েও অগ্রিম বিল তুলে নেওয়া হয়েছিল—যার পেছনে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা আছে বলে অভিযোগ।

বর্তমানে রেলওয়ে ডাইভারশন উপবিভাগের ২নং শাখায় থাকা অবস্থায়ও তিনি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ডিএমপি ডেমরা পুলিশ লাইনসহ কয়েকটি বড় প্রকল্পে কর্তৃত্ব বিস্তার করেছেন। আরও দুইটি বড় প্রকল্প তার হাতে যাওয়ার অপেক্ষায়, এবং সূত্র বলছে—এই পোস্টিং টাকায় কেনা।

এমনকি ২০২৪ সালের ছাত্র জনতার আন্দোলন দমনে তিনি নেপথ্যে থেকে অনিয়মে জড়িত ছিলেন। রামপুরা, বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকায় ছাত্রলীগ ক্যাডারদের সহায়তায় তিনি প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয় করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কিন্তু এখন সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে তিনিই হঠাৎ বিরোধী সেজে ঘুরছেন। যেন নিজের অতীত ভুলে গেছে সবাই। অথচ পূর্ত অধিদপ্তরের সাধারণ প্রকৌশলীরা জানেন, মুখ হয়তো বদলেছে—কিন্তু স্বভাবের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। তিনি এখনও সেই ক্ষমতালোভী, প্রভাবশালী, বিতর্কিত জুয়েলই রয়ে গেছেন। একজন উপসহকারী প্রকৌশলী হয়েও যেন পুরো অধিদপ্তরের অঘোষিত ‘রাজা’।

তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ জানতে ফোন করা হলে সাংবাদিক পরিচয় শুনেই তিনি ফোন কেটে দেন এবং আর কোনো জবাব দেননি।




এলজিইডির প্রকৌশলী ফিরোজ আলম তালুকদারকে ঘিরে দুর্নীতি–বদলি তদবিরে ঝড়, একের পর এক প্রকল্পে অর্থ লোপাটের অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ আলম তালুকদারকে ঘিরে দপ্তরজুড়ে চলছে ব্যাপক তোলপাড়। দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, ঘুষের লেনদেন, টেন্ডার কারসাজি, নিয়োগ–বদলি তদবির থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে তার অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ আছে, সেই সংবাদ ঠেকাতে ফিরোজ আলম তালুকদার প্রতিবেদককে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন, যার জের ধরে শেরেবাংলা নগর থানায় জিডিও করা হয়েছে (জিডি নং—৭১৪/২৫)।

ফিরোজ আলম তালুকদার দীর্ঘদিন ধরেই এলজিইডির বিতর্কিত কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১৫ সালে তাকে অবৈধ সম্পদ ও কর ফাঁকির অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। সে সময়ও তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু রাজনৈতিক সুরক্ষার কারণে কোনো ব্যবস্থা হয়নি বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে। এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ওয়াহেদুর রহমানের আমলে পদোন্নতির নামে কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যে ফিরোজের বড় ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী উপ-সহকারী প্রকৌশলী শেখ রাজিবকে ঘিরেও গড়ে ওঠে এক প্রভাব বলয়। রাজিবের স্ত্রী পুলিশের এসআই হওয়ায় এবং গণভবনে দায়িত্বে থাকার কারণে এই প্রভাব আরও শক্ত হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি গণভবনের নাম ব্যবহার করে দপ্তরে এমন পরিবেশ তৈরি করেছিলেন যেন তার কথাই ‘তথাকথিত ওপরের নির্দেশ’। ফিরোজ–রাজিব জুটির বিরুদ্ধে নানা প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ, অতিরিক্ত বিল, কাগজে-কলমে দেখানো কাজ এবং কোটি কোটি টাকার লোপাটের উঠেছে।

সরকার পরিবর্তনের পর দপ্তরে প্রবেশ করলে ক্ষুব্ধ কর্মচারীরা ফিরোজকে লাঞ্ছিতও করেন। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিনি গোপনে অফিসে যাতায়াত করতে বাধ্য হন। বর্তমানে তাকে এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়মের প্রমাণও পাওয়া গেছে। দেবীনগর–হাশেম মাদবর সড়ক প্রকল্পে রাস্তা অর্ধেক কাজ হওয়ার পরও ৩৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল উত্তোলনের অভিযোগ আছে। ওই বিল অনুমোদনে হানিফ মোহাম্মদ মুর্শিদী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী শেখ রাজিবের সম্পৃক্ততার কথাও উঠে এসেছে। রাধানগর–কৃষ্ণদেবপুর সড়ক প্রকল্পে ১ কোটি ২২ লাখ টাকার কাজ দেখিয়ে ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত বিল নেওয়া হয়, যদিও মাঠে কাজই হয়নি। একইভাবে বান্দুরা–বারুয়া–শিকারীপাড়া সড়ক প্রকল্পে ৩২ লাখের বেশি অগ্রিম টাকা তোলা হলেও কাজের শুরু পর্যন্ত হয়নি, ফলে চুক্তি বাতিল করতে হয়।

অনুসন্ধানে আরও বেরিয়ে এসেছে, ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর নকশা পরিবর্তনের বিনিময়ে ফিরোজ আলম তালুকদার তিন বিঘা জমি নিয়েছেন। একাধিক সূত্র বলছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা মোহাম্মদ নাসিমের নাতি অথবা ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটিতে নিজের অবস্থান প্রভাবশালী করে রেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধু পরিষদের সেক্রেটারি পরিচয়ও কাজে লাগাতেন নিয়মিত।

ক্ষমতার রদবদলের পর এখন তিনি নতুন মোড়কে তদবির বাণিজ্য শুরু করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছড়িয়েও নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। সত্যতা জানতে চাইলে ফিরোজ আলম তালুকদার প্রতিবেদকের প্রতি উত্তেজিত আচরণ করেন এবং বলেন— “কাজ না করেই বিল দেওয়ার দায় শুধু আমার নয়, থানা ইঞ্জিনিয়ারসহ অন্যদের কাছেও জানতে হবে।”

এলজিইডির ভেতরে-বাইরে সচেতনরা বলছেন, ফিরোজ আলম তালুকদার শুধু একজন প্রকৌশলী নন—তিনি যেন এক অঘোষিত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। এসব অভিযোগের সঠিক তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও নষ্ট হবে—এমন মন্তব্য করেছেন অনেকেই।




গণপূর্তে কোটি টাকার দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ: প্রকৌশলী রাকিবুলের বিরুদ্ধে তদন্ত দাবি

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইডেন গণপূর্ত বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে সম্প্রতি বিস্তৃত দুর্নীতি ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজস্ব প্রভাব ও সুবিধা আদায়ে নানা ধাপেই চাপ প্রয়োগ করছেন, যার মধ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়া, কাজের বিল পরিশোধ, উপকরণ সরবরাহ অনুমোদন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অন্তর্ভুক্ত।

ঠিকাদারদের মতে, কোনো প্রকল্পের প্রকৃত মূল্য অনুযায়ী কমিশন না দিলে ফাইল আটকে রাখা, মাপ-জোক যাচাইয়ে অযথা জটিলতা সৃষ্টি করা এবং রাজনৈতিক নাম ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগ করা তার একটি নিয়মিত কৌশল। কয়েকজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, “যে কাজের প্রকৃত মূল্য ৫০ লাখ, সেখানে অতিরিক্ত কমিশন হিসেবে ৫ থেকে ১০ শতাংশ দাবি করা হয়।” ফলে যারা ঘুষ দিতে অনিচ্ছুক, তারা প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়েন।

স্থানীয় সূত্র বলেছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় রাকিবুলের পক্ষপাতমূলক ভূমিকা ও ‘নিজেদের প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদার’-দের জন্য সুবিধা সৃষ্টির চেষ্টা স্পষ্ট ছিল। ঠিকাদার সম্প্রদায়ের একাংশ অভিযোগ করেছেন, টেন্ডার-বাণিজ্যের পাশাপাশি নিয়মিত বদলি, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ছাড়, উপকরণ সরবরাহ অনুমোদনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও তিনি রাজনৈতিক সুপারিশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। এতে শুধু কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, প্রকল্পের গুণগত মানও হ্রাস পাচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি আওয়ামী লীগের শাসনামলে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। জানা গেছে, তেজগাঁও গণপূর্ত উপবিভাগে কাজ করার সময় রাকিবুল কোনো ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পে সুযোগ দেননি, বরং নিজেই ঠিকাদার হিসেবে কাজ করেছেন। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ‘দেশ উন্নয়ন’-কে বিশ কোটি টাকার ভুয়া ভেরিয়েশন দেখিয়ে দুই কোটি টাকা কমিশন নেওয়ার ঘটনা ধরা পড়েছে। এছাড়া তেজগাঁও বিসিক ভবন নির্মাণের সময় বেজমেন্টে নানা ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও তিনি উৎকোচ নিয়ে ছাড়পত্র দিয়েছেন। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘কুশলী নির্মাতা’ নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করেও রাকিবুলকে ৫ শতাংশ কমিশন প্রদান করে সম্পূর্ণ বিল পেয়ে গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাকিবুল হাসান তেজগাঁও গণপূর্ত উপবিভাগে শিল্প প্লট ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এই অবৈধ অর্থ দিয়ে ঢাকায় জমি ও ফ্ল্যাট ক্রয়, কুমিল্লা শহরে দশ কাঠা জমি এবং গাজীপুরে ত্রিশ একর জায়গার উপর একটি রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া গণপূর্তে গুঞ্জন রয়েছে যে, দেশের বাইরে সিঙ্গাপুরে তিনি কয়েক শত কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করেছেন।

উল্লেখযোগ্য, বর্তমানে রাকিবুল নিজেকে একপি রাজনৈতিক দলের অর্থদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জানা গেছে, তিনি উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদায়নের জন্য দলের বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠনে অর্থ দান করছেন।

গণপূর্তের একাধিক কর্মকর্তা জানাচ্ছেন, মাঠ পর্যায়ে সরকারি দরপত্রের কাজ সঠিকভাবে হয়েছে কিনা, গুণগত মান যাচাইসহ বিভিন্ন কাজ সচরাচর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাকিবুল নিজস্ব সুবিধার জন্য কমিশন ও ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে বিভিন্ন ত্রুটিপূর্ণ কাজের ছাড়পত্র দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি নির্মাণ কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আচরণ কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা জরুরি। প্রয়োজন হলে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। পাশাপাশি ঘুষের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি এবং নিয়মিত অডিট ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে রাকিবুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও কোনো প্রতিউত্তর পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিবেদককে বিভিন্ন মহল থেকে সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে।




ময়মনসিংহ-৮ এ বিএনপি প্রার্থী লুৎফুল্লাহ মাজেদকে ঘিরে দুর্নীতি ও বিতর্কের ঝড়

এসএম বদরুল আলমঃ ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী ও ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক লুৎফুল্লাহ মাজেদকে ঘিরে দলে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন নেওয়া, সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি, ব্যবসায়িক প্রতারণা এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, লুৎফুল্লাহ মাজেদ তাঁর মালিকানাধীন কোম্পানি অ্যারোনেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন টেন্ডারে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। এ সংক্রান্ত একটি মামলা বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনে বিচারাধীন, যার কার্যক্রম ২৭ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে চলছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসায়িক প্রতারণার অভিযোগেও তিনি একদিন একরাত ডিবি হেফাজতে ছিলেন।

স্থানীয় বিএনপি ও এলাকাবাসীর দাবি— বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তিনি মনোনয়ন ‘ম্যানেজ’ করেছেন। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিএনপির হাইকমান্ড ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগ উঠেছে, নিজের বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতির মামলা ‘ঢাকতে’ তিনি সম্প্রতি ঢাকায় একটি সাজানো আয়না ঘরের নাটক আয়োজন করেন। এলাকাবাসীর দাবি— নাটকটি ছিল শুধুই জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করার কৌশল। বিষয়টিও বিএনপির কেন্দ্রীয় তদন্তের আওতায় এসেছে।

আসামির রাজনৈতিক অতীত নিয়েও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। ২০০৮ সালে তিনি জাতীয় পার্টির মনোনয়ন ফর্ম কিনেছিলেন।

২০১০ সালে তিনি ময়মনসিংহ জেলা জাতীয় পার্টির ১৭ নম্বর সদস্য ছিলেন।বিএনপির ত্যাগী নেতাদের অভিযোগ— তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো বিএনপিতে যোগদান করেননি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, জাতীয় পার্টির সক্রিয় সদস্য হয়ে কিভাবে তিনি বিএনপির উপজেলা কমিটি ও সংসদীয় মনোনয়ন লাভ করলেন?

কেন্দ্রীয় সূত্র জানায়— ময়মনসিংহ-৮ ছাড়াও মাদারীপুর-১ ও ৩, কুষ্টিয়ার দুটি, ভোলার একটি এবং চট্টগ্রামের দুটি আসনসহ মোট প্রায় ৩০টি আসনে অভিযোগ জমা পড়েছে।

“যেখানে অভিযোগ এসেছে, সরেজমিন যাচাই-বাছাই চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের মনোনয়ন স্থগিত বা বাতিল করা হবে।”




“অপহরণ বেড়েই চলেছে, প্রতিদিন গায়েব হচ্ছে একাধিক ব্যক্তি”

বিশেষ প্রতিবেদকঃ অপহরণের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়—বরং তা যেন প্রতিদিনের খবর হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে দেশে ৯২১টি অপহরণের মামলা হয়েছে, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে তিনজন মানুষ অপহৃত হয়েছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ভাষায়, বেশির ভাগ অপহরণ ঘটছে মুক্তিপণ, প্রতিশোধ বা ডিজিটাল যোগাযোগের অপব্যবহারকে কেন্দ্র করে। এতে নাগরিক জীবনে ফিরে এসেছে ভয়, হারিয়ে যাচ্ছে নিরাপত্তাবোধ।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অক্টোবরে সারা দেশে মোট ১১০টি অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে (জানুয়ারি-অক্টোবর) দেশে মোট ৯২১টি অপহরণের মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। গত বছর একই সময় এ সংখ্যা ছিল ৫০১। অর্থাৎ এক বছরে অপহরণের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বেশির ভাগ অপহরণের পেছনে মুক্তিপণ আদায়, প্রতিশোধ, প্রেমঘটিত বিরোধ বা ব্যাবসায়িক দ্বন্দ্বের মতো কারণ রয়েছে। অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক অবক্ষয়, অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ডিজিটাল অপরাধের প্রসারের কারণে এ প্রবণতা বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কঠোর অভিযানের বিকল্প নেই।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগে যেখানে বেশির ভাগ অপহরণ ঘটত রাতের অন্ধকারে, এখন তা ঘটছে দিনের আলোতেও। অনলাইন রাইডশেয়ারিং, ব্যাবসায়িক লেনদেনের ছলে কিংবা প্রেমের সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে অপহরণের ঘটনা ঘটছে। বিশ্লেষকদের মতে, পারিবারিক বা রাজনৈতিক শত্রুতা, এমনকি যৌন নিপীড়নের ঘটনাও অনেক সময় অপহরণের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে আর্থিক কারণই সবচেয়ে বেশি দায়ী। চাঁদাবাজচক্র ছাড়াও পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর সম্পৃক্ততাও এসব ঘটনায় দেখা যাচ্ছে।

অপহরণ বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্কুল-কলেজগামী সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁরা দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছরের অক্টোবর মাস অপহরণের  দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল। ওই মাসে অপহৃত হয়েছেন ১১০ জন। জানুয়ারিতে ১০৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৭৮ জন, মার্চে ৮৩ জন, এপ্রিলে ৮৮ জন, মে’তে ৮২ জন, জুনে ৮০ জন, জুলাইয়ে ৯০ জন, আগস্টে ৯০ জন এবং সেপ্টেম্বরে ৯৬ জন। এতে দেখা যাচ্ছে, গত ১০ মাসে গড়ে প্রতিদিন তিনজনের বেশি মানুষ অপহরণের শিকার হয়েছেন।

তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে মোট ৬৪২ জন অপহৃত হয়েছিলেন। ওই বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম ১০ মাসে অপহৃত হন ৫০১ জন—মাসে গড়ে ৫০ জন। অথচ চলতি বছর একই সময় মাসিক গড় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২ জনে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রকৃত অপহরণের সংখ্যা পুলিশের রেকর্ডের চেয়েও বেশি। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে মামলা হয় না। তাঁদের মতে, প্রতিদিন গড়ে তিনজন অপহৃত হওয়ার অর্থ হলো দেশে আইনের শাসনে বড় ঘাটতি রয়েছে।

অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘দিন দিন অপহরণের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে। আগে মুক্তিপণ আদায় ছিল প্রধান উদ্দেশ্য, এখন সামাজিক প্রতিশোধ, প্রেম-বিবাদ কিংবা ডিজিটাল যোগাযোগের অপব্যবহার থেকেও অপহরণের ঘটনা ঘটছে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘অপহরণের প্রতিটি ঘটনাকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। সাম্প্রতিক একাধিক অপহরণচক্রকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাইবার ইউনিটও ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে সংঘটিত অপহরণ রোধে কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে পরামর্শ হচ্ছে, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগে সতর্ক থাকা এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলে তৎক্ষণাৎ নিকটস্থ থানায় বা ৯৯৯ নম্বরে জানানো।

সাম্প্রতিক কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা : গত মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর দিয়াবাড়ী এলাকা থেকে ক্যামব্রিয়ান কলেজের শিক্ষার্থী সুদীপ্ত রায়ের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে ৭ নভেম্বর তাঁকে অপহরণ করা হয়। পরে তাঁর বাবার কাছে ৮০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। টাকা না পেয়ে ও বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তাঁকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

২৪ অক্টোবর নওগাঁয় এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে ৭০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে একটি চক্র। র‌্যাব অভিযান চালিয়ে ওই ব্যবসায়ীকে উদ্ধার ও চক্রের হোতা শাহাজান (৬৫) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে।

এর আগে ৩ অক্টোবর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে মো. মকবুল নামে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে নির্যাতন করা হয়। পরে ৬০ হাজার টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, কক্সবাজারের টেকনাফে মুক্তিপণ দাবিতে অপহৃত কলেজছাত্র হাসান শরীফকে (২৪) উদ্ধার করেছে র‌্যাব-১৫। গত মঙ্গলবার রাতে সাবরাং ইউনিয়নের চান্দলীপাড়ায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। এর আগে রবিবার বিকেলে টেকনাফ পৌরসভার মায়মুনা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে থেকে মোটরসাইকেলে এসে চার-পাঁচজন ব্যক্তি হাসানকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাঁর পরিবারের কাছে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।




ঘুষের অভিযোগে শাস্তি পেলেন নাজিরপুরের সাবেক শিক্ষা কর্মকর্তা হেনেয়ারা বেগম

পিরোজপুর প্রতিনিধিঃ পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার সাবেক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসা. হেনেয়ারা বেগমের বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এ ঘটনায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বেতন স্কেল নিম্নতর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সোমবার (১০ নভেম্বর) জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়, যা বুধবার এলাকায় জানাজানি হয়।

মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী বিভাগীয় তদন্তে হেনেয়ারা বেগমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। তবে তিনি নবীন কর্মকর্তা হওয়ায়, তুলনামূলক হালকা শাস্তি হিসেবে তার বেতন স্কেল দুই বছরের জন্য নিম্নতর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নাজিরপুরে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই হেনেয়ারা বেগম নানা অজুহাতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছ থেকে ঘুষ দাবি করতেন। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একবার এক শিক্ষককে গ্লাস ছুঁড়ে মারার ঘটনাও ঘটে বলে জানা যায়। এমনকি ঘুষ দাবি সংক্রান্ত তার এক অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হেনেয়ারা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় শুনে ফোন কেটে দেন এবং পরে আর ফোন রিসিভ করেননি।

নাজিরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাকিম জানান, হেনেয়ারা বেগম দায়িত্ব হস্তান্তর না করেই বদলিকৃত কর্মস্থলে চলে যান। পরে পিরোজপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোল্লা বক্তিয়ার রহমানের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ সম্পন্ন হয়।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোল্লা বক্তিয়ার রহমান বলেন, “নাজিরপুরের সাবেক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোসা. হেনেয়ারা বেগমের বিরুদ্ধে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বেতন স্কেল দুই বছরের জন্য নিম্নতর করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি মাগুরার শালিখা উপজেলায় কর্মরত আছেন।”




কুষ্টিয়ায় সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দম্পতির বিরুদ্ধে দুদকের দুই মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ কুষ্টিয়ায় আলোচিত সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হাজী রবিউল ইসলাম এবং তার স্ত্রী বানু ইসলামের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের কুষ্টিয়া সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. বুলবুল আহমেদ বুধবার (১২ নভেম্বর) মামলাগুলো দায়ের করেন। তদন্তে উঠে এসেছে, হাজী রবিউল ইসলাম তার আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে বিপুল সম্পদ গোপন করেছেন এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূতভাবে কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন।

প্রথম মামলায় তার বিরুদ্ধে ৩৭ লাখ টাকার সম্পদ গোপন এবং আরও ১ কোটি ৯১ লাখ ৬১ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদকের তদন্তে দেখা যায়, তার ঘোষিত সম্পদের তুলনায় বাস্তবে অর্জিত সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় মামলায় তার স্ত্রী বানু ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে যে, স্বামীর প্রভাব ও ক্ষমতা ব্যবহার করে ঘুষ ও অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ ৮২ হাজার ৩০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ তিনি অর্জন করেছেন।

দুদক জানিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাগুলো বর্তমানে প্রাথমিক তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং দ্রুত পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানায় সংস্থাটি।




সাবেক বিমানবাহিনী প্রধানের উপহার পাওয়া ফ্ল্যাটে আলোচনায় সংবাদ উপস্থাপিকা সাঞ্জিদা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজধানীর নিকুঞ্জে বিলাসবহুল জীবনযাপন ও অজানা উৎসের সম্পদ ঘিরে আলোচনায় এসেছেন বেসরকারি টেলিভিশনের সংবাদ উপস্থাপিকা সাঞ্জিদা আক্তার। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে। দুদকের অভিযানে জানা যায়, তার নামে থাকা দুটি ফ্ল্যাটের মূল্য প্রায় ৯৫ লাখ টাকা, পাশাপাশি ৪৫ লাখ টাকার এফডিআর এবং ২৬ লাখ টাকার বৈদেশিক মুদ্রাও পাওয়া গেছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, এসব সম্পদের মূল উৎস হিসেবে উঠে এসেছে বিমান বাহিনীর সাবেক প্রধান শেখ আব্দুল হান্নান এর নাম। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সংবাদ উপস্থাপিকা সাঞ্জিদাকে কোটি টাকার উপহার দিয়েছেন। সম্পদের উৎস যাচাই করতে গিয়ে বিষয়টির সত্যতা খতিয়ে দেখছে দুদক।

অভিযানের পর দুদকের আবেদনের ভিত্তিতে আদালত সাঞ্জিদার নামে থাকা দুটি ফ্ল্যাট ও ব্যাংক হিসাবের ৪০ লাখ টাকা জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, “এই সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে, তার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

একই দিনে দুদক আরও কয়েকটি দুর্নীতির ঘটনায় মামলা দায়ের করেছে। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে চারটি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মামলা হয়। সরকার নির্ধারিত ৭৯ হাজার টাকার পরিবর্তে এসব এজেন্সি শ্রমিকদের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চারটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৩১১ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা রুজু হয়েছে।

এছাড়া, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও আরও ১৯ জনের বিরুদ্ধে চারটি মামলা করেছে দুদক। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে ঋণের নামে প্রায় ৩১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

দুদকের মহাপরিচালক জানান, “যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে, সেগুলোর প্রমাণ মিললেই মামলা হবে। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্টদের সম্পদ জব্দ ও অবৈধ অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়াও চলছে।”

এই ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হয়েছে—অবৈধ সম্পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে দুদক কঠোর অবস্থানে রয়েছে।




দুদকের মামলায় বন কর্মকর্তা সুলতানুল আলমের জামিন নাকচ, কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় বন বিভাগের এক রেঞ্জ কর্মকর্তা সুলতানুল আলম চৌধুরী (৫৭) কে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। বুধবার (১২ নভেম্বর) চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল জজ মিজানুর রহমানের আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে শুনানি শেষে আদালত তা নাকচ করেন।

সুলতানুল আলম ফেনী জেলার দাগনভূঞা রেঞ্জের বর্তমান কর্মকর্তা। তার বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পূর্ব গোমদণ্ডীর মধ্যম কড়লডেঙ্গা এলাকায়। তিনি মৃত আজহারুল হক চৌধুরীর ছেলে। এর আগে তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের পটিয়া রেঞ্জে দায়িত্ব পালন করেছেন।

দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রনি জানান, জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জন ও তা ভোগদখলের অভিযোগে দুদক মামলা করেছিল। এই মামলায় আত্মসমর্পণের সময় সুলতানুল আলম জামিন চেয়েছিলেন, তবে আদালত তার আবেদন খারিজ করে দেন এবং কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এর আগে সুলতানুল আলম চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে জামিন নিয়েছিলেন। তবে জামিনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বুধবার তিনি পুনরায় আত্মসমর্পণ করে নতুন করে জামিন আবেদন করেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, সম্পদের বিবরণীতে তিনি ১ লাখ ৬১ হাজার ৬৪৮ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য গোপন করেন। পাশাপাশি, তিনি ৫১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৩৪ টাকার জ্ঞাত আয়ের বাইরে সম্পদ অবৈধভাবে অর্জন করে নিজের দখলে রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২ এর সহকারী পরিচালক আব্দুল মালেক বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেন। তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১২ মার্চ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।