রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি মামুনের পাঁচ বছরের জেল

ডেস্ক নিউজঃ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামি থেকে রাজসাক্ষী বনে যাওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে ৫ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

সোমবার (১৭ নভেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় দেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে এদিন সকালে কারাগারে থাকা মামলার একমাত্র আসামি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। পরে তাকে রাখা হয় হাজতখানায়।

চলতি বছরের ১৬ মার্চ সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে এ মামলায় আসামি করার আবেদন করে প্রসিকিউশন। পরে ট্রাইব্যুনাল তাতে সম্মতি দেন।

এরপর গত ১২ মে এ মামলায় চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। আর প্রসিকিউশন শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে গত ১ জুন ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে।

শুরুতে এ মামলার একমাত্র আসামি ছিলেন শেখ হাসিনা। গত ১৬ মার্চ সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকেও এ মামলায় আসামি করা হয়। সবশেষ গত ১২ মে মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নাম আসে।

এ মামলায় গত ১০ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। ওইদিনই (১০ জুলাই) সাবেক আইজিপি মামুন ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন।

পরে নিজের দোষ স্বীকার করে ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে সরাসরি ‘লেথাল উইপন’ বা মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গত বছরের ১৮ জুলাই শেখ হাসিনার ওই নির্দেশনা তিনি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মাধ্যমে পেয়েছিলেন বলে জবানবন্দিতে জানান।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে প্রথম মামলা হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজ শুরু হয় গত বছরের ১৭ অক্টোবর। ওইদিনই এ মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।




সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড

ডেস্ক নিউজঃ সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গণঅভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় করা এটিই প্রথম মামলা, যার রায় হলো আজ।

সোমবার (১৭ নভেম্বর) দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে ছয় অধ্যায়ে ৪৫৩ পৃষ্ঠার রায়ের প্রথম অংশ পড়া শুরু করেন বিচারিক প্যানেলের সদস্য বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলের অপর সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।

২ ঘণ্টা ১০ মিনিটের সংক্ষিপ্ত রায় পড়া শেষে দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের বিরুদ্ধে এ রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল।

এ মামলায় পলাতক রয়েছেন কামাল। তবে গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় বছরখানেক ধরে কারাগারে রয়েছেন সাবেক আইজিপি মামুন। যদিও রাজসাক্ষী হয়ে ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি। ফলে সাবেক এই আইজিপির শাস্তির বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের ওপর ছেড়ে দেন প্রসিকিউশন। একইসঙ্গে শেখ হাসিনা ও কামালের সর্বোচ্চ সাজা চাওয়া হয়।




শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ

ডেস্ক নিউজঃ জুলাই গণআন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি অভিযোগের দ্বিতীয়টিতে অভিযোগে ফাঁসির রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।  

ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই রায় দেন। ট্রাইব্যুনালের বাকি সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

এর আগে, গত ১৩ নভেম্বর এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিন (১৭ নভেম্বর) দিন ধার্য করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদসহ অন্যরা।

গত ২৩ অক্টোবর এ মামলায় সমাপনী বক্তব্য রাখেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রধানমন্ত্রীসহ হেভিওয়েট নেতাদের যেভাবে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, সেসব বর্ণনা ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন তিনি। একইসঙ্গে শেখ হাসিনা ও কামালের সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেন তিনি। পরে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর যুক্তি উপস্থাপনের কয়েকটি বিষয়ে জবাব দেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এরপর তাদের কিছু কথার পাল্টা উত্তর দেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আমির হোসেন।

এ মামলায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনও আসামি। তবে রাজসাক্ষী হয়ে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেওয়ায় যুক্তিতর্কে শেখ হাসিনা-কামালের চরম দণ্ড বা সর্বোচ্চ সাজা চাইলেও তার ব্যাপারে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল প্রসিকিউশন। মামুনের আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদও তার অ্যাকুইটাল (খালাস) চেয়েছেন।

এ মামলায় ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন ৫৪ জন। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় চলতি বছরের ৩ আগস্ট। প্রথম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বীভৎসতার চিত্র তুলে ধরেন খোকন চন্দ্র বর্মণ। ৮ অক্টোবর মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো. আলমগীরের জেরার মাধ্যমে শেষ হয় সাক্ষ্যগ্রহণের ধাপ। এরপর প্রসিকিউশন ও স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীর যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয় ২৩ অক্টোবর।

এ মামলায় তিন আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে রয়েছে উসকানি, মারণাস্ত্র ব্যবহার, আবু সাঈদ হত্যা, চানখারপুলে হত্যা ও আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ মোট আট হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠার। এর মধ্যে তথ্যসূত্র দুই হাজার ১৮ পৃষ্ঠার, জব্দতালিকা ও দালিলিক প্রমাণাদি চার হাজার পাঁচ পৃষ্ঠার ও শহীদদের তালিকার বিবরণ দুই হাজার ৭২৪ পৃষ্ঠার। গত ১২ মে চিফ প্রসিকিউটরের কাছে এ মামলার প্রতিবেদন জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।




ধানমন্ডি ৩২ ভাঙার বুলডোজার আটকে দিলো সেনাবাহিনী

ডেস্ক নিউজঃ রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে উপস্থিত জনতার ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। এদিকে দুটি বুলডোজার ধানমন্ডি-৩২-এ প্রবেশের চেষ্টা করলে রুখে দিয়েছে সেনাবাহিনী। তারা বলছে, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এ ধরনের কাজ করতে দেওয়ার সুযোগ নেই।

দুপুর ১২টার দিকে ট্রাকে করে বুলডোজার দুটি নেওয়া হয় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে। এ সময় বুলডোজারের ওপর কিছু তরুণকে স্লোগান দিতে দেখা যায়। এরপর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ঘিরে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। পরে সেনাবাহিনী ওই তরুণদের বুলডোজার থেকে নামিয়ে দেয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এক্সকাভেটর নিয়ে এগোতে চাইলে ছাত্র-জনতাকে ঠেকাতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ আটকানোর চেষ্টা ও পরে লাঠিচার্জ করে। এতে ছাত্র-জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। হঠাৎ পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় পুরো এলাকা থমথমে বিরাজ করছে।

এক্সকাভেটরসহ অবস্থান নেওয়া ছাত্র-জনতা আওয়ামী লীগবিরোধী নানা স্লোগান দিয়ে পরিবেশ উত্তপ্ত করে তোলে। তাদের স্লোগানের মধ্যে ছিল— ‘মুজিব বাদের আস্তানা এই বাংলায় হবে না’, ‘৩২ নম্বর বাড়িটি ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’ ইত্যাদি।

এসময় ছাত্রদের একাংশ দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘যত বাধাই আসুক, খুনি শেখ হাসিনার রায় ঘোষণার পরপরই আমরা ৩২ নম্বর বাড়িটি গুঁড়িয়ে দিতে চাই। এখান থেকেই আমাদের ভাই-বোন, মা-বাবাকে গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই বাড়ির কোনো স্মৃতি আর রাখতে চাই না।’

জুলাই স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক পরিচয় দিয়ে নাহিদ হাসান নামের একজন বলেন, ‘যেবার প্রথম শেখ হাসিনা বক্তব্য দেয় পালিয়ে যাওয়ার পর, সেবার আমরা প্রথম ধানমন্ডি ৩২ ভেঙেছিলাম। তখন নিশ্চিহ্ন করতে পারিনি। আজকে যেহেতু শেখ হাসিনার রায়, আজকের রায়ের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের রাজনীতি আমরা আশা করছি ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।’

এর আগে চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টার দিকে একটি বুলডোজার এসে গুঁড়িয়ে দেয় ৩২ নম্বরের বাড়ি। সেদিন একটি এক্সকাভেটরও আসে সেখানে।

তারও আগে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি আগুনে পুড়িয়ে দেয় ছাত্র-জনতা।




