অ্যান্টিবায়োটিকে নেই অ্যামোক্সিসিলিন: এলবিয়নের ওষুধে ‘মানবহির্ভূত’ উপাদান, জনস্বাস্থ্য আতঙ্ক

এসএম বদরুল আলমঃ দেশের ওষুধ বাজারে চাঞ্চল্যকর এক তথ্য সামনে এসেছে। জাতীয় পরীক্ষাগারে পরীক্ষায় দেখা গেছে—একটি অ্যান্টিবায়োটিক ক্যাপসুলে মূল উপাদান অ্যামোক্সিসিলিনের অস্তিত্বই নেই। পরিবর্তে সেখানে পাওয়া গেছে অজানা সাদা দানাদার পাউডার, যা ল্যাব প্রতিবেদনে সরাসরি “মানবহির্ভূত” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (IPH)-এর ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির বিশ্লেষণে এই ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মিমক্স ৫০০ এমজি (অ্যামোক্সিসিলিন) ক্যাপসুলের ব্যাচ নম্বর ০১১২১২ পরীক্ষায় দেখা গেছে—ক্যাপসুলে অ্যামোক্সিসিলিন নেই, বরং রয়েছে অজানা সাদা পাউডার। ক্যাপসুলের গড় ওজন পাওয়া গেছে ৩৯০.২ মি.গ্রা।

 

 

ল্যাব প্রতিবেদনের ভাষায়—
“ইহা মানবহির্ভূত। অ্যামোক্সিসিলিন শনাক্ত হয়নি।” এই তথ্য প্রকাশের পর জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ চিকিৎসকরা যে ওষুধ রোগীদের দিচ্ছেন, সেখানে যদি মূল অ্যান্টিবায়োটিকই না থাকে, তাহলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ তো দূরের কথা, রোগীর জীবনই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ইনডোমেথাসিনেও গুরুতর ঘাটতি : শুধু অ্যান্টিবায়োটিক নয়, ব্যথানাশক ওষুধেও ধরা পড়েছে বড় ধরনের অমিল। পরীক্ষায় ইনডোমেথাসিন ক্যাপসুলে ঘোষিত মাত্রা ২৫ মি.গ্রা হলেও পাওয়া গেছে ২৪.১১ মি.গ্রা ও ২২.৫৯ মি.গ্রা, যা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি।

কর্মকর্তাদের বক্তব্য : নথি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাঈম গোলদার বলেন, “যথাযথ প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” অন্যদিকে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) আশরাফ হোসেন জানান, “নমুনা সংগ্রহ করে নতুন করে আবার পরীক্ষা করা হচ্ছে।”

তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—
জাতীয় পরীক্ষাগারে অ্যান্টিবায়োটিকে অ্যামোক্সিসিলিন নেই—এটাই কি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়?

নিষিদ্ধ ডিসপ্রিনের ছায়ায় ‘এসপ্রিন’ : অভিযোগ রয়েছে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত মাথাব্যথার ওষুধ ডিসপ্রিন বন্ধ হলেও এলবিয়ন বাজারে এনেছে প্রায় একই ধরনের একটি ওষুধ—‘এসপ্রিন’ ট্যাবলেট।

কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এই ট্যাবলেট পানিতে দ্রবীভূতই হয় না, যা এর কার্যকারিতা ও মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

এলবিয়নের বিরুদ্ধে নিম্নমান ও আন্ডাররেট বাণিজ্যের অভিযোগ :
চট্টগ্রামের রহমতনগর, সীতাকুণ্ডে অবস্থিত এলবিয়ন ল্যাবরেটরীজ লিমিটেড (উৎপাদন লাইসেন্স নম্বর: জৈব-১০৯ ও অজৈব-১৯১) দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের ও আন্ডাররেট ওষুধ বাজারজাত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, লেবেলে মুদ্রিত মূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামে ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে পাইকারি বাজারে। যেমন— ডমপ (ডমপেরিডোন ১০ মি.গ্রা) — ২০০ টাকার বক্স বিক্রি ৬৫ টাকায়, প্যানটোপ্রাজল-২০ — ২১০ টাকার বক্স বিক্রি ৭০ টাকায়, ডাইক্লোফেনাক SR — ৩০০ টাকার বক্স বিক্রি ৯০ টাকায়, সেটিরিজিন — ২৫০ টাকার বক্স বিক্রি ৭০ টাকায়, ডেসলোরাটাডিন — ৪০০ টাকার বক্স বিক্রি ৯৫ টাকায়, ডেক্সামেথাসন — ২০০ টাকার বক্স বিক্রি ৬৫ টাকায়, ক্যালসিয়াম-ডি — ৩৬০ টাকার বক্স বিক্রি ৯৫ টাকায়, লটিল-২০ — ৪০০ টাকার বক্স বিক্রি ১০০-১১০ টাকায় লটিল-৪০ — ২৪০ টাকার বক্স বিক্রি ৯০ টাকায়, নাইট্রাম — ১০০ টাকার বক্স বিক্রি ৩০ টাকায়, টলসিড — ২৪০ টাকার বক্স বিক্রি ১১০-১২০ টাকায়, ন্যাপ্রোক্সেন প্লাস — ৩৬০ টাকার বক্স বিক্রি ১৪০-১৫০ টাকায়।

এসব ওষুধ রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকার হাজী রানী মেডিসিন মার্কেটের একটি পাইকারি দোকান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগকারী জানিয়েছেন।

একই এমএ নম্বর দুই ওষুধে: আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—
সেটিরিজিন ১০ মি.গ্রা এবং ডেসলোরাটাডিন ৫ মি.গ্রা—এই দুই ভিন্ন ওষুধে একই এমএ নম্বর ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

অতীতেও ছিল নিষেধাজ্ঞা : ২০০৮ সালে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি এলবিয়নের চারটি ওষুধের উৎপাদন ও বাজারজাত সাময়িক স্থগিত করেছিল।
সেগুলো হলো— ডাইক্লোফেনাক TR ক্যাপসুল, ডি-ক্যাপসুল (ডক্সিসাইক্লিন), গ্লাইসোফুলভিন ট্যাবলেট, এলফ্লাম (আইবুপ্রোফেন), ২০০৯ সালে আবারও পলিভিট সিরাপ (ভিটামিন বি কমপ্লেক্স) নিম্নমানের হওয়ায় উৎপাদন ও বাজারজাত বন্ধ করা হয়। সিল হয়েছিল কারখানাও। চট্টগ্রামের চাঁদগাঁও কারখানা ভ্রাম্যমাণ আদালত সিলগালা করেছিল। পরে DGDA-এর অনুমতি নিয়ে সীতাকুণ্ডে নতুন কারখানা স্থাপন করা হয়।

তবুও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—
মানবহির্ভূত অ্যান্টিবায়োটিক, GMP লঙ্ঘন, নিম্নমানের ওষুধ, আগেও কারখানা সিল। এসব ঘটনার পরও এলবিয়ন কীভাবে নিয়মিত উৎপাদন ও বিপণন চালিয়ে যাচ্ছে?

বড় প্রশ্ন: এতদিন কী করছিল ঔষধ প্রশাসন ? স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে—“DGDA আরও আগেই ব্যবস্থা নিলে বাজারে নিম্নমানের ওষুধের বিস্তার ঘটত না।” প্রতিবছর সরকার জনস্বাস্থ্য রক্ষায় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেও, যদি বাজারে মানবহির্ভূত অ্যান্টিবায়োটিক ঘুরে বেড়ায়, তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দায় নয়— এটি পুরো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

এখন প্রশ্ন একটাই— দেশের মানুষের জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মান নিশ্চিত করতে প্রশাসন কি কঠোর পদক্ষেপ নেবে, নাকি বাজারে ‘ভেজাল ওষুধের সাম্রাজ্য’ চলতেই থাকবে?




লক্ষ্মীপুরে গণপূর্ত অফিসে ঢুকে নির্বাহী প্রকৌশলীকে হুমকির অভিযোগ, জিডি দায়ের

বিশেষ প্রতিবেদকঃ লক্ষ্মীপুরে গণপূর্ত বিভাগের কার্যালয়ে ঢুকে নির্বাহী প্রকৌশলী সফিকুর রহমান চৌধুরীকে হুমকি ও অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদার মো. শিপন লাহাড়ির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় অফিসের পক্ষ থেকে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সোমবার (২ মার্চ) বিকেলের দিকে শিপন লাহাড়ি হঠাৎ করেই লক্ষ্মীপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। সেখানে ঢুকে তিনি উচ্চস্বরে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন এবং উপস্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এক পর্যায়ে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী সফিকুর রহমান চৌধুরীসহ অফিসের অন্যান্য স্টাফদের উদ্দেশ করে হুমকি দিতে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তিনি মারধর করার জন্য তেড়ে যান বলেও জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।

এ ঘটনার পর গণপূর্ত বিভাগের নির্দেশে ওই কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জামাল উদ্দিন লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, বহিরাগত হিসেবে অফিসে ঢুকে শিপন লাহাড়ি অশোভন আচরণ করেন, কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখান এবং মারধরের হুমকি দেন।

উপ-সহকারী প্রকৌশলী জামাল উদ্দিন জানান, শিপন লাহাড়ি অফিসের নিয়ম-কানুন না মেনে কার্যালয়ে এসে নির্বাহী প্রকৌশলীসহ কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন। তিনি হুমকি ও ভয়ভীতি দেখিয়েছেন। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে অফিসের নির্দেশেই থানায় জিডি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী সফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, তিনি সরকারি দায়িত্ব পালন করতে সেখানে গিয়েছেন এবং সাধারণ মানুষের সেবা দেওয়াই তার কাজ। কিন্তু শিপন লাহাড়ি কার্যালয়ে এসে যে আচরণ করেছেন তা অত্যন্ত অশোভন এবং এতে তিনি বিব্রতবোধ করছেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিপন লাহাড়ি। মোবাইলফোনে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা পুরোপুরি সঠিক নয়। কিছু মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে উসকানি দিয়ে বিষয়টিকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করছে বলে তিনি দাবি করেন।

এদিকে জিডির তদন্তের দায়িত্বে থাকা লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) নুরুল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, ঘটনাটি নিয়ে করা সাধারণ ডায়েরি আদালতের অনুমতির জন্য পাঠানো হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




ডাকাতি মামলার আসামির পুনর্বহাল: যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড–এ দ্বৈত নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ ডাকাতি মামলায় গ্রেফতার, একটানা এক মাস সতের দিন জেল হাজত, এরপর জামিনে মুক্তি—আর তারপরই বিনা বাধায় আবার চাকরিতে যোগদান! সরকারি মালিকানাধীন জ্বালানি খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড–এর বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপোতে ঘটেছে এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা, যা এখন প্রতিষ্ঠানজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম এইচআর) মোঃ মাসুদুল ইসলাম এবং বাঘাবাড়ী ডিপো ইনচার্জ আবুল ফজল মোঃ সাদেকিন। তাদের প্রত্যক্ষ মদদে ডাকাতি মামলার আসামি অফিস সহকারী (হাজিরাভিত্তিক) হোসাইন মোঃ ইসহাক মিল্টন কোনো নিয়মনীতি অনুসরণ ছাড়াই ফের চাকরিতে যোগ দিয়েছেন—এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

গ্রেফতার, জেল, তারপরও ‘চিকিৎসাধীন’ গল্প ! তথ্য অনুযায়ী, বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপোর অফিস সহকারী হোসাইন মোঃ ইসহাক মিল্টন গত ৬ জানুয়ারি ২০২৬ একটি ডাকাতি মামলায় গ্রেফতার হন। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ থানার একটি মামলায় আদালতের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানা পুলিশ তাকে আটক করে। প্রায় এক মাস সতের দিন জেল হাজতে থাকার পর তিনি ২২ ফেব্রুয়ারি জামিনে মুক্তি পান।
তবে বিষয়টি নিয়ে শুরু হয়েছে রহস্যের ঘনঘটা। ইসহাক মিল্টনের দাবি—তিনি ডাকাতি নয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলায় কারাবন্দি ছিলেন এবং এ সময় অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিলেন।

কিন্তু অফিস কর্তৃপক্ষের একাংশ বলছে ভিন্ন কথা। বাঘাবাড়ী ডিপোর ডেপুটি ম্যানেজার আবুল ফজল মোঃ সাদেকিন দাবি করেন, “ইসহাক মিল্টন জেলে ছিলেন—এটা আমি এই প্রথম শুনলাম। আমার জানা মতে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।” অথচ দেড় মাসের বেশি অনুপস্থিতির পর তার পুনরায় যোগদানের বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে—একজন কর্মী যদি সত্যিই জেলে থাকেন, তবে সেটি কীভাবে ‘হাসপাতালে চিকিৎসাধীন’ হিসেবে চালানো হলো? আর যদি চিকিৎসাধীনই হন, তাহলে সেই চিকিৎসার কাগজপত্র কোথায় ?

‘বিশ্বস্ত ক্যাশিয়ার’, বদলির সঙ্গী !
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ইসহাক মিল্টন দীর্ঘদিন ধরে ডিপো ইনচার্জ আবুল ফজল মোঃ সাদেকিনের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত। তাকে অনেকেই ডিপো ইনচার্জের ‘ক্যাশিয়ার’ বলেও উল্লেখ করেন। অভিযোগ রয়েছে, আবুল ফজল যেখানে বদলি হন, সেখানেই সঙ্গে নিয়ে যান ইসহাক মিল্টনকে। পার্বতীপুর ডিপোতে একসঙ্গে কর্মরত থাকার পর বাঘাবাড়ীতে বদলির সময়ও তাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। এবারও সেই প্রভাব খাটিয়ে জেল ফেরত কর্মীকে পুনর্বহাল করা হয়েছে—এমনটাই অভিযোগ।

জিএম এইচআর–এর নীরবতা কি ‘সম্মতির সীল ’? বাঘাবাড়ী ডিপো ইনচার্জের সঙ্গে মানবসম্পদ বিভাগের জিএম এইচআর মোঃ মাসুদুল ইসলামের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও অবৈধ লেনদেনের অভিযোগও ঘুরছে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে-বাইরে। সেই সম্পর্কের জোরেই নাকি কোনো প্রশাসনিক তদন্ত ছাড়াই ইসহাক মিল্টনের পুনঃযোগদান নিশ্চিত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জিএম এইচআর মাসুদুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার এই নীরবতা কি দায় এড়ানোর কৌশল, নাকি ঘটনার অন্তরালে থাকা প্রভাবশালী চক্রের প্রতি নীরব সমর্থন—সে প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।

সিবিএ নেতাদের বরখাস্ত, কিন্তু ‘বিশ্বস্ত’ কর্মীর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কেন ? আরও বিস্ময়কর হলো, দীর্ঘদিন ধরে জেল হাজতে থাকা যমুনা ওয়েলের সিবিএ নেতা আবুল হোসেন ও মুহাম্মদ এয়াকুব এবং অনুপস্থিত আরেক সিবিএ নেতা জয়নাল আবেদীন টুটুলকে সম্প্রতি সাময়িক বরখাস্ত করেছে কর্তৃপক্ষ।

তাহলে প্রশ্ন একটাই—একই প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড কেন? সিবিএ নেতাদের ক্ষেত্রে কঠোরতা, আর ডিপো ইনচার্জের ঘনিষ্ঠ কর্মীর ক্ষেত্রে রহস্যজনক নমনীয়তা কেন ? নিয়মের শাসন, নাকি ব্যক্তির প্রভাব ? রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি প্রতিষ্ঠানে এমন অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন তোলে না, বরং পুরো ব্যবস্থাপনাকেই সন্দেহের মুখে দাঁড় করায়। একজন কর্মী জেল হাজতে ছিলেন কি না—এ তথ্য জানতেই যদি কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিভ্রান্তি থাকে, তবে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ? ডাকাতি মামলার আসামি হোক বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার অভিযুক্ত—যে কোনো ফৌজদারি মামলায় গ্রেফতার হওয়া কর্মীর বিষয়ে স্পষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়া থাকার কথা। সেখানে কীভাবে নিয়ম ভেঙে ‘বিশেষ ব্যবস্থায়’ পুনঃযোগদান সম্ভব হলো?

এখন দেখার বিষয়—যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের শীর্ষ কর্তৃপক্ষ কি এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করবে, নাকি প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যাবে?
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দ্বৈত নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এই বিস্ফোরক অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।




চাকরির প্রলোভনে অর্থ আত্মসাত ও প্রাণনাশের হুমকি থানায় অভিযোগ, কে এই মাহাবুব হোসেন? তার খুটির জোর কোথায়? 

