প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে ঢাকা ওয়াসায় আউটসোর্সিং বাণিজ্য: উপসচিব নুরুজ্জামান মিয়াজীর বিরুদ্ধে কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ

সূত্র জানায়, মাত্র গত সপ্তাহেই প্রায় দুই শত আউটসোর্সিং কর্মচারী বদলি এবং প্রায় চল্লিশ জন বিলিং সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব বদলি ও নিয়োগের বিপরীতে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ঘুষ বাণিজ্যের নেপথ্যে কথিত সিবিএ নেতা আজিজ ও মনির মূল ভূমিকা পালন করছেন বলেও সূত্রের দাবি।

ঢাকা ওয়াসার এক উপসচিব, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন—নুরুজ্জামান মিয়াজীর মতো একজন চরম দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে প্রশাসন বিভাগে বহাল রাখা প্রতিষ্ঠানটির জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। তাকে দ্রুত অপসারণ করা না হলে ঢাকা ওয়াসা পুরোপুরি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা ওয়াসার পতিত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার সাবেক এমডি তাকসিম এ খানের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন উপসচিব (প্রশাসন-১) নুরুজ্জামান মিয়াজী। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি দাপটের সঙ্গে একই পদে বহাল রয়েছেন।

ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, ঘুষখোর কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত নুরুজ্জামান মিয়াজী ফাইল আটকে রেখে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতেন। ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগে একসময় তাকে ওয়াসার চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলেও প্রভাব ও তদবিরের মাধ্যমে তিনি পুনরায় চাকরিতে ফিরে আসেন। এমনকি পরীক্ষায় নবম স্থান অধিকার করেও প্রায় ১৪ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে বর্তমান পদে আসীন হয়েছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, ঘুষ না পেলে তিনি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ উপেক্ষা করে ফাইল ফেরত পাঠাতেন। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুর্নীতির বরপুত্র হিসেবে পরিচিত ওয়াসার পলাতক সাবেক এমডি তাকসিম এ খানের দুর্নীতির অন্যতম সহযোগী ও সুবিধাভোগী ছিলেন নুরুজ্জামান মিয়াজী—এমন দাবিও উঠে এসেছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি প্লট, ফ্ল্যাট ও বাড়িসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, যা তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি। দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করলে তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের প্রমাণ পাওয়া যাবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে নিজেকে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠতার প্রচারণা চালাতেন। ফেসবুকে আওয়ামী লীগের পক্ষে পোস্ট ও নেতাদের সঙ্গে তোলা ছবি প্রকাশ করে ওয়াসায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন। এমনকি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উস্কানিও দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি অবস্থান পরিবর্তন করে বিএনপির নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান বলে অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা ওয়াসার কথিত জাতীয়তাবাদী কর্মচারী ইউনিয়নের স্বঘোষিত নেতা আজিজুল আলম খান ও মনির হোসেন পাটোয়ারীকে মোটা অঙ্কের ডোনেশন দিয়ে তাদের ছত্রছায়ায় আবারও নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করছে।

উল্লেখ্য, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে একসময় নুরুজ্জামান মিয়াজীকে প্রশাসন বিভাগ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে আজিজ–মনির চক্রের সহায়তায় তিনি পুনরায় একই বিভাগে পোস্টিং পেয়েছেন। এ জন্য বড় অঙ্কের ডোনেশন দেওয়া হয়েছে বলেও একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়ের করা একটি অভিযোগে আওয়ামী লীগের শাসনামলে তাকসিম এ খানের ছত্রছায়ায় নুরুজ্জামান মিয়াজীর অনিয়ম, দুর্নীতি, কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে।