আজিমপুর গণপূর্তে টেন্ডার নিয়ে অভিযোগের ঝড়, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের দাবি ঠিকাদারদের

এসএম বদরুল আলমঃ রাজধানীর আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগকে ঘিরে নতুন করে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের দাবি, এখানে এখন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই সিন্ডিকেটের মূল ব্যক্তি হিসেবে তারা নাম বলছেন বহিরাগত বদিউল আলম সুইটের। তিনি নিজেকে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী হিসেবে পরিচয় দেন এবং তার প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডার বাণিজ্যে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করে সুইট একটি প্রভাবশালী চক্র তৈরি করেছেন। এই চক্রের মাধ্যমে কোটি টাকার কাজ ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়, যেখানে স্বচ্ছতা বা সরকারি নিয়মকানুন মানা হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, কোনো ঠিকাদার কাজ পেতে চাইলে তাকে আগে থেকেই মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হয়। বিশেষ করে এলটিএম পদ্ধতিতে কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে প্রাক্কলিত মূল্যের প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম কমিশন দাবি করা হয়। এই টাকা না দিলে টেন্ডার বাতিল করে দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া টেন্ডার বণ্টনের ক্ষেত্রে ‘লটারি’ নামের একটি প্রক্রিয়া দেখানো হলেও বাস্তবে তা আগেই ঠিক করা থাকে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। সুইট ও তার সহযোগীরা নিজেদের পছন্দের কিছু ঠিকাদারের তালিকা তৈরি করেন এবং পরে সেই তালিকা অনুযায়ী কাজ ভাগ করে দেন। ফলে সাধারণ ঠিকাদাররা কোনোভাবেই ন্যায্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারছেন না।

অভিযোগ আরও গুরুতর হয়েছে যখন বলা হয়েছে, সুইটের অনুমতি ছাড়া কেউ টেন্ডার জমা দিতেই পারে না। তার ‘সবুজ সংকেত’ ছাড়া কোনো কাজের সুযোগ নেই। কেউ এই নিয়ম না মানলে তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়—কখনো কাজের সাইটে বাধা দেওয়া হয়, কখনো প্রশাসনিক জটিলতায় ফেলে দেওয়া হয়, আবার কখনো সরাসরি ভয়ভীতি দেখানো হয়।

একজন ভুক্তভোগী ঠিকাদার লিখিত অভিযোগে জানিয়েছেন, তার লাইসেন্স ব্যবহার করে সুইট ঠিকাদার সমিতির নেতা হয়েছেন এবং সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে তার কাছ থেকে জোর করে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত টাকা আদায় করেছেন। এই ধরনের চাঁদাবাজির ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

এদিকে কেউ যদি এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খোলার চেষ্টা করেন, তাহলে তাকে ‘ব্ল্যাকলিস্টে’ ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। অডিট, নিয়মভঙ্গ বা প্রশাসনিক ঝামেলার ভয় দেখিয়ে তাদের চুপ করিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে অনেকেই ভয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস পাচ্ছেন না।

একাধিক ঠিকাদারের মতে, বর্তমানে আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগে এক ধরনের দ্বৈত ক্ষমতা চলছে। অফিসের ভেতরে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও, বাইরে বদিউল আলম সুইটের প্রভাবই বেশি কার্যকর। এই দুইয়ের চাপে সাধারণ ঠিকাদাররা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছেন। তাদের কথায়, নিয়ম মেনে চললে কাজ পাওয়া যায় না, আর সিন্ডিকেটের বাইরে থাকলে টিকে থাকাই কঠিন।

এই পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ ঠিকাদাররা বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে জানিয়েছে এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি তুলেছেন। তারা চাইছেন, বদিউল আলম সুইটের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। ইতোমধ্যে অভিযোগের কপি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সচিবসহ বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

সব মিলিয়ে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু একটি অফিসের সমস্যা নয়—বরং পুরো সরকারি টেন্ডার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দেয়। এখন সবার নজর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দিকে—তারা এই অভিযোগগুলো কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখবে এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেয় কি না।




সাউন্ড কেলেঙ্কারি নয়, বহুমাত্রিক দুর্নীতি! টেন্ডার ‘ম্যানেজ’ করে একের পর এক কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে একই প্রতিষ্ঠান

এসএম বদরুল আলমঃ জাতীয় সংসদের ত্রয়োদশ অধিবেশনের প্রথম দিনেই ঘটে যাওয়া সাউন্ড সিস্টেম বিপর্যয় এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ‘যান্ত্রিক ত্রুটি’ নয়—এটি ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে একটি সুসংগঠিত, বহুমাত্রিক আর্থিক কেলেঙ্কারির অংশ হিসেবে।

এর সঙ্গে এবার যুক্ত হলো আরও বিস্ফোরক তথ্য—একই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান আমানত এন্টারপ্রাইজ এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে একই কৌশলে কাজ বাগিয়ে নিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ।

সংসদ কেলেঙ্কারি থেকে মুগদা হাসপাতাল—একই চক্র !

সংসদের সাউন্ড সিস্টেম বিপর্যয়ের পেছনে যে আমানত এন্টারপ্রাইজের নাম উঠে এসেছে, সেই একই প্রতিষ্ঠান মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পেও বিতর্কিতভাবে দুটি বড় কাজ দখল করে— ফায়ার ডিটেকশন ও প্রোটেকশন সিস্টেম — প্রায় ৮ কোটি টাকা, এয়ার কুলিং সিস্টেম — প্রায় ১৬ কোটি টাকা। মোট ২৪ কোটি টাকার এই দুই প্রকল্প ই/এম-৬ ডিভিশনের অধীনে দেওয়া হলেও অভিযোগ রয়েছে— টেন্ডার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ‘উচ্চ পর্যায়ের আঁতাতে’ কাজ বাগিয়ে নেয় আমানত এন্টারপ্রাইজ।

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ শুরুই হয়নি !

প্রশ্ন উঠছে— কাজ শুরু না করেই কেন টেন্ডার দেওয়া হলো ? কার স্বার্থে এই দীর্ঘসূত্রতা ? সরকারি অর্থ কি পরিকল্পিতভাবে আটকে রেখে অন্যত্র ব্যবহার করা হচ্ছে ?