‎স্টাফ রিপোর্টার, মো: লিমন হোসেনঃ ‎চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক গৃহিণীর কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা নেওয়ার পর দীর্ঘদিনেও চাকরি না দিয়ে উল্টো হুমকি-ধমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মাহাবুব হোসেন নামের এক ব্যক্তি, যিনি জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটের ইজারাদার হিসেবে আউটসোর্সিং কোম্পানি খান এন্ড ব্যাদার্সের পরিচালকের পদে দায়িত্বরত আছেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নাজমা বেগম (২৬) কামরাঙ্গীরচর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
‎এছাড়াও তার আউটসোর্সিং কোম্পানিতে কর্মরত বিভিন্ন চুক্তি ভিত্তিক মজুরিতে নিয়োজিত শ্রমিকদের একাধিক মাসের বেতন না দিয়ে তাদেরকে পুনর্বাসন ও পুন নিয়োগ এর কথা বলে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করেন এই বেক্তি। এ বিষয়ে দেশের  বিভিন্ন স্বনামধন্য গণমাধ্যমে স্পষ্ট ভাবে সংবাদ প্রচারিত হয়। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনের নীরব ভূমিকা জনমনে নানামুখী প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। অন্যদিকে ভুক্তভোগী সকল শ্রমিক প্রচন্ড রকমের মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
‎এদিকে অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার বেজগাঁও গ্রামের বাসিন্দা নাজমা বেগম একজন গৃহিণী। তার স্বামী মোঃ ফারুক একটি জুতার কারখানায় কর্মরত প্রায় ৯ মাস আগে কামরাঙ্গীরচর থানাধীন হুজুরপাড়া এলাকায় পরিচিত এক ব্যক্তি তাকে একটি হাসপাতালে ক্লিনারের চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেন। চাকরি নিশ্চিত করার কথা বলে ওই ব্যক্তি তার কাছ থেকে ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন।
‎ভুক্তভোগীর দাবি, টাকা নেওয়ার পর থেকেই অভিযুক্ত ব্যক্তি নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও চাকরির কোনো ব্যবস্থা না করে বরং যোগাযোগ  করতে গেলে এড়িয়ে যান। একাধিকবার টাকা ফেরত চাইলে ‘আজ দেব, কাল দেব’ বলে ঘুরিয়ে দেন।
‎সর্বশেষ গত ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে নাজমা বেগম তার স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে পাওনা টাকা চাইতে গেলে অভিযুক্ত কারি টাকা না দিয়ে উল্টো  তাদের বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেন। এমনকি টাকার বিষয় নিয়ে বেশি চাপ দিলে ক্ষয়ক্ষতি করার ভয়ও দেখানো হয় বলে ভুক্তভোগীর দাবি। ‎অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মাহাবুব হোসেন নামের এক ব্যক্তি, যিনি খান এন্ড ব্যাদার্সের পরিচালক হিসেবে পরিচিত, চাকরি দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার সঙ্গে জড়িত বলে এলাকায় পূর্বেও গুঞ্জন রয়েছে।
‎ঘটনার পর ভুক্তভোগী আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে পরিবারের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কামরাঙ্গীরচর থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়।
‎এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানার এক কর্মকর্তা জানান, লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।



উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে আদায় লক্ষ লক্ষ টাকা, লালমনিরহাট রেলওয়েতে তোলপাড়

জহুরুল হক জনি, লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধিঃ রাজস্ব আদায় ও লাইসেন্স প্রদানের নামে অনিয়ম ও উৎকোচ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে এর লালমনিরহাট বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মনজুর হোসেন।

ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রথমে স্টেশনসংলগ্ন দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তালা দেওয়া হয়। পরে দলীয় পরিচয়ধারী কিছু ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় দরবার। একপর্যায়ে অফিসের বাইরে নির্ধারিত নয় এমন স্থানে লেনদেন সম্পন্ন হয়।

রংপুর বিভাগের আট জেলার ৮৪টি স্টেশন এলাকা লালমনিরহাট রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের আওতায়। এসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা শত শত দোকানকে নিয়মিত অভিযানের কথা বলে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দ্বিগুণ-তিনগুণ আদায়ের অভিযোগ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী জানান, অফিসে ডেকে বাণিজ্যিক ভাড়া ও অন্যান্য ফি বাবদ একটি কাগজ ধরিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে উল্লেখিত টাকার দ্বিগুণ কিংবা তিনগুণ পর্যন্ত আদায় করা হয়। সরকারি কোষাগারে জমার রশিদ চাইলে তা দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ তাদের।

হাতীবান্ধা উপজেলার দুই ব্যবসায়ী রনিউল ইসলাম ও ফজলে রহমান দাবি করেন:

রনিউলের কাছ থেকে নেওয়া হয় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা, কিন্তু সরকারি চালানে জমা দেখানো হয়েছে ৫৩ হাজার টাকা। ফজলে রহমানের কাছ থেকে নেওয়া হয় ৮৪ হাজার টাকা, কিন্তু জমা দেখানো হয়েছে ৩৬ হাজার টাকা। বাকি অর্থের কোনো হিসাব তারা পাননি। তাদের হাতে যে লাইসেন্স কপি দেওয়া হয়েছে, তা মূলত সফটওয়্যার থেকে প্রিন্ট করা কাগজ মাত্র বলেও অভিযোগ করেন তারা।

রেলের সর্বশেষ ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী, মাষ্টারপ্ল্যানভুক্ত করে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বাণিজ্যিক লিজ বা লাইসেন্স দেওয়ার কথা। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বরং লাইসেন্স বাতিল, উচ্ছেদ কিংবা মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

অভিযুক্ত কর্মকর্তা মনজুর হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তার বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে।

রাজস্ব আদায়ের নামে যদি ব্যক্তিগত লেনদেনই চলে, তবে সরকারি কোষাগার কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে..? ভুক্তভোগীরা নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।




‘বিনা পুঁজিতে’ ৩ হাজার শেয়ার, কোটি টাকার হিসাবহীনতা—বনলতা ল্যান্ডমার্কে অডিট বাধা ও দ্বৈত কোম্পানির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রিয়েল এস্টেট খাতে উচ্চাভিলাষী সূচনার পর আজ প্রশ্নের মুখে বনলতা ল্যান্ডমার্ক লিমিটেড। শেয়ার বণ্টনে অনিয়ম, গ্রাহকের কোটি কোটি টাকার হিসাবহীনতা, একই প্রকল্পের নামে পৃথক কোম্পানি খোলা, অডিটে বাধা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুকেন্দ্র দাস।

শেয়ার দখলের অভিযোগ: ‘বিনা পুঁজিতে’ ৩ হাজার শেয়ার!
কোম্পানির চেয়ারম্যান আহম্মদ আলী খান ফেরদৌস স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়ের করা লিখিত অভিযোগে দাবি করেছেন—২০১৮ সালের ১৩ আগস্ট প্রলোভন দেখিয়ে সুকেন্দ্র দাস প্রথমে ১২০০ শেয়ার গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে চেয়ারম্যান দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকাকালে আরও ১৮০০ শেয়ার নিজের নামে নিয়ে মোট ৩০০০ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেন—কোনো পুঁজি বিনিয়োগ ছাড়াই।

অভিযোগে বলা হয়, ব্যাংক হিসাবও এককভাবে এমডির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ৩১ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত এক্সট্রা অর্ডিনারি জেনারেল মিটিংয়ে আর্টিকেল সংশোধনের মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালনার ক্ষমতা এমডির হাতে তুলে দেওয়া হয়—যেখানে কোরাম পূরণ হয়নি এবং চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়নি বলে অভিযোগ।

২৮ কোটি টাকার লেনদেন—কিন্তু জমি কোম্পানির নামে নয় !
অভ্যন্তরীণ অডিট সূত্রের দাবি—চলমান প্রায় ২১৮ জন গ্রাহকের কাছ থেকে বুকিং ও কিস্তি বাবদ ২৮ কোটির বেশি টাকা গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ কোম্পানির নামে পর্যাপ্ত জমির দলিল বা বায়নার প্রমাণ নেই। অডিট পর্যবেক্ষণে আরও উঠে আসে—১৭টি দলিলের মধ্যে ১৬টি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত নামে এবং মাত্র একটি চেয়ারম্যানের নামে।
প্রশ্ন উঠছে—গ্রাহকের অর্থ কি ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তরিত হয়েছে ? একইসঙ্গে প্রায় ৫.৫৫ কোটি টাকার ব্যয়ের ক্ষেত্রে বোর্ড রেজুলেশন বা যথাযথ ভাউচার অনুপস্থিত থাকার অভিযোগও রয়েছে।

একই প্রকল্পের নামে আলাদা কোম্পানি ! “বনলতা রিভারগেট টাউন” প্রকল্পের নাম ব্যবহার করে পৃথক কোম্পানি খোলার অভিযোগ রয়েছে। চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের নামের সঙ্গে মিল রেখে “বনলতা রিভারগেট টাউন লিমিটেড” নামে নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়।

এছাড়া “গাডওয়াল হোল্ডিংস লিমিটেড” নামে আরেকটি কোম্পানি একই অফিস ঠিকানায় পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা—এতে গ্রাহক বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং অর্থ স্থানান্তরের পথ সহজ হয়েছে।

অডিটে বাধা ও ফাইল গায়েব!
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৯–২০২১ সময়কালের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। অডিট চলাকালে নির্ধারিত কক্ষে তালা ভাঙা, গুরুত্বপূর্ণ ফাইল গায়েব হওয়া এবং অডিট টিমকে বাধা দেওয়ার ঘটনাও উল্লেখ রয়েছে। যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি কেবল আর্থিক অনিয়ম নয়—বরং প্রমাণ নষ্টেরও ইঙ্গিত বহন করে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ, থানায় জিডি : চেয়ারম্যান আহম্মদ আলী খান বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। পাশাপাশি বনানী থানা-এ সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং ১৬৪, তারিখ ০৩/০১/২০২৬) করেন। জিডিতে তিনি অভিযোগ করেন—হিসাব চাইতে গেলে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় এবং ‘খুন করে লাশ গুম’ করার ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।

এছাড়া কোম্পানির এইচআর ও অ্যাকাউন্টস কর্মকর্তা শারমীন আক্তারও পৃথকভাবে জিডি (নং ৭৩৮, তারিখ ০৮/০১/২০২৬) করেন। তিনি অভিযোগ করেন—অফিসে তাকে হুমকি ও মারধরের চেষ্টা করা হয়েছে, ফলে তিনি মানসিকভাবে আতঙ্কিত।

ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি: গাড়ি ও পূর্বাচল প্লট : অভিযোগে আরও বলা হয়েছে—কোম্পানির অর্থ ব্যবহার করে বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয় এবং পূর্বাচলে প্লট কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক তদন্ত এখনো সম্পন্ন হয়নি।

এমডির নীরবতা : উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সুকেন্দ্র দাসের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রশ্নগুলোর উত্তর কে দেবে ?
২৮ কোটির বেশি গ্রাহক অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে ? কেন অধিকাংশ জমির দলিল ব্যক্তিগত নামে ? একই প্রকল্পের নামে পৃথক কোম্পানি খোলার উদ্দেশ্য কী ? অডিটে বাধা ও নথি গায়েব হওয়ার দায় কার ? ভয়ভীতি ও হুমকির অভিযোগের পেছনে কী সত্য লুকিয়ে আছে ?

রিয়েল এস্টেট খাতে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত এমন অভিযোগের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

(পরবর্তী পর্বে: গ্রাহকদের সরাসরি অভিযোগ, আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ, বোর্ডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা বিশ্লেষণ।)




‘হাউজিং’ না অঘোষিত ব্যাংক? দি মেট্রোপলিটন খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের দাবি

এসএম বদরুল আলমঃ খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সদস্যদের কষ্টার্জিত অর্থে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী আর্থিক প্রতিষ্ঠান দি মেট্রোপলিটন খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডকে ঘিরে উঠেছে বিস্ফোরক অভিযোগ। সাবেক চেয়ারম্যান আগস্টিন পিউরিফিকেশনের বিরুদ্ধে সমবায় আইন লঙ্ঘন, অবৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রম, শতকোটি টাকার সম্পদ গঠন এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ এনে লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ।

অভিযোগকারী সাবেক সদস্য অমূল্য লরেন্স পেরেরা দাবি করেছেন—“এক দশকের বেশি সময় ধরে সমিতিকে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে রেখে আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।”

আইন ভেঙে চতুর্থ মেয়াদ ?
সমবায় সমিতি আইন ২০০১ (সংশোধিত ২০০২ ও ২০১৩) অনুযায়ী একটানা তিন মেয়াদের বেশি কোনো সদস্য ব্যবস্থাপনা কমিটিতে নির্বাচিত হতে পারেন না। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, আগস্টিন পিউরিফিকেশন ২০২২-২০২৫ মেয়াদে চতুর্থবার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ সত্য হলে এটি সরাসরি আইনের ১৮(৮) ধারার লঙ্ঘন। প্রশ্ন উঠেছে—কীভাবে এই মেয়াদ অনুমোদন পেল? সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ভূমিকা নিয়েও দেখা দিয়েছে সন্দেহ।

‘হাউজিং’ না ‘অঘোষিত ব্যাংক’৷ ?
অভিযোগে বলা হয়েছে, সমিতি সদস্য বহির্ভূত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে আমানত গ্রহণ এবং উচ্চ সুদে লেনদেন পরিচালনা করছে—যা সমবায় আইনের ২৩(খ) ও ২৬ ধারার পরিপন্থী। দাবি করা হয়েছে, প্রায় ১১টি প্রাথমিক সমিতি এবং বহু ব্যক্তি উচ্চ মুনাফার আশায় এখানে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। যদি তা সত্য হয়, তবে এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কার্যত ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালনার শামিল—যার শাস্তি কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

ফ্ল্যাট-প্লট বিক্রিতে উপ-আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ : ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে।
অভিযোগে বলা হয়েছে—
ফ্ল্যাট সংখ্যা: ২,১৩৮টি, বিক্রি: ১২৬টি, প্লট সংখ্যা: ৪,৭০৮টি এবং বরাদ্দ: ১,৪১২টি,
অভিযোগকারীর দাবি, সদস্যদের বাইরে বিপুল সংখ্যক ফ্ল্যাট ও প্লট বিক্রি করে সমিতির মূল উদ্দেশ্যকে পাশ কাটানো হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং উপ-আইন লঙ্ঘিত হয়েছে।

আত্মসাৎ ও সম্পদ বিস্তারের প্রশ্ন ;
দাখিলকৃত আবেদনে কয়েকটি নির্দিষ্ট আর্থিক অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে— ২০০৬-২০১৩ সময়কালে বিভিন্ন প্রকল্প থেকে প্রায় ৮ কোটি ৯২ লাখ টাকার অনিয়ম। ২০১০-২০১২ সময়ে জমি বিক্রির মধ্যস্থতায় ব্যক্তিগতভাবে ১৩ কোটির বেশি লাভ। পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে ব্যবসায়িক লেনদেনে বিপুল সম্পদ সঞ্চয়ের অভিযোগ। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রাজধানীর শহরতলীতে উচ্চমূল্যের আবাসন নির্মাণসহ দেশ-বিদেশে সম্পদ গড়ার তথ্য তদন্তে উঠে আসতে পারে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।

প্রভাব খাটানোর অভিযোগ :
অভিযোগপত্রে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল-এর নাম উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে, প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়া এবং সমিতির তহবিল থেকে বিলাসবহুল উপহার দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এই দাবির স্বপক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।

সমবায় অধিদপ্তরের যাচাই কমিটি—স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন : অভিযোগের প্রেক্ষিতে সমবায় অধিদপ্তর ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে একটি যাচাই কমিটি গঠন করে। ২৪ ফেব্রুয়ারি সমিতির কার্যালয়ে যাচাই কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়।

কিন্তু অভিযোগকারী প্রশ্ন তুলেছেন—দুদকে দাখিল করা অভিযোগে দুদকের সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছাড়া কেবল বিভাগীয় যাচাই কতটা নিরপেক্ষ হবে ? বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি অভিযোগগুলো ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, তাহলে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান দুদকের অধীনেই হওয়া উচিত।

নথি বলছে কী ? অভিযোগে একাধিক স্মারক নম্বর, অডিট রিপোর্ট, যুগ্ম নিবন্ধকের তদন্ত প্রতিবেদন এবং আদালতে বিচারাধীন বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি—কিছু প্রতিবেদনে আত্মসাৎ ও আর্থিক অনিয়মের ইঙ্গিত থাকলেও সংশ্লিষ্ট সব নাম প্রকাশ হয়নি এবং পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এখন প্রশ্ন : সমবায় আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ কি সত্য?
সদস্য বহির্ভূত আমানত গ্রহণের বিষয়টি কি প্রমাণিত হবে?
আত্মসাৎ ও সম্পদ সঞ্চয়ের অভিযোগের আর্থিক ট্রেইল কি মিলবে? দুদক কি পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান শুরু করবে?

অভিযুক্তের বক্তব্য অপেক্ষমাণ :
এই প্রতিবেদনের জন্য আগস্টিন পিউরিফিকেশন ও সমিতির বর্তমান কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংযুক্ত করা হবে।

উপসংহার : দি মেট্রোপলিটন খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগগুলো কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশ্ন নয়; এটি সদস্যদের আস্থা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং সমবায় খাতের সুশাসনের প্রশ্ন।

অভিযোগগুলো যদি ভিত্তিহীন হয়—তাহলে নিরপেক্ষ তদন্তেই তা প্রমাণিত হবে। আর যদি সত্য হয়—তবে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াই হবে ন্যায়বিচারের একমাত্র পথ।




২৮ কোটি টাকার লেনদেন ঘিরে প্রশ্নে বনলতা ল্যান্ডমার্ক, এমডির বিরুদ্ধে শেয়ার ও সম্পদ বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক: রিয়েল এস্টেট খাতে উচ্চ প্রত্যাশা নিয়ে যাত্রা শুরু করা বনলতা ল্যান্ডমার্ক লিমিটেড এখন নানা প্রশ্নের মুখে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুকেন্দ্র দাস–এর বিরুদ্ধে শেয়ার অধিগ্রহণে অসঙ্গতি, গ্রাহকের অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম এবং ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিক নথিপত্র ও অডিট পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য।

শেয়ার বণ্টনে অসঙ্গতির অভিযোগ
প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, : ২০১৮ সালে কোম্পানির চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে সুকেন্দ্র দাস বিনা পুঁজিতে প্রথমে ১২০০ শেয়ার গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে মোট ৩০০০ শেয়ার নিজের নামে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চেয়ারম্যান আহমেদ আলী খান ফেরদৌস রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত কারণে দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থানকালে কোম্পানির কার্যক্রম এমডির একক নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পরিচালক।

২৮ কোটি টাকার লেনদেন, কিন্তু জমি কোথায় ? অভ্যন্তরীণ অডিট সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানির চলমান প্রায় ২১৮ জন গ্রাহকের কাছ থেকে বুকিং ও কিস্তি বাবদ ২৮ কোটির বেশি টাকা গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ কোম্পানির নামে পর্যাপ্ত জমির মালিকানা বা দলিল রেজিস্ট্রেশনের তথ্য পাওয়া যায়নি।

অডিট প্রতিবেদনে ৬ কোটির বেশি লোকসান দেখানো হলেও—
১৭টি দলিলের মধ্যে ১৬টি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত নামে, মাত্র একটি চেয়ারম্যানের নামে পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এতে গ্রাহকের অর্থ ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনে ব্যবহৃত হয়েছে কিনা—সেই প্রশ্ন উঠেছে।

একই প্রকল্পের নামে পৃথক কোম্পানি ! “বনলতা রিভারগেট টাউন” প্রকল্পের নাম ব্যবহার করে মিল রেখে পৃথক একটি কোম্পানি খোলার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এতে গ্রাহক বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে। একইভাবে “গাডওয়াল” নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও বনলতার অফিস থেকেই পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অডিটে বাধা, ফাইল গায়েব :
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৯–২০২১ সময়কালের ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। প্রায় ৫.৫৫ কোটি টাকার খরচে বোর্ড রেজুলেশন বা যথাযথ ভাউচার পাওয়া যায়নি।

অডিট কার্যক্রম চলাকালে—
নির্ধারিত কক্ষে তালা ভাঙা, গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও নথি গায়েব হওয়া, অডিট টিমকে বাধা দেওয়া—এসব ঘটনাও অডিট পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন :
অভিযোগ অনুযায়ী, কোম্পানির অর্থ ব্যবহার করে বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয় এবং পূর্বাচলে প্লট কেনার তথ্য উঠে এসেছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক অনুসন্ধান এখনো সম্পন্ন হয়নি।

এমডির বক্তব্য মেলেনি : উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুকেন্দ্র দাস–এর বক্তব্য জানার জন্য তাঁর মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
(পরবর্তী পর্বে থাকছে : গ্রাহকদের অভিযোগ ও আর্থিক ক্ষতির বিবরণ, বোর্ড অব ডিরেক্টরসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং আইনি পদক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা।)




পর্যটন নিরাপত্তা জোরদারে কঠোর অবস্থান, অপপ্রচারের অভিযোগে প্রতিবাদ টুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়ন-এর

নিউজ ডেস্কঃ পর্যটক সেবার সরঞ্জাম ভাড়া দিয়ে মাসে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য শীর্ষক প্রতিবেদনটি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। উক্ত প্রতিবেদনে অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মনগড়া, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

প্রতিবেদনটিতে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আনা হলেও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ, দাপ্তরিক নথি, নিরপেক্ষ সূত্র বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতি অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ করা আবশ্যক, যা এখানে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে এটি একপাক্ষিক ও বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনা হিসেবে প্রতীয়মান। অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ কক্সবাজারে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে পর্যটন নিরাপত্তা জোরদার, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, চাঁদাবাজি প্রতিরোধ এবং পর্যটনবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে একাধিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। বিশেষ করে বিজ এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানে তার কঠোর অবস্থানের পর থেকেই একটি মহল অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত উক্ত প্রতিবেদনটি প্রতিহিংসাপরায়ণ মহলের প্ররোচনায় প্রকাশিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এতে কেবল একজন কর্মকর্তার সুনামহানি নয়, বরং পর্যটন নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সম্প্রতি একটি স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন যেখানে অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদের বিরুদ্ধে পর্যটন সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ভাড়া দিয়ে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মনগড়া, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আমরা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। উক্ত প্রতিবেদনটি কেবল একটি দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা নয়, বরং কক্সবাজারের পর্যটন নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপকৌশল।

কক্সবাজার দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিবছর দেশি-বিদেশি লাখো পর্যটক এখানে আগমন করেন। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে নানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। পুলিশ সংকটকালীন অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে পর্যটন নিরাপত্তা জোরদারে একাধিক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

দৈনিক সকালের কক্সবাজার প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে পর্যটন পুলিশের অবকাঠামো ভাড়া দিয়ে মাসে লাখ লাখ টাকা বাণিজ্য করা হচ্ছে। অথচ এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট দলিল, তথ্যপ্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়নি। সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতিমালা অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু এখানে তা উপেক্ষা করা হয়েছে, যা স্পষ্টতই পক্ষপাতদুষ্টতার প্রমাণ বহন করে।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি কক্সবাজার বিজ এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানে অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। এ সময় কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের ঘনিষ্ঠ মহল তার ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করে। অভিযোগ রয়েছে, ওইসব মহলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে একটি অংশবিশেষ সাংবাদিককে ব্যবহার করে এই ভিত্তিহীন প্রতিবেদনটি প্রকাশ করিয়েছে।

এদিকে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। সত্য উদঘাটন, সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থ, প্রতিহিংসা বা চাঁদাবাজি আড়াল করতে কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশ করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে যে, সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কথিত সাংবাদিকরা মাসিক অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত। যদি এমন অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তবে সেটি তদন্তসাপেক্ষ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য। আইন সবার জন্য সমান সে সাংবাদিক হোক বা সরকারি কর্মকর্তা।

কক্সবাজারে সংকটময় সময়ে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আপেল মাহমুদ যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা অনেকের কাছেই প্রশংসিত। রাত দিন নিরলস পরিশ্রম, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অভিযান পরিচালনা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এসব পদক্ষেপ তার পেশাগত সততা ও সাহসিকতার প্রমাণ বহন করে। পর্যটন শিল্প দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এই খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তাকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী। ভিত্তিহীন সংবাদ কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সুনাম নষ্ট করে না, এটি পুরো বাহিনীর মনোবল ভেঙে দিতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যদি প্রতিটি সৎ পদক্ষেপের পর অপপ্রচারের শিকার হন, তবে তারা নিরুৎসাহিত হবেন। এর প্রভাব পড়বে জননিরাপত্তার ওপর। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়। তারা প্রকৃত সত্য জানতে না পেরে গুজবে বিশ্বাস করতে শুরু করে। এতে সমাজে অস্থিরতা ও অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়েছে টুরিস্ট পুলিশ। সাম্প্রতিক অভিযানে সৈকতের বিভিন্ন অংশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দোকান ও স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এ সময় চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে সতর্ক ও নজরদারিতে আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। টুরিস্ট পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র সৈকতের নির্দিষ্ট অংশ দখল করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছিল। অভিযোগ রয়েছে, কথিত কয়েকজন সাংবাদিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি ওই সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে প্রশাসনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমে টুরিস্ট পুলিশের বিরুদ্ধে অনৈতিক আর্থিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রকাশিত হলে তা ‘ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছে টুরিস্ট পুলিশ। তাদের বক্তব্য, চলমান অভিযানকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে এমন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। টুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সৈকত দখলমুক্ত ও পর্যটকবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখতে অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি উত্থাপিত অভিযোগের সপক্ষে প্রমাণ উপস্থাপনের আহ্বান জানানো হয়েছে।




দুদকের অভিযানে বিএভিএস ও চট্টগ্রাম এলজিইডি কার্যালয়ে অনিয়মের চিত্র উন্মোচন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অভিযান চালিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর ভলানটারি স্টেরিলাইজেশন (বিএভিএস) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) চট্টগ্রাম কার্যালয়ে। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. তানজির আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বিএভিএসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠছিল। অভিযোগ রয়েছে, কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেই প্রতিষ্ঠানটিতে একাধিক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই এলাকার একাধিক ব্যক্তিকে চাকরি দেওয়ার বিষয়টিও তদন্তকারী দলের নজরে আসে, যা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবের ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া ভুয়া বিল ও ভাউচার তৈরি করে সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযান চলাকালে সংগৃহীত নথিপত্র পর্যালোচনা করে দুদক টিম প্রাথমিকভাবে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার আভাস পেয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়মবহির্ভূতভাবে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

অন্যদিকে, চট্টগ্রামের এলজিইডি কার্যালয়েও আলাদা একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করা হয়। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী, কর্ণফুলী ও আনোয়ারা উপজেলায় চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে অনিয়মের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ না করেও বিল উত্তোলন, নিম্নমানের কাজ করে পুরো বরাদ্দ তুলে নেওয়া এবং কাগজে-কলমে কাজ দেখিয়ে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনাগুলো ঘটেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

অভিযানকালে দুদক টিম প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরে উপস্থিত হয়ে অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে বক্তব্য গ্রহণ করে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে নির্দেশ দেয়। তদন্তকারীরা প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ, ব্যয়ের হিসাব, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং বাস্তব কাজের অগ্রগতি মিলিয়ে দেখবেন বলে জানা গেছে।

দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে বিভিন্ন নথি সংগ্রহ করেছে। এসব নথি বিস্তারিতভাবে যাচাই-বাছাই করে কমিশনের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।