পরকিয়ার টানে টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ প্রবাসী স্বামীর ঘর ছেড়ে মিথ্যা মামলা

তৌহিদুর রহমানঃ মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলায় প্রবাসী স্বামীর ৩ লাখ টাকা, স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে স্ত্রী চম্পট দেয়ার পর স্বামী সহ শশুর, দেবর ও ননদের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি কালকিনি থানার উত্তর রমজানপুর গ্রামের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ঘটেছে।

জানা যায়, সৌদি আরব প্রবাসী স্বামীর নাম নাঈম হাওলাদার। সে ওই গ্রামের মিজান হাওলাদারের বড় ছেলে। স্ত্রী বিথী আক্তার হলেন মাদারীপুর জেলার কালকিনি থানার আইরকান্দি গ্রামের শহীদ ফকিরের মেয়ে। বর্তমানে শহীদ ফকির ডিএমপি’র কদমতলী থানার দক্ষিণ ধনিয়ার কুদ্রত আলী বাজারের ১৪৮১ নম্বর বাড়িতে সপরিবারে বসবাস করেন। মিথ‍্যা মামলা সহ তাদের অত‍্যাচার নির্যাতন থকে রক্ষা পেতে ওই প্রবাসীর ছোট ভাই আফিফ হাসান কাউসার (আসামী) ৫ মার্চ ২০২৬ তারিখ নিজে বাদী হয়ে প্রধানমন্ত্রী,স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী,আইন সচিব, আইজিপি, ঢাকার চীপ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সহ বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ ও আবেদন করেন । কাউসার তার অভিযোগ ও আবেদনের বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে মিথ্যা ও কাল্পনিক নাটক সাজিয়ে আদালতে অবৈধ মামলা করে হয়রানির অভিযোগ তোলেন। একই সাথে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।

অভিযোগ সুত্রে জানা যায়,একাধিক পর-পরুষে আসক্ত ওই প্রবাসীর স্ত্রী বিথী আক্তার। হানি ট্রাফের মাধ্যমে যুবকদের থেকে টাকা পয়সা হাতিয়ে নিয়াই তার নেশা ও পেশা। বিথীর এসব অনৈতিক কাজে তার মা-বাবার সহযোগিতার হাত রয়েছে বলে সুত্র নিশ্চিত করে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে ২ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরব প্রবাসী নাঈম হাওলাদার এর সাথে বিথীর ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা কাবিন মূল‍্যে পারিবারিকভাবে বিবাহ হয়। এরপর নাঈম তার স্ত্রীকে বাবা- মায়ের কাছে রেখে ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট পুনরায় সৌদি আরবে যান। এরপর পরোকিয়া আসক্ত স্ত্রী বিথী ২৮ মার্চ ২০২৫, সকাল ১০ টার দিকে বাবার বাড়ি থেকে খালাতো বোনের বিয়েতে যাবার ছলনা করে তার শাশুড়ির কাছে থাকা সব স্বর্ণের গহনা (৩ ভরি) চেয়ে নেয়। তারপর প্রসাধনী জিনিসপত্র ও কাপড়- চোপড় বড় লাগেজে ভরে তার বাবার বাড়ির উদ্দেশ্যে একাই বেরিয়ে যায়। এরপর স্বামী নাঈম ও তার শশুর-শাশুড়ি একাধিক বার মোবাইলে ফোনে তাকে বাড়ি আসতে বল্লেও সে বিভিন্ন তালবাহানা করে কালক্ষেপণ করতে থাকে। এ বিষয়টি বিথীর বাবা-মাকে একাধিকবার জানালেও তারা কোন পদক্ষেপ নেয়নি।

দীর্ঘদিন পর এক পর্যায়ে বিথী আক্তারের বাবা-মা নাঈমের বাবা-কে মোবাইল ফোনে জানায়, আমার মেয়ে বিথী আর তোমাদের বাড়ি যাবে না এবং তোমার ছেলের সংসারও করবে না। একইভাবে তারা বিথীর স্বামী প্রবাসী নাঈমকে মোবাইলে জানায়, আমার মেয়ে তোমার ঘর করবে না, আমার মেয়ের চিন্তা আর তোমাকে করতে হবে না, সময় মত কাগজ হাতে পেয়ে যাবা ইত্যাদি। তার কিছুদিন পর নাইমের পরিবার জানতে পারে বীথিকে দিয়ে তার বাবা শহীদ ফকির, তার মা ওমেনা বেগম,ভাই তানভীর হোসেন বিল্লাল ও তার ছোট খালু কাউসার মোল্লা বিথির কাছে থাকা নাঈমের ৩ লাখ টাকা ও ৩ ভরি স্বর্নের গহনা। যার বাজার মূল্য ৮ লক্ষাধিক টাকা। এছাড়া লক্ষাধিক টাকার বিভিন্ন জিনিসপত্র আত্মসাৎ করার নেশায় মেতে উঠেছে । তারা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে বিথীকে কু-পরামর্শ দিয়ে স্বামীর বাড়ি থেকে সরিয়ে বাপের বাড়ি আনে। এরপর বিথীকে দিয়ে স্বামী নাঈম হাওলাদার, নাঈমের বাবা মিজান হাওলাদার, ভাই আফিফ হাসান কাউসার ও তার বড় বোন মিতু বেগম এর বিরুদ্ধে ৯ ডিসেম্বর ২০২৫, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার আত্নসাৎ করার উদ্দেশ্য আদালতে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে।

জানা গেছে ঢাকার চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এর কদমতলী থানার আমলী ২০ নম্বর আদালতের ওই মামলা নম্বর-৮৮২/২০২৫। ধারা- যৌতুক নিরোধ আইনের-৩। নাঈম হাওলাদার প্রবাসে অবস্থান কালে মিথ্যা মামলায় আসামি হওয়ায় পুলিশি হয়রানি ও গ্রেফতারের ভয়ে দেশে আসতে সাহস পাচ্ছে না। বিথী ও তার পরিবারের লোকেরা মিথ্যা মামলা দিয়ে মোটা অংকের টাকা আদায়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তারা স্বশরীরে ও মোবাইল ফোনে নাঈম ও তার মা- বাবা,ভাই ও বোনকে একাধিক মামলা দিয়ে জেল খাটাবার হুমকি দিচ্ছে। এমনকি তারা মামলা প্রত্যাহার করতে কাবিনের টাকা সহ ১০ লাখ টাকা আদায়ের পাঁয়তারা করছে। অভিযোগকারী তার অভিযোগে উল্লেখ করেছেন বিথী আক্তার বিভিন্ন পর- পুরুষের সাথে ভয়ানকভাবে পরকীয়া আসক্ত। সে সারাক্ষণ মোবাইল ফোনে বিভিন্ন পর পুরুষের সাথে কুরুচিপূর্ণ আলাপ করে এবং ভিডিও কলে নিজের শারীরিক সৌন্দর্য ও অঙ্গভঙ্গি দেখিয়ে তাদেরকে আকৃষ্ট করে। বিকৃত চরিত্রের এই সুন্দরী তরুণী একাধিক যুবক-কে পরকীয়া প্রেমের ফাঁদে ফেলে সর্বস্ব লুটে নেয়। এসব লুটের অর্থ তার বাবা-মার হাতে তুলে দিয়ে প্রচুর সম্পদ গড়েছে বলে স্বামীর পরিবারের দাবি । ওই লম্পট তরুণী বিভিন্ন নামে এক ডজন এরও বেশি ফেসবুক আইডি ও পেইজ খুলে এসব অনৈতিক কাজে ব্যবহার করে। এর মধ্যে বৈশাখী আক্তার বিথী, বিথী আক্তার, বিথী আক্তার বিথী, মেডিবয় বিথী পেইজ, খাদিজা আইডি ও পেইজ ইত্যাদির নাম জানা গেছে।

