ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে সুশাসনের গুরুত্ব ও ফলাফল

ইসলামিক ডেস্কঃ একটি দেশে সুশাসন প্রবর্তন হওয়া ওই দেশের মানব সমাজের স্থিতি, শান্তি ও উন্নতির প্রধান ভিত্তি। আইনের শাসন, দায়িত্বশীল সরকার ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সুশাসন অতি জরুরি। দেশ ও সমাজের নেতৃত্বে ন্যায়, সততা ও জবাবদিহিতা অনুপস্থিত হলে কোনো সভ্যতাই টেকসই হতে পারে না। তাই ইসলাম সুশাসনকে কেবল রাজনৈতিক পরিভাষা হিসেবে নয়, বরং ধর্ম ও নৈতিকতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে সুশাসন হলো এমন এক নেতৃত্ব ব্যবস্থা, যা মানুষের ন্যায়নীতি রক্ষা করবে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে এবং সমাজকে নৈতিকতার পথে পরিচালিত করবে।

কোরআনে করিমের নির্দেশনা : কোরআনে করিমে সুশাসনের প্রতি স্বচ্ছ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। কোরআন সুশাসনের প্রথম ও অপরিহার্য শর্ত হিসেবে আমানত রক্ষার কথা উল্লেখ করেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার প্রকৃত অধিকারীর কাছে পৌঁছে দেবে এবং যখন মানুষের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনা করবে, ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে বিচার করবে।’ (নিসা-৫৮)

এই আয়াত সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় ক্ষমতা, নেতৃত্ব, দায়িত্ব- সবই আমানত। ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পদ বা প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। নেতৃত্বের মূল তত্ত্ব হলো ন্যায়বিচার। ব্যক্তি বিশেষ, দল বা গোষ্ঠী ন্যায় বিচারের মাধ্যম নয়। বরং ন্যায়বিচার হলো সমগ্র সমাজের অধিকার। অন্যত্র উল্লেখ আছে, ‘কোনো জাতির প্রতি নিজেদের বিদ্বেষ তোমাদের ন্যায়পরায়ণতা থেকে বিরত রাখবে না; ন্যায় কর, এটাই তাকওয়ার নিকটবর্তী।’ (মায়েদাহ-৮)

এ আয়াতে ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও দলীয় সবক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণতার বাধ্যবাধকতা তুলে ধরে- যা সুশাসনের মৌলিক শর্ত।

হাদিসের নির্দেশনা : রসুলুল্লাহ (সা.) অগণিত হাদিসে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা ও সুশাসনভিত্তিক নেতৃত্বের গুরুত্ব উল্লেখ করেছেন। বর্ণনা করেছেন এর যথার্থ মর্যাদা। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্ববান এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি, মুসলিম) এ ঘোষণায় ইসলাম নেতৃত্বকে জবাবদিহির অঙ্গনে স্থাপন করেছে। নেতৃত্ব মানে প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতায়ন নয়; বরং আমানত রক্ষা এবং মানুষের হক আদায়ের দায়িত্ব। ন্যায়পরায়ণ নেতাদের মর্যাদা সম্পর্কে রসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যারা ন্যায়ের সঙ্গে শাসন করে, আল্লাহর কাছে তারা নূরের মিম্বরে অবস্থান করবে।’ (সহিহ মুসলিম) হাদিসের এ বাণী প্রমাণ করে, ন্যায়ভিত্তিক সুশাসন দুনিয়ার শান্তি যেমন নিশ্চিত করে, তেমনি পরকালীন পুরস্কারের পথও উন্মুক্ত করে।

ইতিহাসে সুশাসনের বাস্তবতা : ইসলামি ইতিহাসে সুশাসনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনব্যবস্থা মানবসভ্যতার ইতিহাসে সুশাসনের অসাধারণ উদাহরণ। বিশেষত হজরত উমর (রা.)- যিনি তাঁর শাসনামলে ন্যায়, সত্য ও মানবিকতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড স্থাপন করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি- ‘যদি মরুভূমির পথে একটি কুকুরও ক্ষুধায় মারা যায়, আল্লাহ উমরের কাছেই জিজ্ঞাসা করবেন।’ এ বক্তব্য কোনো রাজনৈতিক নীতি নয়; বরং সুশাসনের গভীরতম মানবিক দর্শন। এ ছাড়া হজরত আলী (রা.) তাঁর প্রশাসনিক চিঠিতে গভীরভাবে উল্লেখ করেছেন নেতৃত্বের মূলে আছে দয়া, ন্যায় ও জনকল্যাণ। অত্যাচার নয়, পক্ষপাত নয়।

সুশাসনের অভাবে করুণ পরিণতি : যখন দেশ ও সমাজে ন্যায়বিচার বিলীন হয়, বিচারব্যবস্থা পক্ষপাতদুষ্ট হয় এবং নেতারা জবাবদিহি হারান, তখন সমাজে অস্থিরতা, অবিচার ও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে। আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘সতর্ক হও- একটি বিপর্যয় এলে তা শুধু অত্যাচারীদেরই নয়; বরং সবাইকে গ্রাস করবে।’ (আনফাল-২৫) সমাজে অন্যায় প্রতিষ্ঠিত হলে তার ক্ষতি সম্পূর্ণ জাতিকেই ভোগ করতে হয়- ইসলামের এ সতর্কবাণী আজও সত্য ও প্রযোজ্য। সুশাসনের ফল-সমৃদ্ধি, শান্তি ও নৈতিক উন্নতি। ইসলাম মানবসমাজকে ন্যায়ভিত্তিক সুশাসনের মাধ্যমে একত্র করে। এর ফলাফল তিনভাবে প্রকাশ পায়-

১. সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা : ন্যায়বিচার হলে মানুষ নিরাপদ বোধ করে, অপরাধ কমে, আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।

২. রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নতি : গবেষণায় দেখা যায় যেসব দেশে নেতৃত্ব স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক, সেখানে অর্থনীতি দ্রুত উন্নত হয় এবং দুর্নীতি কমে।

৩. মানুষের নৈতিক উন্নতি : সুশাসন মানুষকে নৈতিকতার পথে পরিচালিত করে; অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে। ফলে সমাজে সহযোগিতা, দয়া, মানবিকতা ও ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধি পায়।




অসুস্থ সাদ (রা.)-এর খোঁজখবর নিতে গিয়ে মহানবী (সা.)-এর নসিহত

ইসলামিক ডেস্কঃ ইসলামের ইতিহাসে কাফিরদের দিকে সর্বপ্রথম তীর নিক্ষেপকারী, আশারায়ে মুবাশ্শারার মধ্যে সর্বশেষ ইন্তেকালকারী সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)। তাঁর উপনাম আবু ইসহাক। পিতার মূল নাম মালিক ইবনে উহাইব; তবে প্রসিদ্ধ আবু ওয়াক্কাস। মা হামনাহ বিনতে সুফয়ান ইবনে উমাইয়া ইবনে আবদে শামস।

মক্কার বিখ্যাত ‘কুরাইশ’ গোত্রের ‘বনু জুহরা’ শাখার সন্তান। (আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা : ৩/১০১)

তিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির একজন এবং তৃতীয় খলিফা নির্বাচনের জন্য ওমর (রা.) কর্তৃক গঠিত ৬ সদস্যবিশিষ্ট শূরা-কমিটির অন্যতম সদস্য। তিনি একজন বীর যোদ্ধা, অশ্বচালক। শীর্ষস্থানীয় অনুসৃত ব্যক্তিত্বের অধিকারী।

মুসতাজাবুদ দাওয়াত (যার দোয়া অবশ্যই কবুল হয়)। মাদাইন-বিজেতা। কূফা নগরীর রূপকার এবং সে-নগরীর পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় খলীফার নিযুক্ত গভর্নর। অবশ্য, উভয় খলীফা তাঁকে (তাঁর দোষে নয়, ভিন্ন কারণে) বরখাস্ত করেন। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৮/৭২)

মহানবী (সা.)-এর প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ও ভালোবাসা ছিল অত্যন্ত গভীর। একদা রাতের বেলা রাসুল (সা.) কোনো এক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনকালে এমন এক জায়গায় অবস্থান করলেন, যেখানে শত্রুপক্ষের আক্রমণের আশঙ্কা ছিল প্রবল। তাই প্রিয় নবী (সা.) দীর্ঘ সময় নিদ্রাহীন জেগে থাকলেন। অবশেষে ইরশাদ করলেন, যদি আমার সঙ্গীদের মধ্যে কোনো সৌভাগ্যবান এই রজনীতে পাহারাদারির জন্য প্রস্তুত থাকত (তবে খুব ভালো হত)! আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) এ কথা শেষ করতে না করতেই অস্ত্রের ঝনঝনানি কানে ভেসে এল। রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, কে? সাদ (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আজ রাত আমি আপনার পাহাদারির জন্য প্রস্তুত।

অতপর রাসুল (সা.) ঘুমিয়ে পড়লেন। সাদ (রা.) প্রিয় নবীকে পাহারা দিলেন। রাসুল (সা.) তাঁর জন্য প্রাণ ভরে দোয়া করলেন। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৮/৭৩)

মহানবী (সা.)-ও তাঁকে ভালোবাসতেন। একবার সাদ (রা.) হুনাইন যুদ্ধের সময় মক্কায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাসুল (সা.) জিইররানা থেকে ওমরাহর ইহরাম করার পর তাঁকে দেখতে যান। তখন তিনি রাসুল (সা.)-কে বললেন, হে আল্লাহর! যে-দেশ থেকে আমি হিজরত করেছি, তাতে আমি মৃত্যুর আশঙ্কা করছি। আপনি আমার জন্য দোয়া করুন, আল্লাহ যেন আমাকে দ্রুত আরোগ্য দান করেন। রাসুল (সা.) তাঁর সুস্থতার জন্য তিন বার দোয়া করলেন। অতপর তিনি রাসুল (সা.)-কে ওসিয়ত করে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমার অনেক সম্পদ আছে। ওয়ারিস বলতে আমার কেউ নেই একটি মাত্র মেয়ে ছাড়া। আমি কি তার দুই তৃতীয়াংশ সদকার অসিয়ত করতে পারি? ইরশাদ করলেন, না। বলেন, তাহলে অর্ধেকের? ইরশাদ করলেন, না। বলেন, তাহলে এক তৃতীয়াংশের? ইরশাদ করলেন, তৃতীয়াংশ! তাও তো অনেক। তবে মনে রেখো! তুমি তোমার সন্তানকে মানুষের কাছে হাত পাতার মতো হতদরিদ্র অবস্থায় রেখে যাওয়া অপেক্ষা তাদের স্বনির্ভর রেখে যাওয়াই উত্তম। এরপর রাসুল (সা.) এর দোয়ায় তিনি সুস্থ হন এবং আরও ৪৭ বছর হায়াত লাভ করেন। (আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা : ৩/১০৭—১০৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৩/৮২)




জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশে মুসলমানদের অগ্রগণ্য ভূমিকা

ইসলামিক ডেস্কঃ ইসলামের প্রথম বাণী ‘ইকরা’ বা পড়ো। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে মক্কার হেরা গুহায় জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে অনুরণিত হয়েছিল এ বাণী। সে ঐশী ধ্বনিই মুসলিমদের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার প্রথম অনুপ্রেরণা। কাল-কালান্তরে এই একটিমাত্র শব্দতরঙ্গ জ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞান গবেষণায় মুসলিমদের উতলা করে তুলেছে।

ইসলাম জ্ঞানচর্চায় যেটুকু গুরুত্বারোপ করেছে পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্ম ও মতবাদ এতটা গুরুত্বারোপ করেনি। ইলম বা জ্ঞানের গুরুত্বে ও মাহাত্ম্যে কোরআন ও হাদিসে প্রচুর উদ্ধৃতি রয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয়তম রাসুল (সা.)-কে শিখিয়েছেন জ্ঞান বৃদ্ধির দোয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আপনি বলুন—হে আমার প্রভু, আপনি আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন।’(সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১১৪)

প্রতিটি মুসলিম নর-নারীকে জ্ঞানার্জনে উদ্বেলিত করতে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ইলম তথা জ্ঞানার্জন প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৪)

রাসুল (সা.) জ্ঞানার্জনের চেতনা মুসলিমদের মধ্যে এমনভাবে জাগিয়ে তুলেছিলেন যে তরুণ, বৃদ্ধ ও নর-নারী সবাইকে জ্ঞানচর্চার চেতনায় উজ্জীবিত করে দিয়েছিল। ফলে তাঁরা শুধু একটি হাদিসের জন্য এক মাসের পথ পাড়ি দিয়ে মদিনা থেকে সুদূর সিরিয়ায় গমন করতেও পিছপা হতেন না। জ্ঞানের জন্য তাঁরা আন্দালুস বা স্পেন থেকে খোরাসান পর্যন্ত চষে বেড়াতেন।

রাসুল (সা.) থেকে জ্ঞানাহরণের জন্য পালাক্রমে একজন সাহাবি সাংসারিক কাজকর্ম করতেন, আরেকজন রাসুল (সা.) থেকে জ্ঞান আহরণ করে অপরজনকে জানাতেন। আবু হুরায়রা (রা.) খেয়ে না খেয়ে রাসুল (সা.) থেকে জ্ঞানাহরণের জন্য মসজিদে নববীর একপাশে দিনাতিপাত করতেন। এভাবে ইলমচর্চার ফলে জাহিলিয়াতের নিকষ অন্ধকারে নিমজ্জিত একটি জাতিকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমগ্র বিশ্বের অনুকরণীয় এক বিস্ময় জাতিতে পরিণত করেছিল।

মুসলিমরা কোরআনের তাফসির, হাদিস ও তার ব্যাখ্যা, সাহিত্য ও অলংকারশাস্ত্র, ভাষাবিজ্ঞান, ফিক্বাহ শাস্ত্রসহ অন্যান্য ধর্মদর্শনে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি জাগতিক সব বিদ্যায় বিস্ময়কর অবদান রেখেছেন ও রাখছেন। আবহাওয়াবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, আইনবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ববিজ্ঞান, রসায়নবিদ্যা, গণিতশাস্ত্র, দর্শনশাস্ত্র, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, শিল্প ও সাহিত্য সব ক্ষেত্রে মুসলিমদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।

জ্ঞানের প্রতিটি শাখায় তাদের পদচারণ ছিলো সরব ও সফল।

অস্ত্রোপচার বিদ্যায় আবুল কাসেম জাহরাভির ‘আত-তাসরিফ’, চোখের ব্যাধি ও তার উপশমে আবুল কাসেম মাওসিলির ‘আল মুন্তাখাব ফি ইলাজিল উয়ুন’, রসায়নে জাবের বিন হায়্যানের ‘কিতাবুর রহমাত’, ‘কিতাবুত-তাজমি’, ‘সুন্দুকুল হিকমা’ ও ‘রিসালাহ ফিল কিমিয়া’, বিজ্ঞানী রাজীর ‘কিতাবুল হাজার’, ‘কিতাবুল আকসীর’, ‘কিতাবুদ-তাদবীর’, ইবনে আব্দুল মালেক আল-খাওয়ারেজমি আল-কাসির ‘আয়নুস-সানাহ’, জ্যোতির্বিদ্যায় আল-বাত্তানির ‘কিতাবুল জিজ’, আবু মাশার আল জাফরের ‘জিজ আবি মাশার’, মহাবিজ্ঞানী আল-বিরুনীর ‘কানুনে মাসউদি’, বীজগণিতে উমর খৈয়ামের ‘কিতাবুল জাবর’, আল-কারখির ‘আল-কাফি ফিল হিসাব’, অ্যালজেব্রাখ্যাত মুসা আল-খাওয়ারিজমীর ‘হিসাবুল জাবরি ওয়াল মুকাবালাহ’, চিকিৎসাবিদ্যায় আবু আলী ইবনে সিনার ‘আল কানুন ফিত-তিব’, আলী ইবনে রাব্বানের ‘ফিরদাউসুল হিকমাহ’, বিজ্ঞানী রাজীর ‘আল-কিতাবুল মানসুরি’, ‘আল কিতবুল হাভি’, ‘আল জুদারী ওয়াল হাসবাহ’, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ফারাবির ‘সিয়াসাত’ ‘আরা’, ইবনে খালদুনের ‘মুকাদ্দামা’, ইতিহাসশাস্ত্রে কালবীর ‘জামহারাতুন-নাসাব’, ওয়াকেদির ‘আল-মাগাজি’, বালাচজুরির ‘ফুতুহুল বুলদান’, ইমাম তাবারির ‘তারিখুল রুসুল ওয়াল-মুলুক’, আরবের হিরোডাটাসখ্যাত আল-মাসউদির ‘মিরআতুয-জামান’, ইমাম জাহাবির ‘তারিখুল ইসলাম’, ইমাম ইবনে আসাকিরের ‘তারিখে মদিনাতে দিমাশক’, স্পেনীয় মনীষী ইবনে খালদুনের ‘তারিখে ইবনে খালদুন’সহ মুসলিমদের শতসহস্র জ্ঞানগ্রন্থ জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলিমদের উজ্জ্বল স্মারক বহন করে চলছে। হিরকখণ্ডতুল্য এসব গ্রন্থ আধুনিক সভ্যতার দিকপালে পরিণত হয়েছে।

এসব জ্ঞানগ্রন্থ আরবি থেকে লাতিন ও ইংরেজিতে অনূদিত হওয়ার পর জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। (বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, মুহাম্মাদ নুরুল আমীন)

সুতরাং মুসলিমরাই বিশ্বসভ্যতার প্রথম ও প্রকৃত দীপাধার। আজকের আধুনিক বিশ্বের উন্নতি ও চোখ-ধাঁধানো উৎকর্ষের নেপথ্যে রয়েছে মুসলিম মনীষীদের অদম্য জ্ঞানসাধনা ও নিরলস বিদ্যাচর্চা। এ কথা পাশ্চাত্য ও ইউরোপের বহু গবেষক অকপটে স্বীকার করেছেন। যেমন—বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ কার্লাইল লেখেন, ‘আরবরা ছিল মরুচারী বেদুইন। যুগ যুগ ধরে তারা ছিল অবহেলিত। এরপর যখন তাদের মধ্যে একজন নবীর আবির্ভাব ঘটল, তখন তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হলো। স্বল্পতার পর আধিক্যতা লাভ করল। অবহেলিত হওয়ার পর বিশ্বে মর্যাদাপূর্ণ আসন অর্জন করল। এক শতাব্দী পার হতে না হতেই তারা তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমগ্র জাহান আলোকিত করে ছাড়ল।’




জুহদ ও দুনিয়া: নবীজির আদর্শ জীবন

ইসলামিক ডেস্কঃ আল্লাহ মানুষকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন পরীক্ষার জন্য, আর দুনিয়াকে বানিয়েছেন মানুষের জীবনযাপনের উপযোগী করে। বিশুদ্ধ বায়ুর জন্য অসংখ্য উদ্ভিদ, খাদ্যের জন্য নানান ধরনের ফল-ফসল, উপভোগের জন্য পাহাড়পর্বত, নদীনালা এবং সৌন্দর্য দেখার জন্য প্রকৃতির অগণিত নিদর্শন তিনি সৃষ্টি করেছেন। আকাশে মেঘ এনে তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন- যাতে মানুষ পান করে জীবনধারণ করতে পারে। এসব কিছুর মধ্যে লুকিয়ে আছে একটিই শিক্ষা- মানুষ যেন এসব নিয়ামতের মাধ্যমে তার স্রষ্টাকে চিনে নেয়, তাঁর আনুগত্য করে এবং কৃতজ্ঞ হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, মানুষ স্রষ্টাকে ভুলে স্রষ্টার সৃষ্টি জড় বস্তু, সম্পদ ও বিলাসবহুল জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। প্রয়োজন পূরণের জন্য পরিশ্রম করা স্বাভাবিক; কিন্তু মানুষ আজ এমন কিছুর পেছনেও ছুটছে, যা তার প্রয়োজনই নয়। জীবন যৌবন দুনিয়ার মোহে নষ্ট করছে, আবার হারানো যৌবন ফিরিয়ে আনতে সম্পদ ব্যয় করছে, যেন নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারছে। আমরা যেন ভুলেই গিয়েছি অমোঘ সেই সত্য আল্লাহ প্রতিটি মানুষের রিজিক নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। কিন্তু মানুষ সেই নির্ধারিত রিজিক নিয়ে সন্তুষ্ট না থেকে মরীচিকার মতো ক্ষণস্থায়ী জিনিসের পেছনে ছুটছে।

অথচ মানুষ দুনিয়াতে মুসাফির। একজন পথিক গাছের নিচে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে যেমন আবার যাত্রা শুরু করে, তেমনই দুনিয়া শুধু সফরের বিরাম; গন্তব্য নয়। মানুষ যখন দুনিয়ার মোহে ডুবে যায়, তখন সে রবকে ভুলে সীমা লঙ্ঘন করে বসে। অথচ দুনিয়ার সৌন্দর্য, সম্পদ ও ভোগবিলাস সবই পরীক্ষা। এগুলো কখনো জীবনের আসল লক্ষ্য হতে পারে না। আল্লাহর সন্তুষ্টিই আসল লক্ষ্য। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘দুনিয়ার যেসব জাঁকজমক সামগ্রী কিছু লোককে পরীক্ষা হিসেবে দিয়েছি, তুমি তার দিকে লোভের দৃষ্টিতে তাকিও না। তোমার রবের দেওয়া রিজিকই উত্তম ও স্থায়ী।’ (সুরা ত্বাহা, আয়াত ১৩১।) অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা দুনিয়াকে চাইছ; অথচ আখিরাতই উত্তম এবং চিরস্থায়ী।’ (সুরা আলা, আয়াত  ১৬-১৭)

মনে রাখতে হবে, দুনিয়া বিমুখতা মানে দুনিয়া ত্যাগ করা নয়। এমনভাবে দুনিয়া ছাড়াও ইসলামে অনুমোদিত নয় যে পরিবারপরিজন, দায়িত্ব-কর্তব্য সব ভুলে গিয়ে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা যাবে। রাহবানিয়্যাত (বৈরাগ্যবাদ) ইসলামের শিক্ষা নয়। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন যুহদের (দুনিয়াবিমুখতা) প্রকৃত আদর্শ। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়াকে কখনো হৃদয়ে স্থান দেননি, কিন্তু হালাল দুনিয়া ব্যবহার করেছেন। তিনি বিবাহ করেছেন, পরিবারপরিজনের হক আদায় করেছেন, হালাল খাবার পছন্দ করেছেন, মধু, সুগন্ধি ও ঠান্ডা পানি পছন্দ করেছেন, আর না পেলে ধৈর্য ধরেছেন। অর্থাৎ হালাল দুনিয়া ব্যবহার, কিন্তু হৃদয়কে দুনিয়ার দাস না বানানো- এটাই জুহদ বা দুনিয়াবিমুখতা।

সুফিয়ানে কেরাম বলেন, জুহদের রয়েছে চারটি স্তর। ১. হারাম থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা। ২. মাকরুহ থেকেও বেঁচে থাকা। ৩. হালাল ভোগে সীমা না ছাড়ানো। ৪. অন্তরে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর প্রতি আসক্তি না রাখা। এটাই সর্বোচ্চ জুহদ। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে দুনিয়াবিমুখতার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুরপাতার চাটাইয়ে ঘুমাতেন, দেহে দাগ পড়ে যেত। তিনি বলতেন, ‘দুনিয়ার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী? আমি তো এক পথিক; যে গাছের নিচে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়, তারপর আবার চলতে থাকে।’ ( তিরমিযি, হাদিস ২৩৭৭।)

অন্য এক হাদিসে হজরত উমর (রা.) বলেন, একদিন তিনি দেখেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে খাবার বলতে শুধু সামান্য যব ছাড়া কিছুই নেই। রোম-ফারসি রাজারা ভোগবিলাসে মত্ত; কিন্তু আল্লাহর প্রিয় নবী দুনিয়া থেকে বিরত থাকছেন। উমর (রা.) কান্নায় ভেঙে পড়েন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘হে উমর! তুমি কি খুশি নও যে দুনিয়া তাদের জন্য, আর আখিরাত আমাদের জন্য?’ (মুসলিম, হাদিস ২৯৬৫)

অনুরূপভাবে ইবাদতেও তাঁর জুহদ প্রকাশ পায়। তিনি রাতে গোপনে, দিনে প্রকাশ্যে ইবাদত করতেন; তাকওয়া, দোয়া, কান্না- সবকিছুতেই ছিলেন উম্মতের জন্য উত্তম  আদর্শ। আমাদের জীবনও হোক এমন- দুনিয়াকে হাতে রেখে, কিন্তু হৃদয়কে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত রেখে। আমিন।




অসিয়ত সম্পর্কে ইসলামি বিধান

ইসলামিক ডেস্কঃ অসিয়ত হলো কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর কোনো কিছু করা বা হওয়ার নির্দেশনা প্রদান। কারো কারো মতে, পরবর্তী সময়ে কার্যকর করার নির্দেশসংবলিত বিশেষ উপদেশ। যেমন-আমানত পৌঁছে দেওয়া, সম্পদ দান করা, কন্যা বিয়ে দেওয়া, মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া, তার জানাজা পড়ানো, মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ বণ্টন করা ইত্যাদি অসিয়তের অন্তর্ভুক্ত।

অসিয়তের সময় দুজন সাক্ষী রাখা উচিত, যেন পরবর্তী সময়ে মতানৈক্য সৃষ্টি না হয়। সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণ অসিয়ত করা জায়েজ। এর চেয়ে বেশি অসিয়ত করা জায়েজ নয়। যেসব হক আদায় করা ওয়াজিব তার জন্য অসিয়ত করাও ওয়াজিব।

অসিয়তকারীর পক্ষে অসিয়ত কোনো চুক্তি নয়। কাজেই অসিয়ত করার পর যত দিন সে জীবিত থাকে, তত দিন তা প্রত্যাহার করার অধিকার তার থাকে। মানুষের স্বীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর তার মালিকানাস্বত্ব নেই।

তাই এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা বা অন্যের কাছে হস্তান্তর করার অধিকারও মানুষের নেই। আর অসিয়ত শুধু নিজ মালিকানাধীন সম্পদের মধ্যেই করা যায়। তাই মৃত্যু-পরবর্তী অঙ্গদানের অসিয়তের কোনো গ্রহণযোগ্যতা ইসলামে নেই। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৮১৫২, দুররুল মুখতার : ১০/৩৩৭)

যেসব লোক মুমূর্ষু ব্যক্তির মুখ থেকে কোনো অসিয়ত শুনেছে, তাদের পক্ষে সে অসিয়ত কোনো ধরনের কমবেশি করা জায়েজ নয়। গুনাহের কাজের অসিয়ত করলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। সুতরাং তা পূর্ণ করা যাবে না, করলে গুনাহ হবে। (রদ্দুল মুহতার : ১০/৩৯৭)




৪ ডিসেম্বর ২০২৫: আজকের নামাজের সময়সূচি

ইসলামিক ডেস্কঃ আজ বৃহস্পতিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪৩২, ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪৭।

ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ—

জোহরের সময় শুরু – ১১টা ৫২ মিনিট।

আসরের সময় শুরু – ৩টা ৩৫ মিনিট।

মাগরিব – ৫টা ১৪ মিনিট।
এশার সময় শুরু – ৬টা ৩৩ মিনিট।

আগামীকাল ফজর শুরু – ৫টা ১১ মিনিটে।

আজ ঢাকায় সূর্যাস্ত – ৫টা ১০ মিনিটে এবং আগামীকাল সূর্যোদয় – ৬টা ২২ মিনিটে।




নসম্পদ ব্যবহারে ইসলামের নির্দেশনা ও করণীয়

ইসলামিক ডেস্কঃ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ধনসম্পদ ও সম্মানের অধিকারী করেন। ইচ্ছা হলেই যে কারোর সম্পদ ও সম্মান কেড়ে নেন। এ বিশ্বজগতের রাজা মহারাজা পরাক্রমশালী সম্রাটদের জীবনেরও অবসান ঘটেছে আল্লাহর ইশারায়।

দৃশ্যত যারা মহাশক্তিমান তারাও প্রভাব-প্রতিপত্তি হারিয়ে অস্তিত্বহীন হয়েছে। যারা আল্লাহতায়ালার দেওয়া নিয়ামত, সম্মান, আল্লাহর নির্দেশিত পথে পরিচালনা করেছেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাদের নাম-যশ তাঁর ইচ্ছায় অম্লান অমর হয়ে রয়েছে। এ জগতে যারা কৃতজ্ঞ চিত্তে আল্লাহর নিয়ামত ভোগ করে, আল্লাহর নির্দেশিত পথে মানবতার সেবা করে গেছেন তাদের অবদান অক্ষয়-চিরন্তন হয়ে আছে।

এ পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যত নবী-রসুল আগমন করেছেন তাঁরা চাইলে প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হতে পারতেন। কিন্তু তাঁরা বিলাসবহুল জীবনের বদলে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা ও মানবতার সেবায় উদ্ভাসিত হয়েছেন। তাঁরা মহান রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে গেছেন। আল্লাহতায়ালা আমাদের ধনসম্পদ, মান-মর্যাদা ইজ্জত দান করে পরীক্ষানিরীক্ষা করেন।

আমাদের কর্তব্য- সর্বাবস্থায় তাঁর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। আল্লাহর এই বিশাল জগতের সৃষ্টিকুলকে অনিবার্য মৃত্যুর স্বাদ বিনা দ্বিধায় ভোগ করতে হবে। সবাইকে এক সময় মৃত্যুর দিকে যাওয়ার পরিণতি মেনে নিতে হবে। মৃত্যুর কোনো নির্দিষ্ট সীমা-পরিসীমা নেই। আল্লাহ যেভাবে ইচ্ছা করেন সেভাবেই বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিতে হয়। দুনিয়ায় অর্জিত সব ধনসম্পদের মায়া একদিন আমাদের পরিত্যাগ করে একেবারেই শূন্য হাতে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে।

এ বিশ্বজগৎ সম্পূর্ণভাবেই একটি অতি অপ্রশস্ত খেলার মাঠ। এ মাঠে কিছুদিন খেলাধুলা করে এক অজানা নিরুদ্দেশ গন্তব্যের দিকে যেতে হবে। সেখানে অনন্তকালের জন্য চিরস্থায়ীভাবে থাকতে হবে। এ বিশ্ব চরাচরে পড়ে থাকবে আমাদের অতি কষ্টে অর্জিত সব অমূল্য ধনসম্পদ। যা সঙ্গে নেওয়ার কোনো ব্যবস্থাই আমরা করে যেতে পারি না। এ জন্য নিয়তি আমাদের কোনো সময়ই দেয় না। আমাদের জীবন অবসানের পর রেখে যাওয়া এ সম্পদের কী অবস্থা হবে, কীভাবে ব্যয় হবে তাও আমরা বলতে পারি না।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে মহান আল্লাহতায়ালা মহাগ্রন্থ আল কোরআনের আলোকে আমাদের প্রিয় নবী মহামানব হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে সুসংবাদ প্রেরণ করেছেন যে, আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জীব মানুষের মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া তিনটি অবদান এ দুনিয়ায় বিরাজ করবে এবং পরকালেও নাজাত তথা জান্নাত লাভে সহায়তা করবে।

যেমন- ১. তোমার সন্তানকে যদি সুসন্তান করে রেখে যেতে পার তবে তারা মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে দুই হাত তুলে প্রাণভরে তোমাদের জন্য দোয়া করবে- রব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি ছগিরা। হে পরম দয়ালু আল্লাহ, আমার পিতা-মাতাকে সস্নেহে লালনপালন ও প্রতিপালন কর।

২. আল্লাহর রাস্তায় ফিসাবিলিল্লাহ হিসেবে কোনো বস্তু বা ধনসম্পদ দান করে যাওয়া যা এতিম নিঃস্ব হতদরিদ্র গরিব মিশকিন পঙ্গুদের জন্য ব্যয় হবে।

৩. মানবতার সেবাসহ সৃষ্টিকুলের জন্য কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান তৈরি বা স্থাপন করে যাওয়া, যাতে অব্যাহতভাবে পরোপকার হতে থাকবে। ইসলামের দৃষ্টিতে সৎভাবে ধনসম্পদ অর্জন বা ধনী হওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ নেই। তবে অর্জিত সম্পদ সৎভাবে সঠিক পথে ব্যয় করতে হবে।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের সমাজে দেখা যায়, আমরা বেপরোয়াভাবে হিংসা-বিদ্বেষ, জোরজবরদস্তি, লুটপাট, অন্যায়ভাবে সম্পদ আহরণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলি। এ সম্পদ জমানোর ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় দেখা যায় নিজের জমানো সম্পদ মানুষ নিজেই ভোগ করে যেতে পারে না। একান্তভাবে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাব, হাজার হাজার কোটি টাকার ধনসম্পদ থাকলেও তার মালিক শান্তিতে ঘুমাতে পারে না তার জমানো টাকার চিন্তায় এবং লোভ-লালসার প্ররোচনায়। ইচ্ছা থাকলেও পেটভরে খেতে পারে না মুখে রুচি না থাকার কারণে।

এর কারণ হলো- আমরা ধনসম্পদের প্রতি এত বেশি লোভী হয়ে পড়ি যে, লোভের বশবর্তী হয়ে খুনাখুনি করে হলেও ধনসম্পদ অর্জন করে থাকি। অন্যায়ভাবে ধনসম্পদ জমিয়ে কার জন্য রেখে যাব- তা আমরা ঘুণাক্ষরেও ভাবি না। ধনসম্পদের লোভে মানইজ্জত বিসর্জন দিতে হলেও আমরা কুণ্ঠাবোধ করি না। মৃত্যুর পর আমাদের খালি হাতেই অজানার পথে যাত্রা করতে হবে।

মূলত এ জীবনটা বড় বেশি ক্ষণস্থায়ী। এক মুহূর্তের জন্যও বেঁচে থাকার আশা করতে পারি না। তাই আমাদের সবাইকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, আমরা অন্যায়ভাবে অবৈধ পথে দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলব না। যেহেতু দিন দুনিয়ার মালিক আল্লাহ সেহেতু তাঁর ওপর আশা-ভরসা রাখতে হবে।




ভূমিকম্প আমাদের জন্য সতর্কবার্তা

ইসলামিক ডেস্কঃ ভূমিকম্প শুধুই প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। যখন আমরা ইমান সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ি, আল্লাহকে ভুলে পাপাচারে আকণ্ঠ ডুবে যাই, তখন আল্লাহ আমাদের সতর্ক করার জন্য নানা ধরনের দুর্যোগ প্রেরণ করেন। ভূমিকম্প এর অন্যতম। কোরআন থেকে আমরা জানতে পারি, আগেও অনেক জাতিকে আল্লাহ ভূমিকম্প দ্বারা শাস্তি দিয়েছেন।

মহান আল্লাহ সুরা আরাফের ৭৮ নম্বর আয়াতে বলেছেন, অতঃপর ভূমিকম্প তাদের হঠাৎ পাকড়াও করল আর তারা তাদের ঘরগুলোতে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল। এই আয়াতে আল্লাহ সালেহ (আ.)-এর উম্মতের পরিণতি বর্ণনা করেছেন। সামুদ জাতির কাছে একত্ববাদের দাওয়াত পৌঁছাতে আল্লাহ সালেহ (আ.)-কে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সামুদ জাতি তাদের নবীকে অস্বীকার তো করলই, আল্লাহর পক্ষ থেকে অলৌকিক নিদর্শন হিসেবে প্রেরিত উটনিকেও তারা হত্যা করে। যার ফলে তাদের ওপর আল্লাহ ভূমিকম্পের শাস্তি প্রেরণ করেন। লুত (আ.)-এর উম্মতের শাস্তির বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেছেন, অতঃপর সূর্যোদয়ের সময় প্রকাণ্ড চীৎকার তাদের পাকড়াও করল। এরপর আমি জনপদকে উল্টিয়ে ওপর-নিচ করে দিলাম এবং তাদের ওপর পোড়ামাটির পাথর-কংকর বর্ষণ করলাম (সুরা হিজর)।