“টেন্ডার ক্যাপাসিটি নেই, তবুও সব কাজ একাই !”

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য— ই/এম ডিভিশন-৪ এর অধীনে প্রায় ৩০ কোটি টাকার একটি ইলেকট্রিক্যাল কাজও একইভাবে ‘ম্যানেজ’ করে নেয় এই প্রতিষ্ঠান অথচ অভিযোগ— প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত টেন্ডার ক্যাপাসিটি নেই, তবুও এককভাবে বিভিন্ন ডিভিশনে কাজ পাচ্ছে, এতে স্পষ্ট প্রশ্ন— এটি কি শুধুই প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি পরিকল্পিতভাবে ‘একক আধিপত্য’ প্রতিষ্ঠার খেলা?

হঠাৎ বদলি—চাপের মুখে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’?

এই ঘটনার মধ্যেই সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অফিস আদেশ— স্মারক নং:- ২৫.৩৬.০০০০.২১১.১২.১০৩.১৭-৪৫২, তারিখ: ০১ এপ্রিল ২০২৬, কার্যালয়: প্রধান প্রকৌশলী, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সেগুনবাগিচা, ঢাকা।

প্রজ্ঞাপনের মূল বিষয় : জনস্বার্থে দুই নির্বাহী প্রকৌশলীকে তাৎক্ষণিক বদলি— মোঃ আনোয়ার হোসেন → ই/এম বিভাগ-৭ থেকে বিভাগ-১২, রিসালাত বারি → বিভাগ-১২ থেকে বিভাগ-৭, সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে: ২ এপ্রিলের মধ্যে যোগদান না করলে ৫ এপ্রিল থেকে “তাৎক্ষণিক অবমুক্ত” বলে গণ্য করা হবে।

প্রশ্ন উঠছে—এই বদলি কি ‘শাস্তি’, নাকি ‘আড়াল’?

বিশেষজ্ঞদের মতে—বড় কেলেঙ্কারি ফাঁস হলে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় এবং এতে তদন্তের গতিপথ ভিন্নদিকে ঘুরে যায়। বিশেষ করে যখন— একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই দুর্নীতির অভিযোগ থাকে
এবং একই ঠিকাদার বারবার বড় প্রকল্প পায় তখন এই ধরনের বদলি আদেশকে অনেকেই দেখছেন “ড্যামেজ কন্ট্রোল অপারেশন” হিসেবে।

সংসদ কেলেঙ্কারি—শুধু শুরু? সংসদের সাউন্ড সিস্টেমে—

নিম্নমানের কেবল জোড়া দেওয়া তার, পরীক্ষাবিহীন ইনস্টলেশন, অতিরিক্ত দামে যন্ত্রাংশ কেনা এবং তার সঙ্গে— একই ঠিকাদারের একাধিক প্রকল্প দখল, কাজ না করেই কোটি টাকা আটকে রাখা এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম। সব মিলিয়ে এটি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়— বরং একটি গভীরভাবে প্রোথিত দুর্নীতির নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত।

“মিডিয়া ম্যানেজ” থেকে “প্রকল্প দখল”—সব এক সুতোয় গাঁথা ?

আগেই অভিযোগ উঠেছে—প্রায় ২ কোটি টাকা খরচ করে মিডিয়া ম্যানেজ করা হয়েছে, অনেক অনলাইন পোর্টাল থেকে সংবাদ গায়েব। এখন দেখা যাচ্ছে—একই সময়েই প্রকল্প বণ্টন, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং কাজ আটকে রাখা—সবই চলছে সমান্তরালে

শেষ কথা: রাষ্ট্রের অর্থ, কার হাতে ?

জাতীয় সংসদ থেকে হাসপাতাল—রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পগুলো যদি একই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে প্রশ্ন একটাই—রাষ্ট্রের অর্থ কি উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে, নাকি পরিকল্পিতভাবে লুট হচ্ছে?

আমাদের দাবি : সংসদ ও মুগদা প্রকল্পসহ সংশ্লিষ্ট সব কাজের স্বাধীন ফরেনসিক অডিট, আমানত এন্টারপ্রাইজের সব প্রকল্প তাৎক্ষণিক তদন্তের আওতায় আনা, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জড়িত কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব যাচাই এবং বদলি নয়—দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

এই কেলেঙ্কারি এখন শুধু একটি প্রকল্পের নয়—এটি রাষ্ট্রীয় সুশাসনের পরীক্ষার প্রশ্ন।
এখন দেখার—সত্য প্রকাশ পায়, নাকি আবারও কোটি টাকার অনিয়ম চাপা পড়ে যায়।




সংসদের সাউন্ড সিস্টেমে গণ্ডগোল, আড়ালে তার চুরি ও দুর্নীতির অভিযোগ -নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনের দিকে সন্দেহের তীর

এসএম বদরুল আলমঃ জাতীয় সংসদের নতুন অধিবেশনের শুরুতেই বড় ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যখন স্পিকারের বক্তব্য চলাকালে হঠাৎ করেই মূল সাউন্ড সিস্টেম বিকল হয়ে যায়। নবনির্বাচিত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বারবার চেষ্টা করেও মাইক্রোফোন চালু করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে বাধ্য হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে অধিবেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয় এবং পরে আবার তা শুরু করা হয়। এই ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ঘটনার পেছনে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম, আলো ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি উন্নয়নের জন্য প্রথমে প্রায় ২৩ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হলেও পরে তা কমিয়ে ১২ কোটি টাকায় অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পে বিদেশি বিশেষজ্ঞ লারস ভিডেক্যামকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি পুরো সিস্টেম বদল না করে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ মেরামত করার পরামর্শ দিলেও তা গুরুত্ব পায়নি।

পরবর্তীতে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন স্থাপন করা হয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এসব যন্ত্রপাতি ঠিকমতো বসানো হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনভিজ্ঞ ঠিকাদার দিয়ে কাজ করানোর কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই যন্ত্রপাতি পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, যা রাষ্ট্রের আরও অর্থ অপচয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

