‘সুফল’ নয়, কেলেঙ্কারি: বন অধিদপ্তরের বিশাল প্রকল্পে দুর্নীতির জাল ফাঁস করল দুদক

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বনজ সম্পদ উন্নয়নের উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালে বন অধিদপ্তর শুরু করেছিল প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ‘টেকসই বন ও জীবিকা’ বা ‘সুফল’ প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল দেশের বিভিন্ন জেলায় বনভূমি বৃদ্ধি ও মানুষের জীবিকা উন্নয়ন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা গেছে, প্রকৃত কাজের তুলনায় কাগজে-কলমে তৈরি হয়েছে সাফল্যের গল্প।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্প্রতি এই প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে—ভুয়া বিল-ভাউচারে কোটি কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে, অনেক জায়গায় কেবল চারা লাগানোর নামেই টাকা গায়েব, আবার কিছু কর্মকর্তা বদলি ও পদায়নের মাধ্যমে কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন।

দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন, অভিযান শেষে কমিশনের টিম একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেটি বিশ্লেষণ করে আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

জানা গেছে, প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ১ জুলাই শুরু হয়ে ২০২৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা বিট এলাকায় ৫১০ হেক্টর বনভূমিতে বনায়নের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু বাস্তবে বনায়ন হয়েছে মাত্র ১৬০ হেক্টরে। একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৩৬২ হেক্টরের মধ্যে অনিয়ম ধরা পড়েছে উল্লেখযোগ্য অংশে।

সরকারি নথিতে দেখানো হয়েছে যে, প্রকল্পের আওতায় দেশের ২৪টি জেলায় মোট ১ লাখ ৩ হাজার ৯৬০ হেক্টর এলাকায় বনায়ন হয়েছে। এর মধ্যে শুধু কক্সবাজারেই ২০ হাজার ১৩৬ হেক্টর এবং বাকি ৮৩ হাজার ৮২৪ হেক্টর বন বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ছড়ানো। উদাহরণস্বরূপ—ঢাকা বন বিভাগে ২,৮১০ হেক্টর, চট্টগ্রাম উত্তর বিভাগে ৯,২৭৩ হেক্টর, দক্ষিণে ৮,৬৭০ হেক্টর, চট্টগ্রাম শহরাঞ্চলে ৯,২১০ হেক্টর, ভোলায় ৮,৪২০ হেক্টর, পটুয়াখালীতে ৮,৩২০ হেক্টর, রাজশাহীর সামাজিক বন বিভাগে ১৭৭ হেক্টর, দিনাজপুরে ২,০৩০ হেক্টর, মৌলভীবাজারে ২৯০ হেক্টর, চট্টগ্রামে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ বিভাগে ২,৬২০ হেক্টর, কক্সবাজার উত্তরে ৮,৪৬৮ হেক্টর, দক্ষিণে ১১,৬৬৮ হেক্টর, ময়মনসিংহে ৪,৪৪৩ হেক্টর, টাঙ্গাইলে ২,৭১৩ হেক্টর, নোয়াখালীর উপকূলীয় বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৯,৯৯০ হেক্টর, সিলেটে ৪,৬৪৮ হেক্টর এবং ঢাকার বন্যপ্রাণী বিভাগে ২০৫ হেক্টর বনায়নের কথা বলা হয়েছে।

তবে মাঠপর্যায়ে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। শেরপুরের নকশী সীমান্ত ফাঁড়ির কাছাকাছি রংটিয়া রেঞ্জ এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, বনায়নের জায়গায় টিকে আছে মাত্র একটি চাপালিশ গাছ। অথচ সরকারি প্রতিবেদনে ওই জায়গায় বিশাল বাগান তৈরির কথা বলা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়—গাছগুলোতে বন্য হাতির আক্রমণের কোনো চিহ্ন নেই, বরং অক্ষতভাবে দণ্ডায়মান।

দুদকের সূত্র বলছে, এই প্রকল্পে কেবল অর্থ নয়, বদলি বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট গঠন করে কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে সুবিধা বণ্টন করেছেন। একাধিক জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বন অধিদপ্তরের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

দুদকের প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া এসব নথি যাচাই-বাছাইয়ের পর পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। বন সংরক্ষণ ও উন্নয়নের নামেই যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, তা এখন পরিণত হয়েছে দুর্নীতি ও অনিয়মের বনে।




তবিবুরের রাজত্ব: বিশ্বব্যাংকের অর্থে গরিবের প্রকল্পে লুটপাটের হিড়িক

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গরিবদের স্যানিটেশন ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে নেওয়া প্রকল্পে চলছে দুর্নীতির মহোৎসব। পাঁচ বছরের এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে আর এক মাসও নেই, কিন্তু কাজের অগ্রগতি মাত্র ৪৭ শতাংশ। যা হয়েছে, তার বেশির ভাগই অনিয়ম আর নিম্নমানের কাজের জালে জড়ানো।

প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ এলাকায় পাবলিক টয়লেট, ল্যাট্রিন ও ছোট পানির স্কিম নির্মাণের কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অধিকাংশ টয়লেট ও হাত ধোয়ার স্টেশন এখন ভাঙাচোরা, বন্ধ বা সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক জায়গায় নির্মাণকাজে প্রকৌশল স্পেসিফিকেশন মানা হয়নি। মাটির নিচে নির্ধারিত গভীরতায় পাইপ বসানো হয়নি, টাইলস নষ্ট, ফিটিংস চুরি হয়ে গেছে, আর পানিতে অস্বাভাবিক আয়রন—সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ।

সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এসব ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, পর্যবেক্ষণ করা ৪৭টি পানির স্কিমের মধ্যে মাত্র ৪টিতে নিয়ম মেনে কাজ হয়েছে। পাবলিক টয়লেটের ৮০ শতাংশ এখন ব্যবহারযোগ্য নয়। কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য নির্মিত ১৯টি টয়লেটের মধ্যে ১৭টিই বন্ধ বা ভাঙা।

এদিকে এই প্রকল্পের মূল নিয়ন্ত্রক—প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের বিরুদ্ধে উঠেছে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ। ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে তিনি প্রকল্পের বিল নিজের ইচ্ছেমতো পাশ করেছেন বলে জানা গেছে। এমনকি বিল পরিশোধের চেকেও একমাত্র তারই সই থাকত, ফলে মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীরা কার্যত কিছুই করতে পারতেন না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই প্রকল্পের অর্থ দিয়ে তবিবুর রহমান দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। সিরাজগঞ্জ শহরে মায়ের নামে ছয়তলা ভবন, ধানমন্ডিতে ৫ হাজার স্কয়ারফুটের বাণিজ্যিক ফ্লোর, আরও দুটি ফ্ল্যাট এবং ব্যাংককেও একটি ফ্ল্যাটের মালিক তিনি। একাধিক গাড়ি তো আছেই, পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত জীবনেও রয়েছে নানা বিতর্ক। অভিযোগ আছে, তিনি ছয়টি বিয়ে করেছেন এবং প্রতিটি স্ত্রীর জন্য আলাদা বাড়িও তৈরি করেছেন।

সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো—এই তবিবুর রহমানকেই আবার নতুন করে ১,৮৮৯ কোটি টাকার আরেকটি স্যানিটেশন প্রকল্পের পিডি করা হয়েছে, সেটিও বিশ্বব্যাংকের অর্থে। এতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনার ঝড়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. রেজাউল মাকসুদ জাহেদী বলেন, “আইএমইডির প্রতিবেদনটি আমার হাতে আসেনি, তবে বিষয়টি দেখে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অন্যদিকে মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি ফোনে কিছু বলব না, দেখা হলে কথা বলা যাবে।”

সূত্র বলছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই করছে, যদিও তবিবুর প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ আছে।

গরিবের টয়লেট ও পানি সরবরাহের নামে এমন লুটপাট কেবল সরকারি অর্থের অপচয়ই নয়, সাধারণ মানুষের প্রতি এক নির্মম তামাশাও বটে। উন্নয়নের নাম ভাঙিয়ে যারা এভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।




মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠিয়ে ৫২৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ: ৬ রিক্রুটিং এজেন্সির ১১ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৬টি রিক্রুটিং এজেন্সির ১১ জন মালিক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, ৩১ হাজার ৩৩১ জন কর্মীর কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার পরিবর্তে গড়ে পাঁচ গুণ বেশি টাকা নেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে গত মঙ্গলবার কমিশনের বৈঠকে ছয়টি মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়।

প্রথম মামলায় আসামি করা হবে মেসার্স আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের মালিক রুহুল আমিনকে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ৭ হাজার ৪৩০ জন কর্মীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ১২৪ কোটি ৪৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা আদায় করেছে।

দ্বিতীয় মামলায় মেসার্স মেরিট ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণকে আসামি করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি ৩ হাজার ৪৮৯ জনের কাছ থেকে ৫৮ কোটি ৪৪ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকা বেশি নিয়েছে।

তৃতীয় মামলায় সাদিয়া ইন্টারন্যাশনালের শামীম আহমেদ চৌধুরী ওরফে নোমানকে আসামি করা হবে, যিনি ৩ হাজার ৩২১ জন কর্মীর কাছ থেকে ৫৫ কোটি ৬২ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা অতিরিক্ত নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

চতুর্থ মামলায় ইমপেরিয়াল রিসোর্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. ইকবাল হোসাইন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা ৮ হাজার ১০১ জনের কাছ থেকে ১৩৫ কোটি ৬৯ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

পঞ্চম মামলায় আরআরসি হিউম্যান রিসোর্স সার্ভিস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও এমডি মো. আলমগীর কবীরের বিরুদ্ধে ৫ হাজার ২০২ জনের কাছ থেকে ৮৭ কোটি ১৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া ষষ্ঠ মামলায় থানেক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সাবেক এমডি আব্দুল্লাহ শাহেদ, পরিচালক মো. জয়নাল আবেদীন নোমানী ও বর্তমান ব্যবস্থাপক শমসের আহমেদকে আসামি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ৩ হাজার ৭৮৮ জনের কাছ থেকে ৬৩ কোটি ৮৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা অতিরিক্ত নিয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে।

এর আগে গত ১১ মার্চ মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে ১ হাজার ১২৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৩২ জনের নামে এবং ১৪ সেপ্টেম্বর আরও ১ হাজার ১৫৯ কোটি টাকার আত্মসাতের ঘটনায় ১৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির শীর্ষ কর্মকর্তাদের নামে মামলা করে দুদক।

২০১৮ সালে অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের কারণে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করেছিল মালয়েশিয়া। পরে ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর দেশটি আবার শ্রমিক নেওয়ার চুক্তি করে। এরপর ২০২২ সালে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ শ্রমিক পাঠানোর খরচ নির্ধারণ করে ৭৮ হাজার ৫৪০ টাকা।




৮৫৭ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি মামলায় এক্সিম ব্যাংকের সাবেক এমডি ফিরোজ হোসেন গ্রেপ্তার

নিজস্ব ডেস্কঃ ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ৮৫৭ কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে এক্সিম ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফিরোজ হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে নিশ্চিত করেছে দুদকের জনসংযোগ শাখা।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, এক্সিম ব্যাংকের মোট ৮৫৭ কোটি ৯৩ লাখ ৭৩ হাজার ৭৫০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যান, এমডি এবং ২১ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান মিরাজ বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ‘মদিনা ডেটস অ্যান্ড নাটস’ নামে প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা মোজাম্মেল হোসাইন অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে ঋণ নেন। ওই ঋণ অনুমোদনের সময় এক্সিম ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যোগসাজশে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। নিয়মবহির্ভূতভাবে অনুমোদিত ঋণ পরবর্তীতে খেলাপি হয়ে যায়, ফলে ব্যাংকটি ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে এবং সরকারের আর্থিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, আসামিরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে গ্রাহকের ব্যবসার বাস্তবতা যাচাই না করেই ঋণ অনুমোদন করেন এবং যৌথভাবে প্রায় ৮৫৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এই কাজ দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

মামলায় আসামি হিসেবে নাম রয়েছে— মদিনা ডেটস অ্যান্ড নাটসের মালিক মোজাম্মেল হোসাইন; এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তার স্ত্রী সাবেক পরিচালক নাসরিন ইসলাম; বর্তমান চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম স্বপন; সাবেক এমডি ফিরোজ হোসেন; সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাখা ব্যবস্থাপক আসাদ মালেক; ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. আরমান হোসেন; সাবেক এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট আনিছুল আলম; অ্যাডিশনাল ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ইব্রাহিম খান ও মঈনুল ইসলাম; ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মাকসুদা খানম; সাবেক এমডি জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া; সাবেক অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর আব্দুল বারী ও হুমায়ুন কবীরসহ আরও কয়েকজন প্রাক্তন পরিচালক ও কর্মকর্তার।

তদন্তে প্রমাণিত হলে এই ঋণ জালিয়াতি দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বৃহৎ দুর্নীতির ঘটনায় পরিণত হতে পারে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।




দুদকের আবেদনে জেমকন গ্রুপের সিইও কাজী আনিসের সম্পদ জব্দ ও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ জেমকন গ্রুপের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাজী আনিস আহমেদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দ এবং অবরুদ্ধের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁর বিদেশযাত্রায়ও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ সাব্বির ফয়েজের আদালত এ আদেশ দেন।

দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম জানান, দুদকের সহকারী পরিচালক আল-আমিন সম্পদ জব্দ, ব্যাংক ও বিনিয়োগ হিসাব অবরুদ্ধ এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন। আদালত শুনানি শেষে আবেদনটি মঞ্জুর করেন।

দুদকের নথি অনুসারে, কাজী আনিস আহমেদের নামে বিভিন্ন জেলায় মোট ৪৯ দশমিক ৪৩ একর জমি ও রাজধানীর গুলশান এলাকায় একটি প্লট রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ৭ কোটি ২০ লাখ ৭২ হাজার ৮৪৬ টাকা।

অন্যদিকে, অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা প্রায় ৮৪ কোটি ৮৯ লাখ ৮২ হাজার ৮২৫ টাকা এবং ২০টি ব্যাংক হিসেবে থাকা প্রায় ২২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।




এলজিইডিতে ফিরোজ আলমের দাপট: অনিয়মের পাহাড়ে ঘেরা প্রকৌশল অফিস

বিশেষ প্রতিনিধিঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ঘিরে আবারও উঠেছে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ আলম তালুকদার। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী উপসহকারী প্রকৌশলী শেখ রাজিবকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন।

সূত্র জানায়, ফিরোজ আলম তালুকদার ও রাজিব একসঙ্গে মিলে একপ্রকার ‘লুটের রাজত্ব’ গড়ে তুলেছিলেন। শেখ রাজিবের স্ত্রী পুলিশ সদস্য হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গণভবনে দায়িত্বে ছিলেন। তার প্রভাবের কারণে অফিসের অনেকেই রাজিবের মুখের কথাকেই “গণভবনের নির্দেশ” বলে ধরে নিত। এই সম্পর্কের সুযোগে ফিরোজ-রাজিব জুটি বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা আত্মসাত করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সাবেক আওয়ামী সরকারের পতনের পর তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। এলজিইডি ভবনের কর্মচারী ও ঠিকাদাররা ফিরোজ আলম তালুকদারকে লাঞ্ছিত করে অফিস থেকে বের করে দেয়। এমনকি তার জামাকাপড় ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাও ঘটে বলে জানা যায়। ওই সময়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। পরে তিনি গোপনে মাঝে মাঝে অফিসে যেতেন। বর্তমানে তাকে এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একাধিক প্রকল্পে অনিয়মের প্রমাণ। GDP-03 প্রকল্পের অধীনে ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার দেবীনগর আজর আলী মোল্লার বাড়ি থেকে হাশেম মাদবর-করিম মোল্লা সড়কের (দৈর্ঘ্য ৬৩০ মিটার) ঠিকাদার ছিলেন মেসার্স নুর এন্টারপ্রাইজের প্রোপাইটর গাজী হাফিজুর রহমান। প্রকল্পের চুক্তিমূল্য ৬৭,০০,০০০ টাকা হলেও কাজ না করেই অতিরিক্ত ৩৭ লাখ টাকা বিল তোলা হয়। এ ঘটনায় উপসহকারী প্রকৌশলী শেখ রাজিব ও নির্বাহী প্রকৌশলী ফিরোজ আলম তালুকদারের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

তাছাড়া, IRIDP-3 প্রকল্পের অধীনে দোহার উপজেলার রাধানগর কৃষ্ণদেবপুর স্যাটেলাইট স্কুল সড়কের কাজের দায়িত্বে ছিল বিসমিল্লাহ কনস্ট্রাকশন, যার প্রোপাইটর আবুল কালাম আজাদ। ১ কোটি ২২ লাখ টাকার এই কাজেও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। নির্ধারিত সময়ের আগেই ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হলেও কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়, ফলে প্রকল্পটি ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে বাতিল করা হয়।

এ ছাড়া নবাবগঞ্জ উপজেলার বান্দুরা-বারুয়া খালি শিকারীপাড়া রোড উন্নয়ন প্রকল্পেও অনিয়মের প্রমাণ মেলে। এস এম ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে প্রতিষ্ঠানের প্রোপাইটর সাইফুল ইসলামের নামে ৯২০,৭৮,৫৩,৩০০ টাকার কাজের চুক্তি হয়। কিন্তু কাজ শুরু না করেই ৩২ লাখ টাকা অগ্রিম বিল নেওয়া হয়। সময়মতো কাজ সম্পন্ন না করায় ৪ মে ২০২৫ তারিখে এই প্রকল্পও বাতিল করা হয়।

এলজিইডি সদর দপ্তরের কর্মীদের দাবি, বর্তমানে ফিরোজ আলম তালুকদার রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে নানা তদবির বাণিজ্যে লিপ্ত রয়েছেন এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।




ধামরাইয়ে সাহসী পুলিশ অফিসার জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ২৫ পিস ইয়াবাসহ কুখ্যাত রিপন গ্রেপ্তার

সুমন খানঃ সাহসী অফিসার এস.আই মোঃ জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে, ধামরাইয়ে আবারও প্রমাণ হলো, আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কেউ রেহাই পায় না।

গতকাল বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে ধামরাই থানার পুলিশের বিশেষ অভিযানে ২৫ পিস ইয়াবাসহ কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী মোঃ রিপন হোসেন (৩৫) গ্রেপ্তার হয়েছেন। অভিযানটি পরিচালনা করেন ধামরাই থানার সাহসী ও সৎ পুলিশ কর্মকর্তা এস.আই (নিঃ) মোঃ জিয়াউর রহমান, বিপি-৮৪০৩০৪৮২৩৪। তাকে সহায়তা করেন কং/৭৬৩ আলিমুল হক ও কং/২০১৬ আবু আনছারসহ থানার একটি চৌকস টিম।গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ সুতিপাড়া ইউনিয়নের শ্রীরামপুর লোকাল বাস স্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালায়।

পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে রিপন পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ সদস্যরা দক্ষতার সঙ্গে তাকে আটক করে। পরে তার দেহ তল্লাশি করে একটি সাদা পলিথিনে মোড়ানো ২৫ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট (ওজন ২.৫ গ্রাম) উদ্ধার করা হয়, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ৭,৫০০ টাকা।জিজ্ঞাসাবাদে রিপন স্বীকার করে যে, সে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ইয়াবা বিক্রি করে আসছে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রিপনের বিরুদ্ধে পূর্বেও পাঁচটি মাদক মামলা রয়েছে। এবারে তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ এর ৩৬(১) সারণির ১০(ক) ধারায় নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে।

এস.আই মোঃ জিয়াউর রহমানের দৃঢ় অবস্থান

মাদকবিরোধী এই অভিযানে নেতৃত্বদানকারী অফিসার এস.আই (নিঃ) মোঃ জিয়াউর রহমান বলেন, ধৃত রিপন একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। সমাজ থেকে মাদক নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। ধামরাইকে মাদকমুক্ত করার জন্য আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।

জনগণের আস্থা ফিরে আসছে পুলিশের প্রতি,ধামরাইয়ে একের পর এক সফল অভিযানে পুলিশের প্রতি জনসাধারণের আস্থা ও সমর্থন বাড়ছে। স্থানীয়রা বলেন, এস.আই জিয়াউর রহমানের মতো সাহসী ও নির্ভীক কর্মকর্তার কারণে ধামরাইয়ে অপরাধীরা আর নিরাপদ নয়।

মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নির্মূলে ধামরাই থানা পুলিশের এই ধারাবাহিক অভিযান এলাকায় প্রশংসিত হচ্ছে।

মাদক সমাজের শত্রু—এর শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে এমন সাহসী উদ্যোগ ও পুলিশের সততা আরও বিস্তৃত হোক,এটাই এখন এলাকার মানুষের প্রত্যাশা।




মিরপুরে রাজউকের অভিযান: ১১টি ভবনের নির্মাণ কাজ বন্ধ, বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজধানীর মিরপুরের দক্ষিণ পীরেরবাগ এলাকায় অবৈধ ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে রাজউকের মোবাইল কোর্ট অভিযান পরিচালনা করেছে। সোমবার (৪ নভেম্বর) রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জনাব বেলাল হোসেন এর নেতৃত্বে এবং জোন-৩/২ এর পরিচালক ও অরথায়জিং অফিসার মাসুক আহমেদ এর উপস্থিতিতে এই অভিযান পরিচালিত হয়।

রাজউকের জোন-৩/২ এলাকায় মিরপুর ৩০ ফিট রোড সংলগ্ন ১১টি নির্মাণাধীন ভবনে এই মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়। অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণ ও সড়ক সংকোচন করে নির্মাণকাজ চালানোর অভিযোগে ভবনগুলোর সব ধরনের নির্মাণকাজ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট ভবনের বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে মিটার খুলে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়।

অভিযানের সময় দেখা যায়, কিছু ভবন সীমানা প্রাচীর নির্মাণের সময় রাস্তার জায়গা দখল করেছে। এ কারণে দুটি ভবনের সীমানা প্রতিস্থ ভেঙে ফেলা হয় এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

অভিযান শেষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বেলাল হোসেন সাংবাদিকদের জানান, আজকের অভিযানে মোট ৯টি ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ করা হয়েছে এবং ২টি ভবনের বেআইনি সীমানা প্রাচীর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “রাজউকের ভবন নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন রোধে নিয়মিতভাবে এ ধরনের অভিযান চলবে।”

অরথায়জিং অফিসার মাসুক আহমেদ বলেন, “রাজউকের অনুমোদন ছাড়া কেউ ভবন নির্মাণ করতে পারবে না। আমরা নিয়মিতভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি এবং ভবিষ্যতেও আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।”

অভিযানে আরও উপস্থিত ছিলেন রাজউক জোন-৩/২ এর সহকারী অরথায়জিং অফিসার, ইঞ্জিনিয়ার পরিদর্শক মাহবুব কামাল আজম, আলী নূরসহ অন্যান্য পরিদর্শক এবং স্থানীয় পুলিশ সদস্যরা।




অবসরের ১১ বছর পর কাস্টমসের সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ চট্টগ্রামে অবসরে যাওয়ার এক যুগেরও বেশি সময় পর কাস্টমস বিভাগের সাবেক সহকারী কমিশনার আহসান হাবিব ও তাঁর স্ত্রী আসমা সুলতানার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাঁদের বিরুদ্ধে মোট তিন কোটি টাকার বেশি মূল্যের সম্পদ জ্ঞাত আয়বহির্ভূতভাবে অর্জনের অভিযোগ উঠেছে।

মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ থেকে মামলাগুলো দায়ের করেন সংস্থাটির সহকারী পরিচালক সায়েদ আলম।

দুদকের তথ্যানুযায়ী, আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত আরও ৫৯ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী আসমা সুলতানার বিরুদ্ধে প্রায় ৩৩ লাখ টাকার সম্পদ গোপন ও ৬৬ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার বাসিন্দা আহসান হাবিব ১৯৮০ সালে কাস্টমস বিভাগে পরিদর্শক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ চাকরি শেষে ২০১২ সালে সহকারী কমিশনার পদে উন্নীত হয়ে ২০১৪ সালে অবসরে যান। কর্মজীবনে তিনি ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে তাঁরা দুজনই দুদকের কাছে তাঁদের সম্পদ বিবরণী জমা দেন।

দুদকের উপপরিচালক সুবেল আহমেদ জানান, আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় মামলা করা হয়েছে। একই ধারায় তাঁর স্ত্রী আসমা সুলতানার বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা হয়েছে। তবে ওই মামলায় দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় আহসান হাবিবকেও সহযোগী আসামি করা হয়েছে, কারণ তিনি চাকরিরত অবস্থায় অবৈধ অর্থে স্ত্রীর নামে সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সম্পদ বিবরণীতে আহসান হাবিব নিজ নামে মাত্র ৯ লাখ টাকার কিছু বেশি স্থাবর সম্পদ ও ৫০ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদের কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী আসমা সুলতানা দেখান প্রায় ২০ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ, তবে অস্থাবর সম্পদ নেই বলে দাবি করেন। তিনি নিজেকে ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করলেও দুদকের তদন্তে তাঁর ব্যবসার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব মেলেনি।

চাকরিজীবনের এক দশক পরও দুর্নীতির অভিযোগ থেকে রেহাই মিলল না এই সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা ও তাঁর স্ত্রীর। দুদকের তদন্তে এখন দেখা যাবে—তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা কোটি টাকার এই অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হয়।




গণপূর্তের ক্ষমতাধর প্রকৌশলী ড. মঈনুল: রাজনীতির ছত্রছায়ায় দুর্নীতির সাম্রাজ্য

এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশের সরকারি স্থাপনা নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তর। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি দুর্নীতি, ঘুষ, টেন্ডার সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য আলোচিত-সমালোচিত। এই অনিয়মের পেছনে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে নাম এসেছে অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মঈনুল ইসলামের।

ড. মঈনুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ—তিনি রাজনৈতিক প্রভাব, কমিশন বাণিজ্য ও ঠিকাদার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বলেই দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক শাস্তি ও দুর্নীতির অভিযোগ থেকেও বেঁচে গেছেন।

কর্মজীবনের শুরু থেকেই মঈনুলের নানা বিতর্ক ছিল। ১৯৯৫ সালের ১৫ নভেম্বর যখন ১৫তম ব্যাচের অন্য সহকারী প্রকৌশলীরা যোগ দেন, তিনি যোগ দেন ৯ মাস পর—১৯৯৬ সালের ১২ আগস্ট। এরপর এক সময় ২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত টানা নয় বছর আট মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পরও তিনি চাকরি হারাননি। বরং আপিলের মাধ্যমে পুনর্বহাল হন—যা স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে তাকে “মিস্টার টেন পার্সেন্ট” নামে ডাকা হতো। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি প্রকল্পে তিনি ১০ শতাংশ কমিশন নিতেন। শুধু তিনটি বড় প্রকল্প থেকেই তিনি শত কোটি টাকার বেশি সম্পদ গড়ে তুলেছেন। ঢাকায় বিলাসবহুল বাড়ি, বিদেশে ব্যাংক হিসাব ও বিনিয়োগ—সবই তার নামে বা পরিবারের নামে আছে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া ও দুবাইয়ে তিনি বিপুল অর্থ পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ড. মঈনুল ইসলামের নাম উঠে আসে কুখ্যাত ঠিকাদার জি কে শামীমের সিন্ডিকেটের সঙ্গেও। র‌্যাবের হাতে শামীম গ্রেফতারের পর তদন্তে প্রকাশ পায়, গণপূর্তের একাধিক উচ্চপদস্থ প্রকৌশলী এই সিন্ডিকেটের অংশ ছিলেন। টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন ভাগাভাগি, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ—সবকিছুতেই জড়িত ছিলেন মঈনুল। এমনকি তার ঘনিষ্ঠ প্রকৌশলীরা এক মামলায় ৩১ কোটি টাকারও বেশি আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত হন।

এই সব অভিযোগ তদন্তে নেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২০ সালের শেষ দিকে দুদক তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে এবং ২০২১ সালের জানুয়ারিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকে। দুদক তার সম্পদের উৎস যাচাই করে অনেক অভিযোগের সত্যতাও খুঁজে পায়।

ড. মঈনুলের দুর্নীতির সঙ্গে আরও যুক্ত ছিল খুলনা অঞ্চলের কিছু কর্মকর্তা। খুলনা গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত কুমার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ঠিকাদার মাহবুব মোল্লা লিখিত অভিযোগ দেন—টেন্ডারে অনিয়ম, ঠিকাদার বাছাইয়ে পক্ষপাত ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগে। হাসপাতাল, থানা ভবনসহ বিভিন্ন প্রকল্পে ‘ভুতুড়ে’ মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে এটি কেবল একজন কর্মকর্তার নয়, বরং একটি সাংগঠনিক দুর্নীতির চক্র—যেখানে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী ও ঠিকাদাররা মিলে “দুর্নীতির সিন্ডিকেট” গড়ে তুলেছেন। তারা সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে, প্রতিযোগিতা বন্ধ করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেয় এবং পরে অর্থ ভাগাভাগি করে নেয়।

ফলে জনগণের করের টাকায় চলা প্রকল্পগুলোর মান দিন দিন কমছে। সৎ ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ভয় পাচ্ছেন, আর সাধারণ মানুষ ভুগছে নিম্নমানের নির্মাণকাজের ভোগান্তিতে।

একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা যখন রাজনৈতিক প্রভাবের আশ্রয়ে বছরের পর বছর দুর্নীতি চালিয়ে যেতে পারেন, তখন এটি কেবল তার ব্যক্তিগত অপরাধ নয়—বরং পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর ব্যর্থতার প্রতিফলন। প্রশ্নটা সেখানেই—কোন শক্তি এত বছর ধরে তাকে অদৃশ্যভাবে রক্ষা করেছে?