দুদক চিহ্নিত করলো সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম, বিদ্যুৎ, জলবায়ু ও স্বাস্থ্যখাতে তদারকি বাড়ানো হচ্ছে

এসএম বদরুল আলমঃ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি খাতগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর মিলেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই তিন খাতে একাধিক অভিযান পরিচালনা করেছে, যার মধ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন প্রকল্প এবং স্বাস্থ্যসেবা খাত অন্তর্ভুক্ত। কমিশন বলেছে, এ ধরনের উদ্যোগ জনসাধারণের স্বার্থে জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং দুর্নীতি রোধে গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের আগ্রাবাদ ও হালিশহর অফিসে দুদক অভিযান চালিয়েছে। এ সময় তারা বিভিন্ন টেন্ডার ও কার্যাদেশের রেকর্ড পরীক্ষা করেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর টার্নওভার, ক্রেডিট লাইন, কাজের অভিজ্ঞতা, কোয়ালিটি কন্ট্রোল সনদ, ম্যানুফ্যাকচারার অথরাইজেশন লেটার এবং ই‑জিপি কালো তালিকাভুক্তির তথ্য যাচাই করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে সম্ভাব্য অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে।

ঢাকায় ঢাকা-মহাখালীতে অবস্থিত বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটি)-র কার্যালয়েও দুদকের একটি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৮৯টি প্রকল্পের মধ্যে মোট ২,১১০ কোটি টাকার প্রায় অর্ধেক অংশে অনিয়মের ছাপ রয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে কিছু প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং দায়িত্বশীলতার অভাবও দেখা গেছে।

স্বাস্থ্যখাতে, যশোর জেলার মনিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুদক অভিযান চালিয়েছে। তারা ছদ্মবেশে হাসপাতালের সেবা ও সরবরাহ ব্যবস্থার তথ্য সংগ্রহ করেছে। অভিযানে দেখা গেছে, অ্যাম্বুলেন্স চালক অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন, হাসপাতালের খাবারের মান ও পরিমাণে অসঙ্গতি রয়েছে, এবং স্যালাইন ও ওষুধ সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। হাসপাতালের কর্মকর্তা ও রোগীদের সঙ্গে আলাপের পর এই অভিযোগগুলো নিশ্চিত করা হয়েছে।

দুদক জানিয়েছে, অভিযানে পাওয়া তথ্য ও নথির ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে। কমিশন আশা করছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারি সেবা আরও স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল হবে।




স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে অভিযোগ: পোল্ট্রির জন্য হার্বাল ওষুধের ডোজ কমিয়ে অবৈধ রিপ্যাকিং, স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা

এসএম বদরুল আলমঃ দেশের শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড-এর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোম্পানিটি সুইজারল্যান্ডভিত্তিক লাইফ সার্কেল নিউট্রিশন কোম্পানির তৈরি হার্বাল কক্সিডিউস্ট্যাট “হার্ব-অল-কক্স” পণ্যের ডোজ কমিয়ে এবং অবৈধভাবে রিপ্যাকিং করে বাজারজাত করেছে।

পোল্ট্রি খামারগুলো দাবি করেছে, তারা গত চার বছর ধরে এই পণ্য ব্যবহার করছে। কিন্তু অভিযোগে বলা হয়েছে, ডোজ কমানোর কারণে খামারে পাখির রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং উৎপাদনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। খামার মালিকদের বক্তব্যে বলা হয়েছে, এ ধরনের প্রতারণা অব্যাহত থাকলে অ্যান্টিবায়োটিক-রহিত ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য উৎপাদনের উদ্যোগ বিপন্ন হবে এবং পোল্ট্রি মাংসের মাধ্যমে ক্ষতিকর উপাদান মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডোজ কমানো বা ভেজাল উপাদান ব্যবহারের ফলে প্রাণীর শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং ব্যাকটেরিয়া ধীরে ধীরে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী হয়ে ওঠে, যা মানুষের খাদ্যচক্র ও স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক।

এই ঘটনায় আগামী ১৫ নভেম্বর ২০২৫ সকাল ১১টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগের প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হবে।

স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস বাংলাদেশের অন্যতম বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। এর পণ্য দেশ-বিদেশে সমান জনপ্রিয় হলেও সাম্প্রতিক সময়ে কোম্পানিটির ওষুধের মান, প্যাকেজিং ও আমদানির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় এই অভিযোগ প্রকাশ পেয়েছে।




ঢাকা ওয়াসায় ‘পছন্দের’ এমডি বসাতে নতুন নাটক: আব্দুস সালামকে নিয়োগে শর্ত বদল, সাক্ষাৎকারও বাদ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ঢাকা ওয়াসার নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ নিয়ে আবারও শুরু হয়েছে বিতর্ক। সংস্থার বর্তমান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুস সালাম ব্যাপারীকে এই পদে বসানোর জন্য নানাভাবে প্রক্রিয়া বদলে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে— তাঁর যোগ্যতা নিশ্চিত করতে একাধিকবার নিয়োগের শর্ত পরিবর্তন করা হয়েছে, এমনকি তাঁকে দ্রুত পদোন্নতিও দেওয়া হয়েছে।

ওয়াসার সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট বলা ছিল, যোগ্য প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। কিন্তু সেটি মানা হয়নি। ৩৭ জন আবেদনকারী থাকার পরও কাউকে ডাকা হয়নি। বরং সরাসরি তিনজনের তালিকা তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, যেখানে প্রথমেই রাখা হয়েছে আব্দুস সালামের নাম। এরপর সেই তালিকাই প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

তবে মন্ত্রণালয় বা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ নিয়ে মুখ খুলছেন না। স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আখতার জাহান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মীর আবদুস শহিদ এবং ওয়াসার সচিব মশিউর রহমান খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

ওয়াসার ভেতরের অনেক কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়াকে ‘পছন্দের লোক বসানোর খেলা’ বলছেন। তাঁদের অভিযোগ, আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে অতীতে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, যার কারণে তাকসিম এ খানের সময়ে তাঁকে প্রায় চার বছর সংযুক্ত অবস্থায় (ওএসডি’র মতো) বসিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে বিগত সরকারের পতনের পর তিনি নিজেকে ‘বঞ্চিত কর্মকর্তা’ দাবি করে প্রভাব খাটিয়ে নিজের বিরুদ্ধে থাকা বিভাগীয় মামলা প্রত্যাহার করান।

তবে আব্দুস সালাম নিজেকে সবচেয়ে যোগ্য দাবি করে বলেন, “ঢাকা ওয়াসার প্রকৌশল কাজে আমার মতো অভিজ্ঞ কেউ নেই। অন্য কেউ এ দায়িত্ব নিলে কাজ চালানোই কঠিন হবে।”

ঢাকা ওয়াসায় বর্তমানে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চলমান, যেখানে এমডি ও প্রকল্প পরিচালকের পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ নতুন নয়।

তাকসিম এ খানের দীর্ঘ ১৫ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর (২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত) ওয়াসায় আর স্থায়ী এমডি নিয়োগ হয়নি। তিনি দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থ অপচয়ের অভিযোগে বিতর্কিত হয়ে গত বছর সরকারের পতনের পর পদত্যাগ করেন। তাঁর পর থেকে তিনজন কর্মকর্তা অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করেন, কিন্তু এখনো কেউ স্থায়ীভাবে নিয়োগ পাননি।

প্রথমে ২১ মার্চ এমডি পদে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়, যেখানে বলা হয়েছিল ৬০ বছরের বেশি বয়স হলেও অভিজ্ঞ প্রার্থীরা আবেদন করতে পারবেন। তখন আব্দুস সালাম চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা হওয়ায় তিনি অযোগ্য ছিলেন। কিন্তু মাত্র দুই দিন পর ২৩ মার্চ নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সেই শর্তই বদলে ফেলা হয়— এখন বয়স ৬০ বছরের বেশি হলে আবেদন করা যাবে না। এতে অনেক অভিজ্ঞ প্রার্থী বাদ পড়ে যান। এরপর তাঁকে দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে তৃতীয় গ্রেডে তোলা হয়, যাতে পরের বিজ্ঞপ্তিতে তিনি যোগ্য হয়ে যান।

সর্বশেষ ১৫ জুলাই নতুন বিজ্ঞপ্তিতে তিনি আবেদন করেন, আর কোনো সাক্ষাৎকার ছাড়াই তিনজনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় তাঁর নাম শীর্ষে উঠে আসে। দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান এবং তৃতীয় স্থানে এলজিইডির সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এনামুল হক।

বর্তমানে ওয়াসার পরিচালনা বোর্ড না থাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে তথাকথিত ‘কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটি’। এই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আখতার জাহান, আর সদস্যসচিব হিসেবে কাজ করছেন ওয়াসার সচিব মশিউর রহমান খান। কমিটিতে আরও আছেন জনপ্রশাসন, অর্থ, পানিসম্পদ ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিনিধি, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ এবং ছাত্র প্রতিনিধি আহনাফ সাঈদ খান।

এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে ইতিমধ্যে আদালতে রিট হয়েছে। মো. লিয়াকত আলী নামের একজন আবেদনকারী হাইকোর্টে রিট করলে, আদালত ৩ নভেম্বর নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করে রুল জারি করেন।

নগর–পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্সের সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেছেন, “পছন্দের মানুষ বসানোর প্রতিযোগিতা যদি সরকারি সংস্থাগুলোর সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হবে। এটি সৎ কর্মকর্তাদের নিরুৎসাহিত করে এবং জনগণের সেবাকে প্রভাবিত করে।”

তিনি আরও বলেন, “সরকারের উচিত স্বচ্ছ নিয়োগনীতি তৈরি করা এবং যাঁরা এই কৌশলগত নিয়োগের পেছনে রয়েছেন, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা।”




বৈজ্ঞানিক সহকারী পদে নিয়োগ দুর্নীতিতে ৪৪ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা অনুমোদন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ২০১৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)-র বৈজ্ঞানিক সহকারী পদে নিয়োগ সংক্রান্ত একটি গোপন দুর্নীতি চিত্র উঠে এসেছে।

সেই সময় মোট ২০টি শূন্য আসনে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। স্বাভাবিক নিয়মে বাছাই কমিটি লিখিত পরীক্ষার নম্বর, কোটাসহ বিভিন্ন মানদণ্ড বিবেচনায় নিয়ে ১৮ জন প্রার্থীর নিয়োগ সুপারিশ করেছিল। পরে সেই সুপারিশ অনুযায়ী নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

কিন্তু দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর তদন্তে দেখা গেছে, সুপারিশপ্রাপ্ত ওই ১৮ জনের বাইরে ৪২ জন প্রার্থীকে সম্পূর্ণ অনিয়মভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা কেউ আবেদন করেনি, কেউ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়নি — তবু নিয়োগ পেয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, ২৫ জন লিখিত পরীক্ষায় পাশ করতে পারেনি। ১৪ জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও সাক্ষাৎকারে ফেল হয়েছেন। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর হলো— ৩ জন একদমই আবেদন করেনি, তবুও নিয়োগ পেয়েছে।

এই নিয়ে বারি-র সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) সহ মোট ৪৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য আজ সোমবার দুদকের কার্যালয় থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

অনিয়মের এ ধারা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতায় বড় প্রশ্ন উঠেছে, যা নিয়োগপ্রত্যাশীদের মধ্যে হতাশা ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।




ডিএসসিসি প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়ার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে সংস্থাটি।

ডিএসসিসির সচিব মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত দপ্তর আদেশে (স্মারক নং: ৪৬.২০১.০৩১.০০.০২.০০৯.২০০৮–৩৭৩০, তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০২৫) গঠিত কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিবহন) মোহাম্মদ নাছিম আহমেদ। সদস্য হিসেবে রয়েছেন প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো. জয়নুল আবেদীন এবং সদস্য–সচিব হিসেবে দায়িত্বে আছেন অঞ্চল–১০ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবিব।

দপ্তর আদেশে বলা হয়েছে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। ইতোমধ্যে কমিটি মাঠপর্যায়ে তদন্ত কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

ডিএসসিসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “নিউজ পোর্টাল ও স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে কিছু অসঙ্গতি পাওয়া গেছে, যা তদন্তের মাধ্যমে বিস্তারিত নিশ্চিত করা হবে।”

সূত্র জানায়, গোলাম কিবরিয়ার তত্ত্বাবধানে থাকা বেশ কয়েকটি প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্নমানের কাজ এবং ঠিকাদার নির্বাচনে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে স্থানীয় ঠিকাদার ও সাধারণ নাগরিকরা একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।

তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে সরাসরি কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে মোবাইল ফোনেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রশাসনিক সূত্র বলছে, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। সম্ভাব্য শাস্তির মধ্যে সাময়িক বরখাস্ত, পদাবনতি কিংবা ফৌজদারি মামলা দায়েরের বিষয়ও রয়েছে। তদন্ত কমিটিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করে ডিএসসিসি পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেবে।




ধামরাইয়ে আমেনার প্রতারণা কাণ্ড: ৬ষ্ঠ স্বামীর ৬০ লক্ষ টাকার সম্পদ হাতিয়ে, শেষে মিথ্যা মামলা করে ফাঁসানোর চেষ্টা!

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ মানুষের বিশ্বাস যখন ব্যবসায় রূপ নেয়, তখন সম্পর্কও হয় প্রতারণার শিকার। ঠিক এমনই এক হৃদয়বিদারক কাহিনি এখন আলোচনায়— ধামরাইয়ের আমেনা বেগম নামের এক নারীর প্রতারণার জাল। একাধিক বিবাহ, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, আর কৌশলে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এখন তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত স্মারক নং-অপরাধ/২০২৫/৩১১৯/ভি, তারিখ-২৯/০৯/২০২৫ খ্রি. নথি অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবী মোঃ শাহাদাৎ হোসেন (৫২) তার জবানবন্দিতে এক ভয়াবহ সত্য তুলে ধরেছেন।

বিবাহের নামে প্রতারণা, অজান্তেই ষষ্ঠ স্বামী!

২০২২ সালের ৩০ জুন ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে কাবিন সম্পন্ন হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই শাহাদাৎ জানতে পারেন আমেনা বেগমের এটি তার ষষ্ঠ বিবাহ!

পূর্বের পাঁচ স্বামীর তালিকা চাঞ্চল্য তৈরি করেছে:

প্রথম স্বামী, মিজানুর রহমান (মুদি ব্যবসায়ী), ধামরাই, ঢাকা। দ্বিতীয় স্বামী,মোজাম্মেল হক (সৌদি প্রবাসী), টাঙ্গাইল। তৃতীয় স্বামী আলম (সাভার ফুটপাতের ব্যবসায়ী)। চতুর্থ স্বামী ফিরোজ(ড্রাইভার),আশুলিয়া। পঞ্চম স্বামী হায়দার রহমান (ব্যবসায়ী), কুষ্টিয়া। এদের প্রত্যেকের সংসারই ভেঙেছে অবাধ্যতা, অনৈতিক আচরণ ও আর্থিক লোভের কারণে, এমন তথ্য উঠে এসেছে স্থানীয় সূত্রে।

বিশ্বাসের সুযোগে হাতিয়ে নিল ৬০ লক্ষ টাকার সম্পদ:

বিবাহের পর আমেনা বেগমের ষষ্ঠ স্বামী শাহাদাৎ-এর কাছ থেকে একের পর এক অর্থ দাবি করতে শুরু করেন। পুকুর ভরাট”, “বাউন্ডারি ওয়াল”, “বেইজমেন্ট নির্মাণ” ইত্যাদি অজুহাতে কৌশলে তিনি হাতিয়ে নেন প্রায় ৫৯ লক্ষ টাকা, যা শাহাদাৎ হোসেন তার কেরানীগঞ্জের জমি বিক্রি করে ব্যয় করেন।এর বাইরেও তার হাতে ১৭-১৮ লক্ষ টাকা নগদ গচ্ছিত ছিল বলে দাবি করেছেন শাহাদাৎ হোসেন।

তিনি বলেন,”সে দামি পোশাক, স্বর্ণালংকার, মোবাইল, পারফিউম— বিলাসী জীবনযাপনের নামে একের পর এক টাকা নিতে থাকে। আমি বাধা দিলে সে গালাগালি, হুমকি এমনকি শারীরিক নির্যাতনও করত।”

জবানবন্দি থেকে শাহাদাৎ হোসেন তালাকের পর প্রতিশোধ মিথ্যা মামলা দায়ের:

অসহ্য নির্যাতনের কারণে শাহাদাৎ হোসেন ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে ‘তালাকে বায়েন’ প্রদান করেন, যা ১৬ ডিসেম্বর কাজী অফিসে নথিভুক্ত হয়। তবে কিছুদিন পর আমেনা বেগম সংশোধনের অঙ্গীকার” করে ফের সংসারে ফিরে আসেন— কিন্তু পরিস্থিতি হয় আরও ভয়াবহ। অবশেষে শাহাদাৎ দ্বিতীয়বারের মতো তালাক বহাল রাখেন। এরপর আমেনা প্রতিশোধ নিতে গিয়ে শাহাদাৎ-এর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নং-০৯, ঢাকা-এ পিটিশন মামলা নং-০৭/২৫, ধারা ৯(১) দায়ের করেন।

তদন্তে সত্য উদ্ঘাটন:

এস.আই (নিঃ) জিয়াউর রহমানের নিরপেক্ষ ভূমিকা উক্ত মামলার তদন্তভার পান ধামরাই থানার এস.আই (নিঃ) জিয়াউর রহমান। তদন্তে সাক্ষ্য, প্রতিবেশী বক্তব্য ও আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়— শাহাদাৎ হোসেনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হলে আদালতও বিষয়টি প্রতারণা ও প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড বলে মন্তব্য করেন।

তদন্তে উঠে আসা মূল তথ্য: 

আমেনা বেগমের একাধিক বিবাহের প্রমাণ মিলে। তিনি শাহাদাৎ হোসেনের কাছ থেকে মোট ৭৫ লক্ষ টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছেন বলে প্রাথমিক তথ্য।মিথ্যা মামলা দায়ের করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেছেন।

স্থানীয়দের মতে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ধামরাই ও সাভার এলাকায় বিবাহ প্রতারণা চক্রের অংশ। শাহাদাৎ হোসেনের দাবি,” আমি শুধু একজন সৎ মানুষ হিসেবে জীবনের সঞ্চয় দিয়ে সংসার গড়তে চেয়েছিলাম। এখন সব হারিয়েছি— মানসম্মান, অর্থ, বিশ্বাস— সবই। আমি চাই প্রশাসন এই নারী প্রতারক চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনুক।”

বঙ্গবন্ধু আইন কলেজের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান বলেন,”বিবাহ প্রতারণা এখন একটি সামাজিক মহামারি। এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও উদাহরণমূলক শাস্তি ছাড়া সমাজে নারীর আসল মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হয়।”




তিতাসে অনিয়মের নেপথ্যে জেনারেল ম্যানেজার আতিয়া বিলকিস: দুদকের অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য

বিশেষ প্রতিবেদকঃ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে চলছে যেন দুই রকম খেলা—একদিকে চলছে লোক দেখানো অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নের অভিযান, অন্যদিকে আবার কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় অবৈধ সংযোগের বাণিজ্য পুরোদমে। সংযোগ বিচ্ছিন্নের চেয়ে বহু গুণ দ্রুততায় এই অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। গ্যাস চুরি করে সিস্টেম লস দেখিয়ে বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে। এসব অনিয়মের পেছনে নাম উঠেছে তিতাসের জেনারেল ম্যানেজার সৈয়দা আতিয়া বিলকিসের।

তিতাসের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে কোম্পানির সিস্টেম লস ছিল ১০.৬ শতাংশ। ওই সময় তিতাস দৈনিক ১,৩৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেয়েছিল, কিন্তু বিক্রির হিসাব দেখানো হয়েছে মাত্র ১,১৮৯ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মূল্য কোম্পানির কোষাগারে জমা হয়নি। কর্মকর্তারা এই বিশাল অঙ্কের ঘাটতির দায় চাপাচ্ছেন আতিয়া বিলকিসের ওপর।

কোম্পানির ভেতরের একাধিক সূত্র জানায়, আতিয়া বিলকিস একসময় দুদকের সাবেক কমিশনার মোজাম্মেল হক খানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সেই সম্পর্কের জোরে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাব বিস্তার করেছেন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে। দুদক কমিশনারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগে যাকে ইচ্ছা হয়রানি করেছেন, আবার নিজের প্রমোশনও আদায় করেছেন সহজেই। এমনকি তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরাও অনেক সময় তার খামখেয়ালি আচরণের বিরুদ্ধে কিছু বলতে সাহস পাননি।

তিতাসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আতিয়া বিলকিসের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস আমাদের নেই। ভয় হয়, চাকরিটাই হারাব।”

সম্প্রতি তিনি ছেলেকে দেখতে কানাডা সফরে গিয়েছিলেন। সরকারি ছুটি শেষ হলেও সময়মতো ফিরে আসেননি; বরং ‘ডি-নথিতে’ ফাইল তুলে দেশে ফিরেছেন। তদন্তে দেখা যায়, তিনি অনুমতি ছাড়াই বিদেশে অবস্থান করেছেন এবং তার একাধিক পাসপোর্ট রয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান জেনারেল ম্যানেজার (অর্থ) রশিদুল আলম সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন, অভিযোগ সত্য—তিনি কানাডায় কয়েকদিন বেশি অবস্থান করেছিলেন।

অন্যদিকে, দুদকও ইতিমধ্যে আতিয়া বিলকিসের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে। তার প্রমোশন সংক্রান্ত নথি, বদলীকৃত কর্মকর্তাদের তথ্য এবং রূপগঞ্জের মুড়াপাড়ায় দেওয়া গ্যাস সংযোগের রেকর্ড চাওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় তিনি শিল্প এলাকায় গ্যাস সংযোগের নামে কোটি কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে পাচার করেছেন।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, “যেহেতু বিষয়টি দুদকের তদন্তাধীন, তাই আপাতত কোনো মন্তব্য করা যাচ্ছে না। তবে তদন্ত প্রতিবেদন পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন আতিয়া বিলকিস। তিনি বলেন, “আমি এখন ৫৮ বছর বয়সে এসে দুর্নীতিতে জড়াব কেন? খিলগাঁওয়ে আমার বাবার জমি ছাড়া আর কিছুই নেই। ছেলেকে পড়ানোর জন্য অফিস থেকে ঋণ নিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে কিছু কর্মকর্তা এবং বাইরের গোয়েন্দা সংস্থাও।”

তিতাসের আরেক কর্মকর্তা বলেন, “তিনি এমনভাবে ছুটি নেন, মনে হয় অফিস তার ইচ্ছামতো চলে। এত ছুটি অন্য কারও ভাগ্যে জোটেনি।”

গ্যাস চুরি ও সিস্টেম লসের কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রতিদিন প্রায় ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই-তিন শতাংশ লসকে ‘সিস্টেম লস’ বলা যেতে পারে, কিন্তু ৪০ শতাংশ পর্যন্ত গ্যাস গায়েব হয়ে যাওয়া আসলে ‘চুরি’ নয়—‘ডাকাতি’। বিইআরসির সাবেক সদস্য মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, “এটা আর দুর্নীতি নয়, সরাসরি ডাকাতি। যারা এসবের সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের মুখোমুখি আনতেই হবে।”




গাজীপুরে সাবেক মেয়র মজিবুরের টেন্ডার কেলেঙ্কারি খতিয়ে দেখছে দুদক

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভার সাবেক মেয়র মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত বৃহস্পতিবার (৬/১১/২৫) পৌরসভায় হঠাৎ অভিযান চালিয়ে তারা বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার ও রেকর্ডপত্র জব্দ করে। দুদকের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ভুয়া কাগজপত্র জমা দিয়ে কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

অভিযানের সময় দুদকের টিম পৌরসভার রাস্তা সংস্কার, ড্রেন নির্মাণ ও প্যালাসাইডিং সংক্রান্ত কাজগুলো সরেজমিনে ঘুরে দেখেন। অভিযোগ রয়েছে, ব্রাউন ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নামের এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে ১৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার কাজের কার্যাদেশ পেয়েছিল। এসব কাজের অনুমোদন দেওয়া হয় তৎকালীন মেয়র মজিবুর রহমানের সময়েই। কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই কাজগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় গাজীপুরের উপপরিচালক নাজমুল হোসাইন বলেন, “ভুয়া কাগজপত্র জমা দিয়ে টেন্ডার পাওয়া নিয়ে অভিযোগ ওঠায় দুদকের ঢাকা অফিস থেকে নির্দেশ পেয়ে আমরা অভিযান চালাই। সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।” তিনি আরও জানান, “রাস্তা সংস্কার, ড্রেন নির্মাণ ও প্যালাসাইডিংসহ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বেশ কিছু কাজের মান ও প্রক্রিয়া যাচাই করে রিপোর্ট কমিশনে পাঠানো হবে।”

পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, আইইউজিই প্রকল্পের চতুর্থ প্যাকেজের অধীনে ২০২৪ সালের এপ্রিলে কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক, আনসার একাডেমি, পাশা গেট ও লালটেকিরসহ কয়েকটি এলাকায় রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করা হয়। তবে দরপত্র যাচাই না করেই ব্রাউন ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ারিংকে কাজ দেওয়া হয়। পরে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করলে দুদক বিষয়টি অনুসন্ধানে নেয়।

এর আগেও ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মজিবুর রহমানকে দুদক তলব করেছিল তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে। দুদক জানতে পারে, তার স্ত্রী, সন্তান ও ঘনিষ্ঠদের নামে জমি, বাড়ি, দোকান, মার্কেট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। এসব সম্পদের উৎস সম্পর্কে জবাব দিতে সেগুনবাগিচার দুদক কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছিল। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তিনি প্রভাব খাটিয়ে নিজেকে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, মজিবুর রহমান বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং আসন্ন সংসদ নির্বাচনে তিনি দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি দুই মেয়াদে কালিয়াকৈর পৌরসভার মেয়রের দায়িত্বে ছিলেন। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের আমলে তিনি ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যবহার করে বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদেরও হয়রানি করতেন।

অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও শনিবার একাধিকবার কল দিয়েও সাবেক মেয়র মজিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। পাঠানো এসএমএসেরও কোনো জবাব মেলেনি।




চট্টগ্রাম বন্দরে লিফট কেলেঙ্কারি: ‘এ’ গ্রেডের নামে ‘ডি’ গ্রেড লিফট, আত্মসাৎ কোটি টাকার

চট্টগ্রাম প্রতিনিধিঃ চট্টগ্রাম বন্দরে লিফট কেনাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, যারা সরকারি অর্থ লুটে নিচ্ছে প্রকাশ্যে। বিদ্যুৎ বিভাগের সাম্প্রতিক ছয়টি প্রকল্পে উচ্চমানের ‘এ’ গ্রেড লিফট সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে দেওয়া হয়েছে নিম্নমানের ‘সি’ ও ‘ডি’ গ্রেড লিফট। প্রতিটি লিফটের দাম ধরা হয়েছিল প্রায় এক কোটি ১৫ লাখ টাকা, অথচ বাজারে একই লিফটের দাম সর্বোচ্চ ১৮ লাখ টাকার মতো। এই কারসাজির মাধ্যমে প্রকল্পগুলো থেকে আত্মসাৎ হয়েছে সাত কোটিরও বেশি টাকা।

বন্দরের বিভিন্ন ভবনে এই লিফটগুলো স্থাপন করা হলেও, শুরু থেকেই দেখা দিচ্ছে নানা ত্রুটি—প্রায়ই লিফট আটকে যাচ্ছে, যাত্রীদের আটকা পড়ার ঘটনাও ঘটছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বন্দরের বিদ্যুৎ বিভাগের পরিচালক এসএম সাইফুল ইসলাম, উপপ্রধান প্রকৌশলী মো. মেসবাহ উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক এমপি আলি আজগর এবং সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদের ব্যক্তিগত সহকারী ইঞ্জিনিয়ার আরশাদ পারভেজ।

এই চক্র টেন্ডারের নিয়মই বদলে দেয়—যেখানে প্রকল্পগুলো ‘গুডস’ ক্যাটাগরির হওয়া উচিত ছিল, সেখানে তারা কাগজে-কলমে ‘ওয়ার্কস’ প্রকল্প দেখিয়ে আন্তর্জাতিক মান যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যায়। ফলে নিম্নমানের লিফট সরবরাহ করা হলেও তাতে কোনো প্রশ্ন তোলা যায়নি।

২০২২ সালে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিসিং বিল্ডিং’-এর জন্য চারটি ‘এ’ গ্রেড লিফট কেনার চুক্তিমূল্য ধরা হয়েছিল চার কোটি ৫৮ লাখ টাকা। শর্ত ছিল ফুজিটেক, হিটাচি, মিৎসুবিশি বা কোনের মতো স্বীকৃত ব্র্যান্ডের লিফট দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে স্থাপন করা হয়েছে ‘ফুজাও’ নামের এক চায়না কোম্পানির ‘ডি’ গ্রেড লিফট, যার দাম ১২ থেকে ১৮ লাখ টাকার মধ্যে। ঠিকাদার মো. জাহাঙ্গীর আলমের প্রতিষ্ঠান ‘এ অ্যান্ড জে ইন্টারন্যাশনাল’ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, এবং এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। একই বছরের অন্যান্য প্রকল্পেও—অফিসার্স কোয়ার্টার, ডরমিটরি, স্টোর ভবন, কার শেড ও প্রশাসনিক ভবনে—একই ধরনের অনিয়ম হয়েছে।

এই পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান: ‘এ অ্যান্ড জে ইন্টারন্যাশনাল’, ‘ম্যাক্সওয়েল সিমেন্স পাওয়ার প্লাস’ এবং ‘এবিএম ওয়াটার কোম্পানি’। মালিকরা—জাহাঙ্গীর আলম, শাখাওয়াত হোসেন ও আতাউল করিম সেলিম—বন্দরের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার সঙ্গে মিলে দরপত্র বণ্টনে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্থানীয় ঠিকাদারদের ভাষায়, এখন “বন্দরের টেন্ডার মানেই আগে থেকে ভাগ করে রাখা প্যাকেজ”—সবাই জানে কে কাজ পাবে, বাকিরা শুধু আনুষ্ঠানিকতা পালন করে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, ‘এ’ গ্রেড লিফটে ইউরোপীয় সনদপ্রাপ্ত কন্ট্রোল ইউনিট, গিয়ারলেস মোটর ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বন্দরে স্থাপিত লিফটগুলোয় এসবের কোনোটি নেই। এক প্রকৌশলী মন্তব্য করেছেন, “এগুলো শুধু নিম্নমানের নয়, জীবনহানির ঝুঁকিও তৈরি করছে।”