অভিযোগে আরো উল্লেখ করেছেন, বিথি বিয়ের পরবর্তী সময় হতে স্বামীর বাড়ির কারো কোন কথা শোনে না। সংসারের কোন কাজকর্মও করতো না। নিজের ইচ্ছামতো বেপর্দায় বেপরোয়াভাবে চলাফেরা করতো। এসব বিষয়ে নাঈমের পরিবারের লোকেরা তার বাবা- মা, ভাই ও ছোট খালুর সাথে কথা বললেও কোন কর্ণপাত করে নাই । বরং তারা আরো উৎসাহ দিয়ে তার জীবন ধ্বংস করেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে মিথ্যা মামলা কারিনী বিথী ও তার বাবা শহীদ ফকিরের মোবাইলে যোগাযোগ করলে তারা প্রতিবেদকের কাছে সব অভিযোগ অস্বীকার করে। অপরদিকে ভুক্তভোগী আফিফ হাসান কাউসার তার অভিযোগে বিথির মামলার আরজির সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও কাল্পনিক কাহিনী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন ওইসব অভিযোগের কোন দালিলিক তথ্য প্রমান নেই। সবই সাজানো নাটকের উপকরণ মাত্র।

এছাড়া এই মিথ্যা মামলাটি আদালতে তুলে দীর্ঘায়িত করে রাষ্ট্রের অর্থ অপচায় ও মূল্যবান সময় নষ্ট না করার আবেদন করেন তিনি। একই সাথে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণসহ মিথ্যা মামলাবাঁজ ও প্রকৃত অপরাধির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান ওই ভুক্তভোগী ও তার পরিবার।




প্রায় ৫ কোটি টাকার সাউন্ড সিস্টেম বিকল, সংসদে হেডফোন কেলেঙ্কারি—গণপূর্তের পাঁচ প্রকৌশলীর গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই দেখা দিয়েছে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিপর্যয়। প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপিত নতুন সাউন্ড সিস্টেম হঠাৎ করেই অচল হয়ে পড়ায় সাময়িকভাবে থমকে যায় সংসদের কার্যক্রম। একই সময়ে সংসদ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হেডফোনের নিম্নমান নিয়েও শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এই ব্যর্থতার দায় কার।

ঘটনার শুরু অধিবেশন চলাকালেই। নতুন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বক্তব্য দিতে শুরু করলে হঠাৎ করেই সংসদের মূল সাউন্ড সিস্টেমে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। মাইকে কথা বললেও তা পরিষ্কারভাবে শোনা যাচ্ছিল না। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত তাকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে বক্তব্য চালিয়ে যেতে হয়। এ সময় স্পিকার অধিবেশন ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি ঘোষণা করেন। বিরতির পর অধিবেশন আবার শুরু হলেও কিছু সময় পর্যন্ত শব্দ বিভ্রাট অব্যাহত ছিল। সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন প্রযুক্তিগত সমস্যাকে অনেকেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।

এদিকে এই ঘটনার আগেই সংসদে সরবরাহ করা হেডফোনের মান নিয়ে সরব হন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মির আহমেদ বিন কাশেম, যিনি ব্যারিস্টার আরমান নামেও পরিচিত। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে একটি কালো রঙের হেডফোনের ছবি পোস্ট করে তিনি অভিযোগ করেন, সংসদে দেওয়া হেডফোনের মান এতটাই নিম্নমানের যে ব্যবহার করতে গিয়ে কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা অনুভূত হয়েছে এবং শব্দের মানও অত্যন্ত খারাপ। তার এই মন্তব্য দ্রুতই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন এই সাউন্ড সিস্টেম কেনার জন্য প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। সাধারণত সংসদের মতো উচ্চ নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে নতুন কোনো প্রযুক্তি চালুর আগে ১০ থেকে ১২ দিন পর্যন্ত নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। কিন্তু এই সিস্টেমের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, সাউন্ড সিস্টেমটি সরবরাহ করেছে আমানত এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যার মালিক দুলাল। ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা নিয়েও অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

সংসদ ভবনের বৈদ্যুতিক ও প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন প্রকৌশলী। তাদের মধ্যে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফুর রহমান এবং উপসহকারী প্রকৌশলী সামসুল ইসলাম রয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, তদারকির ঘাটতি, অযোগ্যতা ও অবহেলার কারণেই নতুন সাউন্ড সিস্টেম প্রথম দিনেই কার্যত ভেঙে পড়েছে।

এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আরও একটি পুরোনো বিতর্কও সামনে এসেছে। জানা গেছে, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক ২০১৮ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে সংসদ ভবনের দায়িত্বে থাকাকালেও অধিবেশন চলাকালে প্রায় ৪৫ মিনিট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার ঘটনা ঘটেছিল। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলেও কেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এর মধ্যেই নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে বিদেশ সফরকে ঘিরে। সংসদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক অবসরের মাত্র কয়েক মাস আগে কারিগরি প্রশিক্ষণের নামে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সফরে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নাজমুল আলমসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তার। এই প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু হচ্ছে HVAC সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ, যা সাধারণত মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন এমন ব্যক্তিরাও এই সফরের তালিকায় রয়েছেন। ফলে অনেকেই এটিকে প্রশিক্ষণের আড়ালে আমলাতান্ত্রিক প্রমোদ ভ্রমণ বলে মন্তব্য করছেন।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এই সফরের ব্যয় বহন করবে ডানহাম–বুশ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, যারা HVAC রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নাজমুল আলম বলেছেন, এই সফরের খরচ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানই বহন করবে এবং এতে সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন দুর্নীতি বিরোধী বিশ্লেষকরা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোম্পানির টাকায় বিদেশ সফরের সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক সমস্যার অংশ, যা স্পষ্ট স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করে এবং সরকারি ক্রয়নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। তার মতে, অনলাইন যুগে প্রযুক্তিগত তথ্য জানার জন্য বিদেশ সফর অপরিহার্য নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এসব সফর ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করে।

এদিকে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই যখন প্রায় পাঁচ কোটি টাকার সাউন্ড সিস্টেম কার্যত অচল হয়ে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই ক্রয় প্রক্রিয়া তদারকি করেছেন কারা এবং কেন যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই এটি চালু করা হলো। এখন দেখার বিষয়, দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, নাকি আগের মতোই সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যাবে।




