বন বিভাগের প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ: বদলি, নিয়োগ ও বনভূমি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে

এসএম বদরুল আলমঃ বন অধিদপ্তরের ঢাকা সামাজিক বনাঞ্চলের বন সংরক্ষক হোসাইন মোহাম্মদ নিশাতকে ঘিরে নানা ধরনের অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। বন বিভাগের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘ কর্মজীবনে তার বিরুদ্ধে বদলি, নিয়োগ, পদায়ন, এনওসি প্রদান এবং বনভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।

হোসাইন মোহাম্মদ নিশাত ২০০৩ সালে ২২তম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী বন সংরক্ষক হিসেবে বন বিভাগে যোগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ ২৩ বছরের চাকরি জীবনে তিনি রাজধানীর বাইরে বড় ধরনের বদলির মুখোমুখি হননি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দীর্ঘদিন থাকার সুযোগ পেয়েছেন।

২০১৩ সালে ঢাকা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তার প্রভাব আরও বাড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় তিনি তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাবেক পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন এবং সাবেক উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন বলে বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার সুযোগ পেয়েছেন।

অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ছিল সোনারগাঁও চেকপোস্ট। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই চেকপোস্টকে ঘিরে গাছ পরিবহনের ট্রাক থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক কাঠবোঝাই ট্রাক চলাচল করত এবং প্রতিটি ট্রাক থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নেওয়া হতো। পাশাপাশি চেকপোস্টের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। স্টেশন অফিসার, সহকারী স্টেশন অফিসার এবং বন প্রহরীদের পোস্টিং নিয়েও টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেন অনেকে।

২০১৬ সালে হোসাইন নিশাত বন অধিদপ্তরের সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক (সংস্থাপন) পদে দায়িত্ব পান। এই পদে থাকাকালে বদলি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি নিয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। তাদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পোস্টিং পেতে অনেককে বড় অঙ্কের টাকা দিতে হতো।

রেঞ্জ কর্মকর্তা, ফরেস্টার এবং বন প্রহরীদের বদলি নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, লাভজনক রেঞ্জ, চেকপোস্ট বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকতে নিয়মিতভাবে টাকা দিতে হতো। দেশের বিভিন্ন এলাকার পোস্টিংকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

বন্যপ্রাণী আমদানি ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া অনেক ফাইল আটকে রাখা হতো। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি এনওসি দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নেওয়া হতো এবং প্রতি মাসে বিপুল সংখ্যক এনওসি থেকে অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা ছিল।

২০২০ সালে বন বিভাগের পদোন্নতি নীতিমালায় পরিবর্তন আনার পরও তাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার পদে সরাসরি নিয়োগের প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছিল এবং রাজনৈতিক পরিচয় থাকা কিছু ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল। এ ঘটনায় বন বিভাগের অনেক কর্মকর্তা অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন বলে জানা যায়।

এছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বন বিভাগে কর্মী নিয়োগ নিয়েও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের চাচাতো ভাই গিয়াস তালুকদারের মালিকানাধীন ‘বলাকা এন্টারপ্রাইজ’-এর মাধ্যমে প্রায় চার হাজার কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব নিয়োগে কর্মীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একইভাবে ২০২৫ সালে ২৮৪ জন ফরেস্ট গার্ড নিয়োগ প্রক্রিয়ায় থাকা কমিটি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে, যেখানে হোসাইন নিশাতের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়।

বনভূমি দখল নিয়েও তার দায়িত্বকাল নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, ঢাকা কেন্দ্রীয় বন অঞ্চলের আওতাধীন গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও সিলেট এলাকায় বিপুল পরিমাণ বনভূমি প্রভাবশালীদের দখলে চলে যায়। এসব এলাকায় রিসোর্ট, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া এলাকায় বনভূমি দখলের ঘটনায়ও তার সহযোগিতার অভিযোগ তোলা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি দেশ-বিদেশে সম্পদ গড়েছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তার মাধ্যমে বিদেশেও সম্পত্তি কেনার তথ্য রয়েছে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদ গড়ার অভিযোগ নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

তবে হোসাইন মোহাম্মদ নিশাতের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ বা আদালতের সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসেনি। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছে, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে এসব অভিযোগের প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসতে পারে।




গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ, ৩৯ দরপত্র নিয়ে প্রশ্ন

এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকা আরবরিকালচার গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে একের পর এক ওটিএম (Open Tendering Method) পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যার মাধ্যমে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, এলটিএম (Limited Tendering Method) পদ্ধতির পরিবর্তে ব্যাপকভাবে ওটিএম পদ্ধতি ব্যবহার করে গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ৩৯টি দরপত্র আহ্বান করা হয়। এই বিপুল সংখ্যক দরপত্র নিয়ে গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের মধ্যে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি, ২৭ জানুয়ারি এবং ৪ ফেব্রুয়ারি সময়ে বেশ কিছু দরপত্র প্রকাশ করা হয়। এসব দরপত্রের মধ্যে রয়েছে টেন্ডার আইডি 1062648, 1062651, 1062652, 1062649, 1062654, 1062653, 1056143, 1056144, 1060358, 1062671, 1062647, 1062396, 1056147, 1062385, 1069899, 1071271, 1071766, 1069900, 1069901, 1068865, 1070729, 1071778, 1071779, 1071780, 1069462, 1068870, 1056141, 1068864, 1068901, 1057944, 1057946, 1068860, 1068896, 1069173, 1062672, 1068863, 1068859, 1068851 এবং 1057813।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কাগজে-কলমে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও বাস্তবে কিছু নির্দিষ্ট ঠিকাদার বা গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, দরপত্রের রেট নির্ধারণ ও কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনৈতিক প্রভাব কাজ করছে।

এছাড়া নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, দপ্তরের বিভিন্ন ফাইল অনুমোদন, প্রকল্প সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অনিয়ম করা হচ্ছে। কয়েকজন ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিযোগ, আর্থিক সুবিধা ছাড়া অনেক ফাইল এগোয় না।

অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন কাজের ফাইল অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি করার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ দরপত্র প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম হলে সরকারি অর্থের অপচয়, কাজের মান কমে যাওয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি হতে পারে।

সরকারি কর্মচারীদের আচরণবিধি অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগত স্বার্থে সরকারি দায়িত্ব ও ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন না। তাই আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো যাচাই করতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান করা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে। সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার ও উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।




গণপূর্তের জিগাতলা ভবনে বাসা বরাদ্দ নিয়ে বিতর্ক, তদন্তকারী নিজেই অভিযুক্ত!

