ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ ওষুধ প্রশাসন !! লাগাম টেনে ধরতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হস্তক্ষেপ জরুরি!!

ভেজাল ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হারবাল ওষুধের কারণে দেশে লাখো মানুষ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। যৌনশক্তিবর্ধক, ভিটামিন ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের নামে বিক্রি হওয়া মানহীন ওষুধে হৃদরোগ, লিভার ও কিডনি সমস্যা এমনকি ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর শুধু লাইসেন্স দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে, কার্যকর তদারকি নেই। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা অনুমোদনহীন ও ক্ষতিকর ওষুধ বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

এসএম বদরুল আলমঃঐতিহ্যবাহী ইউনানি ও আয়ুর্বেদ ওষুধশিল্প এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অনেক কোম্পানি নির্ধারিত ভেষজ উপাদান ব্যবহার না করে সস্তা ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল যেমন সিলডেনাফিল সাইট্রেড ও ডেক্সামেথাসনের ব্যবহার করছে। দ্রুত ফল পাওয়ার লোভে এই ধরনের রাসায়নিক মিশিয়ে ওষুধ তৈরি করা হচ্ছে, যা স্বল্পমেয়াদে কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

বিশেষ করে যৌনশক্তিবর্ধক ও মোটা হওয়ার ওষুধে এসব কেমিক্যালের ব্যবহার বেশি দেখা যাচ্ছে। যেখানে আসল ইউনানি-আয়ুর্বেদ ওষুধ ধীরে ধীরে কার্যকর হয়, সেখানে এসব ভেজাল ওষুধ ১-২ ঘণ্টার মধ্যেই কাজ করছে—যা এর ভেতরে কেমিক্যাল থাকার বড় ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক ব্যবহারকারীও দ্রুত ফল পেলেও পরে নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অভিযোগ করেছেন।

অন্যদিকে বাজারে অসংখ্য কোম্পানি গড়ে উঠেছে, যাদের অনেকেই ফর্মুলারি মেনে চলে না। যেমন হাইম্যাক্স ইউনানি ফার্মাসিউটিক্যালস, আরগন ফার্মাসিটিক্যালস, জিকে ফার্মা ও মডার্ন হারবালের মতো প্রতিষ্ঠানের কিছু পণ্যের বিরুদ্ধে ভেজালের অভিযোগ উঠেছে। এসব কোম্পানি ইংরেজি ট্রেড নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে, ফলে অনেকেই এগুলোকে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ মনে করে ভুল করছেন।

ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অনিয়ম রয়েছে। অনেক কোম্পানি বিক্রেতাদের ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিচ্ছে, যা আসল ভেষজ উপাদান ব্যবহার করে সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে সস্তা কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি ওষুধই বেশি ছড়িয়ে পড়ছে বাজারে।

এদিকে তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া এবং কিছু অসাধু চক্রের প্রভাবের কারণে ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং ঐতিহ্যবাহী এই চিকিৎসা পদ্ধতির বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ভেজালের শীর্ষে যারা
লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইউনানী, আর্য়ূবেদিক ও হারবাল কোম্পানীগুলোর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি বাদে সবাই ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধ বিক্রি করছে দেদারছে। এদের প্রধান ব্যবসা হচ্ছে যৌনশক্তি বর্ধক অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রি করা। এদের ২য় বিক্রির তালিকায় রয়েছে রুচি বর্ধক ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধ। অনুসন্ধানে দেখা দেখা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ভেজালের শীর্ষে আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস
আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস ময়মনসিংহের ঠিকানায় লাইসেন্স নিলেও ঢাকায় বসে ব্যবসা পরিচালনা করছে। ‘আরগন ল্যাবরেটরী’ নামে অনুমোদন নিয়ে ভিন্ন নামে ওষুধ বাজারজাত করছে। ইউনানি-আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠানের জন্য নিষিদ্ধ হলেও তারা “ফার্মাসিউটিক্যালস” শব্দ ব্যবহার করে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করছে। তাদের প্রধান ব্যবসা অনুমোদনহীন যৌনশক্তিবর্ধক ‘নাইটেক্স’ ও ‘রিষ্টোর’। এছাড়া ডায়াবেটিস, ভিটামিন ও মিনারেল ওষুধ বিক্রি করছে, যেগুলোর অনেকই অনুমোদিত তালিকায় নেই।

জিকে ফার্মা (ইউনানী)
জিকে ফার্মা-এর লাইসেন্স গাজীপুরে হলেও কার্যক্রম ঢাকাকেন্দ্রিক। ৫০টি ওষুধ উৎপাদনের অনুমোদন থাকলেও বাস্তবে কয়েকটি যৌনশক্তিবর্ধক ও ডায়াবেটিস ওষুধই বাজারে আছে। ‘কমান্ড’ ও ‘গোল্ডেন লাইফ’ নামে উচ্চমূল্যের ওষুধ বিক্রি করে। অভিযোগ রয়েছে, ডায়াবেটিসের ওষুধ প্রথমে কাজ করলেও পরে রোগ আরও বেড়ে যায়।

ন্যাচার ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউনানী) লিঃ
ন্যাচার ফার্মাসিউটিক্যালস অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। মিরপুরে কারখানার পাশাপাশি গোপন ডিপো থেকে এসব পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সুরমা ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউনানী)
সুরমা ফার্মাসিউটিক্যালস-এর ‘আরক পুদিনা’ ও ‘সেব-এস’ সিরাপ ব্যাপক বিক্রি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব পণ্যে অতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারের কারণে দ্রুত শরীরের পরিবর্তন ঘটে। নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলেও এখনো রিপোর্ট পাওয়া যায়নি, যা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

হামজা ল্যাবরেটরীজ (ইউনানী)
হামজা ল্যাবরেটরীজ বিভিন্ন সিরাপ, ট্যাবলেট ও ক্যাপসুল বাজারজাত করছে। অভিযোগ আছে, যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধে ভায়াগ্রার উপাদান এবং অন্যান্য রোগের ওষুধে অ্যালোপ্যাথিক কাঁচামাল ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে, যদিও প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

চিত্রা ল্যাবরেটরীজ (ইউনানী)
চিত্রা ল্যাবরেটরীজ-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদনের অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিভিন্ন সিরাপ ও ভিটামিন পণ্যে অতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

সব মিলিয়ে ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হারবাল ওষুধশিল্পের বর্তমান চিত্র গভীর উদ্বেগজনক। একদিকে অসাধু ব্যবসায়ীদের অনিয়ম ও ভেজাল উৎপাদন, অন্যদিকে তদারকির ঘাটতি—এই দুইয়ের চাপে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। দ্রুত লাভের আশায় ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করে তৈরি ওষুধ মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতি করছে, যা অনেক ক্ষেত্রে জীবননাশের কারণও হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর নজরদারি, নিয়মিত ল্যাব পরীক্ষা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা ভেজাল ও প্রতারণামূলক ওষুধ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।




ফায়ার সার্ভিসে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অস্থিরতা, জননিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

 

বিশেষ প্রতিবেদকঃ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সেবা সংস্থা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগ উঠছে। সংস্থাটির বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) এবং তার ঘনিষ্ঠ কিছু কর্মকর্তাকে ঘিরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে বলে অভ্যন্তরীণভাবে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে সংস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং জরুরি সেবার মানও কমে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে জনবল সংকট। প্রায় ৫০০ স্টেশন অফিসারের প্রয়োজন থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে ৩৫০টির মতো পদ খালি পড়ে আছে। ফলে আগুন বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর সাড়া দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এই অবস্থার মধ্যেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, আগেই তালিকা ঠিক করে রাখা, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে প্রার্থী নির্বাচনের মতো গুরুতর অভিযোগ করেছেন অনেক কর্মকর্তা। এমনকি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কিছু ব্যক্তিকে চাকরিতে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