আউটসোর্সিংয়ের আড়ালে ৩০ কোটি টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ : প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক শাহজামান তুহিনের বিরুদ্ধে গুরুতর প্রশ্ন 

বিশেষ প্রতিবেদকঃ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ কার্যক্রম ঘিরে উঠেছে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে সারা দেশের উপজেলাগুলোতে কৃত্রিম প্রজনন (এআই) টেকনিশিয়ান নিয়োগের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার একটি বাণিজ্যিক পরিকল্পনার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক মো. শাহজামান খান তুহিনের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করছে, নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর আগেই নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পুরো ব্যবস্থাকে সাজিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে, যা সরকারি ক্রয় ও নিয়োগ নীতিমালার পরিপন্থী।

জানা গেছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে আউটসোর্সিং ব্যবস্থায় দেশের প্রতিটি উপজেলায় একজন করে এআই টেকনিশিয়ান নিয়োগের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় মোট ৪৯৫টি পদের অনুমোদন দিয়েছে। এই অনুমোদনের ভিত্তিতে প্রকল্প পরিচালক মো. শাহজামান খান তুহিন জনবল সরবরাহকারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য পত্রিকায় দরপত্র আহ্বান করেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে বাস্তবে মাত্র তিন থেকে চারটি প্রতিষ্ঠানই অংশ নিতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শর্তগুলো পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে আগে থেকেই নির্ধারিত একটি প্রতিষ্ঠান সহজেই কাজটি পেয়ে যায়।

সূত্রগুলো আরও দাবি করছে, পরিচালক শাহজামান খান তুহিন বগুড়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আগেই অনানুষ্ঠানিক সমঝোতায় পৌঁছেছেন। সেই সমঝোতার ভিত্তিতেই কাজটি ওই প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, যে কাজটি করার কথা ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের, সেটির বড় একটি অংশ নিজেই আগেভাগে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক।

এরই অংশ হিসেবে গত ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে দেশের প্রতিটি উপজেলায় চিঠি পাঠিয়ে তিনজন করে অভিজ্ঞ এআই টেকনিশিয়ানের নামের তালিকা পাঠাতে বলা হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা সংগ্রহ করার এই পদক্ষেপ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনেকের মতে, এটি মূলত সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আগাম দরদাম বা সমঝোতার একটি কৌশল হতে পারে।

নিয়ম অনুযায়ী, আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানই পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই এবং প্রার্থী নির্বাচন করে থাকে। এরপর নির্বাচিতদের বায়োডাটা দপ্তরে জমা দেওয়া হয়। কিন্তু এখানে অভিযোগ উঠেছে, এই পুরো প্রক্রিয়াই আগেভাগে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছেন পরিচালক শাহজামান খান তুহিন। অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যে কাজটি ঠিকাদারের করার কথা, সেটি পরিচালক নিজেই হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে করে ফেলছেন। এতে বোঝা যায়, পুরো বিষয়টি আগেই পরিকল্পনা করে সাজানো হয়েছে।”

আরও জানা গেছে, বর্তমানে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে পাঁচ হাজারেরও বেশি প্রশিক্ষিত এআই টেকনিশিয়ান রয়েছেন। স্বাভাবিক নিয়মে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলে এই প্রশিক্ষিত কর্মীরাই আবেদন করতেন এবং সেখান থেকে যোগ্যদের নির্বাচন করা হতো। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে একটি নিয়ন্ত্রিত তালিকা তৈরির চেষ্টা চলছে।

এদিকে অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ নীতিমালা অনুযায়ী, রাজস্ব খাতে সৃষ্ট আউটসোর্সিং পদের নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব মহাপরিচালকের দপ্তরের ওপরই ন্যস্ত থাকে। অতীতেও একই নিয়মে এই ধরনের নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এবার সেই প্রচলিত প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে পুরো বিষয়টি প্রকল্প পরিচালকের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেকের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এই প্রক্রিয়া নিজের হাতে নেওয়া হয়েছে।

অধিদপ্তরের একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, পুরো আউটসোর্সিং প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার একটি বড় আর্থিক লেনদেনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখানে ঠিকাদারও আগে থেকে ঠিক, প্রার্থীদের তালিকাও ঠিক করা হচ্ছে। এখন কেবল কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়ে যাবে।”

এমন পরিস্থিতিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রকল্প পরিচালক শাহজামান খান তুহিনকে অবিলম্বে অন্যত্র বদলি এবং তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে এআই টেকনিশিয়ান নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া পুনরায় মহাপরিচালকের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা উচিত।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—একজন প্রকল্প পরিচালক কীভাবে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এলেন, দরপত্রের শর্ত কেন এমনভাবে নির্ধারণ করা হলো যাতে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে যায়, এবং ঠিকাদার নিয়োগের আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা সংগ্রহের পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী।

এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভেতরে ও বাইরে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—এটি কি সত্যিই একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া, নাকি ৩০ কোটি টাকার একটি সাজানো খেলা?




এলজিইডির সড়ক ও আয়রন ব্রিজ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ, ময়মনসিংহ ও পিরোজপুরে দুদকের অভিযান

বিশেষ প্রতিবেদকঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা Local Government Engineering Department (এলজিইডি) পরিচালিত সড়ক উন্নয়ন ও আয়রন ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পর অভিযান চালিয়েছে Anti-Corruption Commission (দুদক)। অভিযোগের ভিত্তিতে ময়মনসিংহ ও পিরোজপুর জেলায় পৃথকভাবে এনফোর্সমেন্ট টিম পাঠানো হয় এবং সেখানে প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা যাচাই করা হয়।

দুদকের একটি টিম হালুয়াঘাট উপজেলা, ময়মনসিংহ এলাকায় অভিযান চালায়। অভিযোগ ছিল, এলজিইডির সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থ বরাদ্দ নেওয়া হলেও বাস্তবে কাজ ঠিকভাবে করা হয়নি এবং কাজের মানও অত্যন্ত নিম্নমানের। এনফোর্সমেন্ট টিম স্বদেশী ইউনিয়নের মিলনবাজার সংলগ্ন নির্মাণাধীন সড়ক পরিদর্শন করে। সেখানে গিয়ে তারা প্রকল্পের নথিপত্র পরীক্ষা করে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে। অভিযানের সময় সড়কের বিভিন্ন স্থানে মাপজোক করা হয় এবং কয়েকটি জায়গায় রাস্তা খনন করে কাজের মান যাচাই করা হয়। প্রাথমিকভাবে দেখা যায়, কাগজে-কলমে যে পরিমাণ কাজ দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তার সঙ্গে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য থাকতে পারে। বিস্তারিত তদন্তের জন্য প্রকল্প-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি ও তথ্য সংগ্রহ করেছে দুদক।

এদিকে আরেকটি অভিযান চালানো হয় পিরোজপুর জেলায়। অভিযোগ রয়েছে, সদর উপজেলার কদমতলী ইউনিয়নের বাগমারা আবাসন এলাকা এবং ভান্ডারিয়া উপজেলা-এর ৬ নম্বর ওয়ার্ডসহ কয়েকটি স্থানে আয়রন ব্রিজ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হলেও অনেক জায়গায় কাজ পুরোপুরি শেষ করা হয়নি। অথচ প্রকল্পের অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগের পর পিরোজপুরে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় থেকে একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে। সেখানে বিভিন্ন ব্রিজের কাজের অগ্রগতি পরীক্ষা করা হয় এবং প্রকল্প অনুযায়ী বরাদ্দ অর্থের সঙ্গে বাস্তব কাজের মিল রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হয়।

দুদক সূত্র জানায়, ঘটনাস্থল থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও প্রাথমিক যাচাইয়ে অভিযোগের কিছু সত্যতা মিলেছে। ইতোমধ্যে এই বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত মোট আটটি মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে প্রকল্পগুলোর পরিমাপ নেওয়া হয়েছে এবং কোথাও কাজ কম দেখিয়ে বা কাজ না করেই বিল তোলার ঘটনা ঘটেছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম দুটি অভিযানে সংগ্রহ করা নথিপত্র ও তথ্য বিশ্লেষণ করে কমিশনের কাছে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।




ছাত্র হত্যা মামলার আসামি সোহরাওয়ার্দী সরুর বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ, গ্রেফতার না হওয়ায় আতঙ্কে এলাকাবাসী

স্টাফ রিপোর্টার: রাজধানীর নতুনবাজার বারোবিঘা বটগাছিয়া এলাকায় ছাত্র হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সোহরাওয়ার্দী সরুর বিরুদ্ধে জমি দখল ও হামলার অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে জমি দখলের চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোহরাওয়ার্দী সরু আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় বদলে নতুনভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সম্প্রতি ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীদের নিয়ে জোরপূর্বক একটি জমি দখলের চেষ্টা করেন তিনি। এ সময় বিএনপি নেতা বকুলকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকজনকে নিয়ে বাড়িতে হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে এবং মালামাল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে বাধা দেন বাড়ির দারোয়ান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে চর-থাপ্পড় ও লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়।
সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত ওই দারোয়ানকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন।
ভুক্তভোগী ইতি জানান, জমি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আদালতের রায় তাদের পক্ষে থাকলেও সোহরাওয়ার্দী সরু বারবার সন্ত্রাসী নিয়ে এসে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। এতে এলাকায় বসবাসরত ভাড়াটিয়ারা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে ভাটারা থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শাহীন বলেন, অভিযোগটি বিষয়ে আদালতের রায় থাকা সত্বেও এমন ঘটনা আইন বিরোধী আইনের শাসন অব্যহত রাখতে আমরা সর্বদা সচেষ্ট। এবং এ ব্যপারে আদালতের নির্দেশনা পেলে অতিদ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে



‘শূন্য রিটার্ন’ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি, তদন্তে ৯৫৩ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান

এসএম বদরুল আলমঃ দেশে হুইলচেয়ার, কমোড চেয়ার, হাঁটার লাঠি ও বিভিন্ন পোর্টেবল চিকিৎসা সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে সরকার বড় ধরনের শুল্ক ছাড় দেয়। এসব পণ্য জরুরি চিকিৎসা সহায়ক সামগ্রী হওয়ায় আমদানির সময় ব্যবসায়ীদের কোনো শুল্ক বা কর দিতে হয় না। তবে নিয়ম অনুযায়ী, এসব পণ্য দেশে বিক্রি করার সময় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) দিতে হয়। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, অনেক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সেই ভ্যাট না দিয়েই বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠান ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার জন্য ‘শূন্য ভ্যাট রিটার্ন’ বা ‘নিল রিটার্ন’ নামে একটি কৌশল ব্যবহার করছে। অর্থাৎ তারা প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমা দিলেও সেখানে দেখাচ্ছে যে তাদের কোনো ভ্যাটযোগ্য বিক্রি হয়নি। বাস্তবে তারা নিয়মিত পণ্য বিক্রি করলেও কাগজে–কলমে বিক্রির তথ্য গোপন রেখে সরকারের কাছ থেকে ভ্যাট লুকিয়ে রাখছে।

২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের আমদানি ও বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত কর্মকর্তারা এই অনিয়মের বড় চিত্র খুঁজে পেয়েছেন। তাদের অনুসন্ধানে হুইলচেয়ার ও চিকিৎসা সহায়ক সরঞ্জাম আমদানির সঙ্গে জড়িত মোট ৯৫৩টি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই নিয়মিত শূন্য রিটার্ন জমা দিয়েছে, যদিও বাস্তবে তারা বাজারে এসব পণ্য বিক্রি করেছে।

প্রাথমিক তদন্তে ইতোমধ্যে ২১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ভ্যাট ফাঁকির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো গত পাঁচ বছরে মোট ৫৫ কোটি ১৭ লাখ টাকার বেশি ভ্যাট পরিশোধ করেনি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই টাকার ওপর সুদ ও জরিমানা যোগ হলে প্রকৃত অঙ্ক কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে এবং তা শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ট্রেড ভিশন লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৭ কোটি ৮১ লাখ ৭৮ হাজার ১৯৬ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এরপর রয়েছে ইউনিমিড লিমিটেড, যাদের বিরুদ্ধে ১৪ কোটি ৪৮ লাখ ৮৭ হাজার ৬১৮ টাকা ভ্যাট না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাজ ট্রেডার্স প্রাইভেট লিমিটেড প্রায় ৫ কোটি ১৯ লাখ ৫৩ হাজার ৮২২ টাকা, এসএস এন্টারপ্রাইজ প্রায় ৩ কোটি ৭৩ লাখ ৩০ হাজার ৬৪২ টাকা এবং মেডিকিট ইন্টারন্যাশনাল প্রায় ২ কোটি ৭২ লাখ ২৬ হাজার ৩০৯ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বলে তদন্তে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া রুশদা এন্টারপ্রাইজ প্রায় ১ কোটি ৬৮ লাখ ৭৭ হাজার ৪৪১ টাকা এবং ইউনাইটেড সার্জিক্যাল লিমিটেড প্রায় ১ কোটি ৫৪ লাখ ৯৫ হাজার ৬২৭ টাকার ভ্যাট পরিশোধ করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। একই তালিকায় আরও রয়েছে বিপরা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল (৮১ লাখ ৭৬ হাজার ৮০২ টাকা), ইউরো মিলেনিয়াম ট্রেডিং (৯৪ লাখ ৫ হাজার ৩৬৩ টাকা), দেশ মিডিকা (৯১ লাখ ১১ হাজার ৬৪৯ টাকা), ইয়ামিন টেক ইন্টারন্যাশনাল (৮৩ লাখ ৫২ হাজার ৬৪৩ টাকা), মেহেদী সার্জিক্যাল স্টোর (৫৮ লাখ ২৭ হাজার ৮৬১ টাকা), সুপার হেলথ কেয়ার (৫৬ লাখ ২৯ হাজার ৫৯৭ টাকা), স্ট্যান্ডার্ড মেডিকেল সিস্টেম (৫৬ লাখ ৯৮ হাজার ৪৬৫ টাকা) এবং ম্যাক্সটন এলাইন্স (৫৩ লাখ ৮ হাজার ৫০১ টাকা)।

তালিকায় থাকা আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও উল্লেখযোগ্য ভ্যাট ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে মেসার্স ট্রেড ফেয়ার, সাজ্জাদ ইনট্রাস্ট ট্রেড, নুসাইবা ট্রেডিং, বায়োটেক সার্ভিসেস, মেডিকম এবং মন্ডল সার্জিক্যাল অ্যান্ড ট্রেডিং। এসব প্রতিষ্ঠান কয়েক লাখ থেকে কয়েক দশ লাখ টাকা পর্যন্ত ভ্যাট পরিশোধ না করে বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে গেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, দেশে ব্যবহৃত অধিকাংশ হুইলচেয়ার, হাঁটার লাঠি ও পোর্টেবল কমোড চেয়ার বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এসব পণ্য আমদানিকারকরা পরে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বাজারে বিক্রি করেন। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান বিক্রির প্রকৃত তথ্য গোপন করে ভ্যাট রিটার্নে শূন্য দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।

ইতোমধ্যে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের কাছ থেকে বকেয়া ভ্যাট আদায়ের জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে জনবল সংকট ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে বাকি ৯৩২টি প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত তদন্ত এখনো সম্পূর্ণ করা যায়নি। এজন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১২টি ভ্যাট কমিশনারেটকে এসব প্রতিষ্ঠানের হিসাবপত্র যাচাই করে ভ্যাট ফাঁকির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ এবং বকেয়া রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, সব প্রতিষ্ঠানের হিসাব যাচাই শেষ হলে এই খাতে মোট ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ প্রায় এক হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। যদি গুরুতর অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন বা বিআইএন স্থগিত কিংবা বাতিল করা হতে পারে। পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও করা হতে পারে, যেখানে কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

ভ্যাট আইন অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি ভ্যাট ফাঁকি দেয়, তাহলে প্রথমে সেই বকেয়া কর আদায় করা হয়। এরপর অতিরিক্ত জরিমানা আরোপ করা হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে ফাঁকি দেওয়া টাকার সমপরিমাণ বা তারও বেশি হতে পারে। এছাড়া ওই টাকার ওপর সুদও যোগ করা হয়। গুরুতর অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ করা, নথিপত্র জব্দ করা বা আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানার শাস্তিও দেওয়া হতে পারে।

তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, ‘শূন্য ভ্যাট রিটার্ন’ দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার এই কৌশল দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল। সাম্প্রতিক তদন্তে বিষয়টি বড় আকারে সামনে এসেছে এবং ধীরে ধীরে আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম প্রকাশ পেতে পারে।




লালমনিরহাটে সিলিন্ডারবাহী ট্রাকে পুলিশের হানা, বিপুল গাঁজাসহ আটক ০২

জহুরুল হক জনি, লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি: লালমনিরহাট জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র মিশনমোড়ে পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগের এক যৌথ ঝটিকা অভিযানে বিপুল পরিমাণ গাঁজাসহ একটি গ্যাস সিলিন্ডারবাহী ট্রাক জব্দ করা হয়েছে। এ সময় ট্রাকের চালক ও সহকারীকে আটক করেছে পুলিশ।

সোমবার (৯ মার্চ) বিকেল ৫টার দিকে শহরের ব্যস্ততম মিশনমোড় গোলচত্বর এলাকায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। মাদক পরিবহনের অভিযোগে ট্রাকের চালক ও সহকারীকে হাতেনাতে আটক করা হয়

আটককৃতরা হলেন সদর উপজেলার ফুলগাছ এলাকার আব্দুল কুদ্দুছের ছেলে ট্রাক চালক মোঃ রাকু মিয়া (৩০) এবং দুরাকুটি এলাকার মৃত মনছুর আলীর ছেলে সহকারী মোঃ লুৎফর মিয়া (২৮)।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায় যে জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে একটি গ্যাস সিলিন্ডারবাহী ট্রাকে করে মাদকের বড় একটি চালান পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে সদর থানা পুলিশ ও স্থানীয় ট্রাফিক সার্জেন্ট রাহুল চক্রবর্তীর নেতৃত্বে মিশনমোড় গোলচত্বরে বিশেষ চেকপোস্ট বসানো হয়।

বিকেল ৫টার দিকে নির্দিষ্ট ট্রাকটি (গ্যাস সিলিন্ডার বোঝাই) ওই এলাকা অতিক্রম করার সময় পুলিশ সেটিকে থামানোর সংকেত দেয়। পরে ট্রাকটির কেবিনে তল্লাশি চালিয়ে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা বিপুল পরিমাণ গাঁজা উদ্ধার করা হয়।

এদিকে এই ঘটনার পর ট্রাকের মালিক শাহ আলমকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এক সময়ের সাধারণ রিকশাচালক শাহ আলম কীভাবে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ছোট-বড় ১৫ থেকে ২০টি ট্রাকের মালিক হলেন, তা রহস্যজনক।

সাধারণ মানুষের প্রশ্ন?এই বিপুল সম্পদের পেছনে কি মাদক ব্যবসার কোনো যোগসূত্র রয়েছে? এলাকাবাসী বিষয়টি তদন্ত করে শাহ আলমের আয়ের প্রকৃত উৎস খতিয়ে দেখার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।

অভিযান প্রসঙ্গে লালমনিরহাট সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল মতিন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ট্রাকের কেবিন থেকে গাঁজার প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে মাদকের সঠিক পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য ওজন করার কাজ চলছে।

আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলার প্রস্তুতি চলছে। তিনি আরও জানান, মাদকের গডফাদার বা পর্দার আড়ালের হোতাদের খুঁজে বের করতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে।




“নিম্নমানের ওষুধ ছড়াচ্ছে এলবিয়ন, লেবেলে এক দাম, বাজারে আরেক— ‘ছায়া সুরক্ষা’ অভিযোগ DGDA কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে”

# মানবহির্ভূত অ্যান্টিবায়োটিক # পানিতে না গলা ট্যাবলেট, # আন্ডাররেটে বাজার—প্রশ্নের মুখে ঔষধ প্রশাসন # DGDA-র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ # চট্টগ্রামে বিতর্কিত কয়েক কোম্পানিকে ‘ছায়া সুরক্ষা’ #

এসএম বদরুল আলমঃ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের রহমতনগরে অবস্থিত এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড আবারও নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল, নিম্নমানের এবং মানবহির্ভূত ঔষধ উৎপাদন ও আন্ডাররেটে বাজারজাত করার গুরুতর অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA)-এর ভূমিকা নিয়েও।

অভিযোগ রয়েছে, ঔষধ প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, মূল্য নির্ধারণ কমিটি এবং ব্ল্যাকলিস্ট অনুমোদন কমিটির প্রভাবশালী সদস্যদের সঙ্গে অবৈধ সমঝোতার মাধ্যমে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ বছরের পর বছর বাজারে নিম্নমানের ওষুধ ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে দেশের জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন লাইসেন্স নম্বর জৈব-১০৯ ও অজৈব-১৯১।

নিষিদ্ধ ডিসপ্রিনের ‘ছদ্মবেশ’—এলবিয়নের ‘এসপ্রিন’ : অভিযোগ অনুযায়ী, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত মাথাব্যথার ট্যাবলেট ডিসপ্রিনের আদলে এলবিয়ন ‘এসপ্রিন’ নামে একটি ট্যাবলেট বাজারে দাপিয়ে বিক্রি করছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, অন্য কোনো কোম্পানি যখন নিষিদ্ধ এই ধরনের ওষুধ উৎপাদন করছে না, তখন এলবিয়নের ‘এসপ্রিন’ এককভাবে পাইকারি ও খুচরা বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি—
ডিসপ্রিনের মতো পানিতে দ্রবীভূত হওয়ার কথা থাকলেও এলবিয়নের এসপ্রিন ট্যাবলেট পানিতে ঠিকভাবে গলে না, যা ওষুধটির মান নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।

লেবেলে এক দাম, বাজারে আরেক ! অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এলবিয়নের উৎপাদিত বহু ওষুধের লেবেলে মুদ্রিত দাম এবং পাইকারি বাজারে বিক্রির দামের মধ্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য রয়েছে। নিম্নে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো—

ডমপ (ডমপেরিডোন ১০ মি.গ্রা) এমএ নং: ০৯৬-৯৩-০১৪, লেবেল মূল্য: ২০০ টাকা বাজারে বিক্রি: মাত্র ৬৫ টাকা, প্যানটোপ্রাজল-২০

এমএ নং: ০৯৫-১২৯-০৬৭, লেবেল মূল্য: ২১০ টাকা, বাজারে বিক্রি: ৭০ টাকা

ডাইক্লোফেনাক এসআর (১০০ মি.গ্রা) এমএ নং: ০৯৬-১১০-০৬৪, লেবেল মূল্য: ৩০০ টাকা, বাজারে বিক্রি: ৯০ টাকা

সেটিরিজিন ১০ মি.গ্রা, লেবেল মূল্য: ২৫০ টাকা, বাজারে বিক্রি: ৭০ টাকা

ডেসলোরাটাডিন ৫ মি.গ্রা, লেবেল মূল্য: ৪০০ টাকা, বাজারে বিক্রি: ৯৫ টাকা

ডেক্সামেথাসন ০.৫ মি.গ্রা, লেবেল মূল্য: ২০০ টাকা, বাজারে বিক্রি: ৬৫ টাকা

ক্যালসিয়াম-ডি, লেবেল মূল্য: ৩৬০ টাকা, বাজারে বিক্রি: ৯৫ টাকা

লটিল-২০ (ওমেপ্রাজল), লেবেল মূল্য: ৪০০ টাকা, বাজারে বিক্রি: ১০০–১১০ টাকা

লটিল-৪০, লেবেল মূল্য: ২৪০ টাকা, বাজারে বিক্রি: ৯০ টাকা,           

নাইট্রাম (নাইট্রাজেপাম ৫ মি.গ্রা), লেবেল মূল্য: ১০০ টাকা, বাজারে বিক্রি: ৩০ টাকা

টলসিড (টনফেনামিক এসিড), লেবেল মূল্য: ২৪০ টাকা,বাজারে বিক্রি: ১১০–১২০ টাকা

ন্যাপ্রোক্সেন প্লাস-৫০০, লেবেল মূল্য: ৩৬০ টাকা, বাজারে বিক্রি: ১৪০–১৫০ টাকা।     

অভিযোগকারীরা জানান, এসব ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকার হাজী রানী মেডিসিন মার্কেটের পাইকারি দোকান থেকে।     

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন— এত কম দামে ওষুধ বাজারজাত হওয়া মানেই উৎপাদন প্রক্রিয়া, কাঁচামাল অথবা মান নিয়ন্ত্রণে গুরুতর সমস্যা রয়েছে।

ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবের ভয়ংকর প্রতিবেদন : ২০১৭ সালের ২৭ অক্টোবর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির বিস্ময়কর তথ্য। চট্টগ্রামের এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজের তৈরি মিমক্স ৫০০ মি.গ্রা ক্যাপসুলে অ্যামোক্সিসিলিন একটুও পাওয়া যায়নি। (ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সাবেক) সরকারি বিশ্লেষক ডা. মো. হারুন-অর-রশীদ (বর্তমানে অবসরে আছেন) তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন— পরীক্ষিত নমুনায় অ্যামোক্সিসিলিন শনাক্ত হয়নি। ফলে এটি মানবহির্ভূত। শুধু তাই নয়, ইনডোমেথাসিন ক্যাপসুলেও ঘোষিত মাত্রার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি।

একই ভবনে পশু ও মানুষের ওষুধ !

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়,
এলবিয়নের কারখানায় পশু ও মানুষের ওষুধ একই ভবনে উৎপাদনের অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার GMP (Good Manufacturing Practice) নীতিমালা অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

আগেও সিলগালা হয়েছিল কারখানা : মানবহির্ভূত ওষুধ তৈরির অভিযোগে একসময় চট্টগ্রামের চাঁদগাঁও এলাকায় এলবিয়নের কারখানা ভ্রাম্যমাণ আদালত সিলগালা করে। পরে সংশ্লিষ্ট দফতরের অনুমতি নিয়ে সীতাকুণ্ডে নতুন কারখানা স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটি।

২০০৮ ও ২০০৯ সালেও উৎপাদন স্থগিত : ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী— ২০০৮ সালে এলবিয়নের উৎপাদিত ডাইক্লোফেনাক টি-আর, ডক্সিসাইক্লিন, গ্লাইসোফুলভিন এবং আইবুপ্রোফেন, এই চারটি ওষুধের উৎপাদন, মজুদ ও বাজারজাত স্থগিত করা হয়। ২০০৯ সালে আবারও পলিভিট সিরাপ (ভিটামিন বি কমপ্লেক্স) ভেজাল প্রমাণিত হওয়ায় সেটিও স্থগিত করা হয়।

প্রশ্নের মুখে ঔষধ প্রশাসন :
একাধিক গুরুতর অভিযোগ, মানবহির্ভূত অ্যান্টিবায়োটিক, GMP লঙ্ঘন, কারখানা সিলগালা—সব ঘটনার পরও এলবিয়ন কীভাবে বছরের পর বছর উৎপাদন ও বিপণন চালিয়ে যাচ্ছে—এ প্রশ্ন এখন স্বাস্থ্যখাতে বড় আলোচনার বিষয়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
“ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর যদি সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা নিত, তাহলে নিম্নমানের ওষুধ বাজারে ছড়াত না।”

দুর্নীতির অভিযোগ :

অভিযোগ রয়েছে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা অবৈধ সুবিধা নিয়ে এলবিয়নসহ চট্টগ্রামের কয়েকটি বিতর্কিত কোম্পানিকে ‘ছায়া সুরক্ষা’ দিচ্ছেন। ফলে, নিম্নমানের ওষুধ, মানবহির্ভূত অ্যান্টিবায়োটিক, সন্দেহজনক উৎপাদন, সবকিছু চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকি :
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন— নিম্নমানের ওষুধ ব্যবহারের ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জীবনও ঝুঁকিতে পড়ে। তাদের মতে—“এলবিয়নের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর নজরদারির আওতায় না আনলে দেশের জনস্বাস্থ্য বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।”




অগাস্টিন পিউরিফিকেশন কেলেঙ্কারি : দুদকের অভিযোগ, তদন্ত ঘুরল অন্য খাতে—অভিযুক্তদের বদলে অভিযোগকারীই কি লক্ষ্যবস্তু?

# দুদকে অভিযোগ # সমবায়ে তদন্ত # কিন্তু অভিযুক্তদের বদলে অভিযোগকারীই যেন তদন্তের মুখে # পুনঃতদন্ত চেয়ে নতুন আবেদন # উঠছে গুরুতর প্রশ্ন ?

এসএম বদরুল আলমঃ চট্টগ্রামের আলোচিত প্রতিষ্ঠান অগাস্টিন পিউরিফিকেশনকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ উঠেছে—দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল করা গুরুতর অভিযোগের যথাযথ তদন্ত না করে বরং তা ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্যদিকে। এমনকি অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, প্রকৃত তদন্তের বদলে এমন এক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে যেখানে অভিযুক্তদের বদলে অভিযোগকারীই হয়ে উঠছেন তদন্তের লক্ষ্যবস্তু। এ ঘটনায় নতুন করে পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়ে সমবায় অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ে আবেদন করেছেন অমূল্য লরেন্স পেরেরা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে অগাস্টিন পিউরিফিকেশনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আসছেন।

দুদকের অভিযোগ, কিন্তু তদন্তে সমবায় অফিস ! অমূল্য লরেন্স পেরেরার অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি অগাস্টিন পিউরিফিকেশন–এর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সরাসরি দুদকে দাখিল করেছিলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রহস্যজনকভাবে সমবায় অধিদপ্তর থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে একটি পত্র জারি করা হয়, যেখানে দুদকের নির্দেশনার উল্লেখ থাকলেও তদন্তের ধরন ও লক্ষ্য নিয়ে দেখা দেয় বড় ধরনের প্রশ্ন।

অভিযোগকারী বলছেন—
তদন্তের নামে মূল অভিযোগের পরিবর্তে দি মেট্রোপলিটন খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেড–কে কেন্দ্র করে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যা মূল অভিযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।

অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে তদন্ত আয়োজন? অমূল্য লরেন্স পেরেরার দাবি, সমবায় অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা—বিশেষ করে বিভাগীয় সমবায় কার্যালয় ঢাকার উপ-নিবন্ধক (বিচার) মো. মিজানুর রহমান, যিনি যাচাই দলের দলনেতা—তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে এমন আচরণ করেছেন, যাতে মনে হচ্ছে তদন্তটি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নয়, বরং অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেই পরিচালিত হচ্ছে।

তার অভিযোগ, দুদকের নির্দেশনার প্রকৃত কপি বা অনুমোদনের তথ্য তাকে কখনো দেখানো হয়নি। অথচ তার অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

কোথায় সেই দুদকের নির্দেশনা?
অভিযোগকারী জানতে চেয়েছেন—
দুদক ঠিক কোন তারিখে ও কোন স্মারকে অগাস্টিন পিউরিফিকেশনের বিরুদ্ধে তদন্তের অনুমোদন দিয়েছে? সেই নির্দেশনা কেন অভিযোগকারীকে জানানো হয়নি? কেন দুদককে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পেয়ে তিনি সমবায় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও নিবন্ধকের কাছে পুনঃতদন্তের আবেদন করেছেন।

তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ থাকার দাবি: অভিযোগকারীর দাবি,
তার অভিযোগ শুধু মৌখিক নয়—বরং দি মেট্রোপলিটন খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেড–এর বার্ষিক অডিট প্রতিবেদনে একাধিক অনিয়মের লিখিত প্রমাণ রয়েছে।
তিনি বলেছেন, বিভিন্ন বছরের অডিট রিপোর্টে অনিয়মের তথ্য উল্লেখ আছে, সেইসব প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট স্বারক, তারিখ ও পৃষ্ঠাসংখ্যা সংযুক্ত করা হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে দেশের অন্তত অর্ধশতাধিক সংবাদপত্রে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। আদালতে হাজিরা দিতে না পারার ঘটনাও বিতর্কে গত ৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে উচ্চ আদালতে মামলার কারণে তিনি তদন্ত সংক্রান্ত একটি শুনানিতে উপস্থিত থাকতে পারেননি বলে জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, বিষয়টি আগেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের—মো. শাকিলুজ্জামান ও আমিনুল—অবহিত করেছিলেন। কিন্তু তারপরও বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে।

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে অনুলিপি :
অমূল্য লরেন্স পেরেরা তার আবেদনপত্রের অনুলিপি পাঠিয়েছেন— প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সমবায় অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়।

প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে
ঘটনাটি নিয়ে প্রশাসনিক মহলে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন— দুদকের অভিযোগ থাকলে তদন্ত অন্য খাতে ঘুরল কেন? তদন্তে স্বচ্ছতা না থাকলে কি আসল সত্য চাপা পড়ছে? আর অভিযোগকারীকেই যদি তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করবে কে?

