সংসদ ভবনের স্টোরে ‘গায়েব’ ১৩৪৩ কপার বাসবার: নিরাপত্তা, হিসাব ও জবাবদিহি নিয়ে বড় প্রশ্ন

এসএম বদরুল আলমঃ রাষ্ট্রের সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থাপনাগুলোর অন্যতম জাতীয় সংসদ ভবন। সেই সংসদ ভবনের আওতাধীন একটি স্টোররুমকে কেন্দ্র করে দেখা দিয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। সরকারি নথিতে সংরক্ষিত থাকার কথা বলা বিপুল পরিমাণ কপার বাসবারের হিসাব মিলছে না। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন, মালামাল সংরক্ষণ, সার্ভে রিপোর্ট এবং দায়িত্ব নির্ধারণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে আসায় পুরো বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

প্রাপ্ত নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আমব্রেলা প্রকল্পের আওতায় জাতীয় সংসদ ভবনের নবম তলার চারটি বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশনের উন্নয়নকাজে পুরোনো ট্রান্সফরমার, এইচটি ও এলটি প্যানেল থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কপার বাসবার অপসারণ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মোট ১৪০৯টি কপার বাসবার পাওয়া গিয়েছিল, যার মধ্যে ৬৬টি পুনর্ব্যবহার করা হয় এবং অবশিষ্ট ১৩৪৩টি স্টোরে সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে স্টোর পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে উল্লিখিত সংখ্যক কপার বাসবারের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে মাত্র কয়েকটি কপার বার উদ্ধার হয়েছে বলে দাবি করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—জাতীয় সংসদ ভবনের মতো উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় এত বিপুল পরিমাণ ভারী ধাতব মালামাল কীভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল?

নথি পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, একই প্রকল্পের জন্য একাধিক সার্ভে রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে স্বাক্ষরের ঘাটতি রয়েছে, কোথাও তারিখ নেই, আবার কোথাও মালামালের পরিমাণ ও মূল্যায়নে উল্লেখযোগ্য অমিল রয়েছে। এসব অসঙ্গতি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ সংরক্ষণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী অবস্থান। নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং উপসহকারী প্রকৌশলীর মধ্যে কেউই সরাসরি দায় স্বীকার করছেন না। বরং একে অপরের দিকে দায় নির্দেশ করার অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী দাবি করেছেন, তাকে কখনোই স্টোরের প্রকৃত অবস্থা বা মালামালের পূর্ণাঙ্গ হিসাব বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, প্রকল্পের অনেক বিষয়ে তাকে অবহিত করা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট কাজের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না।

এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও নতুন প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রকল্পের কাজ প্রায় সম্পন্ন হলেও তাদের বিলের একটি অংশ আটকে রাখা হয়েছে। এ নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরোধের কথাও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।

ঘটনার পর গণপূর্ত অধিদপ্তর তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত-সংক্রান্ত নথিতে স্টোর ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ সংরক্ষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এখনো পুরো ঘটনার চূড়ান্ত দায় কার ওপর বর্তাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে জাতীয় সংসদ সচিবালয় প্রকাশিত সংবাদকে ‘বিভ্রান্তিকর’ ও ‘অসত্য’ দাবি করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংবাদে উল্লেখিত কপার বাসবারের সংখ্যা ও মূল্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—যদি মালামাল স্টোরে সংরক্ষিত ছিল, তাহলে তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব কোথায়? যদি চুরি হয়ে থাকে, তাহলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁক কোথায়? আর যদি নথিপত্রে অসঙ্গতি থেকে থাকে, তাহলে প্রকল্পের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক জবাবদিহি কতটা কার্যকর ছিল?

জাতীয় সংসদ ভবনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সরকারি সম্পদের হিসাব নিয়ে তৈরি হওয়া এই ধোঁয়াশা কেবল একটি স্টোররুমের ঘটনা নয়; এটি সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট সকল নথি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কপার বাসবারের এই রহস্যের সমাধান মিলবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা।




দুপুরের মধ্যে ৯ জেলায় ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ের আভাস

আবহাওয়া ডেস্কঃ ঢাকাসহ দেশের নয়টি জেলার ওপর দিয়ে দুপুরের মধ্যে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে এসব এলাকায় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। 

মঙ্গলবার (২৬ মে) দুপুর ১টা পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য দেওয়া এক বিশেষ সতর্কবার্তায় আবহাওয়া অধিদপ্তর এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট জেলার ওপর দিয়ে পশ্চিম অথবা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। ঝড়-বৃষ্টির এই আকস্মিক আশঙ্কার কারণে সংশ্লিষ্ট এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর নৌ সতর্ক সংকেত দেখিয়ে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

এদিকে আবহাওয়া সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, শুধু দুপুরের এই ঝড়ো হাওয়া নয়, বরং চলতি সপ্তাহজুড়েই দেশের সবকটি বিভাগে কম-বেশি ঝড়-বৃষ্টির একটি ধারাবাহিক প্রবণতা বজায় রয়েছে। সেই সঙ্গে মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণও হতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।