এসএম বদরুল আলমঃ রাজধানীর জিগাতলায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত নতুন বহুতল আবাসিক ভবনে ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি আবাসন নীতিমালা অনুসরণ না করে যোগ্যতার বাইরে কয়েকজনকে বাসা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করা হলেও সেই কমিটির সদস্য নির্বাচন নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শফিকুল ইসলামকে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর ঘনিষ্ঠ একজন অস্থায়ী গাড়িচালক জামান হোসেন নিয়ম ভেঙে ডি-২ শ্রেণির একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেয়েছেন। এ কারণে তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে শফিকুল ইসলাম থাকায় বিষয়টির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (উন্নয়ন) মাহাবুব হাসানকে কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে। এছাড়া সদস্য হিসেবে রয়েছেন সুপারিনটেনডেন্ট অফিসার আবু জাফর সিদ্দিক। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, যাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে তদন্ত হলে প্রকৃত তথ্য সামনে আসবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

সরকারি আবাসন নীতিমালা অনুযায়ী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদ, গ্রেড ও বেতন কাঠামোর ভিত্তিতে বাসা বরাদ্দ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু জিগাতলার নতুন ভবনে এই নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ডি-২ শ্রেণির বাসা সাধারণত ১০ম থেকে ১২তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত হলেও সেখানে অস্থায়ী গাড়িচালক জামান হোসেনকে বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া ডি-১, ই, এফসহ বিভিন্ন শ্রেণির ফ্ল্যাট বরাদ্দেও পদমর্যাদা ও গ্রেডের নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা পছন্দের লোকজনকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি রয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় বাসা বরাদ্দ নিয়ে অভিযোগ প্রকাশের পর। পরে সরকারি আবাসন সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখে তদন্তের সুপারিশ করে। এরপর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, নির্দেশ পাওয়ার পরও তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হতে দেরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত এমন একটি কমিটি করা হয়, যার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বাসা বরাদ্দে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত নির্দেশের পর ওই চক্র বিষয়টি নিজেদের মতো করে সামলানোর চেষ্টা করেছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, এই অনিয়মের তথ্য বাইরে যাওয়ার ঘটনায় সন্দেহের ভিত্তিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সংস্থাপন শাখা-৪ এর অফিস সহায়ক ফারুক রহমান শেখকে ঢাকা থেকে বাগেরহাটে বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের দাবি, তথ্য প্রকাশের কারণে চাপের মুখে পড়েই তাঁর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের দাবি, পুরো বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত করতে হলে বর্তমান কমিটি বাতিল করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, বাসা বরাদ্দে অনিয়ম হয়ে থাকলে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, যাতে সরকারি আবাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরে আসে।




উত্তরার বিডিআর মার্কেটের পার্কিং স্থান নিয়ে বিরোধ: পুরো মার্কেটকে ঘিরে আদালতে তিন মামলা, উত্তেজনা বৃদ্ধি

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজধানীর উত্তরার বিডিআর মার্কেটের নির্ধারিত গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অতীতে একটি প্রভাবশালী মহল পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত জায়গা দখল করে সেখানে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। সম্প্রতি আদালতে বিচারাধীন ওই বিতর্কিত স্থানে পুনরায় ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা এর প্রতিবাদ জানান এবং নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুধু পার্কিংয়ের জায়গা নয়, পুরো মার্কেটকে ঘিরে বর্তমানে আদালতে তিনটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। মামলাগুলোর প্রেক্ষিতে আদালত সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির বিষয়ে স্ট্যাটাস-কো (Status Quo) বজায় রাখার নির্দেশনা প্রদান এবং রুল জারি করেছেন বলে জানা গেছে। আদালতের নির্দেশনা বহাল থাকা অবস্থায় নতুন করে স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, নির্ধারিত পার্কিং এলাকায় স্থাপনা নির্মাণ করা হলে বাজারের যানবাহন পার্কিং ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এতে ক্রেতাদের যাতায়াত, পণ্য পরিবহন এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় আইনি অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতি ছাড়াই জায়গাটি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে।

কাঁচাবাজার ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ বলেন, “পার্কিংয়ের জায়গাটি শুধু একটি খালি স্থান নয়; এটি পুরো মার্কেটের ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একতরফা পদক্ষেপ গ্রহণ আইন ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। আমরা চাই আদালতের রায়ের মাধ্যমে বিষয়টির স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধান হোক।”

একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, বাজারে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। তারা বলেন, “আমরা কোনো সংঘাত চাই না। আমরা চাই বাজারে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় থাকুক, যাতে ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।”

সাধারণ ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, “যেহেতু বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন এবং আদালত স্ট্যাটাস-কো বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, তাই সকল পক্ষের উচিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ, দখলচেষ্টা বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।”

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে কোনো পক্ষ একতরফাভাবে নির্মাণকাজ চালিয়ে গেলে ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। এজন্য তারা প্রশাসনের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় এ ধরনের বিরোধ ব্যবসায়িক পরিবেশ, বিনিয়োগবান্ধব পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তারা প্রশাসন, বাজার কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন।

সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, “আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে আদালতের নির্দেশনা মেনে চলা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিতর্কিত স্থানে কোনো ধরনের পরিবর্তন না আনা উচিত। এতে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত এড়ানো সম্ভব হবে।”

ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, আদালতের রায় ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি সকল পক্ষ শ্রদ্ধাশীল থেকে বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তিতে সহযোগিতা করবে এবং বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে তারা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিরোধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।




বিআইডব্লিউটিএর নৌ-সংরক্ষণ বিভাগে অনিয়মের অভিযোগ: টেন্ডার, কমিশন বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট নিয়ে প্রশ্ন

এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর নৌ-সংরক্ষণ বিভাগে বিভিন্ন প্রকল্প ও ক্রয় কার্যক্রমকে ঘিরে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, কমিশন বাণিজ্য এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সক্রিয়তার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, পূর্ববর্তী প্রশাসনের সময় যেসব অভিযোগ সামনে এসেছিল, সেগুলোর যথাযথ নিষ্পত্তি না হওয়ায় একই ধরনের কার্যক্রম এখনও অব্যাহত রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বয়া বাতি, বিকন বাতি, বাঁশের মার্কা, পল্টুন স্থাপন, প্রতিস্থাপন ও স্থানান্তরসহ বিভিন্ন রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া উদ্ধারকারী নৌযানগুলোর কাগুজে মেরামত, জ্বালানি তেল ক্রয় এবং নৌযানের ট্রায়ালের নামে বিপুল পরিমাণ তেল অপচয় বা আত্মসাতের অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়ে আসছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, নৌসংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা মো. শাহাজল বদলি হলেও বিভাগের কার্যক্রমে অভিযোগের ধরণে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং পূর্ববর্তী সময়ে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

‘কমিশন ছাড়া কাজ পাওয়া কঠিন’ : বিভিন্ন ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, নৌ-সংরক্ষণ বিভাগের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে কাজ পেতে হলে কমিশন প্রদান কার্যত অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

অভিযোগকারীরা দাবি করেন, বর্তমান পরিচালক ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শাহজাহানের সময়েও ওই সিন্ডিকেটের প্রভাব বহাল রয়েছে এবং কমিশন ছাড়া কোনো কাজ অনুমোদন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ই-জিপি (e-GP), ওটিএম (OTM) এবং এলটিএম (LTM) পদ্ধতিতে বাস্তবায়িত বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রেও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় প্রকাশিত হয়নি।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ : সেবা গ্রহণকারী ও বিভাগ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, পরিচালক ক্যাপ্টেন শাহজাহান নাকি কমিশন ছাড়া কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করেন না। এমনকি তার নির্দেশনার বাইরে গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি বা প্রশাসনিকভাবে চাপে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। একাধিক সূত্রের দাবি, ভবনের ভেতরে তিনি একজন অত্যন্ত কৌশলী ও প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, সাবেক এক পরিচালকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এবং প্রতিদিন সন্ধ্যায় নিয়মিত সাক্ষাতের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এমনকি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো নথি বা প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের দাবি, সাবেক ও বর্তমান প্রশাসনের মধ্যে একই এলাকার হওয়ার কারণে একটি বিশেষ সমন্বয় বা প্রভাববলয় কাজ করছে, যার কারণে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

তথ্যপ্রাপ্তিতে বাধা ?
অভিযোগকারীরা আরও বলেন, পরিচালকের কার্যালয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশ এবং সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে বিভাগের অনেক অনিয়ম ও অভিযোগ জনসমক্ষে আসতে পারছে না বলে তাদের দাবি। এছাড়া পরিচালকের সম্পদ, আর্থিক লেনদেন এবং জীবনযাত্রার মান নিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, একটি স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালিত হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা বেরিয়ে আসতে পারে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কমিশন আদায়ের ক্ষেত্রে পরিচালকের একজন পিয়ন বা ঘনিষ্ঠ সহায়কের মাধ্যমে যোগাযোগ ও লেনদেন পরিচালিত হয়।

পরিচালকের বক্তব্য :
অভিযোগের বিষয়ে বর্তমান পরিচালক ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শাহজাহানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি যা করি, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত আছেন।” এর বাইরে তিনি আর কোনো বিস্তারিত মন্তব্য করেননি।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি :
এদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত, বিআইডব্লিউটিএর নৌ-সংরক্ষণ বিভাগের টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাস্তবায়ন, জ্বালানি ক্রয়, নৌযান পরিচালনা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালনা করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পথও সুগম হবে বলে তারা মনে করেন।




এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামানকে ঘিরে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রকৌশল বিভাগ) এবং একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, কয়েকজন ঠিকাদার এবং বিভিন্ন সূত্রের দাবি অনুযায়ী, বিআইডব্লিউটিএ’র কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করে তিনি একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে দরপত্র প্রক্রিয়া ও প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন বা সরকারি কোনো তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য এই প্রতিবেদকের কাছে পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সন্দ্বীপ, কক্সবাজারের সোনাদিয়া এবং টেকনাফের সাবরাং ও জালিয়ার দ্বীপ এলাকায় বাস্তবায়নাধীন “Development of Jetties and Infrastructure at Mirsarai & Sandwip at Chattogram, Subrang and Jaliar Dwip at Teknaf and Sonadia Dwip at Cox’s Bazar” প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ বণ্টন, দরপত্র মূল্যায়ন এবং বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে। কয়েকজন ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, বড় টেন্ডারগুলো প্রকাশের আগেই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় এবং কমিশনের বিনিময়ে কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়ার একটি অনিয়মিত ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদারের ভাষ্য, বিআইডব্লিউটিএ’র বড় কাজগুলোতে অংশ নিতে গেলে প্রভাবশালী একটি চক্রের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। তাদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে গোপনে দরমূল্যসংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে দেওয়া হয় এবং নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো সরকারি নথি বা আদালতে প্রমাণিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, নদী খনন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং সমীক্ষা কার্যক্রমের কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি যাচাই-বাছাই ছাড়াই কাজ পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পর্যাপ্ত মাটি পরীক্ষা কিংবা বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়া কিছু কার্যক্রম বাস্তবায়নের কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নদীভাঙন, চর জেগে ওঠা এবং নৌপথ সংকটের মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দাও অভিযোগ করেছেন, কিছু অবকাঠামোতে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরির বেতন-ভাতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা। রাজধানীর বাসাবো, শান্তিনগর, আহমেদবাগ, মায়াকানন, মোহাম্মদপুর, বসিলা, ধানমন্ডি, সবুজবাগ, মুগদা, ফতুল্লা, কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, পূর্বাচল, কালীগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট, বাড়ি, জমি ও প্লট থাকার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া তার নিজ জেলা কুষ্টিয়াতেও পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের আরও অভিযোগ, এসব সম্পদের একটি অংশ সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়নি। তবে এই অভিযোগগুলোর সত্যতা সংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি তদন্ত সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন এবং বড় বড় প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রেখেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তার প্রভাব কমেনি এবং তিনি আগের মতোই বিভিন্ন প্রকল্প ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। তবে এসব দাবির পক্ষেও স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে বাজেট সংকটের মধ্যেও শত শত কোটি টাকার নতুন টেন্ডার আহ্বানের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি। তাদের অভিযোগ, প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা ও অগ্রাধিকার যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করেই কিছু দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং এর পেছনে কমিশন বাণিজ্যের উদ্দেশ্য থাকতে পারে। যদিও এ অভিযোগেরও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

বিআইডব্লিউটিএ’র কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা বিশ্লেষকদের মতে, বড় উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ে। তারা মনে করেন, দরপত্র প্রক্রিয়া, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, কাজের মান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পদের উৎস নিয়ে কোনো অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত। তাদের মতে, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহিতা প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে তার প্রতিক্রিয়া এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।

সংশ্লিষ্ট মহল, ভুক্তভোগী হিসেবে পরিচয় দেওয়া কয়েকজন ঠিকাদার এবং সুশাসনকর্মীরা এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগসমূহ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তার এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, বিআইডব্লিউটিএ’র মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বার্থেই জরুরি।




চিলমারী নদীবন্দর প্রকল্পে ৩৩৫ কোটি টাকার মহাদুর্নীতি! বিআইডাব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে টেন্ডার কারসাজি, ভুয়া বিল ও লুটপাটের বিস্ফোরক অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) বহুল আলোচিত চিলমারী নদীবন্দর স্থাপন প্রকল্পকে ঘিরে সামনে এসেছে ভয়াবহ দুর্নীতি, টেন্ডার কারসাজি, ভুয়া বিল, নিম্নমানের নির্মাণকাজ এবং শত কোটি টাকা লুটপাটের বিস্ফোরক অভিযোগ। প্রায় ৩৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার এই মেগা প্রকল্পে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ মোল্লাসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পের শুরুতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ২৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। পরে সংশোধিত ডিপিপির মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৩৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত বরাদ্দ পাওয়া প্রায় ১০০ কোটি টাকার একটি বড় অংশ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

‘প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের’ নিয়ন্ত্রণে পুরো প্রকল্প : সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সাবেক নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত পিডি আবুল কালাম আজাদ মোল্লা দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখেন। তার নেতৃত্বে আওয়ামীপন্থী কিছু কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ঠিকাদার এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যারা প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়।

অভিযোগে যাদের নাম উঠে এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন— সাবেক প্রতিমন্ত্রীর এপিএস বাশার, ডি.জি. বাংলা (DG Bangla)-এর স্বত্বাধিকারী আরশাদ পারভেজ, ডিপন এন্টারপ্রাইজ (Dipn Enterprise)-এর স্বত্বাধিকারী সজল চন্দ্র দত্ত এবং আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় অর্থবিষয়ক সম্পাদক সুভাসসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, আবুল কালাম আজাদ মোল্লার কথিত ভাগ্নে হিসেবে পরিচিত সজল চন্দ্র দত্তের প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে সাইট ডেভেলপমেন্টসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ দেওয়া হয়।

বালু ভরাট ছাড়াই কোটি কোটি টাকার বিল উত্তোলনের অভিযোগ : প্রকল্প এলাকায় অনুসন্ধানে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, সাইট ডেভেলপমেন্টের নামে প্রয়োজনীয় বালু ভরাট না করেই ভুয়া পরিমাপ ও বিল তৈরি করে কয়েক কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
তাদের দাবি, বাস্তবে যে পরিমাণ কাজ হয়েছে তার সঙ্গে বিলের কোনো মিল নেই। অনেক স্থানে কাজের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি, অথচ সরকারি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে পূর্ণাঙ্গ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে।

ভবন নির্মাণে নকশা লঙ্ঘন, পাইলিংয়ে ভয়াবহ অনিয়ম :
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করা। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনায় সরকারি অনুমোদিত ড্রয়িংয়ের পরিবর্তে ভিন্ন নকশা ব্যবহার করা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পাইলিং কাজে। অফিস কার্যাদেশ অনুযায়ী প্রতিটি পাইলের পরিমাপ হওয়ার কথা ছিল— ব্যাস (Dia): 500 mm
দৈর্ঘ্য: 40.50 মিটার
16 mm রড: ১০টি
কিন্তু বাস্তবে ব্যবহার করা হয়েছে— ব্যাস (Dia): 300 mm
দৈর্ঘ্য: 23 মিটার
16 mm রড: ৭টি
ফলে নির্মিত অবকাঠামোর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পরিমাপ কমিয়ে বিপুল পরিমাণ নির্মাণসামগ্রী আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সরকারি অর্থ লুট করা হয়েছে।

‘নিজস্ব ড্রয়িং’ বানিয়ে কাজ করানোর অভিযোগ :
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, পিডি আবুল কালাম আজাদ মোল্লা সাইটে TIPE-1 ও TIPE-2 নামে দুটি আলাদা ড্রয়িং ব্যবহার করে কাজ করিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ড্রয়িংয়ে সরকারি অনুমোদিত নকশার তুলনায় কম পরিমাণ রড ও কম গভীরতার পাইলিংয়ের নির্দেশনা ছিল বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। স্থানীয়দের মতে, এ কৌশলের মাধ্যমে নির্মাণ ব্যয় কম দেখিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।

ভূমি অধিগ্রহণে জালিয়াতির অভিযোগ : চিলমারী এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধানে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন ভূমি মালিক অভিযোগ করেন, ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ বিতরণ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
তাদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বঞ্চিত করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে এবং ক্ষতিপূরণের অর্থ বণ্টনে নানা ধরনের জালিয়াতি সংঘটিত হয়েছে।

