“হজযাত্রার ফ্লাইট শুরু আজ মধ্যরাতে”

ইসলামিক ডেস্কঃ সৌদি সরকার ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী আজ শুক্রবার মধ্যরাতে শুরু হচ্ছে চলতি বছরের হজ ফ্লাইট। প্রথম ফ্লাইটটি রাত সাড়ে ১২টার দিকে ৪১৯ যাত্রী নিয়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে।

এই কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ উপলক্ষে রাজধানীর আশকোনা হজ ক্যাম্পে চলছে শেষ প্রস্তুতি।

সরকারি তথ্য বিবরণীতে বলা হয়েছে, আগামীকাল শনিবার মোট ১৪টি ফ্লাইট রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, চারটি সৌদি আরবের সাউদিয়া এবং চারটি ফ্লাইনাস এয়ারলাইনস পরিচালনা করবে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ৭৮ হাজার ৫০০ জন হজযাত্রী পবিত্র হজ পালন করবেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চার হাজার ৫৬৫ জন এবং হজ এজেন্সির মাধ্যমে ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন হজ পালনে যাবেন। এরই মধ্যে ১৭১ সদস্যের একটি মেডিক্যাল টিম সৌদি আরবে পৌঁছেছে।

সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হজচুক্তি অনুযায়ী মোট হজযাত্রীর ৫০ শতাংশ পরিবহন করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। বাকি ৫০ শতাংশের মধ্যে সৌদি আরবের সাউদিয়া ৩৫ শতাংশ এবং ফ্লাইনাস ১৫ শতাংশ হজযাত্রী পরিবহন করবে।

ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এবার প্রত্যেক হজযাত্রীর জন্য ‘নুসুক কার্ড’ বাধ্যতামূলক।

এই ডিজিটাল পরিচয়পত্রের মাধ্যমে সৌদি আরবে সব ধরনের সেবা পাবেন হজযাত্রীরা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাওয়া প্রত্যেক হজযাত্রী দেশেই এই কার্ড পাচ্ছেন। তবে সরকারি ব্যবস্থাপনার যাত্রীরা সৌদি আরবে হোটেল লবিতে গিয়ে নুসুক কার্ড সংগ্রহ করবেন।

প্রি-হজ ফ্লাইট মোট ২০৭টি। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১০২টি, সাউদিয়া ৭৫টি এবং ফ্লাইনাস ৩০টি ফ্লাইট পরিচালনা করবে। ২১ মে প্রি-হজ ফ্লাইট শেষ হবে।

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২৬ মে পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হবে। হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ৩০ মে ফিরতি ফ্লাইট শুরু হবে, যা ১ জুলাই শেষ হবে।




“শনিবার জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠক”

ইসলামিক ডেস্কঃ হিজরি ১৪৪৭ সনের পবিত্র জিলকদ মাসের তারিখ নির্ধারণে আগামীকাল শনিবার (১৮ এপ্রিল) জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে। এ দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররম সভাকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে।

সভায় সভাপতিত্ব করবেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ।




আজান শোনামাত্র মসজিদে ছুটে যেতেন রাসুল (সা.)

ইসলামিক ডেস্কঃ দুনিয়াতে এমন কোনো কাজ নেই যা সমাধা করার জন্য প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না। যে কাজের গুরুত্ব যত বেশি সে কাজের প্রস্তুতিও তত গুরুত্বের দাবি রাখে। নামাজ আল্লাহপাক প্রদত্ত এক মহান হুকুম, তার গুরুত্ব অপরিসীম। সুতরাং তার প্রস্তুতিও অত্যন্ত গুরুত্বের দাবিদার। আর নামাজ যেহেতু আল্লাহ প্রদত্ত বিধান, তাই প্রস্তুতি কীভাবে নিতে হবে, প্রস্তুতির উপকরণগুলো কী তা-ও আল্লাহপাক নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

নামাজের প্রস্তুতিমূলক কাজ : ১. ওয়াক্ত মতো নামাজ পড়া। ২. পবিত্রতা অর্জন করে নামাজ পড়া। ৩. বস্ত্রাবৃত অবস্থায় নামাজ পড়া। ৪. পবিত্র কাপড় পরিধান করে নামাজ পড়া। ৫. পাক-পবিত্র স্থানে নামাজ পড়া। ৬. কেবলার দিকে ফিরে নামাজ পড়া। ৭. নামাজের নিয়ত করা।

নামাজের প্রস্তুতিস্বরূপ আল্লাহপাক এ সাতটি কাজের হুকুম দিয়েছেন। এর মাঝে অনেক হেকমত নিহিত রয়েছে। প্রথমেই আলোচনা করি নামাজের সময়সূচি নিয়ে। আল্লাহপাক প্রত্যেক নামাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন সময়ের বিধান রেখেছেন। মনগড়া নামাজ পড়লেই হবে না, যে নামাজের জন্য যে সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে সে সময়েই তা আদায় করতে হবে, অন্যথায় সে নামাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণেযোগ্য হবে না। প্রত্যেক ওয়াক্তের জন্য আল্লাহপাক নির্ধারণ করে রেখেছেন কিছু চিহ্ন ও নিদর্শন। সময় হলেই চতুর্দিক থেকে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ভেসে আসে সুমধুর আজানের ধ্বনি। এটা আল্লাহপাকের বিধান, যা সর্বসাধারণের সুবিধার্থে বিধিবদ্ধ হয়েছে।

আজানের বিধান কেন : আল্লাহপাক এ পৃথিবীকে আখেরাতের প্রতিচ্ছবিরূপে সৃষ্টি করেছেন। মুয়াজ্জিনের সুমধুর কণ্ঠ থেকে যখন ভেসে আসে আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ধ্বনি, তখন মুসলিম হৃদয় মাতোয়ারা হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করতে ছুটে চলে মসজিদ পানে।

অনুরূপভাবে কেয়ামতের পর যখন হজরত ইসরাফিল (আ.) দ্বিতীয়বার শিঙায় ফুঁ দেবেন, তখনো মানুষ মধুর কণ্ঠে ভেসে আসা ধ্বনি শুনে মাতোয়ারা হয়ে আল্লাহর স্মরণে ছুটে চলবে হাশরের পানে। সেই মহাদিবসের স্মরণার্থেই আজ পৃথিবীতে আজানের বিধান। যাতে করে আজানের ধ্বনি শোনামাত্রই মানুষ অনুধাবন করতে সক্ষম হয় যে, এমনিভাবে একদিন আমাকে হাশরের ময়দানের দিকে ডাকা হবে। এতে সেই ভয়াবহ দিবসের প্রস্তুতিস্বরূপ অন্তরে আমলের তাগিদ সৃষ্টি হবে। আজান বিধিবদ্ধ হওয়ার পেছনে এ অপূর্ব হেকমত নিহিত রয়েছে।

বস্তুত আল্লাহপাক দেখতে চান, আজান শুনে কে নামাজের প্রস্তুতি নেয়, আর কে উদাসীন হয়ে বসে থাকে? যারা আজান শুনে আগ্রহ ও গুরুত্বের সঙ্গে মসজিদে উপস্থিত হয়, তারা কেয়ামতের দিন সম্মান ও চিন্তামুক্ত দিল নিয়ে উপস্থিত হবে, আর যারা নামাজ থেকে উদাসীন, মসজিদে উপস্থিত হয় না, তাদের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ! আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হুকুম হলো সব কাজকর্ম ত্যাগ করে মসজিদে উপস্থিত হওয়া। আজানের পর মসজিদে না গিয়ে অন্য কাজে লিপ্ত হলে তা হবে বরকতহীন কাজ। কাজের বরকত ও প্রতিদান আল্লাহপাকের হাতে। আল্লাহপাক বরকতের সব ধারা পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রাখেন।

যখন আজান হয়ে যায়, তখন বরকতের সব ধারা মসজিদের দিকে ধাবিত করে দেন। তখন অন্য কোনো কাজে এবং অন্য কোনো স্থানে বরকত থাকে না। এ সময় যারা মসজিদে থাকে, তারাই কেবল বরকত লাভ করতে পারে। যদিও দেখা যায় আজান হয়ে যাওয়ার পর দোকানে ক্রেতার ভিড় বেশি হয়, আসলে এটা দৃশ্যমান মাত্র, প্রকৃত বরকত মসজিদে। মাঠঘাট, দোকানপাট সবকিছু আজানের পর বরকতশূন্য হয়ে থাকে। সুতরাং আজানের পর শান্তি ও বরকত মসজিদেই বর্ষিত হয়।  নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা মোবারক বিবর্ণ হয়ে যেত। অতি আদরের স্ত্রীদেরও তখন অচেনা মনে হতো।

কারও সঙ্গে কোনোরূপ কথাবার্তায় লিপ্ত না হয়ে সবকিছু বর্জন করে তিনি মসজিদে ছুটে যেতেন। হাদিসের ভাষ্য দ্বারা বোঝা যায়, কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার পর মানুষ যখন হাশরের ময়দানের দিকে ছুটবে, তখন হজরত বেলাল হাবশী (রা.) হবেন ইসলামের পতাকাবাহী। হজরত আবু বকর, হজরত ওমর, হজরত উসমান, হজরত আলীসহ সব সাহাবা কেরাম (রা.) সেখানে উপস্থিত থাকবেন; কিন্তু পতাকাবাহী আর কেউ থাকবে না। একমাত্র পতাকাবাহী থাকবেন বেলাল হাবশী (রা.)। কারণ তিনি দুনিয়াতে আজান দিতেন, আর সে ডাকে সাড়া দিয়েই মানুষ মসজিদ পানে ছুটে যেত এবং এর মাধ্যমেই প্রমাণিত হতো কে মুসলমান আর কে মুসলমান নয়। সুতরাং সেদিন তাঁর হাতেই থাকবে মুসলমানদের পতাকা। আল্লাহপাক আমাদের সহিহ সমঝ দান করুন!




নিজের শান্তির জন্য অন্যকে ক্ষমা করুন

ইসলামিক ডেস্কঃ মহান আল্লাহর যত গুণাবলি রয়েছে, ক্ষমার গুণ তার অন্যতম। কোরআন-হাদিসের পাতায় পাতায় আল্লাহর ক্ষমা ও মহানুভবতার পরিচয় মুক্তার মতো ছড়িয়ে আছে। আল্লাহ বলেছেন, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ও না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন  (জুমার)। এ আয়াত থেকে আমরা জানতে পারলাম, পৃথিবীতে এমন কোনো গুনাহ নেই, যার ক্ষমা নেই। তবে এর জন্য তওবা আবশ্যক। অর্থাৎ আল্লাহর হকসম্পৃক্ত সব গুনাহই যথাযথ তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। আর বান্দার হকসম্পৃক্ত গুনাহের ক্ষেত্রে তওবার পাশাপাশি বান্দার কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়াও আবশ্যক। মুত্তাকিদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে সুরা আলে ইমরানে মহান আল্লাহ বলেছেন, (মুত্তাকি তারাই) যারা সুখে ও দুঃখে দান করে, ক্রোধ দমন করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।

এ আয়াতে মুত্তাকিদের তিনটি গুণের কথা বলা হয়েছে। সবই আমাদের হৃদয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কৃপণতা না করে সুখে-দুঃখে আল্লাহর রাস্তায় দান করা, ক্রোধ দমন করা, ক্ষমা করা-এগুলো মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ বলেন, ক্রোধ না থাকা মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য। বরং তিনি ক্রোধ দমনের কথা বলেছেন। সৃষ্টির নিয়মে আমাদের ভিতর ক্রোধ থাকবে। তবে সেই ক্রোধ কে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারল, আল্লাহ সেটাই দেখবেন। আবার ক্ষমা এমন গুণ, বান্দা যদি ক্ষমা করে, আল্লাহও তাকে ক্ষমা করেন। ক্ষমা করা বড় হৃদয়ের পরিচয়। যারা ক্ষমা করতে পারে না, তাদের হৃদয় ছোট। সমুদ্রের ভিতর যদি ময়লা পড়ে, মুহূর্তে ময়লার টুকরো সমুদ্রের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু ময়লার ওই টুকরো যদি কুয়ার ভিতর পড়ে, তবে ময়লাটি হারিয়ে যায় না। বরং চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়ে থাকে। আমাদেরকে সমুদ্রের মতো বড় হৃদয়ের অধিকারী হতে হবে। জীবন চলার পথে নানা আঘাত, দুঃখ-বেদনা আসবে। কিন্তু সেগুলো মনে পুষে রাখা যাবে না। বরং সমুদ্রের মতো সেসব দুঃখ-বেদনা বিলীন করে দিতে হবে। এক চাকর বারবার ভুল করে আর ক্ষমা চায়। মালিক একসময় বিরক্ত হয়ে বলে, আর কত ক্ষমা করব! তোমার কাজই তো সব সময় ভুল করা। তখন চাকর বলে, আপনি আল্লাহর কাছে যতবার ক্ষমার আশা করেন, আমাকেও ততবার ক্ষমা করুন। এটি একটি শিক্ষণীয় গল্প। আমরা অধীনস্থদের সামান্য ভুলেই বিরক্ত হই, দুর্ব্যবহার করি। স্ত্রী- সন্তানদের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করি। তাদের সামান্য ভুলে ত্যক্ত হয়ে উঠি। তাদের ক্ষমা করি না। কিন্তু আমাদের ভাবা উচিত, আমরা আল্লাহর কাছেও বারবার ভুল করি এবং প্রত্যাশা রাখি, প্রত্যেকবারই আল্লাহ যেন আমাদের ক্ষমা করেন। আমরা যতক্ষণ না ক্ষমা করব, ততক্ষণ আমাদের হৃদয় ভারী হয়ে থাকবে। ধীরে ধীরে এই ভারত্ব বাড়তেই থাকবে। আধা লিটার পানির একটি বোতল হাতে ধরে রাখা খুব সহজ। কিন্তু এই বোতলটাই যদি আমরা পাঁচ-সাত ঘণ্টা ধরে রাখি, তবে এটাই আধামণ ভারী হয়ে উঠবে। ক্ষোভ পুষে রাখার ব্যাপারটাও তাই।

আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই অন্যকে ক্ষমা করা উচিত। কারণ আমরা যত ক্ষমা করব, তত নির্ভার থাকব। আমরা যতক্ষণ ক্ষমা না করব, ততক্ষণ কুয়ার ময়লার মতো আমাদের হৃদয় ময়লা হয়ে থাকবে। এ ময়লা নিয়ে কেউ ভালো থাকতে পারে না। তাই নিজেদের ভালো থাকার স্বার্থেই আমাদের ক্ষমার গুণ অর্জন করা উচিত। হাদিসের একটি ঘটনা বলি। হাদিসটি মুসনাদে আহমাদে এসেছে। একবার রসুল (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে বসেছিলেন। হঠাৎ তিনি বললেন, এখন এমন এক ব্যক্তি আমাদের মাঝে উপস্থিত হবেন, যিনি জান্নাতি। দেখা গেল, একটু পর একজন আনসার সাহাবি এলেন, যার মুখমণ্ডল দিয়ে অজুর পানি ঝরছে এবং তার বাম হাতে জুতা। পরপর তিন দিন একই ঘটনা ঘটল। তখন ওই জান্নাতি সাহাবির গোপন আমলের ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)-এর কৌতূহল হলো। আমাদের সমাজে কেউ হঠাৎ বড়লোক হয়ে গেলে তার ব্যাপারে আমাদের কৌতূহল হয়। ধনী হওয়ার রহস্য উন্মোচন করে আমরাও তার মতো ধনী হওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু সাহাবিদের ধ্যানজ্ঞান ছিল পরকাল, জান্নাত। তাই আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) ওই সাহাবির গোপন আমল অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিন দিনের জন্য তিনি তাঁর মেহমান হলেন। কিন্তু এই তিন দিনে নিয়মিত আমলের বাইরে বিশেষ কোনো আমল দেখা গেল না। অবশেষে ওই সাহাবিকে তাঁর মেহমান হওয়ার গোপন উদ্দেশ্য খুলে বললেন। তখন সাহাবি বললেন, আমার তেমন বিশেষ কোনো আমল নেই। তবে একটা কাজ আমি নিয়মিত করি। সেটা হলো, প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে সবাইকে ক্ষমা করে দিই। কারও প্রতি কোনো ধরনের বিদ্বেষ রাখি না। হাদিসের এ ঘটনায় আমাদের জন্য অনেক বড় শিক্ষা রয়েছে। এ থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, নিয়মিত ক্ষমা করতে থাকা, কারও প্রতি রাগ-ঘৃণা-বিদ্বেষ পুষে না রাখা জান্নাতি মানুষের আলামত। তাই আসুন, আমরা হৃদয়টাকে কোমল করি, সবাইকে ক্ষমা করার গুণ অর্জন করি। তাহলে আমাদের দুনিয়া ও আখেরাত শান্তিময় হয়ে উঠবে।




আজকের নামাজের সময়সূচি—১১ ডিসেম্বর ২০২৫

ইসলামিক ডেস্কঃ আজ বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২, ১৯ জমাদিউস সানি ১৪৪৭।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু – ১১টা ৫৫ মিনিট।

আসরের সময় শুরু – ৩টা ৩৬ মিনিট।

মাগরিব – ৫টা ১৬ মিনিট।

এশার সময় শুরু – ৬টা ৩৪ মিনিট।

আগামীকাল ফজর শুরু – ৫টা ১৫ মিনিটে।

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত – ৫টা ১১ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় – ৬টা ২৭ মিনিটে।




দ্বিনের সঠিক জ্ঞান পেতে আলেমদের শরণে যেতে হবে

ইসলামিক ডেস্কঃ মুসলিম সমাজ আলেমদের দ্বারা নানাভাবে উপকৃত হয়। তাদের দ্বারা সমাজের চারিত্রিক, আত্মিক, ধর্মীয় ও জ্ঞানগত চাহিদা পূর্ণ হয়। তাদের দ্বারা ইসলামী বিশ্বাস ও সামাজিক মূল্যবোধ, ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক বন্ধন, ইসলামী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য টিকে থাকে। এ জন্য যে মুসলিম সমাজে আলেম ও ইমামদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়, সে সমাজের মানুষ আত্মিক ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে, ভালো কাজের উদ্দীপনায়, সুপথ অনুসরণে এগিয়ে যায়।

আলেমদের কাছে আছে কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞান। তাদের সংস্পর্শে মানুষ খুঁজে পায় নিজের আসল পরিচয়। শিখতে পারে আল্লাহর বিধি-বিধান। জানতে পারে হালাল-হারাম। তাদের সংস্পর্শে এসেই অন্ধকারজগতের মানুষ সন্ধান পায় আলোকিত জীবনের। মৃত হৃদয়গুলো হয় পুনরুজ্জীবিত। দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে উন্মত্ত মানুষ আখিরাতমুখী জীবন ধারণ করে। তারা পৃথিবীর জন্য রহমত।

তারা উম্মতের জন্য বরকত। পরমহিতৈষী ও মঙ্গলকামী। তাদের কাছে ইসলাম সবার আগে।

আলেম ও জাহেলের মধ্যে পার্থক্য : ইলম আল্লাহ প্রদত্ত এক অফুরন্ত নিয়ামত, যা জ্ঞানী ও মূর্খদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন! যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান?’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৯)

তিনি অন্যত্র বলেন, ‘বলুন! অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান হতে পারে? আলো ও অন্ধকার কি এক হতে পারে?’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ১৬)

আলেমরা আল্লাহর একত্ববাদের রাজসাক্ষী : আল্লাহ তাআলা আলেমদের বানিয়েছেন নিজ একত্ববাদের অন্যতম সাক্ষী হিসেবে।

ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। ফেরেশতারা এবং ন্যায়নিষ্ঠ আলেমরাও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮)

আলেমরাই কোরআনের সঠিক ব্যাখ্যা বুঝতে সক্ষম : মহান আল্লাহ মানবতার হেদায়েতের জন্য কোরআন নাজিল করেছেন। কিন্তু এই কোরআন সবাই অনুধাবন করতে পারে না। শুধু আলেমরাই সঠিকভাবে কোরআন অনুধাবন করতে সক্ষম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই তোমার প্রতি এই কিতাব নাজিল করেছেন। যার মধ্যে কিছু আয়াত আছে মুহকাম বা সুস্পষ্ট অর্থবোধক। আর এগুলো হলো কিতাবের মূল। আর কিছু আয়াত রয়েছে মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট অর্থবোধক। অতঃপর যাদের অন্তরে বক্রতা আছে, তারা অস্পষ্ট আয়াতগুলোর পেছনে পড়ে ফিতনা সৃষ্টির জন্য এবং তাদের মনমতো ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য। অথচ এগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আর গভীর জ্ঞানীরা বলে, আমরা এগুলোতে বিশ্বাস স্থাপন করলাম। সব কিছু আমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে এসেছে। প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানীরা ছাড়া কেউ উপদেশ গ্রহণ করে না।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৭)

দ্বিন শেখানো আলেমের দায়িত্ব : মানুষকে দ্বিন শেখানো আলেমদের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব আল্লাহ আলেমদের ওপরই ন্যস্ত করেছেন। সাধারণ মানুষ আলেমদের কাছ থেকে দ্বিন শিখে তা মানুষের মধ্যে প্রচার করবে।

ইরশাদ হয়েছে, ‘মুমিনদের সবাই একসঙ্গে অভিযানে বের হওয়া সংগত নয়, তাদের প্রত্যেক দলের এক অংশ বের হয় না কেন, যাতে তারা দ্বিন সম্পর্কে জ্ঞানানুশীলন করতে পারে এবং তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে, যখন তারা তাদের কাছে ফিরে আসবে যাতে তারা সতর্ক হয়।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১২২)

দ্বিনি বিষয়ে আলেমদের অনুসরণ করতে হবে : কোরআনে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যের সঙ্গেই আলেমদের আনুগত্য করার  নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, অনুসরণ করো রাসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বসম্পন্ন (ন্যায়পরায়ণ শাসক ও আলেম) তাদের।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৯)

দ্বিনি বিষয়ে আলেমদের দ্বারস্থ হতে হবে : পৃথিবীর মানুষকে কখনো না কখনো আলেমের মুখাপেক্ষী হতে হয়। আমল বাস্তবায়নের জন্য আলেমদের থেকে জ্ঞান লাভ করা জরুরি। যেকোনো শরয়ি সমস্যা নিরসনে তাঁদের দ্বারস্থ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা নিজেই।

তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘অতএব, জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো, যদি তোমাদের জানা না থাকে।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৪৩)

আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী : আলেমদের অস্তিত্ব ছাড়া কোনো মুসলিম সমাজের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। প্রতিটি মুসলিম সমাজে দ্বিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ও আলেমরা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। তাদের সংগ্রাম ও সান্নিধ্যে বদলে যায় জীবন। যেমন বদলে যেত নবী-রাসুলদের সান্নিধ্যে।

এ জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী। তাঁরা কোনো স্বর্ণমুদ্রা বা রৌপ্যমুদ্রার উত্তরাধিকার রেখে যান না, তাঁরা রেখে যান জ্ঞানের উত্তরাধিকার।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৩৬৪১)

আলেম ব্যক্তিই সালাতের ইমাম হবেন : সালাতে ইমাম হওয়া একটি সম্মানের বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)সহ সাহাবিদের যোগ্য ব্যক্তিরা ইমামতি করেছেন। আর ইমাম হওয়ার জন্য দ্বিনি জ্ঞানে পারদর্শীরাই বেশি হকদার।

আবু মাসউদ আনসারি (রা.)-কে বলতে শুনেছি, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোরআন তিলাওয়াতে বেশি পারদর্শী সে লোকদের ইমামতি করবে। যদি কোরআন পাঠে সবাই সমান হয়, তাহলে যে ব্যক্তি বেশি হাদিস জানে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৫৮২; তিরমিজি, হাদিস : ২৩৫)

আলেমরাই বিবেকসম্পন্ন হয়ে থাকেন : আল্লাহ বলেন, ‘এসব দৃষ্টান্ত আমরা বর্ণনা করি মানুষের জন্য। অথচ তা কেউ অনুধাবন করে না, জ্ঞানীরা ছাড়া।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৩)

আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে তাদের আলেম বলেছেন, যারা আল্লাহ ও রাসুল বর্ণিত দৃষ্টান্ত বোঝে। আমর ইবনে মুররা বলেন, আমি যখন এমন কোনো আয়াতে পৌঁছি, যা আমার বোধগম্য নয়, তখন মনে খুব দুঃখ পাই। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘এসব উদাহরণ আমি মানুষের জন্য দিই, শুধু জ্ঞানীরাই তা বোঝে।’




আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় ১০ নেক আমল

ইসলামিক ডেস্কঃ মানবজীবনের প্রকৃত সফলতা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করা। তাই একজন মুমিনের প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি কাজই হওয়া উচিত সেই মহান সন্তুষ্টির সন্ধানে নিবেদিত। কিন্তু কোন কোন কাজ আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়—এ প্রশ্নটি যুগে যুগে প্রত্যেক ঈমানদারের হৃদয়ে অনুরণিত হয়েছে। যার মাধ্যমে একজন বান্দা সহজ, সুন্দর ও শুদ্ধভাবে তার রবের নৈকট্য অর্জন করতে পারে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার আলোক পথে অগ্রসর হতে পারে।

১. নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা
নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও উত্তম আমল। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) বলেন, ‘আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম : কোন আমল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়? তিনি জবাব দিলেন—নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায় করা। আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম : তারপর কোনটি? তিনি বললেন, তারপর মাতা-পিতার সঙ্গে সদয় আচরণ করা। আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, তারপর আল্লাহর পথে জিহাদ করা।

(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৯৫)

২. পিতামাতার প্রতি সদয় হওয়া
আল্লাহ তাআলা মাতা-পিতার প্রতি সদয়তার নির্দেশকে তাঁর একত্ববাদের (তাওহিদ) পরপরই উল্লেখ করেছেন। তিনি মাতা-পিতার প্রতি কৃতজ্ঞতাকে নিজের প্রতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন। আল্লাহ বলেন : ‘আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক কোরো না; আর মাতা-পিতার সঙ্গে সদয় হও।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৬)
তিনি আরো বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন যে তোমরা তাঁর বাইরে কারো ইবাদত করবে না এবং মাতা-পিতার সঙ্গে সদয় থাকবে।
তাদের একজন বা উভয়েই যদি বার্ধক্যে তোমার কাছে পৌঁছে যায়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বোলো না, তাদের ধমক দিয়ো না, বরং তাদের সঙ্গে সম্মান ও কোমলভাবে কথা বোলো।’
(সুরা : ইসরা/বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৩)

৩. সৎকর্মে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা
ছোট আমল হলেও যদি তা নিয়মিতভাবে করা হয়, তবে তার মূল্য আল্লাহর কাছে অনেক বেশি। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো সেই আমল, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।’
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭৮৩)
তাই একজন মুসলমানের জন্য সৎকর্মে স্থির থাকা এবং তা নিয়মিতভাবে করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৪. কোরআন তিলাওয়াত করা
কোরআন তিলাওয়াত করা, মুখস্থ করা, গভীরভাবে এর অর্থ ও মর্মার্থ নিয়ে চিন্তা করা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা—এসবের মাধ্যমে একজন মুসলিম দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর কাছে উচ্চ মর্যাদা লাভ করে।
আনাস ইবন মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘মানুষদের মধ্যে কিছু বিশেষ মানুষ আছে, যারা আল্লাহর নিকটবর্তী।’ সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, তারা কারা?’ তিনি বলেন, ‘তারা হলো কোরআনের লোকেরা—আল্লাহর লোক এবং আল্লাহর বিশেষ মনোনীত বান্দা।’
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৭৯)

৫. রাস্তা থেকে ক্ষতিকারক জিনিস অপসারণ করা
সমাজ ও মানুষের উপকারে আসে এমন কাজ করা ইসলামে অত্যন্ত মহৎ আমল। তার মধ্যে অন্যতম হলো রাস্তা থেকে ক্ষতিকারক বা বিরক্তিকর জিনিস দূর করা। এটি জান্নাতে প্রবেশের কারণ হিসেবেও বর্ণিত হয়েছে। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আমি এক ব্যক্তিকে জান্নাতে আনন্দ করতে দেখলাম, কারণ সে রাস্তা থেকে একটি কাঁটাযুক্ত ডাল বা গাছ অপসারণ করেছিল, যা মানুষের ক্ষতি করছিল।’
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৪)

৬. আল্লাহর পথে দাওয়াত
আল্লাহর দিকে মানুষকে আহবান করা, ইসলামের বার্তা প্রচার করা এবং ছড়িয়ে দেওয়া—আল্লাহর কাছে অত্যন্ত সম্মানজনক ও প্রিয় আমলগুলোর একটি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর কথায় তার চেয়ে উত্তম কে হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে ডাকে, সৎকর্ম করে এবং ঘোষণা করে ‘নিশ্চয়ই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ৩৩)

৭. বিপদগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাকে অবকাশ দেওয়া
যে ব্যক্তি আর্থিক কষ্টে আছে, যে ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম, তার প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা ইসলামে অত্যন্ত মহৎ গুণ। নবী করিম (সা.) বিপদগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাকে সময় দেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবন আবি কাতাদাহ (রা.) বলেন, আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি—‘যে ব্যক্তি চায় যে আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিনের বিপদ ও কষ্ট থেকে রক্ষা করুন, সে যেন কোনো বিপদগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা ব্যক্তিকে অবকাশ দেয় অথবা তার ঋণ মাফ করে দেয়।’
(মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২২৫৫৯)

৮. মানুষের উপকার করা
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন যে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় তারা, যারা মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে। আর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো কোনো মুসলিমকে আনন্দ দেওয়া, তার কষ্ট দূর করা, তার ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া অথবা ক্ষুধার সময় তাকে আহার করানো।’
(তবারানি, হাদিস : ৬০২৬)

৯. আল্লাহর স্মরণ (জিকির) করা
আল্লাহর স্মরণ পাপ মোচনের পথ, হৃদয়ের প্রশান্তি, তাকওয়া বৃদ্ধি এবং মর্যাদা উন্নীত করার অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যারা পুরুষ, আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে এবং যারা নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে—আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহান প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।’
(সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৫)
মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহর কাছে কোন আমলটি সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বলেন, ‘এভাবে মৃত্যুবরণ করা যে তোমার জিহ্বা আল্লাহর স্মরণে সিক্ত থাকবে।’
(সুনানে বায়হাকি, হাদিস : ৫১৬)

১০. রাতে ইবাদত করা ও নফল রোজা রাখা
রাতের বেলা ইবাদত করা এবং নফল রোজা রাখা—উভয়ই আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় আমল। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) আমাকে বললেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় রোজা হলো দাউদ (আ.)-এর রোজা; তিনি এক দিন রোজা রাখতেন এবং পরদিন রোজা ভাঙতেন। আর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় সালাত হলো দাউদ (আ.)-এর নামাজ; তিনি রাতের অর্ধেক অংশ ঘুমাতেন, এরপর এক-তৃতীয়াংশ সময় তাহাজ্জুদ পড়তেন এবং শেষ এক-ষষ্ঠাংশ ঘুমাতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৩১) এ দুটি মহৎ অভ্যাস—রোজা ও রাতের ইবাদত বান্দাকে তার প্রভুর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করে।




ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে সুশাসনের গুরুত্ব ও ফলাফল

ইসলামিক ডেস্কঃ একটি দেশে সুশাসন প্রবর্তন হওয়া ওই দেশের মানব সমাজের স্থিতি, শান্তি ও উন্নতির প্রধান ভিত্তি। আইনের শাসন, দায়িত্বশীল সরকার ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সুশাসন অতি জরুরি। দেশ ও সমাজের নেতৃত্বে ন্যায়, সততা ও জবাবদিহিতা অনুপস্থিত হলে কোনো সভ্যতাই টেকসই হতে পারে না। তাই ইসলাম সুশাসনকে কেবল রাজনৈতিক পরিভাষা হিসেবে নয়, বরং ধর্ম ও নৈতিকতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে সুশাসন হলো এমন এক নেতৃত্ব ব্যবস্থা, যা মানুষের ন্যায়নীতি রক্ষা করবে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে এবং সমাজকে নৈতিকতার পথে পরিচালিত করবে।

কোরআনে করিমের নির্দেশনা : কোরআনে করিমে সুশাসনের প্রতি স্বচ্ছ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। কোরআন সুশাসনের প্রথম ও অপরিহার্য শর্ত হিসেবে আমানত রক্ষার কথা উল্লেখ করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার প্রকৃত অধিকারীর কাছে পৌঁছে দেবে এবং যখন মানুষের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনা করবে, ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে।’ (নিসা-৫৮)

এই আয়াত সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় ক্ষমতা, নেতৃত্ব, দায়িত্ব- সবই আমানত। ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পদ বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। নেতৃত্বের মূল তত্ত্ব হলো ন্যায়বিচার। ব্যক্তি বিশেষ, দল বা গোষ্ঠী ন্যায় বিচারের মাধ্যম নয়। বরং ন্যায়বিচার হলো সমগ্র সমাজের অধিকার। অন্যত্র উল্লেখ আছে, ‘কোনো জাতির প্রতি নিজেদের বিদ্বেষ তোমাদের ন্যায়পরায়ণতা থেকে বিরত রাখবে না; ন্যায় কর, এটাই তাকওয়ার নিকটবর্তী।’ (মায়েদাহ-৮)

এ আয়াতে ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও দলীয় সবক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতার বাধ্যবাধকতা তুলে ধরে- যা সুশাসনের মৌলিক শর্ত।

হাদিসের নির্দেশনা : রসুলুল্লাহ (সা.) অগণিত হাদিসে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা ও সুশাসনভিত্তিক নেতৃত্বের গুরুত্ব উল্লেখ করেছেন। বর্ণনা করেছেন এর যথার্থ মর্যাদা। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্ববান এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, মুসলিম) এ ঘোষণায় ইসলাম নেতৃত্বকে জবাবদিহির অঙ্গনে স্থাপন করেছে। নেতৃত্ব মানে প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতায়ন নয়; বরং আমানত রক্ষা এবং মানুষের হক আদায়ের দায়িত্ব। ন্যায়পরায়ণ নেতাদের মর্যাদা সম্পর্কে রসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যারা ন্যায়ের সঙ্গে শাসন করে, আল্লাহর কাছে তারা নূরের মিম্বরে অবস্থান করবে।’ (সহিহ মুসলিম) হাদিসের এ বাণী প্রমাণ করে, ন্যায়ভিত্তিক সুশাসন দুনিয়ার শান্তি যেমন নিশ্চিত করে, তেমনি পরকালীন পুরস্কারের পথও উন্মুক্ত করে।

ইতিহাসে সুশাসনের বাস্তবতা : ইসলামি ইতিহাসে সুশাসনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনব্যবস্থা মানবসভ্যতার ইতিহাসে সুশাসনের অসাধারণ উদাহরণ। বিশেষত হজরত উমর (রা.)- যিনি তাঁর শাসনামলে ন্যায়, সত্য ও মানবিকতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড স্থাপন করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি- ‘যদি মরুভূমির পথে একটি কুকুরও ক্ষুধায় মারা যায়, আল্লাহ উমরের কাছেই জিজ্ঞাসা করবেন।’ এ বক্তব্য কোনো রাজনৈতিক নীতি নয়; বরং সুশাসনের গভীরতম মানবিক দর্শন। এ ছাড়া হজরত আলী (রা.) তাঁর প্রশাসনিক চিঠিতে গভীরভাবে উল্লেখ করেছেন নেতৃত্বের মূলে আছে দয়া, ন্যায় ও জনকল্যাণ। অত্যাচার নয়, পক্ষপাত নয়।

সুশাসনের অভাবে করুণ পরিণতি : যখন দেশ ও সমাজে ন্যায়বিচার বিলীন হয়, বিচারব্যবস্থা পক্ষপাতদুষ্ট হয় এবং নেতারা জবাবদিহি হারান, তখন সমাজে অস্থিরতা, অবিচার ও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে। আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘সতর্ক হও- একটি বিপর্যয় এলে তা শুধু অত্যাচারীদেরই নয়; বরং সবাইকে গ্রাস করবে।’ (আনফাল-২৫) সমাজে অন্যায় প্রতিষ্ঠিত হলে তার ক্ষতি সম্পূর্ণ জাতিকেই ভোগ করতে হয়- ইসলামের এ সতর্কবাণী আজও সত্য ও প্রযোজ্য। সুশাসনের ফল-সমৃদ্ধি, শান্তি ও নৈতিক উন্নতি। ইসলাম মানবসমাজকে ন্যায়ভিত্তিক সুশাসনের মাধ্যমে একত্র করে। এর ফলাফল তিনভাবে প্রকাশ পায়-

১. সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা : ন্যায়বিচার হলে মানুষ নিরাপদ বোধ করে, অপরাধ কমে, আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।

২. রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নতি : গবেষণায় দেখা যায় যেসব দেশে নেতৃত্ব স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক, সেখানে অর্থনীতি দ্রুত উন্নত হয় এবং দুর্নীতি কমে।

