পরীক্ষাকেন্দ্রে চরম অবহেলা: দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি রামপুরার প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান

বিশেষ প্রতিবেদকঃ যেখানে দায়িত্ববোধ, সততা আর শৃঙ্খলার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ছিল, সেখানে নেমে এলো চরম অবহেলার অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারেই যেন নিভে গেল এক প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বের প্রদীপ। ঢাকার রামপুরার একরামুন্নেছা বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্রসচিব মোঃ মিজানুর রহমান-কে চলমান পরীক্ষার সব কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা। বুধবার (২২ এপ্রিল), বোর্ড চেয়ারম্যান ড. খোন্দকার এহসানুল কবির-এর স্বাক্ষরিত জরুরি বিজ্ঞপ্তি যেন বজ্রপাতের মতো নেমে আসে। অভিযোগ—দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা!

কেন্দ্রের ভেতরের চিত্র: দায়িত্বের জায়গায় শৈথিল্য : ঢাকা-৪৪ কেন্দ্র (কোড-৪৭১)—যেখানে শত শত শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হয় পরীক্ষার খাতায়, সেই কেন্দ্রের নেতৃত্বেই ছিলেন মিজানুর রহমান। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন—নিয়মের জায়গায় অনিয়ম, শৃঙ্খলার জায়গায় শৈথিল্য। বোর্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, তার দায়িত্বহীনতার প্রমাণ এতটাই স্পষ্ট ছিল যে, তাকে তাৎক্ষণিকভাবে অপসারণ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।

অব্যাহতির পরও শেষ নয়—আসছে কঠোর ব্যবস্থা : এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি পদচ্যুতি নয়—বরং বড় ধরনের প্রশাসনিক ঝড়ের ইঙ্গিত। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি পাঠানো হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর-এর মহাপরিচালকের কাছে।

ঢাকা জেলা প্রশাসকের পাঠানো একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগের স্তূপ: দীর্ঘদিনের জমে থাকা বিস্ফোরণ : এই ঘটনা হঠাৎ নয়—বরং বহুদিনের জমে থাকা অভিযোগের বিস্ফোরণ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো রীতিমতো চাঞ্চল্যকর ! অতিরিক্ত টিউশন ফি আদায়, স্কুলের কক্ষ ভাড়া দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি নিয়ে ফরম পূরণ।

যোগ্য শিক্ষককে বাদ দিয়ে নিজে বিদেশ সফরে যাওয়া :
আইসিটি ক্লাস না নিয়েও প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণ

অব্যাহতির খবর প্রকাশের পর এসব অভিযোগ আবার নতুন করে সামনে এসেছে, যা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

নেটিজেনদের বিস্ফোরক প্রশ্ন :
সামাজিক মাধ্যমে চলছে তীব্র সমালোচনা। প্রশ্ন উঠছে একের পর এক—যিনি ক্লাসই নেন না, তিনি বিদেশে প্রশিক্ষণে গেলেন কীভাবে ? যোগ্যদের বঞ্চিত করে এই সুবিধা কেন নিজের জন্য ? এই প্রশ্নগুলো শুধু অভিযোগ নয়—বরং এক প্রজন্মের ক্ষোভ ও হতাশার প্রতিফলন।

পুরনো বিতর্কের ছায়া: গাজীপুর থেকেও অভিযোগ : মিজানুর রহমানের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ইতিহাস আরও পুরনো। গাজীপুরে তার পূর্ববর্তী কর্মস্থলেও স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। এমনকি অপসারণের দাবিতে মানববন্ধনও হয়েছিল। তারপরও অভিযোগ রয়েছে—অসাধু কমিটির সহায়তায় তিনি রামপুরার এই বিদ্যালয়ে নিয়োগ পান।

শেষ না শুরু ?
এই অব্যাহতি কি কেবল একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, নাকি বড় কোনো তদন্তের সূচনা—তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—শিক্ষাঙ্গনে দায়িত্বহীনতার এই ঘটনা এক কঠিন সতর্কবার্তা হয়ে রইল।

বিশ্বাসের জায়গায় ফাটল ধরলে পতন শুধু সময়ের ব্যাপার—আর সেই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ হয়ে উঠলেন এক প্রধান শিক্ষক।




রেজা-উন-নবী ও মাহফুজুর রহমান পদোন্নতি পেলেও দায়িত্বে নেই, শূন্য সিলেট-বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের পদ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সরকার সিলেট ও বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারকে গ্রেড-১ পদে পদোন্নতি দিয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করায় প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় রোববার (১৯ এপ্রিল) পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী এবং বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানকে গ্রেড-১ পদে উন্নীত করার পাশাপাশি তাদের বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ওএসডি হিসেবে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত জানায়। একই সঙ্গে দুই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে নতুন বিভাগীয় কমিশনার এখনো নিয়োগ না হওয়ায় প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।

প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রেড-১ পদোন্নতি সাধারণত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হলেও একই আদেশে ওএসডি করা হলে তা নানা বার্তা বহন করে। অনেক সময় নতুন পদায়নের আগে সাময়িকভাবে কর্মকর্তাদের ওএসডি করা হয়, আবার কখনো প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, নীতিগত সিদ্ধান্ত বা ভবিষ্যৎ রদবদলের অংশ হিসেবেও এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ফলে দুই বিভাগীয় কমিশনারকে একযোগে পদোন্নতির পর ওএসডি করায় বিষয়টি স্বাভাবিক প্রশাসনিক রদবদল নাকি বড় ধরনের পুনর্বিন্যাসের অংশ—তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

সিলেট ও বরিশাল—দুটি বিভাগই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। সিলেট দেশের প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত, অন্যদিকে বরিশাল দক্ষিণাঞ্চলের নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ এলাকার প্রশাসনিক কেন্দ্র। এমন দুই বিভাগের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে এখনো নতুন নিয়োগ না হওয়ায় মাঠ প্রশাসনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমন্বয় কার্যক্রমে সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন দায়িত্বের বিষয়ে কিছু উল্লেখ না থাকলেও প্রশাসনের ভেতরে ধারণা করা হচ্ছে, খুব শিগগিরই এ দুটি বিভাগে নতুন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে পদোন্নতি পাওয়া দুই কর্মকর্তাকেও গুরুত্বপূর্ণ কোনো দায়িত্বে আনা হতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছেই।

প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সাম্প্রতিক এ সিদ্ধান্ত শুধু দুই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত পদোন্নতি নয়, বরং উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিতও হতে পারে। এখন নজর সিলেট ও বরিশালে কে আসছেন নতুন বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে, আর খান মো. রেজা-উন-নবী ও মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের পরবর্তী গন্তব্য কোথায়।




বিলাসবহুল ফ্ল্যাট-জমির অভিযোগের মাঝে ১৭ কোটি টাকার বিল বিতর্কে গণপূর্ত কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল (ই/এম) সার্কেল-৩ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের দায়িত্বে থাকা একটি বড় প্রকল্পের প্রায় ১৭ কোটি টাকার বিলকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারী ও অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছেন প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং অনুমোদিত বিলের অঙ্কের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে। এই ঘটনায় জনৈক আলদ্দিন ওয়াজেদ দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পে যে উচ্চ অঙ্কের বিল করা হয়েছে, তার বিপরীতে সমপরিমাণ কাজ বা সরঞ্জাম সরবরাহের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নথিতে দেখানো দাম বাজারমূল্যের তুলনায় অতিরঞ্জিত, এবং বিল অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নিয়মনীতি উপেক্ষার অভিযোগ রয়েছে। কয়েকটি অভ্যন্তরীণ নথিতে বিল অনুমোদনের সময় অস্বাভাবিক তড়িঘড়ি, নথি যাচাই ছাড়া পেমেন্ট প্রসেসিং, এমনকি কিছু ফাইলের তারিখে “বেমিল” এসব বিষয়কে অনিয়মের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ই/এম সার্কেল-৩ এর টেন্ডার ও ক্রয়ব্যবস্থায় প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের প্রভাব বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানান। তাদের দাবি তাঁর ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের নির্দিষ্টভাবে সুবিধা পাওয়া, সরঞ্জাম ক্রয় ও সরবরাহে পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়া, এবং গুরুত্বপূর্ণ টেন্ডারে একটি স্থায়ী গোষ্ঠীর আধিপত্য দেখা যায়।

ঠিকাদার আলদ্দিন ওয়াজেদ বলেন, ১৭ কোটি টাকার বিলটি এই প্রভাব বলয়ের আরেকটি উদাহরণ হতে পারে। প্রকৌশলী মাহবুবুর ঘুষ ছাড়া কাউকে কাজ দেন না। বিশেষ করে তিনি আত্মীয় স্বজনের বাইরে কাজ দিতে অনিহা। কারণ প্রতিটি কাজের তার অগ্রিম কমিশন নির্ধারিত থাকে। তিনি আরো বলেন, প্রকল্পে যে উচ্চ অঙ্কের বিল করা হয়েছে, তার বিপরীতে সমপরিমাণ কাজ বা সরঞ্জাম সরবরাহের প্রমাণ নেই। অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নিয়মনীতি উপেক্ষা করা হয়েছে।

মাহবুবুর রহমান রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ১/১৪ ইকবাল রোডে প্রায় ৩৫০০ বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিক। পশ্চিম আগারগাঁওয়ের ৬০ ফুট রাস্তার মাথায় চারতলা একটি ভবন এবং বনশ্রী আমুলিয়া হাউজিং এলাকায় জমি রয়েছে বলে অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে।

অভিযোগকারীরা বলছেন, এই সম্পদ বৈধ আয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা গেলে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সরকারি চাকরির আয়ের হিসাব অনুযায়ী এত সম্পদ অর্জন সম্ভব নয়। সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে এই সম্পদ অর্জন করা হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোও এই অভিযোগের পক্ষে তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে। সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ই/এম সার্কেল-৩-এর আওতাধীন বিভিন্ন টেন্ডার ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। তিনি ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এ ব্যাপারে প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান সরাসরি কোনো মন্তব্য দেননি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একজন ঠিকাদার বলেন স্যারের বিরুদ্ধে লিখলে সমস্যা হতে পারে। তাঁর হাত অনেক লম্বা।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ ধরনের অঙ্কের বিলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি গুরুতর অনিয়ম ও সরকারি অর্থের অপব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। বিষয়টি তদন্ত ছাড়া পরিষ্কার হবে না। তিনি আরও জানান টেন্ডার ক্রয় বিল প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। নিয়ম ভাঙা হয়েছে কি না তা নিরপেক্ষ তদন্তেই প্রমাণিত হবে।

দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, সরকারি প্রকল্পে ১৭ কোটি টাকার বিল নিয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নথিপত্রের বৈষম্য বা আর্থিক অস্বচ্ছতা পাওয়া গেলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুসন্ধানের আওতায় পড়ে। তিনি যোগ করেন অভিযোগকারীরা সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে প্রাথমিক যাচাইয়ের পর আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি অডিট ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ বলেন, তারিখের অসঙ্গতি, তড়িঘড়ি অনুমোদন এবং যাচাই বিহীন পেমেন্ট এসব উচ্চ ঝুঁকির সংকেত। এটি যদি প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের অংশ হয়, প্রভাব কেবল প্রকল্প সীমায় থাকবে না; এটি সিস্টেমিক হতে পারে।

এ ব্যাপারে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়; এটি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও শাসনব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন। স্বাধীন ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত করতে হবে। তাহলে দুর্নীতিবাজ বের করা সম্ভব।




যমুনা অয়েলে ক্ষমতার সিন্ডিকেট: নতুন এমডির দায়িত্বের পরদিনই হামলা, কেন্দ্রে জিএম এইচআর মাসুদুল ইসলাম

এসএম বদরুল আলমঃ গত বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, বিকেল ৪.১৫ মিনিটে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের নতুন এমডি হিসাবে দায়িত্ব নেয় মো: ইউসুফ হোসেন ভুইয়া। রোববার ছিল তার দ্বিতীয় কর্মদিবস। এর মাঝে আজ ১৯ এপ্রিল দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে প্রতিষ্ঠানটির জিএম এইচ আর মাসুদুল ইসলাম অফিস কক্ষেই অতর্কিত হামলা চালায় সাবেক ডিজিএম এইচ আর বর্তমানে ডিজিএম সেলস মো: হাসান ইমামের উপর। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে হাতাহাতি চলে কিছুক্ষন। তাৎক্ষনিক বিষয়টি এমডিকে মৌখিক ভাবে জানিয়েছেন হাসান ইমাম। অবশ্য জিএম এইচ আর এর অত্যাচারে অনেকটা বাধ্য হয়ে চলতি মাসের ১৩ তারিখে তিনি চাকরি থেকে পদত্যাগও করেছিল, কিন্তু পরের দিন সদ্য বিদায়ী এমডি প্রকৌশলী আমির মাসুদের অনুরোধে সেই পদত্যাগ পত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছে হাসান ইমাম । যমুনা ওয়েলের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তাদের দাবী পুরো প্রতিষ্ঠানটি জিম্মি হয়ে আছে মাসুদুল ইসলাম সিন্ডিকেটের কাছে । প্রধান কার্যালয় থেকে শুরু করে সবকটি ডিপোতে রয়েছে তার সিন্ডিকেট সদস্য।

এক সাথে পাঁচ পদের দায়িত্বে:

২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির জিএম এইচ আর পদে দায়িত্ব পান মো: মাসুদুল ইসলাম। সেই থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে পাকাপোক্ত করে তুলেছেন। তার ইচ্ছেই চলছে যমুনা ওয়েলের সকল প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড। মার্কেটিং কিংবা হিউম্যান রির্সোস ম্যানেজম্যান্টের উপর নুন্যতম কোন ডিগ্রী নেই, শিক্ষাগত যোগ্যতা বিকম তৃতীয় শ্রেনী, শুধু মাত্র চাটার্ড একাউন্টেসী কোর্স কমপ্লিট অথচ তিনি একই সাথে মহাব্যবস্থাপক মানবসম্পদ, মহাব্যবস্থাপক বিপনন, কোম্পানি সচিব, বিটুমিন সরবরাহ এবং অর্থ বিনিয়োগ কমিটির আহবায়কও। এছাড়া অল্প কয়দিন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রুটিন দায়িত্বও পালন করেছে। যমুনা অয়েলের প্রধান কার্যালয়ে আছে এই কর্মকর্তার পৃথক পৃথক তিনটি চেম্বার। অফিসারদের চেম্বার বন্টনের দায়িত্বেও তিনি এর সব কিছুর মূলে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা কুদরুত -ই ইলাহির আর্শীবাদে।

পরবর্তীতে অবশ্য প্রকৌশলী আমির মাসুদ নতুন এমডির দায়িত্ব নেয়ার পরেও সেই আগের মতোই ছিল মাসুদুল ইসলামের ক্ষমতা। ইতিমধ্যে নতুন এমডি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছে মো: ইউসুফ হোসেন। হয়তোবা তিনিও আগের এমডিদের মতো সমীহ করবেন মাসুদুল ইসলামকে, এমনটাই ধারণা করেছে যমুনা অয়েলের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। যদিও ২০১৬ সালে যমুনা ওয়েলের আভ্যন্তরিন একটি তদন্ত কমিটি রিপোর্টে এই মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। এমনকি তৎকালীন সময়ে তদন্ত কমিটি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সুপারিশও করেছিল। কিন্তু যেই লাউ সেই কদু। বরং গত ২৭ নবেম্বর ২০২৫ তিনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের রুটিন এর দায়িত্বও পায়, ছিলেন ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত। দায়িত্ব পেয়েই প্রথমে তিনি প্রতিষ্ঠানটির সব চেয়ে বেশী দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ডিপো অপারেশন ইনচার্জ শেখ জাহিদ আহমেদকে পদায়ন করে এজিএম (ডি, বি) ইনচার্জের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে।

মাসুদুল ইসলামের মহা জালিয়াতি:

প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলী সব কিছুতে মাসুদুল ইসলামের একক নিয়ন্ত্রণ। কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীদের অফিসে উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বও তিনিই করে থাকেন । চলতি বছরের ২৬ ফেব্রয়ারী ডিজিএম এইচ আর মোহাম্মদ হাসান ইমামের স্বাক্ষরে তিন সিবিএ নেতাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় । এই তিন সিবিএ নেতার বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে একাদিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আমার বার্তা। এদের বিরুদ্ধে গঠিত হয়েছে একাধিক তদন্ত কমিটিও। তবে বরাবরই এই তিন সিবিএ নেতার হয়ে প্রকাশ্যে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে জিএম এইচ আর মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্বে। কিন্ত মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে শেষ পর্যন্ত এদেরকে এযাত্রায় বাঁচাতে পারেনি তিনি। বরখাস্তকৃত সিবিএ নেতাদের একজন আবুল হোসেন। তিনি যমুনা অয়েল লেবার ইউনিয়নের সভাপতি ও নিষিদ্ধ সংগঠন জাতীয় শ্রমিকলীগ বন্দর থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক। সাময়িক বরখাস্তকৃত সিবিএ এই নেতাকে দেয়া চিঠিতে বলা হয়েছে ২১ জুলাই হতে ৯ আগষ্ট ২০২৫ পর্যন্ত বিশেষাধিকার ছুটি ভোগ করেন। এরপর অনুপস্থিত, প্রাপ্ত তথ্য মতে কোতোয়ালী থানার জি আর মামলা নাম্বার ৪১৫/২০২৫ আবুল হোসেনকে গ্রেফতার করে ২১ জুলাই চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজেষ্টেটের আদালতে প্রেরন করে।

পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে প্রেরণ করে। এমতাবস্থায় সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। অনুরুপ যমুনা ওয়েলের অপর সিবিএ নেতা এয়াকুবের বেলায়। এই সিবিএ নেতার বরখাস্তের চিঠিতে বলা হয়েছে ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১২ জানুয়ারী ২০২৬ পর্যন্ত ছুটি ভোগ করেছে, এর পর অনুপস্থিত। প্রাপ্ত তথ্যমতে চান্দাগাও থামায় একটি মামলায় তাকে ১৩ ডিসেম্বর গ্রেফতার হয়ে, ১৪ ডিসেম্বরে আদালতের মাধ্যমে জেল খানায় প্রেরন করেছে ৷ এমতবস্থায় তাকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। মজার বিষয় হলো এই দুই সিবিএ নেতা যেদিন গ্রেফতার হলেন, সেদিন থেকেই ছুটি মন্জুর হলো কিভাবে? তাছাড়া পুলিশ হেফাজতে থেকে তারা ছুটির আবেদনই বা করলো কিভাবে? অভিযোগ উঠেছে মাসুদুল ইসলাম নিজেই এদের স্বাক্ষর দিয়ে ছুটির আবেদন করে এবং পরবর্তীতে তিনি নিজেই তা মন্জুর করেন৷ মাস দেড়েক আগে এই দুই সিবিএ নেতা জামিনে জেল হাজত থেকে বের এসেছে। এরপরই এদের সাসপেন্ড প্রত্যাহারের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে মাসুদুল ইসলাম। এমনকি সকল প্রক্রিয়াও শেষ করেছিল। অভিযোগ উঠেছে ইতিমধ্যে এক কোটি বিশ লাখ টাকার রফাদফায় সিবিএ নেতা মুহাম্মদ এয়াকুবের সাসপেন্ড প্রত্যাহারের বিষয়টি চুড়ান্তও করেছিল তিনি। তারই মধ্যস্থতায় টাকার বিষয়টি রফাদফাও হয়েছিল সদ্য বিদায়ী এমডি প্রকৌশলী আমির মাসুদের সাথে, কিন্তু তাকে হুট করে এমডি পদ থেকে ছড়িয়ে দেয়ার তাদের প্লান ভেস্তে গেছে।

এদিকে বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সুবিধাবাদীদের ভালো জায়গায় পোষ্টিং ও পদোন্নতি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে৷ কোন নীতিমালা ও বিভাগীয় প্রধানদের সুপারিশ তোয়াক্কা না করে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে গত বছরের আগষ্টে তার ইচ্ছে মতো পাঁচ জনের নামের প্রস্তাব পাঠায় পদোন্নতি সভায়। পরবর্তীতে সকলেই পদোন্নতিও পায়৷ যমুনা অয়েল সুত্রে জানা গেছে ২০২৫ সালের ৩১ আগষ্ট মাসুদুল ইসলামের স্বাক্ষরিত পদোন্নতি প্রাপ্ত তালিকাদের মধ্যে অন্যতম হলো কুতুবউদ্দিন হোসেন৷ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থেকে জুনিয়র অফিসার পদে পদোন্নতি পাওয়া কুতুবউদ্দিন হলো নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামিলীগ চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক, সাবেক মেয়র আজম নাসিরের চাচাতো ভাই।

বিগত আওয়ামিলীগ সরকারের আমলে আজম নাসিরের হাত ধরেই তার চাকরীতে যোগদান। তবে চাকরিতে যোগ দেয়ার পর থেকেই অফিসের কোন শৃঙ্খলা তোয়াক্কা করেননি। ইচ্ছে হলে অফিসে এসেছে ইচেছ না হলে আসেনি। তার এহেন কর্মকাণ্ডের জন্য একবার খুলনা বিভাগীয় অফিসে বদলী করা হলেও আজম নাসিরের ক্ষমতার দাপটে সেই বদলি স্থগিত হয়ে যায়। কিন্তু বিতর্কিত এই কর্মচারীকে নিজের ইচেছমতো পদোন্নতি দিয়েছে জিএম এইচ আর মাসুদুল ইসলাম। দ্বিতীয় পদোন্নতির তালিকায় আছে মো: সহীদুল আলম, তাকেও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থেকে জুনিয়র অফিসার পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে । তার চাকরিও হয়েছে বিগত আওয়ামিলীগ সরকারের আলমে, তাও আবার রাউজানের সাবেক এমপি ফজলে করিম চৌধুরীর আর্শীবাদে। এছাড়া সহীদুল আলম ছিল ছাত্রলীগের সাবেক দুর্ধর্ষ ক্যাডার ও রাউজান ডিগ্রি কলেজ ছাত্র সংসদের ছাত্রলীগের মনোনীত সাবেক ভিপি। বিগত সরকারের আমলে একদিনের জন্যও অফিসে যেতে হয়নি তাকে। কিন্তু তাকে দেয়া হয়েছে পদোন্নতি। পদোন্নতির তালিকায় আরও আছে ছাত্রলীগের ক্যাডার শেখ কামাল, ইকরাম ও মীর আরিফ। তাদের প্রত্যেককে কেরানি থেকে জুনিয়র অফিসার পদোন্নতি দেয়া হয়েছে।

গেল বছরের শেষের দিকে ফতুল্লা ডিপোতে পৌনে চার লাখ লিটার ডিজেল গায়েব হওয়ার ঘটনায় একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমাও দেয়া হয়েছে। সব কটি তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হয়ে কথা বলেছে ফতুল্লা ডিপোর অফিসার (অপারেশন) ইমরান হোসেন। তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন মাসুদুল ইসলাম সিন্ডিকেটের অন্যতম খলিফা জয়নাল আবেদীন টুটুলের বিভিন্ন অনিয়মের ফিরিস্তি ও তেল চুরির কাহিনি। তবে তার এই প্রতিবাদই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাড়ায়। ২৪ নভেম্বর ২০২৫ মাসুদুল ইসলামের স্বাক্ষরে তাকে বদলী করা হয়েছে ঢাকা বিভাগীয় বিক্রয় অফিসে (অফিসার সেলস পদে)। এদিকে এজিএম টার্মিনাল (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মাকছুদুর হলো জিএম এইচ আর মাসুদুল ইসলামের আরেকজন অত্যান্ত বিশ্বস্ত সহোচর।

বিগত সময় চাকরী করেছে হিসাব শাখায় কিন্তু বছর খানিক আগে তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় এজিএম টার্মিনাল পদে (অতিরিক্ত দায়িত্ব)৷ অপারেশন বিভাগে কাজ করার নুন্যতম অভিজ্ঞতা নেই,কিন্তু সেই মাকছুদুর রহমানকে ১১ নবেম্বর ২০২৫ তারিখে এজিএম টার্মিনাল পদে চলতি দায়িত্বে পদায়ন করে মানব সম্পদ বিভাগের জিএম এই মো: মাসুদুল ইসলাম৷ সম্প্রতি তার সিন্ডিকেটের অন্যতম দুই সদস্য এজিএম সেলস সৈয়দ সফিকুর রহমান ও মোংলা ডিপো ইনচার্জ আল আমিন খানকে তেল চুরির অভিযোগে সাসপেন্ড করেছে । তবে এখনো সক্রিয় আছে তার সিন্ডিকেট অন্যান্য সদস্যরা। এই৷ তালিকায় আছে দৌলতপুর ডিপোর সিবিএ নেতা দেলোয়ার হোসেন বিশ্বাস, বাঘাবাড়ি ডিপোর ইনচার্জ আবুল ফজল সাদেকিন, এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মাহবুবুল আলম (কোন নিয়মনীতি ছাড়াই মাহবুবল আলম একই ডিপোতে পাঁচ বছর ধরে চাকরি করছে), পার্বতীপুর ডিপো থেকে সদ্য বদলীকৃত আইয়ুব আলী (সিবিএ নেতা এয়াকুবের সহোদর), ভৈরব ডিপোর ডেপুটি ম্যানেজার মতিয়ার রহমান, ধীমান কান্তি দাস মানেজার (ফাইনান্স) ও হোসেন মোহাম্মদ ইয়াহিয়া ডেপুটি ম্যানেজার (এডমিন) এমডির দপ্তর প্রধান কার্যালয়।

মাসুদুল ইসলাম সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ধীমান কান্তি দাস ও হোসেন মোহাম্মদ ইয়াহিয়া নামক যমুনা অয়েলের এই দুই কর্মকর্তা। প্রথম জন ২০০৭ সালে একাউন্টস অফিসার হিসাবে প্রধান কার্যালয়ে যোগদান করে। বর্তমানে ম্যানেজার (ফাইনান্স)। দ্বিতীয় জনের চাকরিতে যোগদান ২০১১ সালে। দীর্ঘ চাকরি জীবনে এদের কোনো বদলী নাই৷ যদিও ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর বিপিসির সমন্বিত সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে তাদের অধীনস্থ কোম্পানি সমুহে ৩ বছরের অধিক কর্মরত, ওদেরকে বদলী করতে। কিন্তু এই দুজনের বেলায় কিছুই হয়নি৷ বরং হোসেন মোহাম্মদ ইয়াহিয়া দেখভালের দায়িত্ব পালন করছে এমডির গোপনীয় সহকারে হিসাবে। এমডির দপ্তরে যেকোনো অভিযোগ গেলে তার হাত দিয়েই যেতে হয়৷ তাই তেল চোর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগই নজরে আসেনি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের।

এদিকে ২০২০ সালের ২১ জুনে মাসুদুল ইসলাম ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির ডিজিম (একাউন্টস)। সেসময় জিএম অপারেশন বরাবর তার দেয়া একটা চিঠির বিষয়বস্তু হলো তেলের ক্ষতি প্রসঙ্গে। সেই চিঠিতে বলা হয়, মংলা অয়েল ইনষ্টেশন ডিপোর এপ্রিল ২০২০ মাসের এফও এর ট্যাংকে মজুদ এবং লাভ/ক্ষতির সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করে দেখা যায় যে, তেলের কোনো ধরনের অপারেশন বিহীন ২০ এপ্রিল ২০২০ তারিখে ৩১° সে: তাপমাত্রায় মোট ২৯৯২৫ লিটার কার্যকালীন ক্ষতি দেখানো হয়েছে। উল্লেখিত ক্ষতি কিভাবে সমন্বয় করা হবে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা এবং সদয় সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হলো। তবে এই ঘটনার পাঁচ বছর হয়ে গেলেও কোন সুরাহা হয়নি। অভিযোগ উঠেছে এই ঘটনার সাথে অভিযুক্ত তৎকালীন মংলা ডিপো ইনচার্জ আনিসুর রহমানকে বরিশাল ডিপোর মতো ভালো জায়গায় পোষ্টিংয়ের ব্যবস্থা করে দেয় এই মাসুদুল ইসলাম।এরকম অসংখ্য অভিযোগ মাসুদুল ইসলামের বিরুদ্ধে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার আসামির পক্ষ নিলেন জিএম এইচ আর ও বাঘাবাড়ি ডিপো ইনচার্জ:

ডাকাতি মামলায় একটানা জেল হাজতে ছিল এক মাস সতের দিন। জামিনে বের হয়ে ফের চাকরীতে যোগ দিলেন। দীর্ঘদিন এই অনুপস্থিতিতির বিষয়টি অফিসকে জানানো হয়েছে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন৷ জানা গেছে সিরাজগন্জের বাঘাবাড়ীর অয়েল ডিপোর অফিস সহকারী (হাজিরা ভিত্তিক) হোসাইন মো: ইসহাক মিল্টন গত ৬ জানুয়ারী ২০২৬ একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেফতার হয়। চট্রগ্রামের চন্দনাইশ থানার সেই মামলায় আদালতের জারীকৃত গ্রেফতারী পরোয়ানের ভিত্তিতে সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুর থানা পুলিশ সেদিন তাকে গ্রেফতার করে। এবিষয়ে ৫ মার্চ আমার বার্তায় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, সেদিনই ইসহাক মিল্টনকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে বাঘাবাড়ি ডিপো ইনচার্জ আবুল ফজল মো: সাদেকিন জিএম এইচ আর এর ক্যাশিয়ার হিসাবে পরিচিত। আর এই হোসাইন মো: ইসহাক মিল্টন হলো আবার এই ডিপো ইনচার্জের ক্যাশিয়ার। আবুল ফজল মো: সাদেকিন যেখানেই বদলী হয়ে যান, সাথে করে নিয়ে যায় এই ইসহাক মিল্টনকেও। ওরা দুজন সর্বশেষ চাকরি করেছে পার্বতীপুর ডিপোতে৷ আবুল ফজল মো : সাদেকিন সেখান থেকে বাঘাবাড়িতে বদলী হয়ে আসার সময় সাথে করে ইসহাক মিল্টনকেও এখানে বদলী করে নিয়ে আছে। তিন বছরের মাথায় বদলীর নিয়ম থাকলেও আবুল ফজল মো: সাদেকিন এখানে চাকরি করে যাচ্ছে নুন্যতম পাঁচ বছরের উপরে।

প্রতিষ্ঠানটিতে মাসুদুল ইসলামের চাকরি জীবন শুরু ১৯৯৬ সালের ১৪ অক্টোবর। কর্মরত অবস্থায় গাড়ি কেনার ঋন পায় একবার কিন্তু তিনি পেয়েছে দুবার। সিনিয়র একাউন্টস সময়কালী গাড়ি কিনতে ঋন নিয়েছে। এদিকে জিএম এইচ আর হওয়ার পর আগের ঋন সারেন্ডার করে নতুন করে আবেদন করে। পেয়েও যায় বিশ লাখ টাকার ঋন, কিন্তু গাড়ি না কেনে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে সেই টাকা। অবশেষে বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে বছর খানিক পরে সেই টাকা ফেরত দেয় মাসুদুল ইসলাম। চাকরি জীবনে মালিক হয়েছে শত কোটি টাকার। চট্টগ্রাম হালিশহরের ব্লক এল, লেইন -১, রোড -১, বাড়ি নং-২২, দ্বিতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। চউক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বাকলিয়ার কম্পোলেক আবাসিক প্রকল্পে আছে দুটো প্লট। ইতিমধ্যে একটি প্লটে ভবন নির্মাণ শুরু করেছে। একই এলাকায় আছে বৃহৎ একটি ডেইরি ফার্ম। বিনিয়োগ করে রেখেছে চট্টগ্রাম ষ্টক এক্সচেঞ্জে নামে বেনামে শত কোটি শেয়ার। এ সকল অভিযোগের বিষয়ে মাসুদুল ইসলামের সাথে কথা বলার জন্য একাধিকবার ফোন দেয়া কিন্তু তিনি ফোন ধরেনি, পাঠানো হয় ক্ষুদে বার্তা, এতেও তিনি সাড়া দেয়নি।




আইজিপির নাম ভাঙিয়ে কোটি টাকার প্রতারণা—শফিউল্লাহ আল মুনিরের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক প্রভাবশালী মুখ—শফিউল্লাহ আল মুনির। নিজেকে কখনো ক্রীড়া সংগঠক, কখনো ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিলেও তার বিরুদ্ধে জমা হওয়া অভিযোগ, মামলা, তদন্ত প্রতিবেদন ও আদালতের আদেশ বিশ্লেষণ করলে উঠে আসে এক ভয়ংকর চিত্র—প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারের এক সুপরিকল্পিত নেটওয়ার্ক।

আইজিপির নাম ভাঙিয়ে প্রভাব বিস্তার! অভিযোগ রয়েছে, শফিউল্লাহ আল মুনির দেশের বর্তমান পুলিশের আইজিপির নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। নিজেকে “আইজিপির ঘনিষ্ঠ লোক” পরিচয় দিয়ে নানা সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করেন তিনি। অথচ একাধিক অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়েছে—তার সঙ্গে আইজিপির কোনো সম্পর্কই নেই। তবুও এই ভুয়া প্রভাবের দাপটে দীর্ঘদিন ধরে তিনি চালিয়ে গেছেন প্রতারণার বাণিজ্য।

অপরাধের পুরনো ছায়া: র‍্যাবের হাতে গ্রেফতার : ২০০৮ সালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় র‍্যাবের অভিযানে আটক হন শফিউল্লাহ। সে সময় তার পরিচালিত স্টুডিও থেকে পর্নোগ্রাফি সংশ্লিষ্ট সামগ্রী, ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনায় তার সঙ্গে সহযোগী ও কথিত মডেলদেরও আটক করা হয়—যা তার অতীত কর্মকাণ্ডের অন্ধকার দিককে সামনে আনে।

দুদকের নজরে ‘অস্বাভাবিক সম্পদের পাহাড়’ : দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—মাত্র ৪৯ লাখ টাকার বৈধ আয়ের বিপরীতে তার নামে পাওয়া গেছে ১১ কোটির বেশি সম্পদ, যার বিশাল অংশের কোনো বৈধ উৎস নেই। এই প্রেক্ষিতে আদালত তার বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যাতে তদন্ত প্রভাবিত না হয়।

মামলার পর মামলা—কিন্তু রহস্যজনক অব্যাহতি ! তার বিরুদ্ধে একাধিক থানায় প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দায়ের হলেও কিছু ক্ষেত্রে তদন্ত শেষে “তথ্যগত ভুল” দেখিয়ে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে অন্যদিকে বেশ কয়েকটি মামলায় চার্জশিট দাখিল হয়েছে, যা তার বিরুদ্ধে অভিযোগের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

প্রতারণার বহুমুখী কৌশল :
অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ এবং বিস্ময়কর— ব্যবসায়িক অংশীদার বানানোর প্রলোভনে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া, বিদেশে পাঠানো, চাকরি দেওয়া, লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আদায় এবং ব্যাংক ঋণ ও সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা, এলপিজি ডিলারশিপ থেকে শুরু করে ট্রাভেল ব্যবসা—সবখানেই একই কৌশল, কেবল ব্যক্তি নয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ভুয়া প্রকল্পের ফাঁদে কোটি টাকা লোপাট : খাগড়াছড়িতে ইপিজেড, কেবল কার, খুলনায় চিংড়ি ও ইথানল প্রকল্প, নদীতে সাব-জেটি—এমন সব আকর্ষণীয় প্রকল্পের নামে বিনিয়োগ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। বাস্তবে এসব প্রকল্পের অগ্রগতি প্রশ্নবিদ্ধ, কিন্তু অর্থ গেছে কোথায়—সেই উত্তর মিলছে না।

বিলাসী জীবন ও অন্যের টাকায় বিদেশ ভ্রমণ : অভিযোগ রয়েছে, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ দিয়ে সৌদি আরব, দুবাই, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল ভ্রমণ করেছেন তিনি। অফিস ভাড়া, স্টাফ বেতন, সামাজিক অনুষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই অন্যের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

ভয়ভীতি, অস্ত্রধারী প্রভাব ও হুমকি : শুধু প্রতারণাই নয়—অভিযোগ রয়েছে ভয়ভীতি প্রদর্শনেরও। অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মী ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের চাপে রাখা, টাকা ফেরত চাইলে হুমকি দেওয়া—এসব অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

চেক জালিয়াতি ও বিলাসী প্রতারণা : ৬৬ লাখ টাকার চেক ডিজঅনার, ২৫ লাখ টাকার বাড়ি ভাড়া বকেয়া, এমনকি রোলেক্স ঘড়ি জামানত রেখে কোটি টাকার প্রতারণা—সব মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন বহুমাত্রিক।

শেষ কথা: আইনের কাঠগড়ায় ‘প্রভাবশালী মুখ’ : সব অভিযোগ, মামলা, তদন্ত ও আদালতের আদেশ মিলিয়ে স্পষ্ট—শফিউল্লাহ আল মুনিরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক বিস্তৃত অনিয়মের জাল। যদিও কিছু মামলায় তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন, তবে একাধিক মামলায় চার্জশিট এবং দুদকের চলমান তদন্ত প্রমাণ করে—আইনি লড়াই এখনো শেষ হয়নি।

এই ঘটনা আবারও সামনে আনছে একটি কঠিন বাস্তবতা—রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও ভুয়া প্রভাবের আড়ালে কত বড় প্রতারণার সাম্রাজ্য গড়ে উঠতে পারে। এখন দেখার বিষয়, বিচারব্যবস্থা কত দ্রুত এবং কতটা নিরপেক্ষভাবে এই জটিল অভিযোগের জাল ছিন্ন করতে পারে।




ই-ভ্যালি–কিউকমের পর আবারও ফাঁদ? বিতর্কিতদের ঘিরে ‘বাইক স্ক্যাম’ ঘিরে আবারও আলোচনায় বাজাজ মামুন

বিশেষ প্রতিবেদকঃ দেশের ই-কমার্স খাতে একের পর এক কেলেঙ্কারির পর যখন ভুক্তভোগীরা এখনো ক্ষত সামলাতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় নতুন করে আরেকটি সম্ভাব্য প্রতারণা চক্রের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে—পুরনো বিতর্কিত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতায় আবারও সক্রিয় হতে পারে “বাইক স্ক্যাম”।

বিভিন্ন সূত্র ও ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী, এসকে ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী হিসেবে পরিচিত আল মামুন, যিনি “বাজাজ মামুন” নামেও পরিচিত, নতুন করে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মোটরসাইকেল বিক্রির নামে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনায় যুক্ত থাকতে পারেন।

পুরনো অভিযোগ, নতুন আশঙ্কা : অভিযোগ রয়েছে, অতীতে ই-ভ্যালি, আলেশা মার্ট ও কিউকমের মতো ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির মাধ্যমে বাইক সরবরাহের নামে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রেই নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ না হওয়ায় গ্রাহকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।

বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মহলে আশঙ্কা—একই ধরনের মডেল ব্যবহার করে নতুন ওয়েবসাইট খুলে আবারও অর্ডার নেওয়া হতে পারে, যেখানে পণ্য সরবরাহ বিলম্বিত বা অনিশ্চিত হতে পারে।

সিআইডির নজরে পুরনো নেটওয়ার্ক : আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, অতীতের ই-কমার্স জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। এর মধ্যে অর্থ পাচার ও প্রতারণার অভিযোগে দায়ের করা মামলাগুলোও রয়েছে, যেগুলো সিআইডির ফিনান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট খতিয়ে দেখছে। একটি মামলার তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগসাজশের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি, তবে তদন্ত সংস্থাগুলো বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে।

‘চেক ডেলিভারি’ কৌশল—পুরনো ছকের পুনরাবৃত্তি ?
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অতীতে বাইক সরবরাহের আড়ালে ‘চেক ডেলিভারি’ নামের একটি আর্থিক কৌশল ব্যবহার করে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে বাইক না দিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের স্কিমে সাধারণত দ্রুত লাভের লোভ দেখিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অর্থপাচার ও সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ : তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অতীতের এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব তথ্য এখনো বিচারাধীন, তবুও সংশ্লিষ্টদের সম্পদের উৎস ও লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে তরুণ ক্রেতারা :
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেকার বা তরুণ উদ্যোক্তারা সহজ কিস্তি বা কম দামে বাইক পাওয়ার আশায় এমন স্কিমে বেশি ঝুঁকে পড়েন। ফলে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন।

সতর্কতার বার্তা : অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, অবাস্তব ছাড় বা অফার দেখলে সতর্ক থাকতে হবে, অপরিচিত ওয়েবসাইটে বড় অঙ্কের অগ্রিম পরিশোধ এড়িয়ে চলা উচিত, কোম্পানির লাইসেন্স, ডেলিভারি রেকর্ড ও পূর্ব ইতিহাস যাচাই করা জরুরি।




বিলাসবহুল হোটেলে সাজানো ফাঁদ: ভুয়া ঐতিহাসিক নিদর্শনে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠলো কৃষকলীগ নেতা মাকসুদ–সোহেলের বিরুদ্ধে

এসএম বদরুল আলমঃ দেশজুড়ে নীরবে বিস্তার ঘটেছে এক ভয়ংকর প্রতারণা সাম্রাজ্যের—যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন কৃষকলীগের দুই প্রভাবশালী নেতা মাকসুদুল ইসলাম ও মাজারুল ইসলাম সোহেল। “প্রাচীন পিলার ও কয়েন” নামের এক অভিনব প্রতারণার ফাঁদ পেতে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে তাদের নেতৃত্বাধীন একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতারণা নয়—বরং সুপরিকল্পিত, উচ্চপর্যায়ের টার্গেটিং ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল প্রয়োগ করে গড়ে তোলা একটি শক্তিশালী অপরাধচক্র।

বিলাসবহুল ফাঁদে ‘ঐতিহাসিক সম্পদ’ নাটক : সোহেলের নেতৃত্বে পরিচালিত চক্রটি সাধারণ ধাতব বস্তু, পাথর কিংবা সিলিন্ডার আকৃতির জিনিসকে বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কৃত্রিমভাবে “প্রাচীন” রূপ দিত। প্যাটিনা, দাগ, ক্ষয়—সবকিছু নিখুঁতভাবে সাজিয়ে এগুলোকে দুর্লভ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। এরপর শুরু হতো মূল খেলা—ঢাকার পাঁচতারকা হোটেলের লাউঞ্জ, কনফারেন্স রুম কিংবা অভিজাত রেস্টুরেন্টে আয়োজন করা হতো ব্যক্তিগত প্রদর্শনী। নিজেকে “বিশেষজ্ঞ” পরিচয়ে উপস্থাপন করে সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের সামনে তৈরি করা হতো এক ধরনের বিশ্বাসযোগ্যতার আবহ। “গোপন বিনিয়োগ সুযোগ”, “আন্তর্জাতিক কালেক্টরদের চাহিদা”—এমন সব গল্পে মোহিত করে কোটি কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন করা হতো।

কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ : ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে—
প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান ডা. এস বি ইকবালের কাছ থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা, ডজলেন গ্রুপের আরিফের কাছ থেকে প্রায় ১৬ কোটি টাকা এবং সিবিএম গ্রুপের জয়নাল ওরফে জামান সাহেবের কাছ থেকে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা।
এ তালিকা এখানেই শেষ নয়—অভিযোগ রয়েছে, আরও বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে, যার প্রকৃত পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকাও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
লেনদেন শেষে প্রতারকেরা হঠাৎ করেই গা ঢাকা দিত অথবা ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে সময়ক্ষেপণ করত। পরবর্তীতে পরীক্ষাগারে যাচাই করে দেখা গেছে—এসব তথাকথিত “প্রাচীন নিদর্শন” আসলে সম্পূর্ণ ভুয়া।

দেশজুড়ে বিস্তৃত প্রতারণা নেটওয়ার্ক : ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন শতাধিক মানুষ। উচ্চবিত্ত, ব্যবসায়ী, এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও রেহাই পাননি এই সুসংগঠিত প্রতারণা থেকে।

জমি জালিয়াতিতেও জড়িত একই সিন্ডিকেট ? অন্যদিকে, একই চক্রের আরেক মুখ—মাকসুদুল ইসলাম—ইতোমধ্যে জমি জালিয়াতির মামলায় কারাগারে। মিরপুরের বাউনিয়া এলাকায় এক ব্যক্তির জমি জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠিয়েছে।

সিআইডি তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করলে বিচারক মাকসুদুল ইসলামসহ চারজনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি—অর্থ প্রতারণা ও জমি জালিয়াতি, এই দুই অপরাধই একই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকতে পারে।

প্রমাণের পাহাড়, তবুও প্রশ্ন—কখন হবে বিচার ? ভুক্তভোগীরা ইতোমধ্যে ব্যাংক লেনদেনের তথ্য, রশিদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথোপকথন, প্রদর্শিত বস্তু এবং প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। তবুও এখনো পর্যন্ত বড় ধরনের দৃশ্যমান আইনি অগ্রগতি না থাকায় প্রশ্ন উঠছে—এই শক্তিশালী চক্রের বিরুদ্ধে আদৌ কি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা :
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, “প্রাচীন” দাবি করা যেকোনো বস্তু যাচাই ছাড়া কেনা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছাড়া এসব দাবির কোনো ভিত্তি নেই। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের কর্মকাণ্ড স্পষ্টভাবে প্রতারণা, জালিয়াতি এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের আওতায় পড়ে—যার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।

আস্থার সংকটে সমাজ :
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সিন্ডিকেট কেবল অর্থ লুটেই সীমাবদ্ধ নয়—এটি সমাজে আস্থার গভীর সংকট তৈরি করছে। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে যদি এ ধরনের প্রতারণা বারবার পার পেয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

শেষ কথা : “দুর্লভ সম্পদ”, “গোপন বিনিয়োগ”, “অস্বাভাবিক লাভ”—এসব শব্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে ভয়ংকর প্রতারণা। সংশ্লিষ্টরা তাই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—যাচাই ছাড়া কোনো বড় বিনিয়োগ নয়, আর সন্দেহজনক প্রস্তাব দেখলেই সতর্ক থাকুন। এখন দেখার বিষয়—শত কোটি টাকার এই চাঞ্চল্যকর প্রতারণার জাল ভেদ করে সত্য কতদূর সামনে আসে, আর বিচার কতটা নিশ্চিত হয়।




শ্রমিকলীগ থেকে ‘বিএনপি ঘরানা’: পরিচয় বদল, নির্যাতন-দখলদারিত্বের অভিযোগ আরও ভয়ঙ্কর

এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকার মতিঝিলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ভবনের নিচতলায় ভয়ঙ্কর এক ‘টর্চার সেল’ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে শ্রমিকলীগের সাবেক নেতা মাজহার, আক্তার ও শফিক গং-এর বিরুদ্ধে—যারা বর্তমানে নিজেদের ‘বিএনপি ঘরানার’ পরিচয়ে নতুন করে সক্রিয় হয়েছেন বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একাধিক পোস্ট ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ অনুযায়ী, শ্রমিক সংগঠনের নামে বরাদ্দকৃত নিচতলার কার্যালয়টি দখল করে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে কর্মচারীদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে।

লিফট অপারেটরকে নির্যাতনের অভিযোগ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, সকাল প্রায় ১০টার দিকে ভবনের নিচতলায় লিফট অপারেটর মিজান নামে এক কর্মচারীকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তার চিৎকারে অন্যান্য কর্মচারীরা ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় আহত মিজান বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।

পূর্বেও একাধিক নির্যাতনের অভিযোগ : ভুক্তভোগীদের দাবি, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে আজিজুল ইসলাম, মজিবুর রহমান, নুরুল আলম ও আক্কাস হোসেনসহ আরও অনেক কর্মচারী একই ধরনের মারধর ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

শ্রমিকলীগ থেকে ‘হাইব্রিড বিএনপি’—পরিচয় বদলের অভিযোগ : অভিযোগ রয়েছে, ২০১৬ সাল থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শ্রমিকলীগের ব্যানারে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন। সেই সময় সংগঠনটিকে ব্যবহার করে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ, দখলদারিত্ব ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও ওঠে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তারা হঠাৎ করেই ‘বিএনপি ঘরানার’ পরিচয়ে নতুন কমিটি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা। কর্মচারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, “পরিচয় বদলালেও চরিত্র বদলায়নি—বরং আগের চেয়েও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।”

অফিসের বাইরে কর্মস্থল, কিন্তু প্রভাব মতিঝিলে : অভিযোগ অনুযায়ী, মাজহারের বর্তমান কর্মস্থল বরিশালে হলেও তিনি নিয়মিত মতিঝিল অফিসে অবস্থান করেন। একইভাবে তার সহযোগী শফিকুল ইসলামের কর্মস্থল নারায়ণগঞ্জ হলেও তিনিও নিয়মিত মতিঝিলে উপস্থিত থেকে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ। এদের বিরুদ্ধে টেন্ডার বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য এবং দখলদারিত্বের মতো গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন কর্মচারীরা।

কর্তৃপক্ষের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন :
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কীভাবে এমন ‘টর্চার সেল’ গড়ে ওঠে? কেন প্রশাসন নীরব?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী দাবি করেন, “উচ্চপর্যায়ের কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার ছত্রছায়া থাকায় তারা এতদিন ধরে পার পেয়ে যাচ্ছে।”

ভয় আর আতঙ্কে মুখ খুলতে নারাজ কর্মচারীরা : টর্চার সেলের আতঙ্কে অধিকাংশ কর্মচারী প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি নন। তবে তাদের দাবি—এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।




ভেষজের আড়ালে কেমিক্যাল? আরগন ও বিগো ফার্মাসিউটিক্যালস নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ- ২য় পর্ব

এসএম বদরুল আলমঃ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম পরিচালনাকারী আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড এবং ডেমরাভিত্তিক বিগো ফার্মাসিউটিক্যাল আয়ুর্বেদিক—এই দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখন আর বিচ্ছিন্ন অনিয়মের পর্যায়ে নেই; বরং তা রূপ নিয়েছে দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর এক গভীর, সুপরিকল্পিত হুমকিতে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভেষজ বা আয়ুর্বেদিক পরিচয়ের আড়ালে এসব প্রতিষ্ঠানে তৈরি হচ্ছে এমন সব পণ্য, যেগুলোতে ব্যবহৃত হচ্ছে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান—যার ফলাফল ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
ভেষজের নামে রাসায়নিক বিষ-কি আছে এসব ওষুধে ?

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, যৌনশক্তিবর্ধক সিরাপ ও ক্যাপসুলে অবৈধভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে— সিলডেনাফিল সাইট্রেট (যা সাধারণত প্রেসক্রিপশন ছাড়া ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ) ট্রাডালাফিল সাইট্রেট, ক্যাফেইন (অতিরিক্ত মাত্রায়), এছাড়া তথাকথিত “ভিটামিন” বা “স্বাস্থ্যবর্ধক” ওষুধে পাওয়া যাচ্ছে—গবাদিপশু মোটাতাজাকরণে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ কেমিক্যাল সিপ্রোহেপ্টাডিন (Cyproheptadine) শক্তিশালী স্টেরয়েড গ্রুপের ডেক্সামেথাসন এবং মাত্রাতিরিক্ত সিএমসি (Carboxymethyl Cellulose), এইসব উপাদান দীর্ঘদিন সেবনের ফলে মানবদেহে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে- লিভার বিকল কিডনি নষ্ট, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, “এগুলো কার্যত ধীরে ধীরে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার মতোই অপরাধ।”

IMG 20260409 150203.jpg

আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস: লাইসেন্স এক জায়গায়, অপারেশন আরেক জায়গায় : আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস ময়মনসিংহের ঠিকানায় লাইসেন্স নিলেও তাদের কার্যক্রম মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। লাইসেন্সে ‘ল্যাবরেটরি’ উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে তারা বাজারে বিভিন্ন নামে পণ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া তারা অনলাইনেও এই ওষুধের প্রচার প্রসার এবং ওষুধ বিক্রয় করছে। যেটার অনুমোদন তাদের নেই।

অভিযোগ রয়েছে—“ডায়কেয়ার, ‘নাইটেক্স, ‘রিস্টোর সহ বিভিন্ন পণ্য দিয়ে ডায়াবেটিস নিরাময়” বা “ইনসুলিন স্বাভাবিক হবে – এমন বিভ্রান্তিকর দাবি করা হচ্ছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়াই রোগ নিরাময়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, *ডায়াবেটিস নিরাময়ের মতো দাবি করা অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং প্রমাণ ছাড়া এটি সরাসরি প্রতারণার শামিল।”

WhatsApp Image 2026 04 11 at 2.23.16 PM

ডেসটিনি মডেলের পুনরাবৃত্তি? কমিশনভিত্তিক প্রতারণা নেটওয়ার্ক : ভুক্তভোগীদের অভিযোগ— একটি শক্তিশালী মার্কেটিং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সারাদেশে কমিশনভিত্তিক বিক্রয় চালানো হচ্ছে।

এই নেটওয়ার্কে— সাধারণ মানুষকে “ব্যবসা” করার লোভ দেখানো হচ্ছে, রোগ নিরাময়ের গল্প ছড়িয়ে পণ্য বিক্রি বাড়ানো হচ্ছে, কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অনেকে এটিকে অতীতের বহুল আলোচিত মাল্টিলেভেল মার্কেটিং প্রতারণার নতুন সংস্করণ বলেও আখ্যা দিচ্ছেন।

বিদেশে বসে ‘ব্যবসা’, দেশে মৃত্যুর মিছিল ? অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির মালিক আবু বক্কর যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারসহ অবস্থান করে বাংলাদেশে এই ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য—“দেশের সাধারণ মানুষকে ঠকিয়ে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হচ্ছে।” এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতার অভিযোগও উঠেছে, যা এই চক্রকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

element

হুমকি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
এই অনুসন্ধানের সময় ইকরামুল ওরফে সোহেল নামে এক ব্যক্তি এই পত্রিকার সাংবাদিককে হুমকি ধুমকি দিয়ে বলে— “আমরা অনলাইনে ব্যবসা করি আর কেমিক্যাল দিয়ে মাল তৈরি করি, কিন্তু আপনার কী? ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক রয়েছে, আপনারা লিখে কিছুই করতে পারবেন না।”

পরবর্তীতে প্রশ্ন শুরু করলে সে প্রশ্নের উত্তর দিতে না পেরে ফোন কেটে দেয়।

পরবর্তীতে আমরা যাচাই-বাছাই করে জানতে পারলাম, সে আরগন ফার্মাসিটিক্যালের মালিক আবু বক্করের আপন ছোট ভাই।
আরো জানা যায়, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভুয়া নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন লোককে ফোন দিয়ে থাকে এবং অনেকের সঙ্গেই সে খারাপ আচরণ করে।

photo collage.png (38)

ডেমরার বিগো ফার্মাসিউটিক্যাল: দেয়ালঘেরা ‘রহস্য কারখানা’ : ডেমরার মেন্দিপুর এলাকায় অবস্থিত বিগো ফার্মাসিউটিক্যাল আয়ুর্বেদিক কারখানাকে ঘিরে অভিযোগ আরও ভয়াবহ।

স্থানীয়দের দাবি— তিনতলা ভবনটি চারদিকে দেয়ালঘেরা গেট প্রায় সবসময় বন্ধ থাকে সাংবাদিক বা বাইরের কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না।

সাবেক কর্মচারীদের ভাষ্য—এখানে অবৈধ যৌন উত্তেজক সিরাপ ও ক্যাপসুল তৈরি হয়, অভিযান বা সাংবাদিক আসার খবর পেলেই গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়, ভয়ের কারণে অনেক কর্মী চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, তবে মালিক শাখাওয়াত হোসেন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “সবকিছু নিয়ম মেনেই তৈরি করা হয়।”

photo collage.png (36)

মৃত মানুষের ওপর দাঁড়িয়ে কোটি টাকার সাম্রাজ্য : সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অভিযোগ— এইসব পণ্য সেবনের ফলে অসংখ্য মানুষ ধীরে ধীরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কেউ লিভার নষ্ট হয়ে, কেউ কিডনি বিকল হয়ে, কেউ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে জীবন হারাচ্ছেন—আর সেই মৃত মানুষের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠছে কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য। অভিযোগ রয়েছে, এই লুটপাটের ভাগ পাচ্ছেন কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলও।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন : ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে— “বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” কিন্তু প্রশ্ন উঠছে-এতদিন কেন এসব কার্যক্রম চলতে পারলো? কারা দিচ্ছে এই অবৈধ সুরক্ষা?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা : বিশেষজ্ঞদের মতে—
অনুমোদনবিহীন বা অজানা উৎসের ওষুধ ব্যবহার বন্ধ করতে হবে “ভেষজ” বা “প্রাকৃতিক” নাম দেখেই বিশ্বাস করা যাবে না চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ গ্রহণ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

শেষ কথা: নীরব হত্যাযজ্ঞ থামাবে কে? আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস ও বিগো ফার্মাসিউটিক্যালসকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ শুধু দুটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়—এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর এক গভীর আঘাত।

যদি দ্রুত নিরপেক্ষ ও কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়— তাহলে এই ভেষজের আড়ালে বিষের ব্যবসা আরও বিস্তৃত হয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। এখন দেখার-কর্তৃপক্ষ জাগবে, নাকি এই নীরব মৃত্যুর মিছিল চলতেই থাকবে?




লোন একাউন্ট বাইপাসে কোটি টাকার চেক নগদায়ন: হাতিয়া মসজিদ প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ লোন একাউন্ট বাইপাস করে চেক নগদায়ন: ব্যাংক ধ্বংসের পেছনে এখনো লেগে রয়েছে শেখ হাসিনার প্রেতাত্মারা বিগত সরকারের আমলে শেখ হাসিনার সহযোগীরা দেশের ব্যাংকিং সেক্টর কার্যত ধ্বংস করে গিয়েছিল। শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলেও নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাছানের মতো তার প্রেতাত্মারা এখনো রয়ে গেছে। তারা এখনো দেশের ব্যাংকিং সেক্টর স্থিতিশীল হতে দিতে চায়না।

পূবালী ব্যাংকের একটি বিশ্বস্ত সূত্রের মাধ্যমে জানা গেছে, গত ০৭/১২/২০২০ তারিখে হাতিয়া মডেল মসজিদ নির্মাণ কাজের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান KE-OG-DESH (JV) এর সঙ্গে নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগের ১৪ কোটি ৯২ লক্ষ টাকা র চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কাজ বাস্তবায়নে ঠিকাদার ওসমান গণি পূবালী ব্যাংক, দত্তেরহাট শাখায় ওয়ার্ক অর্ডারের বিপরীতে ঋণ আবেদন করেন। সরকারি প্রকল্পে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে অন্যতম শর্ত হচ্ছে কাজের বিপরীতে বিল পরিশোধের অর্থ সরাসরি ব্যাংকের নির্ধারিত লোন একাউন্টে আসবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর চিঠির মাধ্যমে নিশ্চয়তা দেয় এবং চেকের গায়েই নির্দিষ্ট ব্যাংক-একাউন্ট নম্বর, ব্যাংকের নাম ও শাখার নাম লিখে দেওয়া হয় যাতে অই চেক অন্য কোনো একাউন্টে নগদায়ন করা না যায়। এ ক্ষেত্রেও ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ কামরুল হাছান ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন যে, হাতিয়া মডেল মসজিদ নির্মাণ কাজের বিপরীতে ইস্যুকৃত সকল চেক তিনি পূবালী ব্যাংক, দত্তেরহাট শাখার অধীন KE-OG-DESH (JV) হিসাব নম্বর ০৫১২-৯০১-০৩৫৩৮৭ এর বরাবর ইস্যু করবেন। শুধুমাত্র নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ কামরুল হাছান এর এই নিশ্চয়তার ভিত্তিতেই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মোঃ ওসমান গনির KE-OG-DESH (JV) প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৭,৪৬৪,৫১৮.১৪ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি এবং ওয়ার্ক অর্ডারের বিপরীতে ৩.০০ কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুর করেন।

কামরুল হাছান গত ২৬/০৯/২০২৪ ইং তারিখে নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগে ৩য় বারের মতো একপ্রকার জোর করে পদায়ন নিয়েই শুরু করেন অনিয়ম ও দূর্নীতি। দায়িত্ব নেয়ার নিয়েই কামরুল ঠিকাদার ওসমান গনির ঋণ একাউন্ট বাইপাস করে চেক ইস্যু করা শুরু করেন। একে একে ৪ মাসে তিনি ৬ টি চেক ইস্যু করেন। যার চেক নং স-৯৬২০৮০২, স-৯৬২০৮৬৭, স-৯৬২০৮৮৪, স-৯৬২২৬২৩, স-৯৬২২৬২৪, স-৯৬২২৬৪২ এর মাধ্যমে যথাক্রমে ৬৫৩১৭২৬.০০, ৮১০২৫০০.০০, ৩৮২২৩৬.০০, ১২১৫৩৭৫০.০০, ৩৬৪৬১২৫.০০, ৯৯৪৬০৭.০০ অর্থাৎ ৬টি চেকের মাধ্যমে প্রায় ৩ কোটি ১৮ লক্ষ টাকার চেক ইস্যু করেন যার প্রতিটিই ছিলো ব্যাংকের লোন একাউন্ট বাইপাস করে। বিনিময়ে কামরুল হাছান নিয়েছেন বিপুল অর্থ।

কাজ শেষ না হতেই সুরক্ষা জামানত অবমুক্ত
ঠিকাদারের করা কাজের বিপরীতে প্রদেয় বিলে ৫/১০% সুরক্ষা জামানত সরকারি কোষাগারে জমা রাখার নিয়ম। এ টাকা ঠিকাদার কাজ সম্পূর্ণ শেষ করার এক বছর পরে প্রদান করতে হয়। এখানে ঠিকাদারের এখনো কাজের ৫০% ই শেষ হয়নি অথচ বিলের বিপরীতে রক্ষিত সম্পূর্ণ জামানত অবমুক্ত করেছেন, বিনিময়ে নির্বাহী প্রকৌশলী জনাব কামরুল হাছান হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল অর্থ। জামানত বাবদ রক্ষিত ছিলো ৫১ লক্ষ টাকা এর মধ্যে তিনি তিনটি চেক এর মাধ্যমে ৫০ লক্ষ টাকাই দিয়ে দিয়েছেন। চেক নং স-৯৬২০৮০৯ , স-৯৬২২৬৭৭, স-২৪৫৬২০১ এর মাধ্যমে যথাক্রমে ২৫ লক্ষ, ২০ লক্ষ ও ৫ লক্ষ অর্থাৎ ৫০ লক্ষ টাকার জামানত এর অর্থের চেক তিনি প্রদান করেন লোন একাউন্ট বাদ দিয়ে। জানা গেছে লোন একাউন্ট বাইপাস করে চেক প্রদান করার জন্য কামরুল হাছান ঠিকাদারের থেকে নিয়েছেন ৪২ লক্ষ টাকা।

ব্যাংকের একটি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে এ কাজের বিপরীতে কামরুল হাছান এর ইস্যুকৃত ৯টি চেক “জালিয়াতির মাধ্যমে” ভিন্ন একাউন্টে নগদায়ন করার ফলে ঠিকাদারের নিকট পূবালী ব্যাংক দত্তেরহাট শাখার অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,৯৫,৭৫,৯১১.৬৫ টাকা এবং সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এ অনিয়ম ব্যাংককে আরও একটি খেলাপি ঋণের কবলে ফেলেছে।ব্যাংক কর্তৃপক্ষের মতে শেখ হাসিনার আমলে সরাসরি তার তত্ত্বাবধানে ব্যাংকিং সেক্টরে লুটপাট চালিয়ে দেশের অর্থনীতি পংগু করা হয়েছে কিন্তু শেখ হাসিনার পতনের পর এখনো যদি কামরুল হাছানের মতো লোকজনের শাস্তি না হয় তাহলে দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে।

“দেশ সংস্কারের এই সময়েও যদি কামরুল হাছানদের মতো লুটেরাদের কঠোর শাস্তি না হয়, তবে ব্যাংকিং সেক্টরের ধ্বংস ঠেকানো অসম্ভব।” — সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা।

কাজ ছাড়াই বিল
এই কাজের বিপরীতে গত ০৯-১০-২০২৪ হতে ১৬-০৩-২০২৫ তারিখ পর্যন্ত প্রদানকৃত বিলের বিপরীতে বাস্তবে কোনো কাজই হয়নি। অর্থাৎ কাজ ছাড়াই বিল দিয়েছেন। ঠিকাদার ওসমান গণি এর একজন ম্যানেজার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কামরুল স্যার যখন তিন কোটি টাকার চেক দিয়েছিলেন সেসময় সেই ৩ কোটি টাকার কোনো কাজ মাঠ পর্যায়ে ছিলোনা। গত প্রায় বছরখানেক ধরে এডভান্স বিলের মধ্যে প্রায় এক কোটি টাকার কাজ করা হলেও এখনো তার ২ কোটি টাকার কাজ হয়নি। আর মাঠ পর্যায়ের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপ সহকারী প্রকৌশলীদের থেকে জোর করে ও ভয় ভীতি দেখিয়ে কিছু বিলে স্বাক্ষর নেয়া হলেও এখনো কিছু বিল স্বাক্ষর বিহীন রয়েছে।

নিম্নমানের কাঠ বাশের সেন্টারিং: আল্লাহর ঘরে নিম্নমানের কাজ!
গত সপ্তাহে হাতিয়া মডেল মসজিদের নির্মাণ কাজ পরিদর্শনে নিম্নমানের কাঠ বাশের সাটার ব্যবহার করে ছেন্টারিং করা হয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাছান অবগত নন বলে জানান এবং দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর ওপর ন্যস্ত বলে উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জানান যে, গত ০৯-০৩-২০২৫ তারিখে স্মারক নং-১৫৩ এর মাধ্যমে ঠিকাদারকে লিখিতভাবে নিম্নমানের কাঠ বাশের সাটার অপসারণ এবং স্টিল সাটার ব্যতীত অন্য কিছু ব্যবহার না করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল। পূর্বেও একাধিকবার মৌখিকভাবে সতর্ক করা সত্ত্বেও ঠিকাদার কোনো সংশোধনী ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি এবং বিষয়টি ০৯/০৩/২০২৫ তারিখে স্বারক নং ১৫৪ এর মাধ্যমে নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাছানকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে এরপরেও তিনি কেনো অবগত নন বলেছেন সেটা আমার জানা নাই। স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত আছে যে কামরুল হাছান আর ওসমান গনি ব্যাবসায়িক পার্টনার, এতোদিন সেটা বিশ্বাস না করলেও এখন তো মনে হচ্ছে কথা সত্য।

উল্লেখ্য যে, GCC ক্লজ 51.1 অনুসারে কাজ অবশ্যই অনুমোদিত Specifications অনুযায়ী হতে হবে; GCC ক্লজ 27.1(b) অনুযায়ী সাইটের নিরাপত্তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ ঠিকাদারের বাধ্যবাধকতা। কাঠ/বাঁশের অনঅনুমোদিত ছেন্টারিং ব্যবহার উভয় ধারারই লঙ্ঘন। আর, নির্দেশ অমান্য করে ত্রুটিপূর্ণ কাজ চালিয়ে যাওয়ায় GCC 55 (Rejection of defective work) ও GCC 56 (Removal and re-execution) অনুযায়ী ঐ কাজ প্রত্যাখ্যান ও অপসারণ/পুনঃকাজের ব্যয়ভার সম্পূর্ণরূপে ঠিকাদারের দায় হবে।

আইন বিশেষজ্ঞ এর মত: প্রচলিত আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘন
এ বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের আইন ও বিধি বিধান বিশেষজ্ঞ সুপ্রিম কোর্টের বিখ্যাত আইনজীবী এডভোকেট সজীব বলেন, আলোচ্য ঘটনায় নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাছান সরকারি অর্থ বা সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থেকে তা আত্মসাৎ বা অপব্যবহার করেছেন ফলে দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (Penal Code, 1860) এর ধারা ৪০৯ অনুযায়ী সরকারি কর্মচারী কর্তৃক বিশ্বাসভঙ্গ, ধারা ৪২০ (প্রতারণা): ব্যাংকের সাথে করা চুক্তি (ঋণ একাউন্টে চেক দেওয়ার নিশ্চয়তা) ভঙ্গ করে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া, ধারা ৪৬৭/৪৬৮ (জালিয়াতি): বিলের চেকে জালিয়াতি বা স্বাক্ষরবিহীন বিলে অর্থ ছাড় করা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭: সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের বা অন্য কারো আর্থিক লাভের ব্যবস্থা করা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২: ঘুষের অর্থ (৪২ লক্ষ টাকা) গ্রহণ এবং অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ স্থানান্তর করার দায়ে দায়ী।

এছাড়াও কামরুল হাছান সরকারি চাকরি (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করা, দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া এবং পদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার জন্য অসদাচরণ (Misconduct), ঘুষ গ্রহণ (৪২ লক্ষ টাকা) এবং সাইটে কাজ না থাকা সত্ত্বেও বিল প্রদান এর জন্য দুর্নীতি (Corruption) এর দায়ে দায়ী হবেন।

আবার আর্থিক বিধিবিধান ও চেক নিরাপত্তা লঙ্ঘন সরকারি অর্থ ব্যয় ও হিসাব রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে তিনি গুরুতর আর্থিক বিধি ভঙ্গ করেছেন। গ্যারান্টি ও ঋণের শর্ত লঙ্ঘন (Breach of Assignment)

ব্যাংককে দেওয়া লিখিত নিশ্চয়তা (Letter of Comfort/Undertaking) অনুযায়ী চেকগুলো নির্দিষ্ট ঋণ একাউন্টে (হিসাব নং ০৫১২-৯০১-০৩৫৩৮৭) এ জমা হওয়ার কথা ছিল। এটি অমান্য করে অন্য একাউন্টে চেক নগদায়ন করার ব্যবস্থা করা Account Payee Crossing নীতির সরাসরি লঙ্ঘন। কাজের অগ্রগতি ব্যতীত বিল প্রদান করায় (Advance/Excess Payment) সরকারি আর্থিক বিধি অনুযায়ী, কাজ যতটুকু সম্পন্ন হয়েছে তার ভিত্তিতে বিল পরিশোধ করতে হয়। মাঠ পর্যায়ে কাজ না থাকা সত্ত্বেও ৩/৩.৫ কোটি টাকা বিল প্রদান করা সরকারি অর্থের চরম অপচয় এবং সরাসরি আত্মসাৎ। সাধারণত প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া এবং ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড পার না হওয়া পর্যন্ত জামানতের টাকা ফেরত দেওয়া যায় না। কাজ চলাকালীন জামানতের ৫১ লক্ষ টাকার মধ্যে ৫০ লক্ষ টাকা ফেরত দেওয়ায় জামানত (Security Deposit) অবমুক্তকরণে অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন। বিভাগীয় হিসাবরক্ষকের যোগসাজশে স্বাক্ষরবিহীন বিলে অর্থ ছাড় করা এবং চেকে ব্যাংক ও শাখার নাম উল্লেখ না করা CPWA Code (Central Public Works Accounts Code) এর সরাসরি লঙ্ঘনের দায়ে দায়ী হবেন।

ভোল পাল্টানো রাজনীতির ‘খলিফা’
একসময় সাবেক এমপি একরামুল করিম চৌধুরী ও মোহাম্মদ আলীর ছত্রছায়ায় থাকা ওসমান গণি ৫ই আগস্টের পর ভোল পাল্টেছেন নিমিষেই। ভাইয়ের রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এখন তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতার সান্নিধ্য পাওয়ার চেষ্টা করছেন।

প্রকৌশলীর বক্তব্য বনাম বাস্তবতা
নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাছান এখন ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করার ভয় দেখালেও পর্দার আড়ালে তার যোগসাজশের প্রমাণ মিলছে ব্যাংকের নথিতে। পূবালী ব্যাংক দত্তেরহাট শাখা এখন প্রায় ২ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের ঝুঁকিতে, কারণ প্রকৌশলী সাহেব ব্যাংকের সাথে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে চেকগুলো অন্য হাতে তুলে দিয়েছেন।

এ প্রকল্প ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, একাধিক চেক নির্ধারিত ঋণ-একাউন্টের বাইরে নগদায়ন করা হয়েছে, বাস্তব অগ্রগতির তুলনায় বিল দেওয়া হয়েছে, এবং ৫০ শতাংশ কাজ শেষ না হলেও জামানতের অর্থ অবমুক্ত করা হয়েছে। এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা স্বাধীন তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়; তবে অভিযোগের গুরুত্ব এতটাই বেশি যে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এখন সময়ের দাবি।

মসজিদটি এখন শুধু একটি নির্মাণাধীন ভবন নয়—এটি ধীরগতি, প্রশ্নবিদ্ধ বাস্তবায়ন এবং জনঅসন্তোষের এক অস্বস্তিকর প্রতীক।

হাতিয়ার মানুষের প্রশ্ন একটাই—আর কত বছর ঝুলিয়ে রাখা হবে এই পবিত্র স্থাপনা? নাকি দুর্নীতির এই মহাকাব্য চলতেই থাকবে?