নিজের শান্তির জন্য অন্যকে ক্ষমা করুন

ইসলামিক ডেস্কঃ মহান আল্লাহর যত গুণাবলি রয়েছে, ক্ষমার গুণ তার অন্যতম। কোরআন-হাদিসের পাতায় পাতায় আল্লাহর ক্ষমা ও মহানুভবতার পরিচয় মুক্তার মতো ছড়িয়ে আছে। আল্লাহ বলেছেন, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ও না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন  (জুমার)। এ আয়াত থেকে আমরা জানতে পারলাম, পৃথিবীতে এমন কোনো গুনাহ নেই, যার ক্ষমা নেই। তবে এর জন্য তওবা আবশ্যক। অর্থাৎ আল্লাহর হকসম্পৃক্ত সব গুনাহই যথাযথ তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। আর বান্দার হকসম্পৃক্ত গুনাহের ক্ষেত্রে তওবার পাশাপাশি বান্দার কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়াও আবশ্যক। মুত্তাকিদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে সুরা আলে ইমরানে মহান আল্লাহ বলেছেন, (মুত্তাকি তারাই) যারা সুখে ও দুঃখে দান করে, ক্রোধ দমন করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।

এ আয়াতে মুত্তাকিদের তিনটি গুণের কথা বলা হয়েছে। সবই আমাদের হৃদয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কৃপণতা না করে সুখে-দুঃখে আল্লাহর রাস্তায় দান করা, ক্রোধ দমন করা, ক্ষমা করা-এগুলো মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ বলেন, ক্রোধ না থাকা মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য। বরং তিনি ক্রোধ দমনের কথা বলেছেন। সৃষ্টির নিয়মে আমাদের ভিতর ক্রোধ থাকবে। তবে সেই ক্রোধ কে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারল, আল্লাহ সেটাই দেখবেন। আবার ক্ষমা এমন গুণ, বান্দা যদি ক্ষমা করে, আল্লাহও তাকে ক্ষমা করেন। ক্ষমা করা বড় হৃদয়ের পরিচয়। যারা ক্ষমা করতে পারে না, তাদের হৃদয় ছোট। সমুদ্রের ভিতর যদি ময়লা পড়ে, মুহূর্তে ময়লার টুকরো সমুদ্রের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু ময়লার ওই টুকরো যদি কুয়ার ভিতর পড়ে, তবে ময়লাটি হারিয়ে যায় না। বরং চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়ে থাকে। আমাদেরকে সমুদ্রের মতো বড় হৃদয়ের অধিকারী হতে হবে। জীবন চলার পথে নানা আঘাত, দুঃখ-বেদনা আসবে। কিন্তু সেগুলো মনে পুষে রাখা যাবে না। বরং সমুদ্রের মতো সেসব দুঃখ-বেদনা বিলীন করে দিতে হবে। এক চাকর বারবার ভুল করে আর ক্ষমা চায়। মালিক একসময় বিরক্ত হয়ে বলে, আর কত ক্ষমা করব! তোমার কাজই তো সব সময় ভুল করা। তখন চাকর বলে, আপনি আল্লাহর কাছে যতবার ক্ষমার আশা করেন, আমাকেও ততবার ক্ষমা করুন। এটি একটি শিক্ষণীয় গল্প। আমরা অধীনস্থদের সামান্য ভুলেই বিরক্ত হই, দুর্ব্যবহার করি। স্ত্রী- সন্তানদের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করি। তাদের সামান্য ভুলে ত্যক্ত হয়ে উঠি। তাদের ক্ষমা করি না। কিন্তু আমাদের ভাবা উচিত, আমরা আল্লাহর কাছেও বারবার ভুল করি এবং প্রত্যাশা রাখি, প্রত্যেকবারই আল্লাহ যেন আমাদের ক্ষমা করেন। আমরা যতক্ষণ না ক্ষমা করব, ততক্ষণ আমাদের হৃদয় ভারী হয়ে থাকবে। ধীরে ধীরে এই ভারত্ব বাড়তেই থাকবে। আধা লিটার পানির একটি বোতল হাতে ধরে রাখা খুব সহজ। কিন্তু এই বোতলটাই যদি আমরা পাঁচ-সাত ঘণ্টা ধরে রাখি, তবে এটাই আধামণ ভারী হয়ে উঠবে। ক্ষোভ পুষে রাখার ব্যাপারটাও তাই।

আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই অন্যকে ক্ষমা করা উচিত। কারণ আমরা যত ক্ষমা করব, তত নির্ভার থাকব। আমরা যতক্ষণ ক্ষমা না করব, ততক্ষণ কুয়ার ময়লার মতো আমাদের হৃদয় ময়লা হয়ে থাকবে। এ ময়লা নিয়ে কেউ ভালো থাকতে পারে না। তাই নিজেদের ভালো থাকার স্বার্থেই আমাদের ক্ষমার গুণ অর্জন করা উচিত। হাদিসের একটি ঘটনা বলি। হাদিসটি মুসনাদে আহমাদে এসেছে। একবার রসুল (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে বসেছিলেন। হঠাৎ তিনি বললেন, এখন এমন এক ব্যক্তি আমাদের মাঝে উপস্থিত হবেন, যিনি জান্নাতি। দেখা গেল, একটু পর একজন আনসার সাহাবি এলেন, যার মুখমণ্ডল দিয়ে অজুর পানি ঝরছে এবং তার বাম হাতে জুতা। পরপর তিন দিন একই ঘটনা ঘটল। তখন ওই জান্নাতি সাহাবির গোপন আমলের ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.)-এর কৌতূহল হলো। আমাদের সমাজে কেউ হঠাৎ বড়লোক হয়ে গেলে তার ব্যাপারে আমাদের কৌতূহল হয়। ধনী হওয়ার রহস্য উন্মোচন করে আমরাও তার মতো ধনী হওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু সাহাবিদের ধ্যানজ্ঞান ছিল পরকাল, জান্নাত। তাই আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) ওই সাহাবির গোপন আমল অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিন দিনের জন্য তিনি তাঁর মেহমান হলেন। কিন্তু এই তিন দিনে নিয়মিত আমলের বাইরে বিশেষ কোনো আমল দেখা গেল না। অবশেষে ওই সাহাবিকে তাঁর মেহমান হওয়ার গোপন উদ্দেশ্য খুলে বললেন। তখন সাহাবি বললেন, আমার তেমন বিশেষ কোনো আমল নেই। তবে একটা কাজ আমি নিয়মিত করি। সেটা হলো, প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে সবাইকে ক্ষমা করে দিই। কারও প্রতি কোনো ধরনের বিদ্বেষ রাখি না। হাদিসের এ ঘটনায় আমাদের জন্য অনেক বড় শিক্ষা রয়েছে। এ থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, নিয়মিত ক্ষমা করতে থাকা, কারও প্রতি রাগ-ঘৃণা-বিদ্বেষ পুষে না রাখা জান্নাতি মানুষের আলামত। তাই আসুন, আমরা হৃদয়টাকে কোমল করি, সবাইকে ক্ষমা করার গুণ অর্জন করি। তাহলে আমাদের দুনিয়া ও আখেরাত শান্তিময় হয়ে উঠবে।




“ভুলের মুহূর্তেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন”

ইসলামিক ডেস্কঃ ইস্তিগফার তথা ‘ক্ষমা চাওয়া’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘গাফারা’ শব্দমূল থেকে, যার অর্থ হলো ঢেকে দেওয়া বা গোপন রাখা। অর্থাৎ যখন আল্লাহ কোনো বান্দার পাপ ঢেকে দেন বা প্রকাশ করেন না, তখনই তিনি তাকে ক্ষমা করেন। পরিভাষায় ইস্তিগফার হলো—এমন একটি আবেদন, যেখানে বান্দা নিজের দ্বারা সংঘটিত পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের জন্য আল্লাহর কাছে দয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করে। মুসলমানদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যার আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার প্রয়োজন নেই—তার ঈমান যতই দৃঢ় হোক বা তার ধার্মিকতা যতই উচ্চমানের হোক না কেন।

এমনকি আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-ও প্রতিদিন বহুবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.)  বলেছেন : ‘আল্লাহর কসম! আমি প্রতিদিন সত্তরবারেরও বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাঁর কাছে তাওবা করি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩০৭)

আল্লাহ তাআলা সুরা নুহে বলেন, “অতঃপর আমি বললাম, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রাচুর্যে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি বৃদ্ধি করবেন, তোমাদের জন্য বাগান সৃষ্টি করবেন এবং প্রবহমান নদী প্রবাহিত করবেন। ” (সুরা : নুহ, আয়াত : ১০-১২)

অতএব, ইস্তিগফার শুধু পাপ মোচনের মাধ্যম নয়, বরং এটি বরকত, রিজিক, সন্তান-সন্ততি ও জীবনের প্রশান্তি লাভেরও এক অনন্য উপায়।

ইস্তিগফার পাপ মোচন ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যম

যখন কোনো মুসলমান পাপে লিপ্ত হয়, তারপর আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তখন আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেই পাপ মুছে দেন, যতক্ষণ না তার আমলনামা সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে কেউ কোনো মন্দ কাজ করে বা নিজের ওপর অন্যায় করে, কিন্তু পরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে দেখবে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১১০)

ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের আল্লাহ ভালোবাসেন

আল্লাহ তাআলা ক্ষমা প্রার্থনাকারী বান্দাদের ভালোবাসেন, তাদের তাওবায় আনন্দিত হন এবং তাদের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। এমনকি তিনি ফেরেশতাদের কাছেও এই ক্ষমা প্রার্থনাকারী বান্দাদের নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং ভালোবাসেন যারা নিজেদের পবিত্র রাখে।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২২২)

ক্ষমা প্রার্থনা আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি ও শান্তির পথ

ক্ষমা প্রার্থনা করা শুধু একটি ইবাদত নয়, বরং এটি আল্লাহর শাস্তি ও কবরের আজাব থেকে মুক্তির এক নিরাপদ আশ্রয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে উদ্দেশ করে তাঁর উম্মতের জন্য সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন, ‘আর আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না, যতক্ষণ তুমি (হে নবী) তাদের মধ্যে উপস্থিত আছ এবং যতক্ষণ তারা ক্ষমা প্রার্থনা করে, ততক্ষণও আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ৩৩)

ইস্তিগফার দুঃখ-কষ্ট ও উদ্বেগ দূর করার উপায়

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়মিতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তাকে প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেন, প্রতিটি সংকট থেকে বের হওয়ার পথ দান করেন এবং এমন জায়গা থেকে রিজিক দান করেন, যেখানে সে কখনো আশা করে না।’ (আবু দাউদ, ইবনু মাজাহ)

অতএব, ইস্তিগফার একদিকে যেমন আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, তেমনি জীবনের জটিলতা ও মানসিক ভার দূর করে দেয়।