হাম ও উপসর্গে মৃত্যু ৮৫০ ছুঁইছুঁই

দেশে এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৮৪৭ জনের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭৫১ জন মারা গেছে আর হামে মারা গেছে ৯৬ জন।

আজ সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ৩২৬ জন মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। এর পরেই রয়েছে সিলেট বিভাগ, সেখানে মারা গেছে ১১৩ জন। এ ছাড়া রাজশাহীতে ৯১, ময়মনসিংহে ৭১, চট্টগ্রামে ৬১, বরিশালে ৪৫, খুলনায় ৩২ ও রংপুর বিভাগে ১২ জন মারা গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নিয়মিত পরিসংখ্যানে মৃতদের বয়সভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায় না। রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, হাম সব বয়সী মানুষের হতে পারে, তবে শিশুরাই এতে বেশি আক্রান্ত হয়।

সরকারের তথ্য বলছে, আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে ৯৬৭ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ দেখা গেল ১ লাখ ৩১ হাজার ৫০ জনের।

গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ১১৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত দেশে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৬ হাজার ৪০৮।

হাসপাতালে ভর্তির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৫২২ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ১৭৯ জন।




বেনজীরের অন্য দেশের পাসপোর্ট থাকতে পারে, সন্দেহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

সংযুক্ত আরব আমিরাতে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের জামিন বাতিলের জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একইসঙ্গে তার অন্য দেশের পাসপোর্ট থাকতে পারেন বলেও নিজের সন্দেহের কথা জানান মন্ত্রী।

আজ (সোমবার) সচিবালয়ে মন্ত্রীর অফিস কক্ষের সামনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) আদালত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞাসহ কিছু শর্তে জামিন দিয়েছেন। আমরা বিষয়টি জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে দেশটিতে নিয়োজিত ল’ ফার্মকে জামিন বাতিলের আবেদন করতে এবং আদালতে পিটিশন দাখিল করতে নির্দেশনা দিয়েছি। এ ছাড়া, ইউএই রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে এবং ঠিক কী কী শর্তে তাকে জামিন দেওয়া হয়েছে তা জানতে সার্টিফাইড কপি সংগ্রহের অনুরোধ করা হয়েছে। বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আইনি ও কূটনৈতিক—উভয় প্রক্রিয়া সক্রিয় রয়েছে। তবে তার কাছে অন্য দেশের পাসপোর্ট থাকতে পারে – এটা আমাদের সন্দেহ।




রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা: তিনবারের দরপত্রেও কাজ হয়নি ৯ ট্রাফিক সিগন্যালে

রাজধানীর হাইকোর্ট মোড় থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ২২টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর ৯টির কাজ আটকে আছে ঠিকাদারের জটিলতায়। সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) অনুযায়ী চাওয়া অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করতে না পারায় তিন দফা দরপত্র আহ্বান করেও ঠিকাদার চূড়ান্ত করা যায়নি। এ কারণে নিয়মতান্ত্রিকভাবে যানবাহন চলাচলে সব মোড়ে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কাজ না হওয়া সব কটি মোড়ই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মধ্যে।

 

এই পরিস্থিতির মধ্যেই রাজধানীর আরও ৫০টি মোড়ে নতুন প্রজন্মের আইটিএসভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

কাজ না হওয়ার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাকি থাকা ৯টি মোড়ে ঠিকাদার নিয়োগের জন্য তিন দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। প্রথম দফায় গত ডিসেম্বরে, দ্বিতীয় দফায় এপ্রিলে এবং সর্বশেষ জুনে দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো পিপিআর অনুযায়ী চাওয়া অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সে কারণে কিছু শর্ত শিথিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। অর্থসংকটও কাজ দেরি হওয়ার একটি কারণ ছিল।




বাড়তে পারে মন্ত্রিসভার আকার, বদলাতে পারে দায়িত্ব

ডেস্ক রির্পোটঃ সরকারের ছয় মাসের কর্মক্ষমতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভার আকার বাড়তে পারে এবং কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে রদবদল আসতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের গতি বাড়াতে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি অতিরিক্ত উপদেষ্টা ও টেকনোক্র্যাট নিয়োগের বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।

