‘বিনা পুঁজিতে’ ৩ হাজার শেয়ার, কোটি টাকার হিসাবহীনতা—বনলতা ল্যান্ডমার্কে অডিট বাধা ও দ্বৈত কোম্পানির অভিযোগ

image_pdfSaveimage_print

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রিয়েল এস্টেট খাতে উচ্চাভিলাষী সূচনার পর আজ প্রশ্নের মুখে বনলতা ল্যান্ডমার্ক লিমিটেড। শেয়ার বণ্টনে অনিয়ম, গ্রাহকের কোটি কোটি টাকার হিসাবহীনতা, একই প্রকল্পের নামে পৃথক কোম্পানি খোলা, অডিটে বাধা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুকেন্দ্র দাস।

শেয়ার দখলের অভিযোগ: ‘বিনা পুঁজিতে’ ৩ হাজার শেয়ার!
কোম্পানির চেয়ারম্যান আহম্মদ আলী খান ফেরদৌস স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়ের করা লিখিত অভিযোগে দাবি করেছেন—২০১৮ সালের ১৩ আগস্ট প্রলোভন দেখিয়ে সুকেন্দ্র দাস প্রথমে ১২০০ শেয়ার গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে চেয়ারম্যান দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকাকালে আরও ১৮০০ শেয়ার নিজের নামে নিয়ে মোট ৩০০০ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেন—কোনো পুঁজি বিনিয়োগ ছাড়াই।

অভিযোগে বলা হয়, ব্যাংক হিসাবও এককভাবে এমডির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ৩১ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত এক্সট্রা অর্ডিনারি জেনারেল মিটিংয়ে আর্টিকেল সংশোধনের মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালনার ক্ষমতা এমডির হাতে তুলে দেওয়া হয়—যেখানে কোরাম পূরণ হয়নি এবং চেয়ারম্যানকে অবহিত করা হয়নি বলে অভিযোগ।

২৮ কোটি টাকার লেনদেন—কিন্তু জমি কোম্পানির নামে নয় !
অভ্যন্তরীণ অডিট সূত্রের দাবি—চলমান প্রায় ২১৮ জন গ্রাহকের কাছ থেকে বুকিং ও কিস্তি বাবদ ২৮ কোটির বেশি টাকা গ্রহণ করা হয়েছে। অথচ কোম্পানির নামে পর্যাপ্ত জমির দলিল বা বায়নার প্রমাণ নেই। অডিট পর্যবেক্ষণে আরও উঠে আসে—১৭টি দলিলের মধ্যে ১৬টি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত নামে এবং মাত্র একটি চেয়ারম্যানের নামে।
প্রশ্ন উঠছে—গ্রাহকের অর্থ কি ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তরিত হয়েছে ? একইসঙ্গে প্রায় ৫.৫৫ কোটি টাকার ব্যয়ের ক্ষেত্রে বোর্ড রেজুলেশন বা যথাযথ ভাউচার অনুপস্থিত থাকার অভিযোগও রয়েছে।

একই প্রকল্পের নামে আলাদা কোম্পানি ! “বনলতা রিভারগেট টাউন” প্রকল্পের নাম ব্যবহার করে পৃথক কোম্পানি খোলার অভিযোগ রয়েছে। চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের নামের সঙ্গে মিল রেখে “বনলতা রিভারগেট টাউন লিমিটেড” নামে নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়।

এছাড়া “গাডওয়াল হোল্ডিংস লিমিটেড” নামে আরেকটি কোম্পানি একই অফিস ঠিকানায় পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা—এতে গ্রাহক বিভ্রান্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং অর্থ স্থানান্তরের পথ সহজ হয়েছে।

অডিটে বাধা ও ফাইল গায়েব!
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৯–২০২১ সময়কালের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। অডিট চলাকালে নির্ধারিত কক্ষে তালা ভাঙা, গুরুত্বপূর্ণ ফাইল গায়েব হওয়া এবং অডিট টিমকে বাধা দেওয়ার ঘটনাও উল্লেখ রয়েছে। যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি কেবল আর্থিক অনিয়ম নয়—বরং প্রমাণ নষ্টেরও ইঙ্গিত বহন করে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ, থানায় জিডি : চেয়ারম্যান আহম্মদ আলী খান বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। পাশাপাশি বনানী থানা-এ সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং ১৬৪, তারিখ ০৩/০১/২০২৬) করেন। জিডিতে তিনি অভিযোগ করেন—হিসাব চাইতে গেলে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় এবং ‘খুন করে লাশ গুম’ করার ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।

