বাইকের নামে বিনিয়োগ, শেষে প্রতারণা—বাজাজ মামুন চক্রের উত্থান ও পতনের গল্প

এসএম বদরুল আলমঃ দেশে ই-কমার্স খাতের দ্রুত প্রসারের সুযোগে এক ভয়াবহ আর্থিক প্রতারণার চক্র গড়ে ওঠার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষ করে করোনা মহামারীর সময়, বাজারমূল্যের চেয়ে অর্ধেক দামে পণ্য দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের কাছ থেকে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়—যার বড় অংশ আজও অধরাই রয়ে গেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ‘বাইক ডেলিভারি’র আড়ালে “চেক ডেলিভারি” নামে অভিনব এক কৌশল ব্যবহার করে আলোচনায় আসেন এস কে ট্রেডার্স-এর স্বত্বাধিকারী ব্যবসায়ী বাজাজ আল মামুন। অভিযোগ রয়েছে, বাইক সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে স্বল্প সময়েই শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে যান তিনি এবং পরবর্তীতে অর্থ পাচারের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন।

ই-কমার্স জায়ান্টদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ : এই প্রতারণা চক্রে বাজাজ আল মামুনের সহযোগী হিসেবে নাম এসেছে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির সিইও মো. রাসেল এবং আলিশা মার্টের চেয়ারম্যান মো. মনজুর আলম শিকদারের। অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েকটি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের যোগসাজশে এই চক্র শতকোটি টাকা আত্মসাৎ করে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ইতোমধ্যে বাজাজ আল মামুনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করেছে। বনানী থানার মামলা নং-৪০ (স্মারক নং ৩২১৬(৫)/১, তারিখ: ১ জুন ২০২৩)। মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডির ফিনান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগ। এ মামলায় আলিশা মার্টের চেয়ারম্যানকে ১ নম্বর এবং বাজাজ মামুনকে ৪ নম্বর আসামি করা হয়েছে।

শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ : সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ৩১০ কোটি ৯৯ লাখ ১৩ হাজার ৪০৭ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কাফরুল থানায় ইভ্যালির বিরুদ্ধে পৃথক মামলা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই অর্থের একটি বড় অংশ এস কে ট্রেডার্সের মাধ্যমে বাজাজ মামুনের কাছে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘চেক ডেলিভারি’—প্রতারণার নতুন ফাঁদ : প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ কৌশল। গ্রাহকরা অনলাইনে বাইক অর্ডার করলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাইক না দিয়ে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হতো পোস্ট-ডেটেড চেক।

প্রথমদিকে সেই চেক নগদায়ন হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়। পরে অধিক লাভের আশায় অনেকেই একাধিক—কখনো ১০ থেকে ২০টি পর্যন্ত বাইক অর্ডার দেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে বাইকের প্রয়োজন না থাকলেও নগদ লাভের আশায় বিনিয়োগ করতেন গ্রাহকরা।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিত্র পাল্টে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, এক পর্যায়ে বাইক কিংবা টাকা—কোনোটিই আর ফেরত দেওয়া হয়নি। এতে এক লাখের বেশি বাইক অর্ডার জমা পড়ে।

উৎপাদন সক্ষমতার বাইরে অর্ডার :
তদন্তে জানা গেছে, এস কে ট্রেডার্স যে পরিমাণ বাইকের অর্ডার নিয়েছিল, তার উৎপাদন সক্ষমতা মূল কোম্পানি উত্তরা মোটরসের পক্ষেও সম্ভব ছিল না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বাইকের কোনো বৈধ কাগজপত্র—চেসিস নম্বর, ইঞ্জিন নম্বর বা আমদানির নথিও পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, বাজাজ মামুন নিজস্ব ইনভয়েসের মাধ্যমে বাইক অর্ডার গ্রহণ করতেন এবং পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল নিয়ন্ত্রণহীন ও অস্বচ্ছ।

বিলাসবহুল জীবনযাপন ও অর্থ পাচারের অভিযোগ : সিআইডির তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ইভ্যালির রাসেল ও শামীমা নাসরিন গ্রাহক ও মার্চেন্টদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ সংগ্রহ করে তা পণ্য সরবরাহে ব্যয় না করে বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয়, সম্পদ অর্জন এবং বিদেশ ভ্রমণে ব্যবহার করেছেন। গ্রাহকদের বারবার ভুয়া ডেলিভারি তারিখ দিয়ে আশ্বস্ত করা হলেও শেষ পর্যন্ত পণ্য বা অর্থ ফেরত দেওয়া হয়নি—যা সরাসরি প্রতারণা ও মানিলন্ডারিংয়ের শামিল।

বিস্তৃত চক্রের সন্ধানে সিআইডি :
সিআইডি জানিয়েছে, আত্মসাৎ করা অর্থের প্রকৃত অবস্থান শনাক্ত এবং এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সদস্যদের চিহ্নিত করতে গভীর তদন্ত চলছে। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে ইতোমধ্যে বিশেষ টিম কাজ শুরু করেছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি : ভুক্তভোগীদের দাবি, ইভ্যালি ও আলিশা মার্টের শতকোটি টাকা এখনো বাজাজ আল মামুনের কাছে রয়েছে। তারা আলিশা মার্টের অর্থপাচার মামলার পাশাপাশি ইভ্যালির মামলাতেও বাজাজ মামুনকে অভিযুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।

শেষ কথা : ই-কমার্সের মোড়কে গড়ে ওঠা এই প্রতারণার জাল শুধু হাজারো গ্রাহকের সঞ্চয়ই গ্রাস করেনি, বরং দেশের ডিজিটাল বাণিজ্যের ওপর আস্থাকেও বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত কত দ্রুত এই জটিল আর্থিক জাল উন্মোচন করতে পারে এবং ভুক্তভোগীরা আদৌ তাদের অর্থ ফেরত পান কি না।




পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আব্দুস সালামকে ঘিরে অনৈতিক সম্পর্ক ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ একটি দপ্তর পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের এক উপ-পরিচালক আব্দুস সালামকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসছে। নারীসংক্রান্ত অনৈতিক সম্পর্ক, প্রতারণার অভিযোগ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্নে ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এই কর্মকর্তা বিভিন্ন সময় একাধিক নারীর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, যেখানে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন ভুক্তভোগীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নারী দাবি করেছেন, এসব সম্পর্কের মাধ্যমে তারা মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এদিকে, এই অভিযোগগুলোর পক্ষে কিছু ছবি ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের প্রমাণ থাকার দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তবে এসব উপাদানের স্বতন্ত্র ও আনুষ্ঠানিক যাচাই এখনো সম্পন্ন হয়নি—যা পুরো বিষয়টিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।

হোটেল-রিসোর্টে যাতায়াত নিয়েও প্রশ্ন : বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টে নিয়মিত যাতায়াতের অভিযোগও উঠেছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। যদিও সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এসব তথ্য নিশ্চিত করেনি, তথাপি অভিযোগের ধারাবাহিকতা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি রাখে।

সাংবাদিকদের মুখ বন্ধের চেষ্টা ? অভিযোগ হুমকি ও হয়রানির
অভিযুক্ত কর্মকর্তা আব্দুস সালামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি। বরং তার হয়ে কথা বলতে এগিয়ে আসেন শ্রমিক দলের কথিত এক নেতা জাকারিয়া, যিনি পল্টন এলাকার একটি অফিস থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সাংবাদিকদের দাবি, জাকারিয়া শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে কথা বলেন এবং কেন এই বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একপর্যায়ে তিনি সাংবাদিকদের “ব্ল্যাকমেইলার” ও “চাঁদাবাজ” বলে আখ্যা দেন।
এছাড়া, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদকের মোবাইল নম্বর সংগ্রহের চেষ্টা, বারবার ফোন করে চাপ প্রয়োগ এবং হুমকিমূলক আচরণের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বিষয়টিকে অনেকেই স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি চাপ ও ভীতির পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

নীরব অভিযুক্ত, সক্রিয় ‘পক্ষসমর্থক’—কেন এই বৈপরীত্য ?
গুরুতর অভিযোগের মুখে আব্দুস সালামের নীরবতা এবং তার পরিবর্তে তৃতীয় পক্ষের আগ্রাসী অবস্থান নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি অভিযোগ গুলো ভিত্তিহীন হয়, তবে অভিযুক্ত ব্যক্তির উচিত ছিল সরাসরি সামনে এসে তা খণ্ডন করা।

স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে : প্রশাসনিক নৈতিকতা ও জনআস্থার প্রশ্নে এমন অভিযোগ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া এই বিতর্কের কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব নয়।

শেষ কথা : এই ঘটনায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—অভিযোগগুলো কি সত্য ? নাকি এর পেছনে রয়েছে পরিকল্পিত কোনো ষড়যন্ত্র?
যে কোনো উত্তরই হোক, সাংবাদিকদের হুমকি দিয়ে বা তথ্য গোপন রেখে সত্য চাপা দেওয়া সম্ভব নয়। জনস্বার্থে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত এবং স্বচ্ছ জবাবদিহি।




ভেষজের আড়ালে কেমিক্যাল? আরগন ও বিগো ফার্মাসিউটিক্যালস নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড এবং ডেমরার বিগো ফার্মাসিউটিক্যাল আয়ুর্বেদিক নামের দুটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস ময়মনসিংহের ঠিকানায় লাইসেন্স নিলেও তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ঢাকাকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। লাইসেন্সে ‘ল্যাবরেটরি’ নাম থাকলেও বাজারে ভিন্ন নামে পণ্য ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো—আয়ুর্বেদিক বা ইউনানি সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকার কথা থাকলেও “ফার্মাসিউটিক্যালস” শব্দ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের আধুনিক ওষুধ প্রস্তুতকারক হিসেবে উপস্থাপন করছে বলে অভিযোগ।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি এসেছে তাদের পণ্যের গুণগত মান নিয়ে। তাদের প্রধান ব্যবসার পণ্যের মধ্যে অনুমোদিত ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ওষুধ ‘ডায়কেয়ার’, যৌনশক্তিবর্ধক হিসেবে প্রচারিত ‘নাইটেক্স’ ও ‘রিস্টোর’ উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, ভেষজ উপাদানের কথা বলে প্রচার করা হলেও বাস্তবে কিছু পণ্যে রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও যৌনশক্তি বৃদ্ধির নামে বাজারজাত কিছু পণ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—এসব পণ্যের কার্যকারিতা নিয়ে কোনো স্বচ্ছ তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব পণ্যের অনেকগুলোই অনুমোদিত তালিকায় নেই এবং আয়ুর্বেদিক বা ভেষজ হিসেবে প্রচার করা হলেও বাস্তবে সেগুলোতে রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।  

element

প্রতিষ্ঠানটির মালিক হিসেবে আবু বক্করের নাম উঠে এসেছে অভিযোগে। অভিযোগকারীদের দাবি, একটি বড় মার্কেটিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সারাদেশে শোরুম এবং কমিশনভিত্তিক বিক্রয় পদ্ধতিতে এসব পণ্য বিপণন করা হচ্ছে। কিছু অভিযোগে এটিও বলা হয়েছে, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, “ডায়াবেটিস নিরাময়” বা “ইনসুলিন স্বাভাবিকভাবে তৈরি হবে”—এ ধরনের দাবি দিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং যথাযথ গবেষণা ছাড়া এমন প্রচারণা বিভ্রান্তিকর। 

অন্যদিকে, রাজধানীর ডেমরার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭০নং ওয়ার্ডের মেন্দিপুর এলাকায় বিগো ফার্মাসিউটিক্যাল আয়ুর্বেদিক কারখানায় অবৈধভাবে যৌন উত্তেজক সিরাপ তৈরি হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। যার স্বত্বাধিকারী মো. শাখাওয়াত হোসেন।

স্থানীয়রা জানায়, তিন তলা ভবন বিশিষ্ট এ কারখানাটি চারদিকে দেয়াল দিয়ে আটকানো এবং যেখানে মূল গেট সেটা দিনরাত সব সময় বন্ধ থাকে। আমাদের এলাকার একটি প্রতিষ্ঠান এখানে আমাদের এলাকার ছেলে মেয়েরা চাকরি করতেন৷ তবে তাদের দিয়ে তৈরি করে নেওয়া হয় যৌন উত্তেজক সিরাপ ও ক্যাপসুল। এসব কারণে অনেকেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানায়, বিগো ফার্মাসিউটিক্যাল নামের এই আয়ুর্বেদিক কোম্পানিতে অভিযান পরিচালনা করেও কোনো লাভ নেই, এটা কেউ বন্ধ করতে পারবে না। কারণ এরা ওপর লেভেলের সকলকে ম্যানেজ করেই অবৈধ কার্যকলাপ করে থাকে।

photo collage.png (36)

স্থানীয় রিপন নামে একজন বলেন, ‘এখানে যে সব যৌন উত্তেজক সিরাপ তৈরি করা হয়, তার কোনো অনুমোদন নেই৷ আমি এক জনের মাধ্যমে কোম্পানির মধ্য বেড়াতে গিয়ে দেখি সেখানে প্রচুর পরিমাণে অবৈধ যৌন উত্তেজক সিরাপ।’

রানা হোসেন নামে একজন বলেন, ‘এখানে যৌন উত্তেজক সিরাপ তৈরি করা হয়৷ আমি এই কোম্পানিতে চাকরি করতাম। আমি খেয়াল করেছি মাঝে মাঝে যখন সাংবাদিক আসতো তখন আমাদের বলা হতো গেট খোলা যাবে না। কোনো সাংবাদিককে গেটে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। বিভিন্ন সময় অভিযান হয় একারণে ভয়েই আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি।’

এ বিষয়ে বিগো ফার্মাসিউটিক্যাল আয়ুর্বেদিক কোম্পানির মালিক শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমার এখানে কোনো যৌন উত্তেজক সিরাপ তৈরি করা হয় না। যা যা তৈরি করা হয় তা নিয়ম মেনেই তৈরি করা হয়।’

এ বিষয়টি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক বলেন, ‘আপনারা এই বিষয় অবগত করেছেন। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। যদি সত্যতা পাওয়া যায় তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

আরগন ফার্মাসিউটিক্যালসকে ঘিরে আরও অভিযোগ— কোম্পানিটি ডেসটিনির মতন করে ডায়াবেটিস সহ বিভিন্ন রোগের নাম বলে সাধারন মানুষকে বোকা বানিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এদিকে কোম্পানির মালিক আবু বক্কর আমেরিকায় ফ্যামিলি সহ থাকেন। সেখানে বসে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে আমেরিকায় বসে আরামের জীবন কাটাচ্ছেন। ওষুধ প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কোম্পানিদের অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে বলে একাধিক ভুক্তভোগীরা জানিয়েছে। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবু বক্করের শাশুড়ির প্রভাব খাটিয়ে নানা কর্মকান্ড চালিয়ে ছিল। সে নিজেও আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতা এবং বিভিন্ন কর্মকান্ডে ফান্ডিং করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

একটি শক্তিশালী মার্কেটিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সারাদেশে পণ্য ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে কমিশনভিত্তিক বিক্রয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী। তাদের ভাষ্যমতে, বিভিন্ন রোগের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করা হচ্ছে এবং চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে এসব পণ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে।

এদিকে, অভিযোগ রয়েছে—প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। যদিও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হবে এবং সত্যতা মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের আগে অবশ্যই তার অনুমোদন, বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এবং নিবন্ধন যাচাই করা জরুরি। অন্যথায় এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত পণ্য ব্যবহার মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে বার বার কল করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেন নি।




রূপগঞ্জে সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর ‘খারা মোশাররফ’র নেতৃত্বে হামলা: ১৮ লাখ টাকার সরঞ্জাম লুট

বিশেষ প্রতিবেদকঃ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছেন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘গ্রীন টিভি’ ও ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’-সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা। গত রবিবার (০৫ এপ্রিল) বিকেলে উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নাওড়া এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় সন্ত্রাসীরা সাংবাদিকদের মারধর করে প্রায় ১৮ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের পেশাদার ভিডিও সরঞ্জাম ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

এই ঘটনায় গ্রীন টিভির ভিডিও জার্নালিস্ট মোঃ শরীয়তুল্লা বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় ১৩ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৫-১৬ জনকে আসামি করে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

 

 

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৮ মার্চ গ্রীন টিভিতে নাওড়া এলাকার মোশাররফ হোসেনের মাদক ব্যবসা, নারী নির্যাতন ও সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়নের বিষয়ে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর জেরে ক্ষিপ্ত হয়ে গত ৫ এপ্রিল বিকেলে গ্রীন টিভি, প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা পুনরায় সংবাদ সংগ্রহে নাওড়া এলাকায় গেলে পূর্ব থেকে ওত পেতে থাকা মোশাররফের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

হামলাকারীরা সাংবাদিকদের এলোপাথাড়ি মারধর ও লাঞ্ছিত করে। একপর্যায়ে বিবাদী শরীয়তুল্লা গ্রীন টিভির ১৭ লাখ টাকা মূল্যের একটি প্যানাসনিক-৩৭২ ভিডিও ক্যামেরা, ৪০ হাজার টাকার ট্রাইপড এবং ৮০ হাজার টাকা মূল্যের একটি ওয়্যারলেস মাইক্রোফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে শোরগোল শুরু হলে স্থানীয়রা এগিয়ে আসলে সন্ত্রাসীরা সাংবাদিকদের হত্যার হুমকি দিয়ে এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে।

ভুক্তভোগী সাংবাদিক মোঃ শরীয়তুল্লা বলেন, “পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আমাদের ওপর পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে। আমাদের মূল্যবান সরঞ্জাম লুট করার পাশাপাশি আমাদের জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার দাবি করছি।”

এ বিষয়ে রূপগঞ্জ থানা পুলিশ জানায়, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে সাংবাদিকদের ওপর এমন ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।




ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব কর্মকর্তা ইকরামের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ ঢাকা ওয়াসার ২ নম্বর জোনের রাজস্ব কর্মকর্তা এএমএম ইকরামকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে। জালিয়াতি, মিথ্যাচার, দলীয় প্রভাব খাটানো, ঘুষ বাণিজ্য এমনকি একই সঙ্গে দুটি সরকারি চাকরি করার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট মহলে এসব কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি ‘ঢাকা ওয়াসার ইবলিশ’ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, তথ্য গোপন করে একদিকে ঢাকা ওয়াসায় চাকরি চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তিনি নোয়াখালী পৌরসভার সচিব হিসেবেও দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৯ বছর ধরে তিনি দুই প্রতিষ্ঠান থেকেই নিয়মিত বেতন তুলেছেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তিনি নোয়াখালী পৌরসভার চাকরি ছেড়ে দেন। তবে নিয়ম অনুযায়ী চাকরিচ্যুত হওয়ার কথা থাকলেও ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ তাকে কেবল নিম্নতর বেতন স্কেলে নামিয়ে শাস্তি দিয়ে দায়িত্বে বহাল রাখে।

জানা যায়, ২০০১ সালের ৯ অক্টোবর উচ্চমান সহকারী (ইউডিএ) পদে ঢাকা ওয়াসায় যোগ দেন ইকরাম। চাকরির শুরুর দিকে তাকে বোতলজাত পানি উৎপাদন প্ল্যান্টে তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে তার বিরুদ্ধে প্রথম আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা পড়ে, যেখানে উল্লেখ করা হয় তিনি একই সময়ে নোয়াখালী পৌরসভায় সচিব হিসেবে কর্মরত থেকে বেতন নিচ্ছেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে তার দ্বৈত চাকরির বিষয়টি সত্য বলে প্রমাণিত হয়।

সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা বিধিমালা-১৯৭৯ অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারীর একাধিক চাকরি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলেও ইকরামের ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তার বেতন স্কেল সামান্য কমিয়ে দেওয়া হয় এবং বরখাস্তকালীন সময়কে ‘অসাধারণ ছুটি’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

তথ্য অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ওয়াসায় কর্মরত থাকা অবস্থায়ই তিনি নোয়াখালী পৌরসভায় সচিব পদে আবেদন করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং ২০০৫ সালের ৭ জুন সেখানে যোগ দেন। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি দুই জায়গায় সমান্তরালভাবে দায়িত্ব পালন করেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজে উপস্থিত না থেকে অন্য কাউকে দিয়ে দায়িত্ব পালন করাতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পদোন্নতি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০২১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তাকে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা ২০১৩ সাল থেকে কার্যকর দেখানো হয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি তাকে রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। অথচ তার আগের জ্যেষ্ঠ ২৫ জন কর্মকর্তা এখনো একই পদে রয়ে গেছেন, যা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে তিনি উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (ডিসিআরও) পদে পদোন্নতির জন্যও তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন, যদিও সংশ্লিষ্টদের মতে এই পদে উন্নীত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা তার নেই। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

এছাড়াও, প্রেষণ ছাড়াই পিপিআই প্রকল্পে ফিল্ড সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং একই সময়ে একাধিক উৎস থেকে বেতন গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার স্ত্রী সালমা আক্তার মিনা ঢাকা ওয়াসার পিএন্ডডি সার্কেলে পিএ কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে মাস্টাররোলে কর্মরত আছেন। অভিযোগ আছে, আত্মীয়স্বজনদের আউটসোর্সিং ও মাস্টাররোলে নিয়োগ দিতেও তিনি প্রভাব খাটিয়েছেন।

এদিকে তার সহকর্মীদের পক্ষ থেকে একাধিক লিখিত অভিযোগ ওয়াসা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অনিয়ম শুধু প্রশাসনিক নয়, ফৌজদারি অপরাধের মধ্যেও পড়ে। তাদের মতে, এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত এবং যারা তাকে লঘুদণ্ড দিয়েছেন তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য এএমএম ইকরামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।




রাজউকের মালিবাগ কোয়ার্টার এখন অব্যবস্থাপনা, মাদক ও দুর্নীতির আখড়া

এসএম বদরুল আলমঃ রাজধানীর মালিবাগে অবস্থিত রাজউকের অফিসার্স কোয়ার্টার এখন যেন বসবাসের অযোগ্য এক পরিবেশে পরিণত হয়েছে। যেখানে উন্নয়ন আর নিরাপদ বসবাসের কথা, সেখানে দেখা যাচ্ছে ময়লা পানি, অপরিচ্ছন্নতা, মশার উপদ্রব এবং নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড। দীর্ঘদিন ধরে এই কোয়ার্টারে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের।

অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) এবং বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা মো. আবু সাইদের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেট উন্নয়নের নামে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ পেলেও বাস্তবে কাজ হয় খুবই নিম্নমানের। একই কাজ বারবার দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও কোয়ার্টারের বাস্তব চিত্র বদলায়নি।

কোয়ার্টারের বিভিন্ন জায়গায় জমে থাকা নোংরা পানি থেকে মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। এতে ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ইতিমধ্যে এখানে বসবাসকারী বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। অথচ এই সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্টদের কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।

অভিযোগ আছে, দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী প্রকৌশলী মিজান ও আমিনুল বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে এড়িয়ে যাচ্ছেন। বাসিন্দারা বারবার অভিযোগ করলেও তারা নানা অজুহাতে সময় পার করছেন। ফলে বাসিন্দারা ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, কলেরা ও টাইফয়েডের মতো রোগের ঝুঁকিতে বসবাস করছেন।

এদিকে কোয়ার্টারের ভেতরেই গড়ে উঠেছে মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক। পাম্পচালক সুমনের নেতৃত্বে ইয়াবা, ফেন্সিডিল ও মদের ব্যবসা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হিসেবে অফিস সহকারী ইউসুফ, ড্রাইভার ইলিয়াছ, আসাদুল, মেকানিক আবুল কাশেম ওরফে জামাই কাশেম এবং জাহেদ ইবনে নোমান (জুয়েল)-এর নাম উঠে এসেছে। এর আগে সুমন মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে মামলাও চলমান রয়েছে।

শুধু মাদকই নয়, কোয়ার্টারের ড্রাইভারদের ডরমেটরিতে নিয়মিত জুয়ার আসর বসছে। আবুল কাশেম ও ইলিয়াছের নেতৃত্বে এই জুয়ার বোর্ড পরিচালিত হয়। রাতের বেলায় সেখানে বহিরাগতদের আনাগোনা বেড়ে যায় এবং মাদক সেবনও চলে। আগে পার্কিং এলাকায় এসব কার্যক্রম হলেও এখন ডরমেটরির ভেতরেই তা চলছে।

অভিযোগ রয়েছে, করোনাকালীন সময়েও কোয়ার্টারের একটি ভবনের লোহার ফ্রেম কেটে বিক্রি করে দেওয়া হয়, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ টন। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের কারণে বিষয়টি চাপা পড়ে যায়।

বর্তমানে কোয়ার্টারের অনেক রুম অবৈধভাবে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। ড্রাইভার ইলিয়াছ, জুয়েল, খুরশীদ আলম (মিলন), ফারুকসহ অনেকেই একাধিক রুম ভাড়া দিয়েছেন। এসব রুমে বিভিন্ন পেশার লোকজন বসবাস করছেন, যাদের অনেকেই বহিরাগত। এর মাধ্যমে মাসে বড় অঙ্কের অর্থ আয় হচ্ছে, যার একটি অংশ নাকি দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তার কাছেও যায়।

এছাড়া এখানে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতও বেড়েছে। জুয়েলের ছেলে আইজান, জাকিরের ছেলে শুভসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই গ্যাং কোয়ার্টারের পরিবেশ নষ্ট করছে। তারা নিয়মিত আড্ডা, ইভটিজিং এবং মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, কিছু বাসায় অতিরিক্ত লোক সাবলেট হিসেবে রাখা হচ্ছে। যেমন ডিডি আসমা বেগমের বাসায় প্রায় ২০ জনের মতো মানুষ থাকেন। তার বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে নানা অনিয়ম করার অভিযোগও উঠেছে।

সব মিলিয়ে, যেখানে রাজউকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার কর্মকর্তাদের জন্য নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ থাকার কথা, সেখানে এখন চলছে দুর্নীতি, মাদক ব্যবসা, জুয়া এবং অব্যবস্থাপনা। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে।

সচেতন মহলের দাবি, এই কোয়ার্টারের সব অনিয়ম তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। পাশাপাশি অবৈধ দখল, মাদক ব্যবসা ও জুয়ার আসর বন্ধ করে কোয়ার্টারের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।




৫৫ ডিপো জুড়ে তেল চুরির মহোৎসব: সিবিএ নেতা ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট সক্রিয়

এসএম বদরুল আলমঃ দেশজুড়ে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানির প্রায় ৫৫টি ডিপো রয়েছে, আর এই ডিপোগুলোকে ঘিরেই দীর্ঘদিন ধরে তেল চুরির অভিযোগ ঘুরে ফিরে আসছে। বিভিন্ন কৌশলে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার তেল গায়েব হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চুরির সঙ্গে শুধু সাধারণ কর্মচারী নয়, বরং সিবিএ নেতা থেকে শুরু করে প্রভাবশালী কর্মকর্তা পর্যন্ত অনেকেই জড়িত বলে জানা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির পর দেশজুড়ে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ চোরাই তেল উদ্ধার হওয়ায় এই সিন্ডিকেট আবার আলোচনায় এসেছে।

সম্প্রতি পদ্মা অয়েলের গোদনাইল ডিপো থেকে কুর্মিটোলার পথে প্রায় ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল চুরির ঘটনা সামনে আসে। চারটি ট্যাংকার কাগজে-কলমে গন্তব্যে পৌঁছালেও বাস্তবে সেগুলো পৌঁছায়নি। এই জেট ফুয়েল মূলত বিমানের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে কম দামের কারণে এটি অকটেনের সঙ্গে মিশিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহা. মফিজুর রহমান বিষয়টি স্বীকার করে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন।

এর আগেও বড় ধরনের চুরির ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের জুনে যমুনা অয়েলের দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপো থেকে প্রায় ৬ লাখ লিটার তেল উধাও হয়ে যায়। তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং দেড় বছর পর কয়েকজন কর্মচারীকে মৌখিকভাবে বদলির সুপারিশ করা হয়। আশ্চর্যের বিষয়, এরপরও একই ডিপো থেকে আবার ৪৫ হাজার লিটার তেল গায়েব হয়ে যায়। অভিযোগ আছে, অডিট করতে গেলেও কৌশলে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। কিছু ডিলারের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে কাগজে-কলমে হিসাব মিলিয়ে দেওয়া হয়।

এই ডিপোতে দায়িত্বে থাকা সুপারভাইজার সমির পালের বিরুদ্ধেও পুরনো অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালে পতেঙ্গার গুপ্তখাল ডিপো থেকে তেল পাচারের ঘটনায় তিনি বরখাস্ত হয়েছিলেন। পরে কিছু টাকা আদায় করে তাকে আবার চাকরিতে ফিরিয়ে আনা হয় এবং বিভিন্ন ডিপো ঘুরে আবার একই কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আরেক আলোচিত নাম হেলাল উদ্দিন, যিনি যমুনা অয়েলের সাবেক ইনচার্জ থেকে পরে ডিজিএম (অপারেশন) পদে উন্নীত হন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তেল চুরির টাকায় তিনি শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। চট্টগ্রামে একাধিক বাড়ি, বিদেশে ফ্ল্যাট, দামি গাড়ি—সবই তার সম্পদের অংশ। এমনকি তার বাসা থেকেই এক সময় ২৫ লাখ টাকা চুরি হলেও তিনি কোনো আইনি পদক্ষেপ নেননি, কারণ এতে নিজেই বিপদে পড়তে পারেন বলে ধারণা করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত শুরু করলেও তা শেষ পর্যন্ত থেমে যায়।

তেল চুরির এই সিন্ডিকেটে সিবিএ নেতারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যমুনা অয়েল লেবার ইউনিয়নের সভাপতি আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ এয়াকুব দীর্ঘদিন ধরে এই চক্র নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তারা সাময়িক বরখাস্ত হলেও তাদের অনুসারী নাসির উদ্দিন বর্তমানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তিনি শ্রমিকদের কল্যাণ তহবিল থেকে জোরপূর্বক অর্থ কেটে নেওয়ার জন্য চিঠিও দিয়েছেন, যা সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে।

অন্যদিকে মোংলা ডিপোতে অভিযান চালিয়ে অতিরিক্ত ১২ হাজার ৬১৩ লিটার তেল পাওয়া গেছে, যার কোনো হিসাব দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় ডিপোর ম্যানেজার আল আমিনকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ এলাকায়ও প্রকাশ্যে চোরাই তেল বিক্রির চিত্র দেখা যাচ্ছে। ফতুল্লা ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন ব্যক্তি যেমন স্বপন, কালাম, হৃদয়, রনি, পাগলা রাজু, ফয়সাল, কাইল্লা সোহেল, নাসির উদ্দিন, জালাল মিয়া, মাসুদ ও ইকবাল চৌধুরীর নেতৃত্বে আলাদা আলাদা চক্র সক্রিয় রয়েছে। তারা ট্যাংকার থেকে অতিরিক্ত তেল সরিয়ে বিক্রি করে দেয়। এছাড়া নদীপথে জাহাজ থেকে তেল নামানোর সময়ও চুরি হয়।

অনেক ক্ষেত্রে ট্যাংকারে ১০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতা থাকলেও কাগজে ৯ হাজার লিটার দেখানো হয়, আর বাড়তি তেল মাঝপথেই বিক্রি হয়ে যায়। বিভিন্ন জায়গায় খোলা বাজারে অবৈধভাবে ডিজেল ও অকটেন বিক্রি হচ্ছে, যার সঙ্গে ডিপোর কিছু কর্মচারীর সম্পৃক্ততা রয়েছে।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, তেল চুরি এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে রাষ্ট্রীয় সম্পদের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, আর জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।




আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির অভিযোগে চাপে সাউথইস্ট ব্যাংক, নজরে বাংলাদেশ ব্যাংক

এসএম বদরুল আলমঃ দেশের ব্যাংকিং খাতে চলমান অস্থিরতার মধ্যে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে সাউথইস্ট ব্যাংক। আর্থিক সক্ষমতা, পরিচালনা কাঠামো এবং নেতৃত্ব নিয়ে একাধিক অভিযোগ ও প্রশ্ন ঘিরে প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সংশ্লিষ্ট মহলে। বিশেষ করে চেয়ারম্যান এম এ কাসেম এবং তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মুশফিকুর রহমান-কে কেন্দ্র করে প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ছায়া, নীতিনির্ধারণে হস্তক্ষেপের অভিযোগ : সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সক্রিয় প্রভাব রয়েছে। শুধু নীতিনির্ধারণেই নয়—নিয়োগ, বদলি ও পদায়নেও এই গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন শাখা ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি অপছন্দের কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া এবং পছন্দের ব্যক্তিদের বসানোর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলার কথাও শোনা যাচ্ছে।

নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন, আস্থাহীনতায় আমানতকারীরা : ব্যাংকের গ্রাহক ও আমানতকারীদের একটি অংশ চেয়ারম্যান এম এ কাসেমের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন দায়িত্বে থাকলেও বয়সজনিত কারণে তিনি আগের মতো সক্রিয় নন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি ও পেশাদারিত্বের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি ব্যাংকের সামগ্রিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন তারা।

তারল্য সংকটের শঙ্কা, টাকা তুলতে শুরু গ্রাহকরা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, আগের তুলনায় আর্থিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং কিছু আমানতকারী ইতোমধ্যে তাদের জমাকৃত অর্থ তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। যদিও এ বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবুও গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে।

‘লজিস্টিকস সিন্ডিকেট’ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ : ব্যাংকের অভ্যন্তরে মুশফিকুর রহমানকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী প্রভাব বলয় গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। তিনি সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও লজিস্টিক বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগ, ক্রয়-বিক্রয়, সরবরাহ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে তার প্রভাবের কারণে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ভিতরের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, লজিস্টিক বিভাগকে ঘিরে সরঞ্জাম ক্রয় ও অবকাঠামোগত কাজে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানোর মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললে চাকরি হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

দুদকের তদন্তে নতুন মাত্রা :
এদিকে চেয়ারম্যান এম এ কাসেমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। তিন সদস্যের একটি তদন্ত দল ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে। এই অভিযোগগুলোর একটি বড় অংশ সংশ্লিষ্ট নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়-কে কেন্দ্র করে।

অভিযোগ রয়েছে, জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। কম মূল্যের জমি বেশি দামে দেখানো, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে জমি কেনায় অনিয়ম, এবং ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্যে জমি ক্রয়ের বিষয়গুলো তদন্তাধীন।

বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ : অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি থেকে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি কেনা হয়েছে। এসব গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ও চালকের ব্যয়ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে বহন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া অতিরিক্ত কমিটি গঠন করে সিটিং অ্যালাউন্স নেওয়ার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় এসেছে।

স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন :
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল অর্থ একই ব্যাংকে এফডিআর হিসেবে রাখার অভিযোগও উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের লেনদেন স্বার্থের সংঘাত তৈরি করতে পারে এবং একটি ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামোর নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

আস্থার সংকটে ব্যাংকিং খাত:
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আস্থা। পরিচালনায় স্বচ্ছতা না থাকলে দ্রুত গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়, যা সরাসরি আর্থিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলে।

এখন কী করণীয় ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার প্রয়োজন। পরিচালনা পর্ষদে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকটের ঝুঁকি রয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক-এর ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে।

সব মিলিয়ে, সাউথইস্ট ব্যাংককে ঘিরে উদ্ভূত এই পরিস্থিতি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়—এটি পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, তদন্তের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করছে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার।




এলকেএসএসে সিন্ডিকেটের দাপট: আউটসোর্সিং নিয়োগে লাখ টাকার লেনদেনের অভিযোগ

এসএম বদরুল আলমঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর আওতাধীন এলকেএসএস-এর একাধিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অর্থ লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার নূরুল ইসলাম এসব নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে নিয়োগ বাণিজ্য পরিচালনা করছেন।