 

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) এবং কয়েকজন মন্ত্রীর সূত্রে এ তথ্য পাওয়া যায়  , বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া মিত্র দলগুলোর নেতাদেরও সরকারে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। এ ছাড়া বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা, তরুণ সংসদ সদস্য ও নারী প্রতিনিধির নামও সম্ভাব্য নতুন সদস্য হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মন্ত্রিসভা সদস্য বলেন, তিন থেকে চারজন নতুন সদস্য মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে পারেন। কয়েকজন টেকনোক্র্যাট ও যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের নাম নিয়ে আলোচনা চলছে।




তিন দিনের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা, প্লাবিত হতে পারে যেসব জেলা

ডেস্ক নিউজ : আগামী ৭২ ঘণ্টায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায়। একই সময়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

রবিবার বন্যা পরিস্থিতি ও পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী তিন দিনে তিস্তা ও দুধকুমার নদ-নদীর কিছু স্থানে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এছাড়া ধরলা নদীর পানি কয়েকটি স্থানে সতর্কসীমা ছুঁতে পারে। এতে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। একই সময়ে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার সিলেট ও সুনামগঞ্জ এবং সোমেশ্বরী-ভুগাই-কংস অববাহিকার শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার কিছু নিম্নাঞ্চলেও প্লাবনের ঝুঁকি রয়েছে।

পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বর্তমানে কেবল কুশিয়ারা নদী সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ স্টেশনে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগামী দুই দিন সিলেট ও রংপুর বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন উজানে মাঝারি থেকে ভারী, কোথাও কোথাও অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে।

তৃতীয় দিনে রংপুর বিভাগ ও উজানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। এর প্রভাবে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে।

গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বেড়েছে, যা আগামী তিন দিন অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময়ে সিলেট ও সুনামগঞ্জের কয়েকটি স্থানে নদীর পানি সতর্কসীমা স্পর্শ করতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। তবে কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকতে পারে।




জুলাইয়ে রেমিট্যান্স এসেছে ২৮৫ কোটি ডলার

ডেস্ক নিউজ : গত জুলাই মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৮৫ কোটি ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে জুলাই মাসে আসা রেমিট্যান্সের মধ্যে এই পরিমাণ সর্বোচ্চ বলে জানা গেছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে প্রবাসীরা ২৮৫ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের জুলাইয়ের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি। গত বছর জুলাইয়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৫৯ কোটি ডলার।

দেশের রপ্তানি আয় যখন মন্থর, তখন রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির পাওয়ায় আমদানি বিলসহ বৈদেশিক পরিশোধের দায় মেটাতে তা গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় ২ শতাংশ কমে ৪০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে জুলাই-মে সময়ে আমদানি ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ বেড়ে ৬৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

বিপরীতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ বেশি।




আমরা ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি : মির্জা ফখরুল

ডেস্ক নিউজঃ আমরা ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে একটি দীর্ঘ লড়াই হয়েছে। নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। সেই সম্ভাবনা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করবে।’

রবিবার ঠাকুরগাঁও আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন তিনি। মির্জা ফখরুল বলেন, ‘একটা বিষয় সব সময় আপনারা ধরে রাখবেন রুল অব ল অ্যান্ড জাস্টিস ইনসাফ। এ দুটো জিনিস যদি আমরা ধরে রাখতে পারি, তাহলে আমরা সমাজকে অনেকখানি এগিয়ে নিতে পারব। দুর্ভাগ্য বিগত সময়ে বেশ কিছু সময় ধরে এই জিনিসগুলো থেকে বঞ্চিত হয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ন্যায় বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’

এলজিআরডি মন্ত্রী‌ বলেন, ‘প্রভাবমুক্ত একটি জুডিশিয়াল তৈরি করতে পারি, তাহলে সাধারণ নাগরিকরা উপকৃত হবে। আমরা প্রশাসনকে যদি দক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলতে পারি তাহলে রাষ্ট্র উপকৃত হবে। সেই সঙ্গে পার্লামেন্টের কমিটিগুলোকে কার্যকরী করতে পারি তাহলে গণতন্ত্র অনেক দূর এগিয়ে যাবে।’