৬ জুলাইযোদ্ধাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে পাঠাচ্ছে সরকার

ডেস্ক নিউজঃ জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ৬ জন জুলাই যোদ্ধাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডে পাঠাচ্ছে সরকার। 

রোববার (১৬ নভেম্বর) রাতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে তাদের সহযাত্রীসহ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের ভেজথানি হাসপাতালে নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়।

আহত শিক্ষার্থীরা হলেন—মো. সুজন মিয়া, শেখ মোহাম্মদ শান্ত, মো. শাকিল, মো. লিটন, আলী হোসেন এবং মো. মিজান মিয়া। প্রত্যেক আহত ব্যক্তির সঙ্গে তাদের ভাইয়েরা সহযাত্রী হিসেবে থাইল্যান্ড যাবেন।

আদেশে বলা হয়েছে, তারা দেশ ছাড়ার দিন থেকে সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। দেশে ফেরার পর ৭ দিনের মধ্যে তাদের মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট করতে হবে।

প্রত্যেকের চিকিৎসা বাবদ ২০ লাখ করে মোট ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

আদেশে আরও জানানো হয়েছে, বিদেশে অবস্থানের সময় রোগী ও সহযাত্রীদের শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে এবং কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।




অজ্ঞাত ভারতীয় নম্বর থেকে চিফ প্রসিকিউটরকে হত্যার হুমকি

ডেস্ক নিউজঃ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মো. তাজুল ইসলাম এবং কয়েকজন প্রসিকিউটরকে হত্যার হুমকি ও গালিগালাজ করেছে দুর্বৃত্তরা। রোববার (১৬ নভেম্বর) সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত ভারতীয় ফোন নম্বর ব্যবহার করে তাদের এই হুমকি দেওয়া হয়

সোমবার (১৭ নভেম্বর) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন লোকজন রোববার সন্ধ্যার পর থেকে বিভিন্ন অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন দিয়েছে, যার বেশিরভাগই ছিল ভারতীয় নম্বর।

প্রসিকিউটর তারেক আব্দুল্লাহ জানান, তাকে ফোন দিয়ে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত একাধারে ফোন দিয়ে গালিগালাজ করেছে। একই কথা বলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদও। তারা জানান, হুমকিগুলো প্রায়শই দেওয়া হয়েছে।

হুমকির ভাষা ছিল অনেকটা এমন, ‘শেখ হাসিনাকে ফাঁসি দিলে কাউকে ছাড় নয়। নেত্রীর সাজা হলে তোমাদের জীবন শেষ করে দিবো।’

হুমকি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ভীরু, কাপুরুষ ও গণহত্যাকারীদের ভাষা এমনই হয়। এগুলো আমলে নেওয়ার কিছু নেই।’




ভোর থেকে কঠোর তল্লাশি, আদালতপাড়ায় সতর্কতা সর্বোচ্চ

ডেস্ক নিউজঃ ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়কে কেন্দ্র করে আজ সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং সুপ্রিম কোর্ট এলাকা কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে ঘেরা হয়েছে। সকালে সাড়ে আটটা থেকে নয়টার মধ্যে আদালতপাড়া ঘুরে দেখা যায়- পুরো এলাকায় চার বাহিনীর (সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও র‍্যাব) অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন রয়েছে। সন্দেহজনক মনে হলেই পথচারীকে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, পরিচয়পত্র যাচাই এবং ব্যাগ তল্লাশি করা হচ্ছে।

রায় ঘোষণার দিনকে ‘উচ্চঝুঁকির সকাল’ বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে হাইকোর্ট মোড়, সুপ্রিম কোর্টের মূল গেট থেকে মাজার গেট পর্যন্ত নিরাপত্তা কয়েক স্তরে ভাগ করে বাড়ানো হয়েছে। মোটরসাইকেলের কাগজপত্র পরীক্ষা থেকে শুরু করে পথচারীর গন্তব্য জিজ্ঞেস করা- সর্বত্রই কঠোর নজরদারির উপস্থিতি স্পষ্ট।

মাজার গেট এলাকায় সেনাবাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। আদালতপাড়ার ভেতরে র‍্যাবের বাড়তি সদস্য মোতায়েন রয়েছে, আর বিজিবির টহল দল সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে ঘুরে ঘুরে নজরদারি চালাচ্ছে।

মগবাজার থেকে আসা আইনজীবী সানজিদা রহমান বলেন, ‘দুই জায়গায় ব্যাগ খুলে দেখাতে হয়েছে। এমন কড়াকড়ি আগে কখনও দেখিনি।’

নিকটবর্তী দোকানকর্মী ইমরান জানান, ‘সকাল থেকেই পরিবেশ অন্যরকম। কেউ দাঁড়ালেই জিজ্ঞাসা করছে কোথায় যাচ্ছেন।’

ট্রাইব্যুনালের ভেতরে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনুমোদন ছাড়া কাউকেই প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। দায়িত্বপ্রাপ্ত এক নিরাপত্তাসদস্যের ভাষায়, ‘আজ ছাড় দেওয়ার মতো দিন না।’




জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলায় ৫ অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায় আজ

ডেস্ক নিউজঃ জুলাই গণআন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে আজ সোমবার বেলা ১১টায় রায় ঘোষণা করা হবে।

গণ-অভ্যুত্থানের সময় হত্যাকাণ্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় করা এটিই প্রথম মামলা, যার রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছেন বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এই ট্রাইব্যুনালের আরও দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। রায় ঘোষণার জন্য গত ১৩ নভেম্বর এই দিন ধার্য করেন  ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণা সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন। এছাড়া রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বড় পর্দায় দেখানো হবে ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণা।

এদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার কী শাস্তি হয়, তা দেখার জন্য জনগণের দৃষ্টি আজ ট্রাইব্যুনালের দিকে। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও এর আশাপাশের এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি এই মামলার অন্য দুই আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিন আসামির মধ্যে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান পলাতক। দুজনই এখন ভারতে অবস্থান করছেন।

শেখ হাসিনাসহ এ মামলার তিন আসামির বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগগুলো হলো—

গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান;

হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ প্রদান;

রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা;

রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা এবং

আশুলিয়ায় ছয়জনকে পোড়ানোর অভিযোগ।

এই পাঁচ অভিযোগে তিন আসামির বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের দিন (১০ জুলাই) সাবেক আইজিপি মামুন গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। ‘অ্যাপ্রুভার’ (রাজসাক্ষী) হওয়ার আবেদন করেন।

এর আগে গত ১ জুন শেখ হাসিনাসহ এই তিন আসামির বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে প্রসিকিউশন।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় প্রথম মামলাটি (মিসকেস বা বিবিধ মামলা) হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে।

গত বছরের ১৭ অক্টোবর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম বিচারকাজ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিনই এ মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। প্রথম দিকে এ মামলায় শেখ হাসিনাই একমাত্র আসামি ছিলেন। চলতি বছরের ১৬ মার্চ এ মামলায় শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আসামি করার আবেদন করে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)। ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন।

একাধিকবার সময় বাড়ানোর পর চলতি বছরের ১২ মে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।

গত ১২ অক্টোবর এ মামলায় যুক্তিতর্ক শুরু হয়। যুক্তিতর্ক শেষ হয় ২৩ অক্টোবর। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ড চান চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।

আসামি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামানের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। তিনি যুক্তিতর্কে এ মামলা থেকে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামানের খালাস আবেদন করেন। রাজসাক্ষী সাবেক আইজিপি মামুনেরও খালাস আবেদন করেন তার আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।




রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনাল এলাকায় সেনা মোতায়েন চেয়ে চিঠি

ডেস্ক নিউজঃ মানবতাবিরোধী অপরাধে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে করা মামলার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আশেপাশের এলাকায় পর্যাপ্ত সংখ্যক সেনাসদস্য মোতায়েন চেয়ে সেনা সদরে চিঠি দিয়েছেন সুপ্রিমকোর্ট।

বুধবার সুপ্রিমকোর্টের জনসংযোগ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালে সেনা মোতায়েন চেয়ে সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের অফিস থেকে সেনা সদর দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

এর আগে এই মামলায় রায়ের তারিখ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবারও সেনা মোতায়েন করতে চিঠি দেওয়া হয়েছিল সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন থেকে। সেই অনুযায়ী সেনাও মোতায়েন করা হয়েছিল সুপ্রিমকোর্ট ও ট্রাইব্যুনালে।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও মামলাটির সংবেদনশীলতার কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও সুপ্রিমকোর্ট এলাকায় যে কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বাভাবিক রাখতে ঢাকাসহ চার জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার পাশাপাশি এ মামলার অপর দুই আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। এর মধ্যে সাবেক আইজিপি মামুন ‘অ্যাপ্রুভার’ (রাজসাক্ষী নামে পরিচিত) হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।




নবান্নের আবহ নিয়ে চলে এলো অগ্রহায়ণ

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ টলটলে মুক্তোর মতো শিশির যেন ভোরের আলোর সঙ্গে প্রতিদিন নতুন জন্ম নেয়। ঘাসের ডগায়, ধানের শীষের মাথায় তারা চিকচিক করে ওঠে। দূরদিগন্ত অবধি ছড়িয়ে থাকা ধানক্ষেত তখন সোনালি আভায় দীপশিখার মতো ঝলমল করে। সবুজ স্বপ্নের সঙ্গে হলুদ সোনালি রঙ একাকার হয়ে বাংলার হেমন্তকে সাজিয়ে তোলে এক অপূর্ব মায়াবী আলোয়। অখণ্ড নীল আকাশ, কোমল সোনাঝরা রোদ আর হিমশীতল বাতাস—সব মিলিয়ে প্রকৃতির ভাষা যেন বলে ওঠে, এসেছে অগ্রহায়ণ।

দিনগুলো ছোট হয়ে আসে। শেষ বিকেলে কুয়াশার পাতলা চাদর নেমে আসে নিঃশব্দে, ঠিক শিশিরের মৃদু টুপটাপ শব্দের মতো। নিশিথের গাঢ় নিস্তব্ধতায় সেই শিশির যেন রূপ নেয় অদৃশ্য সংগীতে। আর সে সুরেই ভেসে ওঠে কৃষকের মন—কারণ উঠোনে উঠতে চলেছে নতুন ধানের ম-ম গন্ধ, আসন্ন নবান্নের আনন্দ।

অগ্রহায়ণ মানেই বাংলার অন্ন-উৎসব, কৃষিজীবনকে ঘিরে অনাদিকাল ধরে চলে আসা এক ঐতিহ্যের নবজাগরণ। নতুন আমন ধান ঘরে তুলেই শুরু হয় নবান্ন উৎসব। হিন্দু লোকবিশ্বাসে এই দিনকে ধরা হয় বাৎসরিক মাঙ্গলিক এক শুভক্ষণ হিসেবে। নতুন ধানের ভাত, বিবিধ তরকারি, পিঠেপুলি—সব মিলিয়ে গ্রাম মহল্লা হয়ে ওঠে উৎসবের আসর। অনেক পরিবারে মেয়েদের ডেকে আনা হয় বাপের বাড়িতে; কোথাও হয় মসজিদে শিন্নি বিতরণ, আবার হিন্দু কৃষক পরিবারে চলে পূজার আয়োজন। হিন্দু লোকাচারে পিতৃপুরুষ, দেবতা, এমনকি কাক পর্যন্ত নতুন অন্ন উৎসর্গ করার রীতি আছে। মৃতের আত্মার কাছে খাবার পৌঁছে যায় কাকের মাধ্যমে—এ বিশ্বাসে এই নৈবেদ্য পরিচিত ‘কাকবলী’ নামে।

নবান্নের উচ্ছ্বাস শুধু গ্রামেই থেমে থাকে না। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের নানা প্রান্তে আয়োজন করা হচ্ছে নবান্ন উৎসব। অগ্রহায়ণের প্রথম দিনকে ‘আদি নববর্ষ’ আখ্যা দিয়ে উদযাপনের ডাক দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। দেশের বহু স্থানে বসছে গ্রামীণ মেলা—যেখানে মানবসমাগমে জমে উঠবে মিলনমেলা।

ধান কাটা মৌসুমে কৃষকের ঘর ভরে ওঠে ‘রাশি রাশি ভারা ভারা সোনার ধানে’। কুয়াশাচ্ছন্ন হেমন্তের সকালে ভেসে আসে ধান ভাঙার গান, ঢেঁকির তাল—যদিও যান্ত্রিকতার যুগে ঢেঁকির শব্দ আর অতটা শোনা যায় না, তবু সেই স্মৃতিই হেমন্তকে রাখে চিরন্তন আবহে। নতুন চালের পিঠার জন্য সংগ্রহ হতে থাকে খেজুরের রস; নতুন রস আর নতুন চালের এই যুগলবন্দী যেন বাঙালি সংস্কৃতির এক অমোঘ অঙ্গ।

লোকগবেষকদের মতে, কৃষিনির্ভর সভ্যতা গড়ে ওঠার পর থেকেই চলে আসছে নবান্নের জনপ্রিয়তা। কখনও অগ্রহায়ণই ছিল বাংলা বছরের প্রথম মাস—‘অগ্র’ মানে প্রথম, ‘হায়ণ’ মানে মাস। অতীতে উৎসবটি পালন করতেন মূলত হিন্দু গৃহস্থরা। আমন ধান কাটার পর অগ্রহায়ণ বা পৌষে ঘরে ঘরে জমত নবান্ন। হেমন্তের প্রকৃতি যে কী অদ্ভুত সুন্দর, তা কবি-সাহিত্যিকেরা দীর্ঘকাল ধরেই বর্ণনা করে আসছেন মুগ্ধ কণ্ঠে। জীবনানন্দ দাশের স্বপ্নময় পঙ্‌ক্তি যেন নবান্নকেই স্মরণ করিয়ে দেয়—
‘আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়/
হয়তো মানুষ নয়—হয়তো শঙ্খচিল, শালিখের বেশে…’।

তার আরেক কবিতায় হেমন্তের প্রাচুর্য ধরা দেয়—
‘চারিদিকে নুয়ে পড়ে ফলেছে ফসল,/
তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল…।’

বর্তমানে দেশের বহু অঞ্চলে চলছে আগাম আমন ধান কাটা ও মাড়াই। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফসল উৎপাদনের সময়—প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন আমন উৎপাদিত হয় এই মৌসুমেই। রবীন্দ্রনাথও নতুন ফসলের আনন্দকে তুলে ধরেছিলেন—
‘ধরার আঁচল ভরে দিলে প্রচুর সোনার ধানে।’

অগ্রহায়ণের সঙ্গে শীতের দশ প্রহরণ শুরু হয়। কুয়াশার পর্দা নামতে থাকে ধীরে ধীরে। জীবনানন্দের ভাষা তখন সত্যি হয়ে ওঠে—
‘শিশির পড়িতেছিল ধীরে ধীরে খসে;/
নিমের শাখার থেকে একাকীতম কে পাখি নামি
উড়ে গেল কুয়াশায়— কুয়াশার থেকে দূর-কুয়াশায় আরও।’

হেমন্তের প্রকৃতি, নতুন ধানের গন্ধ, কৃষকের মুখের হাসি—সব মিলিয়ে নবান্ন শুধু একটি উৎসব নয়; এটি বাংলার জীবন-স্পন্দন, বাংলার মাটির সঙ্গে মানুষের শাশ্বত বন্ধনের অবিচ্ছেদ্য উদযাপন।