দুদকের নোটিশ: স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সাবেক দুই কর্মকর্তার সম্পদ যাচাই শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সাবেক দুই ব্যক্তিগত কর্মকর্তা তুহিন ফারাবী ও মাহমুদুল হাসানের নামে থাকা সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ জারি করেছে। সম্প্রতি পাঠানো এ নোটিশের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

দুদক সূত্র জানায়, দায়িত্ব পালনকালে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন, প্রভাব খাটানো ও অনিয়মের অভিযোগে প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে এ নোটিশ পাঠানো হয়। তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পদের উৎস ও বিস্তারিত বিবরণ দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, এর আগে তুহিন ফারাবী ও মাহমুদুল হাসানকে তলব করে দুদক জিজ্ঞাসাবাদ করে। সে সময় তাদের কাছ থেকে আয়-ব্যয়ের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। ওই তথ্য যাচাইয়ের পরই সম্পদের বিস্তারিত হিসাব চেয়ে নোটিশ পাঠানো হয়।

দুদক জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদের হিসাব না দিলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বাস্থ্য খাতে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের কয়েকটি অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

দুদক সূত্রের ভাষ্য, স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি বরাদ্দের অপব্যবহার, নিয়োগ বাণিজ্য ও সরবরাহ কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ওই অভিযোগের ভিত্তিতেই তুহিন ফারাবী ও মাহমুদুল হাসানের সম্পদ যাচাই শুরু হয়।

এর আগে গত ২১ মে দুদক তুহিন ফারাবী, ডা. মাহমুদুল হাসান ও এনসিপির বহিষ্কৃত যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাউদ্দীন তানভীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তাদের বিরুদ্ধে তদবির, চাঁদাবাজি ও টেন্ডার বাণিজ্যসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান শাখার কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ পরিচালনা করেন। সে সময় তাদের নামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায় এবং সম্পদের উৎস জানতে চাওয়া হয়।

তুহিন ফারাবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দপ্তরে কাজ করার সময় ক্ষমতার অপব্যবহার ও তদবির বাণিজ্যের মাধ্যমে নামে-বেনামে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে নিজের, স্ত্রী ও সন্তানদের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, আয়করের হালনাগাদ নথি এবং ব্যাংক হিসাবের বিবরণী জমা দিতে বলা হয়।

অন্যদিকে, ডা. মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তাকেও নিজের ও পরিবারের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, আয়কর নথি এবং ব্যাংক বিবরণীসহ হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

পরে গত ২৭ মে ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন গালিব তুহিন ফারাবী ও মাহমুদুল হাসানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্লকের নির্দেশ দেন।




শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ ও পণ্য চুরি: লোডারদের জালে কার্গো সিন্ডিকেট

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেশের প্রধান বিমানঘাঁটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন লাগেজ গায়েব ও পণ্য চোর সিন্ডিকেটের কবলে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে যাত্রীদের লাগেজ কিংবা রপ্তানি কার্গোর মূল্যবান পণ্য। বহু ফরওয়ার্ডিং কোম্পানি বারবার লিখিত অভিযোগ করেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা পাচ্ছে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসায়ীরা, আর ধীরে ধীরে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের আস্থাও হারাচ্ছে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে।

বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কার্গো ভিলেজে দামি ব্র্যান্ডের পণ্য চুরির পেছনে বেশ কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়। তারা আগে থেকেই জেনে নেয় কোন কোম্পানি কী ধরনের পণ্য রপ্তানি করছে। সেই তথ্য পেয়ে টার্গেট করে পরিকল্পিতভাবে চুরি করে নেয় পণ্য। সিসিটিভি ক্যামেরার সীমিত কভারেজ, নষ্ট ক্যামেরা আর মনিটরিংয়ের ঘাটতির সুযোগে এই চক্র নির্ভয়ে কাজ করছে।

অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা গেছে, চুরি করা মালামাল বেশিরভাগ সময় ওয়্যারহাউজের ময়লার স্তূপে লুকিয়ে রাখা হয়। পরে ময়লার গাড়িতে করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। আবার কেউ কেউ শৌচাগারে গিয়ে পোশাক বদলে পণ্য শরীরে লুকিয়ে বাইরে চলে আসে। কখনো স্ক্যানিংয়ের সময়, কখনো লোডিংয়ের সময়, আবার অনেক সময় ওয়্যারহাউজের বাইরে রেখেও চুরি হয় পণ্য।

চুরি শুধু কার্গো ভিলেজেই নয়—টার্মিনালের ক্যানোপি এলাকাতেও ঘটছে। স্বজনদের জন্য অপেক্ষার জায়গা থেকে অনেক সময় ব্যাগ বা পণ্য উধাও হয়ে যাচ্ছে। ৫ নভেম্বর এমনই এক ঘটনায় ইয়াংওয়ান করপোরেশনের শিপমেন্ট থেকে নয়টি পোশাক চুরি হয়। ফরওয়ার্ডার কোম্পানির উদ্যোগে বাফার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চোরাই পণ্য নিয়ে যাওয়ার সময় চোর সোজা প্রধান গেট দিয়ে বেরিয়ে গেছে।

পরবর্তীতে অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই ব্যক্তি বিমান নিরাপত্তা অফিসে খাদ্য সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করেন, তবে তিনি কোনো স্থায়ী কর্মচারী নন এবং কার্গো ভিলেজে প্রবেশের অনুমতিও ছিল না। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সেখানেই কাজ করছিলেন। বাফার সুপারভাইজারের সহযোগিতায় চুরি যাওয়া নয়টির মধ্যে ছয়টি পণ্য ফেরত আনা সম্ভব হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কার্গো ভিলেজের অনেক সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো বা ভাঙা অবস্থায় আছে। কিছু ক্যামেরা স্থির অবস্থায় ঘুরছে না, ফলে পুরো জায়গা কভার হচ্ছে না। এমনকি ছাদে ক্যামেরা না থাকায় কার্গোর স্তূপের আড়ালের দৃশ্য অদৃশ্যই থেকে যাচ্ছে। এই সুযোগে চোরচক্র নির্বিঘ্নে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, বাফা (Bangladesh Freight Forwarders Association)–এর কিছু সদস্য ছাড়াও বিমানের নিজস্ব লোডাররাও এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত। তাদের অনেকে চোরচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা। এমনকি বিমান কর্তৃপক্ষ, সিভিল এভিয়েশন ও সিকিউরিটি কর্মকর্তাদের কাছেও এসব তথ্য আছে, কিন্তু দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই।

টাওয়ার ফ্রেইট লজিস্টিক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ১৪ অক্টোবর, ৬ নভেম্বর এবং এর আগেও একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রপ্তানি কার্গো ভিলেজের মহাব্যবস্থাপকের কাছে। গত বছরের মার্চ মাসেও তারা একই ধরনের অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু এক বছর পেরিয়েও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে ব্যবসায়ীরা একদিকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারিয়ে রপ্তানি আদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ঘাঁটি বিমানবন্দর যদি চোরচক্রের কবলে চলে যায়, তাহলে এটি শুধু আর্থিক ক্ষতির কারণ নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশের ভাবমূর্তির জন্যও বড় হুমকি। তারা বলছেন, দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব রপ্তানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাবে আন্তর্জাতিক মহল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্গো বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার এ বি বি নোজমুল হুদা জানান, জনসংযোগ বিভাগে যোগাযোগ করতে। কিন্তু জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম ফোন রিসিভ করেননি। একইভাবে বাফার ইনচার্জ আবু বকর সিদ্দিক সাংবাদিক পরিচয় জানার পর ফোন কেটে দেন।

উল্লেখ্য, গত ১৮ অক্টোবর কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সিলগালা করা স্ট্রংরুমে রাখা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডারের তালা ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে ২৭ অক্টোবর জিডি করা হলেও ৪ নভেম্বর বিষয়টি প্রকাশ পায়। ধারণা করা হচ্ছে, সেখান থেকেও কিছু অস্ত্র চুরি গেছে। ওই ঘটনার পর ৫ নভেম্বর আবারও দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য জেনারুল ভস্মীভূত দ্রব্যের মধ্যে লুকানো ১৫টি বাটন ফোন চুরির চেষ্টা করলে পরদিন তাকে আটক করা হয়।




রেলওয়ের ওয়াশিং প্ল্যান্টসহ একাধিক প্রকল্পে দুর্নীতির আশঙ্কায় দুদকের বিশেষ অভিযান

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ রেলওয়ের ‘ট্রেন স্বয়ংক্রিয় ধৌতকরণ ব্যবস্থা (ওয়াশিংপ্ল্যান্ট)’ প্রকল্পের অধীনে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নয় শুধু তাই—ভাঙ্গা উপজেলার তালকান্দা খালের ওপর নির্মিত সেতু সংযোগ সড়ক, পাশাপাশি সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও অনিয়ম ও সেবার মানহ্রাসের আশঙ্কায় দুদক একটি সঙ্গবদ্ধ অভিযান পরিচালনা করেছে।

রেকর্ডভিত্তিক সম্ভাব্য অনিয়মের কারণ দেখিয়ে দুদক প্রধান কার্যালয় থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

রেলওয়ের প্রকল্পে ২০০টি মিটারগেজ কোচ ও ৫০টি ব্রডগেজ কোচসহ দুটি অটোমেটিক ওয়াশিং প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ওয়াশিং প্ল্যান্ট দুইটির যন্ত্রপাতি সচল থাকলেও সঠিক স্থানে বসানো হয়নি এবং প্রকল্পটির রূপায়ণে অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলেই দীর্ঘদিন এটি ব্যবহারবর্জিত অবস্থায় পড়ে আছে। এছাড়া ২০১৬ সালে সংশ্লিষ্টভাবে ১৫০টি মিটারগেজ কোচ কেনার প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে; এই খাতে রেকর্ডপত্র চেয়ে দেওয়া হয়েছে।

অভিযানের এক পর্যায়ে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ইউনিয়নের তালকান্দা খালের ওপর নির্মিত সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণ বিভাগের কর্মকাণ্ড প্রদর্শন করা হয়। সেখানে দেখা গেছে—নিচুমানের নির্মাণ সঙ্কুচিত হয়নি, মান নিয়ন্ত্রণে নানা দুর্নীতির আলামত পাওয়া গেছে। উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করে টিম বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

একইসঙ্গে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবা ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ব্যাপকভাবে তলানিতে রয়েছে—রুগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন, সেবার মান ও পরিবেশ আশানুরূপ নয়। রেজিস্টার, উপস্থিতি খাতা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিদর্শন করে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

দুদক জানিয়েছে, অভিযানে সংগৃহীত তথ্যাবলি পর্যালোচনা করে কমিশনের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।




চট্টগ্রাম বন্দরে বদলি হয়েও প্রভাবশালী ক্যাপ্টেন ফরিদের বিরুদ্ধে ফের দুর্নীতির অভিযোগ

চট্টগ্রাম প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকা উপ-সংরক্ষক ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে আবারও গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বদলি হয়েও এখনো চট্টগ্রাম বন্দরে প্রভাব খাটাচ্ছেন এবং নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছেন।

কয়েক মাস আগে দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তাকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বদলি করে পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে পাঠায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। বর্তমানে তিনি পায়রা বন্দরে পরিচালক (ট্রাফিক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে নতুন করে প্রায় ৪ কোটি টাকার বিল তোলার চেষ্টা এবং বন্দরে ফেরার জন্য তদবির করার অভিযোগে ফের আলোচনায় এসেছেন এই কর্মকর্তা।

চট্টগ্রাম বন্দরের নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, বন্দরের টাগবোট ‘এমটি কাণ্ডারি-৮’-এর মেরামত, পাইপিং, আন্ডারওয়াটার ওয়ার্ক ও পেইন্টিংসহ আনুষঙ্গিক কাজের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে ক্যাপ্টেন ফরিদ তার পছন্দের ঠিকাদার মাহি এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ দেন। মাত্র আট দিনের মধ্যে বিশাল কাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে তিনি বিল পরিশোধের সুপারিশও করেন।

২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি পরিদর্শন কমিটির পক্ষ থেকে রিপোর্ট দেন যে কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং মালামাল গ্রহণের সুপারিশ করেন। বাকি সদস্যরাও সেই প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান প্রশ্ন তোলেন—এত বড় কাজ কীভাবে মাত্র আট দিনে শেষ হলো? তদন্তে দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম হয়েছে এবং প্রক্রিয়া না মেনে বিল উত্তোলনের চেষ্টা চলছিল।

এর পরই বন্দর কর্তৃপক্ষ ২৭ এপ্রিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠিয়ে ক্যাপ্টেন ফরিদকে অন্যত্র বদলির সুপারিশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে নানান অনিয়মে জড়িত এবং চট্টগ্রাম বন্দরে তার উপস্থিতি প্রশাসনিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, বদলি হলেও তিনি বাইরের লোকজনের মাধ্যমে এখনো বন্দরের বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এমনকি তাকে সদস্য (অর্থ) পদে বসানোর জন্য নানা মহলে তদবিরও চালাচ্ছেন। এতে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

এই প্রথম নয়—ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। ২০১৩ সালে ইন্দোনেশিয়ান জাহাজ ‘এমভি গ্লেডিস’ ডুবে যাওয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি তাকে দায়ী করে। এছাড়া ২০১১ সালের ভিটিএমএস প্রকল্পে (Vessel Traffic Management System) নিয়ম ভেঙে ২ কোটি টাকার বেশি বিল আগাম পরিশোধের অভিযোগও প্রমাণিত হয়। সে সময় তাকে স্বেচ্ছাচারী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা হিসেবে আখ্যা দিয়ে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছিল।

সব অভিযোগ সত্ত্বেও তিনি এখনো বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন—এ বিষয়টি নিয়েই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম বন্দরের অনেক কর্মকর্তা।

বিষয়টি জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, “ক্যাপ্টেন ফরিদের বদলি ও পদোন্নতির বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। আমরা এখান থেকে কিছু করতে পারব না। টাগবোটের বিষয়েও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”

অন্যদিকে, ক্যাপ্টেন ফরিদ নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, “সব কাজ নিয়ম মেনেই হয়েছে। আমার একক সিদ্ধান্তে কিছু হয়নি। বন্দর কর্তৃপক্ষের ৯০ শতাংশ কাজই এমনভাবে হয়।”

কাজটি মাত্র ৮ দিনে শেষ করার প্রশ্নে তিনি বলেন, “এই কাজ আসলে আগেই শুরু হয়েছিল। তদন্ত কমিটি আমার বিরুদ্ধে কিছুই পায়নি।” তবে কেন তাকে বদলি করা হলো, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাকে কেন জড়ানো হচ্ছে জানি না। আমি আমার জবাব দিয়েছি। হয়তো কাউকে দোষী দেখাতে আমাকে টানা হয়েছে।”

তিনি আরও দাবি করেন, “আমি প্রমোশন চেয়েছি, এটা অপরাধ নয়। আমার আগের সাতজন একই পদ থেকে পদোন্নতি পেয়েছেন।”

তবে বন্দরে বাইরের প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তিনি স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন।

বন্দর সূত্র বলছে, ক্যাপ্টেন ফরিদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগগুলো এখন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনাধীন আছে। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, তার মতো বিতর্কিত কর্মকর্তাকে দীর্ঘদিন ধরে কোনো না কোনোভাবে রক্ষা করা হচ্ছে—যা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর বার্তা দিচ্ছে।




‘সুফল’ নয়, কেলেঙ্কারি: বন অধিদপ্তরের বিশাল প্রকল্পে দুর্নীতির জাল ফাঁস করল দুদক

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বনজ সম্পদ উন্নয়নের উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালে বন অধিদপ্তর শুরু করেছিল প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ‘টেকসই বন ও জীবিকা’ বা ‘সুফল’ প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল দেশের বিভিন্ন জেলায় বনভূমি বৃদ্ধি ও মানুষের জীবিকা উন্নয়ন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা গেছে, প্রকৃত কাজের তুলনায় কাগজে-কলমে তৈরি হয়েছে সাফল্যের গল্প।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্প্রতি এই প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে—ভুয়া বিল-ভাউচারে কোটি কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে, অনেক জায়গায় কেবল চারা লাগানোর নামেই টাকা গায়েব, আবার কিছু কর্মকর্তা বদলি ও পদায়নের মাধ্যমে কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন।

দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, অভিযান শেষে কমিশনের টিম একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেটি বিশ্লেষণ করে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জানা গেছে, প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ১ জুলাই শুরু হয়ে ২০২৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা বিট এলাকায় ৫১০ হেক্টর বনভূমিতে বনায়নের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু বাস্তবে বনায়ন হয়েছে মাত্র ১৬০ হেক্টরে। একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৩৬২ হেক্টরের মধ্যে অনিয়ম ধরা পড়েছে উল্লেখযোগ্য অংশে।

সরকারি নথিতে দেখানো হয়েছে যে, প্রকল্পের আওতায় দেশের ২৪টি জেলায় মোট ১ লাখ ৩ হাজার ৯৬০ হেক্টর এলাকায় বনায়ন হয়েছে। এর মধ্যে শুধু কক্সবাজারেই ২০ হাজার ১৩৬ হেক্টর এবং বাকি ৮৩ হাজার ৮২৪ হেক্টর বন বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ছড়ানো। উদাহরণস্বরূপ—ঢাকা বন বিভাগে ২,৮১০ হেক্টর, চট্টগ্রাম উত্তর বিভাগে ৯,২৭৩ হেক্টর, দক্ষিণে ৮,৬৭০ হেক্টর, চট্টগ্রাম শহরাঞ্চলে ৯,২১০ হেক্টর, ভোলায় ৮,৪২০ হেক্টর, পটুয়াখালীতে ৮,৩২০ হেক্টর, রাজশাহীর সামাজিক বন বিভাগে ১৭৭ হেক্টর, দিনাজপুরে ২,০৩০ হেক্টর, মৌলভীবাজারে ২৯০ হেক্টর, চট্টগ্রামে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ বিভাগে ২,৬২০ হেক্টর, কক্সবাজার উত্তরে ৮,৪৬৮ হেক্টর, দক্ষিণে ১১,৬৬৮ হেক্টর, ময়মনসিংহে ৪,৪৪৩ হেক্টর, টাঙ্গাইলে ২,৭১৩ হেক্টর, নোয়াখালীর উপকূলীয় বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৯,৯৯০ হেক্টর, সিলেটে ৪,৬৪৮ হেক্টর এবং ঢাকার বন্যপ্রাণী বিভাগে ২০৫ হেক্টর বনায়নের কথা বলা হয়েছে।

তবে মাঠপর্যায়ে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। শেরপুরের নকশী সীমান্ত ফাঁড়ির কাছাকাছি রংটিয়া রেঞ্জ এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, বনায়নের জায়গায় টিকে আছে মাত্র একটি চাপালিশ গাছ। অথচ সরকারি প্রতিবেদনে ওই জায়গায় বিশাল বাগান তৈরির কথা বলা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়—গাছগুলোতে বন্য হাতির আক্রমণের কোনো চিহ্ন নেই, বরং অক্ষতভাবে দণ্ডায়মান।

দুদকের সূত্র বলছে, এই প্রকল্পে কেবল অর্থ নয়, বদলি বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট গঠন করে কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে সুবিধা বণ্টন করেছেন। একাধিক জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বন অধিদপ্তরের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

দুদকের প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া এসব নথি যাচাই-বাছাইয়ের পর পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। বন সংরক্ষণ ও উন্নয়নের নামেই যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, তা এখন পরিণত হয়েছে দুর্নীতি ও অনিয়মের বনে।




তবিবুরের রাজত্ব: বিশ্বব্যাংকের অর্থে গরিবের প্রকল্পে লুটপাটের হিড়িক

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গরিবদের স্যানিটেশন ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নেওয়া প্রকল্পে চলছে দুর্নীতির মহোৎসব। পাঁচ বছরের এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে আর এক মাসও নেই, কিন্তু কাজের অগ্রগতি মাত্র ৪৭ শতাংশ। যা হয়েছে, তার বেশির ভাগই অনিয়ম আর নিম্নমানের কাজের জালে জড়ানো।

প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ এলাকায় পাবলিক টয়লেট, ল্যাট্রিন ও ছোট পানির স্কিম নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অধিকাংশ টয়লেট ও হাত ধোয়ার স্টেশন এখন ভাঙাচোরা, বন্ধ বা সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক জায়গায় নির্মাণকাজে প্রকৌশল স্পেসিফিকেশন মানা হয়নি। মাটির নিচে নির্ধারিত গভীরতায় পাইপ বসানো হয়নি, টাইলস নষ্ট, ফিটিংস চুরি হয়ে গেছে, আর পানিতে অস্বাভাবিক আয়রন—সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ।

সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এসব ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, পর্যবেক্ষণ করা ৪৭টি পানির স্কিমের মধ্যে মাত্র ৪টিতে নিয়ম মেনে কাজ হয়েছে। পাবলিক টয়লেটের ৮০ শতাংশ এখন ব্যবহারযোগ্য নয়। কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য নির্মিত ১৯টি টয়লেটের মধ্যে ১৭টিই বন্ধ বা ভাঙা।

এদিকে এই প্রকল্পের মূল নিয়ন্ত্রক—প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে উঠেছে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ। ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে তিনি প্রকল্পের বিল নিজের ইচ্ছেমতো পাশ করেছেন বলে জানা গেছে। এমনকি বিল পরিশোধের চেকেও একমাত্র তারই সই থাকত, ফলে মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীরা কার্যত কিছুই করতে পারতেন না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই প্রকল্পের অর্থ দিয়ে তবিবুর রহমান দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। সিরাজগঞ্জ শহরে মায়ের নামে ছয়তলা ভবন, ধানমন্ডিতে ৫ হাজার স্কয়ারফুটের বাণিজ্যিক ফ্লোর, আরও দুটি ফ্ল্যাট এবং ব্যাংককেও একটি ফ্ল্যাটের মালিক তিনি। একাধিক গাড়ি তো আছেই, পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত জীবনেও রয়েছে নানা বিতর্ক। অভিযোগ আছে, তিনি ছয়টি বিয়ে করেছেন এবং প্রতিটি স্ত্রীর জন্য আলাদা বাড়িও তৈরি করেছেন।

সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো—এই তবিবুর রহমানকেই আবার নতুন করে ১,৮৮৯ কোটি টাকার আরেকটি স্যানিটেশন প্রকল্পের পিডি করা হয়েছে, সেটিও বিশ্বব্যাংকের অর্থে। এতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনার ঝড়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. রেজাউল মাকসুদ জাহেদী বলেন, “আইএমইডির প্রতিবেদনটি আমার হাতে আসেনি, তবে বিষয়টি দেখে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি ফোনে কিছু বলব না, দেখা হলে কথা বলা যাবে।”

সূত্র বলছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই করছে, যদিও তবিবুর প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ আছে।

গরিবের টয়লেট ও পানি সরবরাহের নামে এমন লুটপাট কেবল সরকারি অর্থের অপচয়ই নয়, সাধারণ মানুষের প্রতি এক নির্মম তামাশাও বটে। উন্নয়নের নাম ভাঙিয়ে যারা এভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।




মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠিয়ে ৫২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ: ৬ রিক্রুটিং এজেন্সির ১১ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৬টি রিক্রুটিং এজেন্সির ১১ জন মালিক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, ৩১ হাজার ৩৩১ জন কর্মীর কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার পরিবর্তে গড়ে পাঁচ গুণ বেশি টাকা নেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে গত মঙ্গলবার কমিশনের বৈঠকে ছয়টি মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়।

প্রথম মামলায় আসামি করা হবে মেসার্স আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের মালিক রুহুল আমিনকে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ৭ হাজার ৪৩০ জন কর্মীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ১২৪ কোটি ৪৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা আদায় করেছে।

দ্বিতীয় মামলায় মেসার্স মেরিট ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণকে আসামি করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি ৩ হাজার ৪৮৯ জনের কাছ থেকে ৫৮ কোটি ৪৪ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকা বেশি নিয়েছে।

তৃতীয় মামলায় সাদিয়া ইন্টারন্যাশনালের শামীম আহমেদ চৌধুরী ওরফে নোমানকে আসামি করা হবে, যিনি ৩ হাজার ৩২১ জন কর্মীর কাছ থেকে ৫৫ কোটি ৬২ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা অতিরিক্ত নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

চতুর্থ মামলায় ইমপেরিয়াল রিসোর্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. ইকবাল হোসাইন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা ৮ হাজার ১০১ জনের কাছ থেকে ১৩৫ কোটি ৬৯ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

পঞ্চম মামলায় আরআরসি হিউম্যান রিসোর্স সার্ভিস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও এমডি মো. আলমগীর কবীরের বিরুদ্ধে ৫ হাজার ২০২ জনের কাছ থেকে ৮৭ কোটি ১৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া ষষ্ঠ মামলায় থানেক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সাবেক এমডি আব্দুল্লাহ শাহেদ, পরিচালক মো. জয়নাল আবেদীন নোমানী ও বর্তমান ব্যবস্থাপক শমসের আহমেদকে আসামি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ৩ হাজার ৭৮৮ জনের কাছ থেকে ৬৩ কোটি ৮৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা অতিরিক্ত নিয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে।

এর আগে গত ১১ মার্চ মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে ১ হাজার ১২৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৩২ জনের নামে এবং ১৪ সেপ্টেম্বর আরও ১ হাজার ১৫৯ কোটি টাকার আত্মসাতের ঘটনায় ১৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির শীর্ষ কর্মকর্তাদের নামে মামলা করে দুদক।

২০১৮ সালে অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের কারণে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করেছিল মালয়েশিয়া। পরে ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর দেশটি আবার শ্রমিক নেওয়ার চুক্তি করে। এরপর ২০২২ সালে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ শ্রমিক পাঠানোর খরচ নির্ধারণ করে ৭৮ হাজার ৫৪০ টাকা।




৮৫৭ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি মামলায় এক্সিম ব্যাংকের সাবেক এমডি ফিরোজ হোসেন গ্রেপ্তার

নিজস্ব ডেস্কঃ ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ৮৫৭ কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে এক্সিম ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফিরোজ হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে নিশ্চিত করেছে দুদকের জনসংযোগ শাখা।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, এক্সিম ব্যাংকের মোট ৮৫৭ কোটি ৯৩ লাখ ৭৩ হাজার ৭৫০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যান, এমডি এবং ২১ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান মিরাজ বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ‘মদিনা ডেটস অ্যান্ড নাটস’ নামে প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা মোজাম্মেল হোসাইন অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ঋণ নেন। ওই ঋণ অনুমোদনের সময় এক্সিম ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যোগসাজশে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। নিয়মবহির্ভূতভাবে অনুমোদিত ঋণ পরবর্তীতে খেলাপি হয়ে যায়, ফলে ব্যাংকটি ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে এবং সরকারের আর্থিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, আসামিরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে গ্রাহকের ব্যবসার বাস্তবতা যাচাই না করেই ঋণ অনুমোদন করেন এবং যৌথভাবে প্রায় ৮৫৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এই কাজ দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

মামলায় আসামি হিসেবে নাম রয়েছে— মদিনা ডেটস অ্যান্ড নাটসের মালিক মোজাম্মেল হোসাইন; এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তার স্ত্রী সাবেক পরিচালক নাসরিন ইসলাম; বর্তমান চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম স্বপন; সাবেক এমডি ফিরোজ হোসেন; সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা ব্যবস্থাপক আসাদ মালেক; ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. আরমান হোসেন; সাবেক এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট আনিছুল আলম; অ্যাডিশনাল ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ইব্রাহিম খান ও মঈনুল ইসলাম; ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মাকসুদা খানম; সাবেক এমডি জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া; সাবেক অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর আব্দুল বারী ও হুমায়ুন কবীরসহ আরও কয়েকজন প্রাক্তন পরিচালক ও কর্মকর্তার।

তদন্তে প্রমাণিত হলে এই ঋণ জালিয়াতি দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বৃহৎ দুর্নীতির ঘটনায় পরিণত হতে পারে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।




দুদকের আবেদনে জেমকন গ্রুপের সিইও কাজী আনিসের সম্পদ জব্দ ও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ জেমকন গ্রুপের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাজী আনিস আহমেদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দ এবং অবরুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁর বিদেশযাত্রায়ও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ সাব্বির ফয়েজের আদালত এ আদেশ দেন।

দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম জানান, দুদকের সহকারী পরিচালক আল-আমিন সম্পদ জব্দ, ব্যাংক ও বিনিয়োগ হিসাব অবরুদ্ধ এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন। আদালত শুনানি শেষে আবেদনটি মঞ্জুর করেন।

দুদকের নথি অনুসারে, কাজী আনিস আহমেদের নামে বিভিন্ন জেলায় মোট ৪৯ দশমিক ৪৩ একর জমি ও রাজধানীর গুলশান এলাকায় একটি প্লট রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ৭ কোটি ২০ লাখ ৭২ হাজার ৮৪৬ টাকা।

অন্যদিকে, অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা প্রায় ৮৪ কোটি ৮৯ লাখ ৮২ হাজার ৮২৫ টাকা এবং ২০টি ব্যাংক হিসেবে থাকা প্রায় ২২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।




এলজিইডিতে ফিরোজ আলমের দাপট: অনিয়মের পাহাড়ে ঘেরা প্রকৌশল অফিস

বিশেষ প্রতিনিধিঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ঘিরে আবারও উঠেছে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ আলম তালুকদার। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী উপসহকারী প্রকৌশলী শেখ রাজিবকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন।

সূত্র জানায়, ফিরোজ আলম তালুকদার ও রাজিব একসঙ্গে মিলে একপ্রকার ‘লুটের রাজত্ব’ গড়ে তুলেছিলেন। শেখ রাজিবের স্ত্রী পুলিশ সদস্য হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গণভবনে দায়িত্বে ছিলেন। তার প্রভাবের কারণে অফিসের অনেকেই রাজিবের মুখের কথাকেই “গণভবনের নির্দেশ” বলে ধরে নিত। এই সম্পর্কের সুযোগে ফিরোজ-রাজিব জুটি বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা আত্মসাত করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সাবেক আওয়ামী সরকারের পতনের পর তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। এলজিইডি ভবনের কর্মচারী ও ঠিকাদাররা ফিরোজ আলম তালুকদারকে লাঞ্ছিত করে অফিস থেকে বের করে দেয়। এমনকি তার জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাও ঘটে বলে জানা যায়। ওই সময়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। পরে তিনি গোপনে মাঝে মাঝে অফিসে যেতেন। বর্তমানে তাকে এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একাধিক প্রকল্পে অনিয়মের প্রমাণ। GDP-03 প্রকল্পের অধীনে ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার দেবীনগর আজর আলী মোল্লার বাড়ি থেকে হাশেম মাদবর-করিম মোল্লা সড়কের (দৈর্ঘ্য ৬৩০ মিটার) ঠিকাদার ছিলেন মেসার্স নুর এন্টারপ্রাইজের প্রোপাইটর গাজী হাফিজুর রহমান। প্রকল্পের চুক্তিমূল্য ৬৭,০০,০০০ টাকা হলেও কাজ না করেই অতিরিক্ত ৩৭ লাখ টাকা বিল তোলা হয়। এ ঘটনায় উপসহকারী প্রকৌশলী শেখ রাজিব ও নির্বাহী প্রকৌশলী ফিরোজ আলম তালুকদারের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

তাছাড়া, IRIDP-3 প্রকল্পের অধীনে দোহার উপজেলার রাধানগর কৃষ্ণদেবপুর স্যাটেলাইট স্কুল সড়কের কাজের দায়িত্বে ছিল বিসমিল্লাহ কনস্ট্রাকশন, যার প্রোপাইটর আবুল কালাম আজাদ। ১ কোটি ২২ লাখ টাকার এই কাজেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। নির্ধারিত সময়ের আগেই ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হলেও কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়, ফলে প্রকল্পটি ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে বাতিল করা হয়।

এ ছাড়া নবাবগঞ্জ উপজেলার বান্দুরা-বারুয়া খালি শিকারীপাড়া রোড উন্নয়ন প্রকল্পেও অনিয়মের প্রমাণ মেলে। এস এম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে প্রতিষ্ঠানের প্রোপাইটর সাইফুল ইসলামের নামে ৯২০,৭৮,৫৩,৩০০ টাকার কাজের চুক্তি হয়। কিন্তু কাজ শুরু না করেই ৩২ লাখ টাকা অগ্রিম বিল নেওয়া হয়। সময়মতো কাজ সম্পন্ন না করায় ৪ মে ২০২৫ তারিখে এই প্রকল্পও বাতিল করা হয়।

এলজিইডি সদর দপ্তরের কর্মীদের দাবি, বর্তমানে ফিরোজ আলম তালুকদার রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে নানা তদবির বাণিজ্যে লিপ্ত রয়েছেন এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।