লুত (আ.)-এর সম্প্রদায় সমকামিতার মতো নোংরা ও জঘন্য অপকর্মে লিপ্ত হয়েছিল। সেই অপকর্মের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ উপর্যুক্ত শাস্তি প্রেরণ করেন। তাদের জনপদকে ওলটপালট করে দেন। দুঃখের বিষয় হলো, যে অপরাধের কারণে আল্লাহর ভয়াবহ গজব তাদের ওপর নাজিল হয়েছিল, সেই একই ধরনের গর্হিত কাজ আজ আমাদের সমাজে প্রকাশ্যে ঘটছে। শুধু ইসলাম ধর্ম নয়, প্রচলিত প্রতিটি ধর্মেই সমকামিতা জঘন্য অপরাধ। এমনকি দেশীয় আইনেও এটি সুস্পষ্ট শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ অধিকারের নামে রুচি ও প্রকৃতিবিরুদ্ধ সেই কাজের অনুমোদনের দাবি আজ প্রকাশ্যে করা হচ্ছে।

মনে রাখতে হবে, এমন কিছু অবাধ্যতা আছে, যা কোনো সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে গণহারে আল্লাহর গজব নেমে আসে। তাই আল্লাহর অসন্তুষ্টি ডেকে আনে, এমন সব পাপাচারের বিরুদ্ধে আমাদের প্রত্যেকের সচেতন ও সোচ্চার হওয়া অপরিহার্য।

ভূমিকম্পে আমাদের দুই ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে। এক. আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি। দুই. জাগতিক প্রস্তুতি। এতক্ষণ যা বলা হলো, তা অধ্যাত্মিক প্রস্তুতির নির্যাস। পাপের জন্য তওবা করা, পাপ থেকে বেঁচে থাকা, আল্লাহর নৈকট্যলাভের চেষ্টা করা এসবই আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির অংশ।

আর ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে যা কিছু করা হয় সেগুলো জাগতিক প্রস্তুতির অংশ। আমরা এমন এক ভৌগোলিক এলাকায় বসবাস করি, জনঘনত্ব ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এখানে প্রতিটি অট্টালিকা যেন একেকটি সম্ভাব্য সমাধিসৌধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় যদি ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, তাহলে এক লাখের বেশি ভবন ধসে যেতে পারে। চিন্তা করুন, এটি কত ভীতিজাগানিয়া পূর্বাভাস! দুঃখজনক হলো, এমন ভয়াবহ ঝুঁকির বিপরীতে রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি একেবারেই অপ্রতুল। আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকর্মীর সংখ্যা নগণ্য, বড় ধরনের উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার মতো ভারী যন্ত্রপাতিও অপর্যাপ্ত। ফায়ার সার্ভিসের সীমিত সক্ষমতা দিয়ে হাজার হাজার ভগ্ন স্থাপনা সামলানো কেবলই কল্পনা। অথচ বিভিন্ন স্থাপনার নাম পরিবর্তন, ভাস্কর্য নির্মাণ বা অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্পেই নয়, নেতা-নেত্রীদের জন্য তোরণ নির্মাণ, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা, নানা ধরনের আনুষ্ঠানিকতা ও ক্ষমতার প্রদর্শনীতেও বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের যে অপচয় ঘটে, তা এই অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের কাঠামোকে আরও প্রসারিত করে তোলে।

সেই অর্থের সামান্য অংশও যদি দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি, ভূমিকম্প-প্রতিরোধী প্রযুক্তি, উদ্ধার সরঞ্জাম ও দক্ষ উদ্ধারকারী বাহিনীর প্রশিক্ষণে ব্যয় করা হতো, তাহলে সেটিই হতো সবচেয়ে যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। এটি বিবেচিত হতো বর্তমানের সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে।

তবে প্রস্তুতি যেন কেবল ভৌত অবকাঠামোর ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ না থাকে। জাগতিক প্রস্তুতির পাশাপাশি আমাদের আধ্যাত্মিক প্রস্তুতিও গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহর রহমত ছাড়া কোনো পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ও প্রযুক্তি নিরাপত্তা দিতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি দুর্যোগ আমাদের প্রতি সতর্কবার্তা। আমাদের সমাজের বিস্তৃত দুর্নীতি, জুলুম, অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে আমাদের গণ তওবা করা জরুরি।




আল্লাহর প্রতি ধৃষ্টতার ভয়াবহ ফলের বার্তা

ইসলামিক ডেস্কঃ মানবজীবনের মূল ভিত্তি হলো ঈমান ও আল্লাহভীতি। একজন মুসলমানের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভক্তি, সম্মান, ভালোবাসা ও ভয় সর্বোচ্চ স্থানে থাকে। কারণ আল্লাহই মহাবিশ্বের স্রষ্টা, পালনকর্তা, রিজিকদাতা ও নিয়ন্ত্রক। মানুষের সুখ-দুঃখ, জীবনের চলার পথ, মৃত্যুর পরের বিচার—সবই তাঁর হাতে। তাই আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতা প্রদর্শন করা, তাঁর মর্যাদাকে হেয় করা, তাঁর বিধানকে উপহাস করা অথবা তাঁর আদেশ অমান্য করে বিদ্রোহী আচরণ করা—এগুলো অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। কোরআন ও হাদিসে এসব অপরাধের শাস্তির বিষয়ে কঠোর বর্ণনা এসেছে।

আল্লাহর প্রতি ধৃষ্টতা কী

ধৃষ্টতা মানে হলো ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, যেখানে কেউ নিজের সীমা ছাড়িয়ে আল্লাহর মর্যাদার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, বিদ্রুপ, অপমান বা অমান্যতা প্রদর্শন করে। আল্লাহর প্রতি ধৃষ্টতা কয়েকভাবে প্রকাশ পেতে পারে—

১. আল্লাহর অস্তিত্ব, ক্ষমতা বা জ্ঞান নিয়ে ব্যঙ্গ করা।

২. আল্লাহর বিধানকে উপহাস করা।

৩. কোরআনের আয়াত বা শরিয়তের নিয়মকে বিদ্রুপ করা।

৪. গুনাহকে তুচ্ছ মনে করে প্রকাশ্য অবাধ্যতা করা।

৫. নিজেকে আল্লাহর সমকক্ষ ভাবা বা তাঁর সঙ্গে উপহাসমূলক তুলনা করা।

ইসলামের ইতিহাসে ফেরাউন, হামান, সাদ্দাদের মতো ব্যক্তিরা আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল। তাদের পরিণতি ছিল ভয়ংকর।

কোরআনে আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতার ভয়াবহ শাস্তির বর্ণনা

আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহ সম্পর্কে অহংকার করে, তাদের অবশ্যই অপমানজনক শাস্তি দেওয়া হবে।’ (সুরা : গাফির/মুমিন, আয়াত : ৬০)

আরেক আয়াতে এসেছে, ‘যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জন্য সংকীর্ণ জীবন এবং পরকালে তাকে অন্ধ অবস্থায় ওঠানো হবে।’

(সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১২৪)

ধৃষ্টতা মানুষের হৃদয়কে কঠিন করে দেয়। এমন কঠিন হৃদয়কে আল্লাহ ধ্বংসের পথে টেনে নেন। কোরআনে আরো বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর আয়াতকে যে উপহাস করে, তাদের জন্য আছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।’ (সুুরা : জাসিয়া, আয়াত : ৯)

আল্লাহর বিধানকে উপহাস করা বড় গুনাহ

কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসুলকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছিলে? তোমরা অজুহাত দিয়ো না; তোমরা ঈমান আনয়নের পর কাফিরে পরিণত হলে।’

(সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬৫-৬৬)

অর্থাৎ কেউ খোদা প্রদত্ত বিধান নিয়ে উপহাস করলে তার ঈমান নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এটি এমন অপরাধ, যার শাস্তি শুধু দুনিয়ায় নয়, আখিরাতে অনন্ত জাহান্নাম।

গুনাহকে ছোট করে দেখা অন্য রকম ধৃষ্টতা

রাসুল (সা.) বলেন, ‘একসময় মানুষ এমন যুগে পৌঁছবে, যখন তারা বড় বড় গুনাহকেও ঘাসের মতো তুচ্ছ মনে করবে।’ এটাই ধৃষ্টতার আরেক রূপ। মানুষ যখন ভুলকে ‘ছোট ভুল’ বলতে শুরু করে, তখন সে আসলে আল্লাহকে অপ্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার ওপর একজন শয়তানকে কর্তৃত্ব দিই, যে তার সঙ্গী হয়ে যায়।’
(সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ৩৬)

কেন আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতা সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধ

১. এটি মানুষের ঈমান ধ্বংস করে দেয়।

২. সমাজে দুষ্কর্ম, নৈরাজ্য ও নৈতিক অবক্ষয় বাড়ায়।

৩. আল্লাহর দয়া থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে।

৪. আখিরাতে মুক্তির সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়।

৫. ইচ্ছাকৃত ধৃষ্টতা শিরক বা কুফরিতে রূপ নিতে পারে।

আল্লাহর সঙ্গে ধৃষ্টতার দুনিয়াবি শাস্তি

ধৃষ্টতার শাস্তি শুধু আখিরাতের আগুন নয়; দুনিয়ায়ও এর ভয়াবহ পরিণতি দেখা যায়; যেমন—১. হৃদয় কঠিন হয়ে যাওয়া। ২. বরকত দূর হয়ে যাওয়া। ৩. মনের অশান্তি। ৪. রিজিকে সংকীর্ণতা। ৫. জীবনে ব্যর্থতা ও বিপর্যয়। ৬. সমাজে অপমানিত হওয়া। আল্লাহ বলেন, ‘যে আমার বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য করে, আমি তাকে লাঞ্ছিত করে দেব।’

মানুষ ধারণা করতে পারে যে সে ইচ্ছামতো চলছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার ওপর আল্লাহর গজব কাজ করতে থাকে নীরবে।

আখিরাতে ধৃষ্টতার ভয়াবহ শাস্তি

কোরআনে ধৃষ্টতার জন্য যেসব শাস্তির বর্ণনা এসেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—জাহান্নামের জ্বলন্ত আগুন, খাঁটি ফুটন্ত পানি পান করানো, লোহার বেড়িতে বেঁধে টেনে হাঁটানো, মুখমণ্ডল অন্ধকার হয়ে যাওয়া, হিসাবের ময়দানে লাঞ্ছনা, সর্বাত্মক হতাশা ও বঞ্চনা। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং অহংকারের সঙ্গে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তাদের জন্য আকাশের দরজাসমূহ খোলা হবে না।’

(সুরা : আরাফ, আয়াত : ৪০)

অন্য আয়াতে এসেছে, ‘সেদিন অপরাধীদের মুখে কালো কালো চিহ্ন পড়বে।’




ভূমিকম্পকে যেভাবে দেখেন ঈমানদার ও ঈমানহীনরা

ইসলামিক ডেস্কঃ ভূমিকম্পের সেই আকস্মিক ঘটনা, যা হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়, চোখে এনে দেয় আতঙ্ক এবং মুহূর্তের মধ্যে বহু প্রাণ কেড়ে নেয়—অনেকের চোখে তা শুধু একটি বস্তুবাদী ব্যাখ্যার ঘটনা! তবে এখন ঘটনা শুধু সংখ্যায় নয়, তা যেন হৃদয়ের চোখ দিয়ে দেখা যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের আগে অনেক দৃষ্টান্ত অতিবাহিত হয়ে গেছে। অতএব, পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো যারা সত্যকে অস্বীকার করেছিল তাদের পরিণতি কী হয়েছিল। এতে মানবজাতির জন্য রয়েছে একটি স্পষ্ট শিক্ষা আর আল্লাহভীরু মানুষদের জন্য রয়েছে দিকনির্দেশনা ও উপদেশ।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৭-১৩৮)

কিন্তু গাফেল, অজ্ঞ ও অবিশ্বাসীদের বৈশিষ্ট্য হলো—আল্লাহর নিদর্শন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। তা হোক কোরআনের আয়াত বা মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা কুদরতের স্পষ্ট চিহ্ন—কোনো কিছুই তাদের মনকে নাড়া দেয় না। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় ঘনিয়ে এসেছে, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে আছে। তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যখনই কোনো নবীন উপদেশ আসে, তারা তা অমনোযোগী অবস্থায় শোনে—তাদের হৃদয় তো অন্যদিকে বিভ্রান্ত থাকে।’
(সুরা : অম্বিয়া, আয়াত : ১৩)

যেকোনো ঘটনা, ইতিহাস ও বাস্তবতাকে একমাত্র বস্তুবাদী চোখে দেখা—ইহজাগতিক ধ্যান-ধারণা মানুষের স্বভাবগত বিষয়। আল্লাহ তাদের মানসিকতার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আর যদি তারা আকাশের একটি টুকরা পতনশীল অবস্থায় দেখেও, তারা বলবে, ‘এ তো স্রেফ ঘন মেঘ!’  (সুরা : তুর, আয়াত : ৪৪)

একই মনোভাব আমরা দেখি ‘আদ’ জাতির ইতিহাসে। যখন তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসন্ন শাস্তির মেঘ দেখল, তারা সরলভাবে ভাবল—এটা বৃষ্টির মেঘ। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর তারা যখন দেখল যে তা তাদের উপত্যকার দিকে ধেয়ে আসছে, তারা বলল, এ তো এমন একটি মেঘ, যা আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করবে, বরং এটি সেই জিনিস, যার জন্য তোমরা তাড়াহুড়া করলে—এক প্রবল বায়ু, যাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

এটি তার প্রতিপালকের আদেশে সব কিছু ধ্বংস করে দিল, ফলে এমন হলো যে তাদের ঘরবাড়ি ছাড়া আর কিছুই দৃশ্যমান রইল না।’ (সুরা : আহকাফ, আয়াত : ২৪-২৫)

একজন মুমিন কখনো শুধু বস্তুগত কারণের ওপর নির্ভর করে না। সে কারণগুলোর স্রষ্টা, আসমান-জমিনের মালিক আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। যিনি কোনো বিষয়ের ইচ্ছা করলে কেবল বলেন—‘হও’, আর তা হয়ে যায়। মুমিন তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, যাতে নুহ (আ.)-এর পুত্রের মতো ভুল না করে।

