নৈশ প্রহরী থেকে কোটি টাকার মালিক! কর বিভাগের কর্মচারীর বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিস্ফোরক তথ্য

এসএম বদরুল আলমঃ মো: জুলহাস উদ্দিন আহমেদ কর বিভাগে নৈশ প্রহরী হিসেবে চাকুরীতে প্রথম যোগদান করেন ২৩ মে ১৯৯৩ সালে। একই বিভাগে ৭ বছর চাকরি করার পর ১০ সেপ্টেম্বর ২০০০ সালে অফিস সহায়ক ( পিয়ন ) পদে প্রথম পদোন্নতি পান। একটানা একই বিভাগে ২৫ বছর চাকরি করেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকার থাকাকালীন “অফিস সহকারী কাম কমপিউটার মুদ্রাক্ষরিক ” পদে ৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ইং তারিখে দ্বিতীয় পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে তিনি কর অঞ্চল – ৩, সার্কেল – ৫৯, পুরানা পল্টন ঢাকায় নিয়মিত চাকরি করে যাচ্ছেন। উনার বর্তমান মাসিক বেতন সর্বসাকুল্যে ২২,৪৯০ টাকা।

 

354

 

জুলহাস উদ্দিন আহমেদ ভূয়া ঠিকানায় চাকরি নিয়েছেন মর্মে অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের হাতে বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত ও প্রমান আসে। উনার সম্পর্কে বিভিন্ন ভাবে অনুসন্ধান করে জানা যায় তিনি সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে কাগজ-পত্র জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া স্থায়ী ঠিকানা মানিকগঞ্জ জেলা দেখিয়ে সরকারী চাকরি বাগিয়ে নেন। পরবর্তীতে চাকরি স্থায়ী করনের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশনে তিনি ঘুষের মাধ্যমে পুলিশকে ম্যানেজ করে মানিকগঞ্জের ভূয়া স্থায়ী ঠিকানাকে সঠিক স্থায়ী ঠিকানা দেখিয়ে পুলিশ তদন্ত রিপোর্টটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়ান। সংশ্লিষ্ট দপ্তর পুলিশ তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী উনার চাকরি স্থায়ী করন করেন।

জুলহাস উদ্দিন সম্পর্কে মানিকগঞ্জ জেলায় অনুসন্ধান চালানো হলে তার কোন স্থায়ী ঠিকানার অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদকের হাতের তথ্য-উপাত্ত ও খোঁজ খবর নিয়ে জানা যায়, উনার সঠিক স্থায়ী ঠিকানা : গ্রাম / রাস্তা ৯৯৯, ডাকঘর – সুলতানপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, জেলা – ব্রাহ্মণবাড়িয়া। যাহা উনার এন আই ডি পূর্বের নাম্বার ১৯৭৩২৬৯৩৬২৫৬৮৮৭২৯ এবং বর্তমান স্মার্ট কার্ড নাম্বার ৬৪০০৭১৫১২১ অনুযায়ী সত্যতা পাওয়া যায়।

এসব করে এখানেই তিনি ক্ষ্যান্ত হননি, চাকরি চলাকালীন অবস্থায় নিয়মিত ভাবে সরকারের সাথে প্রতারণা করেই যাচ্ছেন। বাংলাদেশ সরকার প্রত্যেক সরকারী কর্মকর্তা –
কর্মচারীদের আয়কর রির্টান জমা বাধ্যতামূলক করেছে । নতুন TIN ( ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টি নাম্বার ) যখন অনলাইন থেকে বের করা হয়। সেক্ষেত্রে ফরম পুরনের সময় পেশা সরকারী চাকুরীজীবি এবং কর্মস্থল ঢাকা দেখালে সয়ংক্রিয় ভাবে কর অঞ্চল – ৪ অন্তর্ভুক্ত হবে। এই কর অঞ্চলেই ঢাকায় অবস্থানরত সকল সরকারী চাকুরীজীবি আয়কর রির্টান জমা করে থাকেন।

কিন্তু জুলহাস উদ্দিন আহমেদের ৩৪ বছর ধরে নিজের কর্মস্থল কর অঞ্চল – ৩ হওয়ায় নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে লাগাতার একই জায়গায় চাকরি করে যাচ্ছেন। সব নিয়ম যেন তার হাতের মুঠোয়।কিন্তু তিনি সরকারকে বৃদ্ধাংগুলি দেখিয়ে নিজের রাজ্য কর অঞ্চল -৩, সার্কেল – ৬২ থেকেই নতুন TIN অনলাইন থেকে বের করেন। সব অনিয়ম তার কাছে এখন নিয়মে পরিনত হয়েছে। দেখার যেন কেউ নেই।
সরাসরি সাক্ষাৎকারে উনার কাছে ভুয়া ঠিকানা ও এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন আমার ভুল হয়েছে।

বিষয়টি এখানেই শেষ নয়, উনার TIN সার্টিফিকেট যাচাই করে দেখা যায় রাজধানী ঢাকাতেও উনার একটি স্থায়ী ঠিকানা পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে উনার স্থায়ী ঠিকানা হলো ৩ টি। প্রশ্ন থেকে যায় – একই ব্যাক্তির স্থায়ী ঠিকানা কয়টি হতে পারে ? মুলত এর ভিতরে রহস্য কি ? হ্যাঁ গভীরে আরো রহস্য লুকিয়ে আছে।

জুলহাস উদ্দিন আহমেদের ভূয়া ঠিকানায় চাকরি, সরকারের সাথে প্রতারণা ও একাধিক স্থায়ী ঠিকানার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে কেচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে এলো। তিনি গোপনে গড়েছেন টাকার পাহাড় ও নামে বেনামে সম্পদের পাহাড়। ঢাকার স্থায়ী ঠিকানার সূত্র ধরে অনুসন্ধানে জানা যায় – খিলগাও দক্ষীন বনশ্রী মেইন রোড এইচ ব্লকে বাড়ি নং – ৩ তার নিকট আত্তীয়ের নামে কিনেছেন কোটি টাকার ফ্ল্যাট। তার সঠিক স্থায়ী ঠিকানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সুলতানপুরে তার নিজের নামে ও ভাইদের নামে গড়েছেন রাজকীয় প্রাসাদ। এবং বাড়ির ভিতর রয়েছে অভিজাত ফার্নিচার। নিকট আত্তীয় স্বজনের নামে কিনেছেন প্রচুর জায়গা জমি। ৭ ভাইয়ের মধ্যে তিনি তার সবচেয়ে ছোট ভাইকে পাঠিয়েছেন আমেরিকার টেক্সাসে। অন্য আরেক ভাইকে পাঠিয়েছেন সৌদিআরবে।

 

657

 

জুলহাস উদ্দিন আহমেদ ২ মেয়ে ১ ছেলের পিতা। ছেলেকে দেশের সুনামধন্য প্রাইভেট ইষ্ট ওয়েষ্ট ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করিয়েছেন। শুধু তাই নয় – সেখানে পড়াশোনা সম্পন্ন করার পর বর্তমানে উনার ছেলেকে লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করাচ্ছেন। উনার সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে উনাকে যখন প্রশ্ন করা হয় – ৭ বছর নৈশ প্রহরী এবং ২৫ বছর যাবৎ আপনি পিয়ন পদে চাকরি করেছেন। তখন আপনার মাসিক বেতন কত ছিল ? উত্তরে তিনি বলেন – পূর্বে অতি সামান্য বেতন থাকলেও তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার টাকায়। ছেলেকে ইষ্ট ওয়েষ্ট ইউনিভার্সিটির খরচ এবং লন্ডনে পড়াশোনা করতে যাওয়ার খরচ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে উনি কোন সদ উত্তর না দিয়ে রেগে যান এবং বলেন – আপনারা যা পারেন নিউজ করেন!

তার সম্পর্কে আরও বিভিন্ন ভাবে অনুসন্ধান করে প্রমান পাওয়া যায়, তিনি সুলতানপুর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় খেলাধুলার অনুষ্ঠান, স্কুলের অনুষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে ডোনেশন করে বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চে বসেন এবং উপহার সামগ্রী ও অনুদান বিতরন করেন।

 

786

 

এসব বিষয়ে সরাসরি উনাকে প্রশ্ন করা হয় যে – আপনি বেতন পান ১৬ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তব চিত্রে আপনার মাসিক খরচ লাখ লাখ টাকা। বাকী টাকাগুলো আপনার কোথা থেকে আসে ? তিনি উত্তর না দিয়ে প্রতিবেদকের উপর রেগে যান।

দেশের সচেতন মহলের দাবি, এই ধরনের অসাধু কর্মচারী রাষ্ট্রের জন্য খুবই ভয়ংকর। তার সমস্ত অপরাধের বিষয় গুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষ আমলে নিবেন এবং আশাবাদী যথাযথ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শাস্তির ব্যাবস্থা গ্রহণ করবেন।




নদী খননের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ? বিআইডব্লিউটিএ’র অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাইদুর রহমানকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর ড্রেজিং বিভাগ যেন এখন দুর্নীতির অভয়ারণ্য। আর সেই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মো. সাইদুর রহমান। দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ, অনিয়ম, প্রকল্প লুটপাট, বদলি-বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে বিতর্কিত এই কর্মকর্তা আবারও আলোচনায় উঠে এসেছেন ভয়াবহ সব অভিযোগে।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ চক্রের অন্যতম সদস্য ছিলেন সাইদুর রহমান। ক্ষমতার পালাবদল হলেও রহস্যজনকভাবে বহাল তবিয়তেই রয়েছেন তিনি। বরং আগের মতোই কূটকৌশলে নিজের অবস্থান ধরে রেখে ড্রেজিং বিভাগকে ব্যবহার করছেন ব্যক্তিগত আখের গোছাতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পে নদী খননের নামে প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ভোগাই ও কংস নদ খননের কাজেও ব্যাপক অনিয়ম, ভুয়া বিল-ভাউচার এবং কাগুজে খননের মাধ্যমে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প এলাকায় বাস্তবে কাজ না করেই ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়—এমন বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ’র একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

অভিযোগ আরও ভয়ংকর। বলা হচ্ছে, সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে ড্রেজিং বিভাগে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দুর্নীতির সিন্ডিকেট। এই চক্র নিয়ন্ত্রণ করে দরপত্র বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম। সিন্ডিকেটের বাইরে কেউ কথা বললেই তাকে হয়রানি, বদলি কিংবা পদোন্নতি আটকে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র জানায়, নদী খননের নামে প্রকল্পে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে কাগজে-কলমে শতভাগ বাস্তবায়নের রিপোর্ট তৈরি করা হতো। এরপর ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ তুলে ভাগ-বাটোয়ারা করতেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, এসব অপকর্মের মূল সমন্বয়ক ছিলেন সাইদুর রহমান নিজেই।

এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করলেও রহস্যজনক কারণে তা বছরের পর বছর ঝুলে রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, সাইদুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের সম্পদের বিবরণী জমা পড়ার পরও তিন বছরেও যাচাই শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী মহল এবং কিছু অসাধু দুদক কর্মকর্তার সহায়তায় মামলা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

শুধু তাই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি নেওয়ার অভিযোগও সামনে এসেছে। জানা গেছে, এলজিইডি থেকে চাকরি বরখাস্ত হওয়ার তথ্য গোপন করে ২০০৩ সালে বিআইডব্লিউটিএতে যোগ দেন তিনি। অথচ সেই অভিযোগ তদন্তের বদলে বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখা হয়েছে তাঁকে।

বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, “ড্রেজিং বিভাগ এখন সাইদুর রহমানের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে। এখানে নিয়ম নয়, চলে সিন্ডিকেটের নির্দেশ।” তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই পদে থেকে সরকারি চাকরি বিধিমালারও চরম লঙ্ঘন করেছেন তিনি।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত দুর্নীতিবিরোধী ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির সময়েও তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও তিনি বহাল থেকে আগের মতোই প্রভাব খাটিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সচেতন মহল বলছে, বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগের দুর্নীতি এখন শুধু একটি দপ্তরের সমস্যা নয়; এটি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। কোটি কোটি টাকার প্রকল্প লুটপাটের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

এদিকে, এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইদুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।




সাড়ে ১৬ কোটি টাকার ৪ তলা ভবন নিয়ে তোলপাড়, বান্দরবানে হর্টিকালচার সেন্টারে অনিয়মের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বান্দরবানের বালাঘাটা এলাকায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে নির্মাণাধীন একটি ৪ তলা “ল্যাবরেটরি কাম অফিস” ভবনকে ঘিরে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রায় ১৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকার এই প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কাজের তদারকিতে গাফিলতি এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, যে ধরনের ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, সেই তুলনায় ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখানো হয়েছে। ফলে পুরো প্রকল্প নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগসাজশের কারণেই কাজের মান ঠিকভাবে যাচাই করা হচ্ছে না। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বেশিরভাগ সময় প্রকল্প এলাকায় দেখা যায় না। বরং ঢাকায় বসে মোবাইল ফোনের ভিডিও কলের মাধ্যমে নির্মাণকাজ তদারকি করা হচ্ছে। এতে করে বাস্তবে কী ধরনের সামগ্রী ব্যবহার হচ্ছে বা কাজের গুণগত মান কেমন, সেটি সঠিকভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ থাকছে না।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনের বিভিন্ন অংশে এখন টাইলস, বিদ্যুৎ সংযোগ, স্যানিটেশন, ইন্টারনেট লাইন ও পাইপ ফিল্টারের কাজ চলছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ক্ষেত্রেও কমদামি ও নিম্নমানের মালামাল ব্যবহার করা হচ্ছে। ভবনের ফ্লোর ভরাটে বালির পরিবর্তে পাহাড়ি মাটি ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি নিম্নমানের ইট, খোয়া, বালি ও পাথর দিয়েই কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দা।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ভবনের রড ব্যবহারের বিষয়ে। স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, ওয়ার্ক অর্ডারে পিলারে ১৫ এমএম রড ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় ৪ বা ৫ সুতা রড ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ভবনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়া সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত সময় ধরে লোড টেস্ট করার কথাও ঠিকভাবে মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিকদের অনেকে জানিয়েছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যেসব সামগ্রী দিয়েছে, সেগুলো দিয়েই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

স্থানীয় অভিজ্ঞ ঠিকাদারদের অনেকে বলছেন, আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ৪ তলা একটি ভবন নির্মাণে সাধারণত ৭ থেকে ৮ কোটি টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা নয়। সেখানে এই প্রকল্পে সাড়ে ১৬ কোটির বেশি টাকা ব্যয় দেখানোয় তারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের ধারণা, অতিরিক্ত বাজেট দেখিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। তারা মনে করছেন, সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, পরিদর্শনে আসা কর্মকর্তাদের থাকা-খাওয়া ও যাতায়াতের খরচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বহন করে থাকে। এমনকি কাজের মান ভালো হয়েছে বলে রিপোর্ট দেওয়ার জন্যও প্রভাব খাটানো হয় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে প্রকল্পে প্রকৃত মান নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নির্মাণকাজ চলাকালে প্রকল্প এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো প্রকৌশলীকে পাওয়া যায়নি বলেও জানা গেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিজস্ব প্রকৌশল বিভাগ না থাকায় একটি বেসরকারি কনস্ট্রাকশন ফার্মের মাধ্যমে পুরো কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইরের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি বেশিরভাগ সময় ঢাকায় অবস্থান করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকলেও প্রকল্প এলাকায় নিয়মিত যান না। ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যত স্বাধীনভাবে কাজ পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার কারণেই তিনি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন।

ভবন নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তালহা জুবাইর সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে অফিসে এসে কথা বলার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর এই প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয় এবং ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু বান্দরবান নয়, দেশের আরও কয়েকটি জেলাতেও একই ধরনের প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে এখন বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।




নৌ-প্রশিক্ষণ খাতে কোটি টাকার সিন্ডিকেটের অভিযোগ, কেন্দ্রবিন্দুতে প্রিন্সিপাল অফিসার সাব্বির মাহমুদ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ নৌ-প্রশিক্ষণ খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নতুন করে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের মূল নেতৃত্বে রয়েছেন নৌ বাণিজ্য দপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ, যিনি বিভিন্ন মহলে “সাব্বির মাদানি” নামেও পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি পদ-পদবি ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত একাধিক প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম, টেন্ডার কারসাজি এবং আর্থিক দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই চক্রের কারণে দেশের নৌ-প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেরিন একাডেমিতে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় থেকেই সাব্বির মাহমুদ আবাসন ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তবে ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসানের কারণে তিনি কয়েক কোটি টাকার দেনায় পড়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে নৌ বাণিজ্য দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়ার পরই তার আর্থিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। অভিযোগ উঠেছে, সিমুলেটর কেনাকাটা ও প্রশিক্ষণ প্রকল্প নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন।

সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় সরাসরি ব্যবসা পরিচালনায় আইনগত বাধা থাকায় তিনি নিজের শ্যালক কাজী হাবিবুল হোসেনকে সামনে এনে “ইরেকটর্স” নামের একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পেশায় আগে সাধারণ ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের কাজ করলেও হঠাৎ করেই কাজী হাবিব বড় ঠিকাদার ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির আড়ালের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ ছিল সাব্বির মাহমুদের হাতেই। টেন্ডারের কাগজপত্র তৈরি, ব্যাংকিং কার্যক্রম দেখা এবং বিভিন্ন নথিতে “পরামর্শক” পরিচয়ে স্বাক্ষর করার কাজও তিনি নিজেই করতেন বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর।

সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে নারায়ণগঞ্জের ডিইপিটিসি (ডেক ইঞ্জিন পার্সোনেল ট্রেনিং সেন্টার) প্রকল্প নিয়ে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের বিআরডব্লিউটিপি-জি৩সি টেন্ডারে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সরকারি প্রকল্পের কারিগরি স্পেসিফিকেশন তৈরি করার দায়িত্ব সরকারি কর্তৃপক্ষের। কিন্তু এখানে টেন্ডারে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠান “এআরআই-ইরেকটর্স” নিজেরাই সেই স্পেসিফিকেশন তৈরি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে এমনভাবে শর্ত সাজানো হয়, যাতে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ও যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েও কার্যত বাদ পড়ে যায়।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আইয়ুব আলীর সহযোগিতায় সাব্বির মাহমুদ এবং তার ভারতীয় সহযোগী অমিত ভট্টাচার্য পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন। এমনকি নরওয়ের বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান “কনসবার্গ” টেন্ডার নিয়ে আপত্তি তুললেও তা গুরুত্ব পায়নি। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পাঠানো বিভিন্ন ই-মেইলের উত্তরও সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সাব্বির মাহমুদ নিজেই তৈরি করতেন, যা ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির আরও ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, শুরুতে কোনো সিল বা স্বাক্ষর ছাড়া দরপত্র জমা দেওয়া হলেও রহস্যজনকভাবে তা বাতিল করা হয়নি। পরে মূল্যায়নের আগ মুহূর্তে শতাধিক পৃষ্ঠায় গোপনে স্বাক্ষর সংযুক্ত করা হয়। কিছু নথিতে জাল স্বাক্ষর ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। একই প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করার বিষয়টিও সামনে এসেছে, যা পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, মেরিন একাডেমি ও এনএমআই-এর আরও কয়েকটি প্রকল্পেও একই ধরনের সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক নৌমন্ত্রী শাহজাহান খানের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেই দীর্ঘদিন এই চক্র নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। ফলে অনেক কর্মকর্তা অনিয়ম জানলেও প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস পাননি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত কোনো প্রকল্পে এমন অনিয়ম প্রমাণিত হলে পুরো প্রকল্প “মিস-প্রকিউরমেন্ট” হিসেবে ঘোষণা হতে পারে। এতে শুধু প্রকল্প বাতিল হওয়ার ঝুঁকিই নয়, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভবিষ্যতে বিদেশি সহায়তা, উন্নয়ন প্রকল্প এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি নিম্নমানের বা অনিয়মের মাধ্যমে কেনা সিমুলেটর ব্যবহারের কারণে দেশের নৌ-প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে সাব্বির মাহমুদ দাবি করেন, তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং এসব অভিযোগের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তিনি “ইরেকটর্স” ও বিআইডব্লিউটিএ’র সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তবে পরবর্তীতে আর বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।




দুধ-মাংস উৎপাদন প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম: পছন্দের লোক নিয়োগে কোটি টাকার সিন্ডিকেটের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সরকারের প্রাণিসম্পদ খাতের একটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে নতুন করে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দুধ ও মাংস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া এই প্রকল্পে জনবল নিয়োগের আড়ালে কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ মো. শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোক নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল পরিকল্পিত এবং অর্থ লেনদেননির্ভর।

জানা গেছে, প্রকল্পটিতে সাতটি ভিন্ন পদে মোট ১৩১ জনকে নিয়োগ দেওয়ার কথা ছিল। এই নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘ধলেশ্বরী সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্লিনিং সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে। কিন্তু নিয়োগ শুরুর পর থেকেই ঘুষ, তদবির এবং পছন্দের লোক নিয়োগ নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরি পেতে প্রার্থীদের কাছ থেকে পদ অনুযায়ী ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। গড়ে হিসাব করলে প্রায় ৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকারও বেশি লেনদেন হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ভাষ্য, এই টাকার একটি অংশ সরাসরি প্রকল্প পরিচালকের কাছে পৌঁছেছে। যদিও মো. শফিকুর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, নিয়োগ কার্যক্রম পুরোপুরি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে এবং এতে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে প্রশ্ন উঠেছে, যদি নিয়োগের দায়িত্ব শুধু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে, তাহলে প্রকল্প পরিচালকের ঘনিষ্ঠ ও পছন্দের অন্তত ১৩ জন কীভাবে কোনো প্রতিযোগিতা ছাড়াই চাকরি পেলেন?

অভিযোগ রয়েছে, যোগ্য অনেক প্রার্থীকে বাদ দিয়ে বিশেষ একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিজেদের লোকজনকে চাকরি দেওয়া হয়েছে। এতে প্রকৃত মেধাবীরা বঞ্চিত হয়েছেন। নিয়োগে স্বচ্ছতা না থাকায় পুরো বিষয়টি নিয়ে এখন ক্ষোভ বাড়ছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুর রহমানের স্বাক্ষরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ‘নোটিশ অব অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই নিয়োগকে কেন্দ্র করে শুরু হয় ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ ও আর্থিক লেনদেন। অভিযোগ আছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশ ছাড়া অনেকেই চাকরির সুযোগ পাননি।

এদিকে দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠান ‘ধলেশ্বরী সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্লিনিং সার্ভিস প্রাইভেট লিমিটেড’-এর অফিস রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় ছোট পরিসরে পরিচালিত হলেও তাদের বিরুদ্ধে এত বড় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আতিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। তার নীরবতা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও বলছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এর আগেও অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ছিল। রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অধিদপ্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও দাবি করা হচ্ছে। এমনকি কেউ অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো ও চাপ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই নিয়োগ বাণিজ্যের তথ্য প্রকাশ না করতে সাংবাদিকদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং দুর্নীতির তথ্য প্রকাশের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সুশাসন নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে যদি এভাবে দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার চলতে থাকে, তাহলে প্রকল্পের আসল উদ্দেশ্যই নষ্ট হয়ে যাবে। তারা পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।




মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ ছেঁটে গণপূর্তের নতুন স্পেসিফিকেশন, ফের সীমিত হচ্ছে লিফট টেন্ডারের প্রতিযোগিতা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ দীর্ঘদিন ধরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের লিফট ক্রয় ও সরবরাহকে ঘিরে সীমিত প্রতিযোগিতা, অতিমূল্য নির্ধারণ এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছিল সংশ্লিষ্ট মহলে। সরকারি ভবনে ব্যবহৃত লিফট কেনাকাটায় বারবার একই ধরনের কোম্পানির আধিপত্য এবং কঠোর শর্তে দরপত্র সীমাবদ্ধ করার অভিযোগ এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আমলে নিতে বাধ্য হয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার—দরপত্রে অধিকসংখ্যক যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া, অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক শর্ত শিথিল করা এবং বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ঠিক উল্টো। মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কমিটির সুপারিশ পাশ কাটিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর নিজস্বভাবে স্পেসিফিকেশন পরিবর্তন করে এমন কিছু শর্ত আরোপ করেছে, যা আবারও সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মন্ত্রণালয়ের কমিটি বনাম গণপূর্তের ‘কাটাছেঁড়া’ : নথিপত্রে দেখা গেছে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগ)-কে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। কমিটিতে ছিলেন বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক পদমর্যাদার প্রতিনিধি, গণপূর্তের ই/এম সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ই/এম কাঠের কারখানা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং ই/এম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী। কমিটি বাজার বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং বিদ্যমান ই/এম দর তপশিল পর্যালোচনা করে দেখতে পায়—গণপূর্তের বিদ্যমান শর্ত এতটাই কঠিন ও বাছাইকৃত যে অধিকাংশ কোম্পানি দরপত্রে অংশ নিতে পারে না। এর ফলে সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠান উচ্চমূল্যে দরপত্র দাখিল করছে এবং প্রতিযোগিতা কার্যত অনুপস্থিত হয়ে পড়েছে। কমিটির পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, কাস্টমস ডিউটি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি কঠোর স্পেসিফিকেশনই লিফটের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

‘৬৫ বছরের অভিজ্ঞতা’—কার স্বার্থে ?

গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিদ্যমান তপশিলে ‘এ’ টাইপ লিফটের জন্য ৬৫ বছরের উৎপাদন অভিজ্ঞতা এবং ১০ মিটার/সেকেন্ড গতির উৎপাদন সক্ষমতার শর্ত ছিল। এই ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছিল কো-নে, মিৎসুবিশি, ওটিআইএস, শিন্ডলার, টিকেই, ফুজিটেক ও হিটাচির মতো কয়েকটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডকে।

কিন্তু কমিটি দেখতে পায়, বাংলাদেশের বাজারে প্রচলিত অধিকাংশ আন্তর্জাতিক কোম্পানিরই ৬৫ বছরের অভিজ্ঞতা নেই। ফলে এই শর্ত বাস্তবে প্রতিযোগিতা সীমিত করছে। আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো—গণপূর্তের নিজস্ব তপশিলেই ৪ মিটার/সেকেন্ডের বেশি গতির লিফটের বিস্তারিত কারিগরি বিবরণ নেই, অথচ ১০ মিটার/সেকেন্ড সক্ষমতার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনবিসি-২০২০ অনুযায়ী ভবনে লিফটের সর্বোচ্চ গতি ৫ মিটার/সেকেন্ড উল্লেখ রয়েছে।

এসব বিবেচনায় কমিটি সুপারিশ করে, ৬৫ বছরের পরিবর্তে ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা, ১০ মিটার/সেকেন্ড শর্ত শিথিল, ভবনের উচ্চতা অনুযায়ী আলাদা লিফট ক্যাটাগরি নির্ধারণ।

ভবনের উচ্চতা অনুযায়ী নতুন কাঠামো : কমিটি ‘এ১’, ‘এ২’, ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’ টাইপে নতুনভাবে শ্রেণিবিন্যাসের সুপারিশ করে।
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী:

৫–২০ মিটার ভবন: বাংলাদেশে তৈরি বা সংযোজিত লিফট গ্রহণযোগ্য, ২০–৩০ মিটার ভবন: যে কোনো দেশের উৎপাদিত লিফট ৩০–১০০ মিটার ভবন: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের লিফট।

১০০ মিটারের বেশি ভবন: উচ্চগতির আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন লিফট। কমিটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে—কারিগরি শর্ত এমন হওয়া যাবে না, যাতে প্রতিযোগিতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ে গেল ভিন্ন প্রস্তাব : অভিযোগ উঠেছে, মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ গণপূর্ত অধিদপ্তর “কাটাছেঁড়া” করে নিজেদের মতো করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। আর সেখানেই শুরু হয় বিতর্ক। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত নথিতে দেখা যায়:

দেশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, অতিরিক্ত প্রযুক্তিগত শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, নির্দিষ্ট সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, টেস্টিং টাওয়ার, আরঅ্যান্ডডি সেন্টার, নিজস্ব কন্ট্রোলার-পিসিবি উৎপাদনের মতো শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।

বিশেষ করে ‘বি১’ টাইপ লিফটের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে:

প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব টেস্টিং টাওয়ার থাকতে হবে, নিজস্ব আরঅ্যান্ডডি ইউনিট থাকতে হবে, নিজস্ব কারখানায় কন্ট্রোলার, ইনভার্টার, মাদারবোর্ড, পিসিবি উৎপাদন করতে হবে, আন্তর্জাতিক সংস্থার নির্দিষ্ট সার্টিফিকেট থাকতে হবে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই ধরনের শর্ত বাস্তবে বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই পূরণ করা সম্ভব।

“সিন্ডিকেট ভাঙতে গিয়ে সিন্ডিকেটই আরও শক্তিশালী ?”

গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, বহু বছর ধরে লিফট সরবরাহে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্তের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও নির্দিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘদিনের যোগসাজশ রয়েছে।

এর আগে ওয়ালটন কোম্পানির অর্থায়নে গণপূর্তের চারজন নির্বাহী প্রকৌশলী এবং একজন প্রকৌশলীর স্ত্রীসহ বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগও উঠেছিল। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সে সময় তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারের প্রত্যক্ষ মদদের অভিযোগও ওঠে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন স্পেসিফিকেশনেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাজারে দেশীয়ভাবে লিফট উৎপাদন ও সংযোজনকারী বহু প্রতিষ্ঠান থাকলেও এমন শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা পূরণ করতে পারবে কেবল দু-একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বা তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিরা। ফলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কার্যত প্রতিযোগিতা থেকেই ছিটকে পড়ছেন।

“উচ্চতা অনুযায়ী স্পেসিফিকেশন মানা হয়নি” :

কমিটির অন্যতম সদস্য এবং বুয়েটের অধ্যাপক ড. শরীফ মোহাম্মদ মমিনুজ্জামান বলেন,
“বিভিন্ন দেশ থেকে যেসব পণ্য আনা হয় তার কোয়ালিটি নিশ্চিত করতে হবে। একই ধরনের পণ্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই জায়গাতেই হয়। তাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা জরুরি। উচ্চতা অনুযায়ী স্পেসিফিকেশন হওয়া উচিত।”

তবে সুপারিশ পরিবর্তন করে নতুন স্পেসিফিকেশন তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন,
“মন্ত্রণালয় থেকে কোনো বিষয়ে কাগজ এলে তাতে যা উল্লেখ থাকে, তার বাইরে কিছু করা হয় না। কিছু বিষয় কৌশল হিসেবে নেওয়া হয়।”

প্রশ্নের মুখে স্বচ্ছতা :

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ক্রয়ে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা জরুরি হলেও এমন শর্ত আরোপ করা উচিত নয়, যা প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করে। কারণ প্রতিযোগিতা কমে গেলে দরপত্রের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, নতুন উদ্যোক্তারা বাজার থেকে ছিটকে পড়ে, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি।

এখন বড় প্রশ্ন হলো— গণপূর্ত অধিদপ্তরের লিফট ক্রয়ের নতুন তপশিল কি সত্যিই “গুণগত মান নিশ্চিতের কৌশল”, নাকি এটি আবারও পুরনো সিন্ডিকেটকে রক্ষা করার নতুন ছক?




সম্পদের পাহাড়, টেন্ডার সিন্ডিকেট ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগে আলোচনায় গণপূর্তের মোহাম্মদ বদরুল আলম খান

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তর, যা দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বে রয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানটিকেই ঘিরে এখন নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে, যা নিয়ে দপ্তরের ভেতরে-বাইরে আলোচনা বাড়ছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়ের করা একটি অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বদরুল আলম খান তার সরকারি আয়ের তুলনায় অনেক বেশি সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট, গ্রামের বাড়িতে বাংলো ও খামার, এমনকি ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ রয়েছে তার বা তার পরিবারের নামে। তবে এসব সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। যদিও এসব অভিযোগ এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

দপ্তরের কিছু সূত্রের দাবি, তার নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভোলা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ঢাকার কিছু ঠিকাদার একসঙ্গে কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও অনেকে মনে করছেন। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদার বারবার কাজ পাচ্ছেন।