শুধু নিয়োগই নয়, ফায়ার সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ—ফায়ার সেফটি রিপোর্ট তৈরিতেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন ভবন বা স্থাপনার নিরাপত্তা রিপোর্ট দেওয়ার সময় ঘুষ নিয়ে অনুকূল প্রতিবেদন দেওয়া হচ্ছে, যা সরাসরি মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

বদলি বা ট্রান্সফারের ক্ষেত্রেও একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক কর্মকর্তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ইচ্ছেমতো বদলি করা হচ্ছে। চেইন অব কমান্ড ভেঙে জুনিয়র কর্মকর্তাদের দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে, যা পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।

অন্যদিকে বাজেট ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের অসংগতি দেখা গেছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জ্বালানির জন্য অর্থের সংকট থাকলেও বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। এমনকি গত অর্থবছরে কিছু অর্থ খরচ না করে ফেরত দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যা নিয়ে ভেতরে ক্ষোভ রয়েছে।

মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য সদর দপ্তর স্থানান্তরের অভিযোগও উঠেছে। দীর্ঘদিনের সদর দপ্তর সিদ্দিক বাজার থেকে মিরপুরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে ট্রেনিং কমপ্লেক্স নারায়ণগঞ্জে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অর্থ ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের গরমিলের অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন কোর্স থেকে প্রায় ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা আয় হলেও ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে মাত্র ৫৭ লাখ টাকা। বাকি বিপুল অর্থের কোনো স্পষ্ট হিসাব নেই এবং এখন পর্যন্ত কোনো অডিটও হয়নি। প্যাকেজ সেলের আয় নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, যেখানে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা আয় হলেও তা নিয়ম মেনে খরচ করা হচ্ছে না।

এর আগে এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের ঘটনাও সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিক সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে এসব গাড়ি, ড্রাইভার ও অন্যান্য কর্মচারী ব্যবহার করছেন, যা নিয়মবহির্ভূত।

এছাড়া ট্রেনিং কমপ্লেক্সের কর্মকর্তাদের জোর করে নারায়ণগঞ্জে বদলি করা হলেও তারা এখনও সিটি অ্যালাউন্স নিচ্ছেন, যা সরকারি বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ বিষয়ে অডিট আপত্তিও উঠেছে।

ফায়ার সার্ভিসের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স বিভাগের পরিচালকের বিরুদ্ধেও অদক্ষতার অভিযোগ রয়েছে। তার দায়িত্ব পালনের পর মাঠপর্যায়ে তদারকি কমে গেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তিনি অনুপস্থিত থাকেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে পুরো কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে।

সব মিলিয়ে, ফায়ার সার্ভিসের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ভেতরে-বাইরে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, নইলে এই গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত আরও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।

 




ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩: কাগজে কাজ, বাস্তবে শূন্য—কোটির পর কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এখন যেন সাধারণ একটি সরকারি অফিস নয়, বরং অভিযোগ উঠেছে এটি একটি সংগঠিত দুর্নীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ২০২১-২০২২ অর্থবছর থেকে শুরু করে পরবর্তী সময় পর্যন্ত এই দপ্তরে একের পর এক অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন নথি, বিল-ভাউচার, টেন্ডার রেকর্ড এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন মোঃ কায়সার ইবনে সাঈখ, যিনি তখন নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন এবং বর্তমানে ঢাকা গণপূর্ত মেট্রোপলিটন জোনের স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সতীনাথ বসাক এবং সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমেদের নামও বারবার উঠে এসেছে। 

অভিযোগ রয়েছে, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বাজেট শেষ করার নামে প্রায় ৪ কোটি টাকার বিল অনুমোদন করা হয়, যেখানে কাজের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এই টাকা ছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকার একটি বড় ব্যয়ের অংশ, যা দ্রুত খরচ দেখানোর জন্য নানা কৌশলে ব্যয় দেখানো হয়। প্রকল্পের কাগজপত্র থাকলেও বাস্তবে কোনো কাজ সম্পন্ন হয়নি—এমন তথ্যও উঠে এসেছে।

একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো তেজগাঁও ল্যান্ড রেকর্ডস অফিসের একটি সংস্কার কাজ, যেখানে প্রায় ১৯.৮৭ লাখ টাকার বিল পাশ করা হয়। কাগজে দেখানো হয়েছিল থাই গ্লাস, টাইলস, রং এবং সিভারেজ লাইনের কাজ হয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, এসব কাজের কোনো চিহ্নই নেই। একইভাবে এনবিআর ভবন এবং অডিট কমপ্লেক্সে মেরামতের বিল অনুমোদন করা হলেও বাস্তবে ভবনের দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়ে গেছে, কোনো সংস্কারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও সামনে এসেছে। বলা হচ্ছে, কায়সার ইবনে সাঈখ এবং সতীনাথ বসাক ঠিকাদারদের কাছ থেকে অন্তত ৫ শতাংশ কমিশন নিতেন। এর বিনিময়ে ঠিকাদাররা অসম্পূর্ণ বা কোনো কাজ না করেই বিল তুলতে পারতেন। ফলে সরকারি অর্থ সরাসরি লুটপাটের সুযোগ তৈরি হয়।

অন্যদিকে, সরকারি ভবনগুলোর অবস্থা যেখানে নাজুক, সেখানে নিজের অফিস রুমের জন্য প্রায় ২১ লাখ টাকা ব্যয় করার অভিযোগ উঠেছে কায়সারের বিরুদ্ধে। বারবার টাইলস ও মার্বেল পরিবর্তন, অপ্রয়োজনীয় টয়লেট ফিটিংস বসানো—এসবকে অনেকেই অর্থ অপচয়ের কৌশল হিসেবে দেখছেন।

টেন্ডার প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ই-জিপি পদ্ধতিতে টেন্ডার আহ্বান করার নিয়ম থাকলেও সেটিকে পাশ কাটিয়ে ম্যানুয়ালি নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয়েছে। এটি সরাসরি সরকারি ক্রয় বিধিমালার লঙ্ঘন বলে মনে করা হচ্ছে।

হাসপাতাল ও মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পেও ঘুষের নির্দিষ্ট হার নির্ধারণের অভিযোগ এসেছে। ২৫০ শয্যার একটি জেনারেল হাসপাতালের ৩ কোটি টাকার বিল থেকে ১০ শতাংশ কমিশন দাবি করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এছাড়া তিনটি মডেল মসজিদ প্রকল্পে প্রায় ১.২ কোটি টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। এর ফলাফল হিসেবে দেখা গেছে—টাইলস খসে পড়া, পাইপ লাইনে লিকেজ, লিফট বিকল, অপারেশন থিয়েটারের এসি অকেজো এবং বৈদ্যুতিক সমস্যাসহ নানা ত্রুটি।

এই পুরো সিন্ডিকেটে মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার ফিরোজ আহমেদ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি সাইট পরিদর্শন রিপোর্টে ভুল তথ্য দিয়েছেন, কাজের পরিমাপে জালিয়াতি করেছেন এবং অসম্পূর্ণ কাজকে সম্পূর্ণ দেখিয়ে বিল পাশ করাতে সহায়তা করেছেন।

এছাড়াও, হাইকোর্টের নির্দেশ উপেক্ষা করে একটি প্লট হস্তান্তরের সুপারিশ করার অভিযোগও রয়েছে। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ৬০ কাঠার একটি প্লট, যার ওপর ২০১৭ সালে আদালতের স্থগিতাদেশ ছিল, সেটির মালিকানা হস্তান্তরের জন্য ২০২৩ সালে সুপারিশ করেন কায়সার ইবনে সাঈখ। বর্তমানে এ বিষয়ে একাধিক মামলা চলমান।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—এত অভিযোগ, তদন্ত এবং প্রমাণ থাকার পরও কেন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২০১৯ সালে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনও নথি পরীক্ষা করে। তদন্তে শাস্তির সুপারিশ করা হলেও বাস্তবে কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি এবং পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে, এই পুরো চক্রের পেছনে কারা রয়েছে এবং কেন এত বড় অনিয়মের পরও তারা দায়মুক্তি পাচ্ছে। সরকারি নথি, টেন্ডার রেকর্ড, বিল-ভাউচার এবং সরেজমিনের প্রমাণ থাকার পরও যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এই দুর্নীতির দায়ভার শেষ পর্যন্ত কার ওপর বর্তায়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

 




গণপূর্তে ‘মিস্ত্রী সিন্ডিকেট’—দুর্নীতি, টেন্ডার বাণিজ্য ও ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারিতে আলোচনায় সমীরণ মিস্ত্রী

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তর দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা একটি বড় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানেই দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও অনিয়মের একটি শক্তিশালী চক্র কাজ করছে—এমন অভিযোগ উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রীকে ঘিরে। ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানিলন্ডারিং এবং অফিসের ভেতরে বিতর্কিত ব্যক্তিগত সম্পর্ক—সব মিলিয়ে তাকে নিয়ে এখন নানা আলোচনা চলছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়ের করা এক অভিযোগে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন সমীরণ মিস্ত্রী। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি একা নন—তার ভাই উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মিঠুন মিস্ত্রী এবং আরেক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসীকে সঙ্গে নিয়ে গণপূর্তে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেট বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে প্রভাব খাটিয়ে ঠিকাদার নির্বাচন, কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সমীরণ মিস্ত্রীর নামে একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট এবং বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে। শুধু রাজধানীতেই নয়, তার গ্রামের বাড়িতেও রয়েছে অত্যাধুনিক বাংলো এবং খামারবাড়ি। এসব সম্পদের বেশিরভাগই তার সরকারি আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করা হয়েছে।

এছাড়াও অভিযোগ উঠেছে, সমীরণ মিস্ত্রী ও তার ভাই মিঠুন মিস্ত্রী ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও সম্পদ কিনেছেন। কলকাতায় বাড়ি এবং ব্যবসায় বিনিয়োগ করার কথাও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বিপুল অর্থ মানিলন্ডারিং করে ভারতে পাচার করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে কয়েক কোটি টাকার স্থায়ী আমানত বা এফডিআর থাকার তথ্যও অভিযোগে উঠে এসেছে, যা তাদের সরকারি আয়ের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন বলে বলা হয়েছে।

শুধু সম্পদ অর্জনই নয়, আয়কর ফাইলে এসব সম্পদের প্রকৃত তথ্য গোপন করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সমীরণ মিস্ত্রী এবং তার পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত আয়কর দাখিল করলেও সেখানে প্রকৃত সম্পদের তথ্য লুকিয়ে রেখে আয়কর ফাঁকি দিয়ে আসছেন।

গণপূর্তের বিভিন্ন টেন্ডার প্রক্রিয়ায়ও সমীরণ মিস্ত্রীর প্রভাব থাকার অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, তিনি ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ পাইয়ে দিতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজনদের নাম ব্যবহার করে পরোক্ষভাবে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করতেন। এসব কাজে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসী।

এই দুই কর্মকর্তাকে ঘিরে অফিসের ভেতরেও নানা বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন একই বিভাগে কাজ করার সুবাদে সমীরণ মিস্ত্রী ও সিফাত ওয়াসীর মধ্যে অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ব্যক্তিগত এই সম্পর্কের কারণে দপ্তরের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি তাদের একসঙ্গে ভারত সফরের ঘটনাও অফিসের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

সমীরণ মিস্ত্রী প্রায় সাত বছর গণপূর্তের ইএম সার্কেল–৩ এর অধীন ইএম বিভাগ–৭-এ দায়িত্ব পালন করেন, যার আওতায় জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা পড়ে। এই সময়েই তাকে নিয়ে নানা অভিযোগ ছড়ায় এবং অনেকেই তাকে ব্যঙ্গ করে “জাতীয় সংসদের টাকাখেকো ইঞ্জিন” বলেও উল্লেখ করতে শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় তিনি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে নিজের অবস্থান শক্ত করেছিলেন।

সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে তথাকথিত “আমব্রেলা প্রজেক্ট” নিয়ে। বলা হচ্ছে, জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে বিভিন্ন অঙ্গভিত্তিক প্রকল্প দেখিয়ে ৩০ থেকে ৪০টি দরপত্র দেওয়া হয়। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো—এই প্রকল্পগুলোর কার্যাদেশ দেওয়া, অনুমোদন এবং বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়াতেই সমীরণ মিস্ত্রীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর সমীরণ মিস্ত্রীকে ইএম বিভাগ–৭ থেকে পিএন্ডডি বিভাগ–১-এ বদলি করা হয়। একই সময়ে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসীকেও সেখানে বদলি করা হয়। এই ঘটনা নিয়েও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম, পরে গণপূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার এবং গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফ আহমেদের প্রভাব ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন একই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে নিজের পোস্টিং ধরে রেখেছিলেন।

এদিকে সিফাত ওয়াসীর বিরুদ্ধেও দায়িত্ব পালনে অদক্ষতা ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বলা হচ্ছে, পুরো সময়জুড়ে তিনি মূলত নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তার প্রভাবই ছিল প্রধান।

এতসব গুরুতর অভিযোগ সামনে আসার পরও এখন পর্যন্ত সমীরণ মিস্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান বিভাগীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য একটি শক্তিশালী সুরক্ষা বলয় কাজ করছে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সমীরণ মিস্ত্রী, মিঠুন মিস্ত্রী ও সিফাত ওয়াসীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরে অভিযোগপত্রসহ বার্তা পাঠানো হলে তারা কোনো প্রতিক্রিয়া না দিয়ে যোগাযোগকারীকে ব্লক করে দেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়ের করা আবেদনে সমীরণ মিস্ত্রী, মিঠুন মিস্ত্রী এবং সিফাত ওয়াসীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, মানিলন্ডারিং, আয়কর ফাঁকি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পরবর্তীতে সমীরণ মিস্ত্রী পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। এমনকি তিনি প্রভাবশালী নেতা ওবায়দুল কাদের–এর নাম ব্যবহার করে মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ফোন করানোর চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।




ক্ষমতার আড়ালে কামরুল হাছানের অন্ধকার সাম্রাজ্য: দুর্নীতি, নারী কেলেঙ্কারি ও বিতর্কের দীর্ঘ ছায়া

এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশের গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ কামরুল হাছানকে ঘিরে বিভিন্ন সময় নানা গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবন, ক্ষমতার ব্যবহার এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। অনেকের মতে, তার কর্মজীবনের গল্প শুধু প্রশাসনিক কাজের নয়, বরং ক্ষমতা, প্রভাব এবং বিতর্কিত নানা কর্মকাণ্ডের সমন্বয়ে তৈরি এক জটিল অধ্যায়।

কামরুল হাছান, যিনি অনেক জায়গায় “কামরুপ” নামেও পরিচিত, কুমিল্লার তিতাস উপজেলার গৌরিপুরের কড়িকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ২৭তম বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর সহকারী প্রকৌশলী পদে যোগদান করেন। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৫০ বছর। পারিবারিক দিক থেকেও তিনি প্রভাবশালী একটি পরিবারের সদস্য। তার স্ত্রী ডা. জান্নাতুল মাওয়া টুম্পা পিরোজপুর জেলা সদর হাসপাতালে গাইনী বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত এবং একই সঙ্গে ‘কেয়ার ফাস্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এ রোগী দেখেন। তাদের দুই সন্তান রয়েছে—কন্যা আদিবাতুন নাবিহা এবং পুত্র আব্দুল্লাহ আল নাবহান। কামরুলের ছোট ভাই ডা. মুক্তার হোসেন নাসের ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালে কর্মরত এবং তার স্ত্রী ডা. টুম্পা শিকদারও মেডিকেল কলেজে চাকরি করেন। পরিবারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও তার কর্মজীবনের নানা ঘটনা তাকে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

প্রকৌশলী মোঃ কামরুল হাছান, যিনি অনেক জায়গায় “কামরুপ” নামেও পরিচিত, তাকে ঘিরে নানা সময় নানা বিতর্ক ও অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব ও কৌশল ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও তাকে অনেকেই অত্যন্ত দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে উল্লেখ করেন। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগে দীর্ঘ সময় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন। অনেকের মতে, সে সময় তার প্রভাব এতটাই বেশি ছিল যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও তার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিতেন।

২০১৭ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত নোয়াখালীতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী একটি প্রভাব বলয় গড়ে তোলেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই সময় তিনি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতা ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ মহলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়ে প্রভাব খাটান। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় তিনি বিপুল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা আরও দৃঢ় করেন বলে সমালোচকদের দাবি।

পরবর্তীতে বিভিন্ন অভিযোগের কারণে তাকে নোয়াখালী থেকে বরিশালে বদলি করা হলে সেখানেও তিনি নতুন করে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ ওঠে। বরিশালে দায়িত্ব পালনকালে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়। বিশেষ করে শেখ হাসিনার আত্মীয় হিসেবে পরিচিত সাদিক আব্দুল্লাহর সঙ্গে তার সমন্বয়ের কথাও অনেকের মুখে শোনা যায়। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় দরপত্র প্রক্রিয়ায় নিয়মিত পদ্ধতির পরিবর্তে ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করা হতো। এলটিএম (LTM) পদ্ধতির বদলে ওটিএম (OTM) পদ্ধতিতে টেন্ডার আহ্বান করে কমিশনভিত্তিক একটি বাণিজ্য চালু করা হয়েছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।

সমালোচকদের মতে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ১০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে বড় বড় সরকারি কাজ বণ্টন করা হতো এবং এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতবদল হয়েছে। বরিশালের মেডিকেল সাবডিভিশনের কিছু প্রকল্প নিয়েও তখন নানা অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তবে এত আলোচনা ও অভিযোগ সত্ত্বেও প্রশাসনিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে তিনি দীর্ঘ সময় কোনো বড় ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হননি বলে অনেকেই মন্তব্য করেন।

আরেকটি আলোচিত অভিযোগ ছিল নিজের ব্যাচমেট প্রকৌশলী সাদ মোহাম্মদ আন্দালিবকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি জাল ডিও (ডেমি অফিসিয়াল) লেটার তৈরির পরিকল্পনা। বলা হয়, প্রভাবশালী নেতার নাম ব্যবহার করে একটি ভুয়া চিঠি তৈরি করে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল, যাতে আন্দালিবকে বদলি করা যায় এবং নোয়াখালীতে আবারও নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। এই ঘটনাও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছিল।

এই সময়টাতে তার বিরুদ্ধে একদিকে প্রশাসনিক দুর্নীতির অভিযোগ, অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা বিতর্ক সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন। স্থানীয় কিছু ঠিকাদার তার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন এবং তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি কাজ বণ্টনের অভিযোগ ওঠে। ভাঙারি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মামুন, যার প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স আব্দুল ছাত্তার আহাদ, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও বিভিন্ন সূত্রে উঠে আসে। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে বারবার কাজ পাইয়ে দেওয়া হতো এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ছাড়া বা একক দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেওয়া হয়েছে।

একাধিক ঘটনার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের শেষদিকে কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক কাজ একই ঠিকাদারের কাছে দেওয়া হয়। আবার ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ২২টি কার্যাদেশ জারি করার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় অনেকেই মনে করেন, টেন্ডার প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয়নি।

নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প নিয়েও তার বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, দরপত্র জমা দেওয়ার ঠিক আগে প্রকল্পের প্রাক্কলিত মূল্য কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার সুবিধা পায়। একইভাবে হাতিয়া মডেল মসজিদ প্রকল্পেও কাজের অগ্রগতি কম হলেও তুলনামূলক বেশি বিল দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

শুধু প্রশাসনিক বিষয়ই নয়, তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নানা বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সময় তার বিরুদ্ধে একাধিক নারী কেলেঙ্কারি, পরকীয়া এবং অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ ওঠে। পটুয়াখালীতে কর্মরত থাকার সময় এক অধস্তন কর্মকর্তার স্ত্রী ঝুমুরের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বড় ধরনের আলোচনা শুরু হয়। অভিযোগ আছে, ওই কর্মকর্তা অন্য কাজে বাইরে গেলে কামরুল নিয়মিত তার বাসায় যাতায়াত করতেন। এমনকি যাতায়াত গোপন রাখার জন্য বাসার পেছনের দেয়ালে আলাদা দরজা তৈরি করা হয়েছিল বলেও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। বিষয়টি একসময় প্রতিবেশীদের নজরে এলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং ঘটনাটি নিয়ে বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়। পরে ওই দম্পতির সংসার ভেঙে যায় বলে জানা যায়।

আরেক ঘটনায় বলা হয়, নোয়াখালীর মাইজদী এলাকায় এক কিশোরীকে নিয়ে বিতর্কিত একটি ঘটনায় স্থানীয় মানুষের হাতে তিনি মারধরের শিকার হন। অভিযোগ ওঠে, ওই কিশোরীর সঙ্গে তার আপত্তিকর সম্পর্কের ঘটনা সামনে আসার পর এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ঘিরে ফেলে। পরে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এছাড়া তার বিরুদ্ধে তথাকথিত “মুতা বিয়ে” নামে সাময়িক সম্পর্কের অভিযোগও বহুবার আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি একাধিক নারীর সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি সম্পর্ক স্থাপন করতেন এবং এটিকে অনেক সময় বিয়ের নামে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হতো। তবে ইসলামী শরীয়াহ ও বাংলাদেশের আইনে এ ধরনের বিয়ের কোনো স্বীকৃতি নেই বলে ধর্মীয় ও আইন বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন।

তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের তালিকায় আত্মীয়স্বজনদের মধ্যেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এক পর্যায়ে তার সম্বন্ধীর স্ত্রী ফিরোজার সঙ্গেও অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ সামনে আসে। ফিরোজা পেশায় একজন নার্স এবং তার স্বামী একজন চিকিৎসক। এ ঘটনাও পরিবারিক ও সামাজিক মহলে আলোচনার জন্ম দেয়।

এদিকে প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় ক্ষমতাসীন রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান বলে অনেকের দাবি। বরিশালে বদলি হওয়ার পরও তিনি নতুন একটি টেন্ডার সিন্ডিকেট তৈরি করেন বলে অভিযোগ ওঠে। সেখানে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি সাদিক আব্দুল্লাহর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কথাও আলোচনায় আসে।

আরেকটি বিতর্কিত ঘটনা হলো নিজের ব্যাচমেট প্রকৌশলী সাদ মোহাম্মদ আন্দালিবকে সরাতে একটি জাল ডিও লেটার তৈরি করার অভিযোগ। বলা হয়, তিনি প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার নাম ব্যবহার করে একটি ভুয়া চিঠি তৈরি করেন এবং সেটি মন্ত্রণালয়ে পাঠান, যাতে আন্দালিবকে বদলি করা হয়। পরে এই ঘটনাটি প্রশাসনিক মহলেও আলোচনার জন্ম দেয়।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা এসব অভিযোগ, বিতর্ক এবং অনিয়মের কারণে শেষ পর্যন্ত তাকে নোয়াখালী থেকে সরিয়ে অন্য জেলায় বদলি করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তাকে হবিগঞ্জে পদায়ন করা হয়। তবে বিভিন্ন মহলে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে—এত অভিযোগ ও বিতর্কের পরও কীভাবে তিনি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

এই ঘটনাগুলো প্রশাসনের স্বচ্ছতা, নৈতিকতা এবং ক্ষমতার ব্যবহারের বিষয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। অনেকের মতে, এমন অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে সত্য ঘটনা সামনে আসে এবং প্রশাসনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।




কানাডিয়ান ট্রিলিনিয়াম স্কুলের এমডি মাহমুদুর রহমান পিয়ালকে ঘিরে যৌন হয়রানি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ, ভুক্তভোগীদের মধ্যে আতঙ্ক

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ঢাকার গুলশান এলাকায় অবস্থিত কানাডিয়ান ট্রিলিনিয়াম স্কুল ও এর সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পাসগুলোকে ঘিরে সম্প্রতি নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। স্কুলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান পিয়ালের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন বর্তমান ও সাবেক কিছু শিক্ষক-কর্মকর্তা। এসব অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং বিভিন্ন অনিয়মের খবর চাপা দিতে পিয়াল প্রভাব খাটানোর পাশাপাশি কিছু ব্যক্তির মাধ্যমে সাংবাদিক ও স্কুলের সাবেক-বর্তমান কর্মীদের হুমকি দিচ্ছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাহমুদুল হাসান বাদল নামের এক ব্যক্তি পিয়ালের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের ফোন করে দেখা করতে বলেন এবং সেখানে গিয়ে সাংবাদিকরা নানাভাবে ভয়ভীতি ও চাপের মুখে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির আত্মীয় পরিচয় দিয়ে বলেন যে স্কুলের এমডির বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ প্রকাশ করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুধু সাংবাদিকরাই নন, স্কুলের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা ও শিক্ষকও একই ধরনের হুমকির মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন।

স্কুলের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন অনেক কর্মী। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮০ শতাংশ কর্মী নারী হলেও তাদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করার মতো পরিবেশ নেই। কিছু কর্মীর দাবি, নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতার চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও অন্য বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, যারা এমডির ব্যক্তিগত ইচ্ছার সঙ্গে সায় দেন তাদের পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি হয়, আর যারা এতে রাজি হন না তারা মানসিক চাপ ও অপমানের মুখে পড়েন কিংবা একসময় চাকরি হারান।

স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে কর্মরত পাকিস্তানি নাগরিক আয়েশাকে ঘিরেও নানা প্রশ্ন তুলেছেন কিছু কর্মী। তাদের বক্তব্য, তিনি প্রথমে শিক্ষক সহকারী হিসেবে যোগ দিলেও পরে দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে ভাইস প্রিন্সিপাল হন। কিছু কর্মীর দাবি, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং এমডি মাহমুদুর রহমান পিয়ালের সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার কারণেই এই পদোন্নতি হয়েছে বলে তারা সন্দেহ করেন। একইভাবে আয়েশার স্বামী জিয়াকেও স্কুলে রিক্রুট ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যদিও তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন শিক্ষক।

এছাড়া স্কুলের ভেতরে আরও কয়েকজন নারী কর্মকর্তা—শুভ্রা সরকার, অবন্তী ও রিফাত—নিয়ে নানা অভিযোগ করেছেন কিছু কর্মী। তাদের দাবি, এই ব্যক্তিরা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করে অন্য শিক্ষিকাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে এমডির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করতে বিভিন্নভাবে প্ররোচনা দেন। অনেক নারী শিক্ষক নাকি এই পরিস্থিতিতে অতিষ্ঠ হয়ে চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

একজন নারী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কর্মক্ষেত্রে সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেকেই ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করেন। তার দাবি, কোনো নারী কর্মী যদি এমডির ব্যক্তিগত প্রস্তাবে রাজি না হন, তাহলে তাকে নানাভাবে অপমান করা হয় বা চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়।

আরেকটি অভিযোগে বলা হয়েছে, সম্প্রতি কিছু শিক্ষক ও কর্মকর্তাকে নিয়ে কক্সবাজারে একটি ভ্রমণের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে এমডি মাহমুদুর রহমান পিয়াল, আয়েশা, অবন্তী, রিফাতসহ আরও কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন। এ নিয়েও কর্মীদের মধ্যে নানা আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরও কিছু প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে আয়কর ও ভ্যাট সংক্রান্ত অনিয়ম, যথাযথ অনুমোদন ছাড়া বিদেশি শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া কিছু ক্যাম্পাস পরিচালনার বিষয়। এসব অভিযোগের পাশাপাশি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নারী শিক্ষক তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে পোস্ট দিলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। সেখানে তিনি দাবি করেন, এইচআর ম্যানেজার শুভ্রা সরকার তাকে একদিন এমডির বাসায় নিয়ে যান এবং পরে একা রেখে চলে গেলে তিনি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন।

স্কুলের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তা মনে করেন, এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্নভাবে শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু ভয় ও প্রভাবের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে বলতে সাহস পাননি। তারা এখন বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

অভিযোগের সত্যতা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্তৃপক্ষের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা পরিষ্কার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।




কোটি টাকার সাউন্ড সিস্টেমেও সংসদে শব্দ সংকট, হেডফোনে অসুস্থতা—প্রকৌশলীদের গাফিলতির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনসভা জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরুর দিনেই বড় ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা নতুন সাউন্ড সিস্টেম এবং হেডফোন ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দেওয়ায় অধিবেশন চলাকালে একাধিকবার মাইক কাজ করেনি। এমনকি স্পিকারকে নিজের বক্তব্য দিতে গিয়ে বাধ্য হয়ে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে হয়েছে। নতুন হেডফোন ব্যবহারের পর কয়েকজন সংসদ সদস্যও শারীরিক অসুবিধার অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, হেডফোন ব্যবহার করার কিছু সময়ের মধ্যেই কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা শুরু হয়েছে এবং শব্দের মানও খুবই খারাপ।

ঢাকা–১৪ আসনের সংসদ সদস্য মির আহমেদ বিন কাশেম (ব্যারিস্টার আরমান) হেডফোনের মান নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, সংসদে দেওয়া হেডফোন এতটাই নিম্নমানের যে কিছুক্ষণ ব্যবহার করতেই কান ও মাথায় ব্যথা শুরু হয়। তার মতে, সংসদের আগের পুরোনো অডিও ডিভাইসগুলোও সম্ভবত এর চেয়ে ভালো শব্দ দিত। তার এই মন্তব্যের পর আরও কয়েকজন সংসদ সদস্য জানান যে তাদের হেডফোন ঠিকমতো কাজ করেনি এবং অডিও পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল না।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সময় নতুন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বক্তব্য শুরু করতে গিয়ে দেখেন মাইক থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। কয়েকবার চেষ্টা করেও কাজ না করায় তাকে শেষ পর্যন্ত হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করতে হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে তিনি সংসদ সদস্যদের ধৈর্য ধরার অনুরোধ করেন এবং জানান যে যান্ত্রিক সমস্যার কারণে শব্দ সঠিকভাবে শোনা যাচ্ছে না। পরে প্রায় ২০ মিনিটের জন্য অধিবেশন স্থগিত রাখতে বাধ্য হন তিনি। বিরতির পর আবার অধিবেশন শুরু হয়।

এই ঘটনার পর সংসদের অডিও সিস্টেম স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা হলেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) মো. আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফুর রহমান এবং উপসহকারী প্রকৌশলী সামসুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কোনো নতুন প্রযুক্তি চালুর আগে অন্তত ১০ থেকে ১২ দিন ধরে পরীক্ষামূলকভাবে চালিয়ে দেখার নিয়ম থাকলেও এবার সেই নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ফলে উদ্বোধনী অধিবেশনেই পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে চলে আসে।

এ ঘটনায় পুরোনো একটি ঘটনাও আবার আলোচনায় এসেছে। জানা যায়, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আশ্রাফুল হক আগে ২০১৮ সালেও সংসদ ভবনের দায়িত্বে ছিলেন। সেই সময় অধিবেশন চলাকালে প্রায় ৪৫ মিনিট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার মতো ঘটনাও ঘটেছিল। ফলে তার দায়িত্ব পালন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

সংসদের হেডফোন এবং গুজনেক মাইক্রোফোন বসানোর কাজ দেওয়া হয় আমানত এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানের আগে সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সংসদের অডিও সিস্টেমের কাজ করা প্রতিষ্ঠান **কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেড**কে বাদ দিয়ে নতুন এই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। কমিউনিকেশন টেকনোলজি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুর রহমান জোয়ারদার দাবি করেন, তারা বিদেশি বিশেষজ্ঞ দিয়ে সিস্টেম পরীক্ষা করিয়ে একটি প্রতিবেদনও দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে নানা কৌশলে তাদের বাদ দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, সংসদ ভবনে এসি, আলো, অডিও সিস্টেম ও মাইক্রোফোনসহ মোট প্রায় ১২ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু হেডফোন ও গুজনেক মাইক্রোফোন স্থাপনেই প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। একটি গুজনেক মাইক্রোফোনের দাম প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা এবং প্রতিটি হেডফোনের দাম প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বলে জানা গেছে। কিন্তু এত টাকা খরচের পরও কেন এই ধরনের ত্রুটি দেখা দিল—তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কেউ স্পষ্টভাবে দায় স্বীকার করতে চাননি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, তিনি শুনেছেন যে হেডফোন ও মাইক্রোফোনে সমস্যা হয়েছে, তবে বিস্তারিত বিষয়টি তিনি জানেন না। অন্যদিকে সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা জানান, এই ঘটনার দায় তার নয়, তাই তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না।

এদিকে প্রযুক্তিগত ত্রুটি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই আরেকটি বিষয় নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। জানা গেছে, সংসদের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (HVAC) রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণের জন্য কয়েকজন কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. আশ্রাফুল হক, মো. নাজমুল আলম, কাজী মো. ফিরোজ হাসান, ডা. মো. তৌফিক হাসান ফিরোজ, মো. আশরাফুল ইসলাম, মো. রাজু আহমেদ, সিদ্দিকা নাসরিন সুলতানা এবং রিসালত বারী। এই সফরের সমস্ত খরচ বহন করবে ডানহাম–বুশ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। উপসচিব মো. নাজমুল আলম বলেন, এই সফরের ব্যয় সরকার দিচ্ছে না, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই সব খরচ বহন করবে।

তবে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন Transparency International Bangladesh–এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তার মতে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থে বিদেশ সফরে যাওয়ার সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে আমলাতন্ত্রের একটি সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে এবং সরকারি ক্রয়নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে অনেক প্রযুক্তিগত জ্ঞান অনলাইনের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রশিক্ষণ আসলে বিদেশ সফরের সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়।

সব মিলিয়ে জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কোটি টাকার আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম বসানোর পরও উদ্বোধনী অধিবেশনেই মাইক বিকল হয়ে যাওয়া, হেডফোন নিয়ে অভিযোগ এবং অধিবেশন স্থগিত হওয়ার ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি শুধু প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়; বরং ঠিকাদারি নির্বাচন, তদারকির অভাব এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার ফলও হতে পারে। এখন সবার প্রশ্ন—এত বড় প্রকল্পের পরও কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো এবং এর দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে।




যমুনা অয়েলে সিবিএ নেতা নাসিরের চিঠিতে কর্মচারীদের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা কর্তনের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ যমুনা ওয়েলের লেবার ইউনিয়ন ইউনিয়নের সভাপতি আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ এয়াকুব দীর্ঘ দিন ধরে জেল হাজতে । ইতিমধ্যে দুই জনকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে । এদের অনুপস্থিতিতে বর্তমানে যমুনা অয়েলের একক রাজত্ব তাদেরই অত্যান্ত বিশ্বস্ত অনুসারী অপর সিবিএ নেতা মো: নাসির উদ্দিনের৷ বর্তমানে তিনি সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকেও বটে । চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামিলীগ নেতা বদিউল আলমের ভাতিজা নাসির উদ্দিন নিজেও যুবলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। আওয়ামী ঘরনার রাজনৈতিক নেতা বর্তমানে ভোল্ট পাল্টিয়ে হয়ে গেছে বিএনপি ঘরনার । পুরো যমুনা অয়েলে ইচ্ছেমতো চলছে তার চাঁদাবাজি, বদলী ও পদোন্নতি বানিজ্য । বলা চলে তার ইশারায় চলছে যমুনা অয়েল কোম্পানি। জেল হাজতে থাকা দুই সিবিএ নেতাকে জামিনে বের করতে কোটি টাকার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে এই নাসির উদ্দিন৷ এমনকি দুই সিবিএ নেতার সাময়এ বরখাস্ত প্রত্যাহারের জন্য যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষকে চাপ প্রয়োগেরও অভিযোগ উঠেছে এই সিবিএ নেতার বিরুদ্ধে।

এদিকে ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রতিষ্ঠানটির ডিজিএম ফ্যাইন্যান্স বরাবর সিবিএ নেতা নাসির উদ্দিনের দেয়া একটা চিঠি আমাদের কাছে হস্তগত হয়েছে৷ চিঠিতে বিষয় হিসাবে বলা হয়েছে চাঁদা কর্তন। এতে আরও বলা হয়েছে ( সিবিএ) এর কার্যকরী পরিষদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক এবং শ্রমিক কর্মচারীদের মৌখিক সম্পত্তির ভিত্তিতে ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের শ্রমিক কল্যান তহবিলে জমাকৃত অর্থ যাহা সুবিধাভোগীদের মাঝে বন্টন করা হবে। তা হইতে সকল শ্রমিক – কর্মচারী ও সিকিউরিটি সহ প্রতিজনের হিসাব হতে পাঁচ হাজার টাকা করে কর্তন করা অনুরোধ জানান হলো। এধরণের চিঠি দেখে হতবাক যমুনা অয়েলের সাধারণ কর্মচারীরা৷ ইচ্ছে করলেই কর্মচারীরা এর প্রতিবাদ করারও সাহস রাখেনি৷ প্রতিবাদ করতে গেলেই উল্টো তাদেরকে হেনেস্তার শিকার হতে হয়৷ বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য ডিজিএম ফাইন্যান্সকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেনি৷ এদিকে যমুনা অয়েলের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন এধরণের চিঠি দেয়ার এখতিয়ার সিবিএ নেতা নাসির উদ্দিন রাখেনা, তারা দাবি করেন এটা প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির শামিল। তারা এও অভিযোগ করে যমুনা অয়েল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় চলছে এরকম প্রকাশ্য চাঁদাবাজির ঘটনা৷ অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির জিএম এইচ আর মো: মাসুদুল ইসলাম প্রকাশ্যে সিবিএ নেতা নাসিরকে সহযোগিতা করেছে। তার সহয়তায় এই সিবিএ নেতা প্রতিষ্ঠানটিতে দানবের ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে ।

এদিকে চাঁদাবাজি ছাড়াও নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে রয়েছে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ। শ্রমিক কর্মচারী বিশেষে ইনক্রিমেন্ট, গ্রেডিং, পদোন্নতি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও টাকার বিনিময়ে তিনি বদলী, পদোন্নতি বিশেষ ইনক্রিমেন্ট করে থাকেন । অপু দে নামক এক অফিস সহকারী, নারী নির্যাতন মামলায় ছয় মাস জেল হাজতে ছিলেন, যেখানে তার সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার কথা সেখানে নাসিরের ক্ষমতার বদৌলতে বিশেষ ইনক্রিমেন্ট দেয়া হয়৷




পরকিয়ার টানে টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ প্রবাসী স্বামীর ঘর ছেড়ে মিথ্যা মামলা

তৌহিদুর রহমানঃ মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলায় প্রবাসী স্বামীর ৩ লাখ টাকা, স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে স্ত্রী চম্পট দেয়ার পর স্বামী সহ শশুর, দেবর ও ননদের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি কালকিনি থানার উত্তর রমজানপুর গ্রামের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ঘটেছে।

জানা যায়, সৌদি আরব প্রবাসী স্বামীর নাম নাঈম হাওলাদার। সে ওই গ্রামের মিজান হাওলাদারের বড় ছেলে। স্ত্রী বিথী আক্তার হলেন মাদারীপুর জেলার কালকিনি থানার আইরকান্দি গ্রামের শহীদ ফকিরের মেয়ে। বর্তমানে শহীদ ফকির ডিএমপি’র কদমতলী থানার দক্ষিণ ধনিয়ার কুদ্রত আলী বাজারের ১৪৮১ নম্বর বাড়িতে সপরিবারে বসবাস করেন। মিথ‍্যা মামলা সহ তাদের অত‍্যাচার নির্যাতন থকে রক্ষা পেতে ওই প্রবাসীর ছোট ভাই আফিফ হাসান কাউসার (আসামী) ৫ মার্চ ২০২৬ তারিখ নিজে বাদী হয়ে প্রধানমন্ত্রী,স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী,আইন সচিব, আইজিপি, ঢাকার চীপ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সহ বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ ও আবেদন করেন । কাউসার তার অভিযোগ ও আবেদনের বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে মিথ্যা ও কাল্পনিক নাটক সাজিয়ে আদালতে অবৈধ মামলা করে হয়রানির অভিযোগ তোলেন। একই সাথে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।

অভিযোগ সুত্রে জানা যায়,একাধিক পর-পরুষে আসক্ত ওই প্রবাসীর স্ত্রী বিথী আক্তার। হানি ট্রাফের মাধ্যমে যুবকদের থেকে টাকা পয়সা হাতিয়ে নিয়াই তার নেশা ও পেশা। বিথীর এসব অনৈতিক কাজে তার মা-বাবার সহযোগিতার হাত রয়েছে বলে সুত্র নিশ্চিত করে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালে ২ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরব প্রবাসী নাঈম হাওলাদার এর সাথে বিথীর ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা কাবিন মূল‍্যে পারিবারিকভাবে বিবাহ হয়। এরপর নাঈম তার স্ত্রীকে বাবা- মায়ের কাছে রেখে ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট পুনরায় সৌদি আরবে যান। এরপর পরোকিয়া আসক্ত স্ত্রী বিথী ২৮ মার্চ ২০২৫, সকাল ১০ টার দিকে বাবার বাড়ি থেকে খালাতো বোনের বিয়েতে যাবার ছলনা করে তার শাশুড়ির কাছে থাকা সব স্বর্ণের গহনা (৩ ভরি) চেয়ে নেয়। তারপর প্রসাধনী জিনিসপত্র ও কাপড়- চোপড় বড় লাগেজে ভরে তার বাবার বাড়ির উদ্দেশ্যে একাই বেরিয়ে যায়। এরপর স্বামী নাঈম ও তার শশুর-শাশুড়ি একাধিক বার মোবাইলে ফোনে তাকে বাড়ি আসতে বল্লেও সে বিভিন্ন তালবাহানা করে কালক্ষেপণ করতে থাকে। এ বিষয়টি বিথীর বাবা-মাকে একাধিকবার জানালেও তারা কোন পদক্ষেপ নেয়নি।

দীর্ঘদিন পর এক পর্যায়ে বিথী আক্তারের বাবা-মা নাঈমের বাবা-কে মোবাইল ফোনে জানায়, আমার মেয়ে বিথী আর তোমাদের বাড়ি যাবে না এবং তোমার ছেলের সংসারও করবে না। একইভাবে তারা বিথীর স্বামী প্রবাসী নাঈমকে মোবাইলে জানায়, আমার মেয়ে তোমার ঘর করবে না, আমার মেয়ের চিন্তা আর তোমাকে করতে হবে না, সময় মত কাগজ হাতে পেয়ে যাবা ইত্যাদি। তার কিছুদিন পর নাইমের পরিবার জানতে পারে বীথিকে দিয়ে তার বাবা শহীদ ফকির, তার মা ওমেনা বেগম,ভাই তানভীর হোসেন বিল্লাল ও তার ছোট খালু কাউসার মোল্লা বিথির কাছে থাকা নাঈমের ৩ লাখ টাকা ও ৩ ভরি স্বর্নের গহনা। যার বাজার মূল্য ৮ লক্ষাধিক টাকা। এছাড়া লক্ষাধিক টাকার বিভিন্ন জিনিসপত্র আত্মসাৎ করার নেশায় মেতে উঠেছে । তারা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে বিথীকে কু-পরামর্শ দিয়ে স্বামীর বাড়ি থেকে সরিয়ে বাপের বাড়ি আনে। এরপর বিথীকে দিয়ে স্বামী নাঈম হাওলাদার, নাঈমের বাবা মিজান হাওলাদার, ভাই আফিফ হাসান কাউসার ও তার বড় বোন মিতু বেগম এর বিরুদ্ধে ৯ ডিসেম্বর ২০২৫, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার আত্নসাৎ করার উদ্দেশ্য আদালতে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে।

জানা গেছে ঢাকার চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এর কদমতলী থানার আমলী ২০ নম্বর আদালতের ওই মামলা নম্বর-৮৮২/২০২৫। ধারা- যৌতুক নিরোধ আইনের-৩। নাঈম হাওলাদার প্রবাসে অবস্থান কালে মিথ্যা মামলায় আসামি হওয়ায় পুলিশি হয়রানি ও গ্রেফতারের ভয়ে দেশে আসতে সাহস পাচ্ছে না। বিথী ও তার পরিবারের লোকেরা মিথ্যা মামলা দিয়ে মোটা অংকের টাকা আদায়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তারা স্বশরীরে ও মোবাইল ফোনে নাঈম ও তার মা- বাবা,ভাই ও বোনকে একাধিক মামলা দিয়ে জেল খাটাবার হুমকি দিচ্ছে। এমনকি তারা মামলা প্রত্যাহার করতে কাবিনের টাকা সহ ১০ লাখ টাকা আদায়ের পাঁয়তারা করছে। অভিযোগকারী তার অভিযোগে উল্লেখ করেছেন বিথী আক্তার বিভিন্ন পর- পুরুষের সাথে ভয়ানকভাবে পরকীয়া আসক্ত। সে সারাক্ষণ মোবাইল ফোনে বিভিন্ন পর পুরুষের সাথে কুরুচিপূর্ণ আলাপ করে এবং ভিডিও কলে নিজের শারীরিক সৌন্দর্য ও অঙ্গভঙ্গি দেখিয়ে তাদেরকে আকৃষ্ট করে। বিকৃত চরিত্রের এই সুন্দরী তরুণী একাধিক যুবক-কে পরকীয়া প্রেমের ফাঁদে ফেলে সর্বস্ব লুটে নেয়। এসব লুটের অর্থ তার বাবা-মার হাতে তুলে দিয়ে প্রচুর সম্পদ গড়েছে বলে স্বামীর পরিবারের দাবি । ওই লম্পট তরুণী বিভিন্ন নামে এক ডজন এরও বেশি ফেসবুক আইডি ও পেইজ খুলে এসব অনৈতিক কাজে ব্যবহার করে। এর মধ্যে বৈশাখী আক্তার বিথী, বিথী আক্তার, বিথী আক্তার বিথী, মেডিবয় বিথী পেইজ, খাদিজা আইডি ও পেইজ ইত্যাদির নাম জানা গেছে।

অভিযোগে আরো উল্লেখ করেছেন, বিথি বিয়ের পরবর্তী সময় হতে স্বামীর বাড়ির কারো কোন কথা শোনে না। সংসারের কোন কাজকর্মও করতো না। নিজের ইচ্ছামতো বেপর্দায় বেপরোয়াভাবে চলাফেরা করতো। এসব বিষয়ে নাঈমের পরিবারের লোকেরা তার বাবা- মা, ভাই ও ছোট খালুর সাথে কথা বললেও কোন কর্ণপাত করে নাই । বরং তারা আরো উৎসাহ দিয়ে তার জীবন ধ্বংস করেছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে মিথ্যা মামলা কারিনী বিথী ও তার বাবা শহীদ ফকিরের মোবাইলে যোগাযোগ করলে তারা প্রতিবেদকের কাছে সব অভিযোগ অস্বীকার করে। অপরদিকে ভুক্তভোগী আফিফ হাসান কাউসার তার অভিযোগে বিথির মামলার আরজির সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও কাল্পনিক কাহিনী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন ওইসব অভিযোগের কোন দালিলিক তথ্য প্রমান নেই। সবই সাজানো নাটকের উপকরণ মাত্র।

এছাড়া এই মিথ্যা মামলাটি আদালতে তুলে দীর্ঘায়িত করে রাষ্ট্রের অর্থ অপচায় ও মূল্যবান সময় নষ্ট না করার আবেদন করেন তিনি। একই সাথে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণসহ মিথ্যা মামলাবাঁজ ও প্রকৃত অপরাধির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান ওই ভুক্তভোগী ও তার পরিবার।




প্রায় ৫ কোটি টাকার সাউন্ড সিস্টেম বিকল, সংসদে হেডফোন কেলেঙ্কারি—গণপূর্তের পাঁচ প্রকৌশলীর গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই দেখা দিয়েছে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিপর্যয়। প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপিত নতুন সাউন্ড সিস্টেম হঠাৎ করেই অচল হয়ে পড়ায় সাময়িকভাবে থমকে যায় সংসদের কার্যক্রম। একই সময়ে সংসদ সদস্যদের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হেডফোনের নিম্নমান নিয়েও শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এই ব্যর্থতার দায় কার।

ঘটনার শুরু অধিবেশন চলাকালেই। নতুন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বক্তব্য দিতে শুরু করলে হঠাৎ করেই সংসদের মূল সাউন্ড সিস্টেমে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। মাইকে কথা বললেও তা পরিষ্কারভাবে শোনা যাচ্ছিল না। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত তাকে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে বক্তব্য চালিয়ে যেতে হয়। এ সময় স্পিকার অধিবেশন ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি ঘোষণা করেন। বিরতির পর অধিবেশন আবার শুরু হলেও কিছু সময় পর্যন্ত শব্দ বিভ্রাট অব্যাহত ছিল। সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন প্রযুক্তিগত সমস্যাকে অনেকেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন।

এদিকে এই ঘটনার আগেই সংসদে সরবরাহ করা হেডফোনের মান নিয়ে সরব হন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মির আহমেদ বিন কাশেম, যিনি ব্যারিস্টার আরমান নামেও পরিচিত। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে একটি কালো রঙের হেডফোনের ছবি পোস্ট করে তিনি অভিযোগ করেন, সংসদে দেওয়া হেডফোনের মান এতটাই নিম্নমানের যে ব্যবহার করতে গিয়ে কান থেকে মাথা পর্যন্ত ব্যথা অনুভূত হয়েছে এবং শব্দের মানও অত্যন্ত খারাপ। তার এই মন্তব্য দ্রুতই রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন এই সাউন্ড সিস্টেম কেনার জন্য প্রায় ৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। সাধারণত সংসদের মতো উচ্চ নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে নতুন কোনো প্রযুক্তি চালুর আগে ১০ থেকে ১২ দিন পর্যন্ত নিবিড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। কিন্তু এই সিস্টেমের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, সাউন্ড সিস্টেমটি সরবরাহ করেছে আমানত এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যার মালিক দুলাল। ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা নিয়েও অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।

সংসদ ভবনের বৈদ্যুতিক ও প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন প্রকৌশলী। তাদের মধ্যে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) আশ্রাফুল হক, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আসিফুর রহমান এবং উপসহকারী প্রকৌশলী সামসুল ইসলাম রয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, তদারকির ঘাটতি, অযোগ্যতা ও অবহেলার কারণেই নতুন সাউন্ড সিস্টেম প্রথম দিনেই কার্যত ভেঙে পড়েছে।

এই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আরও একটি পুরোনো বিতর্কও সামনে এসেছে। জানা গেছে, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক ২০১৮ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে সংসদ ভবনের দায়িত্বে থাকাকালেও অধিবেশন চলাকালে প্রায় ৪৫ মিনিট বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার ঘটনা ঘটেছিল। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলেও কেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এর মধ্যেই নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে বিদেশ সফরকে ঘিরে। সংসদ ভবনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক অবসরের মাত্র কয়েক মাস আগে কারিগরি প্রশিক্ষণের নামে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সফরে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নাজমুল আলমসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তার। এই প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু হচ্ছে HVAC সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ, যা সাধারণত মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন এমন ব্যক্তিরাও এই সফরের তালিকায় রয়েছেন। ফলে অনেকেই এটিকে প্রশিক্ষণের আড়ালে আমলাতান্ত্রিক প্রমোদ ভ্রমণ বলে মন্তব্য করছেন।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এই সফরের ব্যয় বহন করবে ডানহাম–বুশ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, যারা HVAC রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নাজমুল আলম বলেছেন, এই সফরের খরচ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানই বহন করবে এবং এতে সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন দুর্নীতি বিরোধী বিশ্লেষকরা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোম্পানির টাকায় বিদেশ সফরের সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক সমস্যার অংশ, যা স্পষ্ট স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করে এবং সরকারি ক্রয়নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। তার মতে, অনলাইন যুগে প্রযুক্তিগত তথ্য জানার জন্য বিদেশ সফর অপরিহার্য নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে এসব সফর ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করে।

এদিকে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই যখন প্রায় পাঁচ কোটি টাকার সাউন্ড সিস্টেম কার্যত অচল হয়ে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই ক্রয় প্রক্রিয়া তদারকি করেছেন কারা এবং কেন যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই এটি চালু করা হলো। এখন দেখার বিষয়, দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, নাকি আগের মতোই সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যাবে।