খুলনা গণপূর্তে সাত বছরে গড়ে ওঠা নীরব দুর্নীতির বলয়: উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অভিযোগ

image_pdfSaveimage_print

বিশেষ প্রতিবেদকঃ খুলনা গণপূর্ত জোনে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলেছে এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী দুর্নীতির চক্র—এমনই অভিযোগ উঠেছে উপসহকারী প্রকৌশলী (এস্টিমেটর) মো: মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি সরকারি দায়িত্বকে ব্যবহার করে টেন্ডার বাণিজ্য, কমিশন আদায়, নিম্নমানের কাজ অনুমোদন এবং সরকারি অর্থ আত্মসাৎকে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় পরিণত করেছেন। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী একই কর্মস্থলে সাধারণত তিন বছরের বেশি থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু মো: মিজানুর রহমান ব্যতিক্রমীভাবে টানা সাত বছর ধরে খুলনা গণপূর্ত জোনেই বহাল রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে প্রভাব খাটিয়ে ও বিশেষ সম্পর্ক ব্যবহার করে তিনি বারবার বদলির আদেশ ঠেকিয়ে দিয়েছেন। দীর্ঘ সময় একই জায়গায় থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ঠিকাদারদের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যেখানে তার অনুমতি ছাড়া কোনো কাজ এগোনো কার্যত অসম্ভব।

ভুক্তভোগী একাধিক ঠিকাদার জানান, মিজানুর রহমানের কক্ষে সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা ঠিকাদারদের ঢুকতেই দেওয়া হয় না। দেখা করতে চাইলে দুর্ব্যবহার করা হয়, ফাইল আটকে রাখা হয় কিংবা মাসের পর মাস ঘোরানো হয়। এমনকি অফিসের ভেতরেও তার কক্ষকে ‘অঘোষিত নিষিদ্ধ এলাকা’ হিসেবে দেখা হয়। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীও তার আচরণে চরম বিরক্ত ও ভীত বলে অভিযোগ রয়েছে।

টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার কোনো বালাই নেই—এমন অভিযোগও উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, টেন্ডারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আগেই নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়, যাতে তারা সুবিধা পায়। যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে নানা অজুহাতে বাদ দিয়ে সিন্ডিকেটভুক্ত ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয়। কাজ পেতে হলে নির্দিষ্ট হারে ‘পার্সেন্টেজ’ বা বড় অঙ্কের কমিশন দিতে হয় বলেও অভিযোগ করেছেন ঠিকাদাররা। যারা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের বিল আটকে রাখা হয় কিংবা কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

নির্মাণকাজের মান নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিম্নমানের কাজ হলেও কোনো যাচাই ছাড়াই পূর্ণ বিল অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে একদিকে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে নিম্নমানের অবকাঠামো জনসাধারণের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। অনেক প্রকল্পে ব্যবহৃত সামগ্রী ও কাজের মানের সঙ্গে অনুমোদিত বিলের কোনো মিল নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।

মো: মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি সরকারি পদ ও ক্ষমতা ব্যবহার করে সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগিয়েছেন। ভুয়া ভাউচার তৈরি করে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ তুলে নেওয়া, প্রকল্পের টাকা ভাগাভাগি করে নেওয়া এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ আদায়ের কথাও অভিযোগের তালিকায় রয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো: মিজানুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে দীর্ঘদিন ধরে একই অভিযোগ বারবার ওঠায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—তাহলে এতদিন কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?

এই পরিস্থিতিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতি জোরালো দাবি উঠেছে—খুলনা গণপূর্তের এই দীর্ঘদিনের দুর্নীতির চক্র ভেঙে দিতে অবিলম্বে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে মো: মিজানুর রহমানসহ সংশ্লিষ্টদের সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

এখন প্রশ্ন একটাই—খুলনা গণপূর্তের এই নীরব দুর্নীতির দেয়াল কি আরও কিছুদিন অদৃশ্য শক্তির আশ্রয়ে টিকে থাকবে, নাকি সত্যিই এবার শুরু হবে জবাবদিহির কঠোর অধ্যায়?

  • Related Posts

    দুদকের মামলার আসামি অলিউল, ফুয়াদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ—তবু চেয়্যারম্যানের আস্থাভাজন, জাতীয় গৃহায়নে ফেরদৌসী বেগমের ক্ষমতার বলয় নিয়ে প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. অলিউল ইসলাম ও মোস্তফা হোসাইন ফুয়াদসহ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কথায় চলছে গৃহায়নের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম। তাঁর দপ্তরের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টদের…

    রাজউকে দুই কর্মচারীর ‘সমান্তরাল রাজত্ব’! মলির টেবিলে ফাইল জিম্মি, সবুজের কক্ষে ঘুষের দরদাম—উঠছে গুরুতর অভিযোগ

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানী ঢাকা ও তার চারপাশের পরিকল্পিত নগরায়ণের স্বপ্ন যেখানে বোনা হওয়ার কথা, সেই রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) যেন আজ এক গভীর অন্ধকার কুঠুরি। প্রতিষ্ঠানটির সুশাসন আর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    পুলিশের ৬ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বরখাস্ত

    পুলিশের ৬ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বরখাস্ত

    এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী রিমান্ডে

    এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী রিমান্ডে

    মেসির বিদায়ী ম্যাচ নিয়ে ডি মারিয়া— ‘আমরা শেষ দিনটি উপভোগ করবো’

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
    • 5 views
    মেসির বিদায়ী ম্যাচ নিয়ে ডি মারিয়া— ‘আমরা শেষ দিনটি উপভোগ করবো’

    দুদকের মামলার আসামি অলিউল, ফুয়াদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ—তবু চেয়্যারম্যানের আস্থাভাজন, জাতীয় গৃহায়নে ফেরদৌসী বেগমের ক্ষমতার বলয় নিয়ে প্রশ্ন

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
    • 22 views
    দুদকের মামলার আসামি অলিউল, ফুয়াদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ—তবু চেয়্যারম্যানের আস্থাভাজন, জাতীয় গৃহায়নে ফেরদৌসী বেগমের ক্ষমতার বলয় নিয়ে প্রশ্ন

    জবির দ্বিতীয় সমাবর্তন ৩০ জানুয়ারি

    জবির দ্বিতীয় সমাবর্তন ৩০ জানুয়ারি

    রাজউকে দুই কর্মচারীর ‘সমান্তরাল রাজত্ব’! মলির টেবিলে ফাইল জিম্মি, সবুজের কক্ষে ঘুষের দরদাম—উঠছে গুরুতর অভিযোগ

    • By admin admon
    • সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
    • 58 views
    রাজউকে দুই কর্মচারীর ‘সমান্তরাল রাজত্ব’! মলির টেবিলে ফাইল জিম্মি, সবুজের কক্ষে ঘুষের দরদাম—উঠছে গুরুতর অভিযোগ