আরও বলা হচ্ছে, বিভিন্ন প্রকল্পে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে ফোনের মাধ্যমে চাপ দেওয়া হয়। মিরপুর ও ভাষানটেকের মতো এলাকায় চলমান কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে এমন অভিযোগ ঘুরছে দপ্তরের ভেতরে। যদিও এসব বিষয় নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল এখনো প্রকাশ হয়নি।

রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও কথা উঠেছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালেও বদরুল আলম খানের অবস্থান অপরিবর্তিত থেকেছে। তবে এই দাবিরও কোনো নিশ্চিত প্রমাণ সামনে আসেনি।

এছাড়া আত্মীয়-স্বজনের নামে ডেভেলপার ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে, যা প্রমাণিত হলে স্বার্থের সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে জনপ্রতি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের কথা বলা হচ্ছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে টাকা ফেরত দেওয়ার কথাও শোনা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

আরও কিছু গুরুতর অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাধ্যমে প্রভাব খাটানো এবং টেন্ডার সংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের মতো বিষয়। তবে এসব অভিযোগেরও এখনো কোনো নিরপেক্ষ যাচাই হয়নি।

অন্যদিকে, মোহাম্মদ বদরুল আলম খান সব অভিযোগই সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি সততার সঙ্গে কাজ করছেন এবং একটি মহল ইচ্ছাকৃতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, গণপূর্ত অধিদপ্তর কি এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারবে, নাকি এই বিতর্ক আরও দীর্ঘায়িত হবে—এটাই এখন দেখার বিষয়।




ফেসবুক পোস্ট থেকে পদোন্নতি—বিসিকে প্রভাবশালী কর্মকর্তা রাশেদুর রহমানকে নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন

এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব, বিতর্কিত পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক (মূল পদবী উপ-মহাব্যবস্থাপক) মোঃ রাশেদুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হিসেবে রাজনৈতিক পরিচয়কে পুঁজি করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিসিকে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করেছেন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে রাশেদুর রহমান দাবি করেছেন, বর্তমানে তিনি সরকারি চাকরিতে আছেন এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১১ সালের ৯ অক্টোবর নিয়োগাদেশ পেলেও ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর বিসিকে যোগদান করেন রাশেদুর রহমান। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি ধীরে ধীরে প্রশাসনিক ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি বিশেষভাবে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন মহলের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও নিয়মিতভাবে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পোস্ট দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিসিকের একাধিক সূত্রের দাবি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন বিভাগে দায়িত্ব পাওয়ার পর রাশেদুর রহমান হয়ে ওঠেন অন্যতম ক্ষমতাধর কর্মকর্তা। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর টেন্ডার কার্যক্রমে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেন অনেক ঠিকাদার ও অভ্যন্তরীণ সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তার পছন্দের বাইরে থাকা কোনো ঠিকাদার যাতে কাজ না পায়, সেজন্য নানামুখী কৌশল প্রয়োগ করা হতো। এর মাধ্যমে গড়ে ওঠে একটি প্রভাবশালী টেন্ডার সিন্ডিকেট, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন রাশেদুর রহমান।

এদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের কঠোর সমালোচনা করে পোস্ট দেন। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে বিভিন্ন অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ায় তাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে প্রকাশিত সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের কপি এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত সংযুক্ত করে বিসিক কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগও জমা পড়ে। তবে অভিযোগ উঠেছে, নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের কথা থাকলেও তিনি প্রশাসনিক প্রভাব ও অর্থের জোরে দায় এড়িয়ে যান।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় দৈনিকগুলোতে তাকে নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিসিক কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু তদন্তের অগ্রগতি কিংবা ফলাফল সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্ত চলমান থাকা অবস্থাতেই রাশেদুর রহমানকে সহকারী মহাব্যবস্থাপক থেকে উপ-মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর বিসিকের মহাব্যবস্থাপকের শূন্য পদের বিপরীতে তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্বও দেওয়া হয়, যা নিয়ে বিস্ময় ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং অবৈধ আর্থিক সুবিধার একটি অংশ রাজনৈতিক বলয়ে ব্যয় করা হয়। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে বিসিকের ভেতরে-বাইরে এ নিয়ে আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মোঃ রাশেদুর রহমান বলেন, তিনি বর্তমানে একজন সরকারি কর্মকর্তা, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে স্বীকার করেন তিনি।

বিসিকের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক প্রভাব, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং অভিযোগের পরও পদোন্নতির মতো ঘটনা যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়—পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয় কি না।




পরীক্ষাকেন্দ্রে চরম অবহেলা: দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি রামপুরার প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান

বিশেষ প্রতিবেদকঃ যেখানে দায়িত্ববোধ, সততা আর শৃঙ্খলার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ছিল, সেখানে নেমে এলো চরম অবহেলার অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারেই যেন নিভে গেল এক প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বের প্রদীপ। ঢাকার রামপুরার একরামুন্নেছা বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্রসচিব মোঃ মিজানুর রহমান-কে চলমান পরীক্ষার সব কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা। বুধবার (২২ এপ্রিল), বোর্ড চেয়ারম্যান ড. খোন্দকার এহসানুল কবির-এর স্বাক্ষরিত জরুরি বিজ্ঞপ্তি যেন বজ্রপাতের মতো নেমে আসে। অভিযোগ—দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা!

