জুহদ ও দুনিয়া: নবীজির আদর্শ জীবন

ইসলামিক ডেস্কঃ আল্লাহ মানুষকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন পরীক্ষার জন্য, আর দুনিয়াকে বানিয়েছেন মানুষের জীবনযাপনের উপযোগী করে। বিশুদ্ধ বায়ুর জন্য অসংখ্য উদ্ভিদ, খাদ্যের জন্য নানান ধরনের ফল-ফসল, উপভোগের জন্য পাহাড়পর্বত, নদীনালা এবং সৌন্দর্য দেখার জন্য প্রকৃতির অগণিত নিদর্শন তিনি সৃষ্টি করেছেন। আকাশে মেঘ এনে তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন- যাতে মানুষ পান করে জীবনধারণ করতে পারে। এসব কিছুর মধ্যে লুকিয়ে আছে একটিই শিক্ষা- মানুষ যেন এসব নিয়ামতের মাধ্যমে তার স্রষ্টাকে চিনে নেয়, তাঁর আনুগত্য করে এবং কৃতজ্ঞ হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, মানুষ স্রষ্টাকে ভুলে স্রষ্টার সৃষ্টি জড় বস্তু, সম্পদ ও বিলাসবহুল জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। প্রয়োজন পূরণের জন্য পরিশ্রম করা স্বাভাবিক; কিন্তু মানুষ আজ এমন কিছুর পেছনেও ছুটছে, যা তার প্রয়োজনই নয়। জীবন যৌবন দুনিয়ার মোহে নষ্ট করছে, আবার হারানো যৌবন ফিরিয়ে আনতে সম্পদ ব্যয় করছে, যেন নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারছে। আমরা যেন ভুলেই গিয়েছি অমোঘ সেই সত্য আল্লাহ প্রতিটি মানুষের রিজিক নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। কিন্তু মানুষ সেই নির্ধারিত রিজিক নিয়ে সন্তুষ্ট না থেকে মরীচিকার মতো ক্ষণস্থায়ী জিনিসের পেছনে ছুটছে।

অথচ মানুষ দুনিয়াতে মুসাফির। একজন পথিক গাছের নিচে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে যেমন আবার যাত্রা শুরু করে, তেমনই দুনিয়া শুধু সফরের বিরাম; গন্তব্য নয়। মানুষ যখন দুনিয়ার মোহে ডুবে যায়, তখন সে রবকে ভুলে সীমা লঙ্ঘন করে বসে। অথচ দুনিয়ার সৌন্দর্য, সম্পদ ও ভোগবিলাস সবই পরীক্ষা। এগুলো কখনো জীবনের আসল লক্ষ্য হতে পারে না। আল্লাহর সন্তুষ্টিই আসল লক্ষ্য। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘দুনিয়ার যেসব জাঁকজমক সামগ্রী কিছু লোককে পরীক্ষা হিসেবে দিয়েছি, তুমি তার দিকে লোভের দৃষ্টিতে তাকিও না। তোমার রবের দেওয়া রিজিকই উত্তম ও স্থায়ী।’ (সুরা ত্বাহা, আয়াত ১৩১।) অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা দুনিয়াকে চাইছ; অথচ আখিরাতই উত্তম এবং চিরস্থায়ী।’ (সুরা আলা, আয়াত  ১৬-১৭)

মনে রাখতে হবে, দুনিয়া বিমুখতা মানে দুনিয়া ত্যাগ করা নয়। এমনভাবে দুনিয়া ছাড়াও ইসলামে অনুমোদিত নয় যে পরিবারপরিজন, দায়িত্ব-কর্তব্য সব ভুলে গিয়ে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা যাবে। রাহবানিয়্যাত (বৈরাগ্যবাদ) ইসলামের শিক্ষা নয়। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন যুহদের (দুনিয়াবিমুখতা) প্রকৃত আদর্শ। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়াকে কখনো হৃদয়ে স্থান দেননি, কিন্তু হালাল দুনিয়া ব্যবহার করেছেন। তিনি বিবাহ করেছেন, পরিবারপরিজনের হক আদায় করেছেন, হালাল খাবার পছন্দ করেছেন, মধু, সুগন্ধি ও ঠান্ডা পানি পছন্দ করেছেন, আর না পেলে ধৈর্য ধরেছেন। অর্থাৎ হালাল দুনিয়া ব্যবহার, কিন্তু হৃদয়কে দুনিয়ার দাস না বানানো- এটাই জুহদ বা দুনিয়াবিমুখতা।

সুফিয়ানে কেরাম বলেন, জুহদের রয়েছে চারটি স্তর। ১. হারাম থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা। ২. মাকরুহ থেকেও বেঁচে থাকা। ৩. হালাল ভোগে সীমা না ছাড়ানো। ৪. অন্তরে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর প্রতি আসক্তি না রাখা। এটাই সর্বোচ্চ জুহদ। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে দুনিয়াবিমুখতার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুরপাতার চাটাইয়ে ঘুমাতেন, দেহে দাগ পড়ে যেত। তিনি বলতেন, ‘দুনিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী? আমি তো এক পথিক; যে গাছের নিচে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়, তারপর আবার চলতে থাকে।’ ( তিরমিযি, হাদিস ২৩৭৭।)

অন্য এক হাদিসে হজরত উমর (রা.) বলেন, একদিন তিনি দেখেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে খাবার বলতে শুধু সামান্য যব ছাড়া কিছুই নেই। রোম-ফারসি রাজারা ভোগবিলাসে মত্ত; কিন্তু আল্লাহর প্রিয় নবী দুনিয়া থেকে বিরত থাকছেন। উমর (রা.) কান্নায় ভেঙে পড়েন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘হে উমর! তুমি কি খুশি নও যে দুনিয়া তাদের জন্য, আর আখিরাত আমাদের জন্য?’ (মুসলিম, হাদিস ২৯৬৫)

অনুরূপভাবে ইবাদতেও তাঁর জুহদ প্রকাশ পায়। তিনি রাতে গোপনে, দিনে প্রকাশ্যে ইবাদত করতেন; তাকওয়া, দোয়া, কান্না- সবকিছুতেই ছিলেন উম্মতের জন্য উত্তম  আদর্শ। আমাদের জীবনও হোক এমন- দুনিয়াকে হাতে রেখে, কিন্তু হৃদয়কে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত রেখে। আমিন।




অসিয়ত সম্পর্কে ইসলামি বিধান

ইসলামিক ডেস্কঃ অসিয়ত হলো কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর কোনো কিছু করা বা হওয়ার নির্দেশনা প্রদান। কারো কারো মতে, পরবর্তী সময়ে কার্যকর করার নির্দেশসংবলিত বিশেষ উপদেশ। যেমন-আমানত পৌঁছে দেওয়া, সম্পদ দান করা, কন্যা বিয়ে দেওয়া, মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া, তার জানাজা পড়ানো, মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ বণ্টন করা ইত্যাদি অসিয়তের অন্তর্ভুক্ত।

অসিয়তের সময় দুজন সাক্ষী রাখা উচিত, যেন পরবর্তী সময়ে মতানৈক্য সৃষ্টি না হয়। সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণ অসিয়ত করা জায়েজ। এর চেয়ে বেশি অসিয়ত করা জায়েজ নয়। যেসব হক আদায় করা ওয়াজিব তার জন্য অসিয়ত করাও ওয়াজিব।

অসিয়তকারীর পক্ষে অসিয়ত কোনো চুক্তি নয়। কাজেই অসিয়ত করার পর যত দিন সে জীবিত থাকে, তত দিন তা প্রত্যাহার করার অধিকার তার থাকে। মানুষের স্বীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর তার মালিকানাস্বত্ব নেই।

তাই এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা বা অন্যের কাছে হস্তান্তর করার অধিকারও মানুষের নেই। আর অসিয়ত শুধু নিজ মালিকানাধীন সম্পদের মধ্যেই করা যায়। তাই মৃত্যু-পরবর্তী অঙ্গদানের অসিয়তের কোনো গ্রহণযোগ্যতা ইসলামে নেই। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৮১৫২, দুররুল মুখতার : ১০/৩৩৭)

যেসব লোক মুমূর্ষু ব্যক্তির মুখ থেকে কোনো অসিয়ত শুনেছে, তাদের পক্ষে সে অসিয়ত কোনো ধরনের কমবেশি করা জায়েজ নয়। গুনাহের কাজের অসিয়ত করলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং তা পূর্ণ করা যাবে না, করলে গুনাহ হবে। (রদ্দুল মুহতার : ১০/৩৯৭)




৪ ডিসেম্বর ২০২৫: আজকের নামাজের সময়সূচি

ইসলামিক ডেস্কঃ আজ বৃহস্পতিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪৩২, ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪৭।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু – ১১টা ৫২ মিনিট।

আসরের সময় শুরু – ৩টা ৩৫ মিনিট।

মাগরিব – ৫টা ১৪ মিনিট।
এশার সময় শুরু – ৬টা ৩৩ মিনিট।

আগামীকাল ফজর শুরু – ৫টা ১১ মিনিটে।

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত – ৫টা ১০ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় – ৬টা ২২ মিনিটে।




নসম্পদ ব্যবহারে ইসলামের নির্দেশনা ও করণীয়

ইসলামিক ডেস্কঃ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ধনসম্পদ ও সম্মানের অধিকারী করেন। ইচ্ছা হলেই যে কারোর সম্পদ ও সম্মান কেড়ে নেন। এ বিশ্বজগতের রাজা মহারাজা পরাক্রমশালী সম্রাটদের জীবনেরও অবসান ঘটেছে আল্লাহর ইশারায়।

দৃশ্যত যারা মহাশক্তিমান তারাও প্রভাব-প্রতিপত্তি হারিয়ে অস্তিত্বহীন হয়েছে। যারা আল্লাহতায়ালার দেওয়া নিয়ামত, সম্মান, আল্লাহর নির্দেশিত পথে পরিচালনা করেছেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাদের নাম-যশ তাঁর ইচ্ছায় অম্লান অমর হয়ে রয়েছে। এ জগতে যারা কৃতজ্ঞ চিত্তে আল্লাহর নিয়ামত ভোগ করে, আল্লাহর নির্দেশিত পথে মানবতার সেবা করে গেছেন তাদের অবদান অক্ষয়-চিরন্তন হয়ে আছে।

এ পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যত নবী-রসুল আগমন করেছেন তাঁরা চাইলে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হতে পারতেন। কিন্তু তাঁরা বিলাসবহুল জীবনের বদলে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা ও মানবতার সেবায় উদ্ভাসিত হয়েছেন। তাঁরা মহান রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে গেছেন। আল্লাহতায়ালা আমাদের ধনসম্পদ, মান-মর্যাদা ইজ্জত দান করে পরীক্ষানিরীক্ষা করেন।

আমাদের কর্তব্য- সর্বাবস্থায় তাঁর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। আল্লাহর এই বিশাল জগতের সৃষ্টিকুলকে অনিবার্য মৃত্যুর স্বাদ বিনা দ্বিধায় ভোগ করতে হবে। সবাইকে এক সময় মৃত্যুর দিকে যাওয়ার পরিণতি মেনে নিতে হবে। মৃত্যুর কোনো নির্দিষ্ট সীমা-পরিসীমা নেই। আল্লাহ যেভাবে ইচ্ছা করেন সেভাবেই বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিতে হয়। দুনিয়ায় অর্জিত সব ধনসম্পদের মায়া একদিন আমাদের পরিত্যাগ করে একেবারেই শূন্য হাতে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে।

এ বিশ্বজগৎ সম্পূর্ণভাবেই একটি অতি অপ্রশস্ত খেলার মাঠ। এ মাঠে কিছুদিন খেলাধুলা করে এক অজানা নিরুদ্দেশ গন্তব্যের দিকে যেতে হবে। সেখানে অনন্তকালের জন্য চিরস্থায়ীভাবে থাকতে হবে। এ বিশ্ব চরাচরে পড়ে থাকবে আমাদের অতি কষ্টে অর্জিত সব অমূল্য ধনসম্পদ। যা সঙ্গে নেওয়ার কোনো ব্যবস্থাই আমরা করে যেতে পারি না। এ জন্য নিয়তি আমাদের কোনো সময়ই দেয় না। আমাদের জীবন অবসানের পর রেখে যাওয়া এ সম্পদের কী অবস্থা হবে, কীভাবে ব্যয় হবে তাও আমরা বলতে পারি না।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে মহান আল্লাহতায়ালা মহাগ্রন্থ আল কোরআনের আলোকে আমাদের প্রিয় নবী মহামানব হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে সুসংবাদ প্রেরণ করেছেন যে, আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানুষের মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া তিনটি অবদান এ দুনিয়ায় বিরাজ করবে এবং পরকালেও নাজাত তথা জান্নাত লাভে সহায়তা করবে।

যেমন- ১. তোমার সন্তানকে যদি সুসন্তান করে রেখে যেতে পার তবে তারা মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে দুই হাত তুলে প্রাণভরে তোমাদের জন্য দোয়া করবে- রব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি ছগিরা। হে পরম দয়ালু আল্লাহ, আমার পিতা-মাতাকে সস্নেহে লালনপালন ও প্রতিপালন কর।

২. আল্লাহর রাস্তায় ফিসাবিলিল্লাহ হিসেবে কোনো বস্তু বা ধনসম্পদ দান করে যাওয়া যা এতিম নিঃস্ব হতদরিদ্র গরিব মিশকিন পঙ্গুদের জন্য ব্যয় হবে।

৩. মানবতার সেবাসহ সৃষ্টিকুলের জন্য কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান তৈরি বা স্থাপন করে যাওয়া, যাতে অব্যাহতভাবে পরোপকার হতে থাকবে। ইসলামের দৃষ্টিতে সৎভাবে ধনসম্পদ অর্জন বা ধনী হওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ নেই। তবে অর্জিত সম্পদ সৎভাবে সঠিক পথে ব্যয় করতে হবে।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের সমাজে দেখা যায়, আমরা বেপরোয়াভাবে হিংসা-বিদ্বেষ, জোরজবরদস্তি, লুটপাট, অন্যায়ভাবে সম্পদ আহরণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলি। এ সম্পদ জমানোর ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় দেখা যায় নিজের জমানো সম্পদ মানুষ নিজেই ভোগ করে যেতে পারে না। একান্তভাবে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাব, হাজার হাজার কোটি টাকার ধনসম্পদ থাকলেও তার মালিক শান্তিতে ঘুমাতে পারে না তার জমানো টাকার চিন্তায় এবং লোভ-লালসার প্ররোচনায়। ইচ্ছা থাকলেও পেটভরে খেতে পারে না মুখে রুচি না থাকার কারণে।

এর কারণ হলো- আমরা ধনসম্পদের প্রতি এত বেশি লোভী হয়ে পড়ি যে, লোভের বশবর্তী হয়ে খুনাখুনি করে হলেও ধনসম্পদ অর্জন করে থাকি। অন্যায়ভাবে ধনসম্পদ জমিয়ে কার জন্য রেখে যাব- তা আমরা ঘুণাক্ষরেও ভাবি না। ধনসম্পদের লোভে মানইজ্জত বিসর্জন দিতে হলেও আমরা কুণ্ঠাবোধ করি না। মৃত্যুর পর আমাদের খালি হাতেই অজানার পথে যাত্রা করতে হবে।

মূলত এ জীবনটা বড় বেশি ক্ষণস্থায়ী। এক মুহূর্তের জন্যও বেঁচে থাকার আশা করতে পারি না। তাই আমাদের সবাইকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, আমরা অন্যায়ভাবে অবৈধ পথে দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলব না। যেহেতু দিন দুনিয়ার মালিক আল্লাহ সেহেতু তাঁর ওপর আশা-ভরসা রাখতে হবে।




ভূমিকম্প আমাদের জন্য সতর্কবার্তা

ইসলামিক ডেস্কঃ ভূমিকম্প শুধুই প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। যখন আমরা ইমান সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ি, আল্লাহকে ভুলে পাপাচারে আকণ্ঠ ডুবে যাই, তখন আল্লাহ আমাদের সতর্ক করার জন্য নানা ধরনের দুর্যোগ প্রেরণ করেন। ভূমিকম্প এর অন্যতম। কোরআন থেকে আমরা জানতে পারি, আগেও অনেক জাতিকে আল্লাহ ভূমিকম্প দ্বারা শাস্তি দিয়েছেন।

মহান আল্লাহ সুরা আরাফের ৭৮ নম্বর আয়াতে বলেছেন, অতঃপর ভূমিকম্প তাদের হঠাৎ পাকড়াও করল আর তারা তাদের ঘরগুলোতে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল। এই আয়াতে আল্লাহ সালেহ (আ.)-এর উম্মতের পরিণতি বর্ণনা করেছেন। সামুদ জাতির কাছে একত্ববাদের দাওয়াত পৌঁছাতে আল্লাহ সালেহ (আ.)-কে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সামুদ জাতি তাদের নবীকে অস্বীকার তো করলই, আল্লাহর পক্ষ থেকে অলৌকিক নিদর্শন হিসেবে প্রেরিত উটনিকেও তারা হত্যা করে। যার ফলে তাদের ওপর আল্লাহ ভূমিকম্পের শাস্তি প্রেরণ করেন। লুত (আ.)-এর উম্মতের শাস্তির বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন, অতঃপর সূর্যোদয়ের সময় প্রকাণ্ড চীৎকার তাদের পাকড়াও করল। এরপর আমি জনপদকে উল্টিয়ে ওপর-নিচ করে দিলাম এবং তাদের ওপর পোড়ামাটির পাথর-কংকর বর্ষণ করলাম (সুরা হিজর)।

লুত (আ.)-এর সম্প্রদায় সমকামিতার মতো নোংরা ও জঘন্য অপকর্মে লিপ্ত হয়েছিল। সেই অপকর্মের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ উপর্যুক্ত শাস্তি প্রেরণ করেন। তাদের জনপদকে ওলটপালট করে দেন। দুঃখের বিষয় হলো, যে অপরাধের কারণে আল্লাহর ভয়াবহ গজব তাদের ওপর নাজিল হয়েছিল, সেই একই ধরনের গর্হিত কাজ আজ আমাদের সমাজে প্রকাশ্যে ঘটছে। শুধু ইসলাম ধর্ম নয়, প্রচলিত প্রতিটি ধর্মেই সমকামিতা জঘন্য অপরাধ। এমনকি দেশীয় আইনেও এটি সুস্পষ্ট শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ অধিকারের নামে রুচি ও প্রকৃতিবিরুদ্ধ সেই কাজের অনুমোদনের দাবি আজ প্রকাশ্যে করা হচ্ছে।

মনে রাখতে হবে, এমন কিছু অবাধ্যতা আছে, যা কোনো সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে গণহারে আল্লাহর গজব নেমে আসে। তাই আল্লাহর অসন্তুষ্টি ডেকে আনে, এমন সব পাপাচারের বিরুদ্ধে আমাদের প্রত্যেকের সচেতন ও সোচ্চার হওয়া অপরিহার্য।

ভূমিকম্পে আমাদের দুই ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে। এক. আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি। দুই. জাগতিক প্রস্তুতি। এতক্ষণ যা বলা হলো, তা অধ্যাত্মিক প্রস্তুতির নির্যাস। পাপের জন্য তওবা করা, পাপ থেকে বেঁচে থাকা, আল্লাহর নৈকট্যলাভের চেষ্টা করা এসবই আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির অংশ।

আর ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে যা কিছু করা হয় সেগুলো জাগতিক প্রস্তুতির অংশ। আমরা এমন এক ভৌগোলিক এলাকায় বসবাস করি, জনঘনত্ব ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এখানে প্রতিটি অট্টালিকা যেন একেকটি সম্ভাব্য সমাধিসৌধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় যদি ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে এক লাখের বেশি ভবন ধসে যেতে পারে। চিন্তা করুন, এটি কত ভীতিজাগানিয়া পূর্বাভাস! দুঃখজনক হলো, এমন ভয়াবহ ঝুঁকির বিপরীতে রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি একেবারেই অপ্রতুল। আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকর্মীর সংখ্যা নগণ্য, বড় ধরনের উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার মতো ভারী যন্ত্রপাতিও অপর্যাপ্ত। ফায়ার সার্ভিসের সীমিত সক্ষমতা দিয়ে হাজার হাজার ভগ্ন স্থাপনা সামলানো কেবলই কল্পনা। অথচ বিভিন্ন স্থাপনার নাম পরিবর্তন, ভাস্কর্য নির্মাণ বা অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্পেই নয়, নেতা-নেত্রীদের জন্য তোরণ নির্মাণ, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা, নানা ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ও ক্ষমতার প্রদর্শনীতেও বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের যে অপচয় ঘটে, তা এই অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের কাঠামোকে আরও প্রসারিত করে তোলে।

সেই অর্থের সামান্য অংশও যদি দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি, ভূমিকম্প-প্রতিরোধী প্রযুক্তি, উদ্ধার সরঞ্জাম ও দক্ষ উদ্ধারকারী বাহিনীর প্রশিক্ষণে ব্যয় করা হতো, তাহলে সেটিই হতো সবচেয়ে যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। এটি বিবেচিত হতো বর্তমানের সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে।

তবে প্রস্তুতি যেন কেবল ভৌত অবকাঠামোর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ না থাকে। জাগতিক প্রস্তুতির পাশাপাশি আমাদের আধ্যাত্মিক প্রস্তুতিও গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহর রহমত ছাড়া কোনো পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ও প্রযুক্তি নিরাপত্তা দিতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি দুর্যোগ আমাদের প্রতি সতর্কবার্তা। আমাদের সমাজের বিস্তৃত দুর্নীতি, জুলুম, অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে আমাদের গণ তওবা করা জরুরি।




আল্লাহর প্রতি ধৃষ্টতার ভয়াবহ ফলের বার্তা

ইসলামিক ডেস্কঃ মানবজীবনের মূল ভিত্তি হলো ঈমান ও আল্লাহভীতি। একজন মুসলমানের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভক্তি, সম্মান, ভালোবাসা ও ভয় সর্বোচ্চ স্থানে থাকে। কারণ আল্লাহই মহাবিশ্বের স্রষ্টা, পালনকর্তা, রিজিকদাতা ও নিয়ন্ত্রক। মানুষের সুখ-দুঃখ, জীবনের চলার পথ, মৃত্যুর পরের বিচার—সবই তাঁর হাতে। তাই আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতা প্রদর্শন করা, তাঁর মর্যাদাকে হেয় করা, তাঁর বিধানকে উপহাস করা অথবা তাঁর আদেশ অমান্য করে বিদ্রোহী আচরণ করা—এগুলো অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। কোরআন ও হাদিসে এসব অপরাধের শাস্তির বিষয়ে কঠোর বর্ণনা এসেছে।

আল্লাহর প্রতি ধৃষ্টতা কী

ধৃষ্টতা মানে হলো ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, যেখানে কেউ নিজের সীমা ছাড়িয়ে আল্লাহর মর্যাদার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, বিদ্রুপ, অপমান বা অমান্যতা প্রদর্শন করে। আল্লাহর প্রতি ধৃষ্টতা কয়েকভাবে প্রকাশ পেতে পারে—

১. আল্লাহর অস্তিত্ব, ক্ষমতা বা জ্ঞান নিয়ে ব্যঙ্গ করা।

২. আল্লাহর বিধানকে উপহাস করা।

৩. কোরআনের আয়াত বা শরিয়তের নিয়মকে বিদ্রুপ করা।

৪. গুনাহকে তুচ্ছ মনে করে প্রকাশ্য অবাধ্যতা করা।

৫. নিজেকে আল্লাহর সমকক্ষ ভাবা বা তাঁর সঙ্গে উপহাসমূলক তুলনা করা।

ইসলামের ইতিহাসে ফেরাউন, হামান, সাদ্দাদের মতো ব্যক্তিরা আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল। তাদের পরিণতি ছিল ভয়ংকর।

কোরআনে আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতার ভয়াবহ শাস্তির বর্ণনা

আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহ সম্পর্কে অহংকার করে, তাদের অবশ্যই অপমানজনক শাস্তি দেওয়া হবে।’ (সুরা : গাফির/মুমিন, আয়াত : ৬০)

আরেক আয়াতে এসেছে, ‘যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জন্য সংকীর্ণ জীবন এবং পরকালে তাকে অন্ধ অবস্থায় ওঠানো হবে।’

(সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১২৪)

ধৃষ্টতা মানুষের হৃদয়কে কঠিন করে দেয়। এমন কঠিন হৃদয়কে আল্লাহ ধ্বংসের পথে টেনে নেন। কোরআনে আরো বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর আয়াতকে যে উপহাস করে, তাদের জন্য আছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।’ (সুুরা : জাসিয়া, আয়াত : ৯)

আল্লাহর বিধানকে উপহাস করা বড় গুনাহ

কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসুলকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছিলে? তোমরা অজুহাত দিয়ো না; তোমরা ঈমান আনয়নের পর কাফিরে পরিণত হলে।’

(সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬৫-৬৬)

অর্থাৎ কেউ খোদা প্রদত্ত বিধান নিয়ে উপহাস করলে তার ঈমান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এটি এমন অপরাধ, যার শাস্তি শুধু দুনিয়ায় নয়, আখিরাতে অনন্ত জাহান্নাম।

গুনাহকে ছোট করে দেখা অন্য রকম ধৃষ্টতা

রাসুল (সা.) বলেন, ‘একসময় মানুষ এমন যুগে পৌঁছবে, যখন তারা বড় বড় গুনাহকেও ঘাসের মতো তুচ্ছ মনে করবে।’ এটাই ধৃষ্টতার আরেক রূপ। মানুষ যখন ভুলকে ‘ছোট ভুল’ বলতে শুরু করে, তখন সে আসলে আল্লাহকে অপ্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার ওপর একজন শয়তানকে কর্তৃত্ব দিই, যে তার সঙ্গী হয়ে যায়।’
(সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ৩৬)

কেন আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতা সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধ

১. এটি মানুষের ঈমান ধ্বংস করে দেয়।

২. সমাজে দুষ্কর্ম, নৈরাজ্য ও নৈতিক অবক্ষয় বাড়ায়।

৩. আল্লাহর দয়া থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে।

৪. আখিরাতে মুক্তির সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়।

৫. ইচ্ছাকৃত ধৃষ্টতা শিরক বা কুফরিতে রূপ নিতে পারে।

আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতার দুনিয়াবি শাস্তি

ধৃষ্টতার শাস্তি শুধু আখিরাতের আগুন নয়; দুনিয়ায়ও এর ভয়াবহ পরিণতি দেখা যায়; যেমন—১. হৃদয় কঠিন হয়ে যাওয়া। ২. বরকত দূর হয়ে যাওয়া। ৩. মনের অশান্তি। ৪. রিজিকে সংকীর্ণতা। ৫. জীবনে ব্যর্থতা ও বিপর্যয়। ৬. সমাজে অপমানিত হওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘যে আমার বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য করে, আমি তাকে লাঞ্ছিত করে দেব।’