অভিযোগে বলা হয়, প্রধান প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন নিয়োগ কার্যক্রমে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছেন। এ কারণে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) কর্মকর্তারাও অনেক ক্ষেত্রে তার প্রভাবের কাছে অসহায় হয়ে পড়ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

WhatsApp Image 2026 04 05 at 1.44.12 PM

ছবি: নূরুল ইসলামের প্রধান সহযোগী এসি এডমিনের সহকারী সোহেল ও এইচআরসি’র পিয়ন হাবিব

সূত্রগুলো জানায়, নূরুল ইসলাম একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে এলকেএসএস-এইচআরসি শাখায় নিয়োগ বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে। এই সিন্ডিকেটে তার পিয়ন হাবিব এবং প্রশাসনিক শাখার (এসি এডমিন) সহকারী সোহেলের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, কুড়িগ্রামের এক্সএন অফিসে কর্মরত পিয়ন হাবিবকে বিশেষভাবে ঢাকায় এনে নিয়োগসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার প্রধান কাজ হলো চাকরি প্রত্যাশীদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই এবং প্রক্রিয়াজাত করা।

অভিযোগ রয়েছে, তার মাধ্যমেই অধিকাংশ প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয় এবং অর্থ লেনদেনের বিষয়গুলোও তার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।

এ বিষয়ে আরও জানা যায়, গত রমজান মাসে ঈদের আগে জাইকা প্রকল্পের আওতায় কুড়িগ্রামে সহকারী প্রকৌশলী পদে প্রায় ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

একইভাবে চলতি বছরের মার্চ মাসে রিভার প্রকল্পের আওতায় সিরাজগঞ্জে সহকারী প্রকৌশলী পদে প্রায় ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

শুধু তাই নয়, আউটসোর্সিং নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ফাইল অনুমোদন নেওয়ার প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করা হচ্ছে। মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে ২০০-র বেশি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এসব নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই পিয়ন হাবিবের মাধ্যমে সিভি জমা ও অর্থ লেনদেন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়াও, অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চাকরি প্রত্যাশী আরও অনেক ব্যক্তির কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ গ্রহণ করেছেন ম্যানেজার নূরুল ইসলাম।

WhatsApp Image 2026 04 05 at 1.44.12 PM (1)

ছবি: অফিসে খোশগল্পে নূরুল ইসলাম

নীতি, নৈতিকতা ও আইনি দৃষ্টিকোণ:

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং এটি গুরুতর দুর্নীতি এবং দণ্ডনীয় অপরাধের শামিল।

সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা, মেধা ও সমতার নীতি লঙ্ঘন হলে তা রাষ্ট্রীয় সুশাসনের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী—

  • ঘুষ গ্রহণ ও প্রদান দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
  • নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
  • ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রভাব বিস্তার সরকারি চাকরি বিধিমালার গুরুতর লঙ্ঘন।

সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রত্যাশিত পদক্ষেপ:

সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি-

  • অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত।
  • অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
  • ভবিষ্যতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
  • ডিজিটাল ও কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা।

এই ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।




এলজিইডিতে গতি ফেরাতে ১৯৭ প্রকৌশলীকে চলতি দায়িত্ব

এসএম বদরুল আলমঃ অবশেষে এলজিইডির দীর্ঘ দিনের জট খুলতে শুরু করেছে ১৯৭ জনকে নির্বাহী প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে। এ বিষয়ে ২ এপ্রিল ২৬ বৃহষ্পতিবার স্থানীয় সরকার বিভাগ ০৫.০০.০০০০.১৭০.১১.০১৭.২১.৯৭ প্রজ্ঞাপনের ৩(ক) ও (ঘ) এর ভিত্তি অনুযায়ী এলজিইডির কাজের গতি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে প্রজ্ঞাপন জারী করেছে।

স্হানীয় সরকার বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর দিক নির্দেশনায় ১৯৭ জন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীকে এলজিইডির শুন্য পদে চলতি দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।

এলজিইডি বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতা পর থেকে দেশব্যাপী গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে যোগাযোগ ব্যবস্থায় শীর্ষে পৌছে দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জনবলের অভাবে এ উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হচ্ছিল। এ বিষয়টি চিন্তা করে বর্তমান সরকার চলতি দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যম্যে এলজিইডির চলমান জনবলের সমস্য দূর করার চেষ্টা করছে। দীর্ঘদিন নির্বাহী প্রকৌশলীর কয়েক শত পদ শূন্য থাকলেও নানা জটিলতায় পদোন্নতি দেওয়া যাচ্ছিলনা।

আওয়ামী সরকারের পতনের পরও ছাত্রলীগ পন্থী এবং আওয়ামী সরকারের কতিপয় সুবিধাভোগী কোটি কোটি টাকা খরচ করে সব কিছু দখল করে বসে আছে।

বিগত সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রকল্প পরিচালকদের দ্রুত অপসারণ করে এবং অর্থ লোপাট বন্ধ করলে এলজিইডি পূর্বের ন্যায় দাপটের সাথে সরকারের গৃহীত উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে।

এবিষয়ে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তাগণকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ।

চলতি দায়িত্বের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, চলতি দায়িত্ব ও অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান বিধিমালা, ২০২৩ অনুযায়ী চলতি দায়িত্বকে কোনোভাবেই পদোন্নতি হিসেবে গন্য করা যাবেনা।