এই প্রকল্পে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ‘আমানত এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ঢাকা গণপূর্ত ইএম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান এবং নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ার হোসেনের নাম উঠে এসেছে। এছাড়া প্রকল্প তদারকির সঙ্গে যুক্ত প্রকৌশলী আসিফুর রহমান ও সামসুল ইসলামকেও দায়ী করা হচ্ছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আগেও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল বলে জানা গেছে। তিনি পূর্বে দায়িত্ব পালনকালে প্রকল্পের নিয়ম ভেঙে নিজের পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হন। এমনকি তার কর্মকাণ্ডের কারণে একাধিকবার তদন্তও হয়েছে এবং তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছিল। তবে পরে তিনি আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে আসেন, যেখানে আশ্রাফুল হকের সহায়তার কথাও শোনা যাচ্ছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সাউন্ড সিস্টেমের তার বা কেবল নিয়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় উচ্চমানের কেবল ব্যবহার করা জরুরি। কিন্তু এখানে নিম্নমানের কেবল ব্যবহার করা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তার জোড়া দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সাউন্ড সিস্টেমে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আরও অভিযোগ আছে, ব্যবহৃত কেবলগুলোর কোনো মান যাচাই বা পরীক্ষার প্রমাণও নেই।

এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গণমাধ্যমে দাবি করছেন, তারা আন্তর্জাতিক মানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছেন এবং তাদের কোনো গাফিলতি নেই। তবে সমালোচকদের মতে, হেডফোন বা মাইক্রোফোনের বিষয়টি সামনে এনে মূল সমস্যাটি আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, এই ঘটনায় শুধু প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং পরিকল্পনা, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে। এখন সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি আর না ঘটে।




এলকেএসএসকে ঘিরে নিয়োগ বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগে তোলপাড়, তদন্তে বেরোচ্ছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

এসএম বদরুল আলমঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি সমবায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টারকে ঘিরে নানা ধরনের গুরুতর অভিযোগ সামনে আসছে। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি জনকল্যাণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ জনবল গঠনের কথা বললেও এখন অভিযোগ উঠেছে, এসবের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, জাল নথি ব্যবহার, কর ফাঁকি এবং কর্মীদের অর্থ আত্মসাতের মতো অনিয়ম চলেছে।

এই অভিযোগগুলোর প্রেক্ষিতে বর্তমানে তদন্ত চলছে, যার তত্ত্বাবধানে রয়েছেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম-মহাপরিদর্শক মোঃ মাহফুজুর রহমান ভূইয়া। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এলকেএসএস-এর বিভিন্ন কার্যক্রমে অসংখ্য অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির নাম ব্যবহার, জমা দেওয়া অভিজ্ঞতার সনদ, প্রকল্প সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং ভ্যাট-ট্যাক্স সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের গরমিল ধরা পড়েছে।

সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো—লাইসেন্স ছাড়া আউটসোর্সিং জনবল সরবরাহ। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের কাজ করতে হলে নির্দিষ্ট লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এলকেএসএস সেই লাইসেন্স না পেয়েও লাইসেন্সের আবেদনের ফটোকপি ব্যবহার করে টেন্ডারে অংশ নিয়েছে এবং প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এইভাবে প্রতিষ্ঠানটি হাজার কোটি টাকার বেশি সরকারি প্রকল্পের কাজ নিয়েছে।

নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও উঠেছে বড় অভিযোগ। অনেকের দাবি, স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিয়োগ না দিয়ে প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় নির্দিষ্ট কিছু লোককে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে একটি অস্বচ্ছ আর্থিক লেনদেনের চক্র গড়ে ওঠে, যেখানে নিয়োগ পেতে অর্থ দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এলজিইডির ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরেই এসব বিষয়ে অসন্তোষ থাকলেও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে বিষয়গুলো চাপা পড়ে গেছে।

লাইসেন্সের বিষয়টিও বেশ জটিল। জানা গেছে, ২০১৮ সালে এলকেএসএস হিউম্যান রিসোর্স সেন্টার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছিল। কিন্তু যাচাই-বাছাইয়ে জমা দেওয়া কাগজপত্রে অসত্য তথ্য পাওয়ায় সেই আবেদন বাতিল করা হয়। তারপরও তারা কার্যক্রম চালিয়ে গেছে এবং টেন্ডার পেয়েছে—যা বড় ধরনের অনিয়ম হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ট্যাক্স ও ভ্যাট সংক্রান্ত বিষয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানটির কোনো বৈধ টিন বা ভ্যাট সনদ ছিল না। অথচ তারা ভুয়া নথি ব্যবহার করে কাজ নিয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে প্রায় ৫৬০০ কর্মীর বেতনের বিপরীতে যে ভ্যাট-ট্যাক্স সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা ছিল, তার একটি বড় অংশ জমা হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকার কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। অথচ টিন সনদ নেওয়া হয়েছে ২০২৪ সালে এবং ভ্যাট নিবন্ধন করা হয়েছে ২০২৫ সালে—যা আগের কার্যক্রমের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো কর্মীদের অর্থ আত্মসাৎ। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কর্মীর জন্য এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ নির্দিষ্ট হিসাবে জমা রাখার কথা, যা চাকরি শেষে ফেরত দেওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ জমা না দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন। হিসাব অনুযায়ী, এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।

নথি জালিয়াতির অভিযোগও সামনে এসেছে। বিভিন্ন টেন্ডারে জমা দেওয়া অভিজ্ঞতার সনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই করে সন্দেহজনক তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্রমাণিত হলে তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এদিকে সিরাজগঞ্জের হাটিকামরুল এলাকায় জমি ক্রয়, ভবন নির্মাণ এবং একটি রেস্টুরেন্ট প্রকল্প নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এলজিইডির প্রকল্পের টাকা ব্যবহার করে সেখানে অবকাঠামো তৈরি করা হয় এবং পরে সেটি ভাড়া দেওয়া হয়। ভাড়ার অগ্রিম অর্থ সরকারি হিসাবে জমা না দিয়ে সংশ্লিষ্টরা ভাগাভাগি করে নেন। পরে সরকার ওই জায়গা অধিগ্রহণ করলে প্রায় সাড়ে তের কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, যা সরকারি তহবিল থেকে পরিশোধ করা হয়েছে। বিষয়টি সরকারি অর্থ তছরুপের বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই পুরো ঘটনায় এখন প্রশ্ন উঠছে—এলকেএসএস কি সত্যিই জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান, নাকি এটি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আর্থিক স্বার্থ রক্ষার মাধ্যম? কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলা হলেও বাস্তবে নিয়োগ কতটা স্বচ্ছ ছিল, তা নিয়েই এখন আলোচনা চলছে।

তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ মাহফুজুর রহমান ভূইয়া জানিয়েছেন, ব্যক্তিগতভাবে কাউকে লক্ষ্য করে নয়, বরং আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সুশাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি। তাই স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং দ্রুত তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

 




চট্টগ্রাম বন্দরে প্রভাবের অদৃশ্য জাল: কর্মকর্তা-শ্রমিক নেতাদের ঘিরে নতুন করে অভিযোগের বিস্তার

এসএম বদরুল আলমঃ চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার কথা শোনা যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন তথ্য, নথি এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি আগের ধারণার চেয়েও অনেক বড় ও জটিল। এখানে শুধু শ্রমিক রাজনীতি নয়, বরং কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন স্তরের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক কাজ করছে—এমন অভিযোগ উঠেছে।

এই আলোচনার কেন্দ্রে যাদের নাম ঘুরে ফিরে আসছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন সিবিএ সংশ্লিষ্ট নেতা নায়েবুল ইসলাম ফটিক, শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ইব্রাহিম খোকন ও শেখ নূরুল্লাহ বাহার। এছাড়া পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম, শিপিং শাখার প্রধান সহকারী রফিকুল ইসলাম সেতু, প্রশাসনিক কর্মচারী আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং প্রধান সহকারী সরোয়ার হোসেন লাভলুর নামও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার এবং আর্থিক সুবিধা নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নায়েবুল ইসলাম ফটিককে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে তার তথাকথিত ‘অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ’ নিয়ে। অভিযোগ আছে, দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকলেও তার প্রভাব কমেনি। বরং তার ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে বন্দরের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে তার প্রভাব অব্যাহত রয়েছে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্তেও তার মতামত কার্যকর হয়েছে বলে দাবি করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

অন্যদিকে, ইব্রাহিম খোকন ও শেখ নূরুল্লাহ বাহারকে ঘিরে শ্রমিক রাজনীতির আড়ালে প্রভাব বলয় তৈরির অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, তারা শুধু শ্রমিক সংগঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন, বরং বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও প্রভাব খাটাচ্ছেন। কমিশন বাণিজ্য, সুবিধা আদায় এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুযোগ করে দেওয়ার মতো অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে।

পরিচালক পর্যায়েও প্রশ্ন উঠেছে। পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ—তিনি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পক্ষপাত দেখান, নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সুবিধা দেন এবং কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন। যদিও এসব বিষয় নিয়ে তার পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

শিপিং শাখা ও প্রশাসনিক স্তরেও অনিয়মের অভিযোগ কম নয়। রফিকুল ইসলাম সেতু, আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং সরোয়ার হোসেন লাভলুর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে—নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, তথ্য ফাঁস এবং প্রভাব খাটানোর মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার। দীর্ঘদিন ধরে এসব অভিযোগ থাকলেও দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায় না।

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইস্যুতেও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ব্যক্তি একদিকে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন, আবার অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এতে আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

এর পাশাপাশি কয়েকজনের বিরুদ্ধে আয়ের উৎসের সঙ্গে মিল না থাকা সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। একাধিক স্থানে সম্পত্তি, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব এবং অস্বচ্ছ আর্থিক লেনদেন নিয়ে আলোচনা চলছে। জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২৪ সালে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তলব করে তাদের সম্পদের হিসাব চেয়েছিল এবং একটি প্রাথমিক অনুসন্ধানও শুরু হয়। তবে সেই তদন্তের অগ্রগতি এখনো পরিষ্কার নয়।

সব মিলিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এত অভিযোগ থাকার পরও কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়? অনুপস্থিত কর্মচারী এখনও বহাল, বিতর্কিত বদলি কার্যকর হয়নি, অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকে দায়িত্বে রয়েছেন। এতে করে বন্দর প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই এখানে যদি সত্যিই এমন একটি প্রভাবশালী বলয় সক্রিয় থাকে, তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়—পুরো জাতীয় অর্থনীতির জন্যই উদ্বেগজনক। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।




ঢাকায় গণপূর্তে গোপন প্রভাববলয়: সমীরণ মিস্ত্রীকে ঘিরে বদলি ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকার গণপূর্ত অধিদপ্তরকে ঘিরে আবারও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। ভেতরের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, পুরো বিভাগজুড়ে এক ধরনের অদৃশ্য প্রভাববলয় কাজ করছে। এই বলয়ের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হিসেবে বারবার উঠে আসছে সমীরণ মিস্ত্রীর নাম। অফিসের ভেতরে-বাইরে তার প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। অনেকে মনে করেছিলেন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলাবে, কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রভাবশালী কিছু প্রকৌশলী এখনও রাজধানীতেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করে রেখেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারর ঘনিষ্ঠ একটি গোষ্ঠী এখনও সক্রিয় রয়েছে এবং সেই গোষ্ঠীর অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে সমীরণ মিস্ত্রীর নাম সামনে আসছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, প্রকল্প বণ্টন, এমনকি কর্মকর্তাদের কোথায় পোস্টিং হবে—এসব ক্ষেত্রেও তার প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, অনেক সিদ্ধান্তই নাকি আনুষ্ঠানিকভাবে নয়, বরং অঘোষিতভাবে এই প্রভাববলয়ের মাধ্যমে ঠিক করা হয়।

শেরেবাংলা নগর এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে মেরামতের নামে প্রায় ৮০ কোটি টাকার কাজ দেখানো হলেও বাস্তবে তার উল্লেখযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, এসব প্রকল্পের বিল-ভাউচারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং সেই টাকা কিছু ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে সংসদ সচিবালয়ের কাজ নিয়েও, যেখানে প্রকল্পের প্রকৃত কাজের তুলনায় খরচ অনেক বেশি দেখানো হয়েছে।

এছাড়া বদলি বাণিজ্য নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভেতরের তথ্য অনুযায়ী, পছন্দের জায়গায় পোস্টিং পেতে কর্মকর্তাদের বড় অঙ্কের টাকা দিতে হচ্ছে। এই তথাকথিত ‘পেইড পোস্টিং’ সিন্ডিকেটের সঙ্গে সমীরণ মিস্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে আলোচনা চলছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, ভালো পদে যেতে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হচ্ছে।

সমীরণ মিস্ত্রী দীর্ঘ সময় ধরে গণপূর্তের গুরুত্বপূর্ণ ইএম বিভাগ-৭ এ দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম, পরে গণপূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার এবং প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফ আহমেদর প্রভাব ব্যবহার করে তিনি নিয়ম বহির্ভূতভাবে একই বিভাগে বছরের পর বছর অবস্থান ধরে রাখেন। এমনকি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের—যেমন শেখ হেলাল ও শেখ জুয়েল—সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর তাকে ইএম বিভাগ-৭ থেকে পিএন্ডডি বিভাগ-১ এ বদলি করা হয় এবং তার জায়গায় দায়িত্ব পান আনোয়ার হোসেন। কিন্তু বদলির পরও তার প্রভাব পুরোপুরি কমেনি বলে অভিযোগ। বিশেষ করে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসীকে নিয়েও ব্যাপক আলোচনা চলছে। বলা হচ্ছে, সমীরণ মিস্ত্রীর অনুরোধেই পরবর্তীতে সিফাত ওয়াসীকেও তার নতুন কর্মস্থলে বদলি করা হয়, যা ঘটেছে সরকারি ছুটির দিনেই—যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সিফাত ওয়াসীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি নিজ আওতাধীন এলাকায় দায়িত্ব পালনে চরম অদক্ষতা ও দুর্নীতির পরিচয় দেন। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বারবার আড়াল করা হয়েছে সমীরণ মিস্ত্রীর প্রভাবের কারণে। দায়িত্ব পালনের পুরো সময়টিতেই তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রীর সঙ্গে লেপ্টে ছিলেন।

এ নিয়ে সে সময়ে নানা কথাবার্তা উঠলেও সমীরণ তার ক্ষমতাবলে আগলে রেখেছিলেন সিফাত ওয়াসীকে। সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের স্ত্রী সিফাত ওয়াসীকে বদলি করার জন্য প্রধান প্রকৌশলীকে অনুরোধ জানালেও সমীরণ নিজ ক্ষমতাবলে তা আটকে দিয়েছিলেন। সে সময়ে গুঞ্জন উঠেছিল তারা বিয়ে করেছেন।

ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও এই দুই কর্মকর্তাকে ঘিরে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে, যা অফিসের পরিবেশেও প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন অনেকে। যদিও এসব বিষয়ে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তাদের নীরবতা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে।

বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছুটা পরিবর্তনের আশা তৈরি হলেও এখনো পর্যন্ত মূল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, এই প্রভাবশালী চক্র এখনো আগের মতোই সক্রিয় রয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে—গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও অনিয়মের অবসান আদৌ হবে কি না, নাকি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে সবকিছু আগের মতোই চলতে থাকবে। এখন সবার নজর নতুন নেতৃত্বের দিকে, তারা কতটা কার্যকরভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়।




বিআইডব্লিউটিএ-তে ‘অঘোষিত গডফাদার’! শত কোটি টাকার দুর্নীতির কেন্দ্রে নিজাম উদ্দিন পাঠান

এসএম বদরুল আলমঃ নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), যার ওপর দেশের নদীপথ, বন্দর ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার বিশাল দায়িত্ব ন্যস্ত। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটিকেই ঘিরে উঠেছে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক অনিয়মের একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। সাম্প্রতিক একাধিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—সংস্থাটির ভেতরে গড়ে উঠেছে প্রভাবশালী একটি চক্র, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নিজাম উদ্দিন পাঠান নামের এক কর্মকর্তা। এক সময়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হলেও বর্তমানে তিনি সংস্থার ভেতরে “অঘোষিত চেয়ারম্যান” কিংবা “গডফাদার” হিসেবেই বেশি পরিচিত।

জানা যায়, চাকরির শুরু থেকেই বড় বড় ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেন নিজাম উদ্দিন পাঠান। সেই সম্পর্কই ধীরে ধীরে তাকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। পদোন্নতির সিঁড়ি বেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর পদে পৌঁছে তিনি প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন সংস্থার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে। এরপর থেকেই তার বিরুদ্ধে ওঠতে থাকে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ।

অভিযোগ রয়েছে, এই প্রভাব খাটিয়ে বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন তিনি। রাজধানীর বনশ্রী ও রামপুরা এলাকায় তার নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট থাকার কথা বলছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। বনশ্রীর জে, এস ও সি ব্লকে একাধিক অ্যাপার্টমেন্ট ছাড়াও আশপাশে জমি ও বাড়ির মালিকানার অভিযোগ রয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী হলেও সেখানকার স্থানীয়দের প্রতিও তিনি উদাসীন—এমন কথাও শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন মহলে। ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক ও গুঞ্জন।

বাঘাবাড়ি নদী বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেই তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। প্রায় ৫০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে বড় ধরনের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোহাম্মদ জাফর নামের এক ঠিকাদারকে পুরো কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় এবং বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের কমিশন গ্রহণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে কাজের অগ্রগতি না থাকলেও কাগজে-কলমে প্রকল্প সম্পন্ন দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে। একইভাবে নগরবাড়ী-বাঘাবাড়ি প্রকল্পেও মাঠপর্যায়ে কাজের অস্তিত্ব না থাকলেও কাগজে সম্পূর্ণ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া ঠিকাদারদের সঙ্গে গোপন অংশীদারিত্বে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুর্নীতির টাকায় ডেভেলপার ব্যবসায় যুক্ত হয়ে পড়েন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। “এস এস রহমান কোম্পানি”-র মালিক মোহাম্মদ দিপুকে প্রায় ২৪০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছে। বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ ব্যক্তিগত ব্যবসায় ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এমন গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে সচিবালয়ও নড়েচড়ে বসেছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর ফাইল প্রস্তুত করা হয়েছে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রাথমিক যাচাইয়ে বিল, ভাউচার ও পেমেন্টের নথিপত্রে অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। একই কাজের জন্য একাধিকবার বিল তোলা এবং অনেক ক্ষেত্রে কাজ না করেই সম্পন্ন দেখানোর প্রমাণ মিলছে বলে জানা গেছে।