৩. মানুষের নৈতিক উন্নতি : সুশাসন মানুষকে নৈতিকতার পথে পরিচালিত করে; অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে। ফলে সমাজে সহযোগিতা, দয়া, মানবিকতা ও ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধি পায়।




অসুস্থ সাদ (রা.)-এর খোঁজখবর নিতে গিয়ে মহানবী (সা.)-এর নসিহত

ইসলামিক ডেস্কঃ ইসলামের ইতিহাসে কাফিরদের দিকে সর্বপ্রথম তীর নিক্ষেপকারী, আশারায়ে মুবাশ্শারার মধ্যে সর্বশেষ ইন্তেকালকারী সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)। তাঁর উপনাম আবু ইসহাক। পিতার মূল নাম মালিক ইবনে উহাইব; তবে প্রসিদ্ধ আবু ওয়াক্কাস। মা হামনাহ বিনতে সুফয়ান ইবনে উমাইয়া ইবনে আবদে শামস।

মক্কার বিখ্যাত ‘কুরাইশ’ গোত্রের ‘বনু জুহরা’ শাখার সন্তান। (আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা : ৩/১০১)

তিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির একজন এবং তৃতীয় খলিফা নির্বাচনের জন্য ওমর (রা.) কর্তৃক গঠিত ৬ সদস্যবিশিষ্ট শূরা-কমিটির অন্যতম সদস্য। তিনি একজন বীর যোদ্ধা, অশ্বচালক। শীর্ষস্থানীয় অনুসৃত ব্যক্তিত্বের অধিকারী।

মুসতাজাবুদ দাওয়াত (যার দোয়া অবশ্যই কবুল হয়)। মাদাইন-বিজেতা। কূফা নগরীর রূপকার এবং সে-নগরীর পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় খলীফার নিযুক্ত গভর্নর। অবশ্য, উভয় খলীফা তাঁকে (তাঁর দোষে নয়, ভিন্ন কারণে) বরখাস্ত করেন। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৮/৭২)

মহানবী (সা.)-এর প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ও ভালোবাসা ছিল অত্যন্ত গভীর। একদা রাতের বেলা রাসুল (সা.) কোনো এক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনকালে এমন এক জায়গায় অবস্থান করলেন, যেখানে শত্রুপক্ষের আক্রমণের আশঙ্কা ছিল প্রবল। তাই প্রিয় নবী (সা.) দীর্ঘ সময় নিদ্রাহীন জেগে থাকলেন। অবশেষে ইরশাদ করলেন, যদি আমার সঙ্গীদের মধ্যে কোনো সৌভাগ্যবান এই রজনীতে পাহারাদারির জন্য প্রস্তুত থাকত (তবে খুব ভালো হত)! আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) এ কথা শেষ করতে না করতেই অস্ত্রের ঝনঝনানি কানে ভেসে এল। রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, কে? সাদ (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আজ রাত আমি আপনার পাহাদারির জন্য প্রস্তুত।

অতপর রাসুল (সা.) ঘুমিয়ে পড়লেন। সাদ (রা.) প্রিয় নবীকে পাহারা দিলেন। রাসুল (সা.) তাঁর জন্য প্রাণ ভরে দোয়া করলেন। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৮/৭৩)

মহানবী (সা.)-ও তাঁকে ভালোবাসতেন। একবার সাদ (রা.) হুনাইন যুদ্ধের সময় মক্কায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাসুল (সা.) জিইররানা থেকে ওমরাহর ইহরাম করার পর তাঁকে দেখতে যান। তখন তিনি রাসুল (সা.)-কে বললেন, হে আল্লাহর! যে-দেশ থেকে আমি হিজরত করেছি, তাতে আমি মৃত্যুর আশঙ্কা করছি। আপনি আমার জন্য দোয়া করুন, আল্লাহ যেন আমাকে দ্রুত আরোগ্য দান করেন। রাসুল (সা.) তাঁর সুস্থতার জন্য তিন বার দোয়া করলেন। অতপর তিনি রাসুল (সা.)-কে ওসিয়ত করে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার অনেক সম্পদ আছে। ওয়ারিস বলতে আমার কেউ নেই একটি মাত্র মেয়ে ছাড়া। আমি কি তার দুই তৃতীয়াংশ সদকার অসিয়ত করতে পারি? ইরশাদ করলেন, না। বলেন, তাহলে অর্ধেকের? ইরশাদ করলেন, না। বলেন, তাহলে এক তৃতীয়াংশের? ইরশাদ করলেন, তৃতীয়াংশ! তাও তো অনেক। তবে মনে রেখো! তুমি তোমার সন্তানকে মানুষের কাছে হাত পাতার মতো হতদরিদ্র অবস্থায় রেখে যাওয়া অপেক্ষা তাদের স্বনির্ভর রেখে যাওয়াই উত্তম। এরপর রাসুল (সা.) এর দোয়ায় তিনি সুস্থ হন এবং আরও ৪৭ বছর হায়াত লাভ করেন। (আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা : ৩/১০৭—১০৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৩/৮২)




জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশে মুসলমানদের অগ্রগণ্য ভূমিকা

ইসলামিক ডেস্কঃ ইসলামের প্রথম বাণী ‘ইকরা’ বা পড়ো। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে মক্কার হেরা গুহায় জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে অনুরণিত হয়েছিল এ বাণী। সে ঐশী ধ্বনিই মুসলিমদের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার প্রথম অনুপ্রেরণা। কাল-কালান্তরে এই একটিমাত্র শব্দতরঙ্গ জ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞান গবেষণায় মুসলিমদের উতলা করে তুলেছে।

ইসলাম জ্ঞানচর্চায় যেটুকু গুরুত্বারোপ করেছে পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্ম ও মতবাদ এতটা গুরুত্বারোপ করেনি। ইলম বা জ্ঞানের গুরুত্বে ও মাহাত্ম্যে কোরআন ও হাদিসে প্রচুর উদ্ধৃতি রয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয়তম রাসুল (সা.)-কে শিখিয়েছেন জ্ঞান বৃদ্ধির দোয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আপনি বলুন—হে আমার প্রভু, আপনি আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন।’(সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১১৪)

প্রতিটি মুসলিম নর-নারীকে জ্ঞানার্জনে উদ্বেলিত করতে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ইলম তথা জ্ঞানার্জন প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৪)

রাসুল (সা.) জ্ঞানার্জনের চেতনা মুসলিমদের মধ্যে এমনভাবে জাগিয়ে তুলেছিলেন যে তরুণ, বৃদ্ধ ও নর-নারী সবাইকে জ্ঞানচর্চার চেতনায় উজ্জীবিত করে দিয়েছিল। ফলে তাঁরা শুধু একটি হাদিসের জন্য এক মাসের পথ পাড়ি দিয়ে মদিনা থেকে সুদূর সিরিয়ায় গমন করতেও পিছপা হতেন না। জ্ঞানের জন্য তাঁরা আন্দালুস বা স্পেন থেকে খোরাসান পর্যন্ত চষে বেড়াতেন।

রাসুল (সা.) থেকে জ্ঞানাহরণের জন্য পালাক্রমে একজন সাহাবি সাংসারিক কাজকর্ম করতেন, আরেকজন রাসুল (সা.) থেকে জ্ঞান আহরণ করে অপরজনকে জানাতেন। আবু হুরায়রা (রা.) খেয়ে না খেয়ে রাসুল (সা.) থেকে জ্ঞানাহরণের জন্য মসজিদে নববীর একপাশে দিনাতিপাত করতেন। এভাবে ইলমচর্চার ফলে জাহিলিয়াতের নিকষ অন্ধকারে নিমজ্জিত একটি জাতিকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমগ্র বিশ্বের অনুকরণীয় এক বিস্ময় জাতিতে পরিণত করেছিল।

মুসলিমরা কোরআনের তাফসির, হাদিস ও তার ব্যাখ্যা, সাহিত্য ও অলংকারশাস্ত্র, ভাষাবিজ্ঞান, ফিক্বাহ শাস্ত্রসহ অন্যান্য ধর্মদর্শনে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি জাগতিক সব বিদ্যায় বিস্ময়কর অবদান রেখেছেন ও রাখছেন। আবহাওয়াবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, আইনবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ববিজ্ঞান, রসায়নবিদ্যা, গণিতশাস্ত্র, দর্শনশাস্ত্র, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, শিল্প ও সাহিত্য সব ক্ষেত্রে মুসলিমদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় তাদের পদচারণ ছিলো সরব ও সফল।

অস্ত্রোপচার বিদ্যায় আবুল কাসেম জাহরাভির ‘আত-তাসরিফ’, চোখের ব্যাধি ও তার উপশমে আবুল কাসেম মাওসিলির ‘আল মুন্তাখাব ফি ইলাজিল উয়ুন’, রসায়নে জাবের বিন হায়্যানের ‘কিতাবুর রহমাত’, ‘কিতাবুত-তাজমি’, ‘সুন্দুকুল হিকমা’ ও ‘রিসালাহ ফিল কিমিয়া’, বিজ্ঞানী রাজীর ‘কিতাবুল হাজার’, ‘কিতাবুল আকসীর’, ‘কিতাবুদ-তাদবীর’, ইবনে আব্দুল মালেক আল-খাওয়ারেজমি আল-কাসির ‘আয়নুস-সানাহ’, জ্যোতির্বিদ্যায় আল-বাত্তানির ‘কিতাবুল জিজ’, আবু মাশার আল জাফরের ‘জিজ আবি মাশার’, মহাবিজ্ঞানী আল-বিরুনীর ‘কানুনে মাসউদি’, বীজগণিতে উমর খৈয়ামের ‘কিতাবুল জাবর’, আল-কারখির ‘আল-কাফি ফিল হিসাব’, অ্যালজেব্রাখ্যাত মুসা আল-খাওয়ারিজমীর ‘হিসাবুল জাবরি ওয়াল মুকাবালাহ’, চিকিৎসাবিদ্যায় আবু আলী ইবনে সিনার ‘আল কানুন ফিত-তিব’, আলী ইবনে রাব্বানের ‘ফিরদাউসুল হিকমাহ’, বিজ্ঞানী রাজীর ‘আল-কিতাবুল মানসুরি’, ‘আল কিতবুল হাভি’, ‘আল জুদারী ওয়াল হাসবাহ’, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ফারাবির ‘সিয়াসাত’ ‘আরা’, ইবনে খালদুনের ‘মুকাদ্দামা’, ইতিহাসশাস্ত্রে কালবীর ‘জামহারাতুন-নাসাব’, ওয়াকেদির ‘আল-মাগাজি’, বালাচজুরির ‘ফুতুহুল বুলদান’, ইমাম তাবারির ‘তারিখুল রুসুল ওয়াল-মুলুক’, আরবের হিরোডাটাসখ্যাত আল-মাসউদির ‘মিরআতুয-জামান’, ইমাম জাহাবির ‘তারিখুল ইসলাম’, ইমাম ইবনে আসাকিরের ‘তারিখে মদিনাতে দিমাশক’, স্পেনীয় মনীষী ইবনে খালদুনের ‘তারিখে ইবনে খালদুন’সহ মুসলিমদের শতসহস্র জ্ঞানগ্রন্থ জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলিমদের উজ্জ্বল স্মারক বহন করে চলছে। হিরকখণ্ডতুল্য এসব গ্রন্থ আধুনিক সভ্যতার দিকপালে পরিণত হয়েছে।

এসব জ্ঞানগ্রন্থ আরবি থেকে লাতিন ও ইংরেজিতে অনূদিত হওয়ার পর জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। (বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, মুহাম্মাদ নুরুল আমীন)

সুতরাং মুসলিমরাই বিশ্বসভ্যতার প্রথম ও প্রকৃত দীপাধার। আজকের আধুনিক বিশ্বের উন্নতি ও চোখ-ধাঁধানো উৎকর্ষের নেপথ্যে রয়েছে মুসলিম মনীষীদের অদম্য জ্ঞানসাধনা ও নিরলস বিদ্যাচর্চা। এ কথা পাশ্চাত্য ও ইউরোপের বহু গবেষক অকপটে স্বীকার করেছেন। যেমন—বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ কার্লাইল লেখেন, ‘আরবরা ছিল মরুচারী বেদুইন। যুগ যুগ ধরে তারা ছিল অবহেলিত। এরপর যখন তাদের মধ্যে একজন নবীর আবির্ভাব ঘটল, তখন তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হলো। স্বল্পতার পর আধিক্যতা লাভ করল। অবহেলিত হওয়ার পর বিশ্বে মর্যাদাপূর্ণ আসন অর্জন করল। এক শতাব্দী পার হতে না হতেই তারা তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমগ্র জাহান আলোকিত করে ছাড়ল।’