মাধবপুরে সাব-রেজিস্ট্রার মাসুদ রানার বিরুদ্ধে দুর্নীতির ঝড়, অভিযোগে তোলপাড় দপ্তর

হবিগঞ্জ প্রতিনিধিঃ হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার মাসুদ রানার বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতি, অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে। তার দপ্তরে এখন চলছে চরম অস্বচ্ছতা ও ভীতিকর কর্মপরিবেশ— এমনটাই অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ও দপ্তরের কর্মচারীরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কথিত ‘অলিখিত নির্দেশ’ দেখিয়ে মাসুদ রানা স্থানীয় নিশান এনজিওর বিভিন্ন সম্পত্তির দলিল সম্পাদন বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে অনেক গ্রাহক তাদের বৈধ সম্পত্তির দলিল নিতে পারছেন না। অভিযোগ উঠেছে, তিনি এসব সিদ্ধান্ত নিতে আইন মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার নামও ব্যবহার করেন প্রভাব খাটাতে।

অফিসের নকলনবিশ জান্নাত আরা জানান, তিনি মাসুদ রানার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনলেও সেটি যথাযথভাবে গ্রহণ বা তদন্ত করা হয়নি। বরং অভিযোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তার ভাষায়— “আমি লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি গ্রহণ করেননি। পরে জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ জানাই এবং শেষ পর্যন্ত আদালতের শরণাপন্ন হই।”

অফিসের অন্যান্য কর্মচারীরাও জানিয়েছেন, সাব-রেজিস্ট্রার অনেক সময় অফিসের নিয়ম ভেঙে এজলাসে না বসে নিজ কামরাতেই দলিল সম্পাদন করেন। আবার অনেক নকলনবিশকে তিনি ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত রাখেন। কেউ প্রতিবাদ করলে বিভিন্নভাবে চাপের মুখে পড়তে হয়।

এছাড়া অভিযোগ আছে, দলিল সম্পাদনের সময় স্থানীয় একটি মসজিদের নামে অনুদান হিসেবে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের দাবি— এই টাকা সম্পূর্ণভাবে মসজিদের তহবিলে জমা হয় না, বরং বেশিরভাগ অর্থ সাব-রেজিস্ট্রার ও তার সহযোগীদের পকেটে চলে যায়।

নিশান এনজিওর ভুক্তভোগী নয়ন মিয়া বলেন, “আমাদের দলিল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে টাকার বিনিময়ে। আমরা লাখ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছি। এখন হাইকোর্টে রিট করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।”

অফিসের কয়েকজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “এখানে নারী কর্মীদের জন্য কোনো নিরাপদ পরিবেশ নেই। কেউ অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই তাকে প্রশাসনিকভাবে চাপে ফেলা হয়।”

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সাব-রেজিস্ট্রার মাসুদ রানা নিজ কক্ষে বসেই দলিল সম্পাদন করছেন। অনেক নকলনবিশকে তার ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত দেখা যায়। অফিসে কর্মচারীদের অর্থ আদায়ের দৃশ্যও চোখে পড়ে।

অভিযোগের বিষয়ে মাসুদ রানা বলেন, “প্রতি দলিলের কিছু টাকা নেওয়া হয়, তবে সবটুকু মসজিদের অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়। নারী কর্মচারীর অভিযোগ তদন্তাধীন আছে। অফিসে বসে দলিল করতে হয় প্রয়োজনে। অন্য সব অভিযোগ মিথ্যা।”

এ বিষয়ে নিবন্ধন অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগের পরিদর্শক মীর মাহবুব মেহেদী বলেন, “তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ আমরা পেয়েছি। তদন্ত চলছে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

হবিগঞ্জ জেলার রেজিস্ট্রার কে. এম. রফিকুল কাদির জানান, “অভিযোগগুলো আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”




৩০০ কোটি টাকায় মনোনয়ন কেনার ঘোষণা ও ২ হাজার কোটি টাকার সম্পদের অনুসন্ধান দাবি- মোস্তফা জামানের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য সচিব হাজী মোস্তফা জামান-এর বিরুদ্ধে বিপুল সম্পদ অর্জন ও অস্বচ্ছ আর্থিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে, যেখানে অনুসন্ধান চাওয়া হয়েছে তার সম্পদের উৎস ও নির্বাচনী তহবিলের অর্থের উৎস সম্পর্কে।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী হতে গিয়ে মোস্তফা জামান তিনশত কোটি টাকা ব্যয় করতে ইচ্ছুক—এমন মন্তব্য তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি ও গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ৮ থেকে ১০ বছরে মোস্তফা জামান রাজধানীর উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২০ একর জমি, ১০ থেকে ১২টি বহুতল ভবন এবং ২০টিরও বেশি ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন। অভিযোগকারীরা বলেন, তার দৃশ্যমান কোনো বড় ব্যবসা বা প্রকাশ্য আয়ের উৎস নেই, কিন্তু তিনি হঠাৎ করেই প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দুদকে জমা দেওয়া নথিতে বলা হয়, ২০২০ সালের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন মোস্তফা জামান। নির্বাচনের সময় দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী, তার মালিকানাধীন জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৭৭ শতাংশ, এবং বার্ষিক আয় উল্লেখ করা হয়েছিল মাত্র ৫ লাখ ৩১ হাজার টাকা।

কিন্তু অভিযোগকারীদের দাবি, বর্তমানে তার ভাড়াজনিত আয়ই মাসিক প্রায় দুই কোটি টাকা, যা বাৎসরিক হিসাবে ২৪ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। অথচ আয়কর বিবরণীতে এমন কোনো পরিমাণ অর্থের উৎস বা ঘোষণা দেখা যায় না।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, “২০২০ সালের পর থেকে মোস্তফা জামানের সম্পদ বৃদ্ধির হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কৃষক পরিবার থেকে উঠে এসে মাত্র এক দশকের মধ্যে শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়া একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।”

এছাড়া, অভিযোগে দাবি করা হয়, জুলাই বিপ্লবের পর বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন মোস্তফা জামান। এর আগে তিনি তুরাগ থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। দলীয় রাজনীতিতে পুনরায় প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি নাকি ২০ কোটি টাকার বিনিময়ে মহানগর উত্তর বিএনপির পদ অর্জন করেছেন, এমন অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে চিঠিতে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, “মোস্তফা জামান প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, প্রয়োজনে তিনশত কোটি টাকা খরচ করে হলেও তিনি ঢাকা-১৮ আসনের মনোনয়ন নিশ্চিত করবেন। প্রকাশ্যে কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য না থাকলেও কীভাবে তার পরিবার হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলো—দুদকের উচিত বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা।”

এ বিষয়ে মোস্তফা জামানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগপত্রটি কমিশনের রিসিভ সেকশনে জমা হয়েছে এবং প্রাথমিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় পাঠানো হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের অভিযোগ বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।




প্রধান উপদেষ্টাকে প্রাণনাশের হুমকি, ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ নিজ ফেসবুক লাইভে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে বাঁশখালীর ছাত্রলীগ নেতা শেফায়েতুল ইসলাম ইমরানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

বুধবার (১২ নভেম্বর) ভোরে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের একটি টিম অভিযান চালিয়ে শহরের একটি এলাকা থেকে তাকে আটক করে। পুলিশ জানায়, হুমকিমূলক ভিডিও প্রকাশের পর থেকে ইমরান পলাতক ছিলেন এবং তাকে ধরতে চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ, ঢাকা ও কক্সবাজারে অভিযান চালানো হয়।

ইমরান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের বিরোধী প্রচারণা ও উস্কানিমূলক বক্তব্য ছড়াতেন। সর্বশেষ ৯ নভেম্বর বাঁশখালীর প্রধান সড়কে একটি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের নেতৃত্ব দেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইমরান বাঁশখালী উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের মধুখালী এলাকার রেজাউল করিমের ছেলে। সম্প্রতি তিনি বিএম কনটেইনার ডিপোতে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিলেন, কিন্তু ফেসবুক লাইভের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, ইমরানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




দুর্নীতির মামলায় সাবেক বিমানবাহিনী প্রধানের সহযোগী সানজিদার ফ্ল্যাট ও ব্যাংক হিসাব জব্দ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দুর্নীতির মামলায় সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল (অব.) শেখ আব্দুল হান্নানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সানজিদা আক্তারের নামে থাকা দুইটি ফ্ল্যাট ও ব্যাংক হিসাব জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ সাব্বির ফয়েজ এ আদেশ দেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পর আদালত এই আদেশ দেন। দুদকের পক্ষে সংস্থার সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান আবেদনটি দাখিল করেন। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম।

দুদকের আবেদনে বলা হয়, সাবেক এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে নিজের এবং ঘনিষ্ঠদের নামে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত ২৭ জুলাই মামলা দায়ের করা হয়। তদন্তে দেখা যায়, হান্নান তার সহযোগী সানজিদা আক্তারের নামে ঢাকার খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ-২ এলাকায় প্রায় ৯৫ লাখ টাকায় দুটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেন।

এছাড়া, বিভিন্ন ব্যাংকে সানজিদার নামে ৪০ লাখ টাকার বেশি অর্থ ও একাধিক এফডিআর পাওয়া যায়। তদন্তে জানা গেছে, এসব অর্থের কোনো বৈধ উৎস নেই। এমনকি তার বাসায় তল্লাশিকালে ২৬ লাখ টাকার বেশি বিদেশি মুদ্রাও উদ্ধার করা হয়, যা তার বৈধ আয় দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয় বলে দুদক জানিয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, তদন্ত চলাকালে সানজিদা আক্তার এসব সম্পদ গোপনে বিক্রি বা অন্যত্র স্থানান্তরের চেষ্টা করছেন। ফলে মামলার নিষ্পত্তির আগে সম্পদ বেহাত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দুদক আদালতে ফ্ল্যাট দুটি জব্দ ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আবেদন করে। আদালত বিষয়টি পর্যালোচনা করে সম্পদ জব্দের আদেশ দেন।

দুদকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শেখ আব্দুল হান্নান ও তার সহযোগী সানজিদা আক্তারের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত শেষে প্রমাণ মিললে শিগগিরই অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।




মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে ৩১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ: চার রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে চারটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চারটি পৃথক মামলা করেছে। এসব মামলায় মোট পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে, যারা প্রবাসে ১৮ হাজারের বেশি শ্রমিক পাঠানোর সময় সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে প্রায় ৩১০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

গতকাল (১১ নভেম্বর) মঙ্গলবার দুদকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সংস্থার মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। দুদকের সহকারী পরিচালক মিনহাজ বিন ইসলাম বাদী হয়ে ঢাকা-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে চারটি মামলা দায়ের করেছেন।

মামলায় আসামি করা হয়েছে—  
সেলিব্রিটি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড-এর চেয়ারম্যান ফরিদা বানু ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল হাই (৭৫),
অদিতী ইন্টারন্যাশনাল-এর স্বত্তাধিকারী বিশ্বজিৎ সাহা (৫৫),
রাব্বি ইন্টারন্যাশনাল-এর স্বত্তাধিকারী মোহাম্মদ বশির (৬২) এবং
আর ভিং এন্টারপ্রাইজ-এর স্বত্তাধিকারী হেফজুল বারী মোহাম্মদ লুৎফর রহমান (৬৪)-কে।

দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, এই আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রবাসী কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছেন। সরকার যেখানে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর খরচ ৭৮,৯৯০ টাকা নির্ধারণ করেছিল, সেখানে তারা কর্মীদের কাছ থেকে কয়েকগুণ বেশি টাকা নিয়েছেন।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে জানা যায়,

  • সেলিব্রিটি ইন্টারন্যাশনাল ৩,৪৮৬ জন কর্মীর কাছ থেকে ৫৮ কোটি ৩৯ লাখ ৫ হাজার টাকা,

  • অদিতী ইন্টারন্যাশনাল ৩,৮৫২ জনের কাছ থেকে ৬৪ কোটি ৫২ লাখ ১০ হাজার টাকা,

  • রাব্বি ইন্টারন্যাশনাল ৩,১৪৮ জনের কাছ থেকে ৫২ কোটি ৭২ লাখ ৯০ হাজার টাকা, এবং

  • আর ভিং এন্টারপ্রাইজ ৮,০৭৭ জন কর্মীর কাছ থেকে ১৩৫ কোটি ২৮ লাখ ৯৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়।

এছাড়া, প্রতিজন কর্মীর পাসপোর্ট ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য যে অর্থ সরকার নির্ধারণ করেছিল, তা ফেরত না দিয়ে ওই টাকাও আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। এভাবে প্রাপ্ত অর্থ অবৈধভাবে স্থানান্তর ও রূপান্তর করে মানি লন্ডারিং করা হয়েছে বলে দুদকের দাবি।

তদন্তে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, বিএমইটি ও সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে দুদক প্রাথমিকভাবে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে।

এই ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২০(বি)/১৬১/১৬২/১৬৩/১৬৪/১৬৫(ক)/৪২০/৪০৯/১০৯ ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারা অনুযায়ী মামলা করা হয়েছে।




শ্যামনগরে যুবদল নেতা আনারুলের অবৈধ বালু বাণিজ্য: মাসে কোটি টাকার লেনদেন

সাতক্ষীরা প্রতিনিধিঃ সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন খোলপেটুয়া ও কপোতাক্ষ নদে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে ব্যাপক অর্থ উপার্জন করছেন উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব আনারুল ইসলাম আংগুর। এলাকাজুড়ে তিনি এখন “বালু খেকো” নামে পরিচিত। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি নদী থেকে বালু তুলছেন নির্বিঘ্নে, আর এতে প্রতি মাসে আয় করছেন কোটি টাকার বেশি।

শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী, আড়পাঙ্গাশিয়া, নওয়াবেকী ও ঘোলা— এসব এলাকায় কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর তীরে জনবসতি গড়ে উঠেছে। প্রায় প্রতিবছরই এসব এলাকায় নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও অতিরিক্ত জোয়ারের কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে নদীভাঙন আরও তীব্র হয়েছে, বেড়িবাঁধও পড়েছে ঝুঁকিতে।

স্থানীয়রা জানান, আগে আওয়ামী লীগের সময় কিছু যুবলীগ নেতা বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং এতে মাসে কোটি টাকা আয় করতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই বালু বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ যায় যুবদল নেতা আনারুলের হাতে। তিনি সাতক্ষীরার আশাশুনি থানার ঘোলা তেরমুনে এলাকার একটি বালু মহলের নাম ব্যবহার করলেও বাস্তবে বালু উত্তোলন করছেন গাবুরা ইউনিয়নের জেলিয়াখালী নামক স্থানে, যা তার ঘোষিত মহল থেকে নদীপথে প্রায় বিশ কিলোমিটার দূরে।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, আনারুল ইসলাম আংগুর প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দেন, যাতে তার অবৈধ কার্যক্রমে বাধা না আসে। অভিযোগ রয়েছে, শ্যামনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসকও তার প্রভাবের বাইরে নন। এলাকাবাসী কেউ প্রতিবাদ করলে আনারুল তাদের হুমকি দিয়ে চুপ করিয়ে দেন।

গাবুরার কিছু বাসিন্দা জানান, এখন এলাকায় আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টির প্রভাব নেই, বালুর ব্যবসায় জড়িত শুধু বিএনপি ও জামায়াতপন্থীরা। প্রশ্ন উঠেছে, জামায়াত শিবির নেতারা কেন এ বিষয়ে চুপ আছেন। স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসন ও রাজনীতি দুই দিকই এখন অর্থের বিনিময়ে আনারুলের নিয়ন্ত্রণে, তাই কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।




নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণে স্থবিরতা — উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ

এসএম বদরুল আলমঃ নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প। প্রায় এক যুগ আগে প্রকল্পটির কাজ শুরু হলেও এখনো তা আলোর মুখ দেখেনি। বরং অধিগ্রহণ করা জমির একটি বড় অংশ দখল করে রেখেছে প্রভাবশালী মহল, যার কারণে হাসপাতাল নির্মাণ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়েছে।

সোমবার (১১ নভেম্বর) সকালে জেলা প্রশাসন ও কলেজ কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দীন ফোন করে অভিযান স্থগিতের ঘোষণা দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, সরকারি নির্দেশনা ও বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। দখলদাররা জমি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে এবং প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টি বিলম্বিত করছেন বলে তাদের অভিযোগ।

এক শিক্ষার্থী বলেন, “সরকার কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, অথচ দখলদারদের কারণে হাসপাতাল নির্মাণ কাজ শুরুই হচ্ছে না। আজ উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ করে দেওয়া অন্যায়ের শামিল।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, ১২ বছর আগে জমি অধিগ্রহণের সময় বাউন্ডারি দেয়াল নির্মাণ করা হলেও পরে তা ভেঙে বসতি গড়ে তোলে এক প্রভাবশালী গোষ্ঠী। এখন তারা এলাকাটিকে নিজেদের দখলে রেখে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।

এ বিষয়ে কলেজ শিক্ষক পরিষদের এক সদস্য বলেন, “এটি শুধু একটি প্রকল্প নয়, পুরো নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রতীক। প্রশাসনের উদাসীনতা এখন জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।”

ঘটনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা বিকেলে এক জরুরি সভা করে। সভা শেষে তারা ঘোষণা দেন, “দুই-তিন দিনের মধ্যে আমরা জেলা প্রশাসক কার্যালয় ঘেরাও করব যদি দ্রুত দখলমুক্ত না করা হয়।”

বর্তমানে নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে হাসপাতাল নির্মাণ কাজ শুরুর দাবি জানিয়েছেন।




আর ইউ টি ডিপিতে অনিয়মের গন্ধ: নারীপ্রেমে বেপরোয়া কনসালটেন্ট নূরুল আমিন তালুকদার

এসএম বদরুল আলমঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর আওতাধীন “আরবান রেজিলিয়েন্ট টাউন ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট” বা সংক্ষেপে আর ইউ টি ডিপি (RUTDP) নামের বিশাল এই প্রকল্পে একের পর এক অনিয়ম আর বিতর্কে জড়াচ্ছে কর্মকর্তারা। প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে সরকারি অর্থে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শতাধিক কর্মকর্তা, কনসালটেন্ট ও ফার্ম। কিন্তু প্রকল্পের কর্মকাণ্ডের চেয়ে বেশি আলোচনায় এখন প্রকল্পের এক শীর্ষ কনসালটেন্ট নূরুল আমিন তালুকদার—যাকে নিয়ে নানা অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে অফিসের ভেতরে-বাইরে।

সূত্র জানায়, নূরুল আমিন তালুকদার এই প্রকল্পের ডি এম এস (DMS) কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্বে আছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নাকি এই পদে আসীন হয়েছেন ঘুষের বিনিময়ে। প্রকল্পের সাবেক প্রজেক্ট ডিরেক্টর (পিডি) প্রায় সাত লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে তাকে নিয়োগ দিয়েছেন—এমন তথ্যও মিলেছে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে। তার মাসিক বেতন প্রায় আড়াই লাখ টাকা বলে জানা গেছে।

এই প্রকল্পের আওতায় ৮১টি পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনে “ক্লাস্টার ডেভেলপমেন্ট কর্মশালা” আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি কর্মশালার জন্য যাতায়াত, খাওয়া-দাওয়া ও অনারিয়াম বাবদ প্রায় দেড় লাখ টাকা বাজেট ধরা আছে। কিন্তু বাস্তবে এই টাকা কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।

প্রকল্পের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করে জানান, কর্মশালার সময়সূচি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত হলেও বাস্তবে তা হয় সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রকল্পের নির্ধারিত ব্যয়ের টাকা পৌরসভা বা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের নিজেদের পকেট থেকে খরচ করতে হয়। পরবর্তীতে সেই টাকা নূরুল আমিন তালুকদার ও পিডির মধ্যে ভাগ হয়ে যায় বলে জানা গেছে।

অভিযোগ এখানেই শেষ নয়—কর্মশালাগুলোতে তিনি প্রায়ই সুন্দরী নারী সহকর্মীদের নিয়ে সফর করেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন আরবান প্ল্যানার জোবায়দা পারভীন, আর্কিটেক্ট আজমিরা ও ফারহানা ইসলাম, জেন্ডার স্পেশালিস্ট সাজেদা বেগমসহ আরও কয়েকজন নারী কর্মকর্তা। স্থানীয় প্রকৌশলীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কর্মশালার চেয়ে বেশি সময় কাটে তার “বিশেষ অতিথিদের” সঙ্গে আলাপ-আড্ডায়।

অফিসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নূরুল আমিন তালুকদার অফিস সময়েও প্রায়ই নারী সহকর্মীদের নিয়ে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় মেতে থাকেন। অনেক সময় আপত্তিকর অবস্থায়ও তাকে দেখা গেছে। সূত্র জানায়, তার পরিবার বর্তমানে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছে, আর ঢাকায় তার নিজস্ব বাড়িও রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রায়ই অফিসের কিছু নারী কর্মীকে নিজের বাসায় আমন্ত্রণ জানান। সেখানে সারাদিন চলে খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা ও হাসিঠাট্টা। এতে অনেক নারী কর্মকর্তা আতঙ্কে ও অস্বস্তিতে অফিস করেন, বিশেষ করে যারা তার সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন।

প্রকল্পের ভেতরে এই ধরনের আচরণে সহকর্মীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেকে বলছেন, প্রকল্পের কাজের চেয়ে এখন বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে “অপ্রাসঙ্গিক” কর্মকাণ্ডে।

বড় অঙ্কের সরকারি অর্থে পরিচালিত এই প্রকল্পে এমন কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক কর্মকর্তা। তারা মনে করেন, যথাযথ তদন্ত না হলে প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।




এলজিইডিতে ফিরোজ আলম তালুকদারের দাপট: অভিযোগে তোলপাড়, হুমকিতে সাংবাদিক

এসএম বদরুল আলমঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী ফিরোজ আলম তালুকদারকে ঘিরে দপ্তরজুড়ে চলছে ব্যাপক তোলপাড়। তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ-বদলির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটি এখন সরগরম। সম্প্রতি তাঁর অনিয়ম ও সহযোগীদের দূর্নীতির খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। অভিযোগ উঠেছে, সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে ফিরোজ আলম তালুকদার সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদককে নানাভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছেন। এ ঘটনায় প্রতিবেদক ও তাঁর সহকর্মী শেরেবাংলা নগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং–৭১৪/২৫) করেছেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তালিকাভুক্ত ফিরোজ আলম তালুকদার দীর্ঘদিন ধরেই এলজিইডির সবচেয়ে বিতর্কিত কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। ২০১৫ সালে দুদক তাঁকে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও কোটি টাকার কর ফাঁকির অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। ১৫ ও ১৬ এপ্রিল দুই দফা জিজ্ঞাসাবাদের পরও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তখন তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, ১/১১–এর পর সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ওয়াহেদুর রহমানের সময়ে পদোন্নতির ঘুষ বাণিজ্যে ফিরোজ আলম তালুকদার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আদালতের এক রায়ের পর পদোন্নতির সুবিধা পাওয়া প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে প্রায় ৩,১০৫ জনের কাছ থেকে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়া হয়। মোট অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে তিন শত কোটি টাকা, যা ফিরোজের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। সে সময় তিনি প্রধান প্রকৌশলীর স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা মোহাম্মদ নাসিমের নাতি এবং ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের কথিত পুত্র বা আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে ফিরোজ আলম তালুকদার এলজিইডিতে নিয়োগ, বদলি ও ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব খাটান। বঙ্গবন্ধু পরিষদের সেক্রেটারি পরিচয়েও তিনি প্রশাসনে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন।

তার নিজ জেলা সিরাজগঞ্জেও ফিরোজের প্রভাব তীব্রভাবে দৃশ্যমান। স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, তাঁর ভাই ও ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সহযোগীদের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য চালাচ্ছেন। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও এলজিইডি অফিস তাঁর ছত্রছায়ায় পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।

এলজিইডির ভেতরে-বাইরে এখন অনেকেই বলছেন, ফিরোজ আলম তালুকদার কেবল একজন প্রকৌশলী নন—তিনি যেন এক “অঘোষিত কর্তৃপক্ষ”। দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও ভয়ভীতির সংস্কৃতিতে জড়িয়ে থাকা এমন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যদি কঠোর তদন্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই উন্নয়ন সংস্থার ভাবমূর্তি আরও প্রশ্নের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।




রাজধানীজুড়ে ককটেল-অগ্নিসংযোগ, উচ্চ সতর্কতা জারি

ডেস্ক নিউজঃ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে গতকাল একযোগে ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রাজধানী জুড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সারাদিনে অন্তত ১১ টি স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে এবং তিনটি বাসে আগুন দেয়া হয়েছে। কোনো বড় ধরনের হতাহতের খবর না পাওয়া গেলেও ঘটনায় শহরে নিরাপত্তা বজায় রাখতে ইতোমধ্যেই ব্যাপকতবে তৎপরতা বাড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও র‌্যাব যৌথ কার্যক্রম শুরু করেছে এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি ক্ষুন্ন করার যে কোনও চেষ্টা কঠোরতার সঙ্গে দমন করা হবে। পুলিশের নির্দেশে আগামী ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর সব থানাকে টহল, নজরদারি ও গৌণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বাড়াতে বলা হয়েছে—এ দিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা এক মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণ হয়েছে।