নুহ (আ.) যখন তাকে বলেন, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র! আমাদের সঙ্গে ওঠে এসো, আর কাফিরদের সঙ্গে থেকো না।’ পুত্র জবাব দিল সম্পূর্ণ বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে—‘আমি এমন এক পর্বতে আশ্রয় নেব, যা আমাকে পানির হাত থেকে রক্ষা করবে।’ তখন নুহ (আ.) বলেন, ‘আজ আল্লাহর আদেশ থেকে কাউকে রক্ষা করার নেই, তিনি যাকে দয়া করেন তাকে ছাড়া। এরপর তাদের মাঝে ঢেউ এসে দাঁড়াল এবং সে ডুবে যাওয়া লোকদের অন্তর্ভুক্ত হলো।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৪৩)

ইহজাগতিক ধ্যান-ধারণা লোকেরা কি ভুলে গেছে—অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলে থাকার ভান করছে যে এই পৃথিবীর ভূত্বক, পর্বত, সাগর—সবই আল্লাহর আদেশেই পরিচালিত? আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করলেন, যখন তা ছিল ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। তিনি আকাশ ও পৃথিবীকে বললেন, ‘চাই স্বেচ্ছায়, চাই অনিচ্ছায়—তোমরা আসো।’ তারা বলল, ‘আমরা স্বেচ্ছায় উপস্থিত হলাম।’

(সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ১১)

তিনি আদেশ করেন আর সৃষ্টিজগৎ বিনা দ্বিধায় অনুসরণ করে। তিনি তাদের ধারণ করে রেখেছেন তাদের নির্ধারিত ভূমিকায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আসমান ও জমিনকে ধরে রেখেছেন, যাতে তারা ভেঙে না পড়ে। আর যদি তারা ভেঙে পড়ত, তবে আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই যে তাদের ধরে রাখতে পারত।’

(সুরা : ফাতির, আয়াত : ৪১)

বিজ্ঞানীরা কী বলেন? তাঁরা বলেন, অপ্রত্যাশিত! কিন্তু আল্লাহর কাছে কিছুই অপ্রত্যাশিত নয়। কেমন যেন আল্লাহ তাআলা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন সেই অত্যাচারীর দিকে, যার নাম ছিল কারুন। আল্লাহ যখন তাকে বিপুল সম্পদ দান করেছিলেন, সে অকৃতজ্ঞ হয়ে বলেছিল, ‘আমি তো এগুলো পেয়েছি আমার নিজ জ্ঞানের কারণে!’ এ ছিল তার অহংকার, তার অজ্ঞতা। ফলে শাস্তি ছিল অনিবার্য—‘অতঃপর আমরা তাকে ও তার গৃহকে ভূগর্ভে ধ্বংস করে দিলাম। আল্লাহ ছাড়া তার কোনো দল তাকে সাহায্য করতে পারেনি এবং সে নিজেও আত্মরক্ষা করতে সক্ষম ছিল না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৮১)

আজ আমাদের ওপর যা ঘটেছে, যার জন্য ভূমিকম্পবিদরা এখনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা খুঁজে পাননি, তা নিছক আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের কর্ম, আমাদের নৈতিক অবক্ষয় এবং আল্লাহর আইনকে উপহাস করার পরিণতির দিকেই ইঙ্গিত করে—সুদকে বৈধ করা, মদকে সাংস্কৃতিক আড়ালে প্রমোট করা, ইসলামী আইনকে উপহাস করা, আল্লাহর আয়াতের সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা—এসব কি শাস্তিকে আহবান করার মতো কাজ নয়? আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কত শহর ছিল যারা তাদের পালনকর্তা ও তাঁর রাসুলদের আদেশ অমান্য করেছিল। আর আমরা তাদের কঠোর হিসাবের মুখোমুখি করেছি এবং ভয়াবহ শাস্তি দিয়েছি। ফলে তারা তাদের কর্মের মন্দ ফল ভোগ করেছে এবং তাদের পরিণতি হয়েছে সম্পূর্ণ ধ্বংস।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৮৯)

শাস্তি শুধু জালিমদের ওপর আসে না, এটি সামাজিক পরীক্ষাও বটে! আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা এমন এক ফিতনাকে ভয় করো, যা শুধু তোমাদের মধ্যের জালিমদের ওপরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২৫)

অতএব, সমাজে যখন পাপ, অন্যায়, অশ্লীলতা, দুর্নীতি, দুরাচার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, তখন শাস্তি শুধু অপরাধীদের ওপর নয়, বরং পুরো সমাজের ওপর এসে পড়ে।

পাপাচার তো পশ্চিমে আরো বেশি, তবু তাদের কিছু হয় না—এই আপত্তির জবাব অনেকে বলে থাকে, ‘আমেরিকা ও ইউরোপের মতো দেশগুলোতে নৈতিক অবক্ষয় আমাদের চেয়ে বহুগুণ বেশি। তবু তাদের তো কিছু হয় না! আমরা বলি, তাদের এই বাহ্যিক সমৃদ্ধিকে শাস্তি থেকে নিরাপত্তা ভেবে নেওয়া মারাত্মক ভুল। আল্লাহ যখন কারো প্রতি ক্রুদ্ধ হন, অনেক সময় তাঁর শাস্তি সঙ্গে সঙ্গে আসে না,

বরং আল্লাহ তাদেরকে অবকাশ দেন, যেন তারা বিভ্রান্তির মধ্যে আরো ডুবে যায় এবং পরিণামে একদিন হঠাৎ করে পাকড়াও করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা যখন যে বিষয় দ্বারা উপদেশপ্রাপ্ত হয়েছিল তা ভুলে গেল, তখন আমরা তাদের জন্য সবকিছুর দরজা খুলে দিলাম। অবশেষে যখন তারা যা পেয়েছিল তাতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল, তখন আমরা হঠাৎ তাদের পাকড়াও করলাম। এবং তখন তারা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে গেল।’ (সুরা: আনআম, আয়াত : ৪৪)

মুমিনদের ক্ষেত্রে আল্লাহর রীতি কিছুটা ভিন্ন। মুমিনদের ওপর যদি বিপদ আসে—তা শাস্তি নয়, বরং শিক্ষা, সতর্কতা ও ফিরে আসার জন্য এক দয়াময় আহবান। মুমিন যদি অবাধ্য হয় বা পাপের পথে চলে—আল্লাহ কখনো কখনো দ্রুত আজাব দেন, যাতে সে জেগে ওঠে, তাওবার দিকে ফিরে আসে এবং সঠিক পথ আঁকড়ে ধরে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষের হাতের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও জলে বিপর্যয় দেখা দেয়, যাতে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কাজের কিছু স্বাদ আস্বাদন করান, হয়তো তারা (এতে) ফিরে আসবে।’ (সুরা : রুম, আয়াত : ৪১)

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) বহু আগেই এসব ঘটনার ব্যাপারে আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন। যারা ভূমিকম্পের মতো বিপর্যয় সম্পর্কে পূর্বাভাস জানতে চান, তাদের উদ্দেশে সহিহ বুখারিতে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, ‘কিয়ামত আসবে না, যতক্ষণ না জ্ঞান কমে যায়, অজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়ে, ভূমিকম্প বৃদ্ধি পায় এবং সম্পদ প্রচুর পরিমাণে হয়ে যায়, কিন্তু তা কেউ তেমন গুরুত্ব দেয় না।’ (বুখারি, হাদিস : ৭১২১)

অতএব, আল্লাহর দিকে আন্তরিক প্রত্যাবর্তনই আমাদের পার্থিব ক্ষতি থেকে পরিত্রাণ দিতে পারে।