৩ ফুট বাই ৪ ফুটের যম সেলে ৮ ইঞ্চি টয়লেট

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বাইরে থেকে দেখলে এটি অন্য যেকোনো সরকারি নিরাপত্তা স্থাপনার মতোই। তবে একের পর এক নিরাপত্তা গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। ঘুটঘুটে অন্ধকার সরু করিডর, ছোট ছোট কক্ষ, ভ্যান্টিলেটর তো দূরের কথা, আলো-বাতাসের জন্য নেই কোনো ছিদ্র। প্রতিটি কক্ষের সামনেই ছিল ভারী লোহার দরজা (বর্তমানে খুলে ফেলা হয়েছে), একেবারেই নিস্তব্ধ পরিবেশ, ৩ ফুট বাই ৪ ফুট ছোট যম সেলে টয়লেটের জন্য রয়েছে মাত্র ৮ ইঞ্চি জায়গা। গতকাল সরেজমিন পরিদর্শনে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত র‌্যাবের টিএফআই (টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন) সেলের গোপন বন্দিশালার ভিতরের এমন চিত্রই পাওয়া গেছে। বেলা ১১টার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার ও অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীকে নিয়ে টিএফআই সেল পরিদর্শনে প্রবেশ করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। এ সময় তারা টিএফআই সেলের ২৯টি গোপন কক্ষ ঘুরে দেখেন।

বিচারপতিদের পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্যও স্থাপনাটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এ সময় চিফ প্রসিকিউটর ও অন্যান্য প্রসিকিউটররা সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখান। তারা সেলগুলোর অবস্থান, জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ, বিভিন্ন অবকাঠামো এবং সরকারি তথ্যপত্রে উল্লিখিত বিভিন্ন স্থাপনার বিষয়ে সাংবাদিকদের অবহিত করেন।

এ সময় প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এম এইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, শাইখ মাহদী, বি এম সুলতান মাহমুদ, তারেক আব্দুল্লাহ, সহিদুল ইসলাম সরদার, আসামিপক্ষের আইনজীবী তবারক হোসেন, এ বি এম হামিদুল মেসবাহ, মো. আমির হোসেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক ও সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি, মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন উপস্থিত ছিলেন।

সরেজমিনে আয়নাঘরের ২৯ সেল : রাজধানীর উত্তরা-২ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত র‌্যাব-১ এর প্রধান কার্যালয়ে মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করে অনেকটা পেছন দিকে গেলে দেখা মেলে টিএফআই সেলের সেই বন্দিশালার। দ্বিতল ভবনটিতে মোট ২৯টি সেল রয়েছে। কোনো সেলেই নেই ভ্যান্টিলেশন বা আলো বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা। ঘুটঘুটে অন্ধকার এই বন্দিশালায় প্রবেশের সময় ব্যবহার করতে হয়েছে টর্চ লাইট। স্থাপনার প্রবেশমুখের সিঁড়ির পাশে একটি সরু প্রবেশ পথ দিয়ে প্রবেশ করতেই দেখা যায় আয়তনে অত্যন্ত ছোট সাতটি রুম। প্রতিটি রুমের আয়তন ৩ ফিট বাই ৪ ফিট। এর মধ্যে একটি কক্ষ দেখা গেছে সবচেয়ে ভয়াবহ। মাত্র ৪২ ইঞ্চি উচ্চতার এই কক্ষে থাকা বন্দির দাঁড়ানোর সুযোগও ছিল না। এই রুমগুলো দেখিয়ে প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ জানান, এই রুমগুলোকে বলা হতো ‘ডেথ সেল’ বা ‘যম সেল’। প্রতিটি রুমের শেষ অংশে ৮ ইঞ্চি পরিমাণে ড্রেনেজ লাইন ছিল। এই ড্রেনেজের এক মাথায় একটি তিন ইঞ্চি পরিমাণ ছিদ্র ও আরেক মাথায় পানির ট্যাপ লাগানোর লাইন দেখা যায়। এই ড্রেনেজ দেখিয়ে প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ জানান, এই ড্রেনেজই ছিল এই সেলগুলোর টয়লেট।

