মধুপুর জাতীয় উদ্যান রেঞ্জে ৩৯ লাখ টাকা রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ, রেঞ্জ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রশ্ন

image_pdfSaveimage_print

এসএম বদরুল আলমঃ টাঙ্গাইল বন বিভাগের মধুপুর জাতীয় উদ্যান রেঞ্জে রাজস্ব আত্মসাতের এক ভয়ংকর চিত্র ধীরে ধীরে সামনে আসছে। সম্প্রতি রাজস্ব সংক্রান্ত একটি ঘটনায় পলায়নের অভিযোগ ওঠার পর এবার মধুপুর রেঞ্জের বর্তমান রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ মোশাররফ হোসেন, ডেপুটি রেঞ্জারের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে টাঙ্গাইল বন বিভাগের অধীনে নিলামের মাধ্যমে মধুপুর জাতীয় উদ্যান রেঞ্জের গাছাবাড়ি বিটের লট নম্বর ১৫, ১৬, ১৯ ও ৩১/২৪-২৫ সহ একাধিক লট বিক্রি করা হয়। এসব লটের ক্রেতা হিসেবে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার গাবতলী এলাকার কাঠ ব্যবসায়ী আলাল খান ও রহমত সরকার এবং টাঙ্গাইলের অরণখোলা এলাকার কাঠ ব্যবসায়ী আয়নাল হকের নাম উঠে আসে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ছয় থেকে সাত মাস আগে রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ মোশাররফ হোসেন নিজ কার্যালয়ে ডেকে কাঠ ব্যবসায়ী আলাল খানের কাছ থেকে লট নম্বর ১৫ ও ১৬/২৪-২৫ বাবদ ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা, রহমত সরকারের কাছ থেকে লট নম্বর ১৯, ৩১ ও আরও একটি লট বাবদ ১৪ লাখ টাকা এবং আয়নাল হকের কাছ থেকে কয়েকটি লটের বিপরীতে প্রায় ২০ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা আদায় করা হলেও এসব অর্থ আজও সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, কাঠ ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত লটের গাছ কেটে নিয়ে গেছেন এবং জামানতের অর্থও ফেরত পেয়েছেন। একই সঙ্গে রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ মোশাররফ হোসেন ওই বনভূমিতে দ্বিতীয় আবর্তের বাগান সৃজন করেছেন। তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো—এত বড় অঙ্কের বিক্রয়মূল্য সরকারি কোষাগারে জমা না হওয়ায় বন বিভাগের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কাঠ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা বন বিভাগের সব পাওনা পরিশোধ করেছেন বলে মনে করলেও রেঞ্জ কর্মকর্তা তাদের কাছ থেকে সরকারি রশিদের পরিবর্তে কাঁচা রসিদ বা টোকেন ব্যবহার করে অর্থ গ্রহণ করেছেন। বন বিভাগের সরকারি রাজস্ব আদায়ের জন্য নির্ধারিত রশিদ বহি থাকা সত্ত্বেও কেন কাঁচা রসিদ ব্যবহার করা হলো, তা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয় যখন সম্প্রতি রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ মোশাররফ হোসেন কাঠ ব্যবসায়ীদের আবারও তার অফিসে ডেকে টাকা দাবি করেন। তখনই মূল তথ্য ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে শুরু করে। স্থানীয়দের মতে, তদন্ত হলেই পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।

এদিকে গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পাল্টা পোস্টে মোঃ মোশাররফ হোসেন দাবি করেন, লাল চান নামের এক বাগান মালী (আউটসোর্সিং স্টাফ) পারিবারিক ঝামেলার কারণে পরিবার রেখে পালিয়ে যাওয়ায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। তবে এই ব্যাখ্যাকে অনেকেই প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, একজন আউটসোর্সিং স্টাফের পারিবারিক সমস্যার দায় কেন একজন রেঞ্জ কর্মকর্তা নেবেন এবং কেন তিনি নিজে বাদী হয়ে থানায় জিডি করবেন—এই প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার নয়।

নিয়ম অনুযায়ী, কোনো স্টাফ কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে রেঞ্জ কর্মকর্তার করণীয় হলো উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সেখানে থানায় জিডি করার বিষয়টি অনেকের কাছেই সন্দেহজনক বলে মনে হচ্ছে।

আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যে, রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ মোশাররফ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে একজন আউটসোর্সিং স্টাফের কাছে রাজস্বের লক্ষ লক্ষ টাকা জমা রেখে নিশ্চিন্ত ছিলেন এবং ওই স্টাফের কোনো খোঁজখবর নেননি। স্থানীয়রা জানান, মুক্তাগাছার বানারপাড়া এলাকার করাতকল মালিক মোঃ শফি এবং আরও একজনের মোবাইলে বিকাশের মাধ্যমে গত এক সপ্তাহে ওই স্টাফ লাল চান ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা পাচার করেছে—যা এলাকায় মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, টাঙ্গাইলের ডিএফও’র অত্যন্ত স্নেহভাজন হওয়ায় মোঃ মোশাররফ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে ধরাকে সরা জ্ঞান করে মধুপুর জাতীয় উদ্যান রেঞ্জে অনিয়ম ও দুর্নীতির একটি শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলেছেন। এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের ডিএফও, কেন্দ্রীয় অঞ্চলের বন সংরক্ষক ও প্রধান বন সংরক্ষক মহোদয়ের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

  • Related Posts

    ফেসবুক পোস্ট থেকে পদোন্নতি—বিসিকে প্রভাবশালী কর্মকর্তা রাশেদুর রহমানকে নিয়ে প্রশ্নের পর প্রশ্ন

    এসএম বদরুল আলমঃ বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব, বিতর্কিত পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক…

    পরীক্ষাকেন্দ্রে চরম অবহেলা: দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি রামপুরার প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ যেখানে দায়িত্ববোধ, সততা আর শৃঙ্খলার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ছিল, সেখানে নেমে এলো চরম অবহেলার অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারেই যেন নিভে গেল এক প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বের প্রদীপ। ঢাকার…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    সংরক্ষিত নারী আসনের ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 27 views
    সংরক্ষিত নারী আসনের ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী

    বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়াল সরকার

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 22 views
    বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়াল সরকার

    বৃষ্টি থাকতে পারে আরও ৫ দিন

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 21 views
    বৃষ্টি থাকতে পারে আরও ৫ দিন

    পুরো দেশেই বেসিক সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 19 views
    পুরো দেশেই বেসিক সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর

    দেশের বাজারে আবারও কমলো স্বর্ণ ও রুপার দাম

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 17 views
    দেশের বাজারে আবারও কমলো স্বর্ণ ও রুপার দাম

    ক্লিন সিটি গড়ে তুলতে নানা পদক্ষেপের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী

    • By Reporter
    • এপ্রিল ২৯, ২০২৬
    • 13 views
    ক্লিন সিটি গড়ে তুলতে নানা পদক্ষেপের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী