নৌকা নেই, নিশ্চিত ভোটও নেই: হবিগঞ্জ-০৪ এ অনিশ্চয়তার রাজনীতি

বিশেষ প্রতিবেদকঃ স্বাধীনতার পর থেকে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত হবিগঞ্জ-০৪ আসন (চুনারুঘাট–মাধবপুর) এবার একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। নৌকা প্রতীক না থাকায় ভোটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা, কৌতূহল আর চাপা উত্তেজনা। প্রায় ৫ লাখ ১০ হাজার ভোটারের এই আসনে দীর্ঘদিন ধরে নৌকার পক্ষে থাকা একটি বড় অংশ এবার কোন দিকে যাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

এই আসনের রাজনীতিতে এবার মুখোমুখি অবস্থানে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শিল্পপতি ও রাজনীতিবিদ এস এম ফয়সল এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ইসলামি বক্তা মুফতী গিয়াস উদ্দিন তাহেরি। দুজনের প্রচার, বক্তব্য ও সমর্থন ঘিরে শুরু থেকেই চলছে নানা আলোচনা ও বিতর্ক।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এস এম ফয়সলের ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৮ কোটি টাকা হলেও তার বিরুদ্ধে প্রায় ২০০০ কোটি টাকার ঋণের অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের ওপর পেশিশক্তি প্রয়োগ, ভয়ভীতি দেখানো এবং নির্বাচনী মাঠে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে। এছাড়া তার পরিবারের একাধিক সদস্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে থাকায় বিষয়টি নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে এস এম ফয়সলের ভাই এস এম কায়সার যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন—এই ইতিহাস নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যদিও আদালতের রায় কার্যকরের আগেই তিনি কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন।

এদিকে এস এম ফয়সলের ভাতিজা সৈয়দ তানভীর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতা হওয়ায় এলাকাজুড়ে আরও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগপন্থী অনেক নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার আতঙ্ক এবং তথাকথিত মামলা-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে এস এম ফয়সলের অনুসারীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর মাধবপুর বাজারের স্বর্ণপট্টি এলাকায় এক রাতেই প্রায় ৮০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় জড়িত বিতর্কিত কিছু নেতাকে নির্বাচনী কার্যক্রমে সক্রিয় দেখা গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের মধ্যেও বিভাজন তৈরি, মতের অমিল থাকা সাংবাদিকদের চাপের মুখে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার কথাও শোনা যাচ্ছে।

অন্যদিকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের প্রার্থী মুফতী গিয়াস উদ্দিন তাহেরি নিজেকে একজন ঋণমুক্ত প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি ইসলামি মূল্যবোধ, সংযত ভাষা ও ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ভোটারদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তার পক্ষে পীর-মাশায়েখদের সমর্থন এবং সাবেক স্বতন্ত্র এমপি ব্যারিস্টার সাইদুল হক সুমনের সমর্থনের কথাও আলোচনায় রয়েছে।

যদিও মুফতী গিয়াস উদ্দিন তাহেরির স্থায়ী ঠিকানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়, তবুও তিনি হবিগঞ্জ-০৪ আসনে উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন পাচ্ছেন বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা চলছে। অনেকের মতে, বহিরাগত হয়েও তার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

ইটাখোলা দাখিল মাদ্রাসার এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এস এম ফয়সলের পরিবারের বিরুদ্ধে অতীতে নিজ দলের লোকজনের ওপরও হামলা, মারধর ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ রয়েছে। তার মতে, নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারে এসব নতুন কিছু নয়। তিনি আরও বলেন, মুফতী তাহেরির কর্মীদের ওপর হামলা ও হুমকির ঘটনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে অনেকেই মনে করছেন।

মুফতী গিয়াস উদ্দিন তাহেরি নিজেও অভিযোগ করেছেন যে, তাকে গাড়ি আটকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং মত প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে এসব ঘটনায় তিনি বিচলিত নন বলে জানান। তার ভাষায়, “আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করে এগোচ্ছি। জনগণ ব্যালটেই জবাব দেবে।”

এই আসনে প্রায় ২২টি চা বাগানের প্রায় ৭০ হাজার চা শ্রমিক ভোটার দীর্ঘদিন ধরে নৌকার প্রতি অনুগত বলে পরিচিত। নৌকা না থাকায় তাদের ভোট কোন দিকে যাবে, সেটিই এখন নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। অনেকের ধারণা, প্রকাশ্যে মিছিল-মিটিংয়ের চিত্র একরকম হলেও গোপন ব্যালটে ভিন্ন ফল দেখা যেতে পারে।

সব মিলিয়ে হবিগঞ্জ-০৪ আসনের নির্বাচন এবার শুধু ভোটের লড়াই নয়, বরং অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, ইতিহাস আর নতুন সমীকরণের এক জটিল চিত্র হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত ব্যালট বাক্সই ঠিক করবে—এই উত্তাল মাঠে কে হাসবে শেষ হাসি।