অনুসন্ধান দাবি বিশেষজ্ঞদের
দুর্নীতি ও সমবায় খাতের বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া সত্য উদঘাটন সম্ভব নয়। তাদের মতে, “যদি সত্যিই অডিট রিপোর্টে অনিয়মের প্রমাণ থাকে, তাহলে সেটি দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত। আর তদন্ত প্রক্রিয়াই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট হয়।”
এই বিষয়ে সমবায় অধিদপ্তর, তদন্ত দলের সদস্য এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।




যমুনা অয়েলে দ্বৈত নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার: বরখাস্ত মিল্টন, ধরাছোঁয়ার বাইরে জিএম এইচআর মাসুদুল ইসলাম

এসএম বদরুল আলমঃ ৪ মার্চ “যমুনা অয়েলে দ্বৈতনীতির বিস্ফোরক অভিযোগ, ডাকাতি মামলার আসামিকে বাঁচাতে তৎপর জিএম এইচআর ও ডিপো ইনচার্জ” শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই নড়েচড়ে বসে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ। প্রতিবেদনের ঠিক পরদিন, অর্থাৎ ৫ মার্চ তড়িঘড়ি করে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা হিসেবে আলোচিত কর্মচারী অফিস সহকারী হোসাইন মো. ইসহাক মিল্টনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। মানব সম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. মাসুদুল ইসলাম এবং বাঘাবাড়ি ডিপো ইনচার্জ আবুল ফজল মো. সাদেকিনের সমন্বয়ে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। ইসহাক মিল্টন দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক কর্মচারী হওয়ায় “নো ওয়ার্ক নো পে” নীতির আওতায় মৌখিক নির্দেশেই তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানা যায়।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, এক মাস সতের দিন জেল হাজতে থাকার পরও কীভাবে ওই কর্মচারী আবার স্বাভাবিকভাবে চাকরিতে যোগদান করতে পারলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই পুরো ঘটনায় মানব সম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক এবং সংশ্লিষ্ট ডিপো ইনচার্জের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি, এমনকি কোনো ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। যমুনা অয়েলের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, প্রতিষ্ঠানটিতে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়; অতীতেও জেল হাজতে থাকা কর্মচারীর নামে ছুটির আবেদন গ্রহণ ও তা মঞ্জুর করার নজির রয়েছে, যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বর্তমান জিএম এইচআর মাসুদুল ইসলাম।

২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের মানব সম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. মাসুদুল ইসলাম। এরপর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কার্যক্রমে তার প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। মার্কেটিং কিংবা হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে কোনো ডিগ্রি না থাকা সত্ত্বেও তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষাগত যোগ্যতায় বিকম তৃতীয় শ্রেণি এবং কেবলমাত্র চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সির কোর্স সম্পন্ন করলেও তিনি বর্তমানে একসঙ্গে মহাব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ), মহাব্যবস্থাপক (বিপণন), কোম্পানি সচিব, বিটুমিন সরবরাহ কমিটির দায়িত্ব এবং অর্থ বিনিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এমনকি কিছুদিন তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রুটিন দায়িত্বও পালন করেছেন।

যমুনা অয়েলের প্রধান কার্যালয়ে তার জন্য পৃথক তিনটি চেম্বার রয়েছে এবং কর্মকর্তাদের চেম্বার বণ্টনের দায়িত্বও তার হাতেই। অভিযোগ রয়েছে, সদ্য বিদায়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরুত-ই-ইলাহির আশীর্বাদেই প্রতিষ্ঠানে নিজের ক্ষমতার ভিত্তি মজবুত করেন তিনি। পরবর্তীতে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আমির মাসুদ দায়িত্ব গ্রহণের পরও তার ক্ষমতায় কোনো পরিবর্তন আসেনি।

এদিকে ২০১৬ সালে যমুনা অয়েলের একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের প্রমাণ পায় এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর তিনি আবারও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রুটিন দায়িত্ব পান এবং ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি প্রতিষ্ঠানটির বিতর্কিত কর্মকর্তা শেখ জাহিদ আহমেদকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং বদলির ক্ষেত্রেও মাসুদুল ইসলামের একক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ডিজিএম (এইচআর) মোহাম্মদ হাসান ইমামের স্বাক্ষরে তিন সিবিএ নেতাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পাশাপাশি একাধিক তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু এতদিন তাদের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ ছিল মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

বরখাস্ত হওয়া সিবিএ নেতা আবুল হোসেন, যিনি যমুনা অয়েল লেবার ইউনিয়নের সভাপতি এবং নিষিদ্ধ সংগঠন জাতীয় শ্রমিকলীগ বন্দর থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক। তার বরাবর পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয় যে, ২১ জুলাই থেকে ৯ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত তিনি বিশেষাধিকার ছুটি ভোগ করেছেন এবং পরে অনুপস্থিত ছিলেন। অথচ তথ্য অনুযায়ী, কোতোয়ালী থানার জি আর মামলা নম্বর ৪১৫/২০২৫–এ তাকে ২১ জুলাই গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে অপর সিবিএ নেতা এয়াকুবের ক্ষেত্রেও।

এখানেই প্রশ্ন উঠেছে—যেদিন তারা গ্রেফতার হলেন, সেদিন থেকেই কীভাবে তাদের ছুটি মঞ্জুর হলো। পুলিশ হেফাজতে থেকে তারা কীভাবে ছুটির আবেদন করলেন—তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মাসুদুল ইসলাম নিজেই তাদের স্বাক্ষর জাল করে ছুটির আবেদন তৈরি করেন এবং পরে নিজেই তা অনুমোদন দেন।

এদিকে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও বিতর্কিত কর্মচারীদের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট তার স্বাক্ষরে প্রকাশিত পদোন্নতির তালিকায় কুতুবউদ্দিন হোসেনসহ কয়েকজন বিতর্কিত কর্মচারী পদোন্নতি পান। কুতুবউদ্দিন নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র আজম নাসিরের আত্মীয় বলে জানা গেছে। এছাড়া সহীদুল আলম, শেখ কামাল, ইকরাম ও মীর আরিফসহ ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মচারীকেও পদোন্নতি দেওয়া হয়।

ফতুল্লা ডিপোতে প্রায় পৌনে চার লাখ লিটার ডিজেল গায়েব হওয়ার ঘটনায় একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অভিযোগকারীরাই শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়েন। ফতুল্লা ডিপোর অফিসার (অপারেশন) ইমরান হোসেন তেল চুরির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার পর তাকে ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর ঢাকা বিভাগীয় বিক্রয় অফিসে বদলি করা হয়।

এর আগে ২০২০ সালে মংলা অয়েল ইনস্টলেশন ডিপোতে প্রায় ২৯ হাজার ৯২৫ লিটার তেলের অস্বাভাবিক ক্ষতির ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ঘটনার কোনো সুরাহা হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ভালো পোস্টিং দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুধু প্রশাসনিক নয়, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিলের অর্থ শেয়ারবাজারে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিনিয়োগ করে প্রায় চার কোটি ১৫ লাখ টাকার ক্ষতির ঘটনায় ২০১৬ সালে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও তা কার্যকর হয়নি।

১৯৯৬ সালের ১৪ অক্টোবর যমুনা অয়েলে চাকরি শুরু করা মাসুদুল ইসলাম চাকরি জীবনে একাধিকবার গাড়ি কেনার ঋণ নিয়েছেন। এমনকি ২০ লাখ টাকার গাড়ি ঋণ নিয়ে গাড়ি না কিনে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার অভিযোগও ওঠে। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে তিনি সেই অর্থ ফেরত দেন।

বর্তমানে চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকায় তার একটি ফ্ল্যাট, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বাকলিয়া আবাসিক প্রকল্পে দুটি প্লট, একটি ডেইরি ফার্ম এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিনিয়োগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। দীর্ঘ চাকরি জীবনে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ায় তার সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।