মানুষ ধারণা করতে পারে যে সে ইচ্ছামতো চলছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার ওপর আল্লাহর গজব কাজ করতে থাকে নীরবে।

আখিরাতে ধৃষ্টতার ভয়াবহ শাস্তি

কোরআনে ধৃষ্টতার জন্য যেসব শাস্তির বর্ণনা এসেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুন, খাঁটি ফুটন্ত পানি পান করানো, লোহার বেড়িতে বেঁধে টেনে হাঁটানো, মুখমণ্ডল অন্ধকার হয়ে যাওয়া, হিসাবের ময়দানে লাঞ্ছনা, সর্বাত্মক হতাশা ও বঞ্চনা। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং অহংকারের সঙ্গে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তাদের জন্য আকাশের দরজাসমূহ খোলা হবে না।’

(সুরা : আরাফ, আয়াত : ৪০)

অন্য আয়াতে এসেছে, ‘সেদিন অপরাধীদের মুখে কালো কালো চিহ্ন পড়বে।’




ভূমিকম্পকে যেভাবে দেখেন ঈমানদার ও ঈমানহীনরা

ইসলামিক ডেস্কঃ ভূমিকম্পের সেই আকস্মিক ঘটনা, যা হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়, চোখে এনে দেয় আতঙ্ক এবং মুহূর্তের মধ্যে বহু প্রাণ কেড়ে নেয়—অনেকের চোখে তা শুধু একটি বস্তুবাদী ব্যাখ্যার ঘটনা! তবে এখন ঘটনা শুধু সংখ্যায় নয়, তা যেন হৃদয়ের চোখ দিয়ে দেখা যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের আগে অনেক দৃষ্টান্ত অতিবাহিত হয়ে গেছে। অতএব, পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো যারা সত্যকে অস্বীকার করেছিল তাদের পরিণতি কী হয়েছিল। এতে মানবজাতির জন্য রয়েছে একটি স্পষ্ট শিক্ষা আর আল্লাহভীরু মানুষদের জন্য রয়েছে দিকনির্দেশনা ও উপদেশ।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৭-১৩৮)

কিন্তু গাফেল, অজ্ঞ ও অবিশ্বাসীদের বৈশিষ্ট্য হলো—আল্লাহর নিদর্শন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। তা হোক কোরআনের আয়াত বা মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা কুদরতের স্পষ্ট চিহ্ন—কোনো কিছুই তাদের মনকে নাড়া দেয় না। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় ঘনিয়ে এসেছে, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে আছে। তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যখনই কোনো নবীন উপদেশ আসে, তারা তা অমনোযোগী অবস্থায় শোনে—তাদের হৃদয় তো অন্যদিকে বিভ্রান্ত থাকে।’
(সুরা : অম্বিয়া, আয়াত : ১৩)

যেকোনো ঘটনা, ইতিহাস ও বাস্তবতাকে একমাত্র বস্তুবাদী চোখে দেখা—ইহজাগতিক ধ্যান-ধারণা মানুষের স্বভাবগত বিষয়। আল্লাহ তাদের মানসিকতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আর যদি তারা আকাশের একটি টুকরা পতনশীল অবস্থায় দেখেও, তারা বলবে, ‘এ তো স্রেফ ঘন মেঘ!’  (সুরা : তুর, আয়াত : ৪৪)

একই মনোভাব আমরা দেখি ‘আদ’ জাতির ইতিহাসে। যখন তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসন্ন শাস্তির মেঘ দেখল, তারা সরলভাবে ভাবল—এটা বৃষ্টির মেঘ। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর তারা যখন দেখল যে তা তাদের উপত্যকার দিকে ধেয়ে আসছে, তারা বলল, এ তো এমন একটি মেঘ, যা আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করবে, বরং এটি সেই জিনিস, যার জন্য তোমরা তাড়াহুড়া করলে—এক প্রবল বায়ু, যাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

এটি তার প্রতিপালকের আদেশে সব কিছু ধ্বংস করে দিল, ফলে এমন হলো যে তাদের ঘরবাড়ি ছাড়া আর কিছুই দৃশ্যমান রইল না।’ (সুরা : আহকাফ, আয়াত : ২৪-২৫)

একজন মুমিন কখনো শুধু বস্তুগত কারণের ওপর নির্ভর করে না। সে কারণগুলোর স্রষ্টা, আসমান-জমিনের মালিক আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। যিনি কোনো বিষয়ের ইচ্ছা করলে কেবল বলেন—‘হও’, আর তা হয়ে যায়। মুমিন তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, যাতে নুহ (আ.)-এর পুত্রের মতো ভুল না করে।

নুহ (আ.) যখন তাকে বলেন, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র! আমাদের সঙ্গে ওঠে এসো, আর কাফিরদের সঙ্গে থেকো না।’ পুত্র জবাব দিল সম্পূর্ণ বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে—‘আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানির হাত থেকে রক্ষা করবে।’ তখন নুহ (আ.) বলেন, ‘আজ আল্লাহর আদেশ থেকে কাউকে রক্ষা করার নেই, তিনি যাকে দয়া করেন তাকে ছাড়া। এরপর তাদের মাঝে ঢেউ এসে দাঁড়াল এবং সে ডুবে যাওয়া লোকদের অন্তর্ভুক্ত হলো।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৪৩)

ইহজাগতিক ধ্যান-ধারণা লোকেরা কি ভুলে গেছে—অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলে থাকার ভান করছে যে এই পৃথিবীর ভূত্বক, পর্বত, সাগর—সবই আল্লাহর আদেশেই পরিচালিত? আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করলেন, যখন তা ছিল ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। তিনি আকাশ ও পৃথিবীকে বললেন, ‘চাই স্বেচ্ছায়, চাই অনিচ্ছায়—তোমরা আসো।’ তারা বলল, ‘আমরা স্বেচ্ছায় উপস্থিত হলাম।’

(সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ১১)

তিনি আদেশ করেন আর সৃষ্টিজগৎ বিনা দ্বিধায় অনুসরণ করে। তিনি তাদের ধারণ করে রেখেছেন তাদের নির্ধারিত ভূমিকায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও জমিনকে ধরে রেখেছেন, যাতে তারা ভেঙে না পড়ে। আর যদি তারা ভেঙে পড়ত, তবে আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই যে তাদের ধরে রাখতে পারত।’

(সুরা : ফাতির, আয়াত : ৪১)

বিজ্ঞানীরা কী বলেন? তাঁরা বলেন, অপ্রত্যাশিত! কিন্তু আল্লাহর কাছে কিছুই অপ্রত্যাশিত নয়। কেমন যেন আল্লাহ তাআলা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন সেই অত্যাচারীর দিকে, যার নাম ছিল কারুন। আল্লাহ যখন তাকে বিপুল সম্পদ দান করেছিলেন, সে অকৃতজ্ঞ হয়ে বলেছিল, ‘আমি তো এগুলো পেয়েছি আমার নিজ জ্ঞানের কারণে!’ এ ছিল তার অহংকার, তার অজ্ঞতা। ফলে শাস্তি ছিল অনিবার্য—‘অতঃপর আমরা তাকে ও তার গৃহকে ভূগর্ভে ধ্বংস করে দিলাম। আল্লাহ ছাড়া তার কোনো দল তাকে সাহায্য করতে পারেনি এবং সে নিজেও আত্মরক্ষা করতে সক্ষম ছিল না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৮১)

আজ আমাদের ওপর যা ঘটেছে, যার জন্য ভূমিকম্পবিদরা এখনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা খুঁজে পাননি, তা নিছক আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের কর্ম, আমাদের নৈতিক অবক্ষয় এবং আল্লাহর আইনকে উপহাস করার পরিণতির দিকেই ইঙ্গিত করে—সুদকে বৈধ করা, মদকে সাংস্কৃতিক আড়ালে প্রমোট করা, ইসলামী আইনকে উপহাস করা, আল্লাহর আয়াতের সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা—এসব কি শাস্তিকে আহবান করার মতো কাজ নয়? আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কত শহর ছিল যারা তাদের পালনকর্তা ও তাঁর রাসুলদের আদেশ অমান্য করেছিল। আর আমরা তাদের কঠোর হিসাবের মুখোমুখি করেছি এবং ভয়াবহ শাস্তি দিয়েছি। ফলে তারা তাদের কর্মের মন্দ ফল ভোগ করেছে এবং তাদের পরিণতি হয়েছে সম্পূর্ণ ধ্বংস।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৮৯)

শাস্তি শুধু জালিমদের ওপর আসে না, এটি সামাজিক পরীক্ষাও বটে! আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা এমন এক ফিতনাকে ভয় করো, যা শুধু তোমাদের মধ্যের জালিমদের ওপরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২৫)

অতএব, সমাজে যখন পাপ, অন্যায়, অশ্লীলতা, দুর্নীতি, দুরাচার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, তখন শাস্তি শুধু অপরাধীদের ওপর নয়, বরং পুরো সমাজের ওপর এসে পড়ে।

পাপাচার তো পশ্চিমে আরো বেশি, তবু তাদের কিছু হয় না—এই আপত্তির জবাব অনেকে বলে থাকে, ‘আমেরিকা ও ইউরোপের মতো দেশগুলোতে নৈতিক অবক্ষয় আমাদের চেয়ে বহুগুণ বেশি। তবু তাদের তো কিছু হয় না! আমরা বলি, তাদের এই বাহ্যিক সমৃদ্ধিকে শাস্তি থেকে নিরাপত্তা ভেবে নেওয়া মারাত্মক ভুল। আল্লাহ যখন কারো প্রতি ক্রুদ্ধ হন, অনেক সময় তাঁর শাস্তি সঙ্গে সঙ্গে আসে না,

বরং আল্লাহ তাদেরকে অবকাশ দেন, যেন তারা বিভ্রান্তির মধ্যে আরো ডুবে যায় এবং পরিণামে একদিন হঠাৎ করে পাকড়াও করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা যখন যে বিষয় দ্বারা উপদেশপ্রাপ্ত হয়েছিল তা ভুলে গেল, তখন আমরা তাদের জন্য সবকিছুর দরজা খুলে দিলাম। অবশেষে যখন তারা যা পেয়েছিল তাতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল, তখন আমরা হঠাৎ তাদের পাকড়াও করলাম। এবং তখন তারা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে গেল।’ (সুরা: আনআম, আয়াত : ৪৪)

মুমিনদের ক্ষেত্রে আল্লাহর রীতি কিছুটা ভিন্ন। মুমিনদের ওপর যদি বিপদ আসে—তা শাস্তি নয়, বরং শিক্ষা, সতর্কতা ও ফিরে আসার জন্য এক দয়াময় আহবান। মুমিন যদি অবাধ্য হয় বা পাপের পথে চলে—আল্লাহ কখনো কখনো দ্রুত আজাব দেন, যাতে সে জেগে ওঠে, তাওবার দিকে ফিরে আসে এবং সঠিক পথ আঁকড়ে ধরে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষের হাতের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও জলে বিপর্যয় দেখা দেয়, যাতে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কাজের কিছু স্বাদ আস্বাদন করান, হয়তো তারা (এতে) ফিরে আসবে।’ (সুরা : রুম, আয়াত : ৪১)

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) বহু আগেই এসব ঘটনার ব্যাপারে আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন। যারা ভূমিকম্পের মতো বিপর্যয় সম্পর্কে পূর্বাভাস জানতে চান, তাদের উদ্দেশে সহিহ বুখারিতে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, ‘কিয়ামত আসবে না, যতক্ষণ না জ্ঞান কমে যায়, অজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়ে, ভূমিকম্প বৃদ্ধি পায় এবং সম্পদ প্রচুর পরিমাণে হয়ে যায়, কিন্তু তা কেউ তেমন গুরুত্ব দেয় না।’ (বুখারি, হাদিস : ৭১২১)

অতএব, আল্লাহর দিকে আন্তরিক প্রত্যাবর্তনই আমাদের পার্থিব ক্ষতি থেকে পরিত্রাণ দিতে পারে।




ইহকাল ও পরকালের শান্তির চাবিকাঠি—তাওবার গুরুত্ব

ইসলামিক ডেস্কঃ মহান আল্লাহকে খুশি করার অন্যতম মাধ্যম তাওবা। তাওবার অর্থ হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে ও অভ্যন্তরীণভাবে আল্লাহ যে কাজ ভালোবাসেন তা পালন করা এবং বাহ্যিকভাবে ও অভ্যন্তরীণভাবে আল্লাহ যে কাজ অপছন্দ করেন তা ত্যাগ করা। তাই তাওবা শুধু গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার নাম নয়।

কারণ গুনাহ ত্যাগ করা তাওবার একটি অংশ হলেও তাওবা পূর্ণতা পায় তখনই, যখন বান্দা আল্লাহর পছন্দের কাজগুলোতে আত্মনিয়োগ করে।

পবিত্র কোরআনে তাওবা শব্দটি অনেক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কখনো ক্ষমা অর্থে; যেমন পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘এটি তোমাদের জন্য তোমাদের সৃষ্টিকর্তার নিকট উত্তম। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের তাওবা কবুল করলেন।
নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৫৪)

এই আয়াতের উচ্চারণে ‌‘ফাতাবা আলাইকুম’ এর স্থলে মহান আল্লাহ তাওবা ক্ষমা অর্থে ব্যবহার করেছেন।