সিঁড়ি দিয়ে প্রথম তলায় উঠে দেখা গেছে একটু বড় আয়তনের ১০টি সেল। এই সেলগুলোর গড় আয়তন ৫ ফিট বাই ৮ ফিট। এখানেও ড্রেনেজ লাইনের মতো ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি জায়গা দেখিয়ে প্রসিকিউটররা জানান, এগুলোকেও টয়লেট হিসেবেই ব্যবহার করতে বাধ্য করা হতো বন্দিদের। একই তলায় র‌্যাব সদস্যদের থাকার জন্য ব্যারাকসদৃশ একটি অংশও রয়েছে।

দ্বিতীয় তলায় উঠে দেখা যায় আরও ১০টি সেল, যেগুলোর গড় আয়তন প্রায় ১৪ ফুট বাই সাড়ে ৪ ফুট। এ ছাড়া দুটি তুলনামূলক বড় কক্ষ রয়েছে, যেগুলোকে ভিআইপি সেল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালে দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষীর জবানবন্দিতে। একটি কক্ষের আয়তন প্রায় ১৪ ফুট বাই ১০ ফুট এবং অন্যটির আয়তন প্রায় ১০ ফুট বাই ১০ ফুট। প্রতিটি বড় কক্ষের সঙ্গে ছোট টয়লেটও রয়েছে। একই তলায় টিএফআই সেল ও র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তাদের কয়েকটি অফিস কক্ষও দেখা যায়।

প্রতিটি কক্ষই বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। সেলগুলোর বিভিন্ন ভাঙা দেখা গেছে। সরিয়ে ফেলা হয়েছে দরজাগুলো। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম পরিদর্শনের সময় জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এই বন্দিশালার আলামত ধ্বংসের চেষ্টা করা হয়েছে। কোথাও দেয়াল ভাঙা হয়েছে। আবার কোথাও দেয়াল তুলে আটকে দেওয়া হয়েছে। পরে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন সব উদ্ধার করে।

বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও এই সেলে রাখা হয়েছিল- চিফ প্রসিকিউটর : ভারতে পাচারের আগে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই সেল) রাখা হয়েছিল। সেটা তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। গতকাল টিএফআই সেল পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা জানান। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, নির্মম নির্যাতনের সেল সরাসরি দেখাতে বিচারপতিদের আনা হয়েছে। এটি মেমোরেন্ডাম, আদালতের বিচারের একটি অংশ হবে। আর যারা আয়নাঘরকে আড়াল করার জন্য আলামত নষ্ট করেছেন, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, এখানে অত্যন্ত ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে। ছোট-বড় মিলিয়ে ২৯টি কামরা রয়েছে, যেখানে ভুক্তভোগীদের মানবেতর পরিবেশে রাখা হতো। যাদের ধরে আনা হতো, তাদের দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি কাউকে কাউকে বছরের পর বছর সেখানে আটকে রাখা হতো।

কামরাগুলোর বর্ণনা দিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, কক্ষগুলো এতটাই ছোট ছিল যে, সেখানে শুয়ে থাকার কোনো সুযোগ ছিল না। ভুক্তভোগীদের বসেই দিনের পর দিন ও মাসের পর মাস কাটাতে হতো। এভাবেই তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো। দীর্ঘদিন আটকে রাখার পর কাউকে কাউকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ছেড়ে দেওয়া হতো। এসব তথ্যের সঙ্গে প্রসিকিউশনের কাছে দেওয়া ভুক্তভোগীদের বর্ণনার মিল পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি। আমিনুল ইসলাম বলেন, এই সেলে বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলী এবং বর্তমান সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেমকেও (আরমান) রাখা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, গুম হওয়া প্রায় ২৫০ ব্যক্তির এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এটি কথিত আয়নাঘর কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে- আসামি পক্ষ : পরে আসামি পক্ষের আইনজীবী মো. তাবারক হোসেন ভূইয়া সাংবাদিকদের বলেন, আইন অনুযায়ীই এ পরিদর্শন হয়েছে। তবে তারা টিএফআই সেল দেখতে আসেননি। তিনি বলেন, টিএফআই একটি ধারণা, এটি কোনো সুনির্দিষ্ট স্থান নয়। তিনি বলেন, গুম কমিশনের সদস্যরা পরিদর্শনের সময় বলেছিলেন, সেখানে নির্দিষ্ট সময় পরপর বিমান বা ট্রেনের শব্দ শোনার কথা থাকলেও তারা তা শুনতে পাননি। তাই এটি কথিত ‘আয়নাঘর’ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এটি একটি পরিত্যক্ত ভবনও হতে পারে। আসামি পক্ষের আরেক আইনজীবী এ বি এম হামিদুল মেসবাহ বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কাউকে আদালতে সোপর্দ করতে ব্যর্থ হলে সেটি বিভাগীয় ব্যবস্থার বিষয় হতে পারে, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তা মানবতাবিরোধী অপরাধ নয়। তিনি বলেন, বিচার অবশ্যই হতে হবে, তবে তা ন্যায়বিচার হতে হবে। প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করে শাস্তি দিতে হবে এবং কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন সাজাপ্রাপ্ত না হন, সেটিই ন্যায়বিচারের মূলনীতি।




বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্ব বেসরকারি খাতে গেলে সমাধান নাকি নতুন দুর্ভোগ?

ডেস্ক নিউজঃ খাতা কলমে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও লোডশেডিং কমেনি। দিনের পর দিন বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বিক্রিতে বাড়ছে ভর্তুকির পরিমাণও। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৬৭ হাজার কোটি টাকা বকেয়া বিলের চাপ।

সব মিলিয়ে নানামুখী সংকটে দেশের বিদ্যুৎ খাত। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার যে ১৫টি খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে তার একটি বিদ্যুৎ। যেখানে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা।

কিন্তু এরপরও চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া লাগতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে এবার বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশ- বিতরণ ব্যবস্থাপনা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, উৎপাদন ও পাইকারি সরবরাহ সরকারের হাতে থাকলেও খুচরা পর্যায়ে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছানো এবং এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বেসরকারি কোম্পানিকে।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির কথাও জানিয়েছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী।

কিন্তু বিদ্যুৎ বিতরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব ব্যক্তিখাতে ছেড়ে দেওয়ার এই আলোচনা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দায়িত্ব বদলালেই কি বিদ্যুৎ খাতে অব্যবস্থাপনার সমাধান মিলবে, নাকি নতুন করে বাড়বে গ্রাহকের বিল আর ভোগান্তি? এমন প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দায়িত্ব দিলেই যে বিদ্যুৎ খাতের অস্থিরতা কমে আসবে, এটি মনে করেন না জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা। বরং এর ফলে বিদ্যুতের দাম আরও বাড়তে পারে বলেই মত তাদের।

বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের নীতিগত দুর্বলতার কারণেই গত ১৫ বছরে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও লোডশেডিং কমেনি। এক্ষেত্রে, বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতে দেওয়ার থেকে এই খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শক্তিশালী করা এবং জবাবদিহি জরুরি বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বিদ্যুৎমন্ত্রী অবশ্য বলছেন, লাভক্ষতির হিসাব মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘ভর্তুকি যেটা দিচ্ছি, সেটাও সাধারণ মানুষের টাকা, আবার বিদ্যুতের দাম বাড়লে সেটাও দিচ্ছে ওই গ্রাহকই, দুই জায়গায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত। এই পরিস্থিতি ঠিক করতেই সরকার চিন্তাভাবনা করছে’।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
অব্যবস্থাপনা, ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা এবং বিশাল অঙ্কের আর্থিক লোকসানের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের আলোচনা নতুন নয়।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যায়ে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা এবং আমদানি প্রবণতা দুটোই বেড়েছে। এবার বিদ্যুতের খুচরা বিতরণ ব্যবস্থাপনাও বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া যায় কি না, এই আলোচনা সামনে আনলো সরকার।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্যুৎ ও তেলের মতো রাষ্ট্রীয় কৌশলগত উপাদান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া কতটা যৌক্তিক হবে? এছাড়া আর্থিক চাপ কমাতে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর এবং সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে বা শিল্প খাতে এর প্রভাব কেমন হতে পারে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দেড় দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের চিত্রটি ছিল মূলত অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্প আর আমদানি নির্ভরতার এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।

বিশেষ করে, কুইক রেন্টালের নামে যত্রতত্র বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন এবং অলস বসিয়ে রেখে হাজার কোটি টাকার ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ পরিশোধের সংস্কৃতি পুরো অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ক্যাব-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, ‘দেশের জ্বালানি খাতে ভয়াবহ জরুরি অবস্থা বিরাজ করছে। যা উত্তরণে সরকারের নিয়ন্ত্রণ জরুরি।’

তার মতে, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা ঠিক না করে বেসরকারিকরণে বরং গ্রাহকের ব্যয় আরও বাড়বে। এক্ষেত্রে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দামের প্রসঙ্গ টানছেন এই বিশেষজ্ঞ।

অধ্যাপক বলেন, ‘পুরোপুরি বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণ কখনই সম্ভব হয়নি। বরং প্রাইভেটাইজেশনের চাপে রেগুলেটরি কালচারও ধ্বংস হয়ে গেছে’।

এছাড়া জ্বালানির মতো রাষ্ট্রীয় কৌশলগত উপাদান বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে গেলে সার্বভৌম বিপন্ন হওয়ার শঙ্কা তৈরি হতে পারে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা- বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসির ক্ষমতা ও কর্মকাণ্ড নিয়েও আপত্তি রয়েছে অনেক বিশেষজ্ঞের।

জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, ‘বিইআরসির ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে নির্বাহী আদেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো হচ্ছে, রেগুলেটরি সিস্টেম ধ্বংস করা হয়েছে। এখন পুরো সেক্টর পুনর্গঠন না করে যদি বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে বড়ো ধরনের সর্বনাশ হবে। এর ফলে সরকারও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়বে’।

অবশ্য ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বেসরকারিকরণের কিছু সুফলও রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।

তাদের মতে, বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে সরকারি দীর্ঘসূত্রিতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমতে পারে। এর পাশাপাশি সিস্টেম লস ও বকেয়া আদায়ও দ্রুত হতে পারে। যুক্তরাজ্য, ভারত ও তুরস্ক এই মডেলে সফল হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে।

কিন্তু এক্ষেত্রে শর্ত একটাই— শক্তিশালী, স্বাধীন ও দাঁত-নখওয়ালা রেগুলেটর। তাই বেসরকারি খাতে না দিয়ে বরং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে শক্তিশালী করে কীভাবে বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনা দূর করা যায়, সরকারকে সেই পথে হাঁটতে বলছেন তারা।

অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘প্রতি মুহূর্তে এই সেক্টরে ফৌজদারি কর্মকাণ্ড ঘটছে- সরকার নিজে বলছে চুরি হচ্ছে। কোনো একটা অপরাধের শাস্তি, কোনো রেগুলেটরি বডি দিয়েছে? যেসব দেশের উদাহরণ সরকার দিচ্ছে, সেখানে রেগুলেটরি ব্যবস্থাপনা এতটা নিষ্ক্রিয় নয়’।

এ বিষয়ে একমত বুয়েটের অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরীও। তিনি বলেন, ‘ডেসকো, পিজিসিবির শেয়ার সরকারের হাতেও আছে, মার্কেটেও ছাড়া হয়েছে। এতে কী উন্নতি হয়েছে, তার আলোচনা প্রয়োজন। প্রাইভেটে গেলেই বড় পরিবর্তন আসবে- এটা ঠিক না’।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে লুটপাটের উদাহরণ দিচ্ছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকে লুটপাটের পর আমানতকারীর টাকা সরকারকে ফেরত দিতে হচ্ছে, বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে’।

বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে যেসব শঙ্কা
বিদ্যুতের বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ দেখছেন এই খাতের বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, বেসরকারি কোম্পানির মূল লক্ষ্য মুনাফা। তারা যদি কোনো অঞ্চলের একচেটিয়া দায়িত্ব পায়, তাহলে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে। এছাড়া বিদ্যুৎ পাওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের বৈষম্য তৈরি হতে পারে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।

তারা বলছেন, পাহাড়ি, দুর্গম বা কম জনবহুল এলাকায় বিদ্যুৎ দিতে খরচ বেশি, মুনাফা কম। ফলে বেসরকারি কোম্পানি সেখানে বিনিয়োগে আগ্রহ নাও দেখাতে পারে।

সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাকে বেসরকারিকরণ করা হলে সেখানে কর্মরতদের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষের শঙ্কাও রয়েছে।

এছাড়া, বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারিকরণের নামে কুইক রেন্টালের মতো অস্বচ্ছ চুক্তি করা হলে বিদ্যুৎ খাত জিম্মি করার সুযোগও তৈরি হতে পারে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না করে শুধু দায়িত্ব হস্তান্তর করলে রাষ্ট্রের আর্থিক চাপ কমবে না।

তিনি বলেন, ‘আগে চুক্তিগুলো রিভাইস করা দরকার। নীতিগত দুর্বলতা দূর না করে শুধু বিতরণ বেসরকারি খাতে দিলে লাভ হবে না’।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের যে-সব দেশে বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারিকরণ হয়েছে, সেখানে প্রথম কাজ ছিল শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। যাতে গ্রাহক হয়রানি এবং অন্যায় মূল্যবৃদ্ধি কঠোরভাবে দমন করা যায়।

আবার বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিইআরসির ক্ষমতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। রেগুলেটর দুর্বল রেখে বাজার ছেড়ে দিলে তেলের মতো বিদ্যুতের দামও নিয়ন্ত্রণহীন হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন উপদেষ্টা।

যে যুক্তি দিচ্ছে সরকার
বর্তমানে সব উৎপাদন কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে বিইআরসি নির্ধারিত দামে ছয়টি বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবি।

সমস্যা হলো, পিডিবি যে দামে বিদ্যুৎ কেনে, তার চেয়ে কম দামে বিক্রি করে। যে লোকসান ভর্তুকির মাধ্যমে পুষিয়ে দেয় সরকার।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ দাবি করেছেন, বিদ্যুৎ খাতে ৬৭ হাজার কোটি টাকা বকেয়া বিলের দায় নিয়েই যাত্রা শুরু করেছে বর্তমান সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

এমনকি জ্বালানি তেলের আমদানি ও বিতরণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও বেসরকারি খাতে দেওয়ার কথা সরকার ভাবছে বলেও জানান মন্ত্রী।

বিদ্যুৎমন্ত্রী বলছেন, ‘ডিস্ট্রিবিউশনটা আমরা প্রাইভেট করতে চাই এবং প্রাইম মিনিস্টার হ্যাজ গিভেন মি কনসেন্ট, ইউ গো অ্যাহেড।’

এক্ষেত্রে কয়েকটি যুক্তি দিচ্ছেন মন্ত্রী। তার মতে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দায়িত্ব দিলে দক্ষতা বাড়বে, বিল আদায় নিশ্চিত হবে, যা সহায়ক হবে এই খাতে সরকারের ভর্তুকির বোঝা কমাতে।

উদাহরণ হিসেবে ভারতের মুম্বাইয়ে রিলায়েন্স ও দিল্লিতে আদানির মডেলের কথা টেনেছেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, ‘কলকাতায় গোয়েঙ্কারা চালাচ্ছে, বোম্বেতে রিলায়েন্স চালাচ্ছে, দিল্লিতে আদানি- দে আর রানিং ভেরি ওয়েল, তো আমাদের কোম্পানিরা কেন পারবেনা চালাতে?’

বিতরণ ব্যবস্থাপনা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হলে বিদ্যুৎ বিল আরও বাড়বে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিল তো এমনিতেই বাড়াতে হবে, আমরা ১৭ টাকায় কিনে আট টাকায় বিক্রি করছি- সরকার আর কত ভর্তুকি দিতে পারবে?’

বিদ্যুতের সরবরাহ, চুরি ঠেকানো এবং বিল আদায় কার্যক্রমে দক্ষতা বাড়াতে বেসরকারি খাত ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে বলেই মনে করেন বিদ্যুৎমন্ত্রী।

মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তো চেষ্টা করলাম, সরকার নিজেই কোম্পানি পলিসিতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ কার্যক্রম চালালো, কই খুব একটা তো লাভ হলো না। তাই আমরা বেসরকারি খাতে এই দায়িত্ব দেওয়া যায় কিনা ভাবছি, যাতে মানুষ সেবাটা ঠিক মতো পায়’।

এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও শক্তিশালী করার কথাও জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও তেলের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই পদক্ষেপ যে এখনই বাস্তবায়ন হয়ে যাচ্ছে বিষয়টি এমন নয়। আমরা এই বিষয়টি নিয়ে ভাবছি, স্টাডি করছি যে কীভাবে বিষয়টিকে যৌক্তিক করা যায়।’




সমন্বিত প্রচেষ্টায় ৪-৫ বছরেই অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

ডেস্ক নিউজ : সরকার ও ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে কাজ করলে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

আজ শনিবার প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) আয়োজনে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে চার ঘণ্টাব্যাপী মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু এ তথ্য জানান।

তিনি জানান, মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করাই আমাদের লক্ষ্য। কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। তবে আমরা একসঙ্গে কাজ করলে সেগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির বিদ্যমান সমস্যাগুলো সরকার যেমন উপলব্ধি করছে, তেমনি ব্যবসায়ীরাও তা অনুধাবন করছেন। এসব সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। এ বিষয়ে সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই স্বীকার করছি যে, অনেক সমস্যা আছে। সরকার নিশ্চয়ই এতটুকু প্রমাণ করতে পেরেছে যে, আমরা চেষ্টা করছি। সরকারের বয়স এখনো ছয় মাস হয়নি। এর মধ্যেই আমরা কয়েক দফা বৈঠক করেছি। প্রথমে আপনাদের সঙ্গে বসেছি, পরে ফোরামের সঙ্গেও আলোচনা করেছি। সেক্টরভিত্তিক সমস্যাগুলো নিয়েও আমরা কাজ করছি।’

আগের বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়ীরা যেসব সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলেন, সেগুলোর অনেকগুলোরই সমাধান হয়েছে। আজকের বৈঠকেও নতুন কিছু সমস্যার কথা উঠে এসেছে। সেগুলো নিয়েও সরকার কাজ করবে।

তিনি জানান, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে আবারও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করবে সরকার।

তাঁর ভাষায়, ‘আমরা যত বেশি বসতে পারব, তত বেশি আপনাদের সমস্যাগুলো জানতে পারব এবং সেগুলোর সমাধান করতে পারব।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান বেরিয়ে আসে। দীর্ঘ সময় ধরে খোলামেলা আলোচনা হলে কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়। এ ধরনের সংলাপ অব্যাহত থাকলে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন শিল্পায়নের পরিবেশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে ঋণ, নীতিগত সহায়তা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করে তারা চলমান কার্যক্রমের অগ্রগতিতেও সন্তোষ প্রকাশ করেন।

সভায় জানানো হয়, আগের বৈঠকে আলোচিত ২৮টি সমস্যার মধ্যে ২১টির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাকি সাতটি বিষয় প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

এ সময় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার রূপরেখাও তুলে ধরেন ব্যবসায়ীরা। রপ্তানি বাড়াতে কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেয় সরকার।

বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সড়ক, সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।