কেন্দ্রের ভেতরের চিত্র: দায়িত্বের জায়গায় শৈথিল্য : ঢাকা-৪৪ কেন্দ্র (কোড-৪৭১)—যেখানে শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হয় পরীক্ষার খাতায়, সেই কেন্দ্রের নেতৃত্বেই ছিলেন মিজানুর রহমান। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন—নিয়মের জায়গায় অনিয়ম, শৃঙ্খলার জায়গায় শৈথিল্য। বোর্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, তার দায়িত্বহীনতার প্রমাণ এতটাই স্পষ্ট ছিল যে, তাকে তাৎক্ষণিকভাবে অপসারণ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।

অব্যাহতির পরও শেষ নয়—আসছে কঠোর ব্যবস্থা : এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি পদচ্যুতি নয়—বরং বড় ধরনের প্রশাসনিক ঝড়ের ইঙ্গিত। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি পাঠানো হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর-এর মহাপরিচালকের কাছে।

ঢাকা জেলা প্রশাসকের পাঠানো একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগের স্তূপ: দীর্ঘদিনের জমে থাকা বিস্ফোরণ : এই ঘটনা হঠাৎ নয়—বরং বহুদিনের জমে থাকা অভিযোগের বিস্ফোরণ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো রীতিমতো চাঞ্চল্যকর ! অতিরিক্ত টিউশন ফি আদায়, স্কুলের কক্ষ ভাড়া দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি নিয়ে ফরম পূরণ।

যোগ্য শিক্ষককে বাদ দিয়ে নিজে বিদেশ সফরে যাওয়া :
আইসিটি ক্লাস না নিয়েও প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণ

অব্যাহতির খবর প্রকাশের পর এসব অভিযোগ আবার নতুন করে সামনে এসেছে, যা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

নেটিজেনদের বিস্ফোরক প্রশ্ন :
সামাজিক মাধ্যমে চলছে তীব্র সমালোচনা। প্রশ্ন উঠছে একের পর এক—যিনি ক্লাসই নেন না, তিনি বিদেশে প্রশিক্ষণে গেলেন কীভাবে ? যোগ্যদের বঞ্চিত করে এই সুবিধা কেন নিজের জন্য ? এই প্রশ্নগুলো শুধু অভিযোগ নয়—বরং এক প্রজন্মের ক্ষোভ ও হতাশার প্রতিফলন।

পুরনো বিতর্কের ছায়া: গাজীপুর থেকেও অভিযোগ : মিজানুর রহমানের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ইতিহাস আরও পুরনো। গাজীপুরে তার পূর্ববর্তী কর্মস্থলেও স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। এমনকি অপসারণের দাবিতে মানববন্ধনও হয়েছিল। তারপরও অভিযোগ রয়েছে—অসাধু কমিটির সহায়তায় তিনি রামপুরার এই বিদ্যালয়ে নিয়োগ পান।

শেষ না শুরু ?
এই অব্যাহতি কি কেবল একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, নাকি বড় কোনো তদন্তের সূচনা—তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—শিক্ষাঙ্গনে দায়িত্বহীনতার এই ঘটনা এক কঠিন সতর্কবার্তা হয়ে রইল।

বিশ্বাসের জায়গায় ফাটল ধরলে পতন শুধু সময়ের ব্যাপার—আর সেই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ হয়ে উঠলেন এক প্রধান শিক্ষক।




রেজা-উন-নবী ও মাহফুজুর রহমান পদোন্নতি পেলেও দায়িত্বে নেই, শূন্য সিলেট-বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের পদ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সরকার সিলেট ও বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারকে গ্রেড-১ পদে পদোন্নতি দিয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করায় প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় রোববার (১৯ এপ্রিল) পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী এবং বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানকে গ্রেড-১ পদে উন্নীত করার পাশাপাশি তাদের বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ওএসডি হিসেবে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত জানায়। একই সঙ্গে দুই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে নতুন বিভাগীয় কমিশনার এখনো নিয়োগ না হওয়ায় প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।

প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রেড-১ পদোন্নতি সাধারণত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হলেও একই আদেশে ওএসডি করা হলে তা নানা বার্তা বহন করে। অনেক সময় নতুন পদায়নের আগে সাময়িকভাবে কর্মকর্তাদের ওএসডি করা হয়, আবার কখনো প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, নীতিগত সিদ্ধান্ত বা ভবিষ্যৎ রদবদলের অংশ হিসেবেও এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ফলে দুই বিভাগীয় কমিশনারকে একযোগে পদোন্নতির পর ওএসডি করায় বিষয়টি স্বাভাবিক প্রশাসনিক রদবদল নাকি বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের অংশ—তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

সিলেট ও বরিশাল—দুটি বিভাগই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। সিলেট দেশের প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত, অন্যদিকে বরিশাল দক্ষিণাঞ্চলের নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ এলাকার প্রশাসনিক কেন্দ্র। এমন দুই বিভাগের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে এখনো নতুন নিয়োগ না হওয়ায় মাঠ প্রশাসনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমন্বয় কার্যক্রমে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন দায়িত্বের বিষয়ে কিছু উল্লেখ না থাকলেও প্রশাসনের ভেতরে ধারণা করা হচ্ছে, খুব শিগগিরই এ দুটি বিভাগে নতুন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে পদোন্নতি পাওয়া দুই কর্মকর্তাকেও গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্বে আনা হতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছেই।

প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সাম্প্রতিক এ সিদ্ধান্ত শুধু দুই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত পদোন্নতি নয়, বরং উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিতও হতে পারে। এখন নজর সিলেট ও বরিশালে কে আসছেন নতুন বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে, আর খান মো. রেজা-উন-নবী ও মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের পরবর্তী গন্তব্য কোথায়।