ঘটনার ধারাবাহিকতায় প্রথম বিস্ফোরণটি ভোররাতে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ঘটে; ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সংযোগ আছে। মিরপুর মডেল থানার ওসি সাজ্জাদ রোমান জানান, মোটরসাইকেলে এসে দুই ব্যক্তি ভবনের সামনে ককটেল নিক্ষেপ করে পালিয়ে যায়। সেই সময়ে মোহাম্মদপুরের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টার মালিকানাধীন এক প্রতিষ্ঠানেও মোটরসাইকেল থেকে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টার ও ইবনে সিনা হাসপাতালের দিকে মোট চারটি ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

সন্ধ্যায় মৌচাক, আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ বেতার, খিলগাঁও ফ্লাইওভার এলাকা ও মিরপুর শাহ আলী মার্কেট সংলগ্ন জায়গায় বিস্ফোরণ ঘটে; রাত ১০টার দিকে ফ্লাইওভার থেকে আরেকটি ককটেল নিক্ষেপ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। দিনের শেষ বিস্ফোরণটি রাত ১১টা ১০ মিনিটে বাংলামোটরে এনসিপি কার্যালয়ের সামনে ঘটে; এতে এক পথচারী সামান্য আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে একটি অবিস্ফোরিত বোমা উদ্ধার করা হয়েছে বলে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব মুশফিক উস সালেহীন জানান। তিনি বলেন, বিস্ফোরণের পর স্থানীয়রা মোটরসাইকেল চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় দুই জনকে ধাওয়া করে আটক করে—পরে আরও তিনজনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

পুলিশি সূত্রে জানা গেছে, আগের দিন কাকরাইলের সেন্ট মেরি’স ক্যাথেড্রালে ও মোহাম্মদপুরের সেন্ট জোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষকদের বাসভবনের সামনে ককটেল হামলার ঘটনা ঘটে। এছাড়া ভোরে শাহজাদপুর ও মেরুলবাড্ডায় দুটি বাসে আগুন দেয়া হয় এবং সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ধানমন্ডির ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে আরেকটি বাসে আগুন লাগানো হয়। তৎপরতায় ডিএমপি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এলাকার আশেপাশে সব ধরনের জনসমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও জনপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে।

পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) জানিয়েছে, হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে তারা পাল্টা গোয়েন্দা তৎপরতা চালাচ্ছে ও নজরদারি বাড়িয়েছে। ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের কিছু কর্মী প্রকাশ্যে বলে ফেলেছেন তারা তাদের নেতাদের জন্য যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত—এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সোমবার পৃথক অভিযান চালিয়ে আড়াই ডজনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ককটেল হামলায় যুক্ত থাকার অভিযোগে ২৮ বছর বয়সী এক ছাত্রলীগ সদস্যকেও ডিএমপি আটক করেছে।

সরকার ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় অটল থাকার বার্তা দিয়েছে এবং ঢাকার গির্জা, মন্দির, মসজিদসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, ‘দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রতিটি চেষ্টা দ্রুত ও কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে; জননিরাপত্তা, জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সুরক্ষা আমাদের অগ্রাধিকার।’

ঘটনাগুলো এমন সময়ে ঘটেছে যখন রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও বিএনপি–আলোচিত একটি সংগঠন আগামী ১৩ নভেম্বর ‘ঢাকা লকডাউন’ ঘোষণা করেছে—এই প্রেক্ষিতেই রাজধানীতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নিরাপত্তা সভায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সব থানাকে টহল, অতিরিক্ত আলোকসজ্জা, সিসিটিভি তদারকি ও জরুরি প্রতিরোধ ব্যাবস্থা জোরদারের নির্দেশ দেন; রেলওয়ে, মেট্রো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোতেও বিশেষ সতর্কতা তোলা হচ্ছে।