বন্দরের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, অনিয়মে জড়িত কয়েকজন কর্মকর্তা ইতোমধ্যে বিদেশে পালানোর চেষ্টা করছেন। এমনকি তাদের বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়েও তথ্য হাতে পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেছেন, “এক কোটি টাকার নামে ১৮ লাখ টাকার লিফট দেওয়া হয়েছে, বাকিটা ভাগ হয়েছে সিন্ডিকেটের মধ্যে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির একটি দৃষ্টান্ত।” তিনি দ্রুত দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত দাবি করেছেন।

অভিযুক্ত ঠিকাদার মো. জাহাঙ্গীর আলমকে ফোনে পাওয়া না গেলেও হোয়াটসঅ্যাপে তিনি জানান, “লিফট যেভাবে চাওয়া হয়েছে, সেভাবেই দেওয়া হয়েছে।” এরপর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

বন্দরের বিদ্যুৎ বিভাগের পরিচালক এসএম সাইফুল ইসলাম বলেন, “আপনারা আগে সরেজমিনে দেখে নিন, তারপর লিখুন।” যখন প্রতিবেদক তাকে নিম্নমানের লিফট দেখানোর কথা বলেন, তিনি বলেন, “চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ না হলে সরকারি কাজে তা গ্রহণযোগ্য নয়।” তবে উপপ্রধান প্রকৌশলী মেসবাহ উদ্দিন চৌধুরী একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা সত্ত্বেও মন্তব্য দেননি।

চট্টগ্রাম বন্দরের চিফ পারসোনাল অফিসার মো. নাসির উদ্দিন বলেন, “এ ধরনের ঘটনা ভয়াবহ দুর্নীতিরই উদাহরণ। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”




দুদকের নোটিশ: স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সাবেক দুই কর্মকর্তার সম্পদ যাচাই শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সাবেক দুই ব্যক্তিগত কর্মকর্তা তুহিন ফারাবী ও মাহমুদুল হাসানের নামে থাকা সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ জারি করেছে। সম্প্রতি পাঠানো এ নোটিশের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

দুদক সূত্র জানায়, দায়িত্ব পালনকালে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন, প্রভাব খাটানো ও অনিয়মের অভিযোগে প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে এ নোটিশ পাঠানো হয়। তাদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পদের উৎস ও বিস্তারিত বিবরণ দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, এর আগে তুহিন ফারাবী ও মাহমুদুল হাসানকে তলব করে দুদক জিজ্ঞাসাবাদ করে। সে সময় তাদের কাছ থেকে আয়-ব্যয়ের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। ওই তথ্য যাচাইয়ের পরই সম্পদের বিস্তারিত হিসাব চেয়ে নোটিশ পাঠানো হয়।

দুদক জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদের হিসাব না দিলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বাস্থ্য খাতে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের কয়েকটি অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

দুদক সূত্রের ভাষ্য, স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি বরাদ্দের অপব্যবহার, নিয়োগ বাণিজ্য ও সরবরাহ কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ওই অভিযোগের ভিত্তিতেই তুহিন ফারাবী ও মাহমুদুল হাসানের সম্পদ যাচাই শুরু হয়।

এর আগে গত ২১ মে দুদক তুহিন ফারাবী, ডা. মাহমুদুল হাসান ও এনসিপির বহিষ্কৃত যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাউদ্দীন তানভীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তাদের বিরুদ্ধে তদবির, চাঁদাবাজি ও টেন্ডার বাণিজ্যসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান শাখার কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ পরিচালনা করেন। সে সময় তাদের নামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায় এবং সম্পদের উৎস জানতে চাওয়া হয়।

তুহিন ফারাবীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দপ্তরে কাজ করার সময় ক্ষমতার অপব্যবহার ও তদবির বাণিজ্যের মাধ্যমে নামে-বেনামে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে নিজের, স্ত্রী ও সন্তানদের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, আয়করের হালনাগাদ নথি এবং ব্যাংক হিসাবের বিবরণী জমা দিতে বলা হয়।

অন্যদিকে, ডা. মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তাকেও নিজের ও পরিবারের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, আয়কর নথি এবং ব্যাংক বিবরণীসহ হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

পরে গত ২৭ মে ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন গালিব তুহিন ফারাবী ও মাহমুদুল হাসানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্লকের নির্দেশ দেন।