দুই দশক ঢাকায়, বদলির বাইরে কেন ছিলেন স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল?

এসএম বদরুল আলমঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাঠের কারখানা স্পেশাল ইউনিটে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, আলোচিত বদলির পরও এই ইউনিটে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী ফার্নিচার সিন্ডিকেট কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম, যাঁর বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করে শতকোটি টাকার কাজ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাঙ্গীর আলম দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দরপত্র ব্যবস্থাকে কার্যত নিয়ন্ত্রণে নেন। প্রকল্পের এস্টিমেট তৈরি হওয়ার পর নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার ও ফার্নিচার প্রতিষ্ঠানের কাছে গোপনে রেট-কোড সরবরাহ করা হতো। এর বিনিময়ে আগেভাগেই ৩ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ নেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে দরপত্র প্রক্রিয়া চালু থাকলেও বাস্তবে কাজ পেতেন কেবল পূর্বনির্ধারিত প্রতিষ্ঠানগুলো।

যেসব সাধারণ লাইসেন্সধারী ঠিকাদার নিয়ম মেনে দরপত্রে অংশ নিতেন, তারা একের পর এক প্রকল্প থেকে বাদ পড়তেন। অনেককে “পরের কাজ দেওয়া হবে” বলে মাসের পর মাস ঘুরিয়ে রাখা হতো। কেউ কেউ অগ্রিম টাকা দিয়েও কাজ না পেয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। আবার কেউ কাজ পেলে তাকেও বাধ্য করা হতো নির্দিষ্ট ফার্নিচার কোম্পানি থেকে মালামাল নিতে অথবা কাজের বড় অংশ সাব-কন্ট্রাক্ট দিতে। নির্দেশ অমান্য করলে বিল আটকে দেওয়া বা চুক্তি বাতিলের মৌখিক হুমকির অভিযোগও রয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, “ফার্নিচার কনসেপ্ট এন্ড ইন্টেরিয়র লিমিটেড” নামের একটি প্রতিষ্ঠান গত দুই অর্থবছরে অস্বাভাবিক পরিমাণ সরকারি কাজ পেয়েছে। নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫/১৩ নং লটে ৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকার বেশি, ২০২৫/৩ ও ২০২৫/৪ নং লটে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা করে কাজ পায়, যা মডেল মসজিদ প্রকল্পের আসবাবপত্র সরবরাহ ও স্থাপন সংক্রান্ত। এছাড়া রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, শহীদ নায়েব সুবেদার আশরাফ আলী খান বীরবিক্রম লাইব্রেরি এবং পাবলিক লাইব্রেরী বহুমুখী ভবনেও কোটি টাকার কাছাকাছি কাজ প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি প্রকল্পে ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই ফার্নিচার সরবরাহের চুক্তি ও বিল পরিশোধ করা হয়েছে, যা সরকারি ক্রয় বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আরও অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ছাড়াই বিল ছাড় করা হয়েছে। একাধিক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তারা স্বাক্ষর না দিলেও ঊর্ধ্বতন চাপের কারণে বিল পাস হয়ে গেছে।

একই সময়ে আকতার ফার্নিচারস, নদীয়া ফার্নিচার ও হাতিলসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও বড় অঙ্কের কাজ পেয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এসব প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেটের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ বণ্টনের সুবিধা পেয়েছে। এর ফলে সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন মানসম্পন্ন কাজ করা অনেক অভিজ্ঞ ঠিকাদার এখন কার্যত কাজবঞ্চিত।

জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, অতীতে অন্য বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে এপিপি প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে বেনামী ঠিকাদারি ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে তিনি বারবার গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছেন। যদিও সর্বশেষ রাজশাহীতে বদলির পর ঢাকায় ফেরার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে অফিসের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। একাধিক সূত্র জানায়, নারী সহকর্মীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন ছিল। কয়েকজন নারী প্রকৌশলী দায়িত্বকাল শেষ হওয়ার আগেই বদলি নিয়েছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র জানিয়েছে, স্পেশাল ইউনিটে সংঘটিত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অভ্যন্তরীণ তদন্তের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হতে পারে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে যুক্ত করা হবে।

সব মিলিয়ে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই ইউনিট আবারও একটি সীমিত গোষ্ঠীর লুটপাটের কেন্দ্রে পরিণত হবে, যেখানে সরকারি অর্থের অপচয় এবং যোগ্য ঠিকাদারদের পেশা হারানো অব্যাহত থাকবে।




রমনা গণপূর্ত স্টোরের রাস্তা: উন্নয়নের আড়ালে প্রশ্নবিদ্ধ কাজ ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ রমনা গণপূর্ত স্টোর কম্পাউন্ডের ভেতরের রাস্তা উন্নয়নকে ঘিরে এখন তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বাইরে থেকে দেখলে এটি একটি সাধারণ উন্নয়ন প্রকল্প মনে হলেও ভেতরের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। একদিকে কিছু প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এখানে নাকি উন্নতমানের বিটুমিনাস কার্পেটিং দিয়ে টেকসই রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। আবার অন্যদিকে উঠে আসছে নিম্নমানের কাজ, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের মধ্যে যোগসাজশ এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের গুরুতর অভিযোগ। এই দুই বিপরীত চিত্র সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি করছে—এটি কি সত্যিকারের উন্নয়ন, নাকি উন্নয়নের নাম করে দুর্নীতি?

প্রশংসামূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। সেই ধারাবাহিকতায় রমনা গণপূর্ত উপ-বিভাগ-১, শাখা-২-এর আওতায় রমনা স্টোর এলাকার অভ্যন্তরীণ রাস্তায় গড়ে তিন ইঞ্চির বেশি পুরু বিটুমিনাস কার্পেটিং, উন্নতমানের রেডি মিক্স ও ওয়াটার বাউন্ড ম্যাকাডাম ব্যবহারের কথা বলা হয়। এসব লেখায় উপ-সহকারী প্রকৌশলী খন্দকার মমিনুর রহমান এবং উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোঃ মেহবুবার রহমানের সততা, দক্ষতা ও তদারকির ভূয়সী প্রশংসা করা হয়।

তবে এই প্রশংসামূলক বর্ণনার ভাষা ও উপস্থাপন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অনেকের মধ্যে। সমালোচকদের মতে, এসব লেখায় প্রকল্পের বাস্তব কাজের মান যাচাইয়ের চেয়ে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশংসাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এমনকি যারা কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা প্রপাগান্ডা’ চালানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে, যা পুরো বিষয়টিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে।

এর বিপরীতে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একেবারে ভিন্ন চিত্র। অভিযোগ অনুযায়ী, রমনা স্টোর কম্পাউন্ডের রাস্তা নির্মাণে নির্ধারিত কারিগরি নিয়ম মানা হয়নি। যেখানে নিয়ম অনুযায়ী পুরোনো রাস্তা ভেঙে মাটি খনন করে বড় ইটের খোয়া, বালু, ডাউন পাথর ও রোলার দিয়ে শক্ত ভিত্তি তৈরির কথা, সেখানে বাস্তবে পুরোনো রাস্তা সামান্য পরিষ্কার করে তার ওপর পাতলা বিটুমিনাস কার্পেটিং দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে কাজ করা শ্রমিকদের বক্তব্যেও এই অভিযোগের মিল পাওয়া যায়। তারা জানিয়েছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা অনুযায়ীই তারা কাজ করেছেন। কোথাও সঠিক বেস লেয়ার বা বড় পাথরের ব্যবহার চোখে পড়েনি। এতে করে প্রশ্ন উঠছে—এই রাস্তা কতদিন টিকবে, আর এর পেছনে বরাদ্দকৃত অর্থ আদৌ সঠিকভাবে ব্যয় হয়েছে কি না।

এই প্রকল্পে প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের মধ্যে আঁতাতের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বরাদ্দ পাওয়া অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই ইচ্ছাকৃতভাবে নিম্নমানের কাজ করা হচ্ছে। এতে করে কিছুদিন পরই রাস্তা নষ্ট হবে এবং আবার নতুন করে মেরামতের নামে বরাদ্দ আনা যাবে। এভাবে একই স্থানে বারবার কাজ দেখিয়ে সরকারি অর্থ লোপাটের একটি চক্র তৈরি করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

এই কাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জারিন ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আহমেদ হোসেন জানিয়েছেন, তিনি প্রকৌশলীদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেছেন। তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে দায় প্রকৌশলীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা দেখা যায়। অন্যদিকে উপ-সহকারী প্রকৌশলী খন্দকার মমিনুল ইসলাম বলেন, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ বুঝে নিয়েছেন এবং এর বাইরে তার কিছু বলার নেই।

ঢাকা মেট্রোপলিটন জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খায়রুল ইসলামও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরেজমিনে পরিদর্শনের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এমন বক্তব্যকে অনেকেই প্রশাসনিক দায় এড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—কার স্বার্থে এত বিপরীতধর্মী বর্ণনা সামনে আসছে? একদিকে নিম্নমানের কাজ ও অর্থ লোপাটের অভিযোগ, অন্যদিকে হঠাৎ করে কিছু প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের সততা ও দক্ষতার প্রশংসা করে সব অভিযোগকে ‘প্রপাগান্ডা’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দুর্নীতির অভিযোগ ঢাকতে পরিকল্পিত প্রচারণার অংশ হতে পারে।

সব মিলিয়ে রমনা গণপূর্ত স্টোরের রাস্তা উন্নয়ন প্রকল্প এখন আর শুধু একটি নির্মাণকাজ নয়। এটি পরিণত হয়েছে সম্ভাব্য দুর্নীতি, দায়িত্বহীনতা, নিম্নমানের নির্মাণ এবং প্রশাসনিক গাফিলতির একটি উদাহরণে। নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই সম্ভব নয়। তদন্ত না হলে উন্নয়নের গল্পের আড়ালেই চাপা পড়ে যেতে পারে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের বাস্তব চিত্র।

 




গণপূর্তে বদলির বাইরে এক প্রকৌশলী: আওয়ামী ছত্রছায়ায় ঢাকায় স্থায়ী ছিলেন স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সরকারি চাকরির বদলি নীতিমালা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অন্যতম মূল ভিত্তি হলেও গণপূর্ত অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে সেই নীতিমালার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে এক নির্বাহী প্রকৌশলীর ক্ষেত্রে বদলি বিধি যেন অলিখিতভাবে অকার্যকর ছিল। তিনি হলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের সদ্য বদলিকৃত ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল। চাকরি জীবনের শুরু থেকেই রাজধানী ঢাকায় অবস্থান করা এই কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বদলি যেন কখনোই বাধ্যতামূলক ছিল না।

গণপূর্ত সূত্র জানায়, ২০০৪ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে অধিদপ্তরে যোগদানের পরই তিনি এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর সুপারিশে ঢাকায় পোস্টিং লাভ করেন। এরপর দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জোন ও প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করেন। যেখানে নিয়ম অনুযায়ী শতাধিক প্রকৌশলীকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি হতে হয়েছে, সেখানে স্বর্ণেন্দু শেখরের জন্য ঢাকাই যেন হয়ে ওঠে স্থায়ী কর্মস্থল—যেন এটি তার বাপ-দাদার জমিদারি।

ঢাকায় অবস্থানকালেই তিনি দলীয় লবিং ও প্রভাব খাটিয়ে একের পর এক সুবিধাজনক পদায়ন নিশ্চিত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, উন্নয়ন বা মেরামত প্রকল্প মানেই সেখানে কোটি কোটি টাকার কাজ, আর সেই কাজ ঘিরেই গড়ে ওঠে কমিশন বাণিজ্যের সুযোগ। অভিযোগ রয়েছে, বহু প্রকল্পে মাঠ পর্যায়ে কার্যত কোনো কাজ না করেই কাগজে সম্পূর্ণ দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হয়েছে। ঠিকাদার ও কর্তা সিন্ডিকেটের মধ্যে সেই অর্থ ভাগাভাগি হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের।

তাদের আরও দাবি, গত দুই অর্থবছরের টেন্ডার ও বিল সংক্রান্ত নথিপত্র নিরীক্ষা করা হলে এই অনিয়মের সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলতে পারে। কাজের মান যাচাই না করেই বিল অনুমোদনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার দায়িত্বে থাকাকালে স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলকে নিয়মিত সচিবালয়ে অবস্থান করতে দেখা যেত বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা। নিজ কার্যালয়ে তাকে পাওয়া যেত না বললেই চলে। ‘সচিবের একান্ত লোক’ হিসেবে পরিচিত থাকার কারণে তিনি প্রধান প্রকৌশলীর নির্দেশনাকেও উপেক্ষা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি মৌখিক সতর্কবার্তাও তার কাছে গুরুত্বহীন ছিল বলে দাবি সহকর্মীদের।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল খুলনা জেলার এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার সন্তান। তার পিতা অর্ধেন্দু শেখর মন্ডল ছিলেন সাতক্ষীরার পাইকগাছা উপজেলার গড়াইখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। দলীয় পরিচয়ের সুবাদে আওয়ামী লীগ শাসনামলে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরে অঘোষিত ‘সুপারম্যান’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ সূত্রের দাবি, তিনি সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের অঘোষিত ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। একই সঙ্গে আলোচিত ঠিকাদার জিকে শামীম সিন্ডিকেটের ঘনিষ্ঠ প্রকৌশলী হিসেবেও তার নাম উঠে এসেছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগেও তার সংশ্লিষ্টতার কথা বিভিন্ন মহলে আলোচিত।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল নিয়ন্ত্রকের মতো—এমন অভিযোগ রয়েছে। উপসহকারী থেকে নির্বাহী পর্যায়ের বহু প্রকৌশলীর বদলি ও পোস্টিংয়ের পেছনে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব কাজ করেছে বলে সূত্র জানায়। পদায়ন মানেই মোটা অঙ্কের লেনদেন—এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি একটি শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদিকে নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, অবৈধভাবে অর্জিত বিপুল অর্থের বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বিশেষ করে ভারতে বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন যদি জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যাংকিং তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালায়, তবে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের চাপেই তাকে অবশেষে ঢাকার বাইরে গোপালগঞ্জে বদলি করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেখানেও তিনি আওয়ামী ফ্যাসিবাদী ঠিকাদার ও দোসরদের সঙ্গে নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী বলয়ের পুনর্বাসনের কৌশলগত তৎপরতাও চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত গণপূর্ত অধিদপ্তরে যদি দীর্ঘদিন ধরে এমন দলীয় আশ্রয়ে গড়ে ওঠা দুর্নীতির সাম্রাজ্য টিকে থাকে, তবে প্রশ্ন উঠবেই—এতদিন কারা তাকে আগলে রেখেছিল? কার স্বার্থে বদলি নীতিমালা অকার্যকর ছিল? আর কার ছত্রছায়ায় এই ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল?
এখন সময় এসেছে অদৃশ্য বদলি-রুলের আড়ালে থাকা এসব দুর্নীতির গডফাদারদের মুখোশ উন্মোচনের।




কোটি কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগে গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল, গোপালগঞ্জে বদলির পর ‘পুনর্বাসন রাজনীতি’র অভিযোগ

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সরকারি চাকুরি বিধি উপেক্ষা করে বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে দীর্ঘদিন রাজধানী ঢাকায় অবস্থান, কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এবং ক্ষমতাসীনদের ছত্রচ্ছায়ায় প্রভাব বিস্তার—এমন নানা অভিযোগে আলোচনায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগের সদ্য বদলিকৃত সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল।

সূত্রমতে জানা গেছে, চাকরি জীবনের শুরু থেকেই তিনি ঢাকাকেন্দ্রিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও লোভনীয় দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতি বছর শতাধিক প্রকৌশলী দেশের বিভিন্ন জেলায় বদলি হলেও অজ্ঞাত কারণে স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের ক্ষেত্রে বদলি বিধান কার্যকর হয়নি বলেই অভিযোগ। দীর্ঘদিন ঢাকার বাইরে কোনো জেলায় তাকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়নি।

জানা গেছে, ২০০৪ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর সুপারিশে তিনি ঢাকাতেই প্রথম পোস্টিং পান এবং পরবর্তীতে দলীয় লবিংয়ের মাধ্যমে সুবিধাজনক পদায়ন নিশ্চিত করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সদ্য বিদায়ী সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা তাকে আরও প্রভাবশালী করে তোলে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত প্রায় ছয় বছর ধরে বিভিন্ন লোভনীয় জোন ও বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে তিনি অবৈধ অর্থ উপার্জনে জড়িয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে ‘বদলি বাণিজ্য’ শুরু করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। উপ-সহকারী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে নির্বাহী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীদের পদায়নে তার প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।

ঠিকাদারদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে কমিশনের বিনিময়ে কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন ও মেরামত কাজ বণ্টনে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি শত কোটি টাকার মালিক বনে যান বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্য অনুযায়ী, সাবেক সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের প্রত্যক্ষ আগ্রহে প্রায় এক বছর আগে স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। এই বিভাগটি ঢাকা জোনের অন্যতম লোভনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, এই পদে পদায়ন পেতে অনেক নির্বাহী প্রকৌশলী কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতেও পিছপা হন না।

ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগে যোগদানের পর বরাদ্দের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি টেন্ডার আহ্বান করে সরকারি অর্থ লুটপাটের পথ সুগম করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে যেখানে বিভাগের বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩০ কোটি টাকা, সেখানে ৬০ থেকে ৬৫ কোটি টাকার টেন্ডার আহ্বান করে ঠিকাদার নির্বাচন ও কাজ বণ্টন করা হয়। এসব কাজের বিপরীতে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।

মেরামত কাজের ক্ষেত্রেও বাস্তবে কাজ না করেই কাগজে-কলমে সব সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারদের সঙ্গে অর্থ ভাগাভাগি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ঠিকাদার। তাদের দাবি, গত ও চলতি অর্থবছরের মেরামত কাজের টেন্ডার ফাইল নিরীক্ষা করলেই অনিয়মের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, সাবেক সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার দায়িত্বে থাকাকালে স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলকে প্রায়ই সচিবালয়ে দেখা যেত। নিজ অফিসে তাকে খুব কমই পাওয়া যেত বলে অভিযোগ রয়েছে। সচিবের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি থাকায় তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকেও তেমন গুরুত্ব দিতেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও দুর্নীতির অভিযোগে একাধিকবার মৌখিকভাবে সতর্ক করা হলেও তা উপেক্ষিত হয়।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থের একটি বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বিশেষ করে ভারতে তার বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিপুল সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন যদি স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল ও তার পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সম্পদের অনুসন্ধান চালায়, তাহলে জ্ঞাত আয়ের বাইরে বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রসঙ্গত, সার্ভিস রুলস অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই জেলা বা বিভাগে কর্মরত থাকলে বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার বিধান রয়েছে। এমনকি চাকরিচ্যুতির ঝুঁকিও থাকে। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবং সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে সেই প্রেক্ষাপটে স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডল স্বেচ্ছায় প্রায় দুই মাস আগে গোপালগঞ্জে বদলি হন।

তবে অভিযোগ রয়েছে, গোপালগঞ্জে বদলি হওয়ার পরও তিনি থেমে থাকেননি। সেখানে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার সমার্থক ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের রূপরেখা তৈরি এবং ওই গোষ্ঠীর পুনর্বাসনের কূটকৌশলে জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য স্বর্ণেন্দু শেখর মন্ডলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।




গণপূর্ত কাঠের কারখানা স্পেশাল ইউনিটে ‘লুটপাটের নীলনকশা’ : ঠিকাদার বঞ্চনা, সুবিধাভোগী সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর

বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাঠের কারখানা স্পেশাল ইউনিটে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ অনিয়ম, দুর্নীতি ও কাজ বাণিজ্যের মাধ্যমে শতকোটি টাকার সরকারি প্রকল্প নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে সাধারণ লাইসেন্সধারী ঠিকাদারদের কাজ থেকে বঞ্চিত করে নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হাতে কাজ তুলে দিচ্ছে।

এই অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন স্পেশাল ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আওয়ামী লীগ শাসনামলে এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং সেই রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ সুবিধাভোগী ব্যবস্থাপনা চালু করেছেন।

ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর একটি কৌশলনির্ভর ঘুষ ও কাজ বণ্টন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারের কাছে আগেভাগেই প্রকল্পের এস্টিমেট সরবরাহ করা হয়, যার বিপরীতে অগ্রিম ৩ থেকে ৪ শতাংশ কমিশন নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট ফার্নিচার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে গোপনে রেট-কোড সরবরাহ করা হয়, যাতে দরপত্র প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে কাজ নিশ্চিতভাবে পছন্দের কোম্পানির হাতেই যায়।

এতে সাধারণ ঠিকাদাররা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেকেই অগ্রিম অর্থ প্রদান করেও মাসের পর মাস কাজ না পেয়ে শুধু আশ্বাসেই আটকে আছেন। আবার কেউ কাজ পেলেও তাকে বাধ্য করা হচ্ছে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান থেকেই মালামাল সংগ্রহ বা উৎপাদন করাতে। অভিযোগ রয়েছে, মৌখিকভাবে হুমকি দেওয়া হয়—নির্দেশ অমান্য করলে চুক্তিপত্র বাতিল করা হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, “ফার্নিচার কনসেপ্ট এন্ড ইন্টেরিয়র লিমিটেড” নামের একটি প্রতিষ্ঠান চলতি ও গত অর্থবছরে অস্বাভাবিক সংখ্যক বড় অঙ্কের কাজ পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে।

প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫/১৩ নং লটে ৩,৫৩,৪৫,৮০২.৫১৩ টাকা, ২০২৫/৩ নং লটে ৩,৩৭,৩৭,৯০২.৫১৩ টাকা এবং ২০২৫/৪ নং লটে ৩,৩৭,৩৭,৯০২.৫১৩ টাকার কাজ পায়। এসব কাজই ছিল মডেল মসজিদ প্রকল্পের আসবাবপত্র সরবরাহ ও স্থাপন সংক্রান্ত। এছাড়া ২০২৫–২৬ অর্থবছরে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ২৭,৩৬,১০০ টাকা, শহীদ নায়েব সুবেদার আশরাফ আলী খান বীরবিক্রম লাইব্রেরিতে ১,৮২,৩৪,৭০০ টাকা এবং পাবলিক লাইব্রেরী বহুমুখী ভবনে ১,৯৩,৩০,৭৫৬.৬৯১ টাকার কাজও প্রতিষ্ঠানটি পায়।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কয়েকটি ক্ষেত্রে ভবনের মূল নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই ফার্নিচার সরবরাহের চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। সরকারি ক্রয় বিধিমালার স্বাভাবিক ধারার সঙ্গে এই প্রক্রিয়া সাংঘর্ষিক বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। একই সময়ে আকতার ফার্নিচারস, নদীয়া ফার্নিচার ও হাতিলসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে সুবিধা প্রদান করে প্রভাব বিস্তার করেছে।

ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, যারা একসময় সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে বছরের পর বছর মানসম্পন্ন আসবাব সরবরাহ করতেন, তারা এখন কার্যত কাজবঞ্চিত। তাদের জায়গা দখল করেছে পছন্দের কিছু কোম্পানি ও ব্যক্তি, যারা পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, এর আগেও অন্য বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে এপিপি প্রকল্পসহ একাধিক উন্নয়ন কাজে বেনামী ঠিকাদারি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। সেই প্রেক্ষাপটে একসময় তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হলেও রাজনৈতিক প্রভাব ও অবৈধ অর্থের জোরে তিনি পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে ফিরে আসেন বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে সংশ্লিষ্টদের দাবি, গণপূর্ত কাঠের কারখানা স্পেশাল ইউনিট বর্তমানে ফ্যাসিবাদী আমলের লুটপাট ব্যবস্থার পুনর্দখল প্রকল্পে পরিণত হয়েছে, যেখানে সাধারণ ঠিকাদারদের রুটিরুজি হুমকির মুখে পড়েছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে পরবর্তীতে তা সংযোজন করা হবে।




রাজউকের গুলশান এস্টেট শাখায় ‘অদৃশ্য ক্ষমতার বলয়’: উপ-পরিচালক লিটন সরকারের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ 

রাজউকের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, লিটন সরকার দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দপ্তরের ভেতরে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, ভূমি বরাদ্দ, ইজারা, নিলাম ও হস্তান্তর সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কার্যত তার ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে নিয়মের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কই মুখ্য হয়ে উঠেছে।

সূত্রগুলো দাবি করছে, লিটন সরকারের ঘনিষ্ঠ কিছু ঠিকাদার, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারীদের নিয়ে একটি অঘোষিত ‘কন্ট্রাক্ট সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে। রাজউকের ভেতরে এখন প্রকাশ্যে শোনা যায়—“রাজউকে জমি পেতে হলে আগে লিটনের ঘর চিনতে হয়।” এই কথাটিই নাকি গুলশান এস্টেট শাখার বর্তমান বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতাকর্মী ও তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে লিটন সরকার তার প্রভাববলয় আরও বিস্তৃত করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত রাজউকের মালিকানাধীন জমি ও পরিত্যক্ত ভবন নিয়ে গোপন রেজিস্ট্রেশন, দখল বৈধকরণ এবং ফাইল ‘ম্যানেজ’-এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন সংঘটিত হয়েছে। বিনিময়ে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় নিশ্চিত করাই ছিল তার কৌশল—এমন দাবিও সংশ্লিষ্টদের।

গুলশান এস্টেট শাখার অফিস সংস্কৃতি নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। সূত্রমতে, সেখানে এখন কার্যত ‘ব্যক্তি বন্দনা’ সংস্কৃতি চালু রয়েছে। সাধারণ নাগরিকদের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা, অযৌক্তিক হয়রানি, মনগড়া নোটিং এবং বিধিবহির্ভূত ক্ষমতা প্রয়োগ নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলার চেষ্টা করেছেন, তাদের বদলি, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দুর্নাম ছড়ানোর মাধ্যমে চুপ করিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে গুলশান এলাকার একাধিক মূল্যবান প্লট ও পরিত্যক্ত বাড়ি নিয়ে রহস্যজনক ফাইল জটের তথ্য মিলেছে। অভিযোগ রয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে মালিকানা ও ইজারা সংক্রান্ত জট তৈরি করে নির্দিষ্ট সুবিধাভোগীদের হাতে এসব সম্পত্তি তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে রাজউকের মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থায় বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি হচ্ছে।

এদিকে রাজউকের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র আরও গুরুতর একটি অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, উপ-পরিচালক লিটন সরকারের বিরুদ্ধে অফিস চলাকালীন ফেনসিডিল সেবনের অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন কর্মচারী নির্দিষ্টভাবে এ অভিযোগ তুললেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান তদন্ত শুরু হয়নি। বিষয়টি রাজউকের প্রশাসনিক মর্যাদা ও শৃঙ্খলার ওপর গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে লিটন সরকার reportedly বলেন, “এসব রিপোর্টে আমার কিছুই হবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, সচিব নজরুল ইসলামসহ রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমার বিশেষ সখ্যতা আছে।” এই বক্তব্য থেকেই প্রশাসনিক দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এখন বড় প্রশ্ন উঠেছে—রাজউকের অভ্যন্তরীণ নজরদারি ব্যবস্থা কি আদৌ কার্যকর, নাকি প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের কাছে প্রতিষ্ঠানটি জিম্মি হয়ে পড়েছে? সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অবিলম্বে স্বাধীন তদন্ত কমিশন, দুদকের অনুসন্ধান এবং কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নেওয়া হলে রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা আরও ভয়াবহভাবে ক্ষয়ে পড়বে।

এই প্রতিবেদনের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে নগরবাসী। কারণ প্রশ্ন একটাই—রাজউক কি জনগণের প্রতিষ্ঠান, নাকি কিছু প্রভাবশালীর ব্যক্তিগত ক্ষমতার ক্ষেত্র?




টঙ্গীর জাভান হোটেলে চলে রাতভর অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মাদক ব্যবসা প্রশাসন নিরব -১ পর্ব

স্টাফ রিপোর্টারঃ কনা আক্তার 
গাজীপুর জেলার টঙ্গী এলাকায় অবস্থিত জাভান হোটেলকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক কর্মকাণ্ড নারীদের দিয়ে নাচানাচি এবং মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী রাত গভীর হলেই হোটেলটিতে শুরু হয় অসামাজিক তৎপরতা যা এখন আর গোপন নেই কারও কাছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সন্ধ্যার পর থেকে জাভান হোটেলের আশপাশে অস্বাভাবিক ভিড় লক্ষ্য করা যায়। গভীর রাত পর্যন্ত বহিরাগত লোকজনের যাতায়াত উচ্চ শব্দে গান-বাজনা এবং কিছু নারীদের দিয়ে নাচানাচির আয়োজন করা হয় ও আড়ালেই চলে দেহ ব্যবসা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জাভান হোটেলকে কেন্দ্র করে মাদক ব্যবসার বিস্তার অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী হোটেলটির আশপাশে খুব সহজেই বিভিন্ন ধরনের মাদক পাওয়া যায়। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান এখানে হাত বাড়ালেই মাদক মিলে এটাই এখন ওপেন সিক্রেট। সময়ের সাথে সাথে জাভান হোটেল টঙ্গী এলাকায় মাদক কেনাবেচার একটি পরিচিত স্পটে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ।
এলাকাবাসীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সবকিছু প্রকাশ্যে চললেও কেনো বন্ধ করতে পারছে না প্রশাসন। স্থানীয়দের দাবি একাধিকবার এই হোটেলটি কে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণে মাদক সহ কিছু যৌনকর্মী কে গ্রেফতার করে পুলিশ। কয়েকবার অভিযান চালিয়ে প্রশাসন সিং কালা করা হয় পরে জামিনে বের হয়ে আবারও আগের থেকে বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে জাভান হোটেল এবং সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক বাড়ছে।
সচেতন মহলের মতে, এভাবে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মাদক ব্যবসা চলতে থাকলে টঙ্গী এলাকার তরুণ সমাজ মারাত্মকভাবে বিপথগামী হবে। পরিবার ও সমাজব্যবস্থার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
এই টঙ্গী জাভান হোটেল আওয়ামী লীগের দোসর মালিক বাদল মিয়া ছিলেন বর্তমানে পলাতক আছে এবং এই বর্তমানে হোটেলটির মালিক বিএনপি’র নেতা এফ এ রহমান ।
এলাকাবাসী ও সচেতন নাগরিকরা দ্রুত জাভান হোটেলকে ঘিরে সুষ্ঠু তদন্ত, নিয়মিত নজরদারি এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা প্রশ্ন তুলেছেন প্রশাসনের এই নিরবতা কি অবহেলা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয় আমরা অভিযোগ পেয়েছি তা সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে অপরাধী যেই হোক কোন ছাড় দেওয়া হবে না ইনশাআল্লাহ।



গুলশান বনানীতে অভিনব ফাঁদ পেতেছে বহুরূপী শিলা ও হারুন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: ঢাকার গুলশান-বনানী এলাকায় কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অর্ধশতাধিক চক্র, এমনই অভিযোগ এলাকাবাসী ও গণমাধ্যমের। আর প্রতারণার কৌশল ও টোপ হিসেবে অপব্যবহার করা হচ্ছে শিলাদের মতো অল্প বয়সী সুন্দরী তরুণীদের। ইতোপূর্বে বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়।

এবার ফিল্ম স্টাইলে এক ব্যবসায়ীকে ফাঁদে ফেলে সর্বস্ব হাতানোর পাঁয়তারা করছে বহুরূপী শিলা ও প্রতারক হারুন। দিন যতই যাচ্ছে ভয়ংকর হয়ে উঠছে ‘শিলা ও বাহিনীর অন্যতম প্রধান কুশীলব হারুন অর রশিদ (হিরু)।

তথ্যসূত্রে জানা যায়, পল্টিবাজ হারুন, তারেক রহমানের নাম ভাঙানো একজন স্বঘোষিত কর্মী। তারেক রহমানের ভার্চুয়াল পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন এমন একটি বিতর্কিত ছবি দেখিয়ে তিনি ফায়দা লোটার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। তারেক জিয়ার সাথের ওই ছবি দেখিয়ে মানুষকে ব্ল্যাকমেল করেন প্রতারক হারুন।

সরজমিনে এমনি অভিযোগ পাওয়া গেছে, প্রতিবেদকের হাতে আসা রেকর্ড ছবি স্পষ্ট তিনি নিজেকে যুবদল নেতা দাবি করেন। ফোনে কথা হলে হঠাৎ মতামত ঘুরিয়ে বলেন তিনি মানবাধিকার বড় অফিসার। একটু সময় যেতে নিজেকে আবার সম্পাদক বলে জানান দেন। একজন মানুষের কয়টি পদবী প্রয়োজন প্রশ্ন করলে তিনি জানান আবারও যুবদল মহানগর কমিটির নেতা তিনি!! ও সংসদ নির্বাচন করার জন্য বাড়িতে ব্যস্ত তিনি। গুলশান বনানী জনগণের প্রশ্ন কে এই হারুন/ একাধিক পরিচয় দেওয়া অবশ্যই প্রতারণা। হারুনের কুকর্ম উন্মোচনে কিছু তথ্য আমাদের দপ্তরে এসেছে। ল্যান্ড কোম্পানির সাক্ষ্য জালিয়াতি করে তিনি হয়ে গেছেন রাতারাতি ব্যবসায়ী পার্টনার।

তথ্যসূত্র জানা যায় ভয়ংকর বিশ্বাসঘাতকতার আড়ালে দুর্দান্ত সাহসী ভূমিকায় যার সবচেয়ে বেশি অবদান তিনি পারভিন শিলা। গুলশান বনানী এলাকায় এই তরণীর নাম এখন মানুষের মুখে মুখে । এই তরুণীর অভিনব ফাঁদে পড়ে অফিসের স্টাফ সহ অনেকেরই এখন রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, এই সুন্দরী শীলার দ্বারা সবকিছুই সম্ভব। তার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মিথ্যা নাটকীয় মামলায় ফাঁসানো কোন ব্যাপারই না। শিলার নিজের অনৈতিক কর্মকাণ্ড অপকর্ম প্রতারণা আড়াল করতে হারুনের ভূমিকা বেশ প্রশংসনীয়। ছলনাময়ী নারী শিলা কখনো মিলা, আবার কখনো লিনা মাহমুদ। কৌশলে বড় ব্যবসায়ীদের মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে চালান প্রেমের অভিনয়। একপর্যায়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে সিম পরিবর্তন করা তাদের প্রতারণার একটি অংশ। । এছাড়া ভুয়া বিয়ের নাটক, নয়তো অশ্লীল কিংবা অন্তরঙ্গ ছবি তুলে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি। এভাবেই চলছে তাদের প্রতারণা।

সর্বশেষ টার্গেট বনানীর এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। তার নাম্বার সংগ্রহ করে কৌশলে প্রেমের অভিনয় শুরু করেন বহুরূপী শিলা। পরবর্তীতে থানায় শ্লীলতাহানীর চেষ্টার অভিযোগ অথবা জিডি তার পড়ে মামলার হুমকি! এটা তার পেশা ও নেশা দুটোই।

অভিযোগ রয়েছে বাসায় ডেকে ভুয়া বিয়ের কাগজপত্র তৈরি করে দাবি করা হয় মোটা অংকের টাকা অথবা শিলার বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে টাকা ছাড়াই ব্যবসায়ী পার্টনার বানাতে হবে।

গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার বলেন, এই চক্রের মোট সদস্যদের মধ্যে শিলা মাহমুদ ওরফে মিলা নয়, বহু নারী চক্র সদস্যসের নাম রয়েছে ডিএমপিতে। সহযোগীরা বড় ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, এমনকি প্রবাসীদের মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে তাকে দেয়। পরে কৌশলে ফোনে কথা বলে প্রেমের ফাঁদ পাতে শীলারা। এক সময় প্রেমিককে বাসায় ডাকে। একপর্যায়ে অন্তরঙ্গ ছবি তুলে টাকা দাবি করে। অনেকে সম্মানের ভয়ে টাকাওনদিয়ে দেন।

তিনি বলেন, চক্রটি শুধু প্রেমের ফাঁদ নয়, অনেক সময় ভুয়া বিয়েও করে। সেই বিয়ের কাবিনের টাকা আদায়ও করেন কৌশলে।

ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সাইবার ক্রাইমের অতিরিক্তি উপ-পুলিশ কমিশনার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে প্রতারণা অভিযোগ এখনো অনেক বেশি। নারী ও পুরুষ উভয়েরই অভিযোগ আসছে।

তিনি বলেন, নারীদের দ্বারা ব্ল্যাকমেইলিং এর শিকার যেমন হচ্ছে, তেমনি পুরুষের দ্বারা ব্ল্যাকমেইলিং এর শিকার হচ্ছে অনেকে। তবে অধিকাংশই সম্মান নষ্টের ভয়ে নিজেরাই মিটিয়ে নিচ্ছে, আবার অনেকে অভিযোগও দিচ্ছেন। এ ধরনের বেশ কিছু সিন্ডিকেটকে আমরা আটকও করেছি।সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সতর্কতা। লোভ সংবরণ করে সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করলে সমস্যায় পড়তে হবে না নাগরিকদের।




দূর্নীতির অভিযোগের তোয়াক্কা না করে পার পেয়ে যাচ্ছেন তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শরীফ হোসেন

বিশেষ প্রতিনিধিঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক দূর্নীতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চ:দা:) মো: শরীফ হোসেন, কুষ্টিয়া’র একটি কলরেকর্ড ফাঁস হয় যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। কল রেকর্ডে শরীফ হোসেন কে একজন প্রকৌশলী আপত্তিকর ভাষা প্রয়োগ করতে দেখে প্রতিবেদক অনুসন্ধানে নামে, তাছাড়া প্রকৌশলী শরীফ হোসেন স্ব প্রনোদিত হয়ে একটি দৈনিক পত্রিকায় রহস্যজনক সংবাদ প্রকাশ করতে সংশ্লিষ্ট পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে উৎসাহিত করার ফলে প্রতিবেদক শরীফ হোসেন এর দূর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধানে নামে । এলজিইডির সুক্ষ দূর্নীতিবাজ প্রকৌশলী শরীফ হোসেন যার কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি পরতে পরতে দূর্নীতির বেড়াজালের ইশতেহার সম্বলিত ফিরিস্তি সাজিয়ে N,S,I মহাপরিচালক বরাবর তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতির তালিকা হতে নাম বাদ দেওয়ার লিখিত আবেদন করেন খোদ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ও সাবেক চুয়েট ছাত্র কাজী আবদুস সামাদ।

সূত্র মতে ঢাকা অঞ্চলের সাবেক তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো: শরীফ হোসেন সিটি কর্পোরেশনে প্রেষণে থাকাকালীন সময়ে দূর্নীতির দায়ে বরখাস্ত হয়েছিলেন। পার্বত্য বান্দরবান জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে দায়িত্ব পালন কালীন পতিত আওয়ামী সরকারের সময়ে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা পরিচয়ে তিনি ভূয়া performance Security নিয়ে W/order দেওয়ার কারনে সাময়িক বরখাস্ত হন৷

বিগত আওয়ামী সরকারের আমলাদের আস্হাভাজন হওয়ায় অলৌকিক আশীর্বাদে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া ও চাঁদপুর জেলার সমন্বয়ে একটি বড় লাভজনক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পাশাপাশি ৩ টি প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে পিডির দায়িত্ব নিয়ে প্রভাবশালী মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এর সাথে আঁতাত করে প্রতিটি কাজ থেকে ৫% হারে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মো:শরীফ হোসেনের বিরুদ্ধে। তাছাড়া তিনি ঢাকা অঞ্চলের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিভাইজড ইস্টিমেট অনুমোদন দিয়ে প্রতিজনের কাছ থেকে ২% হারে টাকা আদায় করতেন বলে সুত্র নিশ্চিত করেন।

সরেজমিনে এলজিইডি ঘুরে অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায় জুলাই- আগস্টে ছাত্র জনতার আন্দোলনকে প্রতিহত করতে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব এই প্রকৌশলী এলজিইডিতে আওয়ামীলীগ পন্হী প্রকৌশলীদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

১৯৯২ সালে সহকারী প্রকৌশলী /উপজেলা প্রকৌশলী পদে চাকুরীতে যোগ দেওয়া মো: শরীফ হোসেন যশোরের অভয়নগর ও কেশবপুর উপজেলা, কক্সবাজার সদর উপজেলা, এবং নড়াইল জেলার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

উপজেলা প্রকৌশলী থাকাকালীন সময়ে তিনি টেন্ডার ঘুপছি করে পছন্দের ঠিকাদারকে ১০% এর বিনিময়ে টেন্ডার দিয়ে বিল থেকে অতিরিক্ত ২% করে ঘুষ নেওয়ায় অভিযোগ রয়েছে৷
২০১২ সালে ততকালীন প্রধান প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমান কে ১ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে নির্বাহী প্রকৌশলী (চ:দা:) হিসাবে নাটোর জেলায় পদায়ন হন। মো: শরীফ হোসেন এর দূর্নীতিতে অতিষ্ঠ হয়ে ২০১৩ সালে নাটোর জেলার ঠিকাদারগন আন্দোলন করলে তাকে শেরপুর জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে বদলী করা হয়৷

আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর আশীর্বাদ নিয়ে তিনি দূর্নীতির স্বর্ণযুগের সুচনা করেন। এলজিইডির রক্ষনাবেক্ষন কাজে ঘাপলা করায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয় এবং শাস্তি হিসাবে “তিরস্কার ” প্রদান করা হয়৷

তদবির বানিজ্যে উস্তাদ মো: শরীফ হোসেন অবৈধ টাকার বিনিময়ে তদবির চালিয়ে ২০১৬ সালে বান্দরবান জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে পোস্টিং নেন৷
কথায় আছে চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী। বান্দরবান জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব নিয়েই কাজ না করিয়ে বিল প্রদান, এবং ভুয়া বিডি নিয়ে ঠিকাদারকে নিয়মবহির্ভূত অগ্রীম বিল প্রদান করায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা এবং ৩ টি এস্টিমেন্ট বাতিল করে শাস্তি প্রদান করা হয়। যেখানেই তিনি চাকুরী করেছেন সেখানেই ক্যালকুলেটর দিয়ে হিসাবে করে ঠিকাদার থেকে ঘুষ নিতেন বলে জনশ্রুতি আছে।

২০১৯ সালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে দায়িত্ব দিলে তার দূর্নীতিতে অতিষ্ঠ হয়ে সিটি কর্পোরেশন এর সিইও তাকে প্রত্যাহার করার অনুরোধ করলে ২০২১ সালে তাকে সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রত্যাহার করা হয়৷
বর্তমানে কুষ্টিয়া অঞ্চলের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চ:দা:) হিসাবে দায়িত্ব পালন করলেও এলজিইডি সদর দপ্তরে প্রায়ই ঘুরাঘুরি এবং আওয়ামী পন্হীদের নিয়ে গোপন মিটিং চালিয়ে যাচ্ছেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
জ্ঞাত বহির্ভূত আয় দিয়ে তিনি ঢাকার পান্থপথে ২৫০০ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাট ক্রয় করেন যার আনুমানিক মুল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা, ধানমন্ডি ৪ নং সড়কে ২০০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট মূল্য আনুমানিক ৫ কোটি টাকা, ঢাকা -মাওয়া রোডের পার্শ্ববর্তী শ্যামল ছায়া হাউজিং এ ২ টি ফ্ল্যাট মূল্য আনুমানিক ৫ কোটি টাকা, নড়াইলে আলিশান বাড়ি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আই ব্লক -এ ৪ কাঠা জমির উপর প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮ তলা ভবন নির্মাণ করেন। যার একটি ফ্লোরে (৩০০০ বর্গফুট) তিনি নিজে বসবাস করছেন। ঢাকার পূর্বাচলে ৫ কাঠার ১ টি প্লট মূল্য আনুমানিক ৫ কোটি টাকা ছাড়াও নামে বেনামে বিভিন্ন ব্যাংক একাউন্টে রয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা।

দণ্ডবিধির ১৮৬০ ধারা ৪০৯ :পাবলিক সার্ভেন্ট কর্তৃক আর্থিক অসাধুতা সর্বোচ্চ শাস্তি :
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ ধারা ৪ অবৈধ সম্পদ অর্জন ও গোপন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। শাস্তি ৪ থেকে ১২ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড।
অথচ মো:শরীফ হোসেনকে পদোন্নতি দিয়ে তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসাবে পদায়ন আইনের বরখেলাপ বলে সরকারি চাকুরি বিশেষজ্ঞগন মনে করেন৷

তবে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শরীফ হোসেন প্রতিবেদককে বলেন, এগুলো মিথ্যা, আমার এত সম্পদ থাকলে আমি চাকুরী করার প্রয়োজন কি!




খুলনায় খাদ্য বিভাগের বস্তা কেনায় অনিয়ম: নতুনের দামে কেনা পুরোনো বস্তা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ খুলনা জেলায় চলমান খাদ্যশস্য সংগ্রহ মৌসুমে খাদ্য বিভাগের বস্তা কেনাকে ঘিরে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি গুদামের জন্য নতুন বস্তা কেনার কথা থাকলেও বাস্তবে সরবরাহ করা হয়েছে পুরোনো, ব্যবহৃত ও নিম্নমানের বস্তা। এসব পুরোনো বস্তা নতুন বস্তার দামে কেনা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা খাদ্য বিভাগের জন্য নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং কার্যাদেশ পায় মেসার্স চন্দ্রদ্বীপ কনস্ট্রাকশন। এই টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয় প্রায় তিন মাস আগে, বর্তমান জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের সময়ে। টেন্ডার কমিটির প্রধান ছিলেন ফুলতলার পিসিএফ জাকির হোসেন, যিনি অতিরিক্ত দায়িত্বে খুলনার সহকারী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বও পালন করছিলেন। দরপত্র অনুযায়ী নতুন বস্তা মহেশ্বরপাশা খাদ্যগুদামে সরবরাহ করার কথা থাকলেও সেখান থেকেই বিভিন্ন গুদামে পুরোনো বস্তা ছড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

রূপসা উপজেলার আলাইপুর খাদ্যগুদামে ৫০ কেজির ৫০ হাজার এবং ৩০ কেজির ১০ হাজার বস্তা সরবরাহ করা হয়। তেরোখাদা খাদ্যগুদামে দেওয়া হয় ৫০ কেজির ৩০ হাজার ও ৩০ কেজির ১০ হাজার বস্তা। একইভাবে ডুমুরিয়া ও ফুলতলা খাদ্যগুদামেও বিপুল সংখ্যক বস্তা পাঠানো হয়। এছাড়াও মংলা সাইলো ও মোংলা পোর্টে জাহাজ থেকে খাদ্যশস্য খালাসের সময় অনেক বস্তা ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় ফেরত পাঠানো হয়েছে। ফেরত দেওয়া এসব বস্তার মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুরোনো বস্তা ছিল।

ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, অনেক বস্তার গায়ে আগের সরকারের স্লোগান ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ’ আলকাতরা দিয়ে মুছে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি বস্তাগুলোর গায়ে উৎপাদন সাল হিসেবে ২০২২ লেখা রয়েছে, যা নতুন বস্তা দাবি করার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এসব তথ্য থেকেই অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে যে, এগুলো আসলে আগেই ব্যবহৃত বস্তা।

সূত্র বলছে, বাজারে বর্তমানে নতুন ৩০ কেজির বস্তার সরকারি দর প্রতি পিস প্রায় ৫০ টাকা, যেখানে পুরোনো বস্তার দাম ১৮ থেকে ২০ টাকার বেশি নয়। একইভাবে ৫০ কেজির নতুন বস্তার দাম যেখানে প্রায় ৯০ টাকা, সেখানে পুরোনো বস্তা পাওয়া যায় ৩৮ থেকে ৪০ টাকায়। এই দামের পার্থক্য দেখেই অভিযোগ উঠেছে, পুরোনো বস্তা কিনে নতুনের বিল দেখিয়ে কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি খালিদ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, প্রায় দুই লাখ নতুন বস্তা কেনার নামে বিশাল অঙ্কের দুর্নীতি হয়েছে। নতুন বস্তার আড়ালে পুরোনো ও নিম্নমানের বস্তা সরবরাহ করা হয়েছে, যা খাদ্য সংরক্ষণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বস্তা সহজেই ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, ফলে খাদ্যশস্য নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

এ বিষয়ে মহেশ্বরপাশা খাদ্যগুদামের ম্যানেজার টিসিএফ মোশাররফ হোসেন জানান, একসাথে এত বিপুল সংখ্যক বস্তা পুরোপুরি খুলে পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বস্তা দেখে গ্রহণ করা হয়। তেরোখাদা গুদামে পাঠানো ২০ হাজার বস্তার মধ্যে ৮ হাজার পুরোনো বস্তা ধরা পড়ার পর ভিডিও করে সরবরাহকারীকে জানানো হয় এবং পরে সেগুলো বদলে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

খুলনা জেলা খাদ্য কর্মকর্তা তানভীর হোসেনও স্বীকার করেছেন যে তেরোখাদা গুদামে কিছু পুরোনো বস্তা পাওয়া গিয়েছিল। তবে সরবরাহকারীকে জানানো হলে শর্ত অনুযায়ী সেগুলো পরিবর্তন করে নতুন বস্তা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বড় পরিসরে বস্তা কেনার ক্ষেত্রে এমন সমস্যা মাঝে মাঝে হতে পারে এবং নিয়ম অনুযায়ী সরবরাহকারী তা সমাধান করে থাকে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু বস্তা বদল করলেই এই ঘটনার দায় শেষ হয়ে যায় না। পরিকল্পিতভাবে পুরোনো বস্তা নতুন হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে কি না, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কীভাবে বিল পরিশোধ করা হয়েছে—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। না হলে ভবিষ্যতেও খাদ্য বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এ ধরনের অনিয়ম চলতেই থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।