কাগজে এক ঠিকাদার, বিল গেছে অন্য প্রতিষ্ঠানের হিসাবে :
প্রকল্পের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগগুলোর একটি হলো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বিল প্রদানের তথ্যের অসঙ্গতি।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, কাগজপত্রে ঠিকাদার হিসেবে KHANDAKER SHAHIN AHMED LTD & SIGN ENGINEERING LTD (KSL–SEL Joint Venture)-এর নাম থাকলেও বিল পরিশোধের প্রমাণ পাওয়া গেছে DG Bangla-এর এনআরবি ব্যাংক, মিরপুর শাখার হিসাবে। অভিযোগ রয়েছে, Memo No: 18.14.0000.298.19.021.23/279 নম্বর স্মারকের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মোল্লার স্বাক্ষরিত পেমেন্ট সার্টিফিকেটও DG Bangla-এর অনুকূলে ইস্যু করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রকল্পের আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

‘কাজ না করেই ভাগাভাগি’—ফাঁস আর্থিক বণ্টনের তথ্য :
নাম প্রকাশ না করার শর্তে DG Bangla-এর এক কর্মকর্তা দাবি করেন, চাকরি রক্ষার স্বার্থে তাদের বিভিন্ন আর্থিক কাগজপত্র প্রস্তুত করতে হয়েছে।
তার দাবি অনুযায়ী, একটি আর্থিক হিসাবপত্রে দেখা যায়— DG Bangla – ৫৫% : ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৫৩ হাজার ৩৫২ টাকা ৯৯ পয়সা, Clients + Consultant – ৪৫% : ২ কোটি ৭৬ লাখ ১৬ হাজার ৩৭৯ টাকা ৭২ পয়সা, ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, দুর্নীতির অর্থ কারা পেয়েছেন এবং কীভাবে বণ্টন হয়েছে সে সম্পর্কিত আরও তথ্য তাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

DIPU ENTERPRISE-এর হিসাবে জমা হয়েছে দুর্নীতির অর্থ : সূত্রগুলোর অভিযোগ, প্রকল্পের বড় একটি অংশের অর্থ DIPU ENTERPRISE-এর নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবটি পরিচালিত হয় পাবালী ব্যাংক পিএলসির ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার মাধ্যমে। এছাড়া বিপুল অঙ্কের নগদ লেনদেনের মাধ্যমেও অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে এখনো কোনো স্বাধীন নিরীক্ষা বা তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

বক্তব্য এড়িয়ে গেলেন প্রকল্প পরিচালক :
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মোল্লার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
তবে এক সাংবাদিক এর পাঠানো বার্তার জবাবে তিনি বর্তমান সরকারের এক প্রতিমন্ত্রীর ঠিকাদারি লাইসেন্সের কপি পাঠিয়ে দাবি করেন, প্রকল্পের কিছু কাজ ওই প্রতিষ্ঠানের কাছে সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল। তবে অভিযোগকারীরা বলছেন, সাব-কন্ট্রাক্টের বিষয়টি থাকলেও বিল প্রদানের পদ্ধতি ও আর্থিক লেনদেনের অসঙ্গতির ব্যাখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়।

বিআইডাব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের বিস্ফোরক দাবি :
বিআইডাব্লিউটিএর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল না এবং তৎকালীন নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রীর এপিএস বাশার ও ঠিকাদার আরশাদ পারভেজের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তাদের বাইরে গিয়ে কোনো কর্মকর্তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি। তাদের ভাষ্য, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক চাপ ছিল প্রকাশ্য গোপন সত্য।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি :
এদিকে চিলমারী নদীবন্দর প্রকল্পে উত্থাপিত এসব অভিযোগের পর স্থানীয় সচেতন মহল, নাগরিক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক নিরীক্ষা, কারিগরি মূল্যায়ন এবং দুর্নীতি অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, সরকারি অর্থ লুটপাট, নিম্নমানের নির্মাণকাজ এবং টেন্ডার অনিয়মের অভিযোগ সত্য হলে এটি দেশের অন্যতম বড় অবকাঠামো দুর্নীতির ঘটনায় পরিণত হতে পারে। তাই বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

উল্লেখ্য: প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট সূত্র, স্থানীয়দের বক্তব্য এবং প্রাপ্ত নথিপত্রের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।




ইউরোপে পাঠানোর নামে ৩১ লাখ টাকা আত্মসাৎ, চক্রের মূলহোতাসহ গ্রেপ্তার ৩

ডেস্ক নিউজঃ ক্রোয়েশিয়া, পর্তুগাল, ইতালি ও সার্বিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চাকরি ও স্টুডেন্ট ভিসার প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া একটি প্রতারক চক্রের মূলহোতাসহ তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব-৪)।

গ্রেপ্তাররা হলেন– শেখ মো. সাদী (৪১), মো. নাহিন (২৫) ও জাহাঙ্গীর আলম (২৪)। তাদের কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৯ জুন) দুপুরে রাজধানীর মিরপুর পাইকপাড়ায় র‍্যাব-৪ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‍্যাব-৪ সদর কোম্পানির কমান্ডার মেজর শেখ আরমান হোসাইন হৃদয়।

তিনি জানান, গত ২৮ মে মো. রমাজন হোসেন খান নামে এক ব্যক্তি র‍্যাবের কাছে অভিযোগ করেন যে, তিনি ও তার শ্যালক বিদেশে পাঠানোর নামে বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।

মামলার পর র‍্যাব-৪ ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার (৮ জুন) রাতে উত্তরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রটির তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে।

মেজর শেখ আরমান হোসাইন হৃদয় বলেন, গ্রেপ্তার শেখ মো. সাদী ‘জাহরা সাদী টিকিটিং অ্যান্ড ট্রাভেলিং’ ও ‘জেএস এডুকেশন অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিস’ নামে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইউরোপে বৈধভাবে লোক পাঠানোর দাবি করতেন। তার সহযোগীদের সঙ্গে মিলে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তিকে ক্রোয়েশিয়া, পর্তুগাল, ইতালি ও সার্বিয়াসহ ইউরোপের উন্নত দেশে চাকরি ও বসবাসের সুযোগ করে দেওয়ার আশ্বাস দিতেন।

তদন্তে জানা যায়, ভুক্তভোগীরা প্রথমে ক্রোয়েশিয়ায় যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখালে চক্রটি তাদের ইতালিতে ওয়ার্ক পারমিটসহ পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। এ জন্য জনপ্রতি ১৪ লাখ টাকা খরচ হবে বলে জানানো হয়। পরে বিভিন্ন চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ধাপে ধাপে ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাউকে বিদেশে পাঠাতে পারেনি চক্রটি।

প্রথমে ক্রোয়েশিয়া পাঠানোর কথা বলে ব্যর্থ হওয়ার পর ছয় মাস পর পর্তুগাল পাঠানোর আশ্বাস দেওয়া হয়। এ উদ্দেশ্যে ভুক্তভোগীদের ভারতীয় দূতাবাসে পাঠানো হলেও দীর্ঘ ৭২ দিন অপেক্ষার পরও কোনো অগ্রগতি হয়নি। একপর্যায়ে ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে যায়।

পরবর্তী সময়ে প্রতারকরা নিউজিল্যান্ডের ভিসা দেওয়ার কথা বলে কয়েক মাস পর একটি ভিসা দেখায়। পরে যাচাই করে সেটি ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়। এরপর সার্বিয়া হয়ে ইতালি পাঠানোর কথা বলে ভুক্তভোগীদের শ্রীলঙ্কায় পাঠানো হয়। সেখানে তাদের স্থানীয় একটি চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে কৌশলে দেশে ফিরে এসে তারা বুঝতে পারেন যে, তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে মেজর শেখ আরমান হোসাইন হৃদয় বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে পাঠানোর নামে অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করার কথা স্বীকার করেছে। তাদের প্রতারণার শিকার আরও অনেক ভুক্তভোগী থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিদেশে যেতে আগ্রহীদের কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই করার পাশাপাশি সরকারি অনুমোদন ও কাগজপত্র পরীক্ষা করা উচিত। অন্যথায় এ ধরনের প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে অনেকেই সর্বস্ব হারাতে পারেন।

গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র‍্যাব।




পোস্টিং থেকে পাচার—মোয়াজ্জেমের দুর্নীতির সাম্রাজ্য, দুদকের জালে অবৈধ সম্পদের খোঁজ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন যেখানেই বদলি হন গড়ে তোলেন দুর্নীতির সিন্ডিকেট, চুক্তি করে টাকা নেন, শিল্পপতিদের কাছে হুন্ডি করে টাকা পাচার করে জোগান ছেলের লেখাপড়ার খরচ, যুক্তরাষ্ট্রেও কিনেছেন বাড়ি।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে মিলেছে অবৈধ সম্পদের প্রমাণ, চেষ্টা করছেন আওয়ামী ঘনিষ্ঠতা আড়াল করে এনবিআরের চেয়ারম্যান হতে দৌঁড়ঝাপ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআরের কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসন শাখার সদস্য মো. মোয়াজ্জেম হোসেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে দায়িত্ব পালন করেছেন ঢাকা কাস্টম হাউসসহ বিভিন্ন দপ্তরে। কখনও তদ্বির করে পছন্দের পোস্টিং নিয়েছেন। আবার কখনও দুর্নীতির অভিযোগে কম গুরুত্বপূর্ণ কমিশনারেটে শাস্তিমূলক বদলি হয়েছেন। তবে যেখানেই গিয়েছেন, সেখানেই দুর্নীতির শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এভাবে দেশে ও বিদেশে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। শুধু তাই নয়, বড় শিল্প গ্রুপের মালিক, ব্যাংকের চেয়ারম্যানদের থেকেও ডিডের মাধ্যমে টাকা ধার করেন। তবে তার দুর্নীতির তথ্য অনেকের কাছে থাকলেও পদোন্নতি পেতে বেগ পেতে হয়নি মোয়াজ্জেম হোসেনকে। কারণ পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের একাধিক মন্ত্রীর সঙ্গে ছিল তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসব তথ্য ও প্রমাণ উঠে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, এনবিআরের গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন মোয়াজ্জেম হোসেন। পাশাপাশি বিভিন্ন কাস্টম হাউসে কর ফাঁকির চালান খালাসে কর্মকর্তাদের বাধ্য করছেন। শুধু ঢাকা কাস্টম হাউস থেকেই সপ্তাহে অন্তত ৫০ লাখ টাকা ঘুষের ভাগ নেয়ার অভিযোগ মিলেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যানের সঙ্গে ৩০ লাখ টাকা ধারের চুক্তি:
বাংলাদেশের আমদানী খাতের অন্যতম নিয়ন্ত্রক মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ-এমজিআই। গ্রুপটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামালের কাছ থেকে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে ৩০ লক্ষ টাকা ধার নিয়েছেন মোয়াজ্জেম হোসেন। কমিউনিটি ব্যাংকের মাধ্যমে এই অর্থ লেনদেন হয়। চেক নং-সি এ-০৩০৬৯** ছেলের লেখাপড়ার খরচ বাবদ তিনি এ টাকা ধার নেন। একশ টাকার দলিলে ধারের চুক্তি করেন মোয়াজ্জেম হোসেন।

ম্যাক্স গ্রুপের চেয়ারম্যানের কাছে ৩০ লাখ টাকা ধার:
২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর ম্যাক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক গুলাম মোহাম্মদ আলমগীর কাছে থেকে সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের মাধ্যমে ৩০ লাখ টাকা ধার হিসেবে গ্রহণ করেন। ব্যাংকের চেক নম্বর সিডি এস এন বি- ১৫০৬৩**. জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কমিশনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অবস্থায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে থেকে চেকের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করা দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ এর ৫ এর (২) ধারায় সরাসরি অপরাধ।

এছাড়াও টাকা দেয়া ব্যক্তিও নিজেও দুদকের মামলায় গ্রেফতারকৃত। ছেলের লেখাপড়ার খরচ বাবদ এ অর্থ নেন মোয়াজ্জেম হোসেন।

আওয়ামী লীগের দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী মায়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ:
আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের মধ্যে অন্যতম মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। তিনি দুদকের মামলার আসামি। মায়ার সঙ্গে কোনো পারিবারিক সম্পর্ক না থাকলেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন মোয়াজ্জেম হোসেন। মায়ার যে কোন পারিবারিক অনুষ্ঠানে হাজির হতেন মোয়াজ্জেম এবং প্রকাশ্যে নিজেকে মায়ার আত্মীয় বলে দাবি করতেন।

হুন্ডির মাধ্যমে যায় ছেলের শিক্ষার খরচ:
মোয়াজ্জেম হোসেনের ছেলে আমেরিকার জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটিতে করেন। প্রতি সেমিস্টারে তার পড়ালেখার খরচ ৩৫ হাজার ডলার। টাকায় যা প্রায় ৪৩ লাখ। দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মোয়াজ্জেম হন্ডির মাধ্যমে এই টাকা আমেরিকায় পাঠান। এমনকি ছেলে রাগীব মোয়াজ্জেমের এই লেখাপড়ার খরচের বৈধ উৎসও নেই মোয়াজ্জেমের।

বাল্টিমোরে বাড়ি :
অভিযোগ উঠেছে, সম্প্রতি আমেরিকার মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোরে একটি বাড়ি কিনেছেন মোয়াজ্জেম হোসেন। তবে এটি তিনি নিজের নামে কেনেননি। বাড়িটি কিনেছেন ছেলে ও ছেলের স্ত্রী আদিবা গাফফারের নামে।

মোয়াজ্জেমের বাড়ি ও জমির ফিরিস্তি:
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে একটি ৮ তলা ভবন নির্মাণ করছেন মোয়াজ্জেম হোসেন। এটি তৈরির কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। ঢাকার ধানমন্ডি ও উত্তরা মোয়াজ্জেম হোসেনের রয়েছে ২টি ফ্ল্যাট। অভিযোগ মিলেছে, ঢাকার পূর্বাচলে দুটি প্লট, জলসিড়ি প্রকল্পে ০১টি প্লট, ডিওএইচএস এলাকায় দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার।

দুদকের গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, এসব সম্পদের খোঁজ বের করতে প্রকাশ্য অনুসন্ধান করা দরকার। মোয়াজ্জেম হোসেন সাভারের বিরুলিয়ার গ্রীণ ভ্যালি কর্পোরেট সোসাইটিতে বিভিন্ন সময়ে বিনিয়োগ করেছেন ১২ লাখ টাকা। উত্তরা ব্যাংকের একটি হিসাবে কোটি কোটি টাকা লেনদেন করেছেন মোয়াজ্জেম হোসেন। হিসাবটির নম্বর: ১৫৭৮১১১০০১১২০*।এখনও এই একাউন্টে ৩৮ লাখ টাকা স্থিতি রয়েছে। এছাড়া সিটি ব্যাংক পিএলসির হিসাব নম্বর: ২৩০৩৬৯৭২৩৪০* এবং সোনালী ব্যাংক পিএলসির হিসাব নম্বর: ৪৪৩২১০১০০৫২** এর মাধ্যমে অস্বাভাবিক লেনদেন করেছেন মোয়াজ্জেম হোসেন।

দুদক গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, এসব একাউন্টে লেনদেনের সঠিক পরিমাণ জানতে প্রকাশ্য অনুসন্ধান জরুরী। আইডিএলসিতে (হিসাব নম্বর: আইডিএ ৩২১৪) এখনো ২৫ লাখ টাকা টাকা স্থিতি রয়েছে।

ঢাকা কাস্টম হাউসে দুর্নীতি:
মোয়াজ্জেম হোসেন ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাটের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার মাত্র ৫ মাসের মধ্যে তৎকালীন চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন ভুঁইয়ার ভাইকে ঘুষ দিয়ে ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার পদে বাগিয়ে নেন। তারপর সেখানে ঘুষ-দুর্নীতি, স্বর্ণ চোরাচালানসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। উপার্জন করেন বিপুল অর্থ।

অনুসন্ধানে দুদক গোয়েন্দারা জানতে পারেন, ২০২০ সালে মিথ্যা ঘোষণার অভিযোগে নুসাইবা ট্রেডিং নামক কোম্পানির একটি চালান আটক করে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা-সিআইসি। চালানটিতে কোটি টাকার বেশির শুল্ক ফাঁকির প্রমাণও মেলে। তা সত্ত্বেও কমিশনার মোয়াজ্জেম হোসেনের নির্দেশে পণ্য ছেড়ে দেন ডেপুটি কমিশনার মারুফ। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে তদন্তে নামে এনবিআর। জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।

মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঢাকা কাস্টম হাউসে ৬ লাখ পিস মেমরি কার্ড তছরুপেরও অভিযোগও মিলেছে। মামুন হাওলাদার নামে এক যাত্রী ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর অবৈধভাবে ৬ লাখ পিস মেমরি কার্ড আমদানি করেন। গ্রিন চ্যানেল পার হওয়ার সময় তা শুল্ক কর্মকর্তাদের হাতে ধরা পড়ে। মাত্র ৩২ লাখ টাকার বিনিময়ে এসব পণ্য ছেড়ে দেয়ার আয়োজন করেন কমিশনার মোয়াজ্জেম হোসেন। যদিও পরবর্তীতে পণ্য হারিয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

ক্ষতিপূরণ হিসেবে আমদানিকারককে ৫ কোটি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে দেয়ার চেষ্টা করেন। বিষয়টি জানতে পেরে তদন্তে নামে এনবিআর ও দুদক। এঘটনায় আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রক অধিদপ্তরের চার কর্মকর্তার শাস্তি হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে মোয়াজ্জেম হোসেন।

যশোর ভ্যাটের কমিশনার পদে থেকে দুর্নীতি:
যশোর ভ্যাটের দায়িত্বে থাকাকালে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় অবস্থিত আলী বিড়ি কোম্পানি থেকে মাসে ৪৫ লাখ ঘুষ নিতেন মোয়াজ্জেম হোসেন। বিনিময়ে কোম্পানিটিকে দিনে বন্ধ দেখিয়ে রাতে উৎপাদন চালানোর সুযোগ দেন।

মাগুরায় ভুয়া মামলায় ভিশন ড্রাগস লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে এক কোটি টাকার ঘুষ দাবির ঘটনায় মাগুরা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের দুই কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। এদুজন হলেন রাজস্ব কর্মকর্তা বাহারুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মুহাম্মদ আল-মনছুর। মূলত তারা কমিশনারের পক্ষে ঘুস আদায় করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে এই দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়।

এছাড়া বিআরবি কেবল সহ বিভিন্ন বিড়ি-সিগারেট ফ্যাক্টরি থেকে প্রতি মাসে কোটি টাকা ঘুষ নিতেন মোয়াজ্জেম হোসেন। কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরে কয়েকটি বিড়ি ফ্যাক্টরির একটি জাল ব্যান্ডরোল আটকের পর ঘুষের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ার ঘটনার অডিও রেকর্ড ফাঁস হলে মোয়াজ্জেম হোসেনকে চট্টগ্রাম ভ্যাট আপীলে বদলি করা হয়।

রাজশাহী ভ্যাটে দুর্নীতি:
২০১৮ সালে রাজশাহী ভ্যাটের কমিশনার থাকাকালে মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকিতে সহযোগিতার অভিযোগও ওঠে। পাবনায় অবস্থিত ইউনিভার্সেল গ্রুপের ভ্যাট ফাঁকি তদন্তে সহকারী কমিশনার সন্তোষ সরেনকে নির্দেশ দেন কমিশনার মোয়াজ্জেম হোসেন। অডিটে ২৭৩ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু মামলা নিষ্পত্তি করতে ১১ কোটি টাকা ঘুষ দাবি করেন মোয়াজ্জেম। এনিয়ে প্রতিবেদন প্রচার হয় গণমাধ্যমে। পরবর্তীতে ইউনিভার্সাল ফুড কোম্পানী স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

এনবিআরের বদলি বাণিজ্য:
মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে ব্যাপকভাবে ঘুষের বিপরীতে বদলি বাণিজ্য শুরু হয়েছে। রাজস্ব কর্মকর্তা বদলিতে ঘুষের রেট উঠেছে ২৫ লাখ টাকায়। দুদকের গোপন অনুসন্ধানে জানা যায় যে, মোয়াজ্জেম হোসেন শুল্ক ও ভ্যাট প্রশাসন শাখার দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই পছন্দের অফিসারদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পদায়ন করছেন। এমনকি কমিশনারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে মাঠ পর্যায়ের সকল অভ্যন্তরীণ পোস্টিংও নিয়ন্ত্রণ করছেন মোয়াজ্জেম হোসেন। পাশাপাশি বিভিন্ন দপ্তর থেকে নিয়মিত ঘুষ আদায় করছেন। অভিযোগ উঠেছে, শুধু ঢাকা কাস্টম হাউস থেকেই সপ্তাহে ৫০ লাখ টাকা ঘুষের ভাগ নিচ্ছেন তিনি।




কিশোরগঞ্জ এলজিইডিতে অনিয়মের পাহাড়, অগ্রিম বিল বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকার সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ প্রকৌশলী আমিরুল ইসলাম ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত এলজিইডি কিশোরগঞ্জ নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে কর্মরত থাকা অবস্থায় Haor Infrastructure and livelihood Improvement Project (HILIP) প্রকল্পে কাজ না করে ভুয়া LCS কমিটির মাধ‍্যমে সাবেক রাষ্ট্রপ্রতি মোঃ আব্দুল হামিদের এলাকা ইটনা, মিঠামইন এবং অষ্টোগ্রামে কোটি কোটি টাকা উত্তোলন, অত‍্যন্ত নিম্নমানের Submergible Road নির্মাণ যা ১ বছরের মধ‍্যে অস্তিত্বহীন হয়ে যাওয়া এবং ময়মনসিংহ অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প, আমফান প্রকল্প, আইআরআইডিপি প্রকল্প, জিওবি মেইন্টেনেন্সসহ বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ না করে শত শত কোটি টাকার অগ্রিম বিল প্রদান করেছেন এবং সেখান থেকে ঠিকাদারের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা হিসেবে কোটি কোটি টাকা নিয়েছেন।

সূত্র জানায়, ২টি প্রকল্পের মধ্যে তিনি প্রায় ৬ কোটি টাকা অগ্রীম বিল প্রদান করেছেন। যা তার কর্মকালীন সময়ে খুবই সামান‍্য। ময়মনসিংহ অঞ্চল প্রকল্পের আওতায় আব্দুল্লাহপুর উত্তরপাড়া থেকে ঘোষের কান্দি সড়ক। যার দৈর্ঘ‍্য ২ কিলোমিটার। উপজেলা অষ্টগ্রাম। ঠিকাদার-সরকার কনস্ট্রাকশন। অগ্রিম বিল প্রদান ১ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা।

আমফান প্রকল্পের আওতায় কাঠখাল বাজার থেকে বই রাত ইউনিয়ন পরিষদ সড়ক সাড়ে ৪ কিলোমিটার মেরামত। উপজেলা মিঠামইন। ঠিকাদার-মোজাহার এন্টারপ্রাইজ।

অগ্রীম বিল প্রদান ৩ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা। এরকম বিভিন্ন প্রকল্পে তিনি কোটি কোটি টাকার অগ্রীম বিল প্রদান করেছেন। প্রকৌশলী আমিরুল ইসলাম কিশোরগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালীন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মোঃ আব্দুল হামিদ এবং তাঁর ছেলেদের ছত্রছায়ায় থেকে এলজিইডির কাউকে পরোয়া করেননি। আমিরুলের কাছে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী থেকে প্রকল্প পরিচালক সবাই ছিলেন অসহায়। তার বিরুদ্ধে এলজিইডি, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং দুদক থেকে কয়েকবার তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও বঙ্গভবনের নির্দেশে সে সব তদন্ত ধামাচাপা পড়ে গেছে। আমিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া অভিযোগসমূহ পুণ:তদন্ত করলেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর সত‍্যতার প্রমাণ পাওয়া যাবে বলে সচেতনমহল মনে করেন। আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর পরই প্রকৌশলী আমিরুল ইসলাম বোল পাল্টে এখন বিএনপি ঘরনার লোক বনে গেছেন। নানা অভিযোগের ব্যাপারে তার বক্তব্য জানতে এই প্রতিবেদক তার অফিসে গেলে তিনি সাক্ষাত দেননি।