সূত্রমতে, বিআইডব্লিউটিএ-তে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে মেধা নয়—প্রভাব ও রাজনৈতিক পরিচয়ই প্রধান বিবেচ্য। নিয়োগে অনিয়ম, পারিবারিক প্রভাব, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের আত্মীয়দের পুনঃনিয়োগসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। এক ঠিকাদারের ভাষায়, “যে কর্মকর্তা ঠিকাদারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখে, সেই-ই টিকে থাকে।”

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পেও ভয়াবহ অনিয়ম রয়েছে। কাজ হয়েছে অর্ধেকেরও কম, অথচ কাগজে দেখানো হয়েছে সম্পূর্ণ। নিম্নমানের নির্মাণ, অসম্পূর্ণ অবকাঠামো এবং বাস্তবতার সঙ্গে কাগুজে উন্নয়নের বিশাল ফারাক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নগরবাড়ী, বাঘাবাড়ী ও খানপুর পোর্ট উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। সংস্থাটির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ-র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাদের বক্তব্য—বিষয়টি তদন্তাধীন, তাই এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত সংস্কার না আনলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে। স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা, ডিজিটাল মনিটরিং, উন্মুক্ত অডিট এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের নদীপথ অর্থনীতির প্রাণ হিসেবে বিবেচিত বিআইডব্লিউটিএ যদি দুর্নীতির এই চক্র থেকে মুক্ত না হয়, তবে উন্নয়ন পরিকল্পনা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে—এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন সবার প্রশ্ন—নিজাম উদ্দিন পাঠানের মতো প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের হাত থেকে আদৌ কি মুক্তি পাবে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান?




নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে ৫০০ শয্যা হাসপাতাল নির্মাণে টেন্ডার কারসাজির অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ভবন নির্মাণকাজ ঘিরে গুরুতর টেন্ডার কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দরপত্র প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে অসঙ্গতি, গাণিতিক বিভ্রান্তি এবং উদ্দেশ্যমূলক সংশোধনের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।

জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই এই প্রকল্পের তৃতীয় দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়, যার টেন্ডার আইডি ছিল 1130979। প্রকল্পটির প্রাথমিক দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২৫৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা। তবে দরপত্র আহ্বানের এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রথম সংশোধনী প্রকাশ করা হয়, যেখানে TDS ও PCC-এর অসঙ্গতি দূর করার কথা বলা হলেও একইসঙ্গে BOQ-তে নতুন করে ৬০ টন রড (Reinforcement Steel) যোগ করা হয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের চলতি দর অনুযায়ী এই রডের মূল্য প্রায় ৭২ লাখ টাকা হওয়ায় প্রাক্কলিত মূল্য বাড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা কমিয়ে ২৫৪ কোটি ১২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা স্পষ্ট গাণিতিক অসঙ্গতির ইঙ্গিত দেয়।

এরপর আরও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে দরপত্র দাখিলের শেষ সময়ের মাত্র তিন দিন আগে। নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান তার ই-জিপি আইডি হ্যাক হওয়ার অজুহাতে দ্বিতীয় সংশোধনী প্রকাশ করেন। যদিও এই সংশোধনীতে BOQ-এর কোনো আইটেমের পরিমাণ পরিবর্তন করা হয়নি, তবুও সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করছে—এ সময় গোপনে দাপ্তরিক প্রাক্কলিত মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা কমিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণ নিয়মে এই ধরনের তথ্য শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আইডি থেকেই দেখা সম্ভব, ফলে পুরো বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রাক্কলিত মূল্য কৌশলে কমিয়ে এনে নির্দিষ্ট একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—নুরানী-জামাল জেভি—কে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রাক্কলিত মূল্যের ১০ শতাংশ নিচের দরকে অস্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই প্রকল্পে গ্রহণযোগ্য সীমা প্রায় ২২৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা হলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি দর দেয় ২২৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা নিয়ম অনুযায়ী অগ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা। কিন্তু রহস্যজনকভাবে সেই দরকেই Responsive হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে, যা পুরো মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দরপত্র চলমান অবস্থায় এ ধরনের মৌলিক পরিবর্তন এবং প্রাক্কলিত মূল্য হেরফের সরাসরি সরকারি ক্রয় আইন (PPA-2006) ও বিধিমালা (PPR-2008) লঙ্ঘনের শামিল। আইনের Section-9 অনুযায়ী স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগততা এবং সমান প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও এই ঘটনায় তা স্পষ্টভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। একইসঙ্গে Rule-16 অনুযায়ী বাস্তবসম্মত প্রাক্কলন প্রস্তুত করার বিধান, Rule-31 অনুযায়ী দরপত্রের মৌলিক শর্ত অপরিবর্তিত রাখার নির্দেশনা এবং Rule-33 ও Rule-100 অনুযায়ী দর মূল্যায়নের নীতিমালা লঙ্ঘিত হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া, Rule-98 অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্রে কোনো ধরনের দরকষাকষি নিষিদ্ধ থাকলেও প্রাক্কলিত মূল্য কৌশলে পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে ‘Lowest Responsive’ বানানোর চেষ্টা পরোক্ষ দরকষাকষি ও যোগসাজশের ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে প্রতিযোগী দরদাতা, যেমন ‘হুদা কন্সট্রাকশন’-কে অযোগ্য করার অপচেষ্টার অভিযোগও সামনে এসেছে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছে, এই ঘটনায় পরিকল্পিতভাবে প্রাক্কলিত মূল্য কমানো, আইটেম যোগ করেও ব্যয় হ্রাস দেখানো এবং অযোগ্য দরকে গ্রহণযোগ্য ঘোষণা করার মতো একাধিক অনিয়মের সমন্বয় ঘটেছে। যা কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং সংঘবদ্ধ দুর্নীতির লক্ষণ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে, এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।




গণপূর্তে ‘কাগুজে উন্নয়ন’ কেলেঙ্কারি: কাজ নেই, তবু কোটি টাকার বিল—অভিযোগে তোলপাড়

এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকার গণপূর্ত বিভাগ-৩, যেটি মূলত সরকারি ভবন ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি দপ্তর, সেটিকেই ঘিরে এখন ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এখানে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা কাগজে উন্নয়ন দেখিয়ে বাস্তবে কোনো কাজ না করেই কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এই সিন্ডিকেটে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সতীনাথ বসাক, নির্বাহী প্রকৌশলী কায়সার ইবনে সাঈখ এবং সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমেদের নাম বারবার উঠে আসছে।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে কায়সার ইবনে সাঈখ নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে অসম্পূর্ণ কিংবা একেবারেই না হওয়া কাজের বিপরীতে ৪ কোটির বেশি টাকার বিল অনুমোদন দেন। এই অর্থ আবার বৃহৎ একটি বিতর্কিত ব্যয়ের অংশ, যেখানে প্রায় ২০০ কোটি টাকা তড়িঘড়ি করে খরচ দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে কাজের কোনো অস্তিত্ব নেই—ফলে বড় প্রশ্ন উঠেছে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আসলে কোথায় গেল।

একই ধরনের অনিয়ম দেখা গেছে বিভিন্ন সংস্কার প্রকল্পেও। তেজগাঁও ল্যান্ড রেকর্ডস অফিসের বাংলো-১ এবং সেন্ট্রাল রেকর্ড ভবনের জন্য প্রায় ১৯.৮৭ লাখ টাকার সংস্কার কাজ অনুমোদন দেওয়া হয়, কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কোনো কাজই করা হয়নি। সেগুনবাগিচার এনবিআর ভবন এবং অডিট কমপ্লেক্সেও মেরামত ও রংকরণের অনুমোদন দেওয়া হলেও বাস্তবে দেয়াল ভাঙা, ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় পড়ে আছে। এতে সন্দেহ জোরালো হয়েছে যে এসব প্রকল্প আসলে পরিকল্পিতভাবে টাকা লুটের জন্যই করা হয়েছে।

ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও বেশ গুরুতর। অভিযোগ অনুযায়ী, সতীনাথ বসাক এবং কায়সার ইবনে সাঈখ মিলে অন্তত ৫ শতাংশ কমিশন আদায় করতেন। এই কমিশনের বিনিময়ে তারা অসম্পূর্ণ কাজের বিল পাস করতেন কিংবা কাজ না করেই টাকা তোলার সুযোগ করে দিতেন। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল এক ধরনের সাজানো লেনদেন।

অন্যদিকে, সরকারি ভবনগুলো যখন অবহেলায় জরাজীর্ণ, তখন নির্বাহী প্রকৌশলীর নিজের অফিসে ২১ লাখ টাকা খরচ করে বিলাসবহুল সংস্কারের অভিযোগ উঠেছে। বারবার টাইলস ও মার্বেল পরিবর্তন, এমনকি মাত্র ১০ মাস আগে বসানো টয়লেট ফিটিংসও আবার বদলানো হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—এগুলো কি সত্যিই প্রয়োজনীয় ছিল, নাকি টাকা আত্মসাতের কৌশল?

সরকারি ক্রয় বিধিমালাও নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। ই-জিপি পদ্ধতিতে টেন্ডার হওয়ার কথা থাকলেও তা পাশ কাটিয়ে ম্যানুয়ালি নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয়েছে। এতে স্বচ্ছতা পুরোপুরি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

ঝিনাইদহে দায়িত্ব পালনকালে কায়সার ইবনে সাঈখের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ ওঠে। সেখানে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল প্রকল্পে ৩ কোটি টাকার বিল ছাড়াতে ১০ শতাংশ কমিশন দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে তিনটি মডেল মসজিদ প্রকল্পে প্রায় ১.২ কোটি টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। এসব প্রকল্পের কাজের মানও ছিল খুবই খারাপ—টাইলস খসে পড়া, পাইপে লিক, লিফট বিকল এবং অপারেশন থিয়েটারের এসি পর্যন্ত অচল হয়ে পড়ার মতো ঘটনা সামনে এসেছে, যা সরাসরি জননিরাপত্তার জন্য হুমকি।

এই পুরো সিন্ডিকেটের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনায় ফিরোজ আহমেদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ আছে, তিনি সাইট ভিজিট রিপোর্টে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন, কাজের পরিমাপে কারচুপি করেছেন এবং অসম্পূর্ণ কাজকে সম্পূর্ণ দেখিয়ে বিল পাশ করাতে সহায়তা করেছেন।

সবচেয়ে বিতর্কিত একটি ঘটনায় দেখা যায়, ২০১৭ সালে হাইকোর্টের রায়ে বাতিল হওয়া তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ৬০ কাঠার একটি প্লট ২০২৩ সালে পুনরায় হস্তান্তরের সুপারিশ করা হয়, যেখানে কায়সার ইবনে সাঈখের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে এই বিষয়টি নিয়ে একাধিক মামলা চলমান।

এর আগে ২০১৯ সালে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি এসব অনিয়মের প্রমাণ পেয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে কোনো শাস্তি হয়নি, বরং অভিযুক্তদের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ভালো পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। এতে প্রশাসনের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে—প্রমাণ থাকার পরও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?

এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত কোথায় গিয়ে থেমে আছে, মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ কে আটকে দিয়েছে, আর এই সিন্ডিকেটের পেছনে কারা রয়েছে—এসব বিষয় নিয়ে জনমনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এখন এমন একটি দপ্তরে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে, যেখানে প্রকল্প কাগজে আছে, বিলও আছে, কিন্তু বাস্তবে কাজের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাই সচেতন মহল নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্য তদন্ত, জবাবদিহিতা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তির দাবি জানাচ্ছে।




ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ ওষুধ প্রশাসন !! লাগাম টেনে ধরতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হস্তক্ষেপ জরুরি!!

ভেজাল ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হারবাল ওষুধের কারণে দেশে লাখো মানুষ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। যৌনশক্তিবর্ধক, ভিটামিন ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের নামে বিক্রি হওয়া মানহীন ওষুধে হৃদরোগ, লিভার ও কিডনি সমস্যা এমনকি ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর শুধু লাইসেন্স দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে, কার্যকর তদারকি নেই। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা অনুমোদনহীন ও ক্ষতিকর ওষুধ বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

এসএম বদরুল আলমঃঐতিহ্যবাহী ইউনানি ও আয়ুর্বেদ ওষুধশিল্প এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অনেক কোম্পানি নির্ধারিত ভেষজ উপাদান ব্যবহার না করে সস্তা ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল যেমন সিলডেনাফিল সাইট্রেড ও ডেক্সামেথাসনের ব্যবহার করছে। দ্রুত ফল পাওয়ার লোভে এই ধরনের রাসায়নিক মিশিয়ে ওষুধ তৈরি করা হচ্ছে, যা স্বল্পমেয়াদে কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

বিশেষ করে যৌনশক্তিবর্ধক ও মোটা হওয়ার ওষুধে এসব কেমিক্যালের ব্যবহার বেশি দেখা যাচ্ছে। যেখানে আসল ইউনানি-আয়ুর্বেদ ওষুধ ধীরে ধীরে কার্যকর হয়, সেখানে এসব ভেজাল ওষুধ ১-২ ঘণ্টার মধ্যেই কাজ করছে—যা এর ভেতরে কেমিক্যাল থাকার বড় ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক ব্যবহারকারীও দ্রুত ফল পেলেও পরে নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অভিযোগ করেছেন।

অন্যদিকে বাজারে অসংখ্য কোম্পানি গড়ে উঠেছে, যাদের অনেকেই ফর্মুলারি মেনে চলে না। যেমন হাইম্যাক্স ইউনানি ফার্মাসিউটিক্যালস, আরগন ফার্মাসিটিক্যালস, জিকে ফার্মা ও মডার্ন হারবালের মতো প্রতিষ্ঠানের কিছু পণ্যের বিরুদ্ধে ভেজালের অভিযোগ উঠেছে। এসব কোম্পানি ইংরেজি ট্রেড নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে, ফলে অনেকেই এগুলোকে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ মনে করে ভুল করছেন।

ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অনিয়ম রয়েছে। অনেক কোম্পানি বিক্রেতাদের ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিচ্ছে, যা আসল ভেষজ উপাদান ব্যবহার করে সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে সস্তা কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি ওষুধই বেশি ছড়িয়ে পড়ছে বাজারে।

এদিকে তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া এবং কিছু অসাধু চক্রের প্রভাবের কারণে ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং ঐতিহ্যবাহী এই চিকিৎসা পদ্ধতির বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ভেজালের শীর্ষে যারা
লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইউনানী, আর্য়ূবেদিক ও হারবাল কোম্পানীগুলোর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি বাদে সবাই ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধ বিক্রি করছে দেদারছে। এদের প্রধান ব্যবসা হচ্ছে যৌনশক্তি বর্ধক অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রি করা। এদের ২য় বিক্রির তালিকায় রয়েছে রুচি বর্ধক ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধ। অনুসন্ধানে দেখা দেখা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ভেজালের শীর্ষে আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস
আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস ময়মনসিংহের ঠিকানায় লাইসেন্স নিলেও ঢাকায় বসে ব্যবসা পরিচালনা করছে। ‘আরগন ল্যাবরেটরী’ নামে অনুমোদন নিয়ে ভিন্ন নামে ওষুধ বাজারজাত করছে। ইউনানি-আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠানের জন্য নিষিদ্ধ হলেও তারা “ফার্মাসিউটিক্যালস” শব্দ ব্যবহার করে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করছে। তাদের প্রধান ব্যবসা অনুমোদনহীন যৌনশক্তিবর্ধক ‘নাইটেক্স’ ও ‘রিষ্টোর’। এছাড়া ডায়াবেটিস, ভিটামিন ও মিনারেল ওষুধ বিক্রি করছে, যেগুলোর অনেকই অনুমোদিত তালিকায় নেই।

জিকে ফার্মা (ইউনানী)
জিকে ফার্মা-এর লাইসেন্স গাজীপুরে হলেও কার্যক্রম ঢাকাকেন্দ্রিক। ৫০টি ওষুধ উৎপাদনের অনুমোদন থাকলেও বাস্তবে কয়েকটি যৌনশক্তিবর্ধক ও ডায়াবেটিস ওষুধই বাজারে আছে। ‘কমান্ড’ ও ‘গোল্ডেন লাইফ’ নামে উচ্চমূল্যের ওষুধ বিক্রি করে। অভিযোগ রয়েছে, ডায়াবেটিসের ওষুধ প্রথমে কাজ করলেও পরে রোগ আরও বেড়ে যায়।

ন্যাচার ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউনানী) লিঃ
ন্যাচার ফার্মাসিউটিক্যালস অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। মিরপুরে কারখানার পাশাপাশি গোপন ডিপো থেকে এসব পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সুরমা ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউনানী)
সুরমা ফার্মাসিউটিক্যালস-এর ‘আরক পুদিনা’ ও ‘সেব-এস’ সিরাপ ব্যাপক বিক্রি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব পণ্যে অতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারের কারণে দ্রুত শরীরের পরিবর্তন ঘটে। নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলেও এখনো রিপোর্ট পাওয়া যায়নি, যা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

হামজা ল্যাবরেটরীজ (ইউনানী)
হামজা ল্যাবরেটরীজ বিভিন্ন সিরাপ, ট্যাবলেট ও ক্যাপসুল বাজারজাত করছে। অভিযোগ আছে, যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধে ভায়াগ্রার উপাদান এবং অন্যান্য রোগের ওষুধে অ্যালোপ্যাথিক কাঁচামাল ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে, যদিও প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

চিত্রা ল্যাবরেটরীজ (ইউনানী)
চিত্রা ল্যাবরেটরীজ-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদনের অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিভিন্ন সিরাপ ও ভিটামিন পণ্যে অতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

সব মিলিয়ে ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হারবাল ওষুধশিল্পের বর্তমান চিত্র গভীর উদ্বেগজনক। একদিকে অসাধু ব্যবসায়ীদের অনিয়ম ও ভেজাল উৎপাদন, অন্যদিকে তদারকির ঘাটতি—এই দুইয়ের চাপে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। দ্রুত লাভের আশায় ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করে তৈরি ওষুধ মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতি করছে, যা অনেক ক্ষেত্রে জীবননাশের কারণও হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর নজরদারি, নিয়মিত ল্যাব পরীক্ষা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা ভেজাল ও প্রতারণামূলক ওষুধ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।