বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সহকারী কমিশনার রাসেল আল মামুনকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি পদোন্নতি পাওয়া কাস্টমস ক্যাডারের ১১ ব্যাচের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘ চাকরিজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, রাসেল আল মামুনের জন্ম ১৯৮৬ সালের ১ নভেম্বর। চাকরির শুরু থেকেই তিনি কাস্টমসের বিভিন্ন সংবেদনশীল দায়িত্বে ছিলেন। এসব দায়িত্ব পালনের সময় ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও বন্ড প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়া এবং রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এভাবে কয়েক বছরে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছেন।
রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত কাস্টম বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আদায় করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময়ে তাঁর মাধ্যমে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা অবৈধভাবে আদায় করা হয়েছে।
বন্ড ব্যবস্থায় আমদানিকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক ও অন্যান্য রাজস্ব সুবিধা থাকায় সেখানে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাসেল আল মামুন প্রিভেন্টিভ টিমের সদস্যদের নিয়ে রাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান বা টহলের নামে চাপ সৃষ্টি করতেন। পরে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার বিনিময়ে বিভিন্ন জটিলতা মিটিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, বন্ড ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শুধু এককালীন অর্থই নেওয়া হতো না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত মাসিক টাকা আদায়ের একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল। কোনো প্রতিষ্ঠান ওই অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের কাগজপত্র আটকে রাখা, পণ্য খালাসে জটিলতা তৈরি কিংবা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির ভয় দেখানো হতো বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই কর্মকাণ্ডের পেছনে এনবিআরের একজন সাবেক সদস্য ও তৎকালীন অবিভক্ত বন্ড কমিশনারের প্রভাব ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে ওই কর্মকর্তার নাম সরাসরি উল্লেখ না করে তাকে রাসেল আল মামুনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মোংলা কাস্টম হাউসে দায়িত্ব পালনের সময় তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় এবং পরবর্তী সময়ে রাসেল ওই কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়, মোংলা কাস্টমস দিয়ে খালাস হওয়া গাড়ির যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন ভারী আমদানিপণ্যের ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে বড় অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। এর বিনিময়ে রাসেল আল মামুন অর্থ নিতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে ওই সাবেক কর্মকর্তা ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পেলে ২০১৮ সালে রাসেলকেও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে হেডকোয়ার্টার্স ও প্রিভেন্টিভ শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তিনি দায়িত্ব পান। পরবর্তী সময়ে খুলনা আপিল বিভাগ থেকে আবার ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে পোস্টিং নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনের সময় গুলশান ও টঙ্গী এলাকার বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলো থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, গুলশান এলাকার বিভিন্ন ওয়্যারহাউস থেকে মাসে প্রায় এক কোটি টাকা এবং টঙ্গী সার্কেল থেকে আরও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা আদায় করা হতো।
রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট অডিটকে কেন্দ্র করে গুরুতর অনিয়মের কথাও বলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আনোয়ার গ্রুপের মালিকানাধীন ‘হোসেন ডাইং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অডিটের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি ৩৫ লাখ টাকার বিনিময়ে অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার চুক্তি করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অডিটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব ফাঁকি শনাক্ত করার কথা থাকলেও ওই প্রতিষ্ঠানের ফাইল যথাযথভাবে পরীক্ষা না করেই অনুমোদন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে এনবিআরে অভিযোগ জমা পড়লে নতুন করে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় এক কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া যায় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
তবে ওই ঘটনায় রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে ৩৫ লাখ টাকার চুক্তি এবং ওই অর্থ গ্রহণের অভিযোগও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বন্ড কমিশনারেটের বাইরে কমলাপুর আইসিডি কাস্টম হাউসেও রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সেখানে দায়িত্ব পালনকালে আমদানিকৃত পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়া হতো।
অভিযোগে বলা হয়, সেখানে প্রতি মাসে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। যারা অর্থ দিতে চাইতেন না, তাদের পণ্য খালাসে জটিলতা তৈরি করা বা ভুয়া মামলায় জড়ানোর ভয় দেখানো হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে তৎকালীন কমিশনার এবং এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হলেও ওই অভিযোগের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়।
অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ রাসেল আল মামুনের সম্পদ নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরির আয় দিয়ে যে পরিমাণ সম্পদ অর্জন সম্ভব, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। ঘুষ ও অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ রিয়েল এস্টেটসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে তাঁর পারিবারিক বাড়ি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, একসময় সেখানে সাধারণ টিনের ঘর থাকলেও বর্তমানে বিপুল অর্থ ব্যয়ে একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি কেনার অভিযোগও রয়েছে।
রাজধানীতেও রাসেল আল মামুনের নামে ও বেনামে একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট এবং গাড়ি থাকার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, নিজের নামে সম্পদ দেখানোর পাশাপাশি বাবা-মা, ভাই-বোন এবং অন্যান্য নিকটাত্মীয়ের নাম ব্যবহার করেও সম্পদ কেনা হয়েছে।
এদিকে রাসেল আল মামুনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, পারিবারিক বিরোধের জেরে তাঁর স্ত্রী নারী নির্যাতন ও যৌতুক দাবির অভিযোগে আদালতে মামলা করেছেন।
সব মিলিয়ে রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন বেশ বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি দায়িত্বের অপব্যবহার, আমদানিকারক ও বন্ড ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ আদায়, মাসিক মাসোহারা নির্ধারণ, রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তা, অডিটে অনিয়ম, সরকারি রাজস্ব আদায়ে বাধা সৃষ্টি, ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার এবং অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন সময় এসব অনিয়মের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ কারণে রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে এবার দুদকের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে। তার চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালন করা শাখা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাইল, বিল-ভাউচার, অডিট রিপোর্ট, রাজস্ব আদায়ের হিসাব এবং সম্পদের বিবরণ যাচাইয়ের দাবি করা হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি প্রাথমিকভাবে যাচাই করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথিপত্র, কর্মকর্তার সম্পদের তথ্য এবং তাঁর দায়িত্ব পালনকালে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা হতে পারে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে রাসেল আল মামুনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এখন দুদকের অনুসন্ধানেই স্পষ্ট হতে পারে—অভিযোগে উল্লেখ করা অর্থ লেনদেনের বাস্তবতা কতটা, রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন, রাসেল আল মামুনের কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল কি না এবং তাঁর নামে ও স্বজনদের নামে থাকা সম্পদের প্রকৃত উৎস কী। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থায় গুরুতর অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।