অন্য আয়াতে আবার এই একই শব্দ ফিরে আসার অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো, খাঁটি তাওবা; আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের পাপগুলো মোচন করবেন এবং তোমাদের এমন জান্নাতগুলোতে প্রবেশ করাবেন, যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত, নবী ও তার সঙ্গে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে সেদিন আল্লাহ লাঞ্ছিত করবেন না। তাদের আলো তাদের সামনে ও ডানে ধাবিত হবে। তারা বলবে, হে আমাদের রব, আমাদের জন্য আমাদের আলো পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন; নিশ্চয় আপনি সর্ববিষয়ে সর্বক্ষমতাবান।’
(সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৮)

আবার এ শব্দটি নিজেকে শুধরে নেওয়ার অর্থেও ব্যবহার করা হয়। যেমন—কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘কিন্তু যারা তাওবাহ করে ও সংশোধিত হয় এবং সত্য প্রকাশ করে, বস্তুত আমি তাদের প্রতি ক্ষমা প্রদানকারী, করুণাময়।’

(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৬০)

তাই নিজেকে ইহকালীন ও পরকালীন শাস্তি থেকে বাঁচাতে প্রকৃত তাওবার বিকল্প নেই। খাঁটি মনে অতীতের গুনাহে অনুতপ্ত হয়ে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে সামনের দিনগুলোতে নিজের আমল-আখলাক পরিশুদ্ধ করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

কারণ যারা খাঁটি মনে মহান আল্লাহর কাছে তাওবা করে, মহান আল্লাহ তাদের গুনাহগুলোকে মাফ করে দেন। তাদের পাপকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৭০)

সুবহানাল্লাহ, মহান আল্লাহ যেমন মানুষের পাপের কারণে ক্রোধান্বিত হন আবার তারা যখন অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে, তখন খুশিও হন। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দার তাওবার কারণে ওই ব্যক্তির চেয়েও অধিক আনন্দিত হন, যে লোক ছায়া-পানিহীন আশঙ্কাপূর্ণ বিজন মাঠে ঘুমিয়ে পড়ে এবং তার সঙ্গে থাকে খাদ্য, পানীয়সহ একটি সওয়ারি। এরপর ঘুম থেকে সজাগ হয়ে দেখে যে সওয়ারি কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। তারপর সে সেটি খুঁজতে খুঁজতে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ল এবং বলে, আমি আমার পূর্বের জায়গায় গিয়ে চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে মারা যাব। (এ কথা বলে) সে মৃত্যুর জন্য বাহুতে মাথা রাখল। কিছুক্ষণ পর জাগ্রত হয়ে সে দেখল, পানাহারসামগ্রী বহনকারী সওয়ারিটি তার কাছে। (সওয়ারি ও পানাহারসামগ্রী পেয়ে) লোকটি যে পরিমাণ আনন্দিত হয়, মুমিন বান্দার তাওবার কারণে আল্লাহ তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন। (মুসলিম, হাদিস : ৬৮৪৮)

আর আল্লাহ যখন বান্দার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যায়, তখন তার দুনিয়া ও আখিরাতে কোনো ভয় থাকে না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে (এটা শিক্ষা দেয়) যে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা চাও, আর অনুশোচনা ভরে তাঁর দিকেই ফিরে এসো, তাহলে তিনি একটা নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তোমাদের উত্তম জীবনসামগ্রী ভোগ করতে দেবেন, আর অনুগ্রহ লাভের যোগ্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে তিনি তাঁর অনুগ্রহ দানে ধন্য করবেন। আর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে আমি তোমাদের ওপর বড় এক কঠিন দিনের আজাবের আশঙ্কা করছি। (সুরা : হুদ, আয়াত : ৩)




“ভুলের মুহূর্তেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন”

ইসলামিক ডেস্কঃ ইস্তিগফার তথা ‘ক্ষমা চাওয়া’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘গাফারা’ শব্দমূল থেকে, যার অর্থ হলো ঢেকে দেওয়া বা গোপন রাখা। অর্থাৎ যখন আল্লাহ কোনো বান্দার পাপ ঢেকে দেন বা প্রকাশ করেন না, তখনই তিনি তাকে ক্ষমা করেন। পরিভাষায় ইস্তিগফার হলো—এমন একটি আবেদন, যেখানে বান্দা নিজের দ্বারা সংঘটিত পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের জন্য আল্লাহর কাছে দয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করে। মুসলমানদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যার আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার প্রয়োজন নেই—তার ঈমান যতই দৃঢ় হোক বা তার ধার্মিকতা যতই উচ্চমানের হোক না কেন।

এমনকি আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-ও প্রতিদিন বহুবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.)  বলেছেন : ‘আল্লাহর কসম! আমি প্রতিদিন সত্তরবারেরও বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাঁর কাছে তাওবা করি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩০৭)

আল্লাহ তাআলা সুরা নুহে বলেন, “অতঃপর আমি বললাম, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রাচুর্যে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি বৃদ্ধি করবেন, তোমাদের জন্য বাগান সৃষ্টি করবেন এবং প্রবহমান নদী প্রবাহিত করবেন। ” (সুরা : নুহ, আয়াত : ১০-১২)

অতএব, ইস্তিগফার শুধু পাপ মোচনের মাধ্যম নয়, বরং এটি বরকত, রিজিক, সন্তান-সন্ততি ও জীবনের প্রশান্তি লাভেরও এক অনন্য উপায়।

ইস্তিগফার পাপ মোচন ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যম

যখন কোনো মুসলমান পাপে লিপ্ত হয়, তারপর আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তখন আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেই পাপ মুছে দেন, যতক্ষণ না তার আমলনামা সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে কেউ কোনো মন্দ কাজ করে বা নিজের ওপর অন্যায় করে, কিন্তু পরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে দেখবে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১১০)

ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের আল্লাহ ভালোবাসেন

আল্লাহ তাআলা ক্ষমা প্রার্থনাকারী বান্দাদের ভালোবাসেন, তাদের তাওবায় আনন্দিত হন এবং তাদের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। এমনকি তিনি ফেরেশতাদের কাছেও এই ক্ষমা প্রার্থনাকারী বান্দাদের নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন যারা নিজেদের পবিত্র রাখে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২২২)

ক্ষমা প্রার্থনা আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি ও শান্তির পথ

ক্ষমা প্রার্থনা করা শুধু একটি ইবাদত নয়, বরং এটি আল্লাহর শাস্তি ও কবরের আজাব থেকে মুক্তির এক নিরাপদ আশ্রয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে উদ্দেশ করে তাঁর উম্মতের জন্য সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন, ‘আর আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না, যতক্ষণ তুমি (হে নবী) তাদের মধ্যে উপস্থিত আছ এবং যতক্ষণ তারা ক্ষমা প্রার্থনা করে, ততক্ষণও আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ৩৩)

ইস্তিগফার দুঃখ-কষ্ট ও উদ্বেগ দূর করার উপায়

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়মিতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেন, প্রতিটি সংকট থেকে বের হওয়ার পথ দান করেন এবং এমন জায়গা থেকে রিজিক দান করেন, যেখানে সে কখনো আশা করে না।’ (আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ)

অতএব, ইস্তিগফার একদিকে যেমন আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, তেমনি জীবনের জটিলতা ও মানসিক ভার দূর করে দেয়।




“ইসলামের দৃষ্টিতে পানি: অপচয় নয়, সংরক্ষণই দায়িত্ব”

ইসলামিক ডেস্কঃ দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে পানির বিশিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। যে কারণে পবিত্র কোরআনের ৪৬ স্থানে পানির বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। সুরা আরাফের ৫০ নম্বর আয়াতে পানিকে জান্নাতবাসীর জন্য নেয়ামত এবং জাহান্নামিদের জন্য শাস্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পানিকে অতীতেও আল্লাহ অনুগত বান্দার জন্য পুরস্কার এবং অবাধ্যদের জন্য শাস্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পুণ্যবতী স্ত্রী হাজেরার পুণ্যবান সন্তান ইসমাইল (আ.)-এর জন্য সৃষ্টি করা হয়েছিল জমজম কূপ। দুনিয়ায় আল্লাহ রব্বুল আলামিনের বিস্ময়কর নিদর্শনগুলোর মধ্যে জমজম কূপ অন্যতম। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে অলৌকিকভাবে পবিত্র কাবা ঘরের সন্নিকটে এ বরকতময় কূপটির সৃষ্টি হয়। আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) প্রিয়তমা স্ত্রী হাজেরা ও দুগ্ধপোষ্য শিশু ইসমাইল (আ.)-কে জনমানবহীন প্রান্তরে নির্বাসনে দেন। স্ত্রী ও পুত্রের জন্য সামান্য পানি ও কিছু খেজুর মক্কার মরু প্রান্তরে রেখে যান। ইব্রাহিম (আ.) চলে যাওয়ার পর হাজেরা (আ.) সন্তানকে বুকে ধারণ করে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নির্জন প্রান্তে থাকেন। খাদ্য-পানীয় ছাড়া তিনি বেশ কিছু দিন কাটান। বুকের দুধ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পর ইসমাইল (আ.) যখন ক্ষুধায় কাতর হয়ে ছটফট করছিলেন, তখন হজরত হাজেরা (আ.) দুগ্ধপোষ্য শিশুর জীবন বাঁচানোর জন্য একবার সাফা পাহাড়ে আরেকবার মারওয়া পাহাড়ের ওপর ছোটাছুটি করেন পানির খোঁজে। কোথাও পানি না পেয়ে তিনি যখন ক্লান্ত শ্রান্ত তখন হঠাৎ দেখতে পান ইসমাইল (আ.)-এর পায়ের আঘাতে পানির ফোয়ারা উথলে উঠছে। চারদিকে তিনি বালু ও পাথর দিয়ে পানির প্রবাহ থামান। সেই কুদরতি পানির ঝরনা ধারাটিই জমজম কূপ।

একইভাবে হজরত নুহ (আ.)-এর অবাধ্য কওমের জন্য নাজিল হয়েছিল শাস্তি হিসেবে ভয়াবহ প্লাবন। যে প্লাবনে অবিশ্বাসীদের সবাই পানিতে ডুবে মারা যায়। ফেরাউন ও তার সৈন্য দলের পানিতে ডুবে মারা যাওয়াও আল্লাহর তরফ থেকে আসা শাস্তি। দুনিয়াদারির জীবনে পানি এমন এক অপরিহার্য জিনিস যা ছাড়া জীবনধারণের কথা কল্পনা করাও কঠিন। পানি ইবাদতেরও অন্যতম অনুষঙ্গ। আল্লাহর ইবাদতের জন্য বান্দাকে পবিত্রতা অর্জন করতে হয়। পবিত্রতা অর্জনে পানির ব্যবহার সুবিদিত। মানবজীবনেই শুধু নয়, পৃথিবীতে জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে পানির অবদান অনস্বীকার্য।

আখিরাতের জীবনে পানি জান্নাতবাসীকে উপহার দেওয়া হবে ও জাহান্নামবাসীকে শাস্তি হিসেবে পানি থেকে দূরে রাখা হবে। জাহান্নামবাসী ভয়াবহ কষ্টে পানির পিপাসায় পড়ে জান্নাতিদের কাছে পানি চাইবে, কিন্তু তাদের পানি দেওয়া হবে না। আল্লাহ বলেন, ‘জাহান্নামবাসী জান্নাতবাসীকে ডেকে বলবে, আমাদের ওপর কিছু পানি বা খাদ্য ফেলে দাও বা আল্লাহ তোমাদের যা দিয়েছেন তা থেকে, তারা বলবে আল্লাহ এ দুটি অবিশ্বাসীদের জন্য নিষিদ্ধ করেছেন।’ (সুরা আরাফ, আয়াত ৫০)। পানি বর্তমান বিশ্বে ব্যাপকভাবে অপচয় হচ্ছে। পানি যেহেতু আমাদের জন্য বিশাল এক নেয়ামত সেহেতু মহান আল্লাহ পানির অপচয় করা নিষেধ করেছেন। পানির অপচয় ইসলামের দৃষ্টিতে এক মারাত্মক গর্হিত কাজ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আহার কর ও পান কর কিন্তু অপচয় কর না, তিনি অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত ৩১)।

ইসলামে পানির সদ্ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পানি যেহেতু মহান আল্লাহর নেয়ামত, সেহেতু পানির সংরক্ষণ এবং এর সদ্ব্যবহার মুমিনদের জন্য অবশ্য পালনীয়। এমনকি অজু করার সময়ও যাতে পানির অপচয় না হয় সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। ইবনে মাজাহ শরিফের হাদিসে বলা হয়েছে : ‘সাহাবি হজরত সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা.) একদিন বসে অজু করছিলেন। এমন সময় রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তার পানির ব্যবহার দেখে তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এত অপচয় কেন? সাহাবি জিজ্ঞাসা করলেন অজুর মধ্যে কি অপচয় হয়? রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। এমনকি নদীর পাশে বসেও অজু করার সময় (পানি অযথা খরচ করলে অপচয় হিসেবে গোনাহ হবে)। পানি কীভাবে পান করতে হবে সেই আদব মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন। বসে ডান হাত দিয়ে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বলে পানি পান করা সুন্নত। তিন শ্বাসে পানি পান করা উত্তম। রসুল (সা.) পানি সম্পর্কে যে শিক্ষা দিয়েছেন সেগুলো শুধু সুন্নত নয়, বরং এর প্রতিটিতে রয়েছে শরীর সুস্থ রাখার নিদর্শন। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পানির পাত্র ঢেকে রাখ এবং বাসনগুলো উল্টে রাখ।’ (মুসলিম)। আল্লাহ আমাদের পানির সদ্ব্যবহারের তৌফিক দান করুন।