এছাড়া কোম্পানির এইচআর ও অ্যাকাউন্টস কর্মকর্তা শারমীন আক্তারও পৃথকভাবে জিডি (নং ৭৩৮, তারিখ ০৮/০১/২০২৬) করেন। তিনি অভিযোগ করেন—অফিসে তাকে হুমকি ও মারধরের চেষ্টা করা হয়েছে, ফলে তিনি মানসিকভাবে আতঙ্কিত।

ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি: গাড়ি ও পূর্বাচল প্লট : অভিযোগে আরও বলা হয়েছে—কোম্পানির অর্থ ব্যবহার করে বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয় এবং পূর্বাচলে প্লট কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক তদন্ত এখনো সম্পন্ন হয়নি।

এমডির নীরবতা : উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সুকেন্দ্র দাসের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রশ্নগুলোর উত্তর কে দেবে ?
২৮ কোটির বেশি গ্রাহক অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে ? কেন অধিকাংশ জমির দলিল ব্যক্তিগত নামে ? একই প্রকল্পের নামে পৃথক কোম্পানি খোলার উদ্দেশ্য কী ? অডিটে বাধা ও নথি গায়েব হওয়ার দায় কার ? ভয়ভীতি ও হুমকির অভিযোগের পেছনে কী সত্য লুকিয়ে আছে ?

রিয়েল এস্টেট খাতে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত এমন অভিযোগের নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

(পরবর্তী পর্বে: গ্রাহকদের সরাসরি অভিযোগ, আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ, বোর্ডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা বিশ্লেষণ।)

  • Related Posts

    মাদারীপুর এলজিইডিতে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পিডি বাবুল আখতারকে ঘিরে শতকোটি টাকার প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ মাদারীপুরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র ও কার্যাদেশ নিয়ে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন এলজিইডির সাবেক মাদারীপুর জেলা নির্বাহী…

    ভিজিটিং কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি ঘিরে প্রশ্ন

    বিশেষ প্রতিবেদকঃ ময়মনসিংহ সদর সাব-রেজিস্ট্রার মো. জাহিদ হাসানের বদলিকে কেন্দ্র করে তাঁর দায়িত্ব পালনকালের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় তাঁর বদলি হওয়ার খবরের পাশাপাশি ভিজিটিং কার্ড…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    You Missed

    মাদারীপুর এলজিইডিতে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পিডি বাবুল আখতারকে ঘিরে শতকোটি টাকার প্রশ্ন

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 11 views
    মাদারীপুর এলজিইডিতে টেন্ডার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, পিডি বাবুল আখতারকে ঘিরে শতকোটি টাকার প্রশ্ন

    ভিজিটিং কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি ঘিরে প্রশ্ন

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 9 views
    ভিজিটিং কার্ড বিতরণে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, সাব-রেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের বদলি ঘিরে প্রশ্ন

    বিআরটিএ উত্তরা মেট্রো-৩: ঘুষ দাবির অভিযোগে প্রশ্নের মুখে সেবা কার্যক্রম, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

    বিআরটিএ উত্তরা মেট্রো-৩: ঘুষ দাবির অভিযোগে প্রশ্নের মুখে সেবা কার্যক্রম, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

    চাকরির আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মেলে না, সাবেক সাবরেজিস্ট্রার নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

    • By admin admon
    • অক্টোবর ২৮, ২০২৬
    • 14 views
    চাকরির আয়ের সঙ্গে সম্পদের হিসাব মেলে না, সাবেক সাবরেজিস্ট্রার নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

    লোহাগড়ায় জমি নিয়ে বিরোধ, ছোট ভাইকে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ বড় ভাই ও ভাবীর বিরুদ্ধে!

    লোহাগড়ায় জমি নিয়ে বিরোধ, ছোট ভাইকে পিটিয়ে জখমের অভিযোগ বড় ভাই ও ভাবীর বিরুদ্ধে!

    বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের জন্য ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছিল: রিজভী

    বিদ্যুৎখাতে লুটপাটের জন্য ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছিল: রিজভী