মল পানিতে ভেসে গেলে কি স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে?

স্বাস্থ্য ডেস্কঃ সম্প্রতি ইউরোপিয়ান জার্নাল অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি অ্যান্ড হেপাটোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু মানুষের মল পানিতে ভাসতে পারে। সাধারণত মল পানির চেয়ে ভারী হওয়ায় এটি ডুবে যায়, তবে মলে যদি বাতাস বা চর্বি বেশি থাকে, মল ভেসে যেতে পারে।

গবেষণায় ১,২৫২ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা গেছে, ফাংশনাল বাওয়েল ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত রোগীদের ২৬ শতাংশের মল পানিতে ভেসেছে। অন্য ফাংশনাল পরিপাকতন্ত্র সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এ হার ৩ শতাংশ।

ফাংশনাল বাওয়েল ডিজঅর্ডার হল এমন একটি সমস্যা যেখানে অন্ত্রে গঠনগত কোনো ত্রুটি না থাকলেও অন্ত্র স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না। এছাড়া অতিরিক্ত আঁশ বা চর্বিযুক্ত খাবার, দুধের ল্যাকটোজ ও ফলের ফ্রুকটোজও মলকে ভাসমান করতে পারে।

তবে বিশেষ কোনো অসুবিধা না থাকলেও কিছু লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি:

  • মল দীর্ঘদিন ভেসে থাকা

  • স্বাভাবিকের চেয়ে দুর্গন্ধযুক্ত বা আঠালো মল

  • রক্তসহ মল বা টয়লেট পেপারে রক্ত দেখা

  • ওজন কমা, পেট ব্যথা, অতিরিক্ত গ্যাস

গবেষকরা জানাচ্ছেন, মল ভেসে থাকা সাধারণত স্বাভাবিক হলেও খাবার ও অভ্যাসের প্রতি মনোযোগ রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।




মিরপুরে লাজফার্মার ভুল ওষুধে জীবন-মৃত্যুর লড়াই রিনার; প্রতিশ্রুতি ভেঙে উল্টো পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজধানীর মিরপুরে লাজফার্মার অবহেলার কারণে ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়েছেন কামাল হাউজিংয়ের বাসিন্দা খালেদা আক্তার রিনা (৪৫)। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে থাকা Methoflex 500 mg-এর পরিবর্তে ফার্মেসি থেকে তাকে তুলে দেওয়া হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ও অত্যন্ত শক্তিশালী কেমোথেরাপি-জাতীয় ওষুধ Methotrexate 10 mg—এক পুরো পাতায় মোট ১০টি ট্যাবলেট। ভুল ওষুধ সেবনের পর থেকেই রিনার শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি হতে থাকে। লিভার ও কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মাথা ও ভ্রুর চুল পড়ে যেতে শুরু করে।

২৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে মিরপুরের রাইনখোলা মোড়ে শাহ আলী থানার কাছাকাছি লাজফার্মা থেকে ওষুধ কেনেন রিনা। শরীর খারাপ হতে থাকলে প্রথমে তাকে ১ নভেম্বর মিরপুর ইবনে সিনা হাসপাতালে নেয়া হয়। অবস্থা সংকটজনক হওয়ায় সেখান থেকে দ্রুত ধানমন্ডীর গ্রীন লাইফ হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়।

রিনা আইসিইউতে থাকা অবস্থায় লাজফার্মার ম্যানেজার মো. ওবায়দুল কয়েকবার হাসপাতালে যান। প্রতিষ্ঠানটির সুনাম রক্ষায় তিনি পরিবারকে বলেন যে চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় লাজফার্মা বহন করবে। শুরুতে তিনি ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা সাহায্যও দেন। কিন্তু ৫ নভেম্বর রিনাকে আইসিইউ থেকে কেবিনে নেয়ার পর তাদের আচরণ পুরোপুরি বদলে যায়।

১১ নভেম্বর রিনার পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়ে কথা বলতে লাজফার্মায় গেলে ম্যানেজার ওবায়দুল এবং পরিচালক বেলালের ভাই জিলাল তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন, হুমকি দেন এবং আর কোনো খরচ বহন করতে অস্বীকৃতি জানান। পরে সাংবাদিকরা বিষয়টি জানার পর পরিচালক আকবর ও বেলাল চার লাখ টাকা দেয়ার আশ্বাস দেন।

১২ নভেম্বর ফেয়ারপ্লাজার ১০ম তলায় এক ডেভেলপারের অফিসে রিনার পরিবার ও লাজফার্মা কর্তৃপক্ষের মধ্যে সাদা কাগজে লিখিত সমঝোতাও হয়—সেখানে চার লাখ টাকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই টাকা দেয়নি তারা। বরং লাজফার্মার ম্যানেজার ওবায়দুল উল্টো রিনার পরিবারের বিরুদ্ধে “চাঁদাবাজি” অভিযোগে শাহ আলী থানায় মামলা করেছেন। এ মামলার তদন্ত করছেন এসআই রুবেল।

স্থানীয়দের দাবি, রাইনখোলা মোড়ের লাভজনক এই লাজফার্মার সাইনবোর্ডটি কয়েকজন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ–সম্পৃক্ত নেতার কাছে মোটা অঙ্কের টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। ফলে মাসে লাখ টাকার বেশি মালিক লুৎফর রহমানকে দিতে হয়—যার কারণে ওষুধের মান, ভোক্তার নিরাপত্তা বা নৈতিকতার চেয়ে এখন মুনাফাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। এমনকি আগে লাজফার্মার অন্য একটি শাখায় নকল ওষুধ বিক্রির অভিযোগে ৫ লাখ টাকা জরিমানাও হয়েছিল।

গ্রাহকদের অভিযোগ—লাজফার্মার অনেক কর্মীই নিয়মিত দুর্ব্যবহার করেন, ভুল ওষুধ দেন এবং নানা প্রতারণা করেন, অথচ তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় খালেদা আক্তার রিনা এখনো গ্রীন লাইফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার পরিবার বলছে—লাজফার্মার অবহেলা, ভুল ওষুধ এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণেই রিনার জীবন আজ ঝুঁকির মধ্যে।




এলবিয়ন গ্রুপকে ঘিরে নানা অভিযোগ: নিম্নমানের ওষুধ, রাজস্ব ফাঁকি ও প্রতারণার তদন্ত চলছে

এসএম বদরুল আলমঃ দেশের ওষুধ শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এলবিয়ন গ্রুপ সম্প্রতি বারবার আলোচনায় আসছে নানা অভিযোগের কারণে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে একদিকে প্রতারণা ও চাঁদাবাজির মামলা চলমান, অন্যদিকে নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদন এবং শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করছে বিভিন্ন সংস্থা। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন বড় ধরনের বিতর্কের ঘূর্ণাবর্তে।

চট্টগ্রামের ইনোভেটিভ ফার্মার স্বত্বাধিকারী কাজী মোহাম্মদ শহিদুল হাসান ২০২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি কোতোয়ালিতে মামলা দায়ের করেন। তিনি অভিযোগ করেন, এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাইসুল উদ্দিন, এমডি মোহাম্মদ মুনতাহার উদ্দিন এবং চিফ অ্যাডভাইজার নিজাম উদ্দিন চুক্তিভঙ্গ ও প্রতারণা করেছেন। ১০ বছরের চুক্তি অনুযায়ী এলবিয়ন ওষুধ উৎপাদন করে লাভ ভাগাভাগি করার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে তারা চুক্তি ভেঙে ৫-৬ কোটি টাকার ওষুধ ইনোভেটিভ ফার্মার গুদামে জমা রেখে ৯টি খালি চেক জামানত হিসেবে নেয়। পরে আবার সেই ওষুধ ফেরত নিয়ে চেকগুলো ফেরত দিতে টালবাহানা শুরু হয়। এমনকি হুমকি দিয়ে ২ কোটি টাকার চাঁদা পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়। মামলা নম্বর—১৫১/২৩। বিষয়টি তদন্ত করছে চট্টগ্রাম মেট্রোর পিবিআই।

এদিকে ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির ২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবরের এক রিপোর্টে দেখা যায়, এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজের উৎপাদিত বেশ কিছু ওষুধের মান স্বাভাবিক মানদণ্ডের নিচে। ‘মিমক্স’ নামের অ্যান্টিবায়োটিক ক্যাপসুলে অ্যামোক্সিসিলিনই পাওয়া যায়নি, বরং ভিতরে ছিল সাদা দানা ধরনের পাউডার। ‘ইনডোমেথাসিন’ ক্যাপসুলেও নির্ধারিত পরিমাণের কম উপাদান পাওয়া গেছে। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো—মানুষ ও পশুর ওষুধ একই ভবনে তৈরি করা হচ্ছিল, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে। এছাড়া বাজারে অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামে ওষুধ বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে, যা নিম্নমানের উৎপাদনের ইঙ্গিত বহন করে।

দুদকে জমা পড়া অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কর বছরভিত্তিক গোপনে কোটি কোটি টাকার আমদানি-বিক্রয় করেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে ২০২১-২২ পর্যন্ত গোপন রাখা আমদানি ও বিক্রয়ের হিসাব মোটেই ছোট নয়—শুধু একটি বছরেই গোপন আমদের পরিমাণ ৪৯ কোটি টাকার ওপরে। আরও অভিযোগ রয়েছে মালিকপক্ষের নামে বেনামী জমি, একাধিক দামি গাড়ি, ৭টি প্রতিষ্ঠান ও ৯টি ব্যাংক হিসাব গোপন রাখা নিয়ে।

সংস্থাটি বিদেশে উচ্চমানের ওষুধ রপ্তানির দাবি করলেও তদন্তে জানা যাচ্ছে, এসব প্রচারণার অনেক তথ্যই ভ্রান্ত। দেশে মানহীন ওষুধ উৎপাদনের মাঝে রপ্তানি নিয়ে এমন প্রচারণা প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

এলবিয়ন গ্রুপের অধীনে রয়েছে এলবিয়ন ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড, এলবিয়ন অ্যানিমেল হেলথ, ব্লু অ্যাকোয়া ড্রিংকিং ওয়াটার, ফেভারিট লিমিটেড, ক্লিনজি ফরমুলেশন, ফবিটা, এলবিয়ন ট্রেডিং কর্পোরেশন, এলবিয়ন ডিস্ট্রিবিউশন, সেগাফ্রেডো জেনেতি এসপ্রেসো (ইতালি) ও এলবিয়ন স্পেশালাইজড ফার্মা লিমিটেডসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান।

সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রতারণা মামলা, মানহীন ওষুধ উৎপাদন, বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণা—এই চার দিকের অভিযোগ এখন প্রতিষ্ঠানটিকে কঠিন অবস্থায় ফেলেছে। এসব বিষয়ে সত্যতা যাচাই এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য পিবিআই ও দুদকের সক্রিয় তৎপরতা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।

 




হাসপাতালের কোয়ার্টারে ডাক্তারের ব্যক্তিগত চেম্বার: তাড়াইলে দুদকের অভিযানে অনিয়মের চিত্র

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধিঃ কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এনফোর্সমেন্ট টিমের অভিযানে বেরিয়ে এসেছে একের পর এক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা। ছদ্মবেশে পরিচালিত এই অভিযানে টিম দেখতে পায়, হাসপাতালের এক চিকিৎসক নিজ কোয়ার্টারেই ব্যক্তিগত চেম্বার খুলে রোগী দেখছেন, যা সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত।

দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আক্তারুল ইসলাম জানিয়েছেন, চিকিৎসাসেবা প্রদানে হয়রানি ও নানা অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তিতে দুদকের কিশোরগঞ্জ জেলা কার্যালয় থেকে এই অভিযান পরিচালিত হয়।

অভিযানের সময় টিম হাসপাতালের বহির্বিভাগে আগত রোগীদের ওষুধ সরবরাহের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে। দেখা যায়, অনেক রোগী ঠিকমতো ওষুধ পাচ্ছেন না। হাসপাতালের খাবারেও অনিয়ম ধরা পড়ে—রোগীদের জন্য নির্ধারিত ১৮০ গ্রামের পরিবর্তে মাত্র ১২৫ গ্রাম মাংস দেওয়া হচ্ছে, ১০০ গ্রামের পাউরুটির পরিবর্তে দেওয়া হচ্ছে ৫০ গ্রাম, আর নির্ধারিত ৫০ গ্রাম চিনি দেওয়া হয়নি। রান্নাঘরে ডায়েট চার্ট না থাকা, নোংরা পরিবেশ এবং বাথরুমের অস্বাস্থ্যকর অবস্থা টিমের নজরে আসে।

তাছাড়া, হাসপাতালের প্যাথলজি ল্যাবে মেয়াদোত্তীর্ণ রিএজেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছিল, ওয়ার্ডে বেডশিটগুলো ছিল অপরিচ্ছন্ন। ডিউটি থাকা ডাক্তাররা নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন না, ফলে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।

অভিযানে পাওয়া এসব অনিয়মের বিষয়ে দুদক টিম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি সংগৃহীত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে টিম একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেবে বলে জানিয়েছে দুদক।