সিসি ক্যামেরা প্রকল্পে কোটি টাকা লোপাট, দুই গাড়িতে ৩১ চালক! গণপূর্তের ই/এম জোনে অনিয়মের বিস্ফোরক অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম পি অ্যান্ড ডি জোনকে কেন্দ্র করে আবারও সামনে এসেছে ভয়াবহ অনিয়ম, ক্ষমতার
অপব্যবহার ও রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের অভিযোগ। এবার অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর খান। তার বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পে প্রভাব খাটিয়ে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন, আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে পরোক্ষ ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, অডিট আপত্তি ধামাচাপা এবং দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি ও মামলার হুমকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

গত ২৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ধানমন্ডীর বাসিন্দা এলাহী নেওয়াজ খান গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগপত্রের অনুলিপি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটেও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগে যা বলা হয়েছে : অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, মো. আলমগীর খান দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকা শহরে একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট, বিলাসবহুল গাড়ি, গ্রামের বাড়িতে বাংলো ও খামারবাড়ি রয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার এফডিআর থাকারও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, এসব সম্পদের সঙ্গে তার বৈধ আয়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই।

এছাড়া অভিযোগে আরও বলা হয়, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করে কানাডায় বাড়ি ক্রয় ও ব্যবসায় বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে আয়কর নথিতে প্রকৃত সম্পদের তথ্য গোপন করে নিয়মিত কর ফাঁকির অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে। সাভার স্মৃতিসৌধে ‘কাগুজে’ সিসি ক্যামেরা প্রকল্প! অভিযোগে সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্য হিসেবে উঠে এসেছে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্পের অনিয়ম।

অভিযোগ অনুযায়ী, ই/এম বিভাগ-৬ কোনো কার্যকর সিসি ক্যামেরা স্থাপন না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ১৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করেছে। অডিট রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জুন মাসে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে তিনটি কার্যাদেশ দিয়ে ১৬ চ্যানেলের ডিডিআর, ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা, ডিসপ্লে মনিটর ও অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহ এবং স্থাপনের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ ছাড় করা হয়। অথচ পরবর্তীতে অডিট কর্মকর্তারা সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পান, অধিকাংশ যন্ত্রপাতি অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে এবং প্রকল্পের বাস্তব কোনো কার্যকারিতা নেই ।

অডিট প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, পর্যাপ্ত কারিগরি জনবল থাকার পরও সিস্টেমগুলো সচল করা হয়নি, কিন্তু অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল দেখানো হয়েছে। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টদের মতে, “এটি শুধুমাত্র প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের একটি সংগঠিত চিত্র।”

দুটি গাড়ি, কিন্তু ৩১ চালক! ই/এম বিভাগ-৮ নিয়েও উঠেছে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ। সরকারি নথি অনুযায়ী, বিভাগটিতে সচল রয়েছে মাত্র দুটি গাড়ি। অথচ ওই দুই গাড়ির বিপরীতে নিয়মিত ৩১ জন চালকের বেতন-ভাতা উত্তোলন করা হয়েছে। শুধু এই খাতেই বছরে প্রায় ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে।

অভিযোগে বলা হয়, মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে এসব তথাকথিত চালকের বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ নামই কাগজে-কলমে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি। তার ভাষ্যমতে, “ভুয়া নিয়োগ দেখিয়ে বছরের পর বছর সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।” অডিট রিপোর্টেও মিলেছে অনিয়মের প্রমাণ : অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত একাধিক অডিট রিপোর্টে আর্থিক অসঙ্গতি, অতিরিক্ত ব্যয়, নথিগত গরমিল এবং অনিয়মের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উঠে এলেও রহস্যজনক কারণে কোনো কার্যকর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় সংশ্লিষ্টরা বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন : গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারকারী একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে মো. আলমগীর খানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি বিশেষ সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হিসেবে প্রভাব খাটিয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। এদিকে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর পদায়ন নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক আনুগত্য ও বিশেষ গোষ্ঠীর সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের সংস্কৃতি এখনো বহাল রয়েছে। ফলে অতীত সরকারের সময়ে গড়ে ওঠা বিতর্কিত প্রশাসনিক বলয় এখনও সক্রিয় থেকে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের সুযোগ পাচ্ছে।

বক্তব্য মেলেনি: অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. আলমগীর খান এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি। ফলে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তদন্ত দাবি : সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ, মানিলন্ডারিং ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত। তাই দুদক, বিএফআইইউ এবং আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের মাধ্যমে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন জরুরি।

একই সঙ্গে অভিযোগে উত্থাপিত সম্পদের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, বিদেশে বিনিয়োগ এবং প্রকল্প ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট করারও দাবি উঠেছে।




বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ: খোন্দকার আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে মানববন্ধন, সাংগঠনিক ব্যবস্থার দাবি নারী সাংবাদিকদের

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সাংবাদিক নেতা খোন্দকার আলমগীর হোসেন-এর বিরুদ্ধে ওঠা নৈতিক স্খলন, ভুক্তভোগী নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ ও দীর্ঘদিন হয়রানির অভিযোগকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। নারী সাংবাদিকদের অভিযোগ, এমন অশ্লীল ও চরিত্র স্থলনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাংবাদিক সমাজে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হয়েছে।

এসব ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার (২৫ মে) সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাব-এর সামনে “নারী সাংবাদিক ঐক্য” ব্যানারে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে সংগঠনের আহ্বায়ক আয়শা সিদ্দিকা ও সদস্য সচিব জেসমিন জুই বক্তব্য রাখেন।

বক্তব্যে জেসমিন জুই বলেন, “এমন কলঙ্কিত ব্যক্তি যদি জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের মতো ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে নারী সাংবাদিকরা শঙ্কিত ও ভীতসন্ত্রস্ত বোধ করেন।”

তিনি আরও বলেন, সাংবাদিক সমাজের মর্যাদা রক্ষায় খোন্দকার আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। মানববন্ধন থেকে বক্তারা অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

এ সময় দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, আলোকচিত্রী ও ক্যামেরাপারসন উপস্থিত ছিলেন।




রাজউকে যোগ দিয়েই ১৬ কোটি টাকার গোপন চুক্তি! যুগ্ম সচিব শামসুল আলমকে ঘিরে তোলপাড়

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ— রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)—বরাবরই দুর্নীতি, টেন্ডার বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আলোচিত। কিন্তু এবার যেন সেই পুরোনো সব রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেলেন নবনিযুক্ত সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) শামসুল আলম।

দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই কোটি কোটি টাকার রহস্যজনক “লোন চুক্তি”, সুদে-আসলে বিপুল অর্থ ফেরতের অঙ্গীকার এবং “কাজ দিয়ে টাকা পরিশোধের” প্রতিশ্রুতি ঘিরে তৈরি হয়েছে বিস্ময়, ক্ষোভ ও তীব্র প্রশ্ন।

অভিযোগ উঠেছে, চলতি মাসের ৩ তারিখে রাজউকের সদস্য হিসেবে বদলি হওয়ার পর থেকেই একের পর এক গোপন আর্থিক চুক্তিতে জড়িয়ে পড়েন এই যুগ্ম সচিব।

সংশ্লিষ্ট একাধিক নথিতে দেখা গেছে, তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ “লোন” হিসেবে নিয়েছেন। তবে এসব ঋণ কোনো সাধারণ আর্থিক লেনদেন নয়—বরং ভবিষ্যৎ দুর্নীতির অগ্রিম বন্দোবস্ত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তিতে শামসুল আলম ১৬ কোটি টাকা গ্রহণের বিপরীতে ১৮ মাস পর ২০ কোটি টাকা পরিশোধের অঙ্গীকার করেছেন।

আরেকটি চুক্তিতে ২৪ মাসে লভ্যাংশসহ ৫৬ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এমন অন্তত চার থেকে পাঁচটি চুক্তিপত্র এখন ঘুরছে বিভিন্ন মহলে, যা নিয়ে রাজউকের অভ্যন্তরেও শুরু হয়েছে চাপা আলোচনা।

সবচেয়ে ভয়ংকর অভিযোগ হলো—ঋণ পরিশোধের পদ্ধতি নিয়েই। চুক্তিপত্রগুলোতে উল্লেখ রয়েছে, এই অর্থ “ক্যাশ অথবা কাজের মাধ্যমে” পরিশোধ করা হবে। অর্থাৎ সরকারি দায়িত্বে থেকে প্রকল্প, প্লট, বরাদ্দ কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক সুবিধা দিয়ে অর্থ শোধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল অনৈতিক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ দুর্নীতির লিখিত ঘোষণা।
প্রশ্ন উঠেছে—একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি সদ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পেয়েছেন, তিনি হঠাৎ কেন শত কোটি টাকার দায়ে জড়াবেন? কী এমন জরুরি প্রয়োজন তৈরি হয়েছিল যে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে একের পর এক উচ্চসুদের আর্থিক চুক্তি করতে হলো ?

অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়েছে রাজউকের গুরুত্বপূর্ণ পদটি “ম্যানেজ” করতেই। অর্থাৎ বদলি ও নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। আর সেই টাকা জোগাড় করতেই বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে সুদে বিপুল অঙ্কের অর্থ ধার নিয়েছেন শামসুল আলম।

আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—চুক্তির নিরাপত্তা হিসেবে তিনি বিভিন্ন পক্ষকে নিজের ব্যাংক হিসাবের ব্ল্যাংক চেক দিয়েছেন। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের একটি স্বাক্ষরিত ফাঁকা চেকের কপিও ঘুরছে সংশ্লিষ্ট মহলে। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার এমন আচরণ প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন অনেকে।

শামসুল আলমের অতীত নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি ধারাবাহিকভাবে “লাভজনক” ও “ধান্দাবাজির” পোস্টিং পেয়েছেন। প্রশাসনের ভেতরে তার পরিচিতি ছিল প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে। আর এখন দেশের সবচেয়ে বিতর্কিত ও দুর্নীতিপ্রবণ সংস্থাগুলোর একটি রাজউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেই যেন আরও বড় খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

এই চুক্তিপত্র ও আর্থিক সমঝোতা নিয়ে শামসুল আলমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

সুশাসনকর্মীরা বলছেন, যদি অভিযোগগুলো সত্য হয়, তাহলে এটি শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দুর্নীতির ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ আর্থিক অপরাধের ভয়াবহ নমুনা। একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব গ্রহণের আগেই যদি “কাজ দিয়ে টাকা শোধের” প্রতিশ্রুতি দেন, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে—এ প্রশ্ন এখন।




নিয়োগ জালিয়াতি থেকে অর্থ আত্মসাৎ: সুবিদখালী সরকারি ডিগ্রি কলেজে নিরীক্ষায় ভয়াবহ অনিয়ম উন্মোচন

এসএম বদরুল আলমঃ পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী সরকারি ডিগ্রি কলেজ-এ দীর্ঘদিন ধরে চলা নিয়োগ জালিয়াতি, আর্থিক অনিয়ম, টিউশন ফি আত্মসাৎ, ভুয়া ব্যয় দেখিয়ে অর্থ লোপাট এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি গোপনের বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে শিক্ষা অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে কলেজটির উপাধ্যক্ষ মোঃ আছাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে, যা স্থানীয় শিক্ষা অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। শিক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষা পরিদর্শক মাহমুদুল হাসান, সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম এবং অডিট অফিসার চন্দন কুমার দেব গত ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে কলেজটিতে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে প্রকাশিত নিরীক্ষা প্রতিবেদনে কলেজটির আর্থিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে ভয়াবহ অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র উঠে আসে।

ফল প্রকাশের আগেই নিয়োগ, প্রশ্নের মুখে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া : নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, মোঃ আছাদুজ্জামান ৮ জুন ১৯৯৭ সালে জীববিদ্যা বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু নিয়োগ সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, আবেদন করার সময় তার এমএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। আবেদনপত্রে তিনি নিজেই “ফলাফল অপ্রকাশিত” উল্লেখ করেছিলেন। বিধি অনুযায়ী চূড়ান্ত ফলাফল ছাড়া আবেদন গ্রহণযোগ্য না হলেও রহস্যজনকভাবে তার আবেদন বাতিল করা হয়নি। বরং তৎকালীন গভর্নিং বডির যোগসাজশে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে ১ জানুয়ারি ২০১১ সালে উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন ওঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রভাষক পদে নিয়োগই যেখানে বিধিসম্মত হয়নি, সেখানে উপাধ্যক্ষ পদে আবেদনও বাতিলযোগ্য ছিল। কিন্তু তা না করে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

অবৈধ নিয়োগে ৬৮ লাখ টাকার বেতন-ভাতা গ্রহণ :
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রভাষক হিসেবে ১ আগস্ট ১৯৯৭ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১০ পর্যন্ত তিনি ১০ লাখ ২৫ হাজার ৮৪৭ টাকা এবং উপাধ্যক্ষ হিসেবে ১ জানুয়ারি ২০১১ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত ৫৭ লাখ ৭৯ হাজার ৬৫০ টাকা বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন।

সব মিলিয়ে ৬৮ লাখ ৫ হাজার ৪৯৭ টাকা সরকারি অর্থ গ্রহণের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে এই অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তার বেতন-ভাতা বন্ধের সুপারিশও করা হয়।

সরকারিকরণের পরও টিউশন ফি জমা হয়নি কোষাগারে :
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১২ আগস্ট ২০১৮ তারিখের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কলেজটি সরকারিকরণ করা হয়। বিধি অনুযায়ী ওই সময় থেকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত টিউশন ফি সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও দীর্ঘ সময় তা জমা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। নিরীক্ষায় দেখা যায়, ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৪০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হলেও পূর্ববর্তী বছরের বিপুল পরিমাণ টিউশন ফির অর্থ জমা হয়নি।

এ বিষয়ে উপাধ্যক্ষ আছাদুজ্জামান নিরীক্ষক দলকে জানান, “টাকা কলেজ তহবিলে সংরক্ষিত রয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি।” তবে নিরীক্ষকরা তার বক্তব্যে সন্তুষ্ট হতে পারেননি।

বোর্ডের ফেরত দেওয়া টাকাও পেল না শিক্ষার্থীরা : নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষা-২০২০ এর ফরম পূরণ ফি বাবদ শিক্ষা বোর্ড থেকে ফেরত পাওয়া ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪০ টাকা ক্যাশ বইয়ে আয় হিসেবে দেখানো হলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেই অর্থ ফেরত বিতরণ করা হয়নি।

এছাড়া কলেজ সরকারিকরণের সময় ডিড অব গিফটে উল্লেখিত ২৭ লাখ ৭৬ হাজার ৬৪৩ টাকা ২১ পয়সা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষিত থাকার কথা থাকলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও আনা হয়েছে।

ক্যাশ বইয়ে আয়, ব্যাংকে জমার তথ্য নেই : নিরীক্ষায় কলেজের ক্যাশ বই ও ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা করে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া যায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত ১ লাখ টাকা ক্যাশ বইয়ে আয় হিসেবে দেখানো হলেও ব্যাংকে জমার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে ১৪ জুন ২০১৭ তারিখে ছাত্র বেতন বাবদ আদায়কৃত ৮৫ হাজার ১০০ টাকাও ব্যাংকে জমা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া সোনালী সেবা ফি বাবদ আদায়কৃত অর্থ এবং ব্যয়ের হিসাবেও গরমিল পাওয়া গেছে। প্রশংসাপত্র ফি বাবদ আদায়কৃত ৫৩ হাজার টাকা ক্যাশ বইয়ে দেখানো হলেও ব্যাংকে জমার কোনো তথ্য মেলেনি।

ভুয়া ব্যয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ :
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনার্স প্রথম বর্ষ পরীক্ষার ফি থেকে ৫ লাখ ১ হাজার ১৭৫ টাকা নির্মাণ কাজে ব্যয়ের তথ্য দেখানো হলেও সংশ্লিষ্ট খাতের সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি।

গভর্নিং বডির সভা, সম্মানী ভাতা, আপ্যায়ন বিল ও যাতায়াত ব্যয়ের ক্ষেত্রেও যথাযথ ভাউচার ও নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ। এমনকি করোনাকালীন লকডাউনের সময়ও পুকুরপাড় সংস্কার, মেহমান আপ্যায়ন ও অন্যান্য খাতে ব্যয়ের তথ্য দেখানো হয়েছে। তবে সেই ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষকরা।

গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র গোপনের অভিযোগ : নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভর্তি, ফরম পূরণ, টিউশন ফি, পরীক্ষার আয়-ব্যয়ের রেজিস্টার, রশিদ ও বিভিন্ন আর্থিক নথিপত্র নিরীক্ষক দলকে দেখানো হয়নি। পরে সরবরাহ করার কথা বলা হলেও সেগুলো জমা দেওয়া হয়নি। এছাড়া বিএম শাখার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে রেজিস্ট্রি কার্ড বিতরণের সময় শিক্ষার্থীপ্রতি ৫০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে সেই অর্থ ব্যাংকে জমা বা ব্যয়ের কোনো বৈধ নথি পাওয়া যায়নি।

‘ভুল বোঝাবুঝি’ দাবি অভিযুক্ত উপাধ্যক্ষের : অভিযোগের বিষয়ে উপাধ্যক্ষ মোঃ আছাদুজ্জামান বলেন,
“কিছু অর্থ কলেজ তহবিলে সংরক্ষিত রয়েছে। অনেক বিষয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লিখিত অনিয়ম ও আর্থিক অসঙ্গতি নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্টরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর অডিট কমপ্লেক্স কর্তৃক ৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে আছাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে প্রায় ৫ কোটি টাকার দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পত্র পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্ফোরক তথ্য থাকছে প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে।




বিআইডব্লিউটিএতে ‘সিবিএ সন্ত্রাস’: মারধর, চাঁদাবাজি ও সাংবাদিক হুমকিতে তোলপাড়

এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ—বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এ আবারও সামনে এসেছে শ্রমিক রাজনীতির আড়ালে ভয়ঙ্কর দখল, নির্যাতন ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ। সংস্থাটির শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) ‘ভারপ্রাপ্ত সভাপতি’ দাবি করা তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে—অপছন্দ হলেই কর্মচারীদের মারধর, চাঁদাবাজি, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে পুলিশে সোপর্দ, বদলির ভয় দেখানো এবং সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের হুমকি-ধমকি দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন তিনি।

বিআইডব্লিউটিএর একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে সুবিধাভোগী একটি চক্রের অংশ হিসেবে পরিচিত মাজহারুল ইসলাম সরকার পরিবর্তনের পরও প্রভাব ধরে রাখতে রাজনৈতিক পরিচয়ের রঙ বদলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। অভিযোগ রয়েছে, আগে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে দাপট দেখানো এই চক্র এখন বিএনপির নাম ভাঙিয়ে নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার বাণিজ্য ও দখলবাজির মাধ্যমে বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছে।

মারধর, ছিনতাই, তারপর পুলিশে সোপর্দ!
মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে সর্বশেষ গুরুতর অভিযোগ ওঠে বিআইডব্লিউটিএর হিসাব বিভাগের অফিস সহায়ক ইসরারুল হাসান সুমনের ওপর হামলার ঘটনায়। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৩ এপ্রিল রাজধানীর মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিএ প্রধান কার্যালয়ের সামনে ১০-১২ জন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে সুমনের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় তাঁকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি তাঁর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। পরে সুমনকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। যদিও বিএনপির এক প্রভাবশালী এমপির হস্তক্ষেপে তিনি ছাড়া পান। তবে এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ঘটনার পরপরই সুমনকে বিআইডব্লিউটিএ সিবিএ ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের পদ থেকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ উঠেছে, ঘটনাটি ঘটার পর কৌশলে পেছনের তারিখ ব্যবহার করে বহিষ্কারের চিঠি ইস্যু করা হয়েছে।

‘৫ আগস্ট’ থেকেই দখল রাজনীতি
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের দিনই মাজহারুল ইসলাম তাঁর সহযোগীদের নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ ভবনের তালা ভেঙে নিচতলার সিবিএ কার্যালয় দখল করেন। এরপর নিজেকে সংগঠনের ‘ভারপ্রাপ্ত সভাপতি’ ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে রাতারাতি বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক দলের ‘সভাপতি’ পরিচয় ব্যবহার শুরু করেন।

অভিযোগ রয়েছে, সংস্থার প্রভাবশালী কয়েক কর্মকর্তার সহায়তায় তিনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে বদলি হয়ে আসেন। এরপর থেকেই শুরু হয় বদলি বাণিজ্য, নিয়োগ সিন্ডিকেট, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব বিস্তারের রাজত্ব।

বিআইডব্লিউটিএর একাধিক কর্মচারীর দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়ে এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে চক্রটি।

চাঁদা না দেওয়ায় নির্যাতনের অভিযোগ:

শুধু সুমন নন, এর আগে গত ১৩ এপ্রিল সংস্থার লিফট অপারেটর মিজানুর রহমানকেও সিবিএ কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, চাঁদার টাকা না দেওয়ায় তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।
এই ঘটনায় মিজানের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মাজহারের সহযোগী ও বিআইডব্লিউটিএর গেজপাঠক পদে কর্মরত শফিকুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, গত দুই বছরে আজিজুল ইসলাম, মজিবুর রহমান, নুরুল আলম, আক্কাস হোসেনসহ আরও অনেক কর্মচারী এই চক্রের নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। অনেককে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ তকমা দিয়ে পুলিশে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিককে হুমকি:
মাজহারুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে গত ২৪ এপ্রিল একটি জাতীয় দৈনিকে “নব্য শ্রমিক দল নেতাদের দাপটে অসহায় কর্মচারীরা” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিন সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম কর্মীকে ফোন করে হুমকি দেন মাজহার। নির্যাতনের শিকার কর্মচারীদের ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তাদের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ তোলেন তিনি। একপর্যায়ে সাংবাদিককে “দেখে নেওয়া” এবং মামলা দিয়ে শায়েস্তা করার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কথোপকথনের একপর্যায়ে গালাগাল করে ফোন কেটে দেন তিনি।

গণমাধ্যমকর্মীদের একটি অংশ বলছেন, এটি শুধু একজন সাংবাদিককে হুমকি নয়; বরং সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে ভয়ভীতি প্রদর্শনের একটি সুস্পষ্ট অপচেষ্টা।

অভিযোগ অস্বীকার মাজহারের:
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাজহারুল ইসলাম। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, “আমি কারও ওপর কোনো নির্যাতন করিনি। ইসরারুলের ওপর মারধরের সময় ঘটনাস্থলেও ছিলাম না। অন্য কোথাও কিছু করে মার খেয়ে এসে এখন আমার ওপর দায় চাপানো হচ্ছে।”

তিনি আরও দাবি করেন, “সুমনকে আগেই সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এটা বিএনপি এমপি শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস ও আমাদের বিষয়। এটি আমরা নিজেরাই বুঝে নেব। এ বিষয়ে অন্য কারও কিছু বলার প্রয়োজন নেই।”

আতঙ্কে সাধারণ কর্মচারীরা:
বিআইডব্লিউটিএর সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে তারা দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কের মধ্যে কাজ করছেন। অভিযোগ করলেও কোনো প্রতিকার মেলে না। উল্টো নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদেরই রাজনৈতিক ট্যাগ দিয়ে হেনস্তা করা হচ্ছে।

তাদের ভাষ্য, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক সংগঠনের নামে এমন দখলদারিত্ব, ভয়ভীতি ও সহিংসতা শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলাই ভেঙে দিচ্ছে না; বরং পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।




হত্যা মামলার আসামি হয়েও প্রভাবশালী ‘সুলতান সিন্ডিকেট’ — বিআইডব্লিউটিএতে ১২০০ কোটি টাকার লুটপাটের অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ—বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এ পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট একটি শক্তিশালী দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা সংস্থাটির বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. সুলতান আহমেদ খান, যিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, টেন্ডার সিন্ডিকেট, বদলি বাণিজ্য ও প্রকল্প লুটপাটের মাধ্যমে বিআইডব্লিউটিএকে কার্যত ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যে পরিণত করেছিলেন।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড সংশ্লিষ্ট একটি মামলায় রাজধানীর ভাটারা থানায় নাম থাকার পরও রহস্যজনক কারণে এখনো গ্রেফতার এড়িয়ে চলছেন এই কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, মামলা থেকে রেহাই পেতে প্রায় ৫ কোটি টাকার “ম্যানেজমেন্ট ফান্ড” গঠন করে বিভিন্ন মহলে তদবির ও প্রভাব বিস্তারের মিশনে নেমেছেন তিনি। একইসঙ্গে নিজেকে “সৎ, দক্ষ ও বিএনপি-ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা” হিসেবে পরিচয় দিয়ে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

“হানিফের ভাগ্নে” পরিচয়ে একক আধিপত্য :
বিআইডব্লিউটিএর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিগত ১৫ বছর ধরে সাবেক আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ–এর ভাগ্নে পরিচয় ব্যবহার করে সংস্থাটিতে অপ্রতিরোধ্য প্রভাব বিস্তার করেন সুলতান আহমেদ খান। বদলি, পদায়ন, নিয়োগ, টেন্ডার অনুমোদন, ড্রেজিং প্রকল্প—সবকিছুই তার ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার অনুমতি ছাড়া সংস্থাটিতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব ছিল। ফলে বিআইডব্লিউটিএতে গড়ে ওঠে এক ভয়ঙ্কর “সুলতান সিন্ডিকেট”, যেখানে যোগ্যতা নয়—রাজনৈতিক আনুগত্য ও অর্থ লেনদেনই ছিল পদোন্নতি ও সুবিধা পাওয়ার প্রধান মাধ্যম।

সৎ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, দুর্নীতিবাজদের ছত্রচ্ছায়া : অভিযোগ রয়েছে, সুলতান খানের ঘনিষ্ঠ শ্রমিক লীগ নেতা সনজিব কুমার দাসকে ব্যবহার করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো হতো। বেনামি অভিযোগপত্র, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো এবং প্রশাসনিক হয়রানির মাধ্যমে বহু কর্মকর্তাকে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল দীর্ঘদিন।

এমনকি গত বছরের ২ অক্টোবর তাকে বিআইডব্লিউটিএ থেকে সরিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে পাঠানো হলেও তার নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংস্থার ভেতরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, বিভাজন তৈরি এবং সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতেই এই চক্র নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শ্রমিক দলের নেতার ওপর হামলার অভিযোগ :
সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএতে শ্রমিক দলের সভাপতি মাজহারুল ইসলামের ওপর হামলার ঘটনায়ও সুলতান খানের অনুসারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, পতিত আওয়ামী বলয়ের সুবিধাভোগী অংশ এখনো সংগঠিত হয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

১২০০ কোটি টাকার ড্রেজিং প্রকল্পে ‘মহালুট’ :
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য। পাবনা ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের ড্রেজিং প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রায় ১২০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে সুলতান আহমেদ খানের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ অনুযায়ী, নদী খননের বিপুল পরিমাণ মাটি বিক্রি করে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও সেই অর্থ ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের বিভিন্ন দরপত্রে পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগ, কমিশন বাণিজ্য এবং কাজের গুণগত মানে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ভুয়া সনদে পদোন্নতির অভিযোগ : সুলতান আহমেদ খানের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ—ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হয়েও ভুয়া সনদ ব্যবহার করে পদোন্নতি নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদ বাগিয়ে নেন তিনি। এমনকি ১৯৯৬ সালে তার চাকরিতে প্রবেশও ছিল রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের মাধ্যমে—এমন অভিযোগও সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে।

“আওয়ামী লীগ ২০৪১ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে” :
বিআইডব্লিউটিএর একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা–ঘনিষ্ঠ মহলের আশীর্বাদে দীর্ঘদিন ধরেই বেপরোয়া আচরণ করতেন সুলতান আহমেদ খান। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিভিন্ন সময় তিনি প্রকাশ্যে বলতেন—“আওয়ামী লীগ ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবে, আমাকে কেউ ছুঁতে পারবে না।”

এই দম্ভের জোরেই তিনি বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাবনা জেলার শতাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার নামে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে রাজধানীর উত্তরায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন তিনি বলে জানা গেছে।

তদন্তে দুদক, ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা :
বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা জানিয়েছেন, সুলতান আহমেদ খান কেন ? বিআইডব্লিউটিএ’র যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠবে সেসকল অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের একটি টিম তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত করছে বলে জানা গেছে।

সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এখনো বিভিন্ন দফতরে বেনামি চিঠি পাঠিয়ে সৎ কর্মকর্তাদের সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক, ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।

নৌখাত সংস্কারে বড় বাধা ‘পুরনো সিন্ডিকেট’ : গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে পতিত আওয়ামী সরকারের বিদায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নৌখাত সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ভেস্তে দিতেই পুরনো দুর্নীতিবাজ চক্র আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নৌখাত বিশেষজ্ঞদের মতে, বিআইডব্লিউটিএতে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক প্রভাব, টেন্ডার সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা না গেলে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ-ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। রাষ্ট্রীয় অর্থ লুট, প্রশাসনিক সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।




ফেইক আইডিতে অপপ্রচার ও কোটি টাকার চেক জালিয়াতির অভিযোগে আদালতে ইনোভেটিভ ফার্মার মালিক শহিদুল হাসান

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ফেইক আইডি খুলে অপপ্রচার, পোস্টারিং করে ভয়ভীতি প্রদর্শন, কোটি কোটি টাকার চেক জালিয়াতি ও ব্যবসায়িক প্রতারণার অভিযোগে এবার আইনের জালে আটকালেন ইনোভেটিভ ফার্মার স্বত্ত্বাধিকারী কাজী মোহাম্মদ শহিদুল হাসান। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালতে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা দায়ের করেছেন এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানেজার মো. রফিক আহমদ।

মামলায় শুধু শহিদুল হাসানই নন, তার সঙ্গে আরও চারজনকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন—মো. জাহিদুল করিম ওরফে রিমন (৩০), মো. শওকত আলী ওরফে রিফাত (২৯), কাজী মোহাম্মদ রুবাইদুল হাসান (৩৫) ও কামাল হোসাইন (৩৮)।
মামলা সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড থেকে নগদ ও বাকিতে ওষুধ ক্রয় করে আসছিলেন ইনোভেটিভ ফার্মার মালিক কাজী মোহাম্মদ শহিদুল হাসান। ব্যবসায়িক লেনদেনের একপর্যায়ে তার কাছে বিপুল অঙ্কের পাওনা জমা হলে তিনি তিন কোটি পঞ্চান্ন লাখ টাকার ৫টি চেক প্রদান করেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সেই চেকের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হন তিনি। পরে বাধ্য হয়ে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানেজার মো. রফিক আহমদ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শহিদুল হাসানের বিরুদ্ধে পৃথক ৫টি মামলা দায়ের করেন।

WhatsApp Image 2026 05 20 at 2.39.03 PM (1)

অভিযোগ উঠেছে, মামলায় জামিন পাওয়ার পর থেকেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন শহিদুল হাসান। এরপর শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেইক আইডি খুলে এলবিয়ন গ্রুপ ও এর চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার। শুধু অনলাইনেই নয়, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পোস্টারিং করেও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কোম্পানিকে চাপে ফেলতে এবং নিজেদের আর্থিক প্রতারণা আড়াল করতে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

এ ঘটনায় এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাইসুল উদ্দিন প্রথমে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে উল্টো এলবিয়ন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতারণা, চুক্তিভঙ্গসহ একাধিক ভিত্তিহীন মামলা ও অভিযোগ তুলে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করেন শহিদুল হাসান ও তার সহযোগীরা।

এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানেজার মো. রফিক আহমদ বলেন, “এটি আমাদের কোম্পানির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। নিজেদের প্রতারণা ঢাকতেই তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে। বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হয়েছে এবং আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।”

WhatsApp Image 2026 05 20 at 2.39.04 PM

অনুসন্ধানে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, ইনোভেটিভ ফার্মার স্বত্ত্বাধিকারী কাজী মো. শাহদিুল হাসান ২০০৫ সালে ‘সান ফার্মা’ নামের একটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন। কিন্তু সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় একপর্যায়ে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।

ব্যবসায়ী মহলে এখন প্রশ্ন উঠেছে—একজন বিতর্কিত ব্যক্তি কীভাবে বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার লেনদেন করে বাজারে প্রভাব বিস্তার করেছেন? ফেইক আইডি, অপপ্রচার, হুমকি, চেক কেলেঙ্কারি ও আইনি জটিলতায় ঘেরা এই ঘটনায় ওষুধ খাতজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করে করপোরেট ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ ব্যবসায়ী সমাজে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত হলে বেরিয়ে আসতে পারে আরও ভয়ংকর সব তথ্য ও আর্থিক অনিয়মের চিত্র।




বিআইডব্লিউটিএতে ‘টেন্ডার সিন্ডিকেট’ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ: হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে আশরাফুজ্জামানকে নিয়ে বিতর্ক

এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রকৌশল বিভাগ) এবং একাধিক মেগা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (PD) এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সীমাহীন দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র, ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বিআইডব্লিউটিএ’র বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পকে কার্যত ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত করেছেন। বিশেষ করে চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সন্দ্বীপ, কক্সবাজারের সোনাদিয়া, টেকনাফের সাবরাং ও জালিয়ার দ্বীপ এলাকায় বাস্তবায়নাধীন জেটি ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নদী খনন, সমীক্ষা ও অবকাঠামো নির্মাণকাজে নিম্নমানের কাজ করিয়ে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত মাটি পরীক্ষা কিংবা বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের যথাযথ সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ফলে প্রকল্প এলাকায় বারবার চর জেগে ওঠা, ভাঙন ও নৌপথ সংকট তৈরি হচ্ছে। এতে একদিকে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে অপচয় হচ্ছে বিপুল সরকারি অর্থ। অভিযোগ রয়েছে, এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামান একটি শক্তিশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বড় বড় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন। নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে দরপত্র ভাগাভাগি, রেইট কোড সরবরাহ এবং পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিআইডব্লিউটিএ’র ভেতরে তার নিজস্ব “ক্যাশিয়ার” রয়েছে বলেও দাবি করেছেন একাধিক সূত্র।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী ঠিকাদার অভিযোগ করে বলেন, “তিনি কমিশন ছাড়া কোনো কাজ করেন না। বড় টেন্ডারগুলো আগে থেকেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাগ করে দেওয়া হয়। সাধারণ ঠিকাদারদের নানা ধরনের ভয়ভীতি, অপমান ও চাপ প্রয়োগ করা হয়।”

অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল ও সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করে তিনি বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ ফ্ল্যাট, প্লট ও বাড়ি গড়ে তুলেছেন।

সূত্র মতে, তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
বাসাবোর অপরাজিতা এলাকায় ৩২/বি/১ ও ৩২/বি/ই নম্বরের ফ্ল্যাট, বাসাবো এলাকায় ৭ তলা বাড়ি
শান্তিনগরে আলিশান ফ্ল্যাট
আহমেদবাগ এলাকায় ৩৩/বি ও ৩৩/সি নম্বরে একাধিক ফ্ল্যাট
মায়াকানন এলাকায় ফ্ল্যাট
মোহাম্মদপুর, বসিলা, ধানমন্ডি, ফতুল্লা, কেরানীগঞ্জ, রূপগঞ্জ, পূর্বাচল, কালীগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়ায় প্লট ও জমি, সবুজবাগ ও মুগদা এলাকায় বাড়ি, নিজ জেলা কুষ্টিয়ায় পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি।

অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পদের বড় অংশই সম্পদ বিবরণীতে গোপন রাখা হয়েছে এবং রাষ্ট্রকে ভুয়া ও অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া হয়েছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ম্যানেজ করে তিনি হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও একইভাবে কমিশন বাণিজ্য ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রেখেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল বিএনপি সরকার গঠনের পর ও একই কাজে লিপ্ত থেকে বিভিন্ন প্রকারের অনিয়ম ও দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন।

ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, বাজেট সংকট থাকা সত্ত্বেও তিনি শত শত কোটি টাকার টেন্ডার আহ্বান করেছেন এবং কমিশনের ভিত্তিতে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিচ্ছেন। এর ফলে একদিকে রাষ্ট্র হারাচ্ছে বিপুল অর্থ, অন্যদিকে সাধারণ ঠিকাদাররা বঞ্চিত হচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নাম:
Development of Jetties and Infrastructure at Mirsarai & Sandwip at Chattogram, Subrang and Jaliar Dwip at Teknaf and Sonadia Dwip at Cox’s Bazar. এ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (PD) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামান।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি মোবাইল রিসিভ না করায় তার কোন প্রকার বক্তব্য প্রকাশিত হলো না।

সংশ্লিষ্ট ওয়াকিবহাল মহল, ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সচেতন মহলের দাবি, এ.এস.এম. আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগসমূহ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